📄 ‘ঈসা (আঃ) যেভাবে অবতরণ করবেন
দাজ্জাল বের হয়ে যখন দুনিয়াতে ফিতনা-ফ্যাসাদ শুরু করবে তখনই আল্লাহ্ তা'আলা 'ঈসা (আঃ) কে দুনিয়াতে পাঠাবেন। তিনি সিরিয়ার পূর্ব দামেস্কের সাদা মিনারার নিকটেই অবতরণ করবেন। তাঁর গায়ে থাকবে লাল ও জাফরান বর্ণের দু'টি কাপড়। তখন তাঁর হাত দু'টো থাকবে দু' ফিরিস্তার ডানার উপর। তিনি মাথা নিচু করলে তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটা পড়বে। উঁচু করলে মুক্তা ঝরবে। কোন কাফিরই তাঁর শ্বাস- প্রশ্বাসের গন্ধ পেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। আর তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ ততটুকু যাবে যতটুকু যাবে তাঁর দৃষ্টি।
তিনি সে যুগের আল্লাহ্ প্রদত্ত সাহায্যপ্রাপ্ত দলের নিকটেই অবতরণ করবেন। যারা তখন সত্যকে আল্লাহ্'র জমিনে বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। তারা যখন দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সবাই একত্রিত হবে তখনই 'ঈসা (আঃ) তাদের উপর অবতীর্ণ হবেন। তখনকার সময়টি হবে নামাযের সময়। তখন তিনি উক্ত দলের ইমামের পেছনেই নামায আদায় করবেন।
'আল্লামাহ্ ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ৭৪১ হিজরী সনে মুসলমানরা উক্ত মিনারটি সাদা পাথর দিয়ে তৈরি করে। যা ছিলো খ্রিস্টানদের সম্পদেই তৈরি। কারণ, তারাই পূর্বের মিনারটিকে পুড়িয়ে দেয় এবং তারাই ইহার ক্ষতিপূরণ দেয়। যা সত্যিই নবুওয়াতের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত ব্যবস্থা এ কারণেই করেছেন যে, যেন তাদের নিজস্ব টাকায় বানানো মিনারটিতেই 'ঈসা (আঃ) অবতরণ করতে পারেন। শূকর হত্যা ও ক্রুশ চিহ্ন ভাঙ্গতে পারেন। তিনি তখন তাদের থেকে জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। ইসলাম অথবা হত্যা। সকল প্রকার কাফিরেরই তখন এমতাবস্থা হবে।
নাওয়াস্ বিন্ সাম্'আন থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) 'ঈসা (আঃ) এর অবতরণ এবং দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারটি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেনঃ
فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ bَعَثَ اللهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ، فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شَرْقِيَّ دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُوْدَتَيْنِ، وَاضِعًا كَفَّيْهِ عَلَى أَجْنِحَةِ مَلَكَيْنِ، إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ فَطَرَ، وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُؤِ، فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرٍ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ، وَنَفَسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ، فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُةٍ فَيَقْتُلُهُ، ثُمَّ يَأْتِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللَّهُ مِنْهُ، فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ، وَيُحَدِّثُهُمْ بِدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ.
অর্থাৎ দাজ্জাল যখন এমন প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে তখনই আল্লাহ্ তা'আলা 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) কে দুনিয়াতে পাঠাবেন। তিনি সিরিয়ার পূর্ব দামেস্কের সাদা মিনারার নিকটেই অবতরণ করবেন। তাঁর গায়ে থাকবে লাল ও জাফরান বর্ণের দু'টি কাপড়। তখন তাঁর হাত দু'টো থাকবে দু' ফিরিপ্তার ডানার উপর। তিনি মাথা নিচু করলে তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটা পড়বে। উঁচু করলে মুক্তার মতো পানি ঝরবে। কোন কাফিরই তাঁর ('ঈসা (আঃ) এর) শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ পেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। আর তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ ততটুকু যাবে যতটুকু যাবে তাঁর দৃষ্টি। তিনি দাজ্জালকে খুঁজে বেড়াবেন এবং লুদ্দ গেইটের নিকটে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করেছেন তারা সবাই 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) এর নিকট আসবেন। তখন তিনি তাদের চেহারার ধুলোবালি মুছে দিবেন এবং তাদেরকে তাদের জান্নাতের অবস্থানসমূহ জানিয়ে দিবেন। (মুসলিম ২৯৩৭)
📄 ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের প্রমাণসমূহ
'ঈসা (আঃ) এর অবতরণ কুর'আন ও বিশুদ্ধ মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা কিয়ামতের বড়ো আলামতগুলোর অন্যতম।
📄 ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের ব্যাপারে কুর’আনের প্রমাণ
১. আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
وَلَمَّا ضُرِبَ ابْنُ مَرْيَمَ مَثَلًا إِذَا قَوْمُكَ مِنْهُ يَصِدُّوْنَ... وَإِنَّهُ لَعِلْمُ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا.
অর্থাৎ যখন 'ঈসা বিন্ মাইয়ামের দৃষ্টান্ত উপস্থান করা হলো তখন তোমার বংশ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।... নিশ্চয়ই 'ঈসা'র (অবতরণ) কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করো না। (যুখরুফঃ ৫৭-৬১)
উক্ত আয়াতটির দ্বিতীয় কিরাত ব্যাপারটিকে আরো শক্তিশালী করে। যা নিম্নরূপঃ
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَإِنَّهُ لَعَلَمُ لِلسَّاعَةِ.
অর্থাৎ নিশ্চয়ই 'ঈসা'র (অবতরণ) কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন। (কুরতুবী ১৬/১০৫)
২. আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ... بَلْ رَّفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ، وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا، وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ، وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا.
অর্থাৎ উপরন্তু তাদের (ইহুদিদের) এ কথা 'বলার জন্য যে, আমরা আল্লাহ্'র রাসূল 'ঈসা বিন্ মাইয়ামকে হত্যা করেছি। মূলতঃ তারা ওকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি। বরং হত্যাকৃত ব্যক্তিটিকে 'ঈসার আকৃতি দিয়ে তাদেরকে সংশয়ে ফেলা হয়েছে।... বরং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী। আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই 'ঈসা'র মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনবে এবং কিয়ামতের দিন 'ঈসাই তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবে। (নিসা': ১৫৭-১৫৯)
'হাসান বস্ত্রী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আল্লাহ্'র কসম! 'ঈসা (আঃ) আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এখনো জীবিত। যখন তিনি আবারো দুনিয়াতে অবতরণ করবেন তখন তাঁর প্রতি সবাই ঈমান আনবে। (ত্বাবারী ১/১৮)
📄 ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের ব্যাপারে হাদীসের প্রমাণ
'ঈসা (আঃ) এর অবতরণের ব্যাপারে হাদীসের প্রমাণগুলো অনেক বেশি ও মুতাওয়াতির। নিম্নে কয়েকটি হাদীস উল্লিখিত হলো।
১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ! لَيُوْشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيْكُمْ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا، فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الْخِنْزِيرَ، وَيَضَعَ الجِزْيَةَ، وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لَا يَقْبَلَهُ أَحَدٌ، حَتَّى تَكُونَ السِّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا.
অর্থাৎ সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! অচিরেই তোমাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক রূপে 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ চিহ্ন ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর দুনিয়া থেকে একেবারেই উঠিয়ে দিবেন। মানুষের ধন-সম্পদ তখন এতো বেড়ে যাবে যে, তা গ্রহণ করার আর কেউ থাকবে না। তখন আল্লাহ্ তা'আলার জন্য একটি সিজদাহ্ দুনিয়া ও তার মধ্যকার সকল বস্তুর চাইতেও উত্তম বলে বিবেচিত হবে। (বুখারী ৩৪৪৮; মুসলিম ১৫৫)
২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ
كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ، وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ؟!
অর্থাৎ তোমাদের তখন কেমন লাগবে যখন 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন এবং তখন তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদের মধ্য থেকেই?! (বুখারী ৩৪৪৮; মুসলিম ১৫৫)
৩. জাবির থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ( ) ইরশাদ করেনঃ
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ، ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ () فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ: تَعَالَ صَلِّ لَنَا، فَيَقُولُ: لَا ، إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ، تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الْأُمَّةَ.
অর্থাৎ আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাবে। কিয়ামত পর্যন্ত তারা বিশ্বের বুকে নিজেদের মাথা উঁচু করে সম্মানের জীবন যাপন করবে। ইতিমধ্যে 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তখন তাদের আমীর 'ঈসা (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলবেনঃ আসুন, আমাদেরকে নামায পড়িয়ে দিন। তখন তিনি বলবেনঃ না, আমি নামায পড়াবো না। তোমরা একে অপরের আমীর। এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের জন্য এক বিশেষ সম্মান। (মুসলিম ১৫৬)
৪. আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ( ইরশাদ করেনঃ
الْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلَّاتٍ، أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى، وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ، وَإِنِّي أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ؛ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ، وَإِنَّهُ نَازِلُ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ.
অর্থাৎ নবীগণ যেন একে অপরের সৎ ভাই। তাদের মা ভিন্ন। ধর্ম এক। আর আমিই 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) এর সব চাইতে নিকটবর্তী ব্যক্তি। কারণ, আমি ও তাঁর মাঝে আর কোন নবী নেই। তিনি নিশ্চয়ই (কিয়ামতের পূর্বে) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে অতিসত্বর চিনে ফেলবে। (আহমাদ ২/৪০৬)