📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীসমূহ সৃষ্টিশূন্য করা

📄 আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীসমূহ সৃষ্টিশূন্য করা


মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলা এরপর আকাশসমূহকে ডান হাতে আর পৃথিবীগুলোকে অন্য হাতে মুষ্ঠিবদ্ধ করবেন। অতঃপর বলবেন, কোথায় শক্তিধর স্বৈরাচারীরা? কোথায় অহংকারীরা?
আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেন,
﴿وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ، سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الزمر: ٦৭]
“আর তারা আল্লাহ-কে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্ঠিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭]
﴿يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَى السَّجِلِ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ، وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ ﴾ [الانبياء: ১০৪]
"সে দিন আমরা আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। নিশ্চয় আমি তা পালন করব”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৪]
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«يَقْبِضُ اللَّهُ الأَرْضَ، وَيَطْوِي السَّمَوَاتِ بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا المَلِكُ، أَيْنَ مُلُوكُ الأَرْضِ »
"আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী মুষ্ঠিবদ্ধ করবেন আর আকাশকে নিজ ডান হাতে ভাজ করে ধরবেন অতঃপর বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় আজ পৃথিবীর রাজা-বাদশাগণ?"¹⁰
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«يَطْوِي اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْيُمْنَى، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ. ثُمَّ يَطْوِي الْأَرَضِينَ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟ »
"কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আকাশসমূহকে ভাঁজ করে ফেলবেন। অতঃপর তা ডান হাতে ধারণ করবেন আর বলবেন, আমি বাদশা। কোথায় আজ স্বৈরাচরীরা? কোথায় আজ অহংকারীরা? এরপর পৃথিবীগুলোকে বাম হাতে ভাঁজ করে ধরবেন। অতঃপর বলবেন, কোথায় আজ স্বৈরাচরীরা? কোথায় আজ অহংকারীরা?"¹¹

টিকাঃ
¹⁰ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৮৭。
¹¹ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৮৮。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 হাশরের ময়দানের অবস্থা

📄 হাশরের ময়দানের অবস্থা


হাদীসে এসেছে: সাহল ইবন সা'আদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ، كَفُرْصَةِ النَّقِيَّ، لَيْسَ فِيهَا عَلَمُ لِأَحَدٍ»
"কিয়ামতের দিবসে মানুষকে সাদা পোড়ামাটি রংয়ের উদ্ভিদহীন একটি যমীনে একত্র করা হবে। যেখানে কারো জন্য কোনো আলামত থাকবে না"। ¹²
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তিনি বলতেন:
« يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ النِّسَاءُ وَالرَّجَالُ جَمِيعًا يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ ، قَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَائِشَةُ الْأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ »
"কিয়ামতের দিন মানুষকে উলঙ্গ, খালি পায়ে ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পুরুষ ও নারী সকলকে একত্র করা হবে আর একজন অপর জনের দিকে তাকাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে আয়েশা! সেদিন অবস্থা এমন ভয়াবহ হবে যে একজন অপর জনের দিকে তাকানোর ফুরসত পাবে না"। ¹³
কাফেররা অন্ধ ও চেহারার উপর ভর করে উপস্থিত হবে:
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ * قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا ۖ وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنسَىٰ ﴾ [طه: ١٢٤، ١٢٦]
“আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো”। [সূরা ত্বাহা, আয়াত: ১২৪-১২৬]
তিনি আরো বলেন,
﴿ وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْمًا وَصُمًّا ۖ مَّأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا ﴾ [الإسراء: ٩٧]
“আর আমরা কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম; যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৯৭]
হাদীসে এসেছে: আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,
« أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ يُحْشَرُ الكَافِرُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ: «أَلَيْسَ الَّذِي أَمْشَاهُ عَلَى الرَّجُلَيْنِ فِي الدُّنْيَا قَادِرًا عَلَى أَنْ يُمْشِيَهُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» قَالَ قَتَادَةُ: بَلَى وَعِزَّةِ رَبِّنَا »
“এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামতের দিন কাফিরদের কীভাবে চেহারার উপর উপুর করে উঠানো হবে? তিনি বললেন: যে মহান সত্ত্বা দুনিয়াতে দু'পা দিয়ে চলাচল করিয়েছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখ-মন্ডল দিয়ে চলাচল করাতে পারবেন না? কাতাদা বললেন: অবশ্যই তিনি পারবেন, মহান রবের সম্মানের কসম করে বলছি”। ¹⁴
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الْأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا، وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ»
“কিয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মাক্ত হবে। এমনকি যমীনের সত্তর হাত ঘামে ডুবে যাবে। তাদের ঘামে তারা কান পর্যন্ত ডুবে যাবে”। ¹⁵
মিকদাদ ইবন আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
« تُدْنَى الشَّمْسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْخَلْقِ، حَتَّى تَكُونَ مِنْهُمْ كَمِقْدَارِ مِيلٍ - قَالَ سُلَيْمُ بْنُ عَامِرٍ: فَوَاللهِ مَا أَدْرِي مَا يَعْنِي بِالْمِيلِ؟ أَمَسَافَةَ الْأَرْضِ، أَمِ الْمِيلَ الَّذِي تُكْتَحَلُ بِهِ الْعَيْنُ - قَالَ: فَيَكُونُ النَّاسُ عَلَى قَدْرِ أَعْمَالِهِمْ فِي الْعَرَقِ، فَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى كَعْبَيْهِ، وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى رُكْبَتَيْهِ، وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى حَقْوَيْهِ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُلْجِمُهُ الْعَرَقُ الْجَامًا» قَالَ: وَأَشَارَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ إِلَى فِيهِ »
“কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। এ সম্পর্কে সুলাইম ইবন আমের বলেন, আল্লাহর শপথ! মাইল বলতে এখানে কোনো মাইল তিনি বুঝিয়েছেন আমি তা জানি না। জমির দূরত্ব পরিমাপের মাইল বুঝিয়েছেন, না সুরমা দানির মাইল (শলাকা) বুঝিয়েছেন? মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে থাকবে। কারো ঘাম হবে পায়ের গিরা বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে হাটু বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে কোমর বরাবর। আবার কারো ঘামের পরিমাণ হবে তার মুখ বরাবর"। ¹⁶
হে আল্লাহর বান্দা! আপনি এভাবে চিন্তা করে দেখতে পারেন, আমার অবস্থা তখন কেমন হবে? আমি কি সেদিন সৌভাগ্যবান হবো না দুর্ভাগা? আমার জীবনের অধিকাংশ কাজ কি সৎ কাজ হয়েছে না পাপাচার বেশি হয়েছে? আমি কি মদ, ব্যভিচার, জুয়া, প্রতারণা, মিথ্যা কথা, দুর্নীতি, আমানতের খেয়ানত, অপরের সম্পদ আত্মসাৎ, অপরের মানহানি, অপরের দোষ চর্চা, অপবাদ, মিথ্যা মামলা-মুকাদ্দামা, সূদী কারবার, ঘুষ লেনদেন, খাবারে ভেজাল, ওয়াদা খেলাফী, ঋণ খেলাফী, ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব, ইসলাম অনুসারীদের নিয়ে উপহাস তামাশা ইত্যাদি অনৈতিক কাজগুলো পরিহার করে চলতে পেরেছি, না এগুলো ছিলো আমার জীবনের নিত্য দিনের সঙ্গী? কাজেই কিয়ামতের এ কঠিন দিনের মুখোমুখী হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ-কে ভয় করুন। সকল বিষয়ে আল্লাহ-কে ভয় করে সাবধানতার সাথে পথ চলুন। দুনিয়ার জীবনে একবার ব্যর্থ হলে তা কাটিয়ে উঠা যায়। কিন্তু কিয়ামতের সময়ের ব্যর্থতার কোনো প্রতিকার নেই। কাজেই এখন থেকেই নিজের আমলের হিসাব নিজে করতে থাকুন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجِأْتِءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى يَقُولُ يَالَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي ﴾ [الفجر: ٢١، ٢٤]
"কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে পরিপূর্ণভাবে। আর তোমার রব ও ফিরিশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। আর সেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু সেই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে? সে বলবে, হায়! যদি আমি কিছু আগে পাঠাতাম আমার এ জীবনের জন্য!" [সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ২১- ২৪]

টিকাঃ
¹² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৯০。
¹³ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৫৯。
¹⁴ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৬০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৬。
¹⁵ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৩২。
¹⁶ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৬৪。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 যারা সে দিন আল্লাহ তা‘আলার ছায়াতে আশ্রয় পাবে

📄 যারা সে দিন আল্লাহ তা‘আলার ছায়াতে আশ্রয় পাবে


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: «أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي »
"আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমারই জন্য পরস্পরকে ভালোবেসেছে তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় ছায়া দান করবো। আজ এমন দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই"। ¹⁷
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ: الإِمَامُ العَادِلُ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ، فَقَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ، أَخْفَى حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ »
"কিয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোনো ছায়া থাকবে না- ন্যায়পরায়ন বাদশাহ, এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে, ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশিষ্ট থাকে মসজিদের সাথে, এমন দু ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য, এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী নেতৃস্থানীয়া এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি, এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা”। ¹⁸
আবু ইয়াসার কা'আব ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِيرًا أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ »
"যে কোনো ঋণগ্রস্ত বা অভাবী ব্যক্তিকে সুযোগ দেবে অথবা তাকে ঋণ আদায় থেকে অব্যাহতি দেবে আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজ ছায়ায় আশ্রয় দিবেন"। ¹⁹

টিকাঃ
¹⁷ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৬。
¹⁸ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩১。
¹⁹ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩০২。

📘 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর > 📄 কিয়ামতের দিন যাকে প্রথম ডাকা হবে তিনি হলেন আদম আলাইহিস সালাম

📄 কিয়ামতের দিন যাকে প্রথম ডাকা হবে তিনি হলেন আদম আলাইহিস সালাম


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى يَوْمَ القِيَامَةِ آدَمُ، فَتَرَاءَى ذُرِّيَّتُهُ، فَيُقَالُ: هَذَا أَبُوكُمْ آدَمُ، فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ بَعْثَ جَهَنَّمَ مِنْ ذُرِّيَّتِكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ كَمْ أُخْرِجُ، فَيَقُولُ: أَخْرِجُ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ " فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذَا أُخِذَ مِنَّا مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، فَمَاذَا يَبْقَى مِنَّا؟ قَالَ: «إِنَّ أُمَّتِي فِي الْأُمَمِ كَالشَّعَرَةِ البَيْضَاءِ فِي القَوْرِ الأَسْوَدِ» »
"কিয়ামতের দিন যাকে প্রথম ডাকা হবে তিনি হলেন আদম আলাইহিস সালাম। তিনি তার সন্তানদের দেখবেন। বলা হবে এ হলো তোমাদের পিতা আদম। তিনি তখন বলবেন, উপস্থিত হয়েছি হে রব! আপনার কাছেই কল্যাণ। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তোমার সন্তানদের মধ্যে জাহান্নামবাসীদের নিয়ে আসো। আদম বলবেন, হে রব, কত জনকে নিয়ে আসবো? আল্লাহ বলবেন, শত করা নিরানব্বই জনকে নিয়ে আসো। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যখন আমাদের একশ জনের মধ্য হতে নিরানব্বই জনকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে তাহলে বাকী থাকবে কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন অন্যান্য উম্মতের সংখ্যার তুলনায় আমার উম্মত হবে এমন অল্প যেমন একটি কালো ষাড়ের গায়ে সাদা পশম থাকে"। ²⁰
আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« يَقُولُ اللَّهُ : يَا آدَمُ، فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالخَيْرُ فِي يَدَيْكَ، قَالَ: يَقُولُ: أَخْرِجْ بَعْثَ النَّارِ، قَالَ: وَمَا بَعْثَ النَّارِ؟ قَالَ: مِنْ كُلِّ أَلْفِ تِسْعَ مِائَةٍ وَتِسْعَةٌ وَتِسْعِينَ، فَذَاكَ حِينَ يَشِيبُ الصَّغِيرُ ( وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سَكْرَى وَمَا هُمْ بِسَكْرَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ ) " فَاشْتَدَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيُّنَا ذَلِكَ الرَّجُلُ؟ قَالَ: «أَبْشِرُوا، فَإِنَّ مِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ أَلْفًا وَمِنْكُمْ رَجُلٌ ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنِّي لَأَطْمَعُ أَنْ تَكُونُوا ثُلُثَ أَهْلِ الجَنَّةِ» قَالَ: فَحَمِدْنَا اللَّهَ وَكَبَّرْنَا، ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنِّي لَأَطْمَعُ أَنْ تَكُونُوا شَطْرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ، إِنَّ مَثَلَكُمْ فِي الأُمَمِ كَمَثَلِ الشَّعَرَةِ البَيْضَاءِ فِي جِلْدِ القَوْرِ الأَسْوَدِ، أَوِ الرَّحْمَةِ فِي ذِرَاعِ الحِمَارِ» »
“আল্লাহ বলবেন হে আদম! তখন আদম বলবেন, হে প্রভু আমি উপস্থিত। আপনার হাতেই সৌভাগ্য ও সকল কল্যাণ। আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদের আমার কাছে উপস্থিত করো। আদম বলবেন, কত জন জাহান্নামী? আল্লাহ বলবেন প্রতি হাজারে নয় শত নিরানব্বই জন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন এটা হলো সেই সময় যখন ভয়াবহ অবস্থার কারণে বাচ্চারাও বুড়ো হয়ে যাবে। প্রসব কারীনিরা প্রসব করে দেবে। আর তুমি মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্ত অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। সাহাবায়ে কেরামের কাছে বিষয়টা কঠিন মনে হলো। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে আমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি সে, যে মুক্তি পাবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, আমি আশা করি জান্নাতীদের চার ভাগের একভাগ হবে তোমরা। এ কথা শুনে আমরা আলহামদুলিল্লাহ বললাম ও আল্লাহ আকবর বললাম। তিনি বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, আমি আশা করি জান্নাতীদের তিন ভাগের একভাগ হবে তোমরা। এ কথা শুনে আমরা আলহামদুলিল্লাহ বললাম ও আল্লাহ আকবর বললাম। তিনি বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, আমি আশা করি জান্নাতীদের অর্ধেক হবে তোমরা। এ কথা শুনে আমরা আলহামদুলিল্লাহ বললাম ও আল্লাহ আকবর বললাম। তিনি বললেন, অন্যান্য জাতির তুলনায় তোমাদের সংখ্যা হবে এমন যেন একটি কালো ষাঁড়ের গায়ে কিছু সাদা লোম থাকে। অথবা গাধার পায়ের গোছার সাদা অংশের মতো"। ²¹
হাদীস দুটো থেকে শিক্ষা, মাসায়েল ও জ্ঞাতব্য:
এক. দেখা গেল এক হাদীসে শতকরা নিরানব্বই জন জাহান্নামী হবে বলা হয়েছে। আবার অন্য হাদীসটিতে এক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জনের কথা বলা হয়েছে। আসলে কোনটি সঠিক।
এর উত্তর হলো দুটোই সঠিক। যেখানে একশ জনে নিরানব্বই জনের কথা বলা হয়েছে সেখানে উম্মতে মুহাম্মাদী উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পরে যে সকল মানুষ জন্ম গ্রহণ করেছে তাদের একশজনের একজন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। আর যেখানে এক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জনের কথা বলা হয়েছে সেখানে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত মানুষ জন্ম নিয়েছে তাদের হাজারে একজন মুক্তি পাবে।
দুই. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতীদের চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগের এক ভাগ সর্বশেষে অর্ধেক হবে তার অনুসারীদের মধ্য থেকে যে কথা বলেছেন সেটা হলো তার আশা-আকাংখা। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এ আশা পূরণ করবেন বলে হাদীসে এসেছে।
তিন. উম্মতে মুহাম্মাদীর ফযীলত ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো এ হাদীস দিয়ে। মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে তারা জান্নাত বাসীদের মধ্যে সংখ্যায় অনেক বেশি হবে।
চার. যখন জাহান্নামী আর জান্নাতীদের বাছাই করা হবে তখনকার অবস্থার ভয়াবহতার একটি চিত্র এ হাদীসে তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ নিজে এ সম্পর্কে বলেছেন,
﴿ وَامْتَرُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ * أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَنبَنِي ءَادَمَ أَن لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ cَدُوٌّ مُّبِينٌ * وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ وَلَقَدْ أَضَلَّ مِنكُمْ جِبِلًا كَثِيرًا أَفَلَمْ تَكُونُوا تَعْقِلُونَ هَذِهِ جَهَنَّمُ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ أَصْلَوْهَا الْيَوْمَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ ﴾ [يس: ٥٩، ٦٤]
“আর (বলা হবে) হে অপরাধীরা, আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও। হে বনী আদম, আমি কি তোমাদেরকে এ মর্মে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের উপাসনা করো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? আর আমারই ইবাদাত কর। এটিই সরল পথ। আর অবশ্যই শয়তান তোমাদের বহু দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করনি? এটি সেই জাহান্নাম, যার সম্পর্কে তোমরা ওয়াদাপ্রাপ্ত হয়েছিলে। তোমরা যে কুফুরী করতে সে কারণে আজ তোমরা এতে প্রবেশ কর"। [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯-৬৪]
পাঁচ. ভালো কোনো কিছু শুনলে আলহামদুলিল্লাহ বলা ও আল্লাহু আকবর বলা সুন্নাত।

টিকাঃ
²⁰ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫২৯。
²¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২২。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00