📄 উক্ত হাদীস সম্পর্কে আল্লামাহ্ রশীদ রেযার মন্তব্য ও উহার উত্তর
আল্লামাহ্ রশীদ রেযা বলেনঃ উক্ত হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন বর্ণন ধারায় ইব্রাহীম বিন্ ইয়াযীদ বিন্ শরীক আত-তাইমী থেকে তিনি আবূ যর থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আহমাদ বলেনঃ বর্ণনাকারী ইব্রাহীম বিন্ ইয়াযীদ আবু যর এর সাথে কখনো সাক্ষাৎ করেননি। ইমাম দারাকুত্বনী বলেনঃ তিনি হাস্বা ও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে কোন হাদীসই শুনেননি। এমনকি তাঁদের যুগও পাননি। 'আল্লামাহ্ ইব্দুল-মাদীনি বলেনঃ তিনি 'আলী এবং ইব্দু 'আব্বাস্ () থেকেও কোন হাদীস শুনেননি।
এভাবে তিনি অন্যান্য হাদীসও এঁদের থেকে “আন্” (থেকে) শব্দে বর্ণনা করেন; অথচ তিনি এঁদের থেকে সরাসরি কোন হাদীসই শুনেননি। সুতরাং তিনি বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী হলেও তিনি যাঁর নাম উল্লেখ না করে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিনি বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী নাও হতে পারেন।
তাঁর মন্তব্যটি খুবই ভয়ানক। কারণ, তিনি বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে কথা তুলেছেন; অথচ সকল মুসলমান এগুলোর বিশুদ্ধতার উপর একমত।
এ দিকে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, ইব্রাহীম বিন্ ইয়াযীদ বিন্ শরীক আত-তাইমী তাঁর পিতা থেকে তাঁর পিতা আবু যর থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। আর তাঁর পিতা তো 'উমর, 'আলী, আবু যর, ইব্দু মাস্'উদ এবং অন্যান্য সাহাবা থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। আল্লামাহ্ ইব্দু মা'য়ীন, ইব্দু হিব্বান, ইবনু সা'দ এবং ইবনু 'হাজার তাঁকে বিশ্বস্ত বলে আখ্যায়িত করেন।
এ ছাড়াও মুসলিম শরীফের বর্ণনায় বর্ণনাকারী ইব্রাহীমের তাঁর পিতা থেকে হাদীসটি সরাসরি শুনার ব্যাপারটি উল্লিখিত হয়েছে। আর কোন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী কোন হাদীস তাঁর উপরের বর্ণনাকারী থেকে সরাসরি শুনার ব্যাপারটি সুস্পষ্ট উল্লেখ করলে তা মেনে নিতে হয়।
📄 পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠার পর আর কারোর কোন ঈমান বা তাওবা গ্রহণ যোগ্য হবে না
যখন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে তখন আর নতুন করে কোন কাফিরের ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। না কোন পাপীর তাওবা গ্রহণ করা হবে। কারণ, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠা আল্লাহ্ তা'আলার একটি বড়ো নিদর্শন। যা সে যুগের প্রত্যেক ব্যক্তিই সুস্পষ্টভাবে অবলোকন করবে। তখন সকল সত্যই উদ্ভাসিত হবে। সকল মানুষই আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় আয়াতসমূহ স্বীকার ও বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। অতএব যেমন আল্লাহ্ তা'আলার মানব বিধ্বংসী আযাব দেখলে নতুন করে আর কারোর ঈমান গ্রহণযোগ্য হয় না এটাও তেমন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا قَالُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَحْدَهُ وَكَفَرْنَا بِمَا كُنَّا بِهِ مُشْرِكِينَ، فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا، سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ.
অর্থাৎ অতঃপর যখন তারা আমার শাস্তি প্রতক্ষ্য করলো তখন বললোঃ আমরা এক আল্লাহ্'র উপর ঈমান আনলাম এবং আমরা তাঁর সাথে যাদেরকে শরীক করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম। তারা যখন আমার শাস্তি প্রতক্ষ্য করলো তখন তাদের ঈমান আর তাদের কোন উপকারে আসলো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ নিয়ম পূর্ব থেকেই তাঁর বান্দাহ্রদের মাঝে চালু আছে। আর তখনই তো কাফিররা সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (গাফির/মু'মিন: ৮৪-৮৫)
'আল্লামাহ্ কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার পর নতুন করে কারোর ঈমান তার কোন ফায়েদায় আসবে না এ জন্য যে, উক্ত নিদর্শন দেখার পর তার ভেতর এমন ভয়-ভীতি সঞ্চারিত হবে যে, যার ফলে তখন তার ভেতরকার সকল কুপ্রবৃত্তি মরে যাবে এবং তার শরীরের সকল শক্তি নেতিয়ে পড়বে। তখন মানুষের অবস্থা এমন হবে যে, যেন তাদের মৃত্যু এসে গেছে। কারণ, তখন তারা নিশ্চিত যে, কিয়ামত অতি সন্নিকটে। তখন সবার মধ্যেই গুনাহ্'র সকল ইচ্ছা নিভে যাবে। সুতরাং মুমূর্ষু ব্যক্তির তাওবা যেমন গ্রহণযোগ্য হয় না তেমন এদের ঈমান এবং তাওবাও তখন গ্রহণযোগ্য হবে না।
'আল্লামাহ্ ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এমন সময় কোন কাফির ঈমান আনলে তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে কোন ঈমানদার ইতিপূর্বে নেক আমল করে থাকলে সে অবশ্যই ভাগ্যবান। আর গুনাহগার হয়ে থাকলে তার তাওবাহ্ এখন আর তার কোন লাভে আসবে না। (ইবনু কাসীর ৩/৩৭১)
কুর'আন ও হাদীস এ ব্যাপারে অতি সুস্পষ্ট। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيْمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيْمَانِهَا خَيْرًا.
অর্থাৎ যে দিন তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন প্রকাশ পাবে সে দিন কারোর ঈমান তার কোন ফায়দায় আসবে না যদি সে ইতিপূর্বে ঈমান না এনে থাকে অথবা ঈমান আনার পর কোন নেক আমল সম্পাদন করে না থাকে। (আন্'আম: ১৫৮)
রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ مَا تُقْبَلَتِ التَّوْبَةُ، وَلَا تَزَالُ التَّوْبَةُ مَقْبُولَةً حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ الْمَغْرِبِ، فَإِذَا طَلَعَتْ طُبِعَ عَلَى كُلِّ قَلْبِ بِمَا فِيْهِ، وَكَفَى النَّاسَ الْعَمَلُ.
অর্থাৎ হিজরত (কাফির এলাকা ছেড়ে যাওয়া) বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাওবা কবুল করা হবে। আর তাওবা কবুল করা হবে যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠে। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে তখন প্রত্যেকের অন্তরে যা আছে তার উপরই মোহর মেরে দেয়া হবে। তখন মানুষকে আর তার আমল নিয়ে ভাবতে হবে না। তথা পূর্বের আমলই তার জন্য যথেষ্ট হবে। (আহমাদ, হাদীস ১৬৭১ মাজমা'উয-যাওয়ায়িদ ৫/২৫১)
রাসূল () আরো বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ جَعَلَ بِالْمَغْرِبِ بَابًا عَرْضُهُ مَسِيْرَةُ سَبْعِينَ عَامًا لِلتَّوْبَةِ، لَا يُغْلَقُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ قِبَلِهِ، وَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى: ﴿يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيْمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيْمَانِهَا خَيْرًا﴾.
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাওবার জন্য পশ্চিম দিকে একটি গেইট খুলে রেখেছেন যার প্রস্থ সত্তর বছরের পথ। তা বন্ধ করা হবে না যতক্ষণ না সূর্য সে দিক থেকে উঠে। এ দিকেই আল্লাহ্ তা'আলা ইঙ্গিত করে বলেনঃ যে দিন তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন প্রকাশ পাবে সে দিন কারোর ঈমান তার কোন ফায়দায় আসবে না যদি সে ইতিপূর্বে ঈমান না এনে থাকে অথবা ঈমান আনার পর কোন নেক আমল সম্পাদন করে না থাকে। • (তিরমিযী/তুহফাহ্ ৯/৫১৭-৫১৮)
কারো কারোর ধারণা, যাদের ঈমান গ্রহণ করা হবে না তারা এমন কাফির যারা সরাসরি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠতে দেখেছে। তবে এরপর সময় দীর্ঘায়িত হলে এবং মানুষ তা ভুলে গেলে কাফিরদের ঈমানও গ্রহণ করা হবে এবং গুনাঙ্গারের তাওবাও গ্রহণ করা হবে।
আল্লামাহ্ কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাহ্'র তাওবা কবুল করেন যতক্ষণ না তার রূহ্ গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যখন রূহ্ তার গলা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে তখন আর তার কোন তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। তখন বান্দাহ্ জান্নাত বা জাহান্নামে তার অবস্থান দেখতে পাবে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠতে দেখে অথবা নিকট অতীতে সে যুগের সবাই তা দেখেছে এমন সংবাদ নিশ্চিতভাবে তার কাছে পৌঁছে সেও এমন। সুতরাং তার তাওবাও গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, তখন আল্লাহ্, রাসূল এবং তাঁদের ওয়াদা সম্পর্কে তার জ্ঞান নিশ্চিত অবশ্যম্ভাবী। তবে এরপর যদি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায় এবং মানুষ তা ভুলতে বসে তথা তা নিয়ে তেমন আর আলোচনা হয় না এমনকি বিশেষ বিশেষ মানুষ ছাড়া তা আর কেউ জানে না তখন যে ব্যক্তি ঈমান আনবে অথবা তাওবা করবে তা তাদের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে। (কুরতুবী ৭/১৪৬-১৪৭ তাযকিরাহ্ ৭০৬)
আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার পর মানুষ আরো এক শ' বিশ বছর বেঁচে থাকবে।
'ইমরান বিন্ 'হুস্বাইন থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার পর তাওবা কবুল করা হবে না যতক্ষণ না এক বিকট চিৎকার শুনা যায়। যখন এক বিকট চিৎকার শুনা যাবে তখন অনেক লোকই মারা যাবে। সুতরাং যারা ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে অথবা তাওবা করেছে অতঃপর চিৎকার ধ্বনিতে মারা গেছে তাদের তাওবা গ্রহণ করা হবে না। তবে যারা তারপর তাওবা করবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। (তাযকিরাহ্ ৭০৫-৭০৬)
সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার দীর্ঘ সময় পর তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার মতটি মূলতঃ সঠিক নয়। কারণ, এ সংক্রান্ত সকল কুর'আন ও হাদীস এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার পর নতুন করে আর কারোর কোন তাওবা বা ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে না। চাই সে উক্ত নিদর্শন দেখুক অথবা নাই দেখুক।
'আয়িশা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ যখন প্রথম নিদর্শন পরিলক্ষিত হবে তখন (আমলনামা লেখার) কলম রেখে দেয়া হবে এবং লেখক ফিরিস্তাদেরকে তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। তখন মানুষের শরীরই তার আমলের সাক্ষ্য দিবে। (ত্বাবারী ৮/১০৩ ফাত্হুল-বারী ১১/৩৫৫)
আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ তাওবার সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে যতক্ষণ না পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠে। (ত্বাবারী ৮/১০১)
আবূ মূসা আশ্'আরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوْبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا.
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা রাত্রি বেলায় নিজ হাত সম্প্রসারিত করেন যেন দিনের পাপীরা তাঁর কাছে তাওবা করতে পারে। তেমনিভাবে তিনি দিনের বেলায়ও নিজ হাত সম্প্রসারিত করেন যেন রাত্রের পাপীরা তাঁর কাছে তাওবা করতে পারে যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠে। (মুসলিম ২৭৫৯)
. উক্ত হাদীসে তাওবা কবুল করার শেষ সময় সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার সময়টিকেই ধরে নেয়া হয়েছে। সুতরাং এরপর আর তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ দিকে 'আল্লামাহ্ কুরতুবী কর্তৃক উপরোল্লিখিত আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আমরের হাদীসটি 'হাফিজ ইবনু 'হাজারের মতে রাসূল () থেকে প্রমাণিত নয়। অন্য দিকে 'ইমরান বিন্ 'হুস্বাইন এর হাদীসটিরও সঠিক কোন ভিত্তি নেই। (ফাত্হুল-বারী ১১/৩৫৫)