📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 দাজ্জালকে অস্বীকারকারীগণ

📄 দাজ্জালকে অস্বীকারকারীগণ


ইতপূর্বের হাদীসসমূহ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, দাজ্জال সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির। সে বাস্তব এক মানুষ। তাকে আল্লাহ্ তা'আলা অনেকগুলো অলৌকিক ক্ষমতা দিবেন। কিন্তু শায়েখ মুহাম্মাদ 'আব্দুহ্ তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জালের ব্যাপারটি একটি ডাহা মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী। শায়েখ আবূ 'উবায়্যাহ্ও উক্ত মত পোষণ করেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল একটি বাতিল শক্তির নাম। সে মানুষ নয়।
আমরা বলবোঃ হাদীসগুলো এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট যে, দাজ্জال একজন মানুষ এবং এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মাঝে বাস্তবে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এ ছাড়া শায়েখ আবূ 'উবায়্যাহ্ নিজেই ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এর "আল-ফিতানু ওয়াল-মালা'হিম" কিতাবে দাজ্জালের দু' চোখের মাঝখানে কাফির শব্দটি লেখা থাকা এবং কেউ যে মৃত্যুর পূর্বে তার প্রভুকে দেখবে না এ সংক্রান্ত হাদীসটির টীকায় তিনি বলেনঃ উক্ত হাদীসটি এ কথাই প্রমাণ করে যে, দাজ্জালের প্রভু দাবি করাটা নিতান্তই মিথ্যা। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে লাঞ্ছিত করুক এবং তার উপর তাঁর পূর্ণ অসন্তুষ্টি ও অভিশাপ নাযিল হোক!
উক্ত টীকায় তিনি দাজ্জال মানুষ হওয়ার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করলেন। আশা করি নিম্নোক্ত হাদীসটি তাঁদের উপর বর্তাবে না। কারণ, তাঁরা গবেষণাগত ভুল করেছেন। ইচ্ছাকৃত নয়।
রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
তোমাদের ইন্তিকালের পর অচিরেই এমন এক সম্প্রদায় জন্ম গ্রহণ করবে। যারা রজম তথা বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা, দাজ্জাল, পরকালের সুপারিশ, কবরের শাস্তি এবং পুড়ে যাওয়ার পর জাহান্নাম থেকে কিছু লোকের বের হওয়ার ব্যাপারটিকে অস্বীকার করবে। (আহমাদ, হাদীস ১৫৭)
কারো কারোর নিকট উপরোক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লামাহ্ আহমাদ শাকির হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 দাজ্জালের অলৌকিক ব্যাপারগুলো সত্যিই বাস্তব

📄 দাজ্জালের অলৌকিক ব্যাপারগুলো সত্যিই বাস্তব


ইতিপূর্বে দাজ্জালের যে অলৌকিক ক্ষমতাগুলো উল্লিখিত হয়েছে তা সত্যিই বাস্তব। তা কোন কাল্পনিক কথা নয়।
তবে 'আল্লামাহ্ ইব্‌দু 'হায্য এবং ইমাম ত্বা'হাভী (রাহিমাহুমাল্লাহ) তা অস্বীকার করেন। আবূ 'আলী আল-জুব্বায়ী আল-মু'তাযিলীও বলেনঃ এগুলো বাস্তব নয়। নতুবা রাসূলের মু'জিযাহ্ এবং যাদুকরের অলৌকিক ক্ষমতার মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না। এরপর 'আল্লামাহ্ শায়েখ রশিদ রেযাও দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করেন। তিনি বলেনঃ এটি আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত নিয়ম বহির্ভূত। কারণ, তা নবীদের মু'জিযাহ্ সমতুল্য অথবা তারও ঊর্ধ্বে; অথচ আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের উপর অত্যন্ত দয়া করে তাদেরই হিদায়াতের জন্য নবীদেরকে মু'জিযাহ্ দিয়ে পাঠিয়েছেন। কুর'আনের ভাষায় যে নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হবে না। সুতরাং তিনি তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য আরো বড়ো অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে দাজ্জালকে পাঠাবেন তা কখনো হতে পারে না। কারণ, কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, সে চল্লিশ দিনের মধ্যে মক্কা-মদীনা ছাড়া পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করবে। অন্য দিকে দাজ্জال সংক্রান্ত বিপরীতমুখী হাদীসগুলো কুর'আনকে বিশেষিত বা রহিত করতে পারে না। তিনি বিপরীতমুখী হাদীসগুলোর দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেনঃ কোন কোন হাদীসে রয়েছে তার সাথে থাকবে রুটির পাহাড় এবং মধু ও পানির নদী। জান্নাত ও জাহান্নام। আবার অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল (ﷺ) একদা হযরত মুগীরাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ দাজ্জال তোমার কি ক্ষতিটুকুই না করবে বলো তো? কারণ, তিনি রাসূল (ﷺ) কে দাজ্জال সম্পর্কে সব চাইতে বেশি জিজ্ঞাসা করতেন। তখন তিনি বললেনঃ আমি লোকমুখে শুনতে পেলাম যে, তার সাথে থাকবে রুটির পাহাড় ও পানির নদী। রাসূল (ﷺ) বললেনঃ বরং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তার অবস্থান এতো নিম্নে যে, তিনি তাকে এ সকল ক্ষমতা দিয়ে আবার তার সত্যতাও প্রমাণ করবেন এমন কোন প্রশ্নই আসে না। বরং তার সাথে থাকবে মিথ্যা ও কুফরির সুস্পষ্ট প্রমাণ। (বুখারী ৭১২২; মুসলিম ২১৫২)
শায়েখ আবূ 'উবায়দাহ্ও দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাগুলো অস্বীকার করেন। তিনি এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোর টিকায় বলেনঃ এ রকম মারাত্মক ফিতনার সম্মুখে বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই কোন ভাবে টিকে থাকা সম্ভবপর নয়। দাজ্জال আবার মানব জন সম্মুখে কাউকে জীবন দিবে আবার কাউকে মৃত্যু দিবে; অথচ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে এ জন্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন যে, তারা উক্ত ফিতনার সম্মুখে এতটুকুও টিকে থাকতে পারেনি তা কিভাবে সম্ভব? কারণ, এ কথা তো সবারই জানা যে, আল্লাহ্ তা'আলা নিজ বান্দাহ্'র উপর অত্যন্ত দয়ালু এবং পরম করুণাময়। সুতরাং তিনি নিজ বান্দাহ্'র সাথে এমন নির্মম কাণ্ডই বা করতে যাবেন কেন? অন্য দিকে দাজ্জাল তো আবার আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এতো সম্মানীও নয় যে, তিনি তাকে এতো অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে বেশির ভাগ মানুষের ঈমান-আক্বীদায় মারাত্মক কম্পন সৃষ্টি করবেন এবং তাদেরকে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করবেন।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 দাজ্জাল অস্বীকারকারীদের উত্তর

📄 দাজ্জাল অস্বীকারকারীদের উত্তর


১. দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতা সংক্রান্ত হাদীসগুলো সঠিক ও বিশুদ্ধ। সুতরাং কিছু ছুতা-নাতা দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং এর অপব্যাখ্যা দেয়া কোনভাবেই ঠিক হবে না। মূলতঃ দাজ্জال সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মাঝে এমন কোন বৈপরীত্য নেই যে, যার কোন সহজ সমাধান বের করা সম্ভবপর নয়।
এ দিকে মুগীরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির শেষাংশের অর্থ এই যে, বরং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তার অবস্থান এতো নিম্নে যে, তিনি তাকে এ সকল ক্ষমতা দিয়ে কোন ঈমানদারকে পথভ্রষ্ট করবেন এমন কোন প্রশ্নই আসে না। বরং এতে করে মু'মিনদের ঈমান আরো বেড়ে যাবে। সন্দেহে পড়বে শুধু ওরাই যাদের ঈমান ঠিক নেই। এ কারণেই তো দাজ্জাল যাকে হত্যা করবে সে জীবিত হয়ে বলবেঃ ইতিপূর্বে তোমার সম্পর্কে আমার এতো অভিজ্ঞতা ছিলো যা এখন অর্জিত হয়েছে।
২. উক্ত হাদীসটিকে যদি তার প্রকাশ্য অর্থে ধরা যায় তা হলে এমনো তো হতে পারে যে, রাসূল () ওহীর মাধ্যমে দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাগুলো জানার পূর্বেই এমন কথা বলেছেন। কারণ, হযরত মুগীরা নিজেই বলেছেনঃ আমি লোকমুখে শুনতে পেয়েছি যে, তার সাথে থাকবে রুটির পাহাড় ও পানির নদী।
৩. দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাগুলো সত্যিই বাস্তব। তবে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে এ সকল ক্ষমতা দিবেন মানুষের পরীক্ষার জন্য। নবীদের মু'জিযাহ্'র সাথে তা কখনো মিশে যাবে না। কারণ, এমন কোন বর্ণনা নেই যে, দাজ্জাল তখন নবুওয়াতের দাবি করবে। বরং সে তখন প্রভু বলে দাবি করবে।
৪. 'আল্লামাহ্ রশিদ রেযা যে, শুধু চল্লিশ দিনের মধ্যে দাজ্জালের মক্কা-মদীনা ছাড়া পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করা অসম্ভব মনে করলেন তা ঠিক নয়। কারণ, তা শুধুমাত্র চল্লিশ দিন নয়। বরং এর কোন কোন দিন এক বছরের সমতুল্য। আবার কোন কোন দিন এক মাসের এবং কোন কোন দিন এক সপ্তাহের সমতুল্য হবে।
৫. দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতা আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত নিয়ম বহির্ভূত নয়। কারণ, তা হলে আপাত দৃষ্টিতে নবীদের মু'জিযাহগুলোও আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত নিয়ম বহির্ভূত বলে মনে হবে। মূলতঃ যখন তা নিয়ম বহির্ভূত নয় তখন দাজ্জালের ব্যাপারটিও নিয়ম বহির্ভূত হবে কেন?
৬. দাজ্জালের ব্যাপারটিকে যদি নিয়ম বহির্ভূতই মনে করা হয় তা হলে বলতে হবে, তখনকার সময়টিতে তো এ ছাড়া আরো অনেকগুলো নিয়ম বহির্ভূত কাজও সংঘটিত হবে। যা ইতিপূর্বে কখনো সংঘটিত হয়নি। তখনকার সময়টিই তো হবে ফিতনার সময়। তখন আল্লাহ্ তা'আলা যে, দাজ্জালকে অনেকগুলো অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষদেরকে পরীক্ষা করবেন তা কখনো তাঁর দয়া বিরোধী নয়। কারণ, তিনি ইতিপূর্বে তাঁর নবীর মাধ্যমে সতর্ক করেছেন। তার ফিতনা থেকে বাঁচার পথ শিখিয়েছেন।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাগুলো যে সত্য এবং বাস্তব এ সংক্রান্ত আলেমদের কিছু কথা

📄 দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতাগুলো যে সত্য এবং বাস্তব এ সংক্রান্ত আলেমদের কিছু কথা


কাযী 'ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দাজ্জাল সংক্রান্ত হাদীসগুলো যা ইমাম মুসলিম ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন তা সত্যপন্থীদের জন্য এ ব্যাপারে এক বিরাট প্রমাণ যে, দাজ্জাল একদা অবশ্যই দুনিয়াতে পদার্পণ করবে। সে এক বাস্তব মানুষ। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে পাঠিয়ে তাঁর বান্দাহদেরকে পরীক্ষা করবেন এবং তিনি নিজেই তাকে এমন কিছু ক্ষমতা দিবেন যা উক্ত পরীক্ষার জন্য একান্ত সহায়ক। সে মানুষ মেরে তাকে আবারো জীবিত করবে। পুরো দুনিয়া তখন হবে সুজলা সুফলা। তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নام। আরো থাকবে দু'টি নদী। দুনিয়ার সকল ধন-ভাণ্ডার তার পিছু নিবে। তার আদেশেই আকাশ বৃষ্টি ও জমিন ফসল দিবে। এ সব কিছু আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত ক্ষমতা ও তাঁর ইচ্ছাধীন। তাই তো তিনি পরিশেষে তাকে অক্ষম বানিয়ে দিবেন। তখন সে আর কাউকে হত্যা করতে পারবে না। বরং তাকেই তখন হত্যা করবেন 'ঈসা (আঃ)।
এটিই হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা'আত এবং সকল মুহাদ্দিস ও মুফতিদের একান্ত মতাদর্শ। তবে খারিজী, জাহ্মী এবং কিছু মু'তাযিলাহ্ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে। তাদের ধারণা, সে যদি সত্যই হতো তা হলে তাকে নবীদের মতো মু'জিযাহ্ দিয়ে এতো শক্তিশালী করা হতো না। তবে তাদের উক্ত মতামতের সত্য কোন ভিত্তি নেই। কারণ, সে তো আর নিজকে তখন নবী বলে দাবি করছে না। বরং সে তো তখন নিজকে ইলাহ্ বলেই দাবি করবে এবং তার এ দাবি যে অসত্য তা তার শরীরই প্রমাণ করবে। কারণ, সে কানা হবে এবং তার কপালেই লেখা থাকবে সে কাফির।
এরপরও যে তাকে দিয়ে ধোঁকা খাবে সে অবশ্যই অত্যন্ত ভীতু, দুনিয়ালোভী এবং ঈমানশূন্য। সত্যিকার মু'মিন ব্যক্তি তাকে দিয়ে কখনো ধোঁকা খাবে না। (শর'হন-নাওয়াওয়ী ১৮/৫৮-৫৯ ফাত'হুল-বারী ১৩/১০৫)
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা দাজ্জালকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে তাঁর বান্দাহদেরকে পরীক্ষা করবেন। যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কেউ তার কথা শুনলে সে আকাশকে আদেশ করা মাত্রই আকাশ বৃষ্টি দিবে। জমিনকে আদেশ করা মাত্রই জমিন এতো বেশি ফলন দিবে যে, যা তাদের এবং তাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জন্য একেবারেই যথেষ্ট। যা খেয়ে তাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলো দুধেল ও মোটা-তাজা হয়ে যাবে। যে তার কথা শুনবে না সে তো অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ, চতুষ্পদ জন্তুর মৃত্যু, জান-মালের ঘাটতি ইত্যাদিতে ভুগবে। মৌমাছির দলের ন্যায় দুনিয়ার সকল ধন-ভাণ্ডার তার পিছু নিবে। জনৈক যুবককে হত্যা করে তাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করবে। এ সব কিন্তু কোন কল্পকাহিনী নয়। বরং তা নিতান্ত সত্য। যা কর্তৃক আল্লাহ্ তা'আলা নিজ বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন। তাতে সন্দেহকারীরা পথভ্রষ্ট হবে। ঈমানদারদের ঈমান আরো বেড়ে যাবে। (নিহাইয়াহ/আল-ফিতানু ওয়াল-মালা'হিম ১/১২১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00