📄 কল্যাণের খনিসমূহের একটখানি ঝলক
আখিরাতে কল্যাণ-প্রত্যাশী ব্যক্তি তার সফলতার সোপানে উড্ডয়নের সময় একস্থান থেকে অন্যত্র উন্নতির প্রাক্কালে সবচেয়ে বেশি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়। এবং পুণ্যকর্মের সুউচ্চ মার্গে আরোহণের ক্ষেত্রে ধৈর্যের চেয়ে বড় উপাদান অন্য কোনো বস্তু নেই। যেমন দুর্গম পাহাড়ে আরোহণকারী ব্যক্তি, এর জন্য ধৈর্যের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হয়, যেন মধ্যখানে এসে আবার ফিরে যেতে না হয়।
কুরআনে ধৈর্যশীলতার গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা প্রায় নব্বই জায়গায় ধৈর্যের আলোচনা করেছেন। এবং সব কল্যাণ ও মর্যাদাকে তার দিকেই সম্বন্ধ করেছেন। সর্বোপরি সব কল্যাণের আধার হিসেবে ধৈর্যকে চিত্রায়ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
'যারা ধৈর্যধারণকারী, তাদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অপরিমিত।'
শাইখ সাদি বলেন, 'প্রতিদানের বিষয়টি ধৈর্যের সব প্রকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন:
- পূর্বনির্ধারিত কষ্টদায়ক ভাগ্যলিপির ওপর ধৈর্যধারণ কালে সে আর অসন্তুষ্ট হবে না।
- তেমনিভাবে গুনাহ হতে সবরকালে সে আর তাতে লিপ্ত হয় না।
- আনুগত্যের ওপর ধৈর্যকালে সে তা পালন করেই ছাড়ে, যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন।
বস্তুত, এ কারণেই তো আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের অসংখ্য-অগণিত প্রতিদানে ভূষিত করেন। কোনো ধরনের হিসাব ছাড়া, অর্থাৎ কোনো কষ্ট ও পরিমাণ ছাড়া দান করেন। আর তা শুধু ধৈর্যের গুরুত্ব ও অভাবনীয় ফলাফলের কারণেই দিয়ে থাকেন। বস্তুত, ধৈর্য সব বিষয়ে সহায়তাকারী একটি বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ )
'আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো, তাহলে তা ধৈর্যশীলদের জন্য উত্তম。
হাসান বসরি বলেন, 'ধৈর্য হচ্ছে জান্নাতের খনিগুলোর অন্যতম। আল্লাহ তাআলা তা একমাত্র তাঁর অতিশয় নৈকট্যশীল বান্দাদের দান করে থাকেন।'
ধৈর্যের প্রকারভেদ
১. আনুগত্যে ধৈর্যশীলতা : বান্দা তিনটি অবস্থায় উক্ত ধৈর্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়。
- প্রথম অবস্থা: ইবাদতের পূর্বে, আর তা হচ্ছে নিয়ত বিশুদ্ধকরণ ও সব ধরনের লৌকিকতার গন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে নিষ্ঠার সাথে উপাসনা করা。
- দ্বিতীয় অবস্থা : ইবাদতরত অবস্থায় অর্থাৎ ইবাদতের মাঝখানে যেন কোনোভাবেই উদাসীনতা ও অলসতা গ্রাস না করে, যার ফলে ইবাদতের সুন্নাত ও আদবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অপরিপূর্ণতা পরিলক্ষিত হয়।
- তৃতীয় অবস্থা : ইবাদত সম্পাদনের পর, আর তা হচ্ছে ইবাদতটি প্রসিদ্ধি ও লৌকিকতা থেকে মুক্ত থাকা। তেমনিভাবে ওই সব ভয়ংকর বস্তু থেকে ইবাদতকে পূত-পবিত্র রাখা, যা তাকে সম্পূর্ণ বা আংশিক বিনষ্ট করে দেয়।
২. পাপাচারের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ : এই ধৈর্যের প্রতি বান্দার মুখাপেক্ষিতার অন্ত নেই। কেননা, তা সব ধরনের পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যেমন: ব্যভিচার, মদপান, ধূমপান, অবৈধ জিনিসের প্রতি দৃষ্টিপাত, পরনিন্দা, গালমন্দ ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম হাতিয়ার।
৩. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ: যেমন প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু, ধন-সম্পদ বিনষ্ট হওয়া, স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়া এবং মানুষের পক্ষ থেকে কথা কিংবা কর্মের নির্যাতন ইত্যাদি কঠিনতম মুহূর্তে ধৈর্যধারণ।
• সুতরাং ধৈর্যকে দশ ভাগে বিভক্ত করা যায়。
১. অবাধ্যতার ওপর ধৈর্যধারণ, ২. ফরজ বিধান আদায়ের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ, ৩. কামভাব ও প্রবৃত্তির তাড়নার ওপর ধৈর্যধারণ, ৪. যন্ত্রণার ওপর ধৈর্যধারণ, ৫. দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণ, ৬. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ, ৭. লোকদের নির্যাতনের ওপর ধৈর্যধারণ, ৮. নিজের কামনা-বাসনার ওপর ধৈর্যধারণ, ৯. অহেতুক বকবক করা থেকে বিরত থাকতে ধৈর্যধারণ, ১০. নফলের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ।
• উল্লিখিত যেকোনো একটি কাজ সম্পাদনে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে আদায় করার অর্থ হলো আপনি উক্ত কাজ সম্পাদনে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আর যে কাজ সম্পাদনে কোনো রকমের ক্লান্তি ও কষ্টের ভোগান্তি পোহাতে হয় না, উহা ধৈর্যের আওতাভুক্ত নয়। কেননা, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি বিশেষ সহযোগিতা ও দানস্বরূপ। কারণ, তাতে রয়েছে একদিকে কষ্টের বোঝা না থাকা, অপরদিকে আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্যের স্বাদ আস্বাদন।
বিপদাপদ পাপ ও গুনাহকে মোচনকারী
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا يَزَالُ البَلَاءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ
‘মুমিন বান্দা-বান্দি নিজে, নিজের সন্তানসন্ততি ও ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে একের পর এক বিপদে আক্রান্ত হতে থাকে, একপর্যায়ে সে আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় উপস্থিত হয় যে, তার আর কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না।’
- রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا يُصِيبُ المُسْلِمَ، مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ، وَلَا هَمَّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٌ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
'কোনো মুসলিম যেকোনো কষ্ট-ক্লেশ, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও নির্যাতনের সম্মুখীন হোক না কেন, এমনকি পথ চলতে সামান্যতম কাঁটাবিদ্ধ হলেও প্রত্যেক বিপদের পরিবর্তে একটি করে পাপ মোচন করে দেওয়া হয়।'
টিকাঃ
১৩৮. সুরা আজ-জুমার: ১০
১৩৯. সুরা আন-নাহল: ১২৬
১৪০. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৯
১৪১. সহিহুল বুখারি: ৫৬৪১
📄 মনের বাসনা ও আকাঙ্ক্ষা কেমন হওয়া উচিত
আখিরাতের রাহে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তিকে তার পারলৌকিক পথ মাড়ানোর সময় মরীচিকাময় হলেও এমন কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা সাথে নিয়ে চলতে হয়, যা তার পথ চলাকে দ্রুত থেকে দ্রুততর করতে ভূমিকা রাখে। তাই এই পথে স্বীয় মহান রবের কাছে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে এগুতে হয়। তাই প্রত্যাশা কী। এর নিদর্শন ও আমাদের বাস্তব জীবনে এর বাস্তবায়ন-পদ্ধতি ইত্যাদির পরিচয় নিয়ে আমাদের এই অধ্যায়।
প্রশংসনীয় প্রত্যাশা
ইবনুল কুদামা বলেন, 'খুব ভালোভাবে জেনে রাখুন, প্রত্যাশা-এটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক। কেননা, প্রত্যাশা মানুষকে কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পক্ষান্তরে নিরাশা নিন্দনীয়। কেননা, তা কর্ম সম্পাদনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক।'
মারুফ কারখি বলেন, 'তুমি যে মহান সত্তার অবাধ্য, তাঁর দয়ার প্রত্যাশা করা তোমার সর্বোচ্চ অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللهِ ﴾
'নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমত-প্রত্যাশী। '
• রাসুলুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ
“আমি আমার বান্দার ধারণার অনুরূপ আচরণ করি। অতএব সে আমার সাথে যেমন ইচ্ছা ধারণা পোষণ করুক।”
ইমাম কুরতুবি বলেন, 'প্রার্থনা ও তাওবার সময় দরবারে ইলাহিতে কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যাশা করো। তেমনিভাবে ইসতিগফারের সময়ও ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে প্রবল ধারণা পোষণ করো।'
• রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَا يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
'কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা না নিয়ে মৃত্যুবরণ না করে।'
কতিপয় উলামায়ে কিরাম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের প্রত্যাশা করে, সে তা অন্বেষণ করে। পক্ষান্তরে যে কোনো বিষয়কে ভয় করে, সে তা থেকে পলায়ন করে। তাই এমন ব্যক্তি অবশ্যই প্রতারিত, যে একদিকে তো গুনাহের ওপর গোঁ ধরে বসে আছে। অন্যদিকে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।'
প্রত্যাশা সত্য হওয়ার কতিপয় নিদর্শন
ইবনে কুদামা বলেন, '(প্রত্যাশা সত্য হওয়ার নিদর্শন তিনটি)
১. পুণ্যকর্মের ক্ষেত্রে অধিক পরিশ্রমী ও যত্নবান হওয়া।
২. আনুগত্যে পাহাড়সম অটল থাকা। যতই ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেন।
৩. আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপ ও তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ইমানি স্বাদ আস্বাদন করতে পারা।'
আমলনামার অস্থিতিশীলতা
ইবনে কুদামা বলেন, 'লোকদের মধ্যে কতক এমন আছে, যে মনে মনে ধারণা করে যে, তার আনুগত্য অবাধ্যতার চেয়ে বেশি। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, সে সৎকর্মের ক্ষেত্রে হিসেবি হলেও অবাধ্যতার ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ান এবং সে তার পাপসমূহের ব্যাপারে চোখে ধুলো দিয়ে থাকে। যেমন কোনো ব্যক্তি দিনে একশ বার তাওবা ও ইসতিগফার করে, কিন্তু
বাকি পুরো দিন পরনিন্দা ও অহেতুক গালগল্প করে কাটিয়ে দেয়। সে তাসবিহ ও ইসতিগফারের ফজিলতের ব্যাপারে তো খুব সচেতন, কিন্তু পরনিন্দা ও অশ্লীল আলাপের কঠোর শাস্তির ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।
সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন
আবু উসমান জিজি বলেন, 'সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, স্বীয় রবের অকুণ্ঠ আনুগত্য করেও তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কায় থাকা। পক্ষান্তরে দুর্ভাগ্যের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, অবাধ্যতায় ডুবে থাকা সত্ত্বেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করা।'
প্রত্যাশার বিশুদ্ধতার আলামত
কিরমানি বলেন, 'প্রত্যাশার বিশুদ্ধতার অন্যতম আলামত হচ্ছে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা।
প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার মাঝে পার্থক্য
আকাঙ্ক্ষা মানুষকে অলস বানিয়ে দেয় এবং পরিশ্রম ও কষ্ট পোহাতে নিরুৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে প্রত্যাশা এর ঠিক বিপরীত।
খাঁটি মুমিন ও অপরাধীর ধারণার মাঝে পার্থক্য
হাসান বসরি বলেন, 'খাঁটি মুমিনমাত্রই তার রবের প্রতি সুধারণাপ্রসূত সৎকর্ম সম্পাদনে ব্রতী হয়। অপরদিকে পাপাচারী ও অপরাধী ব্যক্তি স্বীয় রবের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে। ফলে সে নিন্দনীয় সব কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
টিকাঃ
১৫৭. সুরা আল-বাকারা: ২১৮
১৫৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৬০১৬
১৫৯. সহিহু মুসলিম: ২৮৭৭
📄 তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘পার্থিব কিংবা পারলৌকিক যেকোনো সফলতা-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য দুটি শক্তির বিকল্প নেই。
১. তাত্ত্বিক ও জ্ঞানগত শক্তি : এর মাধ্যমে পথচারী রাস্তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের কুসুমাস্তীর্ণ ও কণ্টকাকীর্ণ অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হতে পারে। যার ফলে সে পথচ্যুত হওয়ার সব উপকরণ থেকে নিরাপদ থাকে。
২. ব্যবহারিক শক্তি : যার মাধ্যমে সে মনোবল চাঙা করে সম্মুখপানে গন্তব্যস্থলের দিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে এবং একস্থান অতিক্রান্ত হওয়া মাত্রই অন্য স্থানে প্রস্থানের জন্য পুরোদ্যমে প্রস্তুতি নিয়ে নেয়। যদি কষ্ট-ক্লেশ তাকে কুরে-কুরে খেয়ে একেবারে জর্জরিতও করে তোলে, তথাপি সে এই বলে মনকে প্রবোধ দিতে থাকে যে, আরেকটু সামান্য ধৈর্য ধরো। কেননা, আখিরাতের তুলনায় পৃথিবীর সময়টা তো আর আহামরি কিছু নয়। বড়জোর এক মিনিট কিংবা এক ঘণ্টা হবে। এর থেকে অধিক নয়। সুতরাং ধৈর্যকে তোমার মূল পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে নাও。
- উভয় শক্তির একটি বাস্তব উদাহরণ: যেমন একটি বাগান, যার রয়েছে একটি শাহি গেট, যার অভ্যন্তরে নানা ধরনের ফল-ফুলের সমাহার ও পার্থিব প্রফুল্লতার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান। যার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। এখন ব্যবহারিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তি তো ওখানে প্রবেশের জন্য অস্থির ও পাগলপারা হয়ে গেছে। কিন্তু বেচারা গেটের সন্ধান পাচ্ছে না এবং উক্ত বাগানে অবগাহন করার উৎস আবিষ্কারে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অথচ বাগানের চতুর্দিকে কতবার না সে ঘুরঘুর করছে এবং বাগানের অনাবিল প্রাকৃতিক স্বাদ আস্বাদনে কত কষ্টই না স্বীকার করেছে। তার ব্যর্থতার একমাত্র কারণ হচ্ছে তাত্ত্বিক কৌশলে দৈন্যতা।
• উভয় শক্তি ভেদে মানুষের প্রকারভেদ
১. যার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় শক্তি রয়েছে।
২. যার কোনোটাই নেই。
৩. যার তাত্ত্বিক শক্তি থাকলেও ব্যবহারিক শক্তির দৈন্যতা রয়েছে।
৪. যার ব্যবহারিক শক্তি রয়েছে, কিন্তু তাত্ত্বিক শক্তি নেই।
• প্রিয় দ্বীনি ভাই, আমরা কিয়ামুল লাইল, কুরআন তিলাওয়াত, অধিক হারে জিকির, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও রাসুল ﷺ-এর ওপর দরুদ ইত্যাদির কত অগণিত ফজিলতই না শুনতে শুনতে কান পর্যন্ত ভারী করে ফেলেছি। অথচ এগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা কত চরমে পৌঁছে গেছে, তা একটু তাকিয়ে দেখার দরকার নয় কি?
- এর একমাত্র কারণ হলো: কোনো তাত্ত্বিক শক্তির দৈন্যতা নয়; বরং ব্যবহারিক শক্তির দুর্বলতাই একমাত্র দায়ী।
অন্তরে ব্যবহারিক শক্তির প্রেরণা জিয়ে রাখার উপায়
খুব ভালোভাবে খেয়াল রাখুন! পুণ্য কর্মের ওপর নিয়মিত অনুশীলন, প্রশিক্ষণ ও নিয়মতান্ত্রিক কসরতের মাধ্যমে ব্যবহারিক শক্তি শানিত হয়। সাথে অধিক হারে প্রার্থনা, আল্লাহর সাহায্য কামনা, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ'-এর আবৃত্তির আধিক্যও প্রতি মুহূর্তে একান্ত অপরিহার্য।
• তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শক্তির প্রবৃত্তির জন্য কতিপয় কার্যকর কৌশল
১. আপনি রিয়াজুস সালিহিন পাঠ আরম্ভ করে দিন এবং পাঠ্য হাদিসের ওপর আমলের জন্য সচেষ্ট হোন। আর যদি আপনার উক্ত আমলি প্রশিক্ষণে কোনো দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী ব্যক্তিকে আপনার অনুশীলনের সহায়তাকারী হিসেবে পান, তাহলে তা হবে আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর। সুতরাং প্রত্যেকে একে অপরকে জিজ্ঞেস করবেন এবং পরস্পরকে উৎসাহিত করবেন। এভাবে আপনি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় শক্তির মাঝে সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম হবেন। অর্থাৎ রাসুল ﷺ-এর হাদিসের ওপর জ্ঞানার্জন ও অর্জিত হাদিসসমূহের ওপর আমলের মাধ্যমে উভয়ের মাঝে সমন্বয়তার যুগান্তকারী যোগসূত্র ঘটাতে পারবেন।
📄 সময় বাঁচানোর সহজ উপায়
সালাফ সর্বদা নিজের অবস্থার উন্নতি সাধনেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তারা সামান্য সময়ও হেলাখেলায় নষ্ট করতেন না। বরং সব সময় উপকারী ইলম ও সৎকর্মের পরিধি বৃদ্ধিতে ব্যতিব্যস্ত থাকতেন。
* আবু খালিদ আহমার বলেন, 'সালাফের কারও যদি আজকের সময় গতকালের অপেক্ষা উত্তম না হতো, তখন তারা আল্লাহর নিকট অনেক বেশি লজ্জিত হয়ে যেতেন।'
* উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেন, 'দিন ও রাত আপনার ক্ষেত্রে কর্মতৎপর। তাই আপনিও এতদুভয়ের কর্মে ব্যতিব্যস্ত থাকুন।'
* ইবনে মাসউদ বলেন, 'আমি ওই দিনই সবচেয়ে বেশি হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। যেদিনটি আমার কাছ থেকে সূর্যাস্তের মাধ্যমে অতিবাহিত হলো, অথচ আমার আমলে কোনো বৃদ্ধি হলো না।'
* জনৈক জাহিদ (দুনিয়াবিমুখ) বলেন, 'আমি এমন কাউকে সত্যিকারের মুমিন মনে করি না, যার কাছ থেকে একটি ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেল। অথচ, সে ওই সময় আল্লাহর জিকির কিংবা নামাজ ও তিলাওয়াত বা অন্য কোনো সৎকর্ম সম্পাদন করল না।'
* সালাফ বলতেন, 'দুর্ভাগ্যের অন্যতম চিহ্ন হচ্ছে সময় অপচয়।'
* তাই পরিপূর্ণ মুমিন ব্যক্তি কখনো পাপাচার, উদাসীনতা ও অন্যান্য অহেতুক কাজে নিজ সময় অপচয় করতে পারে না।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَّةُ وَالفَرَاغُ 'দুটি নিয়ামতের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত ও ধোঁকাগ্রস্ত। এক. সুস্থতা। দুই. অবসর সময়।'
অবসর সময়কে গুটিকয়েক স্বর্ণপুরুষ ব্যতীত কেউই কাজে লাগাতে পারে না।
সময় সংরক্ষণের পদ্ধতি
১. বিশুদ্ধ নিয়ত: প্রত্যেক কর্মে—চাই তা স্বভাবজাত বিষয় হোক না কেন, যেমন: পানাহার, ঘুম প্রভৃতি সবক্ষেত্রে—একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই উদ্দেশ্য থাকা। তাহলে নিজের পুরো সময় ইবাদত বলে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। তাই তো হাদিসে এসেছে:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنَّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
'প্রত্যেক কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।'
• তাই বিশুদ্ধ নিয়ত সময়কে ফলবান করে, জীবনের গতিকে জীবন্ত-প্রাণবন্ত রাখে, আমলকে করে তোলে সুন্দর ও দামি। হাদিসে এসেছে, আবু জার রা. বা আবু দারদা রা. বলেন:
مَا مِنْ رَجُلٍ يُرِيدُ أَنْ يَقُومَ سَاعَةً مِنَ اللَّيْلِ، فَيَغْلِبُهُ عَيْنَاهُ عَنْهَا، إِلَّا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ أَجْرَهَا، وَكَانَ نَوْمُهُ صَدَقَةٌ تَصَدَّقَ بِهَا اللَّهُ عَلَيْهِ
'কোনো ব্যক্তি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা করে অধিক ঘুমের চাপে শেষ রাতে উঠতে সক্ষম না হলে আল্লাহ তাআলা তার আমলনামায় রাত্রিজাগরণের সাওয়াব লিখে দেবেন। আর ঘুমটা তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে দান বলে গণ্য হবে। '
২. ঘরে কিংবা মসজিদে অবস্থান করা: কোথাও প্রয়োজন ব্যতীত বের না হওয়া। কেননা, বের হওয়ার আধিক্য সময় অপচয়ের অন্যতম কারণ। এ কারণেই হাদিসে এসেছে, উকবা বিন আমির বলেন: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ مَا النَّجَاةُ؟ قَالَ: امْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتَكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
'আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, মুক্তির উপায় কী?” তিনি বললেন, “তুমি নিজের জবানকে নিয়ন্ত্রণ করো, নিজের ঘরকেই যথেষ্ট মনে করো এবং নিজের ভুল-ত্রুটির ওপর ক্রন্দন করো। "'
সাবধান! খুব সাবধান! মানুষের সাথে যার সম্পর্ক বেড়ে যায়, তার অধিকাংশ সময়ই অহেতুক কর্মে নষ্ট হয়ে যায়। বস্তুত, এ কারণেই মানুষ থেকে বিচ্ছন্নতার ওপর অগণিত ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
ইবনুল জাওজি বলেন, 'অবসর ব্যতীত কেউই একত্রিত হওয়া পছন্দ করে না।'
আবু সাইদ থেকে বর্ণিত : قَالَ رَجُلُ : أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ؟ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: مُؤْمِنٌ يُجَاهِدُ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فِي سَبِيلِ الله، قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ رَجُلٌ مُعْتَزِلُ فِي شِعْبٍ مِنَ الشَّعَابِ يَعْبُدُ رَبَّهُ وَيَدَعُ النَّاسَ مِنْ شَرِّهِ
'একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসুল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?” রাসুলুল্লাহ বললেন, “যে মুমিন নিজের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।" লোকটি জিজ্ঞেস করল, "এরপর কে?” রাসুলুল্লাহ উত্তরে বললেন, “ওই ব্যক্তি, যে লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্গম কোনো পাহাড়ি উপত্যকায় স্বীয় রবের ইবাদতে মগ্ন হয় এবং মানুষের অনিষ্টতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।"'
মালিক বিন দিনার বলেন, 'মসজিদের ভেতর মুনাফিক ব্যক্তির অবস্থা খাঁচায় আবদ্ধ চড়ুই পাখির মতো।'
আবু মুসলিম খাওলানি তার জীবনের অধিকাংশ সময় মসজিদেই অতিবাহিত করেছেন।
৩. দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমানো: কেননা, যার দুনিয়াবি ব্যস্ততা যত বেড়ে যায়, তার সময়ও তদনুযায়ী অহেতুক কাজে নষ্ট হয়ে যায়। যেমন কারও ১০টি দোকান আছে, সে অবশ্যই এক দোকানের মালিক থেকে অধিক ব্যস্ত থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। এভাবে দুনিয়াবি সকল ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।
• আফসোস, বর্তমানে আমাদের মেয়েদের অধিকাংশ সময় তো রান্না ঘরের ধোঁয়া খেতে খেতে শেষ হয়ে যায়! অন্যথায় কেটে যায় অহেতুক গালগল্প, পরনিন্দা, অশ্লীল ম্যাগাজিন পাঠ, মোবাইল ফোনে প্রেমালাপ প্রভৃতিতে!
৪. প্রার্থনার আধিক্য: সময়ের হিফাজতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে থাকা। কেননা, রবের সাহায্য ছাড়া সময়ের সংরক্ষণ কখনো সম্ভব নয়। দুআ হচ্ছে সর্বরোগের মহৌষধ।
৫. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি: আল্লাহ তাআলা তাঁর মুত্তাকি বান্দাদের বয়স ও সময়ের অবশ্যই সংরক্ষণ করেন, তাদের তিনি বেকার ছেড়ে দেন না। বরং কোনো ইবাদতে মশগুল রাখেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন।'
৬. নামাজের সময়ের সংরক্ষণ করা: কেননা, এর মাধ্যমেই মূলত তার জীবনের পুরো সময়কে সংরক্ষণ করা হয়।
ফজরের নামাজের পর নিজ স্থানে বসে থাকার উপকারিতা
- আল্লাহ তাআলা উক্ত ব্যক্তির সময়ে বরকত দান করেন।
- সূর্য উদিত হওয়ার পর দুই রাকআত নামাজ আদায়কারীকে আল্লাহ তাআলা একটি করে কবুল হজ ও উমরার প্রতিদান দান করেন। এমন ব্যক্তি কোনো তাড়াহুড়া ছাড়া একাগ্রতার সহিত সকালের আজকার আদায় করতে পারেন।
- উক্ত ব্যক্তির জন্য ফেরেশতারা মাগফিরাতের দুআ করতে থাকেন।
- রাসুল -এর সুন্নাহর অনুরসণ, কেননা তিনি সর্বদা সূর্যোদয় পর্যন্ত নিজ নামাজের স্থানে বসে থাকতেন।
- সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক কুরআন খতম করা সহজ হয়।
- সময়ের সদ্ব্যবহার ও সকাল সকালেই প্রফুল্লতার সাথে দৈনিক কাজকর্ম আরম্ভ করা যায়।
- সময়কে সুশৃঙ্খলার সাথে বণ্টন করা যায়।
সুতরাং যে নিজ সময়কে সুবিন্যস্ত ও সুষম বণ্টন না করবে, তার অধিকাংশ সময় নষ্ট হয়ে যায়।
যেমন জ্ঞান অন্বেষণ ও অন্যান্য ইবাদতকে সময় অনুযায়ী বণ্টন করা। তেমনই ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দাওয়াতি কার্যক্রমকে রুটিন-মাফিক চালানো。
টিকাঃ
১৯১. সহিহুল বুখারি: ৬৪১২
১৯২. সহিহুল বুখারি: ১
১৯৩. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ৪২২৪
১৯৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৪০৬
১৯৫. সহিহু মুসলিম: ১৮৮৮
১৯৬. সুরা আত-তালাক: ২