📄 মসজিদগুলোকে অত্যাধিক সুসজ্জিত করণ ও তা নিয়ে পরস্পর গর্ব করা
মসজিদগুলোকে অত্যধিক সুসজ্জিত করণ ও তা নিয়ে পরস্পর গর্ব করা কিয়ামতের আরেকটি আলামত।
আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَتَبَاهَى النَّاسُ فِي الْمَسَاجِدِ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না মানুষ মসজিদ নিয়ে পরস্পর গর্ব করে। (আহমাদ ৫/৩১৮ স'হীহুল্ জামি', হাদীস ৭২৯৮)
আনাস্ বলেনঃ তারা মসজিদ নিয়ে পরস্পর গর্ব করবে ঠিকই। তবে মসজিদের মুসল্লী হবে খুবই কম।
আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেনঃ
لَتُزَخْرِفُنَّهَا كَمَا زَخْرَفَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى.
অর্থাৎ তোমরা একদা মসজিদগুলোকে সুসজ্জিত করবে যেমনিভাবে সুসজ্জিত করেছে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের মন্দিরগুলোকে। (ফাত্হুল বারী ১/৫৩৯)
মসজিদ নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ মুসল্লীদেরকে গরম, ঠাণ্ডা ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। এ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
'উমর মসজিদে নববী সংস্কারের সময় অধিনস্থ কর্মকর্তাকে এ বলে আদেশ করেনঃ
أَكِنَّ النَّاسَ مِنَ الْمَطَرِ، وَإِيَّاكَ أَنْ تُحَمِّرَ أَوْ تُصَفِّرَ فَتَفْتِنَ النَّاسَ.
অর্থাৎ মানুষকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করো। লাল বা হলদে বানাতে যাবে না। তা হলে মানুষ নামায থেকে অন্য মনস্ক হয়ে যাবে। (ফাত্হুল বারী ১/৫৩৯)
বর্তমান যুগে মসজিদগুলোকে শুধু লাল বা হলদেই বানানো হচ্ছে না বরং উহাকে কাপড়ের নকশার মতো নকশাদার করা হচ্ছে। বিশ্বের বুকে এমন অনেক মসজিদ রয়েছে যা আজো কারুশিল্পের এক এক ভাস্কর দৃষ্টান্ত।
মসজিদ ও কুর'আনের কারুকার্য যখন ব্যাপক রূপ ধারণ করবে তখনই মুসলমানদের ধ্বংস অনিবার্য।
আবৃদ্দারদা' থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
إِذَا زَوَّقْتُمْ مَسَاجِدَكُمْ، وَحَلَّيْتُمْ مَصَاحِفَكُمْ؛ فَالدَّمَارُ عَلَيْكُمْ.
অর্থাৎ যখন তোমরা মসজিদ ও কুর'আন মাজীদকে কারুমণ্ডিত করবে তখনই তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। (সহীহুল জামি' ৫৯৯)
📄 বড়ো বড়ো অট্টালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা
বড়ো বড়ো অট্টালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
وَإِذَا تَطَاوَلَ رِعَاءُ الْبَهُم فِي الْبُنْيَانِ فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا.
অর্থাৎ যখন রাখালরা বড়ো বড়ো অট্টালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা করবে তখনই তা কিয়ামতের একটি আলামত। (মুসলিম ৯)
'উমর বিন খাত্ত্বাব থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ.
অর্থাৎ কিয়ামতের আলামত এটাও যে, তখন তুমি কাপড়-জুতোবিহীন গরিব ছাগল রাখালকে দেখবে অট্টালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা করতে। (মুসলিম ৮)
📄 রাশি তার প্রভুকে জন্ম দেওয়া
বান্দির তার প্রভুকে জন্ম দেওয়া কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِذَا وَلَدَتِ الْأَمَةُ رَبَّهَا فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا.
অর্থাৎ যখন কোন বান্দি তার প্রভুকে জন্ম দিবে তখনই তা কিয়ামতের একটি আলামত। (মুসলিম ৯)
বান্দি তার প্রভুকে জন্ম দেয়ার অনেকগুলো অর্থ হতে পারে যা নিম্নরূপঃ
ক. ইসলাম যখন জোরপূর্বক কাফির এলাকায় প্রবেশ করবে তখন মুসলমানরা কাফিরদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে বান্দি হিসেবে ব্যবহার করবে। অতঃপর তার থেকে যে সন্তান জন্ম নিবে একদা সে মিরাসী সূত্রে উক্ত বান্দির মনিব হয়ে যাবে।
খ. মালিকরা যখন বাচ্চার জননী বান্দিকে সচরাচর বিক্রি করে দিবে। যা মূলতঃ না জায়িয। তখন ভাগ্যচক্রে তারই সন্তান তাকে বান্দি হিসেবে খরিদ করবে। অথচ সে জানবে না যে, এই তার মা জননী।
গ. বান্দির সাথে তার মালিক ছাড়া অন্য কেউ সন্দেহ বশতঃ হালাল মনে করে সহবাস করবে। তখন তো তার পেট থেকে স্বাধীন পুরুষই জন্ম নিবে। যে পরবর্তীতে তারই প্রভু হবে। এমনো হতে পারে যে, তার সাথে শরীয়ত সম্মতভাবে বিবাহ্ পূর্বক সহবাস করা হবে অথবা ব্যভিচার করা হবে। এরপর তাকে বাজারে বিক্রি করা হলে ঘটনাচক্রে তার সন্তানই তাকে খরিদ করে একদা তার মালিক হয়ে যাবে।
ঘ. সন্তান তার মাতা-পিতার চরম অবাধ্য হবে। তখন সন্তান তার মায়ের সাথে বান্দির আচরণই করবে। তাকে গালি দিবে, মারবে ও তার খিদমত নিবে। আল্লামাহ্ ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত ব্যাখ্যাকেই যুক্তিযুক্ত বলে মত ব্যক্ত করেন।
ঙ. শেষ যুগে বান্দিরা অত্যধিক সম্মান পাবে। তখন তাদেরকেই প্রভাবশালীরা বিবাহ্ করবে এবং তাদের ঘর থেকেই তখন তাদের মনিব জন্ম নিবে। আল্লামাহ্ ইব্ন্ধু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত মত ব্যক্ত করেন।
📄 অত্যাধিক হত্যাকাণ্ড
অত্যধিক হত্যাকাণ্ড কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمُ الْهَرْجُ، قَالُوا: وَمَا الْهَرْجُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الْقَتْلُ الْقَتْلُ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে হারজ বেড়ে যায়। সাহাবাগণ বললেনঃ হাজ কি? হে আল্লাহ্'র রাসূল! তিনি বললেনঃ হত্যা, হত্যা। (মুসলিম ১৫৭)
উক্ত হত্যাকাণ্ডের মূল কারণই হচ্ছে ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ও মূর্খতার ছড়াছড়ি। যার দরুন সামান্য ছুতানাতা নিয়েই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত হবে।
আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامُ الْهَرْجِ، يَزُولُ فِيهَا الْعِلْمُ وَيَظْهَرُ فِيهَا الْجَهْلُ.
অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বক্ষণে চলবে হত্যাকাণ্ডের যুগ। তাতে ধর্মীয় জ্ঞান বিদায় নিবে এবং মূর্খতা প্রকাশ পাবে। (বুখারী ৭০৬৬)
তবে এতে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হবে এই যে, উক্ত হত্যাকাণ্ড তখন কাফিরদের বিরুদ্ধে চালানো হবে না বরং তা চালানো হবে মুসলমানদেরই পক্ষ থেকে এবং মুসলমানদেরই বিপক্ষে।
আবূ মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ الْهَرْجُ ، قَالُوا : وَمَا الْهَرْجُ؟ قَالَ: الْقَتْلُ، قَالُوا: أَكْثَرَ مِمَّا نَقْتُلُ؟ إِنَّا نَقْتُلُ فِي الْعَامِ الْوَاحِدِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ أَلْفًا، قَالَ: إِنَّهُ لَيْسَ بِقَتْلِكُمُ الْمُشْرِكِينَ، وَلَكِنْ قَتْلُ بَعْضِكُمْ bَعْضًا، قَالُوا: وَمَعَنَا عُقُوْلُنَا يَوْمَئِذٍ، قَالَ: إِنَّهُ لَيُنْزَعُ عُقُولُ أَكْثَرٍ أَهْلِ ذَلِكَ الزَّمَانِ، وَيَخْلُفُ لَهُ هَبَاءُ مِنَ النَّاسِ، يَحْسَبُ أَكْثَرُهُمْ أَنَّهُ عَلَى شَيْءٍ، وَلَيْسُوا عَلَى شَيْءٍ.
অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বক্ষণে হার্জ দেখা দিবে। সাহাবাগণ বললেনঃ হার্জ কি? রাসূল() বললেনঃ অত্যধিক হত্যাকাণ্ড। সাহাবাগণ বললেনঃ এখন আমরা যা হত্যা করছি তার চাইতেও বেশি? আমরা তো হত্যা করছি প্রতি বছর সত্তর হাজারেরও বেশি লোক। রাসূল() বললেনঃ মুর্শিকদেরকে হত্যা করা নয়। তখন তোমরা হত্যা করবে নিজেরা একে অপরকে। সাহাবাগণ বললেনঃ তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি সচল থাকবে? রাসূল () বললেনঃ সে যুগের অধিকাংশ মানুষেরই বিবেক-বুদ্ধি উঠিয়ে নেয়া হবে। তখন শুধু বেঁচে থাকবে অযোগ্য অপদার্থ জগাখিচুড়ি লোক। তাদের অধিকাংশই মনে করবে, তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু করছে; অথচ তারা ফিতনা-ফাসাদ ছাড়া আর কিছুই করছে না। (আহমাদ ৪/৪১৪ ইব্নু মাজাহ্, হাদীস ৩৯৫৯ শর'হুস্ সুন্নাহ্, হাদীস ৪২৩৪ সহীহুল্ জামি', হাদীস ২০৪৩)
তখন বিবেক-বুদ্ধি এতোই হ্রাস পাবে যে, হত্যাকারী ব্যক্তি বলতে পারবে না সে কি জন্য হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং হত্যাকৃত ব্যক্তিও জানবে না তাকে কি জন্য হত্যা করা হচ্ছে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ! لَا تَذْهَبُ الدُّنْيَا حَتَّى يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمُ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَا قُتِلَ؟ فَقِيلَ: كَيْفَ يَكُوْنُ ذَلِكَ؟ قَالَ: الْهَرْجُ الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ.
অর্থাৎ সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! দুনিয়া নিঃশেষ হবে না যতক্ষণ না এমন এক দিন আসবে যে দিন হত্যাকারী বলতে পারবে না সে কি জন্য হত্যা করছে এবং হত্যাকৃত ব্যক্তিও বলতে পারবে না তাকে কি জন্য হত্যা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করা হলোঃ সেটা আবার কি ধরনের? রাসূল () বললেনঃ এটার নামই তো হার্জ তথা অমূলক হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারী ও হত্যাকৃত উভয়ই জাহান্নামী। (মুসলিম ২৯০৮)
রাসূল () যা বলে গেছেন তা আজ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। 'উসমান এর হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক বড়ো বড়ো যুদ্ধ হয়েছে। তবে এর অনেকগুলোরই মূল যৌক্তিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমান যুগে রাজনীতির ধাপাধাপি ও অস্ত্রের ছড়াছড়ির কারণে হত্যাকাণ্ড দিন দিন আরো বেড়েই চলছে। মানুষ এখন যৎসামান্য কারণেই একে অপরকে হত্যা করছে। যা বুদ্ধিশূন্যতারই মহা পরিচায়ক।
এরপরও এতটুকু মনে করেই শান্তি পেতে হয় যে, এ উম্মত তো আল্লাহ্ তা'আলার এক বিশেষ করুণার পাত্র। আখিরাতে তাদের জন্য কোন শাস্তি নেই। এ দুনিয়াতেই তাদের যতটুকু শাস্তি। যা ফিতনা, ভূমিকম্প, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির মধ্যেই নিহিত।
আবূ বুরদাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা আমি যিয়াদের শাসনামলে বাজারে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন আমি আশ্চর্য হয়ে এক হাতের উপর অপর হাত ক্ষেপণ করছিলাম। তা দেখে জনৈক আন্সারী সাহাবীর ছেলে আমাকে বললেনঃ হে আবূ বুরদাহ্! তুমি আশ্চর্য হচ্ছো? কেন? আমি বললামঃ আমি আশ্চর্য হচ্ছি এমন এক জাতির কথা স্মরণ করে যাদের ধর্ম এক, নবী এক, দা'ওয়াত এক, হজ্জ এক, যুদ্ধ এক। তারপরও তারা একে অপরকে হত্যা করা হালাল মনে করছে। তখন সে বললোঃ এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। আমি আমার পিতা থেকে বর্ণনা করছি তিনি রাসূল () কে বলতে শুনেছেন তিনি বলেনঃ
إِنَّ أُمَّتِي أُمَّةٌ مَرْحُوْمَةٌ، لَيْسَ عَلَيْهَا فِي الْآخِرَةِ حِسَابٌ وَلَا عَذَابٌ، إِنَّمَا عَذَابُهَا فِي الْقَتْلِ وَالزَّلَازِلِ وَالْفِتَنِ.
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমার উম্মত এক করুণাপ্রাপ্ত উম্মত। আখিরাতে তাদের কোন শাস্তি ও হিসেব হবে না। তাদের শাস্তি হত্যা, ভূমিকম্প ও ফিতনার মাঝে। ('হাকিম ৪/২৫৩-২৫৪ সিলসিলাহ্ স'হীহাহ্ ২/৬৮৪-৬৮৬)