📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 সেদিন প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে

📄 সেদিন প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে


সেদিন প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে তা হলো, সালাত। যদি এটি শুদ্ধভাবে কবুল হয় তবে তার সকল আমল শুদ্ধ বলে ধরা হবে। আর যদি এট বরবাদ হয়ে যায় তখন সকল আমলই বরবাদ হয়ে যাবে।
হাদীসে এসেছে: আনাস ইবন হাকীম আদ-দবী যিনি যিয়াদ অথবা ইবন যিয়াদের ভয়ে মদীনাতে এসেছিলেন ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এর সাথে সাক্ষাত করলেন, তিনি বলেন, হে যুবক! আমি কি তোমাকে একটি হাদীস শুনাবো? আমি বললাম, অবশ্যই শুনাবেন। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ النَّاسُ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ أَعْمَالِهِمُ الصَّلَاةُ، قَالَ: " يَقُولُ رَبُّنَا جَلَّ وَعَزَّ لِمَلَائِكَتِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ: انْظُرُوا فِي صَلَاةِ عَبْدِي أَتَمَّهَا أَمْ نَقَصَهَا؟ فَإِنْ كَانَتْ تَامَّةٌ كُتِبَتْ لَهُ تَامَّةً، وَإِنْ كَانَ انْتَقَصَ مِنْهَا شَيْئًا، قَالَ: انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّع؟ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعُ، قَالَ: أَتِمُّوا لِعَبْدِي فَرِيضَتَهُ مِنْ تَطَوُّعِهِ، ثُمَّ تُؤْخَذُ الْأَعْمَالُ عَلَى ذَاكُمْ " »
“মানুষের আমলের মধ্যে প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে তাহল, সালাত। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা নিজে ভালোমত জানা সত্বেও তার ফিরিশতাদের বলবেন: আমার এ বান্দার সালাতের প্রতি তাকাও। সে সালাত পূর্ণ করেছে তা ত্রুটি করেছে? যদি সে তা পূর্ণ করে থাকে তার ব্যাপারে পূর্ণতা লেখে দাও। আর যদি সে ত্রুটি করে থাকে তাহলে তার নফল সালাতের প্রতি খেয়াল করো। তার নফল থেকে ফরজের অপূর্ণতা পূর্ণ করে দাও। এরপর তার সকল আমলই এভাবে মূল্যায়ন করা হবে”। ⁴⁰

টিকাঃ
⁴⁰ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৯৪৯৪; আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৬৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 সহজ হিসাব

📄 সহজ হিসাব


অনেক ঈমানদার মানুষ যারা পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল আল্লাহ তাদের পাপগুলো স্মরণ করিয়ে দিবেন ও ক্ষমা করে জান্নাত দান করবেন।
হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
« إِنَّ اللَّهَ يُدْنِي المُؤْمِنَ، فَيَضَعُ عَلَيْهِ كَنَفَهُ وَيَسْتُرُهُ، فَيَقُولُ: أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا، أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ أَيْ رَبِّ، حَتَّى إِذَا قَرَّرَهُ بِذُنُوبِهِ، وَرَأَى فِي نَفْسِهِ أَنَّهُ هَلَكَ، قَالَ: سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ اليَوْمَ، فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ وَالْمُنَافِقُونَ، فَيَقُولُ الأَشْهَادُ : هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ} [هود: 18] » »
"আল্লাহ ঈমানদারদের কাছাকাছি হবেন। নিজের উপর একটা পর্দা রেখে দিবেন। আর তাকে বলবেন, তুমি কি সেই পাপটি সম্পর্কে জানো? সেই পাপটির কথা কি তোমার মনে আছে? সে উত্তরে বলবে, হ্যাঁ, প্রভু। এভাবে সে সকল পাপের কথা স্বীকার করবে। আর ধারনা করবে আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার পাপগুলো গোপন রেখেছি আর আজ তা ক্ষমা করে দিলাম। এ কথা বলে তার নেক আমলের দফতর তাকে দেওয়া হবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক সকলের সামনে তাদের ডাকা হবে। ফিরিশতারা বলবে, এরাইতো তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। জালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত"।⁴¹
কিয়ামতের ভয়াবহতায় আরো গতি সঞ্চয় করবে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ। যেমন আমরা উপরের হাদীসগুলোতে দেখলাম। শাফা'আত সম্পর্কিত হাদীসে দেখলাম সকল নবীই বলবেন, আজ আমার প্রভু আমার প্রতি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছেন। আমাদের সকলের কর্তব্য হবে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ থেকে তাঁর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করা।

টিকাঃ
⁴¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৪১。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 প্রথম যে বিষয়ে ফায়সালা হবে

📄 প্রথম যে বিষয়ে ফায়সালা হবে


হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ»
"কিয়ামতের দিন প্রথম যে বিষয়ে মানুষের মধ্যে ফয়সালা করা হবে তা হবে রক্তপাতের বিচার"। ⁴²
বিশেষ জ্ঞাতব্য: একটি হাদীসে বলা হলো, প্রথম ফয়সালা হবে সালাত সম্পর্কে। এ হাদীসে বলা হলো, প্রথম ফয়সালা হবে রক্তপাত ও হত্যার।
এ দু'হাদীসের মধ্যে কোনো বৈপরিত্য নেই। প্রথম হাদীসে আল্লাহ তা'আলার হক বা অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার হক বা অধিকার বিষয়ে প্রথম হিসাব হবে সালাতের। আর মানুষের অধিকার ক্ষুন্নের বিষয়ে প্রথম বিচার হবে রক্তপাত ঘটানো ও হত্যাকান্ডের।

টিকাঃ
⁴² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৭৮。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 মানুষের অধিকার হরণের প্রতিকার

📄 মানুষের অধিকার হরণের প্রতিকার


পৃথিবীতে বসে এক জন মানুষ অন্যজনের প্রতি যে যুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন করেছে, অধিকার ক্ষুন্ন করেছে, সম্পদ ও সম্মানের ওপর যে আঘাত করেছে তার বিচার হবে কিয়ামতের দিন। এ বিচারের ধরণ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا دِرْهَمْ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»
"যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি কোনো অন্যায় করেছে, অথবা তার সম্মানহানী করেছে কিংবা অন্যকোনভাবে তার ক্ষতি করেছে সে যেন যেদিন কোনো টাকা-পয়সা কাজে আসবে না সে দিন আসার পূর্বে আজই (দুনিয়াতে থাকাবস্থায়) তার প্রতিকার করে নেয়। কিয়ামতের বিচারে অন্যায়কারীর কোনো নেক আমল থাকলে তা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাওনা আদায় করা হবে। আর যদি অন্যায়কারীর নেক আমল না থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে"। ⁴³
হাদীসে আরো এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ ؟» قَالُوا : الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ، فَقَالَ: «إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا ، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ»
"তোমরা কি জান দরিদ্র অসহায় ব্যক্তি কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিতো সে যার কোনো টাকা পয়সা বা সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে সত্যিকার দরিদ্র অসহায় হলো সেই ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতসহ অনেক ভালো কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, অথচ দুনিয়াতে বসে সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছিল, করো সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, কারো রক্তপাত ঘটিয়েছিল, কাউকে মারধোর করেছিল ফলে তার নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা আদায় করা হবে। এভাবে যখন তার নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার জন্য আর কিছু থাকবে না তখন তাদের পাপগুলো তাকে দেওয়া হবে ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে"। ⁴⁴
এ হাদীস দুটো থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. গুনাহ, পাপ বা অপরাধ দু প্রকার। প্রথম প্রকার হলো যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অধিকার বা হক ক্ষুন্ন হয়। যেমন শির্ক করা, সালাত পরিত্যাগ করা, হজ আদায় না করা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় প্রকার হলো যা দ্বারা মানবাধিকার বা হুকুকুল ইবাদ ক্ষুন্ন হয়। যেমন, করো সম্পদ দখল করা, গালি দেওয়া, মারধোর করা ইত্যাদি। প্রথম প্রকারের পাপগুলো ক্ষমা করা আল্লাহর দায়িত্বে থাকে। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে এগুলো ক্ষমা করে দিতে পারেন। আর দ্বিতীয় প্রকার পাপগুলো আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করবেন না। যতক্ষণ না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করে।
দুই. দুনিয়াতে বসে মৃত্যুর পূর্বেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। বা তার কাছ থেকে দাবী ছাড়িয়ে নিতে হবে।
তিন. যার মাধ্যমে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার নেক আমল বা সৎকর্ম থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা পরিশোধ করা হবে। এমনি পাওনা পরিশোধ করতে করতে যদি নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যায় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দিয়ে তার পাওনা পরিশোধ করা হবে।
চার. আলোচিত ব্যক্তি আসলে ধনীই ছিল। তার অনেক নেক আমল ছিল। কিন্তু এগুলো এমনভাবে আর এমন সময়ে নিঃশেষ হয়ে গেল যে, তা অর্জন করার আর কোনো পথই থাকলো না। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যক্তিকে সত্যিকার অসহায় বলেছেন। কারণ দুনিয়াতে কেহ নিঃস্ব হয়ে গেলে সে আবার পরিশ্রম করে সম্পদ অর্জন করতে পারে। কিন্তু বিচার দিবসে কেহ নিঃস্ব হয়ে গেলে তার সামনে আর সম্পদ অর্জনের সুযোগ থাকে না।
পাঁচ. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিস আমাদেরকে মানুষের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে যত্নবান হতে নির্দেশ দেয়। মানুষের সম্মান, সম্পদ, শরীর সবকিছু আমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। এগুলোর কোনটি ক্ষতিগ্রস্ত করলে মানবাধিকার লঙঘিত হয়।

টিকাঃ
⁴³ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৪৯。
⁴⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৮১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00