📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 নিজ ব্যক্তিত্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত

📄 নিজ ব্যক্তিত্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত


আখিরাতে উঁচু মর্যাদা-প্রত্যাশী ব্যক্তি ইবাদত, জ্ঞান, জিকির ও আনুগত্যের যত শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করুক না কেন, তথাপি সে নিজেকে সীমালঙ্ঘনকারী, পাপী ও নিতান্ত তুচ্ছ মনে করে এবং নিজ আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারে না।

• আল্লাহর পরিচয় লাভকারী জনৈক পূণ্যবান ব্যক্তি, 'যখন তুমি নিজ ব্যক্তিত্ব ও আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্টি ও আত্মতৃপ্তিতে ভোগো, তখন বুঝে নাও যে, স্বীয় রব এখনও তোমার ওপর সন্তুষ্ট নন। পক্ষান্তরে যদি তুমি নিজেকে সব ধরনের ত্রুটি, কদর্যতা, কলুষতা ও বিপদাপদের উৎস মনে করো, তুমি যত স্বল্প আমলই করো না কেন, এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করো যে, মহান রব তোমার ওপর সন্তুষ্ট।'

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আনুগত্যে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা নফসের কদর্যতা ও নির্বুদ্ধিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে, সাথে সাথে আল্লাহর হক ও তাঁর মান অনুযায়ী ইবাদত পালনে মূর্খতার প্রমাণ বহন করে।

• উতবা বিন গজওয়ান সর্বদা এই দুআ পাঠ করতেন :

إِنِّي أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ فِي نَفْسِي عَظِيمًا، وَعِنْدَ اللَّهِ صَغِيرًا
'আমি নিজের কাছে বড় ও আল্লাহর কাছে ছোট হওয়া থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'

• আবু বকর বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ক্রোধান্বিত হয়, আল্লাহও তাকে স্বীয় ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি থেকে নিরাপদ করে দেন।'

সত্যবাদীদের কতিপয় গুণাবলি

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহর জন্য প্রচণ্ড ক্রোধ ও শত্রুতা সত্যবাদীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বান্দা এই একটি মাত্র বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মুহূর্তেই রবের নৈকট্যের এমন উঁচু স্তরে পৌঁছে যায়, যা সাধারণত অন্য কোনো সৎকর্ম সম্পাদনে কল্পনা করাও যায় না।

• সুতরাং হে প্রিয় ভাই, নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো দিয়ে নিজ আত্মাকে জিজ্ঞেস করুন; যেন আপনি রবের জন্য (কাফিরদের প্রতি) প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত ও বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারেন।
* আপনার কাছে প্রকৃত ইমান ও একনিষ্ঠতার মতো মহাসম্পদ কি রয়েছে?
* আপনি কি প্রকৃত সত্যবাদিতাকে তার সব শাখাসহ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন?
* আপনি কি স্বীয় রবের ইবাদতের ক্ষেত্রে ইহসানের স্তরে উন্নীত হতে পেরেছেন?
* আপনি কি স্বীয় রবের যথাযথ ইবাদত পালনে সর্বদা তৎপর?
* আপনি কি সত্যিকারার্থে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করেন?
* আপনি কি স্বীয় নামাজে পূর্ণ নিষ্ঠাসহ একাগ্রতার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছেন?
* আপনি কি কুরআনে শাস্তির আয়াতসমূহ শ্রবণকালে স্বীয় রবের ভয়ে ক্রন্দন করেন?
* আপনি কি স্বীয় রবের সাথে একান্ত আলাপে ও আনুগত্যের স্বাদ আস্বাদনে সফল হয়েছেন?
* আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রচণ্ড আগ্রহ আপনার হয়েছে কি?
* আপনি স্বীয় অন্তরকে আত্মার যাবতীয় রোগব্যাধি তথা লৌকিকতা, হিংসা, মন্দ ধারণা, আত্মগর্ব ও অহংকার প্রভৃতি থেকে পবিত্র করছেন কি?
* স্বীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে সংরক্ষণ করছেন কি?
* কুরআনের মহত্ত্ব ও মর্যাদা আপনার অন্তরে গভীরভাবে দাগ কেটেছে কি?
* আপনার বাহ্যিক অবস্থা অভ্যন্তরের পরিপূর্ণ মুখপাত্র হয়েছে কি? প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবস্থার মাঝে কোনো রকমের বৈপরীত্য কি আপনি লক্ষ করছেন?
* বাস্তবিক অর্থে কি আপনি তাকওয়া অর্জনে সক্ষম হয়েছেন?
* কুরআনে বর্ণিত মুমিনের যাবতীয় গুণে গুণান্বিত হয়েছেন কি?
* আপনি মুনাফিকদের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য থেকে নিজেকে পূত-পবিত্র রেখেছেন কি? যা শতাধিক বা তার চেয়েও বেশি।
* কথা ও কাজের মাধ্যমে আপনি কি আল্লাহর পথের একনিষ্ঠ দায়ি (আহ্বানকারী) হতে পেরেছেন?
* আসতাগফিরুল্লাহ বলার সময় আপনার অন্তর ও জবান কি একাত্ম হয়েছে?
* মাখলুকের বড়ত্ব ও মহত্ত্বের ওপর স্বীয় রবের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব আপনার নিকট প্রাধান্য পেয়েছে কি?

কতিপয় বড় বড় বিপদ

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বলেন, 'মানুষের ওপর আপতিত সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, নিজের অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটির কথা জানা সত্ত্বেও কোনো কিছুর পরোয়া না করা এবং গুনাহের দরুন অনুতপ্তও না হওয়া।'

মুমিন ও অবাধ্য ব্যক্তিদের নিকট গুনাহের ভিন্ন ভিন্ন রূপ

ইবনে মাসউদ বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি নিজ পাপকে এমন ভয়ংকর বস্তু হিসেবে দেখে, যেন সে কোনো পতনোন্মুখ পর্বতের নিচে বসে আছে! যে পর্বতটি যেকোনো মুহূর্তে তার মাথায় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পক্ষান্তরে পাপী ও অবাধ্য ব্যক্তি নিজ পাপকে নাকের ডগায় উপবিষ্ট সামান্য মশা-মাছির মতো মনে করে এবং তুচ্ছ করে বলে যে, এটা তো সামান্য ব্যাপারমাত্র!'

আত্মতৃপ্ত ও অহংকারী ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য

১. সময়ের সঠিক মূল্যায়ন ও যথাযথ ব্যবহারে শিথিলতা প্রদর্শন করা।
২. সদা নিজ নফসের দাসত্ব করা, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা।
৩. আত্মতৃপ্তি ও নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্টিতে ভোগা。

ইবনে রজব বলেন, 'মুমিন ব্যক্তির উচিত সর্বদা নিজেকে নীচু ও খাটো করে দেখা। কেননা, এই উপলব্ধির মাধ্যমে সে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মহামূল্যবান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।

যাবতীয় উপকারী বিষয় অজর্নে সর্বদা অক্লান্ত পরিশ্রমী ও তৎপর হয়।

নিজেকে সর্বদা অপরিপূর্ণ ও অপরিপক্ক মনে হয়।

• নিজেকে হীন ও তুচ্ছ জ্ঞান করার গুরুত্ব
একদা আয়িশা -কে আল্লাহর বাণী: }وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ{ ['এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।' ] এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, তারা ওই সমস্ত পুণ্যবান ব্যক্তি, যারা সৎকর্ম সম্পাদনে

সর্বদা বদ্ধপরিকর। সাথে সাথে স্বীয় রবের নিকট তাদের ওই তুচ্ছ আমলের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারেও শঙ্কা অনুভব করে।'

- ইবনে বাত্তাল বলেন, 'সালাফের সবাই এই বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাই তারা স্বীয় রবের উপাসনায় সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেও নিজেদের নিতান্তই তুচ্ছ ও যাবতীয় ভুল-ত্রুটির কেন্দ্রভূমি মনে করতেন।'

ইমাম ইবনে তাইমিয়া সব সময় বলতেন, 'আমার কোনো যোগ্যতা নেই, কোথাও আমার কোনো ধরনের অবদান ও ভূমিকা নেই। আমি নিতান্ত দুর্বল ক্ষীণকায়, রক্তমাংসে গড়া একজন তুচ্ছ ব্যক্তিমাত্র।'

• ইবনুল কাইয়িম -এর নিম্নোক্ত বাক্যটির ওপর গভীরভাবে লক্ষ করুন।
'যার আনুগত্য যত বেশি হবে, তার তাওবা-ইসতিগফারও তত বেশি হবে।'

তিনি আসলে সত্যিই বলেছেন। কেননা, স্বীয় রবের আনুগত্য ও ইমান যার যত বৃদ্ধি পায়, বস্তুত সে তত নিজেকে তুচ্ছ, হীন ও সব অপকর্মের উৎসস্থল মনে করে।

• হাসান বসরি বলেন, 'অহেতুক-অপ্রয়োজনীয় কাজে মজে থাকা— বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির অন্যতম নিদর্শন।'

টিকাঃ
২৯০. সহিহু মুসলিম: ২৯৬৭
২৯১. সুরা আল-মুমিনুন: ৬০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00