📄 ‘ঈসা (আঃ) এর কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য
তিনি ছিলেন একজন মাঝারি আকৃতির পুরুষ। বেশি লম্বাও নন এবং বেশি খাটোও নন। তিনি হলেন রক্ত বর্ণের, হৃষ্টপুষ্ট, প্রশস্ত বক্ষ ও কাঁধে ঝুলানো লম্বা চুল বিশিষ্ট। যেন তিনি এখনই বাথরুম থেকে বের হয়েছেন। সব সময় তিনি চুলগুলো আঁচড়ে রাখতেন। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু হাদীস উল্লিখিত হলোঃ
১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي لَقِيتُ عِيسَى (فَنَعَتَهُ فَقَالَ : رَبْعَةٌ أَحْمَرُ ، كَأَنَّمَا خَرَجَ مِنْ دِيمَاسٍ يَعْنِي الْحَمَّامَ.
অর্থাৎ যখন আমার ইসরা' (রাত্রিকালীন ভ্রমণ) হয়েছিলো তখন আমার সঙ্গে 'ঈসা (আঃ) এর সাক্ষাৎ হয়। তিনি রক্ত বর্ণের একজন মাঝারি আকৃতির মানুষ। যেন এখনই বাথরুম থেকে বের হয়েছেন। (বুখারী ৩৪৩৭)
২. 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
رَأَيْتُ عِيسَى وَمُوسَى وَإِبْرَاهِيمَ، فَأَمَّا عِيسَى فَأَحْمَرُ جَعْدٌ عَرِيضُ الصَّدْرِ.
অর্থাৎ আমি 'ঈসা, মূসা ও ইব্রাহীম (আলাইহিমুস-সালাম) কে দেখেছি। 'ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রক্ত বর্ণের, হৃষ্টপুষ্ট এবং প্রশস্ত বক্ষ বিশিষ্ট। (বুখারী ৩৪৩৮)
৩. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
لَقَدْ رَأَيْتُنِي فِي جَمَاعَةٍ مِّنَ الْأَنْبِيَاءِ ... وَإِذَا عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ (ع) قَائِمٌ يُصَلِّي، أَقْرَبُ النَّاسِ بِهِ شَبَهَا عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ الثَّقَفِي.
অর্থাৎ আমি একদা আমাকে নবীদের একটি দলের মাঝে দেখতে পেলাম।... হঠাৎ দেখলাম 'ঈসা বিন্ মারিয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন। তাঁর আকৃতির সাথে 'উরওয়াহ্ বিন্ মাস্উদ সাক্বাফীর খুব একটা মিল রয়েছে। (মুসলিম ১৭২)
৪. আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
أُرِيتُ اللَّيْلَةَ فِي الْمَنَامِ عِنْدَ الْكَعْبَةِ، فَإِذَا رَجُلٌ آدَمُ كَأَحْسَنِ مَا تَرَى مِنْ أُدْمِ الرِّجَالِ، تَضْرِبُ لِمَّتُهُ بَيْنَ مَنْكِبَيْهِ، رَجِلُ الشَّعْرِ، يَقْطُرُ رَأْسُهُ مَاءً، وَاضِعًا يَدَيْهِ عَلَى مَنْكِبَيْ رَجُلَيْنِ، وَهُوَ بَيْنَهُمَا يَطُوفُ بِالْبَيْتِ، فَقُلْتُ: مَنْ هَذَا؟ فَقَالُوا: الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ.
অর্থাৎ গত রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি কা'বা ঘরের পার্শ্বেই অবস্থিত। দেখতে পেলাম জনৈক সুদর্শন ব্যক্তিকে। যেমনটি সুদর্শন কোন পুরুষ হতে পারে। তিনি একেবারে সাদাও নন এবং কালোও নন। তাঁর লম্বা চুলগুলো নিজ কাঁধেই আছড়ে পড়ছে। তবে চুলগুলো আঁচড়ানো। তাঁর মাথা থেকে এখনো পানির ফোঁটা পড়ছে। তিনি দু' ব্যক্তির কাঁধে হাত দু'টো রেখেই কা'বা ঘর তাওয়াফ করছেন। আমি উপস্থিতদের জিজ্ঞাসা করলামঃ ইনি কে? তারা বললোঃ ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ্ বিন্ মারইয়াম। (বুখারী ৩৪৪০; মুসলিম ১৬৯)
📄 ‘ঈসা (আঃ) যেভাবে অবতরণ করবেন
দাজ্জাল বের হয়ে যখন দুনিয়াতে ফিতনা-ফ্যাসাদ শুরু করবে তখনই আল্লাহ্ তা'আলা 'ঈসা (আঃ) কে দুনিয়াতে পাঠাবেন। তিনি সিরিয়ার পূর্ব দামেস্কের সাদা মিনারার নিকটেই অবতরণ করবেন। তাঁর গায়ে থাকবে লাল ও জাফরান বর্ণের দু'টি কাপড়। তখন তাঁর হাত দু'টো থাকবে দু' ফিরিস্তার ডানার উপর। তিনি মাথা নিচু করলে তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটা পড়বে। উঁচু করলে মুক্তা ঝরবে। কোন কাফিরই তাঁর শ্বাস- প্রশ্বাসের গন্ধ পেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। আর তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ ততটুকু যাবে যতটুকু যাবে তাঁর দৃষ্টি।
তিনি সে যুগের আল্লাহ্ প্রদত্ত সাহায্যপ্রাপ্ত দলের নিকটেই অবতরণ করবেন। যারা তখন সত্যকে আল্লাহ্'র জমিনে বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। তারা যখন দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সবাই একত্রিত হবে তখনই 'ঈসা (আঃ) তাদের উপর অবতীর্ণ হবেন। তখনকার সময়টি হবে নামাযের সময়। তখন তিনি উক্ত দলের ইমামের পেছনেই নামায আদায় করবেন।
'আল্লামাহ্ ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ৭৪১ হিজরী সনে মুসলমানরা উক্ত মিনারটি সাদা পাথর দিয়ে তৈরি করে। যা ছিলো খ্রিস্টানদের সম্পদেই তৈরি। কারণ, তারাই পূর্বের মিনারটিকে পুড়িয়ে দেয় এবং তারাই ইহার ক্ষতিপূরণ দেয়। যা সত্যিই নবুওয়াতের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত ব্যবস্থা এ কারণেই করেছেন যে, যেন তাদের নিজস্ব টাকায় বানানো মিনারটিতেই 'ঈসা (আঃ) অবতরণ করতে পারেন। শূকর হত্যা ও ক্রুশ চিহ্ন ভাঙ্গতে পারেন। তিনি তখন তাদের থেকে জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। ইসলাম অথবা হত্যা। সকল প্রকার কাফিরেরই তখন এমতাবস্থা হবে।
নাওয়াস্ বিন্ সাম্'আন থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) 'ঈসা (আঃ) এর অবতরণ এবং দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারটি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেনঃ
فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ bَعَثَ اللهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ، فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شَرْقِيَّ دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُوْدَتَيْنِ، وَاضِعًا كَفَّيْهِ عَلَى أَجْنِحَةِ مَلَكَيْنِ، إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ فَطَرَ، وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُؤِ، فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرٍ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ، وَنَفَسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ، فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُةٍ فَيَقْتُلُهُ، ثُمَّ يَأْتِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللَّهُ مِنْهُ، فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ، وَيُحَدِّثُهُمْ بِدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ.
অর্থাৎ দাজ্জাল যখন এমন প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে তখনই আল্লাহ্ তা'আলা 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) কে দুনিয়াতে পাঠাবেন। তিনি সিরিয়ার পূর্ব দামেস্কের সাদা মিনারার নিকটেই অবতরণ করবেন। তাঁর গায়ে থাকবে লাল ও জাফরান বর্ণের দু'টি কাপড়। তখন তাঁর হাত দু'টো থাকবে দু' ফিরিপ্তার ডানার উপর। তিনি মাথা নিচু করলে তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটা পড়বে। উঁচু করলে মুক্তার মতো পানি ঝরবে। কোন কাফিরই তাঁর ('ঈসা (আঃ) এর) শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ পেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। আর তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ ততটুকু যাবে যতটুকু যাবে তাঁর দৃষ্টি। তিনি দাজ্জালকে খুঁজে বেড়াবেন এবং লুদ্দ গেইটের নিকটে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করেছেন তারা সবাই 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) এর নিকট আসবেন। তখন তিনি তাদের চেহারার ধুলোবালি মুছে দিবেন এবং তাদেরকে তাদের জান্নাতের অবস্থানসমূহ জানিয়ে দিবেন। (মুসলিম ২৯৩৭)
📄 ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের প্রমাণসমূহ
'ঈসা (আঃ) এর অবতরণ কুর'আন ও বিশুদ্ধ মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা কিয়ামতের বড়ো আলামতগুলোর অন্যতম।
📄 ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের ব্যাপারে কুর’আনের প্রমাণ
১. আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
وَلَمَّا ضُرِبَ ابْنُ مَرْيَمَ مَثَلًا إِذَا قَوْمُكَ مِنْهُ يَصِدُّوْنَ... وَإِنَّهُ لَعِلْمُ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا.
অর্থাৎ যখন 'ঈসা বিন্ মাইয়ামের দৃষ্টান্ত উপস্থান করা হলো তখন তোমার বংশ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।... নিশ্চয়ই 'ঈসা'র (অবতরণ) কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করো না। (যুখরুফঃ ৫৭-৬১)
উক্ত আয়াতটির দ্বিতীয় কিরাত ব্যাপারটিকে আরো শক্তিশালী করে। যা নিম্নরূপঃ
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَإِنَّهُ لَعَلَمُ لِلسَّاعَةِ.
অর্থাৎ নিশ্চয়ই 'ঈসা'র (অবতরণ) কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন। (কুরতুবী ১৬/১০৫)
২. আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ... بَلْ رَّفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ، وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا، وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ، وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا.
অর্থাৎ উপরন্তু তাদের (ইহুদিদের) এ কথা 'বলার জন্য যে, আমরা আল্লাহ্'র রাসূল 'ঈসা বিন্ মাইয়ামকে হত্যা করেছি। মূলতঃ তারা ওকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি। বরং হত্যাকৃত ব্যক্তিটিকে 'ঈসার আকৃতি দিয়ে তাদেরকে সংশয়ে ফেলা হয়েছে।... বরং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী। আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই 'ঈসা'র মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনবে এবং কিয়ামতের দিন 'ঈসাই তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবে। (নিসা': ১৫৭-১৫৯)
'হাসান বস্ত্রী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আল্লাহ্'র কসম! 'ঈসা (আঃ) আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এখনো জীবিত। যখন তিনি আবারো দুনিয়াতে অবতরণ করবেন তখন তাঁর প্রতি সবাই ঈমান আনবে। (ত্বাবারী ১/১৮)