📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 যাকাত পরিত্যাগকারীর শাস্তি

📄 যাকাত পরিত্যাগকারীর শাস্তি


আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا يَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴾ [آل عمران: ۱۸۰]
"আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮০]
﴿ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَرْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ ﴾ [التوبة: ٣٤، ٣٥]
“এবং যারা সোনা ও রূপা (টাকা-পয়সা) পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেওয়া হবে। (আর বলা হবে) এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর”। [সূরা আত তাওবা, আয়াত: ৩৪-৩৫]
আয়াত দুটো থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল:
এক. কৃপণতা একটি নিন্দনীয় কাজ।
দুই. কৃপণতা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না।
তিন, ধন-সম্পদ আল্লাহ তা'আলারই দান।
চার, কৃপণতা করে সঞ্চিত ধন-সম্পদ কেয়ামতে শাস্তির কারণ হবে।
পাঁচ, টাকা পয়সা ধন-সম্পদে গরিবদের যে অধিকার আছে তা যাকাত দানের মাধ্যমে আদায় না করলে কেয়ামতে এগুলো শাস্তির মাধ্যম হবে।
ছয়, এ অপরাধে কি ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে।
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ، مُثْلَ لَهُ مَالُهُ شُجَاعًا أَقْرَعَ، لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ، يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ - يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ - يَقُولُ: أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ " ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الآيَةَ: ﴿وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ﴾ [آل عمران: ۱۸۰] إلَى آخِرِ الآيَةِ »
“যাকে আল্লাহ তা'আলা সম্পদ দিলেন, কিন্তু সে যাকাত আদায় করলো না তার সম্পদকে বিষধর চুলওয়ালা সাপে পরিণত করা হবে। যার শিংয়ের মত দুটো বিষাক্ত দাঁত থাকবে। কিয়ামতের দিন এ সাপ তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। এ দিয়ে সে তাকে দংশন করতে থাকবে আর বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চয়। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন:
﴿وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ﴾ [آل عمران: ১৮০]
“আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮০]²²
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، صُفْحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ، فَأُحْيِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ، كَلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ، فَيَرَى سَبِيلَهُ، إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِمَّا إِلَى النَّارِ»
“যে সকল স্বর্ণ রৌপ্য (টাকা পয়সা) সঞ্চয়কারী সম্পদের হক (যাকাত) আদায় করে নি, সেগুলোকে কিয়ামতের দিন আগুনে দিয়ে পাত বানানো হবে। জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তার পার্শদেশ, কপাল ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হবে আবার গরম করা হবে। সে দিনটির সময়ের পরিমাণ হবে হাজার। এ শাস্তি হবে মানুষের মধ্যে বিচার ফয়সালার পূর্বে। এরপর জান্নাতীরা জান্নাতে যাবে আর জাহান্নামীরা যাবে জাহান্নামে”। ²³
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. দরিদ্র মানুষের অধিকার যাকাত আদায় না করে সম্পদ সঞ্চয় করে রাখা অন্যায়।
দুই. সঞ্চয়কৃত সম্পদ দিয়েই সম্পদের মালিককে শাস্তি দেওয়া হবে।
তিন. হিসাব নিকাশ ও জান্নাত জাহান্নামের ফয়সালা হওয়ার পূর্বে এ শাস্তি দেওয়া হবে।
চার. পৃথিবীর সময়ের হিসাবে কিয়ামত দিবসের সময়ের পরিমাণ হবে হাজার বছর।
হাদীসে এসেছে: জাবের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« وَلَا صَاحِبُ كَنْزِ لَّا يَفْعَلُ فِيهِ حَقَّهُ، إِلَّا جَاءَ كَنْزُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ، يَتْبَعُهُ فَاتِحًا فَاهُ، فَإِذَا أَتَاهُ فَرَّ مِنْهُ ، فَيُنَادِيهِ: خُذْ كَنْزَكَ الَّذِي خَبَأْتَهُ، فَأَنَا عَنْهُ غَنِيٌّ، فَإِذَا رَأَى أَنْ لَا بُدَّ مِنْهُ، سَلَكَ يَدَهُ فِي فِيهِ، فَيَقْضَمُهَا قَضْمَ الْفَحْلِ " »
"যে সঞ্চিত সম্পদের মালিক তার পাওনা (যাকাত) আদায় করে নি, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ একটি বিষধর সাপ হয়ে আসবে। সাপটি মুখ হা করে তাকে ধাওয়া করতে থাকবে আর সে পালাতে চেষ্টা করবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে ডাক দিয়ে বলবেন, তোমার সম্পদ গ্রহণ করো, যা তুমি সঞ্চয় করেছিলে। আমি তোমার সম্পদের মুখাপেক্ষী নই। যখন সে দেখবে যে সাপটি থেকে বাঁচা সম্ভব নয় তখন সে নিজেই তার মুখে হাত ডুকিয়ে দেবে। সাপটি এমনভাবে তার হাত গ্রাস করবে যেমন উট ঘাস মুখে নেয়"। ²⁴

টিকাঃ
²² সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৬৫。
²³ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৮৭。
²⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৮৮。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজে কাউসার

📄 কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজে কাউসার


কিয়ামতের দিন মুসলিমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজে কাউসারে পানি পানের জন্য সমবেত হবে। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, মেশকের চেয়ে এর সুঘ্রাণ তীব্র আর তার পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের মত। যে এ থেকে একবার পানি পান করবে সে আর কখনো পিপাসিত হবে না।
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« تَرِدُ عَلَى أُمَّتِي الْحَوْضَ، وَأَنَا أَذُودُ النَّاسَ عَنْهُ، كَمَا يَذُودُ الرَّجُلُ إِبِلَ الرَّجُلِ عَنْ إِبْلِهِ قَالُوا يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَتَعْرِفْنَا؟ قَالَ: " نَعَمْ لَكُمْ سِيمَا لَيْسَتْ لِأَحَدٍ غَيْرِكُمْ تَرِدُونَ عَلَيَّ غرًا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الْوُضُوءِ، وَلَيُصَدَّنَّ عَنِّي طَائِفَةٌ مِنْكُمْ فَلَا يَصِلُونَ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ هَؤُلَاءِ مِنْ أَصْحَابِي فَيُجِيبُنِي مَلَكُ، فَيَقُولُ: وَهَلْ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ؟ " »
"হাউজে কাউসারে আমার উম্মত সমবেত হবে। আমি অনেক মানুষকে এমনভাবে তাড়িয়ে দেব যেমন একজনের উট অন্য জনের উটের পাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাদের তখন চিনবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা, তোমাদের এমন কিছু আলামত আছে যা অন্যদের নেই। তোমরা আমার কাছে উপস্থিত হবে আর তোমাদের অজুর স্থানগুলো চকমক করতে থাকবে। তোমাদের একটি দলকে আমার থেকে দুরে সরিয়ে দেওয়া হবে, তারা হাউজের কাছে পৌছতে পারবে না। সে সময় আমি বলব, হে আমার প্রভু এরা আমার অনুসারী। তখন এক ফিরিশতা উত্তর দেবে, আপনি কি জানেন আপনার পরে তারা কি প্রচলন করেছে?"²⁵
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. উম্মতের সকল মানুষ হাউজে কাউসারে পানি পানের জন্য ভীর করবে।
দুই. অজুর আলামত দেখে মুসলিমদের চেনা যাবে।
তিন, অজুর ফযীলত।
চার, মুসলিমদের একটি অংশকে হাউজে কাউসার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। কারণ, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গত হওয়ার পর ইসলামে নতুন বিষয়ের প্রচলন করেছে বা তাতে লিপ্ত হয়েছে।
পাঁচ. ইসলামে বিদ'আত প্রচলন ও তার অনুসরণ একটি মহা-পাপ।
হাদীসে এসেছে: আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنِّي عَلَى الحَوْضِ حَتَّى أَنْظُرَ مَنْ يَرِدُ عَلَيَّ مِنْكُمْ، وَسَيُؤْخَذُ نَاسٌ دُونِي، فَأَقُولُ: يَا رَبَّ مِنِّي وَمِنْ أُمَّتِي، فَيُقَالُ: هَلْ شَعَرْتَ مَا عَمِلُوا بَعْدَكَ، وَاللَّهِ مَا بَرِحُوا يَرْجِعُونَ عَلَى أَعْقَابِهِمْ»
"আমি হাউজে কাউসারে থাকব আর দেখব তোমাদের কে কে আসছে। কিন্তু কিছু মানুষকে আমার অনুমতি ব্যতীত নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব! এরা আমার অনুসারী, আমার উম্মতের অংশ। আমাকে বলা হবে, আপনি কি জানেন, আপনার পরে এরা কি কাজ করেছে? আল্লাহর শপথ! তারা পিছনে ফিরে যাবে"। ²⁶
হাউজে কাউসারে মুসলিম উম্মাহ কখন সমবেত হবে? এ বিষয়ে উলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন, এটা পুলসিরাতের পূর্বে হবে। আবার কেহ কেহ বলেছেন এটা হিসাব-কিতাব, মিযান ও পুলসিরাতের পরে হবে।
আমি মনে করি প্রথম মতটি অধিকতর সঠিক। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের সাক্ষাতের ওয়াদা করেছেন হাউজে কাউসারে কাছে। যেমন, হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন যায়েদ ইবন আসেম রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
«إِنَّكُمْ سَتَلْقَوْنَ بَعْدِي أُثْرَةٌ، فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوْنِي عَلَى الْحَوْضِ»
"আমার পরে তোমরা অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে শাসকদের অগ্রাধিকার দেখতে পাবে। তোমরা তখন ধৈর্য ধারণ করবে হাউজে কাউসারে আমার কাছে সাক্ষাত লাভ পর্যন্ত”। ²⁷
হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ ، وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ المِسْكِ، وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ ، مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلَا يَظْمَأُ أَبَدًا»
"আমার হাউজের প্রশস্ততা হবে এক মাসের সমান দূরত্ব। তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, সুঘ্রাণ মেশকের চেয়ে উত্তম। আর তার পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের মতো। যে তা থেকে পান করবে কখনো পিপাসিত হবে না"। ²⁸
এ হাদীসটি দিয়ে বুঝা যায় কিয়ামত সংঘটনের পর পরই জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারণ হওয়ার আগে হাউজে কাউসারে সমবেত হওয়ার বিষয়টি চলে আসবে।

টিকাঃ
²⁵ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭。
²⁶ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৯৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭。
²⁷ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪৫。
²⁸ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৭৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৯২。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত

📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত


কিয়ামতের পর জান্নাতকে ঈমানদারদের নিকটে নিয়ে আসা হবে। তারা তাতে প্রবেশ করার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। অপরদিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিচার, হিসাব নিকাশে দেরী করবেন। তখন মানুষেরা নবী ও রাসূলদের কাছে যাবে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য। তখন প্রত্যেক নবীই বলবে, আমি আমার জন্য চিন্তিত তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও।
জান্নাত ঈমানদারদের নিকটবর্তী করা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ ﴾ [ق: ۳۱]
"আর জান্নাতকে মুত্তাকীদের অদূরে কাছেই আনা হবে”। [সূরা কাফ, আয়াত: ৩১]
তিনি আরো বলেন,
﴿ وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ ﴾ [التكوير: ١٣]
"আর যখন জান্নাতক নকিটকী করা হব"ে। [সূরা আত তাকবীর, আয়াত: ১৩]
একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা ও হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يَجْمَعُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى النَّاسَ، فَيَقُومُ الْمُؤْمِنُونَ حَتَّى تُزْلَفَ لَهُمُ الْجَنَّةُ، فَيَأْتُونَ آدَمَ، فَيَقُولُونَ: يَا أَبَانَا اسْتَفْتِحُ لَنَا الْجَنَّةَ، فَيَقُولُ: وَهَلْ أَخْرَجَكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ إِلَّا خَطِيئَةُ أَبِيكُمْ آدَمَ، لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ، اذْهَبُوا إِلَى ابْنِي إِبْرَاهِيمَ خَلِيلِ اللَّهِ ..... »
"আল্লাহ তা'আলা যখন সকল মানুষকে একত্র করবেন তখন ঈমানদারগণ দাঁড়িয়ে যাবে জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য। তারা আদম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য জান্নাত খুলে দেওয়ার জন্য আবেদন করুন। আদম আলাইহিস সালাম উত্তরে বলবেন, তোমরা কি জান না, তোমাদের পিতা আদমের ভুলের কারণে তোমাদের জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে?
আমার আবেদন করার অধিকার নেই। বরং তোমরা ইবারহীম খলীলুল্লাহর কাছে যাও........."। ²⁹
হাদীসে এ বিষয়ে বিস্তারিত এভাবে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
« عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِلَحْمٍ فَرُفِعَ إِلَيْهِ الدَّرَاعُ، وَكَانَتْ تُعْجِبُهُ فَنَهَشَ مِنْهَا نَهْشَةً، ثُمَّ قَالَ: " أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَهَلْ تَدْرُونَ مِمَّ ذَلِكَ ؟ يَجْمَعُ اللَّهُ النَّاسَ الأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ، يُسْمِعُهُمُ الدَّاعِي وَيَنْفُذُهُمُ البَصَرُ، وَتَدْنُو الشَّمْسُ، فَيَبْلُغُ النَّاسَ مِنَ الغَمَّ وَالكَرْبِ مَا لَا يُطِيقُونَ وَلَا يَحْتَمِلُونَ، فَيَقُولُ النَّاسُ : أَلاَ تَرَوْنَ مَا قَدْ بَلَغَكُمْ، أَلَا تَنْظُرُونَ مَنْ يَشْفَعُ لَكُمْ إِلَى رَبِّكُمْ؟ فَيَقُولُ بَعْضُ النَّاسِ لِبَعْضٍ عَلَيْكُمْ بِآدَمَ، فَيَأْتُونَ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَيَقُولُونَ لَهُ: أَنْتَ أَبُو البَشَرِ ، خَلَقَكَ اللَّهُ بِيَدِهِ، وَنَفَخَ فِيكَ مِنْ رُوحِهِ، وَأَمَرَ المَلَائِكَةَ فَسَجَدُوا لَكَ، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ، أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ، أَلَا تَرَى إِلَى مَا قَدْ بَلَغَنَا؟ فَيَقُولُ آدَمُ : إِنَّ رَبِّي قَدْ غَضِبَ اليَوْمَ غَضَبًا لَمْ يَغْضَبْ قَبْلَهُ مِثْلَهُ، وَلَنْ يَغْضَبَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ، وَإِنَّهُ قَدْ نَهَانِي عَنِ الشَّجَرَةِ فَعَصَيْتُهُ، نَفْسِي نَفْسِي نَفْسِي، اذْهَبُوا إِلَى غَيْرِي اذْهَبُوا إِلَى نُوحٍ، فَيَأْتُونَ نُوحًا فَيَقُولُونَ: يَا نُوحُ، إِنَّكَ أَنْتَ أَوَّلُ الرُّسُلِ إِلَى أَهْلِ الأَرْضِ ، وَقَدْ سَمَّاكَ اللهُ عَبْدًا شَكُورًا، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ، أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ؟ فَيَقُولُ: إِنَّ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ قَدْ غَضِبَ الْيَوْمَ غَضَبًا لَمْ يَغْضَبْ قَبْلَهُ مِثْلَهُ، وَلَنْ يَغْضَبَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ، وَإِنَّهُ قَدْ كَانَتْ لِي دَعْوَةٌ دَعَوْتُهَا عَلَى قَوْمِي، نَفْسِي نَفْسِي نَفْسِي اذْهَبُوا إِلَى غَيْرِي اذْهَبُوا إِلَى إِبْرَاهِيمَ، فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ فَيَقُولُونَ: يَا إِبْرَاهِيمُ أَنْتَ نَبِيُّ اللَّهِ وَخَلِيلُهُ مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ ، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ، فَيَقُولُ لَهُمْ: إِنَّ رَبِّي قَدْ غَضِبَ اليَوْمَ غَضَبًا لَمْ يَغْضَبْ قَبْلَهُ مِثْلَهُ، وَلَنْ يَغْضَبَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ، وَإِنِّي قَدْ كُنْتُ كَذَبْتُ ثَلَاثَ كَذِبَاتٍ - فَذَكَرَهُنَّ أَبُو حَيَّانَ فِي الحَدِيثِ - نَفْسِي نَفْسِي نَفْسِي اذْهَبُوا إِلَى غَيْرِي اذْهَبُوا إِلَى مُوسَى فَيَأْتُونَ، مُوسَى فَيَقُولُونَ: يَا مُوسَى أَنْتَ رَسُولُ اللهِ، فَضَّلَكَ اللهُ بِرِسَالَتِهِ وَبِكَلامِهِ عَلَى النَّاسِ، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ، أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ؟ فَيَقُولُ: إِنَّ رَبِّي قَدْ غَضِبَ الْيَوْمَ غَضَبًا لَمْ يَغْضَبْ قَبْلَهُ مِثْلَهُ، وَلَنْ يَغْضَبَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ، وَإِنِّي قَدْ قَتَلْتُ نَفْسًا لَمْ أُومَرْ بِقَتْلِهَا، نَفْسِي نَفْسِي نَفْسِي اذْهَبُوا إِلَى غَيْرِي اذْهَبُوا إِلَى عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، فَيَأْتُونَ عِيسَى، فَيَقُولُونَ: يَا عِيسَى أَنْتَ رَسُولُ اللهِ، وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ، وَكَلَّمْتَ النَّاسَ فِي المَهْدِ صَبِيًّا، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ؟ فَيَقُولُ عِيسَى: إِنَّ رَبِّي قَدْ غَضِبَ اليَوْمَ غَضَبًا لَمْ يَغْضَبْ قَبْلَهُ مِثْلَهُ قَطُّ، وَلَنْ يَغْضَبَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ، وَلَمْ يَذْكُرُ ذَنْبًا، نَفْسِي نَفْسِي نَفْسِي اذْهَبُوا إِلَى غَيْرِي اذْهَبُوا إِلَى مُحَمَّدٍ، فَيَأْتُونَ مُحَمَّدًا فَيَقُولُونَ: يَا مُحَمَّدُ أَنْتَ رَسُولُ اللهِ وَخَاتِمُ الْأَنْبِيَاءِ، وَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ ، اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ أَلَا تَرَى إِلَى مَا نَحْنُ فِيهِ، فَأَنْطَلِقُ فَاتِي تَحْتَ العَرْشِ ، فَأَقَعُ سَاجِدًا لِرَبِّي عَزَّ وَجَلَّ ، ثُمَّ يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيَّ مِنْ مَحَامِدِهِ وَحُسْنِ القَنَاءِ عَلَيْهِ شَيْئًا، لَمْ يَفْتَحْهُ عَلَى أَحَدٍ قَبْلي، ثُمَّ يُقَالُ: يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ سَلْ تُعْطَهُ، وَاشْفَعْ تُشَفَعُ فَأَرْفَعُ رَأْسِي، فَأَقُولُ: أُمَّتِي يَا رَبِّ، أُمَّتِي يَا رَبِّ، أُمَّتِي يَا رَبِّ، فَيُقَالُ: يَا مُحَمَّدُ أَدْخِلْ مِنْ أُمَّتِكَ مَنْ لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ مِنَ البَابِ الْأَيْمَنِ مِنْ أَبْوَابِ الجَنَّةِ، وَهُمْ شُرَكَاءُ النَّاسِ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ مِنَ الأَبْوَابِ، ثُمَّ قَالَ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ مَا بَيْنَ المِصْرَاعَيْنِ مِنْ مَصَارِيعِ الجَنَّةِ، كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَحِمْيَرَ - أَوْ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَبُصْرَى - " »
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একদিন বকরীর ডানার গোশত পরিবেশন করা হলো। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি এটি দাঁতের কিনারা দিয়ে চিবাতে লাগলেন। তখন তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন আমি হব সকল মানুষের নেতা। তোমরা কি জান এটা কীভাবে হবে? কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করবেন একটি প্রান্তরে। তারা সকলকে শুনবে ও দেখবে। সূর্য মানুষের নিকটবর্তী হবে। মানুষেরা এমন দুঃচিন্তা অস্থিরতায় বন্দি হবে, যা তারা সহ্য করতে পারবে না আবার এর থেকে বাঁচতেও পারবে না। তখন মানুষেরা একে অপরকে বলবে, দেখছো আমরা কি দুরবস্থায় পতিত হয়েছি? আমাদের জন্য আমাদের প্রতিপালকের কাছে কে সুপারিশ করবে আমরা কি সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করবো না? চলো আমরা আদম আলাইহিস সালামের কাছে যাই। তারা আদম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজে আপনার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন। তিনি আপনাকে সাজদাহ করার জন্য ফিরিশতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আমাদের প্রতিপালকের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি দুরাবস্থায় আছি? আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পতিত হয়েছি? আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেন নি। এরপরেও এ রকম রাগ করবেন না। তিনি তো আমাকে সেই গাছের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি তা অমান্য করেছি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। নূহের কাছে যাও। তারা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে হে নূহ! আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসূল। আল্লাহ আপনাকে কৃতজ্ঞ বান্দা বলে অভিহিত করেছেন। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পড়েছি? তিনি বলবেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেন নি। এরপরেও এ রকম রাগ করবেন না। আমি আমার জাতির বিরুদ্ধে দো'আ করেছিলাম। আমি আমার চিন্তা করছি। তোমরা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে আসবে। তারা বলবে, আপনি আল্লাহর নবী ও পৃথিবী বাসীর মধ্যে তার খলীল (বন্ধু)। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পড়েছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেন নি। এরপরেও এ রকম রাগ করবেন না। আমি কিছু মিথ্যা বলেছিলাম। তাই আমি আমার চিন্তা করছি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। তোমরা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে মূছা আপনি আল্লাহ তা'আলার রাসূল। আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে ধন্য করেছেন। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পড়েছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেন নি। এরপরেও এ রকম রাগ করবেন না। আমি একজন মানুষকে হত্যা করেছিলাম। অথচ আমি এ ব্যাপারে আদিষ্ট ছিলাম না। এখন আমার চিন্তা আমি করছি। তোমরা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তারা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে হে ঈসা! আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনি দোলনাতে থাকাকালেই মানুষের সাথে কথা বলেছেন। আপনাকে আল্লাহর বাক্য ও তার পক্ষ থেকে রূহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যা মারইয়ামের কাছে পাঠানো হয়েছে। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পড়েছি? তিনি বলবেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেন নি। আমার চিন্তা আমি করছি। তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও। তারা আমার কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আল্লাহ রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আল্লাহ তা'আলা আপনার পূর্বের ও পরের সকল পাপ ক্ষমা করেছেন। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে পড়েছি? আমি চলে আসবো তখন 'আরশের নিচে। আর আমার রবের জন্য সাজদাহ করবো। তখন আল্লাহ আমার জন্য তার রহমত উন্মুক্ত করবেন। আমাকে এমন প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনার বাণী অন্তরে গেথে দিবেন যা আমার পূর্বে কাউকে দেওয়া হয় নি। অতঃপর আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি প্রার্থনা করো, তোমার প্রার্থনা কবুল করা হবে। তুমি সুপারিশ করো তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে। তখন আমি বলবো, হে রব! আমার উম্মত নিয়ে আমি চিন্তিত! আমার উম্মত নিয়ে আমি চিন্তিত! আমার উম্মত নিয়ে আমি চিন্তিত!!
তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মতদের জান্নাতে প্রবেশ করাও। তবে তাদেরকে যাদের কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না। তাদের জান্নাতের ডান পাশের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাও। অবশ্য অন্যসব দরজা দিয়েও তারা প্রবেশ করতে পারবে। যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন তার শপথ, জান্নাতের গেটের দু পাটের মধ্যে প্রশস্ততা হবে মক্কা ও বসরার মধ্যে দূরত্বের সমান"। ³⁰
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:
এক. হাদীসে দেখা যায় নবীগণ সেদিন প্রত্যেকে নিজেদের অন্যায়গুলোর কথা মনে করবেন। আসলে নবীগণ সকল অন্যায় ও পাপাচার থেকে মুক্ত ছিলেন। তবে তারা যে পাপের কথা বলবেন তা হলো আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাদের বিনয় ও পরিপূর্ণ আত্ম-সমর্পনের প্রকাশ।
দুই. ইবারহীম আলাইহিস সালাম যে মিথ্যা বলেছিলেন এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে যে, ইবারহীম আলাইহিস সালাম তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। প্রথমটি হলো, তাকে যখন মূর্তি পূজার উৎসবে যেতে বলা হলো, তখন তিনি বলেছিলেন আমি অসুস্থ। দ্বিতীয়টি হলো, যখন তিনি মূর্তিগুলো ভেঙ্গে বড় মূর্তিটি রেখে দিয়েছিলেন আর লোকরা জিজ্ঞস করল এটা কে করেছে? তখন তিনি বলেছিলেন, বড় মূর্তিটি এ কাজ করেছে। তৃতীয়টি হলো, যখন তিনি নিজ স্ত্রী সারাকে নিয়ে সফর করছিলেন তখন এক অত্যাচারী লোকের থেকে নিজেকে বাচানোর জন্য স্ত্রী সম্পর্কে বলেছিলেন, এ আমার বোন।
আসলে এগুলো ইবরাহীমের দৃষ্টিভংগিতে মিথ্যা ছিল না। কিন্তু কোনো কোন শ্রোতার কাছে এগুলো মিথ্যার মত মনে হয়েছে। আর এগুলো মিথ্যা হলেও নিন্দনীয় মিথ্যা নয়। এগুলো নন্দিত মিথ্যা। নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কিয়ামতের সময় যে বলবেন আমি মিথ্যা বলেছি সেটা আল্লাহর কাছে চরম বিনয় ও পূর্ণ আত্মসমর্পনের বহি:প্রকাশ হিসাবেই বলবেন। সেদিন ভয়াবহতা এমন হবে যে, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগনও তাদের অনেক ভালো কাজকে খারাপ বলে ধারনা করতে থাকবে।
তিন. সকল নবী ও রাসূলগণের ওপর আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো।
চার. আল্লাহ তা'আলার কাছে দো'আ-প্রার্থনার সুন্নত তরিকা হলো, দো'আর শুরুতে তার গুণগান, প্রশংসা ও হামদ-সানা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ভয়াবহ সময়েও আল্লাহ তা'আলার হামদ-প্রশংসার সুন্দর এ আদর্শটি ভুলে যাবেন না।

টিকাঃ
²⁹ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৫。
³⁰ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৪。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 উম্মতে মুহাম্মাদীর হিসাব হবে সর্বপ্রথম

📄 উম্মতে মুহাম্মাদীর হিসাব হবে সর্বপ্রথম


কিয়ামতের এ দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী মুসলিমদের বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন। সকল পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে দাঁড় করিয়ে রেখে মুসলিম জাতির হিসাব-নিকাশ বিচার ফয়সালা করে দিবেন। যদিও মুসলিম জাতি দুনিয়াতে আভির্ভাবের দিক দিয়ে অন্যান্য জাতিগুলোর পরে এসেছে কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের নিষ্পত্তি আগে করা হবে। এটি উম্মতে এক বিশাল সম্মান ও পুরস্কার।
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« نَحْنُ الْآخِرُونَ السَّابِقُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، بَيْدَ أَنَّهُمْ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِنَا، ثُمَّ هَذَا يَوْمُهُمُ الَّذِي فُرِضَ عَلَيْهِمْ، فَاخْتَلَفُوا فِيهِ، فَهَدَانَا اللَّهُ، فَالنَّاسُ لَنَا فِيهِ تَبَعُ اليَهُودُ غدًا، وَالنَّصَارَى بَعْدَ غَدٍ»
"আমরা শেষে এসেছি কিন্তু কিয়ামতের দিন সকলের আগে থাকবো। যদিও অন্য সকল জাতিগুলো (ইয়াহুদী ও খৃষ্টান) কে গ্রন্থ দেওয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে, আমাদের গ্রন্থ দেওয়া হয়েছে তাদের পরে। অতঃপর জেনে রাখো এই (জুমু'আর) দিনটি আল্লাহ আমাদের দান করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে আমাদের সঠিক পথে দিশা দিয়েছেন। আর অন্য লোকেরা এ ব্যাপারে আমাদের পিছনে আছে। ইয়াহূদীরা জুমার পরের দিন (শনিবার) উদযাপন করে আর খৃষ্টানেরা তার পরের দিন (রবিবার) উদযাপন করে"। ³¹
এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম: এক. মুসলিম জাতির মর্যাদা। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের চেয়ে মুসলমানদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। ইসলামের বর্তমানে ইয়াহুদী খৃষ্টানেরা তো কাফির বা অবিশ্বাসী। তাদের চেয়ে মুসলিম উম্মাহ শ্রেষ্ঠ এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর ইসলামপূর্ব যুগের ইয়াহুদী খৃষ্টানেরা যারা কাফির ছিল না, তাদের চেয়েও মুসলিম উম্মাহ শ্রেষ্ঠ। এটি এ হাদীস দিয়েও প্রমাণিত হলো।
দুই. জুমার দিনের ফযীলত জানা গেল। মুলত হাদীসটি জুমার দিনে ফযীলত সম্পর্কিত। উদ্দেশ্য হলো সাপ্তাহিক প্রার্থনার দিন নির্বাচনে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা যেমন আমাদের পিছনে পড়ে গেছে তেমনি কিয়ামত দিবসেও তারা আমাদের পিছনে থাকবে। ইয়াহুদীরা শুক্রবারের পরের দিন সাপ্তাহিক প্রার্থনা করে থাকে। আর খৃষ্টানের শুক্রবারের দু'দিন পর সাপ্তাহিক প্রার্থনা পালন করে থাকে।
আবু হুরায়রা ও হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« نَحْنُ الْآخِرُونَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا، وَالْأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمَقْضِيُّ لَهُمْ قَبْلَ الْخَلَائِقِ».
"পৃথিবীতে বসবাসকারী জাতিগুলোর মধ্যে আমাদের আগমন সর্বশেষে আর কিয়ামতের দিনে আমাদের ফয়সালা করা হবে সকল সৃষ্টি জীবের পূর্বে"। ³²
হাদীসে আরো এসেছে: ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« نَحْنُ آخِرُ الْأُمَمِ، وَأَوَّلُ مَنْ يُحَاسَبُ، يُقَالُ: أَيْنَ الْأُمَّةُ الْأُمِّيَّةُ، وَنَبِيُّهَا؟ فَنَحْنُ الْآخِرُونَ الْأَوَّلُونَ »
“আমরা হলাম জাতিসমূহের সর্বশেষ। কিন্তু কেয়ামতে আমাদের হিসাব সর্ব প্রথম করা হবে। তখন বলা হবে: উম্মী (আসল) জাতি ও তাদের নবী কোথায়? তাই আমরা সর্বশেষ অথচ (মর্যাদায়) প্রথম”। ³³

টিকাঃ
³¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৭৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৫৫。
³² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৫৬。
³³ ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪২৯০, আলবানী রহ. সহীহ আল জামে গ্রন্থে হাদীসটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00