📄 যার হিসাবে কঠোরতা হবে তাকে আযাব দেওয়া হবে
হাদীসে এসেছে: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« لَيْسَ أَحَدٌ يُحَاسَبُ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَّا هَلَكَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَيْسَ قَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا} [الانشقاق: 8] فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا ذَلِكِ العَرْضُ، وَلَيْسَ أَحَدٌ يُنَاقَشُ الحِسَابَ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَّا عُذِّبَ» »
"কিয়ামতের দিন যার হিসাব তলব করা হবে সেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি (আয়েশা) তখন বললাম, আল্লাহ তা'আলা কি বলেননি: আর যার ডান হাতে আমল নামা দেওয়া হবে তার হিসাব নেওয়া হবে সহজ ভাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন: এখানে আমলের হিসাব প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। যার হিসাবেই জওয়াব তলব করা হবে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে"। ³⁸
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. কিয়ামতে দিন যার হিসাবে নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে তার রেহাই নেই।
দুই. আমাদের মুমিনদের মাতা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ইলম, প্রজ্ঞা, কুরআনের জ্ঞান কতখানি ছিল যে তিনি কুরআনের আয়াত দিয়ে আল্লাহর রাসূলের কথা বিচার করতে চেয়েছন। তাই দীনি ক্ষেত্রে বড়দের সকল কথাই যাচাই বাছাই না করে মেনে নিতে হবে এ ধারনা সঠিক নয়।
তিন, আল কুরআনে যেখানে বলা হয়েছে যাদের ডান হাতে আমল নামা দেওয়া হবে তাদের হিসাব সহজ করা হবে, এর অর্থ হলো তাদের কাছে সহজে আমল নামা পেশ করা হবে।
চার, কিয়ামতের দিন যার হিসাব পর্যালোচনা করা হবে সে আটকে যাবে। তাই আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বদা বিনা হিসাবে জান্নাত লাভের প্রার্থনা করা উচিত।
টিকাঃ
³⁸ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৩৭。
📄 সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে কোনো দোভাষী থাকবে না
সেদিন আল্লাহ তা'আলা তার বান্দার সাথে সরাসরি কথা বলবেন। কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হবে না।
হাদীসে এসেছে: আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَا مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ تُرْجُمَانٌ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ مِنْ عَمَلِهِ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلا يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ، وَيَنْظُرُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلا يَرَى إِلَّا النَّارَ تِلْقَاءَ وَجْهِهِ، فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ " »
"তোমাদের মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তি সেদিন আল্লাহ তা'আলার সাথে সরাসরি কথা বলবে। কোনো দোভাষী বা মধ্যস্থ থাকবে না। মানুষ তখন তার ডান দিকে তাকাবে দেখতে পাবে শুধু তাদের প্রেরিত কর্ম। আর বাম দিকে তাকাবে দেখবে শুধু নিজ কৃত কর্ম। সামনের দিকে তাকাবে দেখবে শুধু জাহান্নামের আগুন। কাজেই তোমরা আগুন থেকে সাবধান হও নিজেদের বাঁচাও যদি একটি খেজুরের টুকরা দান করার বিনিময়েও হয়"। ³⁹
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. সামান্য নেক আমলেরও অবজ্ঞা করা উচিত নয়। সুযোগ আসা মাত্রই যে কোনো নেক আমল করা উচিত। কেহ যদি একটি খেজুরের অংশ দান করার সুযোগ পায় তাহলে তা দান করে হলেও আল্লাহ তা'আলার শান্তি ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করা উচিত।
টিকাঃ
³⁹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৫১২。
📄 সেদিন প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে
সেদিন প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে তা হলো, সালাত। যদি এটি শুদ্ধভাবে কবুল হয় তবে তার সকল আমল শুদ্ধ বলে ধরা হবে। আর যদি এট বরবাদ হয়ে যায় তখন সকল আমলই বরবাদ হয়ে যাবে।
হাদীসে এসেছে: আনাস ইবন হাকীম আদ-দবী যিনি যিয়াদ অথবা ইবন যিয়াদের ভয়ে মদীনাতে এসেছিলেন ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এর সাথে সাক্ষাত করলেন, তিনি বলেন, হে যুবক! আমি কি তোমাকে একটি হাদীস শুনাবো? আমি বললাম, অবশ্যই শুনাবেন। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ النَّاسُ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ أَعْمَالِهِمُ الصَّلَاةُ، قَالَ: " يَقُولُ رَبُّنَا جَلَّ وَعَزَّ لِمَلَائِكَتِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ: انْظُرُوا فِي صَلَاةِ عَبْدِي أَتَمَّهَا أَمْ نَقَصَهَا؟ فَإِنْ كَانَتْ تَامَّةٌ كُتِبَتْ لَهُ تَامَّةً، وَإِنْ كَانَ انْتَقَصَ مِنْهَا شَيْئًا، قَالَ: انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّع؟ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعُ، قَالَ: أَتِمُّوا لِعَبْدِي فَرِيضَتَهُ مِنْ تَطَوُّعِهِ، ثُمَّ تُؤْخَذُ الْأَعْمَالُ عَلَى ذَاكُمْ " »
“মানুষের আমলের মধ্যে প্রথম যে বিষয়টির হিসাব নেওয়া হবে তাহল, সালাত। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা নিজে ভালোমত জানা সত্বেও তার ফিরিশতাদের বলবেন: আমার এ বান্দার সালাতের প্রতি তাকাও। সে সালাত পূর্ণ করেছে তা ত্রুটি করেছে? যদি সে তা পূর্ণ করে থাকে তার ব্যাপারে পূর্ণতা লেখে দাও। আর যদি সে ত্রুটি করে থাকে তাহলে তার নফল সালাতের প্রতি খেয়াল করো। তার নফল থেকে ফরজের অপূর্ণতা পূর্ণ করে দাও। এরপর তার সকল আমলই এভাবে মূল্যায়ন করা হবে”। ⁴⁰
টিকাঃ
⁴⁰ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৯৪৯৪; আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৬৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 সহজ হিসাব
অনেক ঈমানদার মানুষ যারা পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল আল্লাহ তাদের পাপগুলো স্মরণ করিয়ে দিবেন ও ক্ষমা করে জান্নাত দান করবেন।
হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
« إِنَّ اللَّهَ يُدْنِي المُؤْمِنَ، فَيَضَعُ عَلَيْهِ كَنَفَهُ وَيَسْتُرُهُ، فَيَقُولُ: أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا، أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ أَيْ رَبِّ، حَتَّى إِذَا قَرَّرَهُ بِذُنُوبِهِ، وَرَأَى فِي نَفْسِهِ أَنَّهُ هَلَكَ، قَالَ: سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ اليَوْمَ، فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ وَالْمُنَافِقُونَ، فَيَقُولُ الأَشْهَادُ : هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ} [هود: 18] » »
"আল্লাহ ঈমানদারদের কাছাকাছি হবেন। নিজের উপর একটা পর্দা রেখে দিবেন। আর তাকে বলবেন, তুমি কি সেই পাপটি সম্পর্কে জানো? সেই পাপটির কথা কি তোমার মনে আছে? সে উত্তরে বলবে, হ্যাঁ, প্রভু। এভাবে সে সকল পাপের কথা স্বীকার করবে। আর ধারনা করবে আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার পাপগুলো গোপন রেখেছি আর আজ তা ক্ষমা করে দিলাম। এ কথা বলে তার নেক আমলের দফতর তাকে দেওয়া হবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক সকলের সামনে তাদের ডাকা হবে। ফিরিশতারা বলবে, এরাইতো তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। জালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত"।⁴¹
কিয়ামতের ভয়াবহতায় আরো গতি সঞ্চয় করবে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ। যেমন আমরা উপরের হাদীসগুলোতে দেখলাম। শাফা'আত সম্পর্কিত হাদীসে দেখলাম সকল নবীই বলবেন, আজ আমার প্রভু আমার প্রতি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছেন। আমাদের সকলের কর্তব্য হবে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ থেকে তাঁর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করা।
টিকাঃ
⁴¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৪১。