📄 যে মূল পাঠটি মুখস্থ করা হবে, তা হরকত দিয়ে সাজিয়ে নেওয়া
হাফিজ ইবনুস সালাহ বলেন : 'লেখায় নুকতার ব্যবহার অস্পষ্টতা থেকে বারণ করে এবং লেখাকে হরকতযুক্ত করলে তা কাঠিন্য বারণ করে।'¹⁴
অর্থাৎ মতন মুখস্থের পূর্বে তা হরকত দিয়ে পড়ার চেষ্টা করুন। যদি মতন হরকতযুক্ত হয়, তাহলে আপনি সুন্দরভাবে তা মুখস্থ করতে পারবেন। কিন্তু যখন মতন হরকতযুক্ত হবে না, তখন ভাষায় দক্ষ কারও কাছে গিয়ে তা পাঠ করতে পারলে করে নিন; যেন শব্দের বিশুদ্ধ উচ্চারণের সাথে আপনার মুখস্থের বিষয়টি আত্মস্থ হয়।
এটি সবাই জানে যে, যে নিজেকে হরকত দিয়ে মতন মুখস্থ করায় অভ্যস্ত করে নিয়েছে এবং হরকত দিয়ে তা পড়েছে, সেই এ বিষয় আয়ত্তে দৃঢ় যোগ্যতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে ওই ব্যক্তির অবস্থা এর বিপরীত, যে উদাসীন হয়ে মতন মুখস্থ করে; ফলে কখনো পেশের জায়গায় জবর পড়ে এবং জবরের জায়গায় পেশ পড়ে। আর এভাবেই তার পড়ায় অনেক ভুল থেকে যায়।
বিষয়টি যেহেতু এমন; তাই হে তালিবে ইলম, মতনের প্রতিটি অংশে হরকত দিয়ে নিন। তিলাওয়াতের বিষয়টিও এমনই। যখন কেউ কোনো সুরা মুখস্থ করার ইচ্ছা করে; কিন্তু সে কোনো কারি বা সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করতে পারে এমন কারও তিলাওয়াত শ্রবণ না করে, তাহলে সে অনেক কিছুই ভুলভাবে মুখস্থ করে বসবে। কিন্তু যদি সে হরকতগুলো সঠিকভাবে লাগিয়ে মুখস্থ করে, তাহলে এটি অবশ্যই তাকে জিহ্বার সঠিক উচ্চারণে থাকতে সাহায্য করবে এবং তাকে ভাষাগত যোগ্যতাও দান করবে।
টিকাঃ
১৪. মুকাদ্দামাতু ইবনিস সালাহ ফি উলুমিল হাদিস: ৮৯ পৃ.
📄 যেসব জিনিস কঠিন বা যা মুখস্থ রাখা কঠিন, তার জন্য বর্ণগত পরিভাষা বা নিয়ম বানিয়ে নেওয়া
অনেক সময় মতনে এমন কিছু শব্দ বা বাক্য থাকে, অধিকাংশ সময় তা মুখস্থ রাখতে গিয়ে ভুল হয়ে যায় বা মুখস্থের শুরু পর্যায়ে তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আপনি সব সময় তা পাঠ করতে গিয়ে ভুলের শিকার হবেন। এটি প্রসিদ্ধ একটি বিষয়। আর এর সমাধানে আপনি নিজের মাথায় বিশেষ একটি নিয়ম মুখস্থ করে নিন।
আমি আপনার জন্য এমন কিছু উদাহরণ পেশ করছি, যা সকলেই মুখস্থ করে থাকে : যদি আমি আপনাদের কাউকে বলি যে, সংখ্যাবাচক আরবি হরফগুলো বলুন, যা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। এখন যদি তার জেহেনে সংখ্যাবাচক আরবি হরফগুলো নির্ধারিত কোনো বাক্যে সাজানো না থাকে—চাই কবিতা আকারে হোক বা ছন্দ আকারে—তাহলে অধিকাংশ সময় হয়তো সে একই হরফ একাধিকবার পড়ে ফেলবে, না হয় কোনো হরফ ছেড়ে দেবে। কিন্তু যখন সে আরবদের কথা অনুযায়ী এভাবে মুখস্থ করে নেবে, তখন আর এই সমস্যা হবে না :
أبجد هوز.... الخ
এভাবে সুন্দর মুখস্থ হয়ে যাবে।
আরেকটি উদাহরণ : যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'ইদগামের হরফগুলো কী কী?' এখন যদি সে সবগুলো হরফ কোনো সুন্দর নিয়ম ছাড়া বলে দিতে চায়, তাহলে হয়তো বাড়িয়ে বলবে, না হয় কমিয়ে বলবে, অন্যথায় একই হরফ একাধিকবার বলবে; কিন্তু যদি সে সবগুলো হরফ একই শব্দে এভাবে বলে দেয়: (يَرْمَلُوْنَ), তাহলে কিস্সা খতম হয়ে যায়।
আরেকটি উদাহরণ : কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠের কার্যক্রম বিষয়ে। সেখানে হাওজে কাওসার থাকবে, পুলসিরাত থাকবে এবং মিজান বা দাঁড়িপাল্লাও থাকবে। তো এখানে ধারাবাহিক কাজগুলো কীভাবে হবে, তা মুখস্থ রাখা আমার জন্য অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত। আমি অনেক অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসার পর বুঝতে পারলাম যে, এ ব্যাপারে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো, হাওজে কাওসার হলো প্রথম, এরপর মিজান এবং তারপর পুলসিরাত। কিন্তু সমস্যা হলো কিছু দিন পর যখন আমি সঠিক মতটি বের করতে যাই, তখন আমার সামনে সব গুলিয়ে যায়। তাই আমি আমার মাথায় একটি শব্দ মুখস্থ করে রাখলাম : (حمص)।
অর্থাৎ ح - হাওজ; م - মিজান; ص - সিরাত। এ পদ্ধতিতে মনে রাখার কারণে আল্লাহর অনুগ্রহে আমি আর কখনো তা ভুলিনি।
আমি নিশ্চিত যে, আপনারা মরে যাবেন; কিন্তু কখনো তা ভুলে যাবেন না; কারণ, এটি আপনাদের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেছে। আল্লাহ চাহে তো দীর্ঘ দিন কল্যাণের ওপর থাকার পরেও ভুলবেন না।
📄 নফসকে মুখস্থের ওপর অভ্যস্ত করে তোলা এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া
নফসকে যখন আপনি কোনো বিষয়ে অভ্যস্ত করে তুলবেন, তখন সে ওই বিষয়ের ওপর অভ্যস্ত হয়ে যাবে। কবি বলেন:
والنفس كالطفل إن تهمله شب على حب الرضاع وإن تفطمه ينفطم
'নফস হলো (দুদপানকারী) শিশুর মতো; যদি আপনি তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন, তাহলে সে স্তন্যপানের ভালোবাসায় বড় হয়ে উঠবে। আর যদি তাকে দুধ ছাড়িয়ে দেন, তাহলে দুধ-ছাড়া হয়ে বেড়ে উঠবে।'
কবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ কথা হলো আমাদের নবি -এর কথা : )... إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ ( “নিশ্চয় ইলম আসে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে।...'¹⁵
এই হাদিসটি পেছনে গত হয়েছে। যখন আপনি নিজের মনকে কোনো একটি বিষয়ে অভ্যস্ত করে তুলবেন, তখন সে ওই বিষয়টি পছন্দ করবে এবং তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। জনৈক আলিম বলতেন, 'আমি প্রতিদিন মুখস্থ করতাম; যদিও একটি লাইন হতো। যেন আমি মুখস্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যাই।'
কারণ, নফসের মাঝে কিছু শক্তি আছে। যদি আপনি সেগুলোকে ফেলে রাখেন, তাহলে তা পরিত্যক্ত কূপের মতো হয়ে যাবে। খলিল বিন আহমাদ আল-ফারাহিদি বলেন : 'প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মগতভাবেই কাব্যিক যোগ্যতা রয়েছে। যদি সে তা কাজে লাগায়, তাহলে তা বিচ্ছুরিত হয়। আর যদি ছেড়ে দেয়, তাহলে তা ডুবে যায়।'
মুখস্থ, বোঝা এবং পড়ার বিষয়টিও তেমনই; যদি মনকে তাতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়, তাহলে সে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং তার জন্য তা সহজ হয়ে যায়।
টিকাঃ
১৫. আল-মুজামুল আওসাত: ২৬৬৩, সহিহুল জামিয়িস সগির : ২৩২৮।
📄 মুখস্থকৃত বিষয়ের যত্ন নেওয়া এবং নিজের সাথে বা অন্যের সাথে তা বারবার আলোচনা করা
অনেক সময় মানুষ কোনো জিনিস মুখস্থ করে নিজে নিজে তা অবিচলভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয় না; বরং আল্লাহ তাআলার সাহায্যের পর তাকে তার কোনো ভাইয়ের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। আর এটি তার জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী প্রমাণিত হয়। অনেক সময় ইবনে আব্বাস মুজাহিদ-এর সাথে বের হতেন এবং বলতেন, 'হে মুজাহিদ, তুমি আমাকে পড়ে শোনাও আর আমিও তোমাকে পড়ে শোনাব।'
এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মুখস্থকৃত বিষয়টি জেহেনে ভালোভাবে গেঁথে নিতেন। আপনি যখন এমন কোনো সাথি পাবেন, যে আপনার মুখস্থে সাহায্য করবে এবং আপনার সাথে বিশেষ কিছু গুণে সে একত্রিত হবে, তখন আল্লাহর অনুগ্রহের পর তার থেকে সাহায্য গ্রহণ করুন। আপনি তাকে পড়ে শুনান এবং সে আপনাকে পড়ে শুনাবে। আপনি তার সামনে তাকরার বা পুনরাবৃত্তি করুন এবং সে আপনার সামনে পুনরাবৃত্তি করবে। আর এর যে ফল বের হবে, তা আপনাকে আনন্দিত করবে।
আমি জনৈক তালিবে ইলমকে জানি, যে বলেছিল, 'যখন আমি কোনো বিষয় মুখস্থের ইচ্ছা করি, তখন আমার ভয়েস ক্যাসেটে তা রেকর্ড করি। এরপর আমি নিজ কানে তা দশবার শ্রবণ করি; ফলে আমার জেহেনে তা দৃঢ়ভাবে বসে যায়। এমনকি বহু সময় অতিবাহিত হলেও আমি তা ভুলি না।' এটি পরীক্ষিত একটি বিষয়।
যা-ই হোক, নিয়ম সেটিই, যা আমি বলেছি : অর্থাৎ একটি সিস্টেম আপনি নিজের জন্য সুবিধাজনক পাবেন এবং মন তা দ্রুত গ্রহণ করে নেবে, তাহলে এই পদ্ধতিটিই আপনি গ্রহণ করুন এবং এরচেয়ে উত্তম পদ্ধতি না পাওয়া পর্যন্ত তা ছেড়ে দেবেন না।