📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 জান্নাতের বিভিন্ন স্তর

📄 জান্নাতের বিভিন্ন স্তর


জান্নাতীদের মান মর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর দান করা হবে। এমনিভাবে মুজাহিদদের জন্য একশত স্তর থাকবে। অন্যান্য ঈমানদার ও আলিম উলামাদের জন্য থাকবে বিভিন্ন স্তর।
এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
﴿ وَ مَن يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَىٰ ﴾ ﴿طه: ٧٥﴾
“আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা”। [সূরা ত্বাহা, আয়াত: ৭৫]
﴿ يَرْفَعِ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴾ ﴿المجادلة: ١١﴾
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত”। [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১১]
﴿ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾ ﴿ دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةٌ وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴾ [النساء: ٩٥، ٩٦]
“নিজদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বসে থাকাদের ওপর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ জিহাদকারীদেরকে বসে থাকাদের ওপর মহা পুরস্কার দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। [সূরা আন নিসা, আয়াত: ৯৫-৯৬]
এ সকল আয়াতের সবগুলোতে আমরা দেখতে পেলাম, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে মর্যাদার বিভিন্ন স্তর রেখেছেন। তিনি নবী ও রাসূলদের পর সাধারণ মানুষদের মধ্য থেকে আলিম-উলামা ও আল্লাহর পথে যারা জিহাদ করেছেন তাদের বিশেষ ও সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন।
জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ، وَأَقَامَ الصَّلاةَ، وَصَامَ رَمَضَانَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الجَنَّةَ، جَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ جَلَسَ فِي أَرْضِهِ الَّتِي وُلِدَ فِيهَا»، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَلَا نُبَشِّرُ النَّاسَ؟ قَالَ: «إِنَّ فِي الجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ ، أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ، فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الجَنَّةِ - أَرَاهُ - فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ» »
"যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে আর সালাত কায়েম করবে ও রোযা পালন করবে আল্লাহর উপর দায়িত্ব হলো, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সে ব্যক্তি তার জন্ম ভূমিতে বসে থাকুক বা আল্লাহর পথে জিহাদ করুক (উভয় অবস্থাতে সে জান্নাতের অধিকারী হবে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি এ সুসংবাদটি মানুষকে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: অবশ্যই জান্নাতে একশ স্তর রয়েছে বিভিন্ন মর্যাদার। যা আল্লাহ সে সকল লোকদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছে। এক একটি মর্যাদার ব্যপ্তি হবে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্বের সম পরিমাণ। যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করবে তখন তোমরা জান্নাতুল ফেরদাউস চাবে। কারণ এটা জান্নাতের মধ্যবর্তী ও সুউচ্চ মর্যাদার স্থান। এর উপর রয়েছে দয়াময় আল্লাহর আরশ"। ⁷³
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পারি
এক. যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে, সালাত আদায় করবে ও সাওম পালন করবে তারা জান্নাতে যাবে।
দুই. যারা আল্লাহর পথে তাঁর দীন সুউচ্চ করার লক্ষ্যে যুদ্ধ ও জিহাদ করবে তাদের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি।
তিন. আল্লাহ তা'আলার কাছে জান্নাতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তথা ফেরদাউস লাভ করার জন্য প্রার্থনা করতে রাসূলের নির্দেশ।
চার. এ হাদীসটি মুসলিমদের জন্য একটি বিরাট সুসংবাদ। সাহাবায়ে কেরাম হাদীসটি শোনার পর বলেছেন, এ সংবাদটি কি আমরা সকলের কাছে প্রচার করবো না? তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বলেননি। অন্য বর্ণনায় আছে তিনি বলেছেন, তাহলে লোকদের অলসতায় পেয়ে বসবে। মোট কথা হলো, যেখানে ও যখন হাদীসটি বললে লোকদের অলসতায় পেয়ে বসবে না, বরং ঈমান ও ইসলামের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন, তখন হাদীসটি বলা উচিৎ। আর যখন দেখা যাবে হাদীসটি বললে এ সমাজের লোকদের মধ্যে অলসতা এসে যাবে তখন না বলা উত্তম হবে।
আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« ﴿يُقَالُ يَعْنِي لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ : اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا» »
"আল কুরআনের ধারক-বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাকো আর উপরে উঠতে থাকো এবং সামনে অগ্রসর হও। যেমন তুমি দুনিয়াতে কুরআন পাঠে সামনে অগ্রসর হয়েছিলে। তোমার মর্যাদা সেখানে, যেখানে তুমি তোমার সর্বশেষ আয়াতটি পাঠ করবে।"⁷⁴
এভাবে আল-কুরআনের ধারক-বাহক, হাফেয, ক্বারী, আলিম, কুরআনের বাণী প্রচারক ও মুফাসসিরদের জান্নাতে সুউচ্চ মর্যাদা দান করা হবে।

টিকাঃ
⁷³ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৯০。
⁷⁴ তিরমিযী, হাদীস নং ২৯১৪, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষসমূহ

📄 জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষসমূহ


এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِّن فَوْقِهَا غُرَفٌ مَّبْنِيَّةٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَ ﴾ [الزمر: ٢٠]
“কিন্তু যারা নিজদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে কক্ষসমূহ যার উপর নির্মিত আছে আরো কক্ষ। তার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর ওয়াদা; আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২০]
এ আয়াত দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, জান্নাতবাসীদের জন্য জান্নাতে প্রাসাদ ও কক্ষসমূহ প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।
হাদীসে এসেছে: আবু সায়ীদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ، كَمَا يَتَرَاءَوْنَ الكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الغَابِرَ فِي الأُفُقِ، مِنَ المَشْرِقِ أَوِ المَغْرِبِ، لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُمْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تِلْكَ مَنَازِلُ الْأَنْبِيَاءِ لَا يَبْلُغُهَا غَيْرُهُمْ، قَالَ: بَلَى وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، رِجَالٌ آمَنُوا بِاللَّهِ وَصَدَّقُوا الْمُرْسَلِينَ »
"জান্নাতের কক্ষে অবস্থানরত জান্নাতবাসীরা অন্যান্য জান্নাতবাসীদের দেখবে। যেমন তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অস্তগামী নক্ষত্রসমূহকে দেখতে পাও। তাদের পরস্পরের মর্যাদার ভিন্নতা সত্বেও তোমরা দেখতে পাবে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ইয়ার রাসূলাল্লাহ! রাসূলদের এই যে মর্যাদা রয়েছে তাতে অন্য কেহ কি অভিষিক্ত হতে পারবে? তিনি বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্বার শপথ ঐ সকল মানুষেরা সেই মর্যাদা পাবে যারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও রাসূলদের সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে"। ⁷⁵
আমরা যেমন ভুপৃষ্ঠে অবস্থান করে আকাশের সব তারকাগুলো দেখতে পাই। কোনটা আছে পূর্ব প্রান্তে, কোনটা পশ্চিম প্রান্তে আবার কোনটি মধ্য আকাশে থাকে। কোনটা দেখতে আমাদের বেগ পেতে হয় না। এমনিভাবে জান্নাতের কক্ষ ও অধিবাসীদের দেখা যাবে।

টিকাঃ
⁷⁵ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৫৬。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 জান্নাতবাসীদের খাবার-দাবার

📄 জান্নাতবাসীদের খাবার-দাবার


এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
﴿يَعِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ الَّذِينَ ءَامَنُوا بِتَايَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ تُحْبَرُونَ ﴾ ﴿ يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴾ ﴿ وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِّنْهَا تَأْكُلُونَ ﴾ [الزخرف: 73، 68]
"হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে ঈমান এনেছিল এবং যারা ছিল মুসলিম। তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। আর এটিই জান্নাত, নিজদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে অনেক ফলমূল, যা থেকে তোমরা খাবে। [সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৬৮-৭৩]
এ আয়াতগুলো থেকে আমরা যা জানতে পারলাম:
এক. জান্নাতবাসীদের কোনো ভয় থাকবে না আর থাকবে না কোনো দুঃশ্চিন্তা। দুনিয়ার জীবনে মানুষ যত সম্পদের অধিকারী হোক না কেন আর সে যতই সুখী হোক, তার ভয় থাকে, থাকে দু:শ্চিন্তা। কিন্তু জান্নাতে এক অনন্য বৈশিষ্ট হলো, সেখানে কোনো পেরেশানী, দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ, দুঃশ্চিন্তা ভয় কিছুই থাকবে না।
দুই. ঈমান ও ইসলাম দুটো দুই বিষয়। যেমন, এ আয়াতে দুটোকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন. যারা জান্নাতের অধিকারী হবে তাদের স্ত্রী, স্বামী ও সন্তান-সন্তদি যদি ঈমানদার ও সৎকর্মশীল হয় তাহলে তারা জান্নাতে একত্রেই থাকবে। যেমন এ আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীসহ জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে বলে বাণী এসেছে।
অন্য আয়াত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
﴿ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ كُلُّ أَمْرِي بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ وَأَمْدَدْنَهُم بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ * يَتَنَازَعُونَ فِيهَا كَأْسًا لَّا لَغْوٌ فِيهَا وَلَا تَأْثِيمٌ * وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَّكْنُونٌ وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ ﴾ [الطور : ٢٠، ٢৫]
“আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্তুতি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোনো অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে। আর আমি তাদেরকে অতিরিক্ত দেব ফলমূল ও গোশত যা তারা কামনা করবে। তারা পরস্পরের মধ্যে পানপাত্র বিনিময় করবে; সেখানে থাকবে না কোনো বেহুদা কথাবার্তা এবং কোনো পাপকাজ। আর তাদের সেবায় চারপাশে ঘুরবে বালকদল; তারা যেন সুরক্ষিত মুক্তা। আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তারা বলবে, পূর্বে আমরা আমাদের পরিবারের মধ্যে শঙ্কিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন”। [সূরা আত- তুর, আয়াত: ২১-২৭]
চার. জান্নাতে মনে যা চায় ও চোখ যা দেখতে চায় তার সবকিছুই থাকবে। এমন নয় যে শুধু আল-কুরআন ও হাদীসে যা উল্লেখ করা হয়েছে শুধু সেগুলোই থাকবে। শুধু বাগান, নদী, গাছ, ফল-মুলই নয়। যা চায় মনে তার সবকিছু পাওয়া যাবে সেখানে। দুনিয়াতে একজন মানুষ যত প্রভাবশালী, ক্ষমতার অধিকারী ও ধন-সম্পদের মালিক হোক না কেন, মনে যা চায় সে তা পায় না। সে তা করতে পারে না; কিন্তু জান্নাত এ রকম নয়। সেখানে নেই কোনো সীমাবদ্ধতা।
জান্নাতে খাবার দাবার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿ وَالسَّبِقُونَ السَّبِقُونَ * أُوْلَبِكَ الْمُقَرَّبُونَ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ثُلَّةٌ مِّنَ الْأَوَّلِينَ وَقَلِيلٌ مِّنَ الْآخِرِينَ عَلَى سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ مُّتَّكِينَ عَلَيْهَا مُتَقَابِلِينَ يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ تُخَلَّدُونَ بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيقَ وَكَأْسٍ مِّن مَّعِينٍ لَّا يُصَدَّعُونَ عَنْهَا وَلَا يُنزِفُونَ * وَفَاكِهَةٍ مِّمَّا يَتَخَيَّرُونَ وَلَحْمِ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ وَحُورٌ عِينٌ * كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤ الْمَكْنُونِ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا تَأْثِيمًا إِلَّا قِيلًا سَلَامًا سَلَامًا وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ فِي سِدْرٍ تَحْضُودٍ وَطَلْحٍ مَّنضُودٍ وَظِلٌ مَّمْدُودٍ وَمَاءٍ مَّسْكُوبٍ وَفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ لَّا مَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَةٍ وَفُرُشٍ مَّرْفُوعَةٍ إِنَّا أَنشَأْنَهُنَّ إِنشَاءً فَجَعَلْنَهُنَّ أَبْكَارًا عُرُبًا أَتْرَابًا لِأَصْحَابِ الْيَمِينِ ثُلَّةٌ مِّنَ الْأَوَّلِينَ وَثُلَةٌ مِّنَ الْآخِرِينَ ﴾ [الواقعة: ١٠، ٤٠]
"আর অগ্রগামীরাই অগ্রগামী। তারাই সান্নিধ্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নিআমতপূর্ণ জান্নাতসমূহে। বহুসংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে, আর অল্পসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে। স্বর্ণ ও দামী পাথরখচিত আসনে! তারা সেখানে হেলান দিয়ে আসীন থাকবে মুখোমুখি অবস্থায়। তাদের আশ-পাশে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা, পানপাত্র, জগ ও প্রবাহিত ঝর্ণার শরাবপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে। তা পানে না তাদের মাথা ব্যথা করবে, আর না তারা মাতাল হবে। আর (ঘোরাফেরা করবে) তাদের পছন্দ মতো ফল নিয়ে। আর পাখির গোশত নিয়ে, যা তারা কামনা করবে। আর থাকবে ডাগরচোখা হুর। যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা। তারা যে আমল করত তার প্রতিদানস্বরূপ। তারা সেখানে শুনতে পাবে না কোনো বেহুদা কথা এবং না পাপের কথা; শুধু এই বাণী ছাড়া, সালাম, সালাম। সালাম। আর ডান দিকের দল; কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! তারা থাকবে কাঁটাবিহীন কুলগাছের নিচে, আর কাঁদিপূর্ণ কলাগাছের নিচে, আর বিস্তৃত ছায়ায়, আর সদা প্রবাহিত পানির পাশে, আর প্রচুর ফলমূলে, যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না। (তারা থাকবে) সুউচ্চ শয্যাসমূহে; নিশ্চয় আমি হুরদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব। অতঃপর তাদেরকে বানাব কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়সী। ডানদিকের লোকদের জন্য। তাদের অনেকে হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে। আর অনেকে হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে”। [সূরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ১০-৪০]
হাদীসে এসেছে: জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
« إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَأْكُلُونَ فِيهَا وَيَشْرَبُونَ، وَلَا يَغْفُلُونَ وَلَا يَبُولُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَمْتَخِطُونَ قَالُوا: فَمَا بَالُ الطَّعَامِ؟ قَالَ: «جُشَاءُ وَرَشْعُ كَرَشْحِ الْمِسْكِ، يُلْهَمُونَ التَّسْبِيحَ وَالتَّحْمِيدَ، كَمَا تُلْهَمُونَ النَّفَسَ» »
"জান্নাতবাসীরা জান্নাতে খাবে, পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলাবে না, প্রসাব করবে না, পায়খানা করবে না, বমি করবে না। এ কথা শুনে সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, তাহলে খাবার দাবার কোথায় যাবে? তিনি বললেন, ঢেকুর হয়ে মৃগনাভীর সুগন্ধ নিয়ে বের হয়ে যাবে। যেভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া হয়, এভাবেই জান্নাতবাসীরা আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ ও তাহমীদ করতে থাকবে"।⁷⁶
এ হাদীসটি থেকে আমরা জানতে পারলাম:
এক. জান্নাতবাসীরা খাওয়া-দাওয়া করবে কিন্তু এ জন্য তাদের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে না।
দুই. তাদের পানাহারকৃত বস্তুগুলো ঢেকুরের সাথে বের হয়ে যাবে। আর এ ঢেকুর কোনো বিরক্তির কারণ হবে না। বরং সুগন্ধ ছড়াবে।
তিন, জান্নাতবাসীরা আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা বা তাহমীদ ও পবিত্রতা বর্ণনা বা তাসবীহ আদায় করবে। কিন্তু এ জন্য তাদের আলাদা কোনো পরিশ্রম করতে হবে না। যেমন আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কোনো পরিশ্রম বা ইচ্ছা করতে হয় না।

টিকাঃ
⁷⁶ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৩৫。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 জান্নাতের তরু

📄 জান্নাতের তরু


হাদীসে এসেছে: আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« فِي الْجَنَّةِ خَيْمَةٌ مِنْ لُؤْلُؤًةٍ مُجَوَّفَةٍ، عَرْضُهَا سِتُّونَ مِيلًا، فِي كُلِّ زَاوِيَةٍ مِنْهَا أَهْلُ، مَا يَرَوْنَ الْآخَرِينَ، يَطُوفُ عَلَيْهِمِ الْمُؤْمِنُ »
“জান্নাতে মুমিনদের জন্য মুক্তা খচিত তাবু থাকবে। যার প্রশস্ততা হবে ষাট মাইল। সেখানে মুমিনদের পরিবার পরিজন একত্র হবে ও পরস্পরে দেখা সাক্ষাত করবে”। ⁷⁷
জান্নাতে যেমন বিশাল বিশাল অট্টালিকা থাকবে তেমনি থাকবে বিশাল বিশাল তাবু। যখন যেমন মনে চাবে জান্নাতীরা তা ব্যবহার করবে।

টিকাঃ
⁷⁷ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৩৮。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00