📄 অত্যাধিক হত্যাকাণ্ড
অত্যধিক হত্যাকাণ্ড কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمُ الْهَرْجُ، قَالُوا: وَمَا الْهَرْجُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الْقَتْلُ الْقَتْلُ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে হারজ বেড়ে যায়। সাহাবাগণ বললেনঃ হাজ কি? হে আল্লাহ্'র রাসূল! তিনি বললেনঃ হত্যা, হত্যা। (মুসলিম ১৫৭)
উক্ত হত্যাকাণ্ডের মূল কারণই হচ্ছে ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ও মূর্খতার ছড়াছড়ি। যার দরুন সামান্য ছুতানাতা নিয়েই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত হবে।
আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامُ الْهَرْجِ، يَزُولُ فِيهَا الْعِلْمُ وَيَظْهَرُ فِيهَا الْجَهْلُ.
অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বক্ষণে চলবে হত্যাকাণ্ডের যুগ। তাতে ধর্মীয় জ্ঞান বিদায় নিবে এবং মূর্খতা প্রকাশ পাবে। (বুখারী ৭০৬৬)
তবে এতে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হবে এই যে, উক্ত হত্যাকাণ্ড তখন কাফিরদের বিরুদ্ধে চালানো হবে না বরং তা চালানো হবে মুসলমানদেরই পক্ষ থেকে এবং মুসলমানদেরই বিপক্ষে।
আবূ মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ الْهَرْجُ ، قَالُوا : وَمَا الْهَرْجُ؟ قَالَ: الْقَتْلُ، قَالُوا: أَكْثَرَ مِمَّا نَقْتُلُ؟ إِنَّا نَقْتُلُ فِي الْعَامِ الْوَاحِدِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ أَلْفًا، قَالَ: إِنَّهُ لَيْسَ بِقَتْلِكُمُ الْمُشْرِكِينَ، وَلَكِنْ قَتْلُ بَعْضِكُمْ bَعْضًا، قَالُوا: وَمَعَنَا عُقُوْلُنَا يَوْمَئِذٍ، قَالَ: إِنَّهُ لَيُنْزَعُ عُقُولُ أَكْثَرٍ أَهْلِ ذَلِكَ الزَّمَانِ، وَيَخْلُفُ لَهُ هَبَاءُ مِنَ النَّاسِ، يَحْسَبُ أَكْثَرُهُمْ أَنَّهُ عَلَى شَيْءٍ، وَلَيْسُوا عَلَى شَيْءٍ.
অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বক্ষণে হার্জ দেখা দিবে। সাহাবাগণ বললেনঃ হার্জ কি? রাসূল() বললেনঃ অত্যধিক হত্যাকাণ্ড। সাহাবাগণ বললেনঃ এখন আমরা যা হত্যা করছি তার চাইতেও বেশি? আমরা তো হত্যা করছি প্রতি বছর সত্তর হাজারেরও বেশি লোক। রাসূল() বললেনঃ মুর্শিকদেরকে হত্যা করা নয়। তখন তোমরা হত্যা করবে নিজেরা একে অপরকে। সাহাবাগণ বললেনঃ তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি সচল থাকবে? রাসূল () বললেনঃ সে যুগের অধিকাংশ মানুষেরই বিবেক-বুদ্ধি উঠিয়ে নেয়া হবে। তখন শুধু বেঁচে থাকবে অযোগ্য অপদার্থ জগাখিচুড়ি লোক। তাদের অধিকাংশই মনে করবে, তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু করছে; অথচ তারা ফিতনা-ফাসাদ ছাড়া আর কিছুই করছে না। (আহমাদ ৪/৪১৪ ইব্নু মাজাহ্, হাদীস ৩৯৫৯ শর'হুস্ সুন্নাহ্, হাদীস ৪২৩৪ সহীহুল্ জামি', হাদীস ২০৪৩)
তখন বিবেক-বুদ্ধি এতোই হ্রাস পাবে যে, হত্যাকারী ব্যক্তি বলতে পারবে না সে কি জন্য হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং হত্যাকৃত ব্যক্তিও জানবে না তাকে কি জন্য হত্যা করা হচ্ছে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ! لَا تَذْهَبُ الدُّنْيَا حَتَّى يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمُ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَا قُتِلَ؟ فَقِيلَ: كَيْفَ يَكُوْنُ ذَلِكَ؟ قَالَ: الْهَرْجُ الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ.
অর্থাৎ সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! দুনিয়া নিঃশেষ হবে না যতক্ষণ না এমন এক দিন আসবে যে দিন হত্যাকারী বলতে পারবে না সে কি জন্য হত্যা করছে এবং হত্যাকৃত ব্যক্তিও বলতে পারবে না তাকে কি জন্য হত্যা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করা হলোঃ সেটা আবার কি ধরনের? রাসূল () বললেনঃ এটার নামই তো হার্জ তথা অমূলক হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারী ও হত্যাকৃত উভয়ই জাহান্নামী। (মুসলিম ২৯০৮)
রাসূল () যা বলে গেছেন তা আজ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। 'উসমান এর হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক বড়ো বড়ো যুদ্ধ হয়েছে। তবে এর অনেকগুলোরই মূল যৌক্তিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমান যুগে রাজনীতির ধাপাধাপি ও অস্ত্রের ছড়াছড়ির কারণে হত্যাকাণ্ড দিন দিন আরো বেড়েই চলছে। মানুষ এখন যৎসামান্য কারণেই একে অপরকে হত্যা করছে। যা বুদ্ধিশূন্যতারই মহা পরিচায়ক।
এরপরও এতটুকু মনে করেই শান্তি পেতে হয় যে, এ উম্মত তো আল্লাহ্ তা'আলার এক বিশেষ করুণার পাত্র। আখিরাতে তাদের জন্য কোন শাস্তি নেই। এ দুনিয়াতেই তাদের যতটুকু শাস্তি। যা ফিতনা, ভূমিকম্প, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির মধ্যেই নিহিত।
আবূ বুরদাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা আমি যিয়াদের শাসনামলে বাজারে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন আমি আশ্চর্য হয়ে এক হাতের উপর অপর হাত ক্ষেপণ করছিলাম। তা দেখে জনৈক আন্সারী সাহাবীর ছেলে আমাকে বললেনঃ হে আবূ বুরদাহ্! তুমি আশ্চর্য হচ্ছো? কেন? আমি বললামঃ আমি আশ্চর্য হচ্ছি এমন এক জাতির কথা স্মরণ করে যাদের ধর্ম এক, নবী এক, দা'ওয়াত এক, হজ্জ এক, যুদ্ধ এক। তারপরও তারা একে অপরকে হত্যা করা হালাল মনে করছে। তখন সে বললোঃ এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। আমি আমার পিতা থেকে বর্ণনা করছি তিনি রাসূল () কে বলতে শুনেছেন তিনি বলেনঃ
إِنَّ أُمَّتِي أُمَّةٌ مَرْحُوْمَةٌ، لَيْسَ عَلَيْهَا فِي الْآخِرَةِ حِسَابٌ وَلَا عَذَابٌ، إِنَّمَا عَذَابُهَا فِي الْقَتْلِ وَالزَّلَازِلِ وَالْفِتَنِ.
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমার উম্মত এক করুণাপ্রাপ্ত উম্মত। আখিরাতে তাদের কোন শাস্তি ও হিসেব হবে না। তাদের শাস্তি হত্যা, ভূমিকম্প ও ফিতনার মাঝে। ('হাকিম ৪/২৫৩-২৫৪ সিলসিলাহ্ স'হীহাহ্ ২/৬৮৪-৬৮৬)
📄 সময়ের দ্রুত গমন
সময়ের দ্রুত গমন কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ () থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (স) ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى ... يَتَقَارَبَ الزَّمَانُ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না সময় পরস্পর নিকটবর্তী হবে তথা দ্রুত গমন করবে। (বুখারী ৭১২১)
আবূ হুরাইরাহ্ () থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَتَقَارَبَ الزَّمَانُ، فَتَكُونَ السَّنَةُ كَالشَّهْرِ، وَيَكُونَ الشَّهْرُ كَالْجُمُعَةِ، وَتَكُونَ الْجُمُعَةُ كَالْيَوْمِ، وَيَكُونَ الْيَوْمُ كَالسَّاعَةِ، وَتَكُوْنَ السَّاعَةُ كَاحْتِرَاقِ السَّعْفَةِ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না সময় পরস্পর নিকটবর্তী হবে তথা দ্রুত গমন করবে। বছর হবে মাসের ন্যায়, মাস হবে সপ্তাহের ন্যায়, সপ্তাহ হবে দিনের ন্যায়, দিন হবে ঘন্টার ন্যায়, ঘন্টা হবে বিশেষ চর্ম রোগের দংশন বা জ্বলনের ন্যায়। (আহমাদ্ ২/৫৩৭-৫৩৮ সহীহুল জা'মি', হাদীস ৭২৯৯)
সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়ার কয়েকটি অর্থ হতে পারে যা নিম্নরূপঃ
ক. সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া মানে উহার বরকত কমে যাওয়া।
খ. সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া মানে 'ঈসা ও মাহদী ('আলাইহিমাস্ সালাম) এর যুগে যখন মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তায় থাকবে তখন সময় অতি দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে মনে হবে।
গ. সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া মানে ধর্মহীনতায় সে যুগের সকল লোক একই রকম হওয়া।
ঘ. সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া মানে যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম উন্নতির কারণে সে যুগের সকল মানুষ পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া।
ঙ. সময় পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া মানে বাস্তবেই সময়ের দ্রুত গমন।
📄 হাট-বাজার পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া
হাট-বাজার পরস্পর নিকটবর্তী হওয়া কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَظْهَرَ الْفِتَنُ، وَيَكْثُرَ الْكَذِبُ، وَتَتَقَارَبَ الْأَسْوَاقُ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না ফিতনা প্রকাশ পায়, মিথ্যা বেড়ে যায় এবং বাজারগুলো পরস্পর নিকটবর্তী হয়। (আহমাদ ২/৫১৯)
বর্তমান যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার এতো চরম উন্নতি সাধিত হয়েছে যে, মানুষ বিশ্বের যে কোন জায়গায় বসে ইন্টারনেট, টেলিফোন, রেডিও, টিভির মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোন পণ্যের বাজার দর খুবই স্বল্প সময়ে জেনে নিতে পারে এবং এরই মাধ্যমে বিশ্বের সকল পণ্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
তেমনিভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম উন্নতির কারণে প্লেনে বা গাড়িতে অনেক দূরের মার্কেটেও অল্প সময়ে পৌঁছা যায়।
সুতরাং হাট-বাজার নিকটবর্তী হওয়া তিনভাবে হতে পারে যা নিম্নরূপঃ
ক. খুব দ্রুত বিশ্ব বাজারের যে কোন পণ্যের বাজার দর জেনে ফেলার সুবিধা।
খ. খুব দ্রুত পৃথিবীর যে কোন বাজারে পৌঁছে যাওয়ার সুবিধা।
গ. বিশ্ব বাজারের যে কোন পণ্যের দাম সর্বত্র কাছাকাছি হওয়া।
📄 উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে শিরকের দ্রুত বিস্তার
উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে শিরকের দ্রুত বিস্তার কিয়ামতের আরেকটি আলামত।
বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শির্ক ও শির্ক জাতীয় আমল অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। কবর পূজা, মূর্তি পূজা আজ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে পুরোদমেই চলছে। ওলীদের কবর থেকে হরদম বরকত নেয়া হচ্ছে। মানুষ তাকে চুমু খাচ্ছে ও অতি সম্মান করছে। কবরের জন্য যে কোন বস্তু মানত করা হচ্ছে। ওলীদের কবরকে নিয়ে বার্ষিক ওরস মাহফিলও করা হচ্ছে। বরং এ যুগের অনেক কবর পূর্বেকার লাত, উয্যা, মানাতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সাউবান থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِذَا وُضِعَ السَّيْفُ فِي أُمَّتِي لَمْ يُرْفَعُ عَنْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَلَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ.
অর্থাৎ যখন আমার উম্মতের মধ্যে হত্যাকাণ্ড শুরু হবে তখন তা আর কিয়ামত পর্যন্ত উঠিয়ে নেয়া হবে না। কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না আমার উম্মতের মধ্য থেকে কোন না কোন সম্প্রদায় মুর্শিকদের সাথে মিশে যায় এবং মূর্তি পূজা করে। (আবূ দাউদ/'আউনুল্ মা'বুদ ১১/৩২২-৩২৪ তিরমিযী ৬/৪৬৬ স'হীহুল জা'মি', হাদীস ৭২৯৫)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءِ دَوْسٍ حَوْلَ ذِي الْخَلَصَةِ.
অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না দাউস্ গোত্রের মহিলারা পাছা নাচিয়ে যুখালাসা নামক মূর্তির তাওয়াফ করবে। (বুখারী ৭১১৬; মুসলিম ২৯০৬ বাগাওয়ী, হাদীস ৪২৮৫ ইবনু হিব্বান, হাদীস ৬৭১৪ আব্দুর রায্যাক, হাদীস ২০৭৯৫)
'আয়িশা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا يَذْهَبُ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ حَتَّى تُعْبَدَ اللَّاتُ وَالْعُزَّى.
অর্থাৎ দিন-রাত নিঃশেষ হবে না তথা কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না লাত ও 'উয্যার পূজা করা হয়। (মুসলিম ২৯০৭)
'আয়িশা বলেনঃ আমি উক্ত হাদীস শুনে রাসূল () কে বললামঃ হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমি তো মনে করতাম, যখন আল্লাহ্ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছেনঃ
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ.
অর্থাৎ তিনিই সেই সত্তা যিনি স্বীয় রাসূলকে পাঠিয়েছেন হিদায়াত তথা কুর'আন এবং সত্য ধর্ম দিয়ে। যেন তিনি বিজয়ী করতে পারেন উক্ত ধর্মকে সকল ধর্মের উপর। যদিও তা মুর্শিকরা অপছন্দ করে। (তাওবাহ্: ৩৩)
আমি তো মনে করতাম যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত আয়াত নাযিল করেছেন তখন ইসলাম ধর্ম অবশ্যই পরিপূর্ণরূপে পুরো বিশ্বে প্রকাশ পাবে। রাসূল () তা শুনে বললেনঃ
إِنَّهُ سَيَكُونُ مِنْ ذَلِكَ مَا شَاءَ اللهُ ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللَّهُ رِيحًا طَيِّبَةً فَتَوَفَّى كُلَّ مَنْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيْمَانٍ، فَيَبْقَى مَنْ لَا خَيْرَ فِيْهِ، فَيَرْجِعُوْنَ إِلَى دِينِ آبَائِهِمْ.
অর্থাৎ তুমি যা মনে করতে তাই হবে। তবে যতো দিন আল্লাহ্ তা'আলা তা ইচ্ছে করবেন। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা এমন এক ধরনের উত্তম হাওয়া বইয়ে দিবেন যা প্রত্যেক মু'মিন বান্দাহকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবে যার অন্তরে একটি রাইয়ের দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে। এরপর এমন সব লোক বেঁচে থাকবে যাদের মধ্যে কোন কল্যাণই থাকবে না এবং তারা সবাই নিজ বাপ-দাদার ধর্মের দিকে আবারো ফিরে যাবে। (মুসলিম ২৯০৭)
নবী () এর উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে। দাউস্ ও তার আশেপাশের গোত্রগুলো একদা যুত্থালাসা নামক মূর্তির পূজা শুরু করেছে। তখন শায়েখ মুহাম্মাদ বিন্ আব্দুল ওয়াহ্হাব (রাহিমাহুল্লাহ) তাদেরকে তাওহীদের দিকে ডাকলেন। শায়েখের দা'ওয়াতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইমাম আব্দুল আজিজ বিন্ মুহাম্মাদ বিন্ স'উদ্ (রাহিমাহুল্লাহ) যুত্থালাসা অভিমুখে দা'য়ীদের একটি দল পাঠান। যাঁরা সবাইকে বুঝিয়ে শুনিয়ে উক্ত মূর্তি ধ্বংস করতে সক্ষম হন। তবে অত্র এলাকায় স'উদ্ বংশের ক্ষমতা কিছু দিনের জন্য অকার্যকর হলে মূর্খরা আবারো যুত্থালাসার পূজা শুরু করে দেয়। অতঃপর স'উদ্ বংশের প্রভাবশালী রাষ্ট্রপতি আব্দুল আজীজ বিন্ আব্দুর রহমান আবারো ক্ষমতায় আরোহণ করলে তিনি তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন।
শির্ক শুধু গাছ, পাথর আর কবর পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা আরো অনেক ব্যাপক। বর্তমান যুগে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা'আলার পাশাপাশি তাগুতদেরকেও বিশেষ অবস্থান দেয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের পক্ষ থেকে মনগড়া সংবিধান রচনা করে মানুষের উপর তা চাপিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে মানুষও তা সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا، لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ.
অর্থাৎ তারা আল্লাহ্ তা'আলাকে ছেড়ে নিজেদের আলিম, ধর্ম যাজক ও মারইয়ামের পুত্র মাসীহ্ (ঈসা) (আঃ) কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে শুধু এতটুকুই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই ইবাদাত করবে। তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই। তিনি তাদের শির্ক হতে একেবারেই পূতপবিত্র। (তাওবাহ্: ৩১)
'আদি' বিন্ হাতিম (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
أَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَفِي عُنُقِي صَلِيْبٌ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ : يَا عَدِيٌّ إِطْرَحُ عَنْكَ هَذَا الْوَثَنَ، وَسَمِعْتُهُ يَقْرَأُ فِي سُورَةِ بَرَاءَةٍ: ﴿وَاتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللهِ قَالَ: أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوْا لَهُمْ شَيْئًا إِسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوْهُ.
অর্থাৎ আমি নবী (সঃ) এর দরবারে গলায় স্বর্ণের ক্রুশ ঝুলিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে ডেকে বলেনঃ হে 'আদি'! এ মূর্তিটি (ক্রুশ) গলা থেকে ফেলে দাও। তখন আমি তাঁকে উক্ত আয়াতটি পড়তে শুনেছি। হযরত 'আদি' বলেনঃ মূলতঃ খ্রিষ্টানরা কখনো তাদের আলিমদের উপাসনা করতো না। তবে তারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে আলিমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতো। আর এটিই হচ্ছে আলিমদেরকে প্রভু মানার অর্থ তথা আনুগত্যের শির্ক। (তিরমিযী, হাদীস ৩০৯৫)
হালাল ও হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে আলিমদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যদি এতো বড়ো অপরাধ হয়ে থাকে তা হলে যারা ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে ইসলাম বিরোধী মতবাদ তথা ধর্ম নিরপেক্ষ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ ও জাতীয়তাবাদকে জীবন সাফল্যের একান্ত চাবিকাঠি বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তা প্রচারে মদমত্ত হয়ে উঠে তারা কি আবার মুসলমান হতে পারে?