📄 বই পাঠে পরামর্শ
অনেক সময় হতে পারে আপনি নির্ধারিত একটি শাস্ত্রের কিতাব পাঠ করবেন; কিন্তু সে শাস্ত্রে আপনার পঠিত কিতাবের তুলনায় সংক্ষিপ্ত ও সহজ অনেক কিতাব আছে, যাতে মূলনীতিগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেটিতে ফায়দাও বেশি। কিন্তু আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞাত এমন কারও সাথে পরামর্শ না করার কারণে আপনি তুলনামূলক জটিল কোনো বই পাঠে অনেক সময় ব্যয় করে ফেলবেন। এর ফলে খুব সামান্য ফায়দাই অর্জন করতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ : আপনি হয়তো 'আল-আরবাউন আন-নাবাবিয়্যাহ' বা 'বুলুগুল মারাম' অথবা 'মিনহাজুস সালিকিন'-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ পাঠ করতে চান। এখন যদি ব্যাখ্যাতাদের নীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার জানা না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনার বড় বড় শাইখদের, তারপর বড় তালিবে ইলমদের জিজ্ঞেস করবেন; যেন তারা আপনাকে আপনার উপযোগী একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নির্বাচন করে দিতে পারেন। আর এভাবে আপনি সহজে বেশি বেশি ফায়দা অর্জন করতে পারবেন এবং বেশি বেশি পাঠ করতে পারবেন।
📄 সর্বোত্তম সংস্করণ নির্বাচন করা
কোনো কিতাব পাঠ করার আগে আপনি আপনার শাইখদের এবং তারপর বড় তালিবে ইলমদের সাথে উপযুক্ত সংস্করণ গ্রহণের ব্যাপারে পরামর্শ করুন। অনেক সময় একটি কিতাবের অনেকগুলো সংস্করণ থাকতে পারে এবং তা ভিন্নও হতে পারে। কিছু আছে নানান বিভ্রাট ও ভুলে ভরা।
যখন কোনো তালিবে ইলম তার চেয়ে অভিজ্ঞ কারও সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করে নেবে, তখন সে ভালো সংস্করণের বই নির্বাচন করে সহজে উপকৃত হতে পারবে। যদি পরামর্শ না করে, তাহলে তার বহু সময় নষ্ট হতে পারে। পরামর্শের ফলে তার এই সময় নষ্ট থেকে সে বেঁচে যাবে।
কিছু কিছু সংস্করণে জঘন্য অনেক ভুল ও উদাহরণ রয়েছে। তারপরও আপনি দেখবেন, কিছু ছাত্র পরামর্শ ছাড়াই এসব কিতাব পাঠ করে; ফলে ভুল তথ্য গ্রহণ করে।
এখানে আমি সুন্দর একটি বিষয় তুলে ধরছি। আমি ইমাম আজ-জাহাবি -এর ‘মিজানুল ইতিদাল’ কিতাবটি পাঠ করছিলাম। পাঠের একপর্যায়ে ইমাম আদ-দাওলাবি -এর জীবনী নিয়ে এই বাক্যটি পেলাম :
تكلموا فيه لما تبين من أمره الأخير
‘তোমরা তার সর্বশেষ যে বিষয় প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে কথা বলো।’
এই বাক্যটি মূলত ইমাম আদ-দারাকুতনি দাওলাবির ব্যাপারে করা সাহামির প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন। এর অর্থ হলো, দাওলাবি সর্বশেষ একটি বিষয় অর্জন করেছেন। আমি সর্বশেষ সে বিষয়টি খুঁজতে থাকি যে, তা কি এলোমেলো কোনো বিষয়? না আকিদার কোনো বিষয়? ফলে আমি ইমাম আদ-দারাকুতনির 'সুওয়ালাতুস সাহামি' নামক কিতাবটি অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। সেখানে দেখলাম, উপরিউক্ত বাক্যটি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে :
تكلموا فيه، ما تبين من أمره إلا خير
'তোমরা তাকে নিয়ে কথা বলো। কারণ, তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।'
মিজানুল ইতিদালের সংস্করণটির প্রতি লক্ষ করুন। এখানে (إِلَّا) কে (خَيْر)-এর সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে (الأخِي) হয়ে গেছে। ফলে পুরো অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। 'সুওয়ালাতুস সাহামি' গ্রন্থটি তা সংশোধন করে দিয়েছে। 'মিজানুল ইতিদাল'-এর এই সংস্করণে যা আছে, তা তার জন্য অপমানজনক।
সুতরাং হে তালিবে ইলম, পড়ার আগে পরামর্শ করে পঠিতব্য গ্রন্থের সর্বোত্তম সংস্করণ নির্বাচন করে নেবেন।
📄 সংক্ষিপ্ত বই দ্বারা পাঠ শুরু করা
অধ্যয়নে আগ্রহী নতুন অনেক যুবক শুরুতে খুব উদ্যমী ও দুঃসাহসী হয়ে থাকে। এটি প্রশংসনীয় একটি বিষয়। কিন্তু তারা আলিম ও বড় তালিবে ইলমদের সাথে পরামর্শ ছাড়াই কিতাব অধ্যয়ন শুরু করে। সময়ের তালে তালে একসময় তাদের মাঝে ক্লান্তি দেখা দেয় এবং দুর্বলতা তাদের ঘায়েল করে ফেলে। ফলে তারা এক ধরনের অলসতা অনুভব করে। আর এভাবে সে একসময় ইলমের পথ থেকেই ছিটকে পড়ে।
তাই তালিবে ইলমের জন্য এটি জানা জরুরি যে, ইলমের পথ অনেক দীর্ঘ। যে তা খুব দ্রুত অর্জন করতে চাইবে, সে তা দ্রুত বর্জন করবে।
📄 পঠিতব্য কিতাব সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে, তা পাঠের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া
উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি 'আল-আরবাউন আন- নাবাবিয়্যাহ'-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'শারহু ইবনি রজব' পড়তে চান, অথবা 'বুলুগুল মারাম'-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইমাম সানআনি -এর 'সুবুলুস সালাম' পাঠ করতে চান, তাহলে 'সুবুলুস সালাম'-এর ব্যাপারে আগে পাঠ করুন। লেখকের পদ্ধতি, পরিভাষা এবং সিস্টেম জেনে নিন। সাথে সাথে লেখকের জীবনীও পাঠ করুন। এ জাতীয় বিষয়গুলো আপনাকে লেখকের পদ্ধতির প্রতি ভালোবাসা, বুঝ এবং আয়ত্তের বিষয়টি দান করবে। পড়া অবস্থায় আপনার পথ আলোকিত করবে। পক্ষান্তরে যখন আপনি বইয়ের লেখক বা তার পদ্ধতি ও পরিভাষার ব্যাপারে কিছুই না জেনে বইয়ের মূল পাঠ পড়বেন, তো অনেক সময় দেখা যাবে যে, কিতাবের মাঝখানে এমন একটি পরিভাষা আসবে—আপনি তার ভুল ব্যাখ্যা করবেন বা তাকে অন্য কোনো পরিভাষার ওপর অনুমান করবেন; ফলে এই অনুমান সঠিক হবে না।
উদাহরণস্বরূপ ইবনে হাজার -এর কিতাব 'তাকরিবুত তাহজিব'-এ (৩)-এর সংকেত ইমাম সুয়ুতি -এর কিতাব 'আল-জামিউস সগির'-এর (৩)-এর সংকেতের বিপরীত; 'তাকরিবুত তাহজিব'-এ (৩) দ্বারা ইশারা করা হয়েছে ইবনে মাজাহ আল-কাজবিনি -এর দিকে; অথচ 'আল-জামিউস সগির'-এ এর মাধ্যমে তাদের কথা 'মুত্তাফাক আলাইহি' ইশারা করা হয়েছে।
'মুত্তাফাক আলাইহি' দ্বারা মাজদুদ্দিন ইবনে তাইমিয়া -এর 'মুনতাকাল আখবার'-এ উদ্দেশ্য করা হয়েছে : ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারি ও মুসলিমকে; অথচ অন্যদের কাছে 'মুত্তাফাক আলাইহি' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শুধু ইমাম বুখারি ও মুসলিম।
সাংকেতিক অর্থের ভিন্নতা সম্পর্কে এই হলো কিছু উদাহরণ। সুতরাং ব্যাখ্যাতাদের পরিভাষা ও মানহাজ কীভাবে তাদের বিধানের ক্ষেত্রে এক হতে পারে?