📄 ফিতনা সাধারণত পূর্ব দিক থেকেই আসে এবং ভবিষ্যতেও সকল ফিতনা সে দিক থেকেই আসবে
ইতিপূর্বে যত ফিতনা মুসলিম সমাজে দেখা দিয়েছে তা পূর্ব দিক থেকেই জন্ম নিয়েছে। সে দিক থেকেই শয়তানের চেলা-চামুণ্ডাদের আবির্ভাব। আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) একদা পূর্ব দিকে ফিরে বলেনঃ
أَلَا إِنَّ الْفِتْنَةَ هَاهُنَا، أَلَا إِنَّ الْفِتْنَةَ هَاهُنَا، مِنْ حَيْثُ يَطْلُعُ قَرْنُ الشَّيْطَانِ، وَفِي رِوَايَةٍ: رَأْسُ الْكُفْرِ مِنْ هَا هُنَا مِنْ حَيْثُ يَطْلُعُ قَرْنُ الشَّيْطَانِ يَعْنِي الْمَشْرِقَ.
অর্থাৎ জেনে রাখো, ফিতনা এ দিক থেকেই আসবে। ফিতনা এ দিক থেকেই আসবে। যে দিক থেকে শয়তানের চেলা-চামুণ্ডারা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কুফরির হোতারা এ দিক থেকেই জন্ম নিবে। যে দিক থেকে শয়তানের চেলা-চামুণ্ডারা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে। অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে। (বুখারী ৩১১১;; মুসলিম ২৯০৫)
আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) একদা নিম্নোক্ত দো'আ করেনঃ
اللَّهُمَّ بَارِكَ لَنَا فِي صَاعِنَا وَمُدْنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا وَيَمَنِنَا، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: يَا نَبِيَّ اللهِ! وَفِي عِرَاقِنَا، قَالَ: إِنَّ بِهَا قَرْنَ الشَّيْطَانِ، وَتَهِيجُ الْفِتَنُ، وَإِنَّ الْجَفَاءَ بِالْمَشْرِقِ.
অর্থাৎ হে আল্লাহ্ আপনি বরকত দিন আমাদের সা' ও মুদে এবং বরকত দিন আমাদের শাম ও ইয়েমেনে। জনৈক ব্যক্তি বললেনঃ হে আল্লাহ্'র নবী! আপনি বলুনঃ এবং বরকত দিন আমাদের ইরাকে। তখন রাসূল (ﷺ) বলেনঃ সেখানে শয়তানের চেলা-চামুণ্ডারা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে এবং ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি পূর্ব এলাকায়ই পারস্পরিক সকল সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। কঠোরতা দেখা দিবে। (মুস্তাস্বারুত্ তারগীবি ওয়াত্-তারহীব ৮৭)
ইরাক থেকেই বেরিয়েছে খারিজী, শিয়া, রাফিযী, বাতিনী, ক্বাদারী, জামী, মু'তাযিলী এবং বহু কুফরি কথার জন্মই তো এ পূর্ব এলাকায়। যার্দাশিয়্যাহ্ ও মানাবিয়্যাহ্ তথা আলো-আঁধার থেকেই পৃথিবীর সকল বস্তুর সৃষ্টি, মুযদাকিয়্যাহ্ তথা পৃথিবীর সকল মানুষই যে কোন মেয়ে ও যে কোন মালের সমান অংশীদার, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম, কাদিয়ানী, বাহায়ী ইত্যাদি অত্র এলাকারই জন্ম। তাতারীদের আবির্ভাবও এ দিক থেকে। এ পর্যন্তও অত্র পূর্ব এলাকা সকল ফিতনা, অকল্যাণ, বিদ'আত ও আল্লাহ্ বিরোধীদের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। ইয়াজুজ-মা'জুজ অচিরেই এ দিক থেকেই বেরুবে।
📄 ‘উসমান (রাঃ) এর হত্যা
’উমার (রাঃ) এর হত্যার পর থেকেই ফিতনা শুরু হয়ে যায়। তিনি জীবিত থাকাবস্থায় ফিতনা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠার কোন সুযোগ পায়নি। কারণ, তিনি ছিলেন ফিতনার পথে একটি সুকঠিন রুদ্ধদ্বার। অতএব যাদের অন্তরে এখনো ঈমান ঠাঁই পায়নি তারা তাঁর হত্যার পর পরই মাথা ছাড়া দিয়ে উঠেছে। 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা 'উমার (রাঃ) সাহাবাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
أَيُّكُمْ يَحْفَظُ حَدِيثَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْفِتْنَةِ؟ قَالَ: قُلْتُ: أَنَا أَحْفَظُهُ كَمَا قَالَ، قَالَ: إِنَّكَ عَلَيْهِ لَجَرِيءٌ فَكَيْفَ؟ قَالَ: قُلْتُ: فِتْنَةُ الرَّجُلِ فِي أَهْلِهِ وَوَلِدِهِ وَجَارِهِ تُكَفِّرُهَا الصَّلَاةُ وَالصَّدَقَةُ وَالْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ، قَالَ: لَيْسَ هَذِهِ أُرِيدُ، وَلَكِنِي أُرِيدُ الَّتِي تَمُوْجُ كَمَوْجِ الْبَحْرِ، قَالَ: قُلْتُ: لَيْسَ عَلَيْكَ بِهَا يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ بَأْسُ، بَيْنَكَ وَبَيْنَهَا بَابٌ مُغْلَقُ قَالَ: فَيُكْسَرُ الْبَابُ أَوْ يُفْتَحُ؟ قَالَ: قُلْتُ: لَا ، بَلْ يُكْسَرُ، قَالَ: فَإِنَّهُ إِذَا كُسِرَ لَمْ يُغْلَقُ أَبَدًا، قَالَ: قُلْتُ: أَجَلْ، فَهِبْنَا أَنْ نَسْأَلَهُ مَنِ الْبَابُ؟ فَقُلْنَا لِمَسْرُوقٍ: سَلْهُ، قَالَ: فَسَأَلَهُ، فَقَالَ: عُمَرُ، قَالَ: فَقُلْنَا: فَعَلِمَ عُمَرُ مَا تَعْنِي؟ قَالَ: نَعَمْ، كَمَا أَنَّ دُوْنَ غَدٍ لَيْلَةً، وَذَلِكَ أَنِّي حَدَّثْتُهُ حَدِيثًا لَيْسَ بِالْأَغَالِيْطِ.
অর্থাৎ তোমাদের কারোর মুখস্ত আছে কি রাসূল ﷺ এর ফিতনা সংক্রান্ত হাদীসটি? 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) বললেনঃ হাদীসটি আমার হুবহু মুখস্ত আছে। তা শুনে 'উমার (রাঃ) বললেনঃ তুমি তো এ ব্যাপারে খুবই সাহস দেখাচ্ছো! আচ্ছা, বলো তো হাদীসটি। 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আমি বললামঃ হাদীসটি এইরূপঃ কোন ব্যক্তির পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও পাড়া-প্রতিবেশী সংক্রান্ত ফিতনার কাফ্ফারা হয়ে যায় নামায, সাদাকা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধের মাধ্যমে। 'উমার (রাঃ) বললেনঃ আমি তো তোমাকে এ জাতীয় ফিতনার হাদীসটি বলতে বলিনি।
বরং আমি চাচ্ছি এমন ফিতনার হাদীসটি তুমি আমাকে বলবে যা আসবে সমুদ্রের বৃহৎ ঢেউয়ের ন্যায়। 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আমি বললামঃ এ ব্যাপারে আপনাকে কোন চিন্তাই করতে হবে না। তাতে আপনার কোন অসুবিধে নেই। আপনার মাঝে ও তার মাঝে রয়েছে একটি সুকঠিন রুদ্ধদ্বার। 'উমার (রাঃ) বললেনঃ সে দরোজাটি ভাঙ্গা হবে, না কি খোলা হবে? 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আমি বললামঃ না, খোলা হবে না বরং তা ভেঙ্গে ফেলা হবে। 'উমার (রাঃ) বললেনঃ ভেঙ্গে ফেলা হলে তো তা আর কখনোই বন্ধ করা যাবে না। 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আমি বললামঃ তা অবশ্যই। জনৈক বর্ণনাকারী বলেনঃ আমরা 'হুযাইফাহ্ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাইনি যে, সে দরোজাটি কে? তখন আমরা মারূক (রাহিমাহুল্লাহ) কে বললামঃ আপনিই তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে বলেনঃ দরোজাটি হচ্ছে 'উমার। আমরা বললামঃ 'উমার কি জানেন রুদ্ধ দরোজাটি বলতে আপনি তাঁকেই বুঝাচ্ছেন। তিনি বললেনঃ তা অবশ্যই জানেন যেমনিভাবে জানেন দিনের পর রাত্রি আসবে। কারণ, আমি তাঁকে এমন হাদীস শুনিয়েছি যা মিথ্যা নয়। (বুখারী ৫২৫, ১৪৩৫, ১৮৯৫, ৩৫৮৬, ৭০৯৬;; মুসলিম ১৪৪)
রাসূল () যা বলেছেন তা সত্যিই ঘটেছে। 'উমার কে হত্যা করা হয়েছে। দরোজাটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ফিতনা শুরু হয়ে গেছে। তার মধ্যে সর্ব প্রথম ফিতনাই হচ্ছে কিছু সংখ্যক অকল্যাণকামীদের হাতে 'উসমান এর হত্যা। তারা ইরাক ও মিসর থেকে এসে মদীনায় জড়ো হয়ে 'উসমান কে তাঁর ঘরে ঢুকেই হত্যা করে।
রাসূল () 'উসমান কে এ ব্যাপারে বহু পূর্ব থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই তো তিনি এ কঠিন মুহূর্তে বিপুল ধৈর্য ধরেছেন। সাহাবাদেরকে যে কোন ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাতে তিনি নিষেধ করে দিয়েছেন। যাতে তাঁর জন্য মুসলমানদের একটুখানি রক্তও প্রবাহিত না হয়। আবূ মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল() একদা মদীনার এক বাগান বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তখন বাগান বাড়ির দরোজাটি ছিলো বন্ধ। দরোজায় এসে হয়রত 'উসমান ঢুকার অনুমতি চাইলে রাসূল () আবূ মূসা আশ্'আরী কে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرُهُ بِالْجَنَّةِ عَلَى بَلْوَى تُصِيبُهُ.
অর্থাৎ তাকে ঢুকার অনুমতি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তবে তার ভাগ্যে রয়েছে অনেকগুলো বিপদ। (বুখারী ৩৬৭৪; মুসলিম ২৪০৩)
রাসূল () 'উসমান এর ব্যাপারে আসন্ন বিপদের কথাই উল্লেখ করেছেন; অথচ 'উমার এর উপরও বিপদ এসেছিলো। তাঁকেও হত্যা করা হয়েছিলো। কারণ, 'উসমান যতটুকু বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন ততটুকু বিপদের সম্মুখীন হননি 'উমার। যালিমরা তাঁর উপর চড়াও হয়ে তাঁকে খিলাফত ছাড়তে কঠিনভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। এমনকি তারা তাঁকে যুলুমের অপবাদও দিয়েছে।
'উসমান এর হত্যার পর মুসলমানরা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এমনকি তাদের মাঝে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘৃণিত, কাজটিও সংঘটিত হয়েছে। অতি দ্রুত আনাচে-কানাচে ফিতনা ও প্রবৃত্তি পূজা ছড়িয়ে পড়েছে। পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। মানব সমাজে অনেক মত ও পথ জন্ম নিয়েছে। এমনকি সাহাবাদের সে স্বর্ণ যুগেও কয়েকটি কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। রাসূল () এ সম্পর্কে পূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। উসামাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () একদা মদীনার এক উঁচু ঘরের ছাদে উঠে সাহাবাদেরকে বলেনঃ
هَلْ تَرَوْنَ مَا أَرَى؟ إِنِّي لَأَرَى مَوَاقِعَ الْفِتَنِ خِلَالَ بُيُؤْتِكُمْ كَمَوَاقِعِ الْقَطَرِ.
অর্থাৎ তোমরা কি দেখছো আমি যা দেখছি? আমি ফিতনার স্থানগুলো দেখছি তোমাদের ঘর-বাড়ির মাঝে। যেমনঃ বৃষ্টির জায়গাগুলো। (মুসলিম ২৮৮৫)
আধিক্য এবং ব্যাপকতার দিক বিবেচনা করেই ফিতনার স্থানগুলোকে বৃষ্টির স্থানগুলোর সাথে তুলনা করা হয়েছে অর্থাৎ ফিতনা বেশি আকারে দেখা দিবে এবং সকল মানুষকে ঘিরে নিবে। এরই মাধ্যমে সাহাবাদের মধ্যকার কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমনঃ জামাল বা উষ্ট্র যুদ্ধ, সিফ্ফীন যুদ্ধ, হারাহ্ যুদ্ধ, 'উসমান এর হত্যা, 'হুসাইন এর হত্যা ইত্যাদি ইত্যাদি।
📄 উষ্ট্রের যুদ্ধ
'উসমান কে হত্যা করার পর যে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো তা ছিলো উষ্ট্র যুদ্ধ। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো 'আলী এবং 'আয়িশা, ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) এর মাঝে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটি ছিলো এরূপঃ যখন 'উসমান কে হত্যা করা হলো তখন হত্যাকারীরা 'আলী এর নিকট এসে বললোঃ আপনার হাত খানি বাড়িয়ে দিন। আমরা আপনার হাতে বায়'আত করবো। তিনি বললেনঃ সবাই এ ব্যাপারে প্রথমে পরামর্শ করে নিক তারপর। তখন উপস্থিত কেউ কেউ বললোঃ হত্যাকারীরা যখন নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবে এবং এ দিকে কোন খলীফাও থাকবে না তখন পুরো জাতির মধ্যে মহা দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে অবশ্যই। তাই আপনি সবাইকে বায়'আত করে নিন।
এভাবেই তারা 'আলী কে বায়'আত গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছিলো। অতএব তিনি চাপের মুখে তাদেরকে এবং আরো অন্যান্যদেরকে বায়'আত করে নেন। যারা তাঁর হাতে বায়'আত করেছিলো তাদের মধ্যে ছিলেন ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)। বায়'আত শেষে তাঁরা 'উমরাহ্ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করলেন। ইতিমধ্যে তাঁরা মক্কায় থাকাবস্থায় 'আয়িশা এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে তাঁরা 'উসমান এর হত্যার ব্যাপারে বিশদ আলোচনা পূর্বক বসরায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বসরায় গিয়ে তাঁরা 'আলী এর নিকট 'উসমান এর হত্যাকারীদেরকে তাঁদের হাতে সোপর্দ করার আবেদন করেন। 'আলী তাঁদের আবেদনে এতটুকুও সাড়া দেননি। বরং তিনি চাচ্ছিলেন, 'উসমান এর যে কোন ওয়ারিশ তাঁর নিকট এ ব্যাপারে আবেদন করুক। আবেদনের পরিপেক্ষিতে কারোর ব্যাপারে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি শুধু তার থেকেই ক্বিস্বাস নিবেন। সুতরাং এ দিকে তাঁরা এ ব্যাপারে পরস্পর মতবিরোধ করছিলেন। অন্য দিকে হত্যাকারীরা ভয় পাচ্ছিলো, পরিশেষে যদি তাদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই হয়ে যায় তা হলে তাদের আর কোন রক্ষা নেই। তাই তারা পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দিলো।
খুব অচিরেই যে 'আলী ও 'আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর মাঝে কিছু একটা ঘটে যাবে এ ব্যাপারে প্রথম থেকেই রাসূল 'আলীকে সঙ্কেত দিয়েছেন।
আবূ রাফি' থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা রাসূল () 'আলী কে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
إِنَّهُ سَيَكُونَ بَيْنَكَ وَبَيْنَ عَائِشَةَ أَمْرُ ، قَالَ : أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَأَنَا أَشْقَاهُمْ يَا رَسُولَ اللهِ! قَالَ: لَا ، وَلَكِنْ إِذَا كَانَ ذَلِكَ فَارْدُدُهَا إِلَى مَأْمَنِهَا.
অর্থাৎ তোমার মাঝে ও 'আয়িশার মাঝে খুব অচিরেই কিছু একটা ঘটে যাবে। তখন 'আলী বললেনঃ আমিই সেই ব্যক্তি হে আল্লাহ্'র রাসূল ()!? রাসূল() বললেনঃ হ্যাঁ, তুমিই। 'আলী) বললেনঃ তা হলে আমিই তো তখনকার সব চাইতে বড়ো দুর্ভাগা ব্যক্তি। রাসূল () বললেনঃ না, তবে এমন কিছু ঘটলে তুমি তাকে তখন নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দিবে। (আহমাদ ৬/৩৯৩)
'আয়িশা, ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) কস্মিনকালেও যুদ্ধের জন্য বের হননি। তাঁরা বের হয়েছিলেন মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক মীমাংসা সাধন করতে।
ক্বাইস্ বিন্ আবূ 'হাযিম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ 'আয়িশা যখন বনূ 'আমিরদের এলাকায় পৌঁছেন তখন কিছু কুকুর তাঁকে দেখে ডাক ছাড়তে শুরু করে। তখন তিনি উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এটি কোন এলাকা? তারা বললোঃ এটি 'হাউআব নামক এলাকা। যা বসরার অতি নিকটবর্তী। তখন তিনি বললেনঃ তা হলে আমি আর যাচ্ছি না। তখন যুবায়ের বললেনঃ না, আপনার এখন আর পেছনে যাওয়া হচ্ছে না। আপনি আরো সামনে চলুন। তখন লোকেরা আপনাকে দেখবে। হয়তো বা আপনার মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের মাঝে মীমাংসা সাধন করবেন। তবুও 'আয়িশা বললেনঃ না, আমি আর যাচ্ছি না। আমি রাসূল () কে বলতে শুনেছি তিনি বলেনঃ
كَيْفَ بِإِحْدَاكُنَّ إِذَا نَبَحَتْهَا كِلَابُ الْحَوْابِ.
অর্থাৎ তোমাদের কোন এক জনের তখন কি অবস্থা হবে যখন তাকে দেখে 'হাউআবের কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করবে। ('হাকিম ৩/১২০)
'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা নবী () নিজ স্ত্রীদেরকে বলেনঃ
أَيَّتُكُنَّ صَاحِبَةُ الْجَمَلِ الْأَدْبَبِ، تَخْرُجُ حَتَّى تَنْبَحَهَا كِلَابُ الْحَوْابِ يُقْتَلُ عَنْ يَمِينِهَا وَعَنْ شِمَالِهَا قَتْلَى كَثِيرَةً، وَتَنْجُو مِنْ بَعْدِ مَا كَادَتْ.
অর্থাৎ তোমাদের মধ্য থেকে কে হবে সে দিন চেহারায় বেশি পশম বিশিষ্ট উটের আরোহিণী। সে ঘর থেকে বেরুবে। পথিমধ্যে তাকে দেখে 'হাউআবের কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করবে। তার ডানে-বাঁয়ের অনেকগুলো লোককে হত্যা করা হবে। এরপরই সে এ কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে। (ফাতহুল বা'রি ১৩/৫৫)
'আয়িশা যখনই উক্ত ঘটনার কথা স্মরণ করতেন তখনই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন। এমনকি তাঁর ওড়না চেখের পানিতে ভিজে যেতো। ত্বাল্'হাহ্, যুবায়ের এবং 'আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) ও এ ব্যাপারে কম লজ্জিত হননি।
'আলী কখনো 'উসমান কে হত্যার ব্যাপারে রাজি ছিলেন না। না তিনি তাঁকে হত্যার ব্যাপারে হত্যাকারীদেরকে কোন ধরনের সহযোগিতা দিয়েছেন। এমনকি তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বহুবার আল্লাহ্ তা'আলার কসম খেয়ে এ ব্যাপারে তাঁর অসম্পৃক্ততা ঘোষণা করেন। অন্য দিকে হত্যাকারীরা ভয় পাচ্ছিলো, পরিশেষে যদি তাদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই হয়ে যায় তা হলে তাদের আর কোন রক্ষা নেই। তাই তারা রাতের অন্ধকারে ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর ঘাঁটির উপর আক্রমণ করে বসে। তখন ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ধারণা করছিলেনঃ 'আলী-ই হয়তো বা তাদের উপর আক্রমণ করে বসেছেন। তাই তাঁরা নিজ আত্মরক্ষায় মেতে উঠলেন। এ দিকে 'আলী -ও মনে করলেনঃ হয়তো বা 'আয়িশা, ত্বাল্'হাহ্ ও যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) ই তাঁর উপর আক্রমণ করে বসেছেন। তাই তিনি নিজ আত্মরক্ষায় মেতে উঠলেন। এমনিভাবেই তাঁদের সবার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধটি ঘটে গেলো। 'আয়িশা তখন ছিলেন উষ্ট্রারোহিণী। না তিনি যুদ্ধ করেছেন। না তিনি যুদ্ধের অর্ডার দিয়েছেন।
📄 সিফ্ফীনর যুদ্ধ
উষ্ট্র যুদ্ধ ছাড়া সাহাবাদের মধ্যে আর যে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছে তা হচ্ছে স্বিফ্ফীন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের প্রতিও রাসূল (ﷺ) তা সংঘটিত হওয়ার বহু পূর্বেই সাহাবাদেরকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَقْتَتِلُ فِئَتَانَ عَظِيمَتَانِ، يَكُونُ بَيْنَهُمَا مَقْتَلَةٌ عَظِيمَةٌ دَعْوَاهُمَا وَاحِدَةً.
অর্থাৎ কিয়ামত আসবে না যতক্ষণ না দু'টি বড় দল পরস্পর যুদ্ধ করবে। যুদ্ধটি হবে খুবই ভয়াবহ এবং তাদের দাবিও হবে একই। (বুখারী ৩৬০৮, ৩৬০৯, ৬৯৩৫, ৭১২১; মুসলিম ১৫৭)
তবে উভয় দলের মধ্যে 'আলী-এর দলটিই ছিলো সত্যের উপর।
যায়েদ বিন্ ওয়াহ্ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা আমরা 'হুযাইফাহ্-এর নিকট অবস্থান করছিলাম। তখন তিনি আমাদেরকে বললেনঃ তোমাদের কি অবস্থা হবে?!; অথচ তোমরা একে অপরকে হত্যা করছো। তখন উপস্থিত সবাই বললোঃ তা হলে আপনি আমাদেরকে এ মুহূর্তে কি করতে বলছেন? তিনি বললেনঃ
انْظُرُوا الْفِرْقَةَ الَّتِي تَدْعُو إِلَى أَمْرٍ عَلِي، فَالْزَمُوْهَا، فَإِنَّهَا عَلَى الْحَقِّ.
অর্থাৎ তোমরা 'আলী-এর পক্ষকে সমর্থন করবে এবং তাদের সাথেই সর্বদা থাকবে। কারণ, তারাই সত্যের উপর। (ফাতহুল বা'রি ১৩/৮৫)
পরিশেষে হিজরী ছত্রিশ সনের জিলহজ্জ মাসে 'আলী ও মু'আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর উভয় পক্ষের মাঝে 'ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকা রিক্বার পার্শ্ববর্তী ফুরাত নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত সিফফীন নামক এলাকায় এক মহা যুদ্ধ বেধে যায়। তাতে একে অপরের উপর সর্বমোট সত্তরটি আক্রমণ করে। যাতে প্রাণ হারায় প্রায় সত্তর হাজার মানুষ।
'আলী ও মু'আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কখনো এ যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। তবে প্রত্যেক পক্ষেই ছিলো কিছু প্রবৃত্তিপূজারী মানুষ। যেমনঃ আন্তার নাখা'য়ী, হাশিম বিন্ 'উদ্বাহ্ আল-মিরক্কাল, আব্দুর রহমান বিন্ খালিদ বিন্ ওলীদ, আবূ ল-আ'ওয়ার আস-সুলামী প্রমুখ। তারা অন্যদেরকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতো। তাদের কেউ ছিলো 'উসমান ও মু'আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর অতি ভক্ত তথা 'উসমান এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তারা 'আলী কে এতটুকুও সহ্য করতে পারতো না। আবার কেউ ছিলো 'আলী এর অতি ভক্ত। তারা মু'আবিয়া কে এতটুকুও সহ্য করতে পারতো না। এভাবেই পরস্পরের মাঝে যুদ্ধ বেধে যায় এবং তারা 'আলী ও মু'আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
যুদ্ধটি নিয়মতান্ত্রিক ছিলো না। বরং তা ছিলো জাহিলী যুদ্ধের ন্যায়। এতে তাদের উদ্দেশ্য ছিলো এলোমেলো। চিন্তা-চেতনা ছিলো বিভিন্ন ধরনের। এ জন্যই ইমাম যুহরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ফিতনা শুরু হয়েছে। তখনো সাহাবাদের অনেকেই জীবিত। তাঁরা এ ব্যাপারে একমত ছিলেন যে, কুর'আনের অপব্যাখ্যা করে যত রক্তই প্রবাহিত হয়েছে, যত সম্পদই লুট-পাট হয়েছে এবং যত ইয্যতই লুণ্ঠিত হয়েছে তা সবই অযথা। এর কোন বিচার নেই। তা জাহিলী যুগের বিশৃঙ্খলার ন্যায়।