📄 যারা লোক দেখানোর জন্য নেক আমল করতো কিয়ামতে তাদের বিচার
হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন,
« إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ، وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ ، وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمٌ ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِيُّ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ: هُوَ جَوَادٌ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ، ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ»
"কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি যে শহীদ হয়েছিল। তাকে হাজির করা হবে এবং আল্লাহ তার নিয়ামতের কথা তাকে বলবেন। এবং সে তার প্রতি সকল নিয়ামত চিনতে পারবে। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন তুমি কি কাজ করে এসেছ?
সে বলবে, আমি তোমার পথে যুদ্ধ করেছি, শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন: তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তো যুদ্ধ করেছ লোকে তোমাকে বীর বলবে এ উদ্দেশ্যে। আর তা বলা হয়েছে। অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হবে, এবং তাকে টেনে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারপর এমন ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে ও অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন তিলাওয়াত করেছে। তাকে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সে স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞেস করবেন কি কাজ করে এসেছ? সে বলবে আমি জ্ঞান অর্জন করেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং আপনার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি জ্ঞান অর্জন করেছ এ জন্য যে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলবে। কুরআন তিলাওয়াত করেছ এ উদ্দেশ্যে যে, লোকে তোমাকে কারী বলবে। আর তা বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে তাকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য। তারপর বিচার করা হবে এমন ব্যক্তির, যাকে আল্লাহ দুনিয়াতে সকল ধরণের সম্পদ দান করেছিলেন। তাকে হাজির করে আল্লাহ নি'আমতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সে সকল নেওয়ামত স্মরণ করবে। আল্লাহ বলবেন, কি করে এসেছ? সে বলবে, আপনি যে সকল খাতে খরচ করা পছন্দ করেন আমি তার সকল খাতে সম্পদ ব্যয় করেছি, কেবল আপনারই জন্য। আল্লাহ বলবেন তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি সম্পদ এ উদ্দেশ্যে খরচ করেছ যে, লোকে তোমাকে দানশীল বলবে। আর তা বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে, এবং তাকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে"। ⁴⁵
টিকাঃ
⁴⁵ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৫。
📄 হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম তুমি আমার সেবা করো নি
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : يَا ابْنَ آدَمَ مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِي، قَالَ: يَا رَبِّ كَيْفَ أَعُودُكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ، قَالَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِي فُلَانًا مَرِضَ فَلَمْ تَعُدْهُ، أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ عُدْتَهُ لَوَجَدْتَنِي عِنْدَهُ؟ يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَطْعَمْتُكَ فَلَمْ تُطْعِمْنِي، قَالَ: يَا رَبَّ وَكَيْفَ أُطْعِمُكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ، قَالَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّهُ اسْتَطْعَمَكَ عَبْدِي فُلَانٌ، فَلَمْ تُطْعِمْهُ؟ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ أَطْعَمْتَهُ لَوَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِي، يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَسْقَيْتُكَ، فَلَمْ تَسْقِنِي، قَالَ: يَا رَبِّ كَيْفَ أَسْقِيكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ، قَالَ: اسْتَسْقَاكَ عَبْدِي فُلَانٌ فَلَمْ تَسْقِهِ، أَمَا إِنَّكَ لَوْ سَقَيْتَهُ وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِي»
"কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে মানব সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমার সেবা করো নি। মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! কীভাবে আমি আপনার সেবা করব, আপনিতো সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো? তুমি তো তাকে সেবা করো নি। তুমি কি জানতে না, যদি তার সেবা করতে তাহলে তার কাছে আমাকে পেতে? হে মানব সন্তান! আমি খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি।
মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভূ! কীভাবে আমি আপনাকে খাদ্য দেব, আপনিতো সৃষ্টিকুলের রব? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা খাবার চেয়েছিলো? তুমি তো খাবার দাওনি। তুমি কি জানতে না, যদি তাকে খাবার দিতে তাহলে তা আমার কাছে পেতে? হে মানব সন্তান! আমি পানি পান করতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! কীভাবে আমি আপনাকে পানী পান করাবো, আপনিতো সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা পিপাসিত ছিল? তুমি তো তাকে পানী পান করাও নি। তুমি কি জানতে না, যদি তাকে পানী পান করাতে তাহলে তা আমার কাছে পেতে?"⁴⁶
এ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম, কেহ অসুস্থ হয়ে পড়লে, ক্ষুধা-পিপাসায় কষ্ট পেলে সেবা ও সাহায্য পাওয়া তার একটি অধিকার। সামর্থ থাকা সত্বেও এ অধিকার আদায় না করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জওয়াব দিতে হবে।
টিকাঃ
⁴⁶ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৯。
📄 জান্নাত ও জাহান্নামে এক মুহূর্তের অনুভূতি
আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَيُصْبَغُ فِي النَّارِ صَبْغَةً، ثُمَّ يُقَالُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا ، وَاللَّهِ يَا رَبِّ وَيُؤْتَى بِأَشَدَّ النَّاسِ بُوسًا فِي الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَيُصْبَغُ صَبْغَةً فِي الْجَنَّةِ، فَيُقَالُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُوسًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا ، وَاللَّهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَطُّ، وَلَا رَأَيْتُ شِدَّةً قَطُّ) »
"কিয়ামতের দিন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনবান সূখী ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। তাকে জাহান্নামে একটি চোবানি দিয়ে উঠানো হবে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি কখনো কল্যাণ দেখেছো? তুমি কি কখনো সুখ-শান্তি পেয়েছো? সে উত্তরে বলবে, না আল্লাহর শপথ! হে রব। এরপর পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য ও দরিদ্র লোকটিকে উপস্থিত করা হবে। যে জান্নাত লাভ করেছে। তাকে জান্নাতে একটি চুবানি দেওয়া হবে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি কখনো অভাব দেখেছো? তুমি কি কখনো কষ্টে পতিত হয়েছিলে? সে উত্তরে বলবে, না, আল্লাহর শপথ হে রব! আমি পৃথিবীতে কখনো কষ্ট দেখে নি। কখনো বিপদে পড়ি নি"। ⁴⁷
এ হাদীসে দু'ব্যক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম ব্যক্তি জাহান্নামের আযাবের একটু ছোঁয়া পেয়ে পৃথিবীর সকল সুখের কথা একেবারে ভুলে যাবে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি জান্নাতের একটু ছোঁয়া পেয়ে পৃথিবীর সকল দুঃখ কষ্টের কথা ভুলে যাবে।
আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يُؤْتَى بِالرَّجُلِ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَيَقُولُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ كَيْفَ وَجَدْتَ مَنْزِلَكَ؟ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ خَيْرُ مَنْزِلٍ، فَيَقُولُ : سَلْ وَتَمَنَّ، فَيَقُولُ: مَا أَسْأَلُ وَأَتَمَنَّى إِلَّا أَنْ تَرُدَّنِي إِلَى الدُّنْيَا، فَأُقْتَلَ فِي سَبِيلِكَ عَشْرَ مَرَّاتٍ، لِمَا يَرَى مِنْ فَضْلِ الشَّهَادَةِ، وَيُؤْتَى بِالرَّجُلِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، فَيَقُولُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ، كَيْفَ وَجَدْتَ مَنْزِلَكَ؟ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ، شَرُّ مَنْزِلٍ، فَيَقُولُ لَهُ: أَتَفْتَدِي مِنْهُ بِطِلَاعِ الْأَرْضِ ذَهَبًا؟ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ، نَعَمْ، فَيَقُولُ: كَذَبْتَ، قَدْ سَأَلْتُكَ أَقَلَّ مِنْ ذَلِكَ وَأَيْسَرَ، فَلَمْ تَفْعَلْ فَيُرَدُّ إِلَى النَّارِ»
"কিয়ামতের দিন জান্নাত লাভকারী এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে।
তাকে বলা হবে, হে মানব সন্তান! তুমি তোমার ঘর কেমন পেয়েছো?
সে উত্তরে বলবে, হে প্রভু! সর্বোৎকৃষ্ট ঘর পেয়েছি। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, কিছু চাও, কিছু আকাংখা করো। সে উত্তরে বলবে আমি কিছু চাই না, কিছুই আকাংখা করি না। শুধু আকাংখা করি যদি আমাকে পৃথিবীতে ফেরৎ পাঠিয়ে দিতেন আর আমি আপনার পথে দশবার নিহত (শহীদ) হতে পারতাম। সে এ কথা বলবে যখন জান্নাতে শহীদের মর্যাদা দেখতে পাবে। এরপর জাহান্নামীদের থেকে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। তাকে বলা হবে হে মানব সন্তান! তোমার ঠিকানা কেমন পেয়েছো? সে বলবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান পেয়েছি। তাকে প্রশ্ন করা হবে পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণ খরচ করে হলোও তুমি কি এ অবস্থান মুক্তি কামনা করবে? সে বলবে, হ্যাঁ, হে প্রভু! আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছো। জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিনিময়ে তোমার কাছে এর চেয়ে অনেক কম ও অনেক সহজ বিষয় চাওয়া হয়েছিলো তা-ই তুমি পারো নি। এরপর তাকে আবার জাহান্নামে ফেরত পাঠানো হবে"।⁴⁸
এ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম, একজন জান্নাতী ব্যক্তি পৃথিবীর কোনো কিছু আকাংখা করবে না। শুধু আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হওয়া কামনা করবে। কারণ, সে যখন কিয়ামতের দিন শহীদদের অভাবনীয় মর্যাদা দেখবে তখন এটা ছাড়া আর কিছু কামনা করবে না। এ হাদীস দ্বারা আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হওয়ার ফযীলত ও মর্যাদা জানতে পারলাম।
জাহান্নাম মুক্তি ও জান্নাত লাভ করার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা খুব কঠিন কাজ নয়।
টিকাঃ
⁴⁷ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৭。
⁴⁸ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৩১৬২, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ জামে কিতাবে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন, হাদীস নং ৩১১/৬。
📄 তাওহীদের মূল্যায়ন
তাওহীদ বা আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদে অবিচল বিশ্বাস দীন ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাসে সমস্যা আছে তার কোনো নেক আমল কাজে আসবে না। দুনিয়া পরিমাণ সম্পদ ছদকা বা আল্লাহর পথে নিজের প্রাণ ও সম্পদ সবকিছু কুরবানী দিলেও নয়। অপরপক্ষে যারা তাওহীদী-আকীদা বিশ্বাস নির্ভেজাল হবে ও এর ওপর অবিচল থাকবে তার অন্য কোনো নেক আমল না থাকলেও তাওহীদের কারণে সে একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিয়ামত পরবর্তী বিচারেও তাওহীদের মূল্যায়ন করা হবে গুরুত্বের সাথে। হাদীসে এর দৃষ্টান্ত এভাবে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
« إِنَّ اللَّهَ سَيُخَلَّصُ رَجُلًا مِنْ أُمَّتِي عَلَى رُءُوسِ الخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعِينَ سِجِلًّا كُلُّ سِجِلٌّ مِثْلُ مَدَّ البَصَرِ ، ثُمَّ يَقُولُ: أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا؟ أَظْلَمَكَ كَتَبَتِي الحَافِظُونَ؟ فَيَقُولُ : لَا يَا رَبِّ، فَيَقُولُ: أَفَلَكَ عُذْرُ؟ فَيَقُولُ: لَا يَا رَبِّ، فَيَقُولُ: بَلَى إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً، فَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ الْيَوْمَ، فَتَخْرُجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، فَيَقُولُ: احْضُرُ وَزْنَكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ مَا هَذِهِ البِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السَّجِلَّاتِ، فَقَالَ: إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ "، قَالَ: فَتُوضَعُ السَّجِلَّاتُ فِي كَفَّةٍ وَالبِطَاقَةُ فِي كَفَةٍ، فَطَاشَتِ السَّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ البِطَاقَةُ، فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ اللَّهِ شَيْءٌ »
"কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে মুক্তি দিবেন এভাবে যে তার সামনে নিরানব্বইটি পাপের দফতর উপস্থিত করা হবে। প্রতিটি দফতরের পরিধি হবে চোখের নজরের পরিধির মত বিশাল। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি কি এর কোনটি অস্বীকার করো? আমার লেখক ফিরিশতারা কি তোমার প্রতি অন্যায় করে এসব লিখেছে? সে উত্তরে বলবে, না, হে আমার প্রভু! আল্লাহ বলবেন এসব পাপের ব্যাপারে তোমার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ বা বক্তব্য আছে? সে উত্তরে বলবে, না, হে আমার রব! আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তাহলে শোন, তোমার জন্য আমার কাছে একটি মাত্র নেক আমল আছে। আর আজ তোমার প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না। এরপর আল্লাহ একটি টিকেট বের করবেন। তাতে লেখা আছে, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আরো স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও রাসূল। এরপর আল্লাহ বলবেন, আমি এ টিকেটটির ওযন দেব। লোকটি বলবে, হে আমার প্রভু! এ টিকেটটির সাথে এতগুলো বিশাল দফতরের ওযন দিলে কী লাভ হবে? আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমার উপর কোনো যুলুম করা হবে না। এই টিকেটটি এক পাল্লায় রাখা হবে আর পাপের দফতরগুলো রাখা হবে অন্য পাল্লায়। টিকেটটির পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। আসলে আল্লাহ তা'আলার নামের সামনে কোনো কিছু কি ভারী হতে পারে?"⁴⁹
এ হাদীসে আমরা দেখলাম আলোচ্য ব্যক্তি পাহাড়সম পাপ করেছিলো। কিন্তু আল্লাহর একত্ববাদে তার বিশ্বাস ছিল নির্ভেজাল। তার বিশ্বাস ছিল শির্কমুক্ত। সে বিশ্বাসী ছিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেসালাতের প্রতিও। এ কারণে সে মুক্তি পেয়ে গেছে। আমরা কি পেরেছি আমাদের তাওহীদকে নির্ভেজাল করতে? আমরা কি পেরেছি ছোট-বড় সকল শির্ক থেকে সর্বদা নিজেকে পবিত্র রাখতে? আসলে আমরা পারি নি। কখনো জেনে কখনো না জেনে বুঝে আমরা বিভিন্ন শির্কে লিপ্ত হয়ে পড়ছি। আল্লাহকে ভালোবাসতে যেয়ে, তার রাসূলের প্রতি মুহাব্বাতের প্রকাশ করতে যেয়েও আমরা অহরহ শির্কে লিপ্ত।
হচ্ছি। তাই আমাদের সকলের উচিত বার বার নিজের তাওহীদি বিশ্বাসকে যাচাই করে নেওয়া। শির্কের ধারে কাছেও না যাওয়া। যদি কখনো কেহ বলে, এটা শির্ক। ব্যস, সাথে সাথে তা পরিহার করা।
আলোচ্য ব্যক্তি শুধু মুখে মুখে কালেমায়ে শাহাদত উচ্চারণ করেছে বলে মুক্তি পায় নি। মুখে মুখে তো কোটি কোটি লোক উচ্চারণ করে।
টিকাঃ
⁴⁹ তিরমিজী, হাদীস নং ২৬৩৯, তিনি হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন সিলসিলাতুল আহাদীস আস সহীহা নং ১৩৫。