📄 দাজ্জাল মক্কা ও মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না
ফাতিমা বিন্তে ক্বাইস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
দাজ্জال বললোঃ আমি হলাম মাসী'হুদ-দাজ্জাল। আমাকে অচিরেই বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। তখন আমি বের হবো এবং বিশ্বের সর্ব জায়গায় ঘুরে বেড়াবো। এমন কোন এলাকা বাকি থাকবে না যেখানে আমি চল্লিশ দিনের মধ্যেই অবতরণ করবো না। তবে মক্কা- মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য হারাম। যখনই আমি এর কোনটিতে ঢুকতে যাবো তখনই জনৈক ফিরিস্তা খোলা তলোয়ার নিয়ে আমাকে প্রতিরোধ করবে। সেখানকার প্রত্যেক গিরি পথে থাকবে অনেকগুলো ফিরিস্তা যারা আমার প্রবেশ থেকে শহরটিকে রক্ষা করবে।
মূলতঃ দাজ্জাল চারটি মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে না। সেগুলো হচ্ছে, মক্কা মসজিদ, মদীনা মসজিদ, তুর মসজিদ ও আক্বস্বা মসজিদ।
জুনাদাহ্ বিন্ আবূ উমাইয়াহ্ আব্দী (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি ও জনৈক আন্সারী সাহাবী জনৈক সাহাবীর নিকট গিয়ে বললামঃ আপনি দাজ্জال সম্পর্কে রাসূল () থেকে যা শুনেছেন আমাদেরকে বলুন। তখন তিনি বললেনঃ... দাজ্জাল চল্লিশ দিন দুনিয়াতে অবস্থান করবে। সে এরই মধ্যে সকল জায়গায় পৌঁছবে। তবে সে চারটি মসজিদের নিকটবর্তী হতে পারবে নাঃ মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী, তুর মসজিদ ও আকুস্বা মসজিদ। (আল-ফাত্হর-রাব্বানি ২৪/৭৬ ফাত্হুল-বারী ১৩/১০৫)
📄 দাজ্জালের অনুসারী
দাজ্জালের অনুসারী হবে ইহুদি, অনারব ও তুর্কিরা। তাতে সব শ্রেণীর লোকই থাকবে। বিশেষ করে মহিলা ও গ্রাম্য লোক।
আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
يَتْبَعُ الدَّجَّالَ مِنْ يَهُودِ أَصْبَهَانَ سَبْعُونَ أَلْفًا، عَلَيْهِمُ الطَّيَالِسَةُ.
অর্থাৎ ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদি দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের গায়ে থাকবে চাদর। (মুসলিম ২৯৪৪)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তাদের মাথায় থাকবে তাজ। (আল-ফাত্হুর-রাব্বানি ২৪/৭৩ ফাত্হুল-বারী ১৩/২৩৮)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তার (দাজ্জال) অনুসারী হবে এমন লোক যাদের চেহারা চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায় তথা চওড়া ও ঝুলে পড়া গণ্ডদেশ বিশিষ্ট।
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মনে হয় এরা তুর্কি। (আন-নিহায়াহ/আল-ফিতানু ওয়াল-মালাহিম ১/১১৭)
কিছু কিছু অনারবও উক্ত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
দাজ্জালের অনুসারী অধিকাংশ গ্রাম্য লোক এ জন্যই হবে যে, কারণ মূর্খতা তাদের মধ্যেই অনেক বেশি।
আবূ উমামাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
দাজ্জালের ফিতনা এটাও যে, সে জনৈক গ্রাম্য লোককে বলবেঃ আমি যদি তোমার মাতা-পিতাকে জীবিত করে দেখাতে পারি তা হলে কি তুমি এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে, আমি তোমার প্রভু। সে বলবেঃ হ্যাঁ। তখন দু'টি শয়তান তার মাতা-পিতার ছবি ধারণ করে বলবেঃ হে আমার ছেলে! এর অনুসরণ করো। এ হচ্ছে তোমার প্রভু। (ইবনু মাজাহ্ ২/১৩৫ ৯-১৩৬৩ স'হীহুল-জামি', হাদীস ৭৭৫২)
আর মেয়েলোকের ব্যাপারটি তো আরো করুণ। কারণ, তারা সহজেই অভিভূত হয় এবং তাদের মধ্যে মূর্খতাও অনেক বেশি।
আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
একদা দাজ্জال মদীনার "মারক্বানাহ্” নামক ঢালু উপত্যকায় অবতরণ করবে। তখন মদীনার অধিকাংশ মহিলাই তার নিকট পাড়ি জমাবে। তখন পুরুষরা দাজ্জালের নিকট যাওয়ার ভয়ে তাদের স্ত্রী, মাতা, কন্যা, বোন ও ফুফুকে রশি দিয়ে ভালো করে বেঁধে রাখবে। (আহমাদ, হাদীস ৫৩৫৩)
📄 দাজ্জালের ফিতনা
দাজ্জালের ফিতনা হলো আদম সৃষ্টির পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল ফিতনার বড়ো ফিতনা। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে এমন এক বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা দিবেন যা একজন বুদ্ধিমান মানুষকেও বোকা বানিয়ে ছাড়বে।
তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম। তার জান্নাত হবে বাস্তবে জাহান্নাম এবং তার জাহান্নام হবে বাস্তবে জান্নাত। তার সাথে থাকবে অনেকগুলো নদ-নদী এবং রুটির পাহাড়। সে আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণ করতে বললে আকাশ তখন বৃষ্টি বর্ষণ করবে। সে জমিনকে ফসল ফলাতে বললে জমিন তখন ফসল ফলাবে। জমিনের সকল ধন-ভাণ্ডার তার পিছে পিছে চলবে। পুরো বিশ্ব সে অতি অল্প সময়ে বিচরণ করবে। যেমন বাতাস তাড়িত বৃষ্টি অতি দ্রুত বয়ে যায়।
'হুযাইফাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
দাজ্জালের বাম চোখ হবে কানা। চুল হবে এলোমেলো। তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নام। তার জাহান্নام হবে বাস্তবে জান্নাত এবং তার জান্নাত হবে বাস্তবে জাহান্নাম। (মুসলিম ২৯৩৪)
'হুযাইফাহ্ (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
আমি নিশ্চয়ই জানি দাজ্জালের সাথে কি থাকবে। তার সাথে থাকবে দু'টি প্রবহমান নদী। একটির দিকে তাকালে মনে হবে তাতে রয়েছে স্বচ্ছ সাদা পানি। অন্যটির দিকে তাকালে মনে হবে তাতে রয়েছে জ্বলন্ত আগুন। তোমাদের কেউ তার সাক্ষাৎ পেলে সে যেন চোখ বন্ধ করে উক্ত নদীতে নেমে পড়ে যাতে জ্বলন্ত আগুন রয়েছে বলে মনে হয়। মাথা নিচু করে সে যেন তা থেকে পানি পান করে। কারণ, সেটিই হবে তখনকার ঠাণ্ডা পানি। (মুসলিম ২৯৩৪)
নাওয়াস্ বিন্ সাম্'আন (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ সাহাবাগণ রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞাসা করলেনঃ হে আল্লাহ্'র রাসূল! দাজ্জাল দুনিয়াতে কতো দিন অবস্থান করবে? রাসূল (ﷺ) বললেনঃ চল্লিশ দিন। তার মধ্যে এক দিন হবে এক বছরের ন্যায়। আরেক দিন হবে এক মাসের ন্যায়। আরেক দিন হবে এক সপ্তাহের ন্যায়। আর বাকী দিনগুলো হবে এখনকার দিনের ন্যায়। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেনঃ হে আল্লাহ্'র রাসূল! সে কতো দ্রুত জমিনে বিচরণ করবে? রাসূল (ﷺ) বললেনঃ হাওয়া তাড়িত বৃষ্টি তথা তুফানের ন্যায়। সে কিছু লোকের কাছে গিয়ে তাদেরকে তার উপর ঈমান আনার আহ্বান করলে তারা তার উপর ঈমান আনবে। তখন সে আকাশকে আদেশ করলে আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। জমিনকে আদেশ করলে জমিন প্রচুর ফসল ফলাবে। তাদের গৃহ পালিত পশুগুলোর স্তনসমূহ দুধে ভরে যাবে। মোটা-তাজা ও হৃষ্ট-পুষ্ট হবে। আরো কিছু লোকের কাছে গিয়ে তাদেরকে তার উপর ঈমান আনার আহ্বান করলে তারা তার উপর ঈমান আনবে না। যখন সে উক্ত এলাকা ছেড়ে যাবে তখন সে এলাকায় আর বৃষ্টি হবে না। মানুষের হাতে কোন সম্পদ থাকবে না। সে কোন মরুভূমি অতিক্রম করার সময় মরুভূমিকে আদেশ করবে তার সকল ধন-ভাণ্ডার বের করে দিতে। তখন মরুভূমির সকল গুপ্ত ধন-ভাণ্ডার মৌমাছির ন্যায় তার পিছু নিবে। অতঃপর সে জনৈক সুঠাম দেহের যুবককে ডেকে কাছে আনবে এবং তাকে তলোয়ার মেরে দু' টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর তাকে আবারো ডাকলে সে হাঁসতে হাঁসতে তার দিকে আসবে। (মুসলিম ২৯৩৭)
আবূ সা'ঈদ খুদ্রী এর বর্ণনায় রয়েছে, দাজ্জাল যাঁকে হত্যা করবে তিনি হবেন সে যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি অথবা সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম। তিনি মদীনা থেকে বের হয়ে দাজ্জালকে বলবেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে রাসূল () আমাদেরকে ইতিপূর্বে সংবাদ দিয়েছেন। তখন দাজ্জাল উপস্থিত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবেঃ আমি যদি একে হত্যা করে আবারো জীবিত করতে পারি তবুও কি তোমরা আমার প্রভু হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে? সবাই বলবেঃ না, তখন সে লোকটিকে হত্যা করে আবারো জীবিত করবে। তখন লোকটি বলবেনঃ আল্লাহ্'র কসম! আজ আমি তোমার ব্যাপারে পূর্বের চাইতে আরো বেশি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। তখন দাজ্জাল তাঁকে আবারো হত্যা করতে চাইবে। কিন্তু সে আর তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। (বুখারী ৭১৩২; মুসলিম ২৯৩৮)
📄 দাজ্জালকে অস্বীকারকারীগণ
ইতপূর্বের হাদীসসমূহ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, দাজ্জال সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির। সে বাস্তব এক মানুষ। তাকে আল্লাহ্ তা'আলা অনেকগুলো অলৌকিক ক্ষমতা দিবেন। কিন্তু শায়েখ মুহাম্মাদ 'আব্দুহ্ তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জালের ব্যাপারটি একটি ডাহা মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী। শায়েখ আবূ 'উবায়্যাহ্ও উক্ত মত পোষণ করেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল একটি বাতিল শক্তির নাম। সে মানুষ নয়।
আমরা বলবোঃ হাদীসগুলো এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট যে, দাজ্জال একজন মানুষ এবং এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মাঝে বাস্তবে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এ ছাড়া শায়েখ আবূ 'উবায়্যাহ্ নিজেই ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এর "আল-ফিতানু ওয়াল-মালা'হিম" কিতাবে দাজ্জালের দু' চোখের মাঝখানে কাফির শব্দটি লেখা থাকা এবং কেউ যে মৃত্যুর পূর্বে তার প্রভুকে দেখবে না এ সংক্রান্ত হাদীসটির টীকায় তিনি বলেনঃ উক্ত হাদীসটি এ কথাই প্রমাণ করে যে, দাজ্জালের প্রভু দাবি করাটা নিতান্তই মিথ্যা। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে লাঞ্ছিত করুক এবং তার উপর তাঁর পূর্ণ অসন্তুষ্টি ও অভিশাপ নাযিল হোক!
উক্ত টীকায় তিনি দাজ্জال মানুষ হওয়ার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করলেন। আশা করি নিম্নোক্ত হাদীসটি তাঁদের উপর বর্তাবে না। কারণ, তাঁরা গবেষণাগত ভুল করেছেন। ইচ্ছাকৃত নয়।
রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
তোমাদের ইন্তিকালের পর অচিরেই এমন এক সম্প্রদায় জন্ম গ্রহণ করবে। যারা রজম তথা বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা, দাজ্জাল, পরকালের সুপারিশ, কবরের শাস্তি এবং পুড়ে যাওয়ার পর জাহান্নাম থেকে কিছু লোকের বের হওয়ার ব্যাপারটিকে অস্বীকার করবে। (আহমাদ, হাদীস ১৫৭)
কারো কারোর নিকট উপরোক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লামাহ্ আহমাদ শাকির হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।