📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 কুর’আনে দাজ্জালের উল্লেখ্য

📄 কুর’আনে দাজ্জালের উল্লেখ্য


আমাদের পবিত্র কুর'আন মাজীদে দাজ্জালের ব্যাপারটি কেন উল্লিখিত হয়নি এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আলিমগণ কয়েকটি মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন যা নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
১. নিম্নোক্ত আয়াতে দাজ্জালের ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও তা প্রকাশ্যভাবে নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيْمَانِهَا خَيْرٌ.
অর্থাৎ যে দিন তোমার প্রভুর কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হবে সে দিন আর এমন কোন লোকের ঈমান তার ফায়েদায় আসবে না যে ইতিপূর্বে ঈমান আনেনি অথবা ঈমান আনার পর কোন নেক আমল করেনি। (আন্‌'আম: ১৫৮)
রাসূল () উক্ত কয়েকটি নিদর্শনের বর্ণনায় তিনিটি বস্তু উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে দাজ্জাল হচ্ছে একটি।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
ثَلَاثُ إِذَا خَرَجْنَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيْمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيْمَانِهَا خَيْرًا : طُلُوعُ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا، وَالدَّجَّالُ، وَدَابَّةُ الْأَرْضِ.
অর্থাৎ দুনিয়াতে যখন তিনটি বস্তু প্রকাশ পাবে তখন আর এমন কোন লোকের ঈমান তার ফায়েদায় আসবে না যে ইতিপূর্বে ঈমান আনেনি অথবা ঈমান আনার পর কোন নেক আমল করেনি। উক্ত বস্তু তিনটি হচ্ছে, পশ্চিম তথা সূর্যাস্তের দিক থেকে সূর্য উঠা, দাজ্জাল ও জমিনের এক অলৌকিক প্রাণী। (মুসলিম ১৫৮)
২. কুর'আন মাজীদে 'ঈসা (আঃ) এর অবতরণের কথা উল্লিখিত হয়েছে। এ দিকে 'ঈসা (আঃ) ই তো দাজ্জالকে হত্যা করবেন। সুতরাং হিদায়েতের মাসীহ্ তথা 'ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারটি উল্লেখ করে ভ্রষ্টতার মাসীহ্ তথা দাজ্জালের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আরবী ভাষায় এমন প্রচলন রয়েছে যে, কোন বস্তুকে উল্লেখ করে তার বিপরীতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়।
৩. নিম্নোক্ত আয়াতেও দাজ্জালের ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও তা প্রকাশ্যভাবে নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
لخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ، وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.
অর্থাৎ মানব সৃষ্টি অপেক্ষা ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল সৃষ্টি অবশ্যই কঠিন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। (গাফির/মু'মিন: ৫৭)
উক্ত আয়াতে মানুষ সৃষ্টি বলতে দাজ্জাল সৃষ্টির কথা বুঝানো হয়েছে।
আবূ ল-'আলিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মানব সৃষ্টির মধ্যে দাজ্জালের চাইতেও আরো বড়ো সৃষ্টি আর কি হতে পারে? তাই তো একদা ইহুদিরা তাকে মহান ভেবে তার পিছু নিবে। (কুরতুবী ১৫/৩২৫)
'আল্লামাহ্ ইবনু 'হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যদি উক্ত কথা সঠিক হয়ে থাকে তা হলে তা হবে সত্যিই একটি সুন্দর উত্তর। যার বর্ণনার দায়িত্ব রাসূল () নিজেই গ্রহণ করেছেন। (ফাত্হুল-বারী ১৩/৯২)
৪. কুর'আন মাজীদে দাজ্জালের ব্যাপারটি এ জন্যই উল্লিখিত হয়নি কারণ সে তো আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এক লাঞ্ছিত ও অপদস্থ সৃষ্টি। সে প্রভুত্বের দাবি করবে; অথচ সে একজন মানুষ।
এ দিকে ফির'আউন প্রভুত্বের দাবিদার হলেও তার কথা কুর'আন মাজীদে এ জন্যই উল্লেখ করা হয়েছে কারণ সে তো গত হয়ে গিয়েছে এবং তার ব্যাপারটি মানুষের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। কিন্তু দাজ্জালের ব্যাপারটি তেমন নয়। কারণ, সে শেষ যুগে আসবে। সুতরাং তার ব্যাপারটি সবার জন্য পরীক্ষা সরূপ। উপরন্তু তার প্রভুত্বের দাবির ব্যাপারটিও বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, তার শরীরই হবে প্রকাশ্য ত্রুটিযুক্ত। যা তার প্রভুত্বের দাবির জন্য কোনভাবেই মানানসই নয়। আর এ কথা সবারই জানা যে, কখনো কোন বস্তুর উল্লেখ এ জন্যই করা হয় না কারণ তা সবার নিকট সুস্পষ্ট। যেমনিভাবে রাসূল () হযরত আবূ বকর এর খিলাফতের ব্যাপারটি নিজের জীবদ্দশায় লিখে যাননি। কারণ, তা সবার নিকটই সুস্পষ্ট। তাঁর সম্মান সবার মনে সুপ্রতিষ্ঠিত। এ জন্যই রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
يَأْبَى اللَّهُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلَّا أَبَا بَكْرٍ.
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা এবং ঈমানদাররা কখনো আবু বকর ছাড়া কাউকে (প্রথম খলীফা হিসেবে) মেনে নিবে না। (মুসলিম ২৩৮৭)
এগুলোর মধ্যে প্রথম উত্তরটিই অধিক গ্রহণযোগ্য।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 দাজ্জালের ধ্বংস

📄 দাজ্জালের ধ্বংস


অনেকগুলো বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, 'ঈসা (আঃ) ই একদা দাজ্জالকে হত্যা করবেন। আর তা এভাবে যে, দাজ্জال যখন মক্কা-মদীনা ছাড়া পুরো বিশ্ব চষে বেড়াবে, তার অনুসারীরাই সর্বাধিক হবে এবং তার ফিতনা ব্যাপক হবে, যা থেকে গুটি কয়েক ঈমানদার ছাড়া আর কেউই রক্ষা পাবে না তখনই 'ঈসা (আঃ) দামেস্কের পূর্ব মিনারায় অবতীর্ণ হবেন। তাঁকে তখন ঈমানদাররা চার দিক থেকে ঘিরে রাখবে। তখন তিনি তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে দাজ্জালকে খুঁজবেন। দাজ্জাল তখন বায়তুল মাকদিস অভিমুখে রওয়ানা করবে। আর তখনই তার সাথে 'ঈসা (আঃ) এর সাক্ষাৎ হবে লুদ্দ গেইটের নিকটে। দাজ্জال তাঁকে দেখেই গলে যাবে যেমনিভাবে গলে যায় লবণ। তখন 'ঈসা (আ.) বলবেনঃ তোমার জন্য রয়েছে আমার পক্ষ থেকে এক অব্যর্থ মার। অতঃপর 'ঈসা (আ.) তাকে নিজ বর্শা দিয়ে হত্যা করবেন এবং তার অনুসারীরা পরাজিত হবে। তখন মু'মিনরা তাদের পিছু নিবে এবং তাদেরকে হত্যা করবে। এমনকি যে কোন পাথর ও গাছপালা তখন মুসলমানদেরকে ডেকে বলবেঃ হে মুসলিম! হে আব্দুল্লাহ্! এই যে, জনৈক ইহুদি আমার পেছনে লুক্কায়িত। এসো, তাকে হত্যা করো। তবে "গারক্বাদ্" নামক গাছটি এমন কথা বলবে না। কারণ, সেটি ইহুদিদের গাছ। (আন-নিহায়াহ/আল-ফিতানু ওয়াল-মালা'হিম ১/১২৮-১২৯)
নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস উল্লিখিত হলোঃ
১. আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনঃ
يَخْرُجُ الدَّجَّالُ فِي أُمَّتِي فَيَمْكُثُ أَرْبَعِينَ، فَيَبْعَثُ اللَّهُ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ كَأَنَّهُ عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ، فَيَطْلُبُهُ فَيُهْلِكُهُ.
অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জাল বেরুবে। অতঃপর সে চল্লিশ (দিন, মাস অথবা বছর) অবস্থান করবে। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) কে পাঠাবেন। দেখতে যেন তিনি 'উরওয়াহ্ বিন্ মাস্'ঊদ্‌। তখন তিনি তাকে খুঁজে হত্যা করবে। (মুসলিম ২৯৪০)
২. মুজাম্মি' বিন্ জারিয়াহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনঃ
يَقْتُلُ ابْنُ مَرْيَمَ الدَّجَّالَ بِبَابِ لُةٍ.
অর্থাৎ 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) লুদ্দ গেইটের নিকটেই দাজ্জালকে হত্যা করবেন। (তিরমিযী, হাদীস ২২৪৪)
নাওয়াস্ বিন্ সাম্'আন থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সা.) 'ঈসা (আ.) এর অবতরণ এবং দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারটি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেনঃ
... فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرٍ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ، وَنَفَسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ، فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُةٍ فَيَقْتُلُهُ.
অর্থাৎ ('ঈসা (আ.) এর অবতরণের পর) কোন কাফিরই তাঁর ('ঈসা (আ.) এর) শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ পেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। আর তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ ততটুকু যাবে যতটুকু যাবে তাঁর দৃষ্টি। তিনি দাজ্জالকে খুঁজে বেড়াবেন এবং লুদ্দ গেইটের নিকটে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। (মুসলিম ২৯৩৭)
জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনঃ
يَخْرُجُ الدَّجَّالُ فِي خَفَقَةٍ مِنَ الدِّينِ، وَإِدْبَارٍ مِنَ الْعِلْمِ... ثُمَّ يَنْزِلُ عِيسَى بْنُ مَرْيَمَ، فَيُنَادِي مِنَ السَّحَرِ، فَيَقُولُ: أَيُّهَا النَّاسُ! مَا يَمْنَعُكُمْ أَنْ تَخْرُجُوا إِلَى الْكَذَّابِ الْخَبِيْثِ، فَيَقُولُونَ: هَذَا رَجُلٌ جِنِّيُّ، فَيَنْطَلِقُونَ، فَإِذَا هُمْ بِعِيسَى بْنُ مَرْيَمَ (আ.), فَتُقَامُ الصَّلَاةُ، فَيُقَالُ لَهُ : تَقَدَّمْ يَا رُوحَ اللَّهِ، فَيَقُولُ : لِيَتَقَدَّمُ إِمَامُكُمْ، فَلْيُصَلِّ بِكُمْ، فَإِذَا صَلَّى صَلَاةَ الصُّبْحِ خَرَجُوا إِلَيْهِ، فَحِيْنَ يَرَى الْكَذَّابُ يَنْمَاثُ كَمَا يَنْمَاتُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ، فَيَمْشِي إِلَيْهِ، فَيَقْتُلُهُ، حَتَّى إِنَّ الشَّجَرَ وَالْحَجَرَ يُنَادِي : يَا رُوحَ اللَّهِ هَذَا يَهُودِيُّ، فَلَا يَتْرُكْ مِمَّنْ كَانَ يَتَّبِعُهُ أَحَدًا إِلَّا قَتَلَهُ.
অর্থাৎ ধর্ম ও ধর্মীয় জ্ঞানের কঠিন দুর্যোগাবস্থায় 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তিনি সেহ্রীর সময় মানুষকে ডাক দিয়ে বলবেনঃ হে মানব সকল! তোমরা কেন এ খবীস মিথ্যাবাদীকে প্রতিহত করার জন্য বের হচ্ছো না? তখন সবাই বলবেঃ আরে এ তো একজন জিন পুরুষ। তখন মানুষ সে দিকে রওয়ানা করবে এবং তাকে দেখে বলবেঃ না, আরে ইনি তো 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আলাইহিমাস-সালাম)! ইতিমধ্যে ফজরের নামাযের ইক্বামত দেওয়া হবে। তাঁকে বলা হবেঃ আপনিই ইমামতি করুন হে আল্লাহ্ প্রেরিত বিশেষ রূহ্! তিনি বলবেনঃ তোমাদের ইমামই তোমাদের ইমামতি করুক। যখন তিনি ফজরের নামায শেষ করবেন তখন সবাই তাঁর নিকট জড়ো হবে। মিথ্যুক (দাজ্জال) যখন তাঁকে দেখবে তখন সে গলে যাবে যেমনিভাবে গলে যায় পানিতে লবণ। তখন তিনি তার দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে হত্যা করবেন। এমনকি যে কোন পাথর ও গাছপালা তখন তাঁকে ডেকে বলবেঃ হে আল্লাহ্ প্রেরিত বিশেষ রূহ্! এই যে, জনৈক ইহুদি আমার পেছনে লুক্কায়িত। তখন তিনি তাঁর কথিত অনুসারী বলে দাবিদার সবাইকে হত্যা করবেন। কাউকে ছাড়বেন না। (আহমাদ/আল-ফাত্হুর-রাব্বানী ২৪/৮৫-৮৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00