📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের আবির্ভাব

📄 নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের আবির্ভাব


নবুওয়াতের মিথ্যুক দাবিদারদের আবির্ভাব কিয়ামতের আরেকটি আলামত। তারা প্রায় তিরিশ জন। তাদের কেউ কেউ নবী যুগে আবার কেউ কেউ সাহাবাদের যুগে বেরিয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এমনিভাবে আরো বেরুবে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُبْعَثَ دَجَّالُوْنَ كَذَّابُونَ، قَرِيبًا مِنْ ثَلَاثِينَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ رَسُولُ اللَّهِ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না মিথ্যুক দাজ্জাল বের হবে। তারা প্রায় তিরিশ জন। তাদের প্রত্যেকেরই দাবি হবে, সে আল্লাহ্'র রাসূল। (বুখারী ৩৬০৯)
সাউবান থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى يَعْبُدُوا الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلَاثُونَ كَذَّابُونَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيُّ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না আমার উম্মতের কোন না কোন সম্প্রদায় মুর্শিকদের সাথে মিলিত হবে এবং মূর্তি পূজা করবে। আর আমার উম্মতের মধ্যে অচিরেই তিরিশ জন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে। যাদের প্রত্যেকেই দাবি করবে, সে এক জন নবী; অথচ আমি সর্বশেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসবেন না। (আবূ দাউদ/'আউন ১১/৩২৪ তিরমিযী/তুহফাহ্ ৬/৪৬৬)
তিরিশ জন বলতে সর্বমোট তিরিশ জনই উদ্দেশ্য নয়। বরং নবুওয়াতের দাবিদার আরো অনেক বেশি হতে পারে। তবে তিরিশ জন বলতে এমন তিরিশ জনকেই বুঝানো হচ্ছে যাদের থাকবে প্রচুর দাপট ও প্রতিপত্তি এবং যাদের অনুসারী হবে অনেক বেশি।
যারা ইতিপূর্বে নবুওয়াতের দাবি করেছে তাদের মধ্যে মিথ্যুক মুসাইলামাহ্ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিথ্যুকটি নবী () এর শেষ যুগে নবম হিজরী সনে তার বংশের এক প্রতিনিধি দলের সাথে মদীনায় এসে রাসূল () এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু বাড়ি ফিরে কিছু দিন পরই সে নবুওয়াতের দাবি করে বসে। সে বলতোঃ এ যুগের দু' নবীর মধ্যে আমি একজন। রাতের অন্ধকারে আমার নিকট আকাশ থেকে ওহী আসে। রাসূল () তার কাছে একদা চিঠিও পাঠান। এবং তাকে মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করেন। তার অনুসারী ছিলো সংখ্যায় অনেক। মুসলমানদের পক্ষে তাকে প্রতিহত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিলো। পরিশেষে হযরত আবূ বকর এর যুগে ইয়ামামাহ্'র যুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়। উক্ত যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত খালিদ বিন্ ওয়ালীদ, 'ইকরামাহ্ বিন্ আবূ জাহ্ ও শুরা'হবীল বিন্ 'হাস্নাহ্ ()। মুসাইলামাহ্ চল্লিশ হাজার সেনা বাহিনী নিয়ে সাহাবাদের মুকাবিলা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর টিকতে পারলো না। বরং বীর বাহাদুর ওয়াহশী বিন্ 'হারব এর হাতেই তার জীবন সমাধি হয়।
ইয়েমেনের আস্তয়াদ 'আন্‌ন্সীও একদা নবুওয়াতের দাবি করে। সে তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে পুরো ইয়েমেন দখল করে নেয়। রাসূল () তা জানতে পেরে সে এলাকার মুসলমানদেরকে তার মুকাবিলা করতে আদেশ করে চিঠি পাঠান। তারা রাসূল () এর আদেশে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার সুকঠিন মুকাবিলা করে তাকে তার ঘরেই হত্যা করে। এ ব্যাপারে তার জনৈকা স্ত্রী মুসলমানদেরকে বিশেষ সহযোগিতা করেন। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি ঈমানদার। তাঁর স্বামীকে হত্যা করে জোরপূর্বক আস্তয়াদ 'আন্‌ন্সী তাঁকে বিবাহ্ করে নেয়। আস্তয়াদ 'আন্‌ন্সীকে হত্যা করার পর অত্র এলাকায় ইসলাম ও মুসলমানরা পুনরায় জয়যুক্ত হয়। রাসূল() কে এ ব্যাপারে জানানোর বহু পূর্বেই তিনি ওহীর মাধ্যমে খবর পেয়ে সবাইকে আস্তয়াদ এর হত্যার ব্যাপারটি জানিয়ে দেন। তার হত্যার পূর্বে সে ইতিমধ্যেই তিন বা চার মাস ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে।
সাজাহ্ বিনতুল 'হারিস্ তাগলিবী নামক জনৈকা মহিলাও একদা রাসূল () এর ইন্তিকালের পর নবুওয়াতের দাবি করে। সে ছিলো একজন খ্রিস্টান আরব। তার অনুসারীরা যুদ্ধ করতে করতে বানু তামীম হয়ে ইয়ামামায় পৌঁছে। সেখানে পৌঁছে মহিলাটি মুসাইলামাহ্ এর সাথে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। তখন মিথ্যুক মুসাইলামাহ্ তার উপর অতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়। তবে মুসাইলামাহ্ এর মৃত্যুর পর সে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে এবং তার ইসলাম সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
তুলাইহাহ্ বিন্ খুওয়াইলিদ আসাদী নামক জনৈক ব্যক্তিও একদা নবুওয়াতের দাবি করে। মিথ্যুকটি নবম হিজরী সনে তার বংশের এক প্রতিনিধি দলের সাথে মদীনায় এসে রাসূল () এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু বাড়ি ফিরে কিছু দিন পরই সে নবুওয়াতের দাবি করে। করে বসে। তখন রাসূল () যিরার বিন্ আযওয়ারকে সে এলাকার গভর্ণর করে পাঠান। যিরার সে এলাকার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তুলাইহাহ্ এর ক্ষমতা একেবারেই হ্রাস পায়। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি বলে কিছু দিন পর মানুষের মধ্যে এ কথা প্রচার পায় যে, তাকে আর হত্যা করা যাচ্ছে না। তখন আবারো তার ভক্তবৃন্দ বেড়ে যায়। ইতিমধ্যে রাসূল () ইন্তিকাল করেন। অতঃপর আবূ বকর এর খিলাফতামলে তিনি খালিদ বিন ওয়ালীদ এর নেতৃত্বে তাকে শায়েস্তা করার জন্য একটি সেনাদল পাঠান। সে যুদ্ধে তার দল পরাজিত হলে সে তার স্ত্রীকে নিয়ে শাম দেশে পালিয়ে যায়। তবে সে পরবর্তীতে তাওবা করে আবারো ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
তাবি'য়ীদের যুগে মুগ্ধার বিন্ আবূ 'উবাইদ সাক্বাফী নামক জনৈক ব্যক্তিও একদা নবুওয়াতের দাবি করে। প্রথমতঃ সে নবী () এর বংশধরদের প্রতি অতি ভক্তি দেখায় এবং হযরত 'হুসাইন এর রক্তের প্রতিশোধ নিতে সে হয় বদ্ধ পরিকর। সে মুহাম্মাদ বিন্ 'হানাফিয়‍্যাহকে ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তার অনুসারীও ছিলো সংখ্যায় অনেক। ইনুষ যুবাইর এর খিলাফতামলে সে কুফা শহর দখল করে নেয়। অতঃপর সে নবুওয়াতের দাবি করে এবং বলেঃ জিব্রীল (আঃ) স্বয়ং তার নিকট ওহী নিয়ে অবতীর্ণ হন। মুস্ব'আব বিন্ যুবাইর এর সাথে তার কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধগুলোতে সে এতটুকুও জয়লাভ করতে পারেনি। বরং পরিশেষে তাকে হত্যাই করা হয়।
খলীফা আব্দুল মালিক বিন্ মাওয়ানের খিলাফতামলে মিথ্যুক হারিস্ বিন্ সা'ঈদও নবুওয়াতের দাবি করে। প্রথমতঃ সে খুব বুযুর্গী দেখায়। অতঃপর সে দাবি করে, সে একজন নবী। যখন সে জানতে পারলো, ব্যাপারটি খলীফা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে তখন সে সুকৌশলে আত্মগোপন করলো। কিন্তু তার বড়ো দুর্ভাগ্য এই যে, জনৈক সুকৌশলী বসরা অধিবাসী অতি অল্প সময়ে তার খাঁটি ভক্ত বনে যায়। তখন হারিস্ তার ভক্তিতে অতি আপ্লুত হয়ে সর্বদা তার জন্য নিজ দরোজা খুলে দেয়। এ সুযোগে লোকটি খলীফার কাছে সংবাদ পৌঁছিয়ে কিছু সংখ্যক অনারব সৈন্য সাথে নিয়ে তাকে আটক করে। তাকে খলীফার কাছে পৌঁছানো হলে তিনি কিছু সংখ্যক মুফতী সাহেবকে তাকে বুঝানোর দায়িত্ব অর্পণ করে। তাতে কোন ফায়েদা হয়নি বলে পরিশেষে খলীফা তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করেন।
আব্বাসী খিলাফতামলে এভাবে আরো অনেকেই নবুওয়াতের দাবি করে। তবে তা এতটুকুও ধোপে টিকেনি।
আমাদের নিকটবর্তী ভারত বর্ষেও অদূর অতীতে এক মিথ্যুক বের হয়। যার নাম ছিলো মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী। সেও নবুওয়াতের দাবি করে। সে বলেঃ আমি মাসীহ্। আমি মারইয়াম। আমি যিল্লী নবী। ইত্যাদি ইত্যাদি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় শায়েখ সানাউল্লাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ) তার কঠিন প্রতিবাদ করেন। এমনকি পরিশেষে তেরোশত ছাব্বিশ হিজরী সনে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী হযরতকে এ বলে চ্যালেঞ্জ করে যে, ঠিক আছে আমি দো'আ করছি, আমাদের মধ্যকার মিথ্যুক লোকটি যেন অন্য জন জীবিত থাকাবস্থায় মহামারীর মতো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অতি সত্বর মৃত্যু বরণ করে। দুর্ভাগ্য বশতঃ দো'আটি তার পক্ষেই কবুল হয়ে যায়। তাই সে উক্ত দো'আর তেরো মাস দশ দিন পরই কলেরা রোগে মৃত্যু বরণ করে। এখনো আছে তার অনেক অনুসারী। এভাবেই মিথ্যুকরা একের পর এক বের হতে থাকবে। যাদের মধ্যে সর্বশেষ মিথ্যুক হবে কানা দাজ্জাল। সামুরাহ্ বিন্ জুন্দুব ( থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ( একদা এক সূর্য গ্রহণের দিনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তখন তিনি বলেনঃ
وَإِنَّهُ وَاللَّهِ لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَخْرُجَ ثَلَاثُونَ كَذَّابًا، آخِرُهُمُ الْأَعْوَرُ الْكَذَّابُ
অর্থাৎ আল্লাহ্'র কসম খেয়ে বলছিঃ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না বের হবে তিরিশ জন মিথ্যুক। যাদের সর্বশেষ মিথ্যুক হবে কানা দাজ্জাল। (আহমাদ ৫/৩৯৬)
এদের মধ্যে চারজন হবে মহিলা। 'হুযাইফাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ وَدَجَّالُونَ سَبْعَةً وَعِشْرُونَ، مِنْهُمْ أَرْبَعُ نِسْوَةٍ، وَإِنِّي خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي.
অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে সাতাশ জন দাজ্জাল ও মিথ্যুক বের হবে। যাদের চার জনই হবে মহিলা; অথচ আমি সর্বশেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসবেন না। (আহমাদ ৫/১৬)

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 সার্বিক নিরাপত্তা

📄 সার্বিক নিরাপত্তা


মুসলিম এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা কিয়ামতের আরেকটি আলামত। যা ছিলো এবং আবারো আসবে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ بَيْنَ الْعِرَاقِ وَمَكَّةَ، لَا يَخَافُ إِلَّا ضَلَالَ الطَّرِيقِ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না কোন আরোহী ইরাক ও মক্কার মাঝে নির্ভয়ে ভ্রমণ করবে। তার শুধু ভয় থাকবে পথ হারিয়ে যাওয়ার। (আহমাদ ২/৩৭০-৩৭১)
সাহাবাদের যুগে এমনটি ঘটেছিলো। যখন পুরো এলাকায় ইনসাফ বিরাজ করছিলো।
'আদি' বিন্ হা'তিম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () একদা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
يَا عَدِيٌّ هَلْ رَأَيْتَ الْحَيْرَةَ؟ قُلْتُ : لَمْ أَرَهَا، وَقَدْ أُنْبِئْتُ عَنْهَا، قَالَ : فَإِنْ طَالَتْ بِكَ حَيَاةً لَتَرَيَنَّ الظَّعِينَةَ تَرْتَحِلُ مِنَ الْحِيرَةِ حَتَّى تَطُوْفَ بِالْكَعْبَةِ لَا تَخَافُ إِلَّا الله.
অর্থাৎ হে 'আদি'! তুমি কি 'হীরায় গিয়েছিলে? আমি বললামঃ যাইনি। তবে 'হীরা এলাকার নাম শুনেছি। তখন রাসূল () আমাকে বললেনঃ হে 'আদি'! তুমি বেঁচে থাকলে অবশ্যই দেখবে যে, একদা জনৈকা মুসাফির মহিলা 'হীরা থেকে রওয়ানা করে মক্কায় পৌঁছে কা'বা ঘর তাওয়াফ করবে; অথচ পথিমধ্যে সে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া আর কাউকেই ভয় পাবে না। (বুখারী ৩৫৯৫)
ইমাম মাহ্দী ও 'ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর যুগে পুরো বিশ্বে যখন আবারো ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে তখন আবারো সমাজের প্রতিটি স্তরে পূর্ণ নিরাপত্তা বিরাজ করবে।

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 ‘হিজাযের আগুন

📄 ‘হিজাযের আগুন


'হিজাযের আগুন কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَخْرُجَ نَارٌ مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ، تُضِيءُ أَعْنَاقَ الْإِبِلِ بِبُصْرَى.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না হিজায ভূখণ্ড (মক্কা-মদীনা) থেকে আগুন বের হয়। যে আগুনের আলোয় বুস্বরা এলাকার উটের গলা নযরে পড়বে। (বুখারী ৭১১৮; মুসলিম ২৯০২)
হিজরী ছয় শত চুয়ান্ন শতাব্দীর পাঁচই জুমাদাস্ সানী রোজ জুমাবার মদীনার পূর্ব দিকের হারাহ্ এর পেছনে এ আগুন দেখা যায়। যা ছিলো খুবই ভয়াবহ। অন্তত চার-পাঁচ মাইল ব্যাপী। পাথরগুলো সীসার মতো গলে গিয়ে কালো রং ধারণ করছিলো। উক্ত আগুনের আলোতে তখনকার লোকেরা তাইমা' এলাকা পর্যন্ত চলা-ফেরা করছিলো। যা ছিলো দীর্ঘ এক মাস ব্যাপী। (নিহায়াহ/আল্ফিতানু ওয়াল্ল্ফালাহিম ১/২৬-২৭)
ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমাদের যুগেই হিজরী ছয় শত চুয়ান্ন শতাব্দীতে মদীনার পূর্ব দিকের হারাহ্ এর পেছনে এ আগুন দেখা যায়। সে আগুন ছিলো খুবই ভয়াবহ। সিরিয়া ও তার আশপাশের লোকেরা এবং মদীনাবাসীরা তা অবলোকন করেছে। (শর্'হুন্ নাওয়াওয়ী ১৮/২৮)
ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বুস্বরা এলাকার একাধিক গ্রাম্য ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছে যে, তারা 'হিজাযের আগুনের আলোয় বুস্বরা এলাকার উটের গলা দেখতে পেয়েছে। (নিহায়াহ/আল্ফিতানু ওয়াল্ল্ফালাহিম ১/১৪)
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উক্ত আগুন মক্কা ও বুস্বরা এলাকার পাহাড়গুলোর উপর থেকে দেখা গিয়েছে। (তাক্বিরাহ্ পৃষ্ঠা ৬৩৬)

📘 কিয়ামতের ছোটবড় নিদর্শন সমূহ > 📄 তুরষ্কিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ

📄 তুরষ্কিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ


মুসলমানদের সাথে তুরকিস্তানীদের যুদ্ধ কিয়ামতের আরেকটি আলামত।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقَاتِلَ الْمُسْلِمُونَ التَّرْكَ، قَوْمًا وُجُوهُهُمْ كَالْمَجَانِ الْمُطْرَقَةِ، يَلْبَسُونَ الشَّعْرَ، وَيَمْشُونَ فِي الشَّعْرِ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না মুসলমানরা তুরকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করবে। তাদের চেহারা হবে চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায় তথা চওড়া ও ঝুলে পড়া গণ্ডদেশ বিশিষ্ট। তারা পশমের কাপড় ও জুতো পরিধান করবে। (মুসলিম ২৯১২)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تُقَاتِلُوا التَّرْكَ صِغَارَ الْأَعْيُنِ، حُمْرَ الْوُجُوْهِ، ذُلْفَ الْأُنُوفِ، كَأَنَّ وُجُوْهَهُمُ الْمَجَانُ الْمُطَرَّقَةُ، وَلَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تُقَاتِلُوا قَوْمًا نِعَالُهُمُ الشَّعْرُ.
অর্থাৎ কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না তোমরা তুরকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করবে। তাদের চোখ হবে ছোট। চেহারা হবে লাল। নাক হবে ছোট ও চেপটা। তাদের চেহারা যেন চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায় তথা চওড়া ও ঝুলে পড়া গণ্ডদেশ বিশিষ্ট। কিয়ামত কায়িম হবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন জাতির সাথে যুদ্ধ করবে। যাদের জুতো হবে পশমের। (বুখারী ২৯২৮, ২৯২৯; মুসলিম ২৯১২)
'আমর বিন্ তালিব থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ تُقَاتِلُوا قَوْمًا يَنْتَعِلُوْنَ نِعَالَ الشَّعْرِ، وَإِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ تُقَاتِلُوا قَوْمًا عِرَاضَ الْوُجُوهِ كَأَنَّ وُجُوهَهُمُ الْمَجَانُ الْمُطْرَقَةُ.
অর্থাৎ কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্য থেকে এটিও একটি যে, তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে যারা পশমের জুতো পরিধান করবে। কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্য থেকে এটিও আরেকটি যে, তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে যাদের চেহারা হবে চওড়া যেন চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায়। (বুখারী ২৯২৭)
সাহাবাদের যুগেই মুসলমানরা তুরকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করেছে। তখন ছিলো বনু উমাইয়াহ্ তথা মু'আবিয়া এর খিলাফতকাল।
মু'আবিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি একদা মু'আবিয়া বিন্ আবূ সুফ্ইয়ান (স) এর নিকট বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় তাঁর জনৈক গভর্নরের কাছ থেকে এ মর্মে একটি চিঠি এসেছে যে, তিনি তুরকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত করেছেন। তাদের অনেককে হত্যা করেছেন এবং প্রচুর যুদ্ধলব্ধ মালও আহরণ করেছেন। তা পড়ে মু'আবিয়া খুবই রাগান্বিত হন এবং তাঁর নিকট এ মর্মে লিখতে আদেশ করেন যে, আমি তোমার কথায় বুঝতে পেরেছি যে, তুমি অনেককে হত্যা করেছো এবং প্রচুর যুদ্ধলব্ধ মাল সংগ্রহ করেছো। আমি যেন আর না শুনি যে, তুমি তাদের সাথে যুদ্ধে মেতে উঠেছো যতক্ষণ না আমার আদেশ আসবে। বর্ণনাকারী বলেনঃ কেন হে আমীরুল মু'মিনীন! তিনি বললেনঃ আমি রাসূল (ﷺ) কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেনঃ
لَتَظْهَرَنَّ التَّرْكُ عَلَى الْعَرَبِ حَتَّى تُلْحِقَهَا بِمَنَابِتِ الشَّيْحِ وَالْقَيْصُوْمِ.
অর্থাৎ তুরকিস্তানীরা অবশ্যই আরবদের উপর জয়ী হবে। এমনকি তারা আরবদেরকে তাড়াতে তাড়াতে শী'হ্ ও ক্বাইস্থম নামক সুগন্ধময় উদ্ভিদ এলাকায় পৌঁছে দিবে। (ফাত্হুল বারী ৬/৬০৯)
বুরাইদাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসূল (ﷺ) এর নিকট বসা ছিলাম। তখন রাসূল (ﷺ) বলছিলেনঃ
إِنَّ أُمَّتِي يَسُوقُهَا قَوْمٌ عِرَاضُ الْأَوْجُهِ، صِغَارُ الْأَعْيُنِ، كَأَنَّ وُجُوهَهُمُ الْحَجَفُ - ثَلَاثَ مَرَّاتٍ - حَتَّى يُلْحِقُوهُمْ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ، أَمَّا السَّابِقَةُ الْأُولَى، فَيَنْجُو مَنْ هَرَبَ مِنْهُمْ، وَأَمَّا الثَّانِيَةُ، فَيَهْلِكُ بَعْضُ وَيَنْجُوْ بَعْضُ، وَأَمَّا الثَّالِثَةُ، فَيَصْطَلِمُوْنَ كُلُّهُمْ مَنْ بَقِيَ مِنْهُمْ، قَالُوا : يَا نَبِيَّ اللَّهِ مَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمُ التَّرْكُ، قَالَ: أَمَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيَرْبِطُنَّ خُيُولَهُمْ إِلَى سَوَارِي مَسَاجِدِ الْمُسْلِمِينَ.
অর্থাৎ আমার উম্মতদেরকে তাড়িয়ে বেড়াবে এমন এক জাতি যাদের চেহারা হবে প্রশস্ত। নাক হবে ছোট। যেন তাদের চেহারা ঢালের ন্যায়। রাসূল (ﷺ) উক্ত কথাটি তিন বার বলেছেন। এমনকি তারা আমার উম্মতদেরকে তাড়াতে তাড়াতে আরব উপদ্বীপে পৌঁছিয়ে দিবে। প্রথম দলটির কেউ কেউ পালিয়ে বাঁচবে। আর দ্বিতীয় দলটির কেউ মরবে আবার কেউ বাঁচবে। তৃতীয় দলটিকে কচু কাটা তথা একেবারেই নিঃশেষ করে দেয়া হবে। সাহাবাগণ বললেনঃ হে আল্লাহ্'র নবী! তারা কারা? তিনি বললেনঃ তারা তুরকিস্তানী। তিনি আরো বলেনঃ সে সত্তার কসম খেয়ে বলছি যাঁর হাতে আমার জীবন! তারা তাদের ঘোড়াগুলো বেঁধে রাখবে মুসলমানদের মসজিদের খুঁটির সাথে। (আহমদ ৫/৩৪৮-৩৪৯)
এ হাদীসটি শুনে বুরাইদাহ্ (রাঃ) তাঁর সাথে সর্বদা দু' তিনটি উট, সফরের সামান ও প্রয়োজনীয় পানপাত্র প্রস্তুত রাখতেন। যাতে তাদের খপ্পর থেকে সহজে পালানো যায়।
ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তাদের মাঝে ও মুসলমানদের মাঝে একটি দেয়াল ছিলো। তবে তা পরবর্তীতে একটু একটু করে খুলে দেয়া হয় এবং তাদের অনেককেই বন্দী করা হয়। তাদের ব্যাপারে কিছু মুসলিম রাষ্ট্রপতি অতি উৎসাহী হয়ে পড়ে। কারণ, তারা ছিলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও অতি সাহসী। এমনকি মু'তাসিম বিল্লাহ্'র অধিকাংশ সেনা সদস্য তারাই ছিলো। অতঃপর তারাই তাঁর রাষ্ট্রের উপর হস্তক্ষেপ করে তাঁর ছেলে মুতাওয়াক্কিল এবং আরো অন্যান্যদেরকে হত্যা করে।
এ দিকে সামানী রাষ্ট্রপতিরাও ছিলো তুরকিস্তানী। একদা মিসর, শাম এবং হিজাজও ছিলো তাদের কর্তৃত্বাধীন। তেমনিভাবে তাতারীরাও ছিলো তুরকিস্তানী। কারণ, তুরকিস্তানীদের সকল বৈশিষ্ট্যই তাদের মধ্যে পাওয়া যায়। চেঙ্গিজ খান ছিলো তাদের প্রধান এবং তাদের মধ্যে সর্বশেষ প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলো তাইমুর লঙ্ক। এক সুদীর্ঘ সময় পুরো প্রাচ্যেই চলছিলো তাদের তাণ্ডবলীলা। তারা বাগদাদে ঢুকে খলীফা মুস্তা'স্বিমকে হত্যা করে এবং শহরটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
তবে তুরকিস্তানীদের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁদের হাতেই ইসলাম ও মুসলমানদের বহু কল্যাণ সাধিত হয়। তাঁরা একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন। তাতে করে ইসলামের প্রভাব বহুলাংশেই বৃদ্ধি পায়। তাঁরা অনেকগুলো কাফির এলাকা বিজয় করেন। তার মধ্যে রোমের রাজধানী ছিলো অন্যতম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00