📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 বিরুদ্ধ হাদীস থেকে ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের প্রমাণ

📄 বিরুদ্ধ হাদীস থেকে ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের প্রমাণ


নিম্নে এমন কিছু বিশুদ্ধ হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে যার কোনটিতে ইমাম মাহদীর সরাসরি উল্লেখ আর কিছুতে তাঁর গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে।
১. আবূ সা'ঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
يَخْرُجُ فِي آخِرِ أُمَّتِي الْمَهْدِيُّ، يَسْقِيهِ اللَّهُ الْغَيْثَ، وَتُخْرِجُ الْأَرْضُ نَبَاتَهَا، وَيُعْطَى الْمَالُ صِحَاحًا، وَتَكْثُرُ الْمَاشِيَةُ، وَتَعْظُمُ الْأُمَّةُ، يَعِيشُ سَبْعًا أَوْ ثَمَانِيَا يَعْنِي حِجَجًا.
অর্থাৎ আমার উম্মতের শেষাংশে মাহ্দী বেরুবে। আল্লাহ্ তা'আলা সে যুগে বেশি বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। জমিন প্রচুর ফসল দিবে। সম্পদের সুষম বন্টন হবে। ছাগল-উট বেড়ে যাবে। উম্মতে মুস্লিমাহ্ তখন শক্তিশালী হবে। সে তখন সাত বা আট বছর বেঁচে থাকবে। ('হাকিম ৪/৫৫৭-৫৫৮)
২. আবূ সা'ঈদ খুদরী থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
أُبَشِّرُكُمْ بِالْمَهْدِي، يُبْعَثُ عَلَى اخْتِلَافٍ مِنَ النَّاسِ وَزَلَازِلَ، فَيَمْلَأُ الْأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلًا كَمَا مُلِئَتْ جُورًا وَظُلْمًا، يَرْضَى عَنْهُ سَاكِنُ السَّمَاءِ وَسَاكِنُ الْأَرْضِ، يُقَسَّمُ الْمَالُ صِحَاحًا، قَالَ لَهُ رَجُلٌ : مَا صِحَاحًا؟ قَالَ: بِالسَّوِيَّةِ بَيْنَ النَّاسِ، قَالَ: وَيَمْلَأُ اللَّهُ قُلُوبَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ আল্লাহ, وَيَسَعُهُمْ عَدْلُهُ، حَتَّى يَأْمُرَ مُنَادِيًا، فَيُنَادِي، فَيَقُولُ: مَنْ لَهُ فِي مَالٍ حَاجَةً؟ فَمَا يَقُوْمُ مِنَ النَّاسِ إِلَّا رَجُلٌ، فَيَقُولُ: ايْتِ السَّدَّانَ يَعْنِي الْخَازِنَ، فَقُلْ لَهُ: إِنَّ الْمَهْدِيَّ يَأْمُرُكَ أَنْ تُعْطِينِي مَالًا، فَيَقُولُ لَهُ: احْتُ، حَتَّى إِذَا حَجَرَهُ وَأَبْرَزَهُ نَدِمَ، فَيَقُولُ: كُنْتُ أَجْشَعَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ نَفْسًا، أَوْ عَجَزَ عَنِّي مَا وَسِعَهُمْ؟!، قَالَ: فَيَرُدُّهُ، فَلَا يُقْبَلُ مِنْهُ، فَيُقَالُ لَهُ: إِنَّا لَا تَأْخُذُ شَيْئًا أَعْطَيْنَاهُ، فَيَكُونُ كَذَلِكَ سَبْعَ سِنِينَ، أَوْ ثَمَانَ سِنِينَ، أَوْ تِسْعَ سِنِينَ، ثُمَّ لَا خَيْرَ لِلْعَيْشِ بَعْدَهُ، أَوْ ثُمَّ لَا خَيْرَ فِي الْحَيَاةِ بَعْدَهُ.
অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দিচ্ছি। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব ও ভূমি কম্প যখন বেড়ে যাবে তখনই সে প্রেরিত হবে। তখন সে পুরো বিশ্ব ন্যায় ও ইন্সাফে ভরে দিবে যেমনিভাবে তা ভরে দেয়া হয়েছিলো অন্যায় ও অত্যাচারে। তার উপর ফেরেস্তারা যেমন সন্তুষ্ট থাকবেন। তেমন মানুষও। তখন সম্পদের সুসম বন্টন হবে। আল্লাহ্ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তরসমূহ অমুখাপেক্ষিতায় ভরে দিবেন। মাহ্দীর ইন্সাফই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। একদা সে জনৈক ব্যক্তিকে পাঠাবে মানুষকে এ কথা ডেকে বলে দিতে যে, কার সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে?
তখন একটি মাত্র লোক দাঁড়িয়ে বলবেঃ আমার সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। তখন সে বলবেঃ সম্পদের প্রয়োজন থাকলে আমার কোষাধ্যক্ষকে গিয়ে বলবেঃ মাহ্দী তোমাকে আদেশ করছেন আমাকে সম্পদ দিতে। তখন সে বলবেঃ যা পারো অঞ্জলী ভরে নিয়ে নাও। যখন সে নিতে নিতে সম্পদের একটি স্তূপ বানিয়ে ফেলবে তখন সে লজ্জিত হয়ে বলবেঃ আমিই তো এ উম্মতের মধ্যকার লোভী মানুষটি। যা বন্টন করা হচ্ছে তা সবার যথেষ্ট আমার যথেষ্ট হবে না কেন?! তখন সে তা ফেরত দিবে। কিন্তু তা আর ফেরত নেয়া হবে না। বরং তাকে বলা হবেঃ আমরা যা কাউকে একবার দেই তা আর ফেরত নেই না। এভাবেই সে সাত, আট বা নয় বছর কাটিয়ে দিবে। তার ইন্তিকালের পর দুনিয়াতে বেঁচে থাকার আর কোন ফায়েদা নেই। (আহমাদ ৩/৩৭)
কারো কারোর নিকট উপরোক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লামাহ্ হাইসামী হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৩. আলী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
الْمَهْدِيُّ مِنَّا أَهْلَ الْبَيْتِ، يُصْلِحُهُ اللَّهُ فِي لَيْلَةٍ.
অর্থাৎ মাহ্দী আমারই বংশধর হবে। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে একই রাত্রে উপযুক্ত বানিয়ে দিবেন। (আহমাদ ২/৫৮ ইবনু মাজাহ্ ২/১৩৬৭)
৪. আবূ সা'ঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
الْمَهْدِيُّ مِنِّي أَجْلَى الْجَبْهَةِ، أَقْنَى الْأَنْفِ، يَمْلَأُ الْأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلًا كَمَا مُلِئَتْ ظُلْمًا وَجُوْرًا، يَمْلِكُ سَبْعَ سِنِينَ.
অর্থাৎ মাহ্দী আমারই বংশধর। তাঁর মাথার অগ্রভাগে কোন চুল থাকবে না। তাঁর নাকের বাঁশি হবে লম্বা এবং মধ্যভাগ হবে ঢালু। সে পুরো বিশ্ব ন্যায় ও ইন্সাফে ভরে দিবে যেমনিভাবে তা ভরে দেয়া হয়েছিলো অন্যায় ও অত্যাচারে। সে সাত বছর ক্ষমতাসীন থাকবে। (আবূ দাউদ ১১/৩৭৫ 'হাকিম ৪/৫৫৭)
৫. উম্মে সালামাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
الْمَهْدِيُّ مِنْ عِتْرَتِي، مِنْ وَلَدِ فَاطِمَةً.
অর্থাৎ মাহ্দী আমারই বংশধর; ফাতিমার সন্তান। (আবূ দাউদ ১১/৩৭৩ ইবনু মাজাহ্ ২/১৩৬৮)
৬. জাবির থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
يَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ، فَيَقُولُ أَمِيرُهُمُ الْمَهْدِيُّ: تَعَالَ صَلِّ بِنَا، فَيَقُولُ: لا ، إِنَّ بَعْضَهُمْ أَمِيرُ بَعْضٍ، تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الْأُمَّةَ.
অর্থাৎ 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তখন মুসলমানদের আমীর মাহ্দী 'ঈসা (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলবেঃ আসুন, নামাযের ইমামতি করুন। তখন তিনি বলবেনঃ না, বরং উম্মাতে মুহাম্মাদীর একে অপরের আমীর। এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের প্রতি এক বিরাট সম্মান। (ইবনুল্ ক্বাইয়ি/আল্-মানারুল্ মুনীফ ১৪৭-১৪৮ সুয়ূত্বী/ আল্-'হাভী ২/৬৮)
৭. আবূ সা'ঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
مِنَّا الَّذِي يُصَلِّي عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ خَلْفَهُ
অর্থাৎ সে আমারই বংশধর যার পেছনে 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আঃ) নামায আদায় করবেন। (স'হী'হুল্ জামি', হাদীস ৫৭৯৬)
৮. আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'ঊদ্ (রাযিয়াল্লহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
لَا تَذْهَبُ أَوْ لَا تَنْقَضِي الدُّنْيَا حَتَّى يَمْلِكَ الْعَرَبَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي، وَفِي رِوَايَةٍ: يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي وَاسْمُ أَبِيْهِ اسْمَ أَبِي.
অর্থাৎ দুনিয়া নিঃশেষ হবে না যতক্ষণ না আরবদের অধিপতি হবে আমারই বংশের একজন। যার নাম হবে আমারই নাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যার নাম হবে আমারই নাম এবং তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নাম। (আবু দাউদ ১১/৩৭০)
৯. আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ، وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ.
অর্থাৎ তোমাদের কেমন লাগবে! যখন 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আ.) তোমাদের মাঝে অবতীর্ণ হবেন। তখন তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য থেকেই হবে। (বুখারী ৩৪৪৯; মুসলিম ১৫৫)
১০. জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ، قَالَ: فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ (আ.) ، فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ : تَعَالَ، صَلِّ لَنَا، فَيَقُولُ: لَا ، إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ، تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الْأُمَّةَ.
অর্থাৎ সর্বদা আমার উম্মতের একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের উপর যুদ্ধ করে জয়ী হবে। অতঃপর 'ঈসা বিন্ মারইয়াম (আ.) অবতীর্ণ হবেন। তখন মুসলমানদের আমীর বলবেঃ আসুন, নামাযের ইমামতি করুন। তখন তিনি বলবেনঃ না, বরং তোমাদের মধ্য থেকে একে অপরের আমীর। এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের প্রতি এক বিরাট সম্মান। (মুসলিম ১৫৬)
১১. আবূ সা'ঈদ খুদ্রী ও জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ خَلِيفَةً يَقْسِمُ الْمَالَ وَلَا يَعُدُّهُ.
অর্থাৎ শেষ যুগে এমন একজন খলীফা হবেন যিনি হিসাব ছাড়া মানুষের মাঝে সম্পদ বন্টন করবেন। (মুসলিম ২৯১৩, ২৯১৪)

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 মাহ্দী সংক্রান্ত মুতাওয়াতির

📄 মাহ্দী সংক্রান্ত মুতাওয়াতির


উক্ত হাদীস ও অন্যান্য হাদীস থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির। মুতাওয়াতির হাদীস বলতে বর্ণন ধারার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্ব যুগে বর্ণনাকারীদের এমন এক জনগোষ্ঠীর বর্ণনাকেই বুঝানো হয় যাদের মিথ্যা বলা স্বভাবতই অসম্ভব।
এ ব্যাপারে নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট আলিমের মতামত তুলে ধরা হয়েছেঃ
১. হাফিয আবূ ল হাসান সিজিস্তানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, একদা ইমাম মাহদী আবির্ভূত হবেন। তিনি হবেন রাসূল () এর বংশধর। তিনি সাত বছর ক্ষমতাসীন থাকবেন। পুরো বিশ্ব ন্যায় ও ইন্সাফ দিয়ে ভরে দিবেন। একদা 'ঈসা (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে দাজ্জাল হত্যায় তাঁর সহযোগিতা করবেন। তিনিই তখন এ উম্মতের ইমামতি করবেন। 'ঈসা (আঃ) তাঁর পেছনেই নামায আদায় করবেন। (ফাত্হুল-বারী ৬/৪৯৩-৪৯৪ তাহযীবুল-কামাল ৩/১১৯৪)
২. শায়েখ মুহাম্মাদ আল-বারাযাঞ্জী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর "আল-'ইশা'আহ্ লি-আশরাত্বিস্ সা'আহ্" নামক কিতাবে বলেনঃ ইমাম মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো বর্ণনার ভিন্নতার দরুন তা সীমাহীন।
তিনি আরো বলেনঃ মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির। তিনি রাসূল (সঃ) এর মেয়ে ফাতিমার বংশধর। (আল-'ইশা'আহ্: ৮৭, ১১২)
৩. 'আল্লামাহ্ মুহাম্মাদ আস-সাফফারিনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো এতো বেশি যে, তা অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। এমনকি তা আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা'আতের বিশেষ আক্বীদাভুক্তও বটে।
তিনি আরো বলেনঃ মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো বহু সাহাবায়ে কিরাম ও তাবি'য়ীনে 'ইযাম থেকে বর্ণিত হওয়ার দরুন তা এ কথা প্রমাণ করে যে, ইমাম মাহদীর আবির্ভাব একেবারেই সুনিশ্চিত এবং এর উপর ঈমান আনা একান্ত ওয়াজিব। (লাওয়ামি 'উল-আনহারিল-বাহিয়‍্যাহ্ ২/৮৪)
৪. ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ পর্যন্ত মাহ্দী সংক্রান্ত যে হাদীসগুলো জানা সম্ভব হয়েছে তা সর্বমোট পঞ্চাশটি। নিঃসন্দেহে তা মুতাওয়াতির। কারণ, এর কম সংখ্যক হাদীসের উপরও কখনো মুতাওয়াতির শব্দ ব্যবহার করা হয়। তেমনিভাবে মাহ্দী সংক্রান্ত সাহাবাদের সুস্পষ্ট বর্ণনাও অনেক। যা রাসূলের হাদীস বলেই গণ্য করা হয়। কারণ, এ জাতীয় কথা ওহী ছাড়া নিজ আন্দাজে বলা কখনোই সম্ভবপর নয়। (আল-ইযা'আহ্: ১১৩-১১৪)
৫. 'আল্লামাহ্ সিদ্দীক হাসান খান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো অনেক বেশি। যা অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পড়ে। (আল-ইযা'আহ্: ১১২)
৬. শায়েখ মুহাম্মাদ বিন্ জা'ফর আল-কাত্তানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মোটকথা, ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও 'ঈসা (আঃ) সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির। (নাফুল-মুতানাসির: ১৪৭)

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 ইমাম মাহ্দী সংক্রান্ত বিশেষ কয়েকটি কিতাব

📄 ইমাম মাহ্দী সংক্রান্ত বিশেষ কয়েকটি কিতাব


হাদীসের কিতাবসমূহ। যেমনঃ আবূ দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ্, মুস্লাদে আহমাদ, মুস্লাদে বায্যার, মুস্নাদে আবী ইয়া'লা, মুস্লাদে 'হারিস্ বিন আবী উসামাহ্, মুস্তাদ্রাকে 'হাকিম, মুসান্নাফে ইব্‌দু আবী শাইবাহ্, স'হীহ্ ইবনু খুযাইমাহ্ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ ছাড়াও যে কিতাবগুলো শুধু ইমাম মাহদীর উপরেই লেখা হয়েছে তার কিছু নিম্নরূপঃ
১. হাফিয আবূ বকর ইবনু আবী খাইসামাহ্'র "আহাদীসুল-মাহ্দী"।
২. ইমাম সুয়ূতীর "আল-'উফুল-ওয়ার্দী ফী আখবারিল-মাহ্দী"।
৩. ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এর "আল-মাহ্দী"।
৪. 'আলী মুত্তাক্বীর "আল-ইমামুল-মাহ্দী"।
৫. ইবনু 'হাজার মাক্কীর "আল-ক্বাওলুল-মুখতাসার ফী 'আলামাতিল-মাহ্দী আল-মুন্তাযার"।
৬. মোল্লা 'আলী আল-ক্বারীর "আল-মাশ্রাবুল-ওয়ার্দী ফী মাযহাবিল-মাহ্দী"।
৭. মার'য়ী বিন্ ইউসুফের "ফাওয়াইদুল-ফিক্স ফী যুহুরিল-মুন্তাযার"।
৮. ইমাম শাওকানীর "আত-তাওযীহ্ ফী তাওয়াতুরি মা জাআ ফিল-মাহদিল-মুন্তাযারি ওয়াদ্দাজ্জালি ওয়াল-মাসীহ্"।
৯. মুহাম্মাদ বিন্ ইসস্মা'ঈল্ আল-ইয়ামানীর "আহাদীসুল-মাহ্দী”।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 মাহ্দীর হাদীস অস্বীকারকারীদের সন্দেহের উত্তর

📄 মাহ্দীর হাদীস অস্বীকারকারীদের সন্দেহের উত্তর


পূর্বের হাদীসসমূহ থেকে এ কথা নিশ্চিতভাবে জানা গেলো যে, শেষ যুগে ইমাম মাহদী (রাহিমাহুল্লাহ) আবির্ভূত হবেন। তিনি হবেন একজন ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী শাসক। এ কথাও জানা হলো যে, এ সংক্রান্ত হাদীসগুলো অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির।
এরপরও আফসোসের সাথে বলতে হয় যে, বর্তমান যুগের কিছু সংখ্যক আলিম এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে পরস্পর বিরোধী এবং বাতিল বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেনঃ মাহ্দীর ব্যাপারটি শিয়াদের কল্পকাহিনী মাত্র। পরবর্তীতে তা সুন্নীদের কিতাবে জায়গা করে নিয়েছে।
কেউ কেউ এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক ইনু খালদূনের কথাও উল্লেখ করেন। কারণ, তিনি মাহ্দী সংক্রান্ত অনেকগুলো হাদীসকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। মূলতঃ ইব্‌ন খালদুন (রাহিমাহুল্লাহ) ঐতিহাসিক ছিলেন সত্যিই। তবে তিনি হাদীস শুদ্ধাশুদ্ধ নির্ণয়ের ব্যাপারে কখনো চূড়ান্ত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। সুতরাং দ্বন্দ্বের সময় তাঁর কথা এ ব্যাপারে কখনো মানা যাবে না। এরপরও তিনি বলেনঃ
فَهِذِهِ جُمْلَةُ الْأَحَادِيثِ الَّتِي خَرَّجَهَا الْأَئِمَّةُ فِي شَأْنِ الْمَهْدِي وَخُرُوجِهِ آخِرَ الزَّمَانِ، وَهِيَ - كَمَا رَأَيْتَ - لَمْ يَخْلُصُ مِنْهَا مِنَ النَّقْدِ إِلَّا الْقَلِيلُ أَوِ الْأَقَلُّ مِنْهُ.
অর্থাৎ এগুলো মাহ্দী সংক্রান্ত কিছু হাদীস। যা আইম্মায়ে কিরাম উল্লেখ করেছেন এবং তাঁরা বলেছেনঃ তিনি শেষ যুগেই আবির্ভূত হবেন। তবে পাঠক সমাজ দেখতেই পাচ্ছেন, এগুলোর কিয়দংশই শুধুমাত্র ত্রুটিমুক্ত। যা একেবারে সামান্যই। (মুকাদ্দামাহ্: ৫৭৪)
তাঁর উপরোক্ত কথায় বুঝা যায় যে, কিছু হাদীস তো অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত। যেখানে একটি হাদীসই যথেষ্ট আর সেখানে অনেকগুলো শুদ্ধ হাদীসই পাওয়া যাচ্ছে। যা অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পড়ে।
আল্লামাহ্ আহমেদ শাকির বলেনঃ ঐতিহাসিক ইব্‌ন খালদুন (রাহিমাহুল্লাহ) মুহাদ্দিসীনদের নিম্নোক্ত বাক্যটি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। বাক্যটি হলোঃ "সাপোর্টের চাইতে প্রত্যাখ্যানই অগ্রগণ্য"
তিনি যদি মুহাদ্দিসীনদের কথাটি পুরোভাবে অনুধাবন করতে পারতেন তা হলে তিনি এমন কথা কখনোই বলতে পারতেন না। তবে এমনো হতে পারে যে, তিনি মুহাদ্দিসীনদের কথাটি পুরোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন। তবে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অত্যধিক বিদ্বেষের কারণেই মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি আরো বলেনঃ ইব্‌ন খালদূন (রাহিমাহুল্লাহ) মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে অনেকগুলো ভুল তথ্য দিয়েছেন। তেমনিভাবে হাদীসগুলোর ভুলত্রুটি বর্ণনা করার ব্যাপারেও তিনি অনেকগুলো ভুলের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেন যে, হয়তো বা এগুলো ছাপার ভুলও হতে পারে। (মুসনাদে আহমাদের টিকা ৫/১৯৭-১৯৮)
মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো অস্বীকারকারীরা 'আল্লামাহ্ রশিদ রেযার কথাও উল্লেখ করে থাকেন।
'আল্লামাহ্ রশিদ রেযা বলেনঃ মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। এরই চাইতে বর্ণনাগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করা আরো কঠিন। তাই এর অস্বীকারকারীরাও অনেক বেশি। হয়তো বা এ কারণেই ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রাহিমাহুমাল্লাহ) এ সংক্রান্ত কোন হাদীস এঁদের কিতাবদ্বয়ে উল্লেখ করেননি এবং এ কারণেই এ নিয়ে মুসলিম উম্মাহ্'র মাঝে বহু ফিতনা ও ফাসাদ সৃষ্টি হয়। (তাফসীরুল মানার: ৯/৪৯৯)
'আল্লামাহ্ রশিদ রেযা এ সংক্রান্ত কিছু হাদীসের পরস্পর দ্বন্দ্বও নমুনা স্বরূপ উল্লেখ করেন। তিনি বলেনঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা'আতের নিকট প্রসিদ্ধ বর্ণনা হচ্ছে, তাঁর নাম মুহাম্মাদ বিন্ আব্দুল্লাহ্। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আহমাদ বিন্ আব্দুল্লাহ্। শিয়ারা বলেঃ তাঁর নাম মুহাম্মাদ বিন্ 'হাসান আল-'আস্কারী। তিনি এগারো নম্বর নিষ্পাপ ইমাম। যাকে 'হুজ্জাত, ক্বায়িম এবং মুন্তাযিরও বলা হয়। কাইসানীদের নিকট তাঁর নাম মুহাম্মাদ বিন্ আল-'হানাফিয়‍্যাহ্। তারা বলেঃ তিনি আজও জীবিত এবং রেযওয়া পাহাড়ে বসবাসরত।
তিনি আরো বলেনঃ প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে, তিনি 'আলীর সন্তান 'হাসানের বংশধর। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি 'আলীর সন্তান 'হুসাইনের বংশধর। যা শিয়াদেরও কথা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি 'আব্বাসের বংশধর।
তিনি আরো বলেনঃ এ কথা অকাট্য সত্য যে, অনেকগুলো ইসরাঈলী বর্ণনা হাদীসের কিতাবসমূহে অবস্থান করে নিয়েছে। অতএব মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলোর অধিকাংশই হয়তো বা এ ধরনেরই। অনুরূপভাবে 'আলাভী, 'আব্বাসী ও পারসীক হঠকারিতাও মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলোর জন্ম দিতে পারে। কারণ, তাদের প্রত্যেক দলই বিশ্বাস করে যে, একদা ইমাম মাহ্দী তাদের মধ্য থেকেই আসবেন। ইহুদী ও পারস্যবাসীরা হয়তো বা এমন হাদীস এ জন্যই রচনা করেছে যেন মুসলমানরা মাহ্দীর উপর নির্ভরশীল হয়ে ধর্মীয় ব্যাপারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে। কারণ, তিনিই তো একদা পুরো বিশ্বে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন।
আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসগুলো শুদ্ধ এবং তা অর্থের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির। যদিও অন্যান্য বিষয়ের মতো এ বিষয়েও যয়ীফ এবং জাল হাদীস থাকতে পারে। আর সকল শুদ্ধ হাদীস যে বুখারী এবং মুসলিমেই রয়েছে তাও কিন্তু সঠিক কথা নয়। বরং অনেকগুলো শুদ্ধ হাদীস সুনান, মাসানীদ, মা'আজিম ইত্যাদিতেও রয়েছে।
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম বুখারী ও মুসলিম এমন দায়িত্ব তো নেননি যে, তাঁরা সকল শুদ্ধ হাদীসসমূহ নিজ কিতাবদ্বয়ে উল্লেখ করবেন। বরং এমন অনেক হাদীসও তো পাওয়া যায় যা তাঁরা শুদ্ধ বলেছেন; অথচ তাঁরা তা বুখারী ও মুসলিমে উল্লেখ করেননি। যেমনঃ ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) এ জাতীয় কিছু হাদীস তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেন। (আল-বা'য়িসুল 'হাসীস ২৫)
হাদীস ভাণ্ডারে যে ইসরাঈলী বর্ণনা এবং কট্টরপন্থীদের বর্ণনাও স্থান করে নিয়েছে তা অবশ্যই সঠিক। তবে হাদীস বিশারদগণ তো তা যাচাই- বাছাই করে সেগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধ নির্ণয় করেছেন। এমনকি তাঁরা জাল ও দুর্বল হাদীস সম্পর্কে অনেকগুলো গ্রন্থও রচনা করেছেন। উপরন্তু তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে অনেকগুলো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সূত্রও রচনা করেছেন। যার দরুন এমন কোন বিদ'আতী বা মিথ্যুক বাকি থাকেনি যাদের কুৎসিত চেহারা জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়নি। এভাবেই আল্লাহ্ তা'আলা হাদীস ভাণ্ডারটিকে বাতিলপন্থীদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তাই আমরা মাহদী সংক্রান্ত কিছু জাল হাদীস অবলোকন করে এ সংক্রান্ত সঠিক ও শুদ্ধ হাদীসগুলো কখনো প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। যে হাদীসগুলোতে মাহ্দী ও তাঁর পিতার নাম এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং মাহ্দী সংক্রান্ত কারোর অমূলক দাবি যেন আমাদেরকে বিচলিত না করে। কারণ, যখন আল্লাহ্ তা'আলা চাবেন তখনই তিনি মাহ্দীর প্রকাশ ঘটাবেন এবং মানুষও তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য দেখেই তাঁকে চিনে ফেলবে। এ জন্য কারোর সমর্থন যোগানোর কোন প্রয়োজন হবে না।
আর এ সংক্রান্ত শুদ্ধ হাদীসগুলোও কখনো পরস্পর দ্বন্দ্বপূর্ণ নয়। বরং দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে শুদ্ধাশুদ্ধ সকল প্রকারের হাদীসসমূহের মাঝে। যা আমাদের কোন চিন্তারই বিষয় নয়। তেমনিভাবে এ বিষয়ে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্বও কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমাদের যা দেখার বিষয় তা হচ্ছে একমাত্র কুর'আন মাজীদ ও প্রিয় নবীর বিশুদ্ধ হাদীস ভাণ্ডার।
এ জন্যই 'আল্লামাহ্ ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ শিয়া ইমামীরা বলে থাকে যে, মাহ্দী হচ্ছেন মুহাম্মাদ বিন্ 'হাসান আল-'আস্কারী। যাঁর অপেক্ষায় তারা সর্বদা ব্যস্ত রয়েছে। যিনি 'আলীর সন্তান 'হুসাইনের বংশধর। 'হাসানের বংশধর নয়। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তবে সবার চোখেরই অন্তরালে। ছোট বেলায় তিনি সামুরা' নামক সুড়ঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন। যা আজ থেকে প্রায় আরো পাঁচ শত বছর আগের কথা। তাঁকে এরপর আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর কোন খবরাখবরও পাওয়া যায়নি। তবুও তারা প্রতিদিন একটি সুসজ্জিত ঘোড়া নিয়ে উক্ত সুড়ঙ্গের দরোজায় তাঁর অপেক্ষায় রয়েছে। চিৎকার দিয়ে তাঁকে ডাকছে, হে আমাদের মাওলা! আপনি তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসুন; অথচ তারা তাঁকে না পেয়ে বার বার নিষ্ফল হয়ে ফিরে আসছে। তারা আদম সন্তানের জন্য এক বড়ো লজ্জা। যা শুনে যে কোন বুদ্ধিমান না হেঁসে পারে না। (আল-মানারুল মুনীফ ১৫২-১৫৩)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00