📄 অষ্টম বিষয় : উপদেশ গ্রহণ এবং নিজের পরিচিত ও সমবয়সীদের প্রতি লক্ষ করা
আপনি আপনার পরিচিত বা আশপাশের তালিবে ইলমদের দিকে লক্ষ করলে এমন কিছু ইলমপিপাসুকে দেখবেন, যারা বয়সে আপনার চেয়ে ছোট; কিন্তু আপনার তুলনায় অনেক বেশি ইলম অর্জন করেছে। আপনি এখানে এমন অনেককে পাবেন, যাদের কাছে ইলম অর্জনে প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণও নেই; কিন্তু আপনার কাছে সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে, তবুও তারা ইলমের দিক দিয়ে আপনার চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করেছে। এই তুলনা ও পার্থক্য আপনাকে তাদের মতো হতে বা তাদের চেয়ে উত্তম হতে উদ্বুদ্ধ করবে। আপনি যখন নিজের সাথিদের দিকে তাকাবেন, তখন অনেক পার্থক্য দেখতে পাবেন। যে আপনার থেকে সম্পদে কম এবং যার আসবাবও পর্যাপ্ত পরিমাণ নেই, তার প্রতি লক্ষ করুন। যখন এদের থেকে এমন কাউকে পাবেন, যে ইলমের দিক দিয়ে আপনাকে ছাড়িয়ে গেছে, তখন অবশ্যই তাকে দেখে আপনার হিম্মত শক্তিশালী হবে এবং আপনি তখন তার প্রতি ঈর্ষা করবেন, হিংসা নয়।
📄 নবম বিষয় : সময়ের বিন্যাস
সময়ের বিন্যাস এবং নিজের প্রতিটি মুহূর্তের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার চেষ্টা করা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তালিবে ইলমকে সময়ের ব্যাপারে মানুষের মাঝে সবচেয়ে কৃপণ হতে হবে; যেন তার কোনো সময় অনর্থক নষ্ট না হয়ে যায়। আর ইলমের প্রচার ও মানুষের উপকারের ক্ষেত্রে তাকে সর্বাধিক উদার হতে হবে। সুতরাং আপনি নিজের সময়ের প্রতি খেয়াল করুন। ইলম অন্বেষণ ব্যতীত আপনার কত সময় যে নষ্ট হয়ে যায়! বিশেষ করে যে যুবক ইলম অন্বেষণে আগ্রহী, তার ক্ষেত্রে তো বিষয়টি আরও ভয়াবহ!
জনৈক সালাফ বলেন, 'যেদিন আমার এমতাবস্থায় অতিবাহিত হয় যে, তাতে আমার ইলমের কোনো বৃদ্ধি ঘটেনি, সেদিনে আমার জন্য কোনো বরকত থাকে না।'
আমির বিন কাইসের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, জনৈক লোক তাকে বলল, 'আমার সাথে (কিছুক্ষণ) কথা বলুন।' তিনি তাকে বললেন, 'সূর্যকে আটকিয়ে রাখো (তবেই আমি তোমার সাথে কথা বলব)।'
ইবনুল জাওজি -এর সাথে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করত, যাদের সাক্ষাতে সময় নষ্ট করা ছাড়া কোনো ফায়দা ছিল না। তিনি তাঁর এ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন :
'আমি তাদের সাক্ষাতের সময়ে এমন কিছু কাজ তৈরি করে রাখতাম, যা তাদের সাথে কথা বলা থেকে আমাকে বারণ করত; যেন আমার সময়গুলো অনর্থক কেটে না যায়। সুতরাং তাদের সাক্ষাতের সময়ে আমি কাগজ কাটা, কলম ধার করা এবং নোটবুকগুলো গুছানোর কাজ করতে থাকতাম। কারণ, এসব কাজের জন্য তেমন কোনো মনোযোগ ও চিন্তা-ফিকিরের প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং তাদের সাক্ষাতের সময়ের জন্য আমি এগুলো গুছিয়ে রাখতাম; যেন আমার কোনো একটি সময়ও বিনষ্ট না হয়।'⁷
সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। আমাদের হাতে তো অনেক সময় অবসর থাকে! সুতরাং এ সময়গুলোকে আমাদের কাজে লাগানোর জন্য এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে; যেন তা অযথা না কাটে। কিছু লোক সময়ের মাঝে বরকত পায় না। এমন লোকদের বলব, বরকত আছে; কিন্তু নিজেদের অবাধ্যতা ও বিশৃঙ্খলা তা ঢেকে দেয়। যদি আমরা আমাদের শাইখদের প্রতি লক্ষ করি, তাহলে দেখব যে, তাদের অনেক ব্যস্ততা সত্ত্বেও সময়ের হিফাজতে কত সুন্দর রুটিন ছিল তাদের! কারণ, তারা প্রত্যেকের হক এবং প্রত্যেক প্রাপকের পাপ্য দিয়ে দিতেন যথাসময়ে প্রথমত আল্লাহ তাআলার তাওফিকে এবং দ্বিতীয়ত সময়ের ব্যাপারে যত্নশীলতার মাধ্যমে।
টিকাঃ
৬. সাইদুল খাতির : ২০ পৃ.।
৭. সাইদুল খাতির: ২২৮ পৃ.।
📄 দশম বিষয় : নিজের মুখস্থকৃত, উপলব্ধ বা পঠিত বিষয়ের তাকরার (পুনরাবৃত্তি) করা
তালিবে ইলমের জন্য এমনটি করা আবশ্যক। কারণ, এর মাধ্যমে বিষয়টি জেহেনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায়। পবিত্র কুরআনের জ্ঞানের অধিকারী জনৈক আলিম বলেন, 'যে দ্রুত মুখস্থ করে, সে দ্রুত ভুলে যায়। আর যে অন্তত পাঁচ বার পড়ে পাঠ শেষ করে, সে তার পাঠ (সহজে) ভুলে না।'
সুতরাং যখন কোনো তথ্যের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার ইচ্ছা করা হবে, তখন তা বারবার আলোচনা, পুনরাবৃত্তি এবং তার ব্যাপারে অন্যকে অবহিত করা হলো, তা দৃঢ়ভাবে জেহেনে বসে যাওয়া ও স্থায়ী হওয়ার মাধ্যমসমূহ থেকে কিছু মাধ্যম।
এখানে নবিজি থেকে বর্ণিত একটি সুন্দর বিষয়ও তুলে ধরতে হয় যে, তিনি বলেন :
وَإِذَا قَامَ صَاحِبُ الْقُرْآنِ فَقَرَأَهُ بِاللَّيْلِ، وَالنَّهَارِ ذَكَرَهُ، وَإِذَا لَمْ يَقُمْ بِهِ نَسِيَهُ
'কুরআনের হাফিজ যদি দিবা-রাত্রি নামাজে দাঁড়িয়ে তা তিলাওয়াত করে, তাহলে সে তা স্মরণে রাখে; অন্যথায় সে তা ভুলে যায়।
বর্ণিত আছে যে, ইবনে উমর সুরা আল-বাকারা মুখস্থে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়েছেন।
📄 এগারোতম বিষয় : ইলমের প্রসার
আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের নিয়তে আপনি যা শুনেছেন, যা পড়েছেন এবং যা বুঝেছেন, তা প্রসার করবেন। এরপর নিয়ত রাখবেন, ইলমের দৃঢ়তা এবং মানুষের উপকার করার। লক্ষ করুন, যখন আপনি একটি ফায়দাজনক কথা শুনলেন, তারপর জাইদ বা আমর অথবা আপনার পরিবার বা প্রিয়জনদের কাউকে তা শুনিয়ে দিলেন, তখন আপনি অনেক ফায়দার অধিকারী হলেন।
কিছু ফায়দা :
– ইলমের প্রসার
- উপকারের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়া।
- সব সময় আপনার সাওয়াব পেতে থাকা। বরং ফায়দা গ্রহণ করতে চেয়েছে এমন প্রত্যেকের অথবা আপনার জীবদ্দশায় বা আপনার মৃত্যুর পর যার কাছেই তা পৌঁছবে, আপনি তাদের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবেন। আর এতে তাদের প্রতিদানের কোনো অংশই কমে যাবে না।
টিকাঃ
৮. সহিহু মুসলিম : ৭৮৯, সহিহু মুসলিম বি শারহিন নববি : ৬/৭৬।
৯. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া 'মুকাদ্দামা ফি উসুলিত তাফসির'-এ ইমাম মালিক থেকে এটি নকল করেন।