📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 উন্নতির জন্য উত্তম পাঠ পরিকল্পনা

📄 উন্নতির জন্য উত্তম পাঠ পরিকল্পনা


যে উন্নতির সোপানে আরোহণ করতে চায়, তার জন্য দৈনিক না হলেও মাসিক একটি প্রোগ্রাম সেট করা উচিত। যেমন তার প্রোগ্রামে কোনো বিষয়ের একটি বই সে অধ্যয়নের জন্য রাখল এবং পঠিত বিষয়ের একটি সারসংক্ষেপ লিপিবন্ধ করে রাখল। এভাবে তার যদি উক্ত বইটি পাঠের ধারাবাহিকতা থাকে, তাহলে অচিরেই সে অল্প সময়ের ব্যবধানে জীবনে উত্তরোত্তর উন্নতি ও শুভ বিজয়ের বদ্ধদ্বারের সন্ধান পাবে。

• কতিপয় কিতাবের শ্রেণিবিন্যাস
- অন্তরের আমলবিষয়ক বইসমূহ। যেমন: 'মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিনা ওয়া হাজিহি আখলুকুনা' নামক প্রসিদ্ধ বই।
- ইমাম ইবনুল কাইয়িম -এর কিতাবসমূহ। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যেমন: 'আল-ফাওয়ায়িদ', 'আদ-দায়ু ওয়াদ-দাওয়ায়ু'।
- আমলের ফজিলতসংক্রান্ত বইসমূহ। যেমন: 'রিয়াজুস সালিহিন', 'সহিহ আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব'।
- সৎকর্মশীল মহান ব্যক্তিদের জীবনী। যেমন: 'সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ', 'সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়াত', 'সুওয়ারুম মিন হায়াতিত তাবিইন'। এই বই-তিনটি আব্দুর রহমান রাহাত পাশা কর্তৃক রচিত।
- আব্দুল হক শিবলি বিরচিত সাড়া জাগানো গ্রন্থ 'আল-আকিবাতু ফি জিকরিল মাওতি ওয়াল আখিরাহ'ও সুখপাঠ্য।

• পঠিত বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার লিপিবদ্ধ করা, গভীর মনোযোগ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিদানের মাধ্যমে বারবার অধ্যয়ন করা, সালাফের অবস্থাদির ওপর কিঞ্চিৎ নজর বুলানো যে, তারা কেমন ছিলেন, তারা কী কী আমল করতেন ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে অধ্যয়ন করতে হবে। তাহলেই এর সুফল ভোগ করা যেতে পারে। না হলে এমনি পাতা উল্টালে কোনো উপকার বয়ে আনবে না।

সতর্কীকরণ

কথাগুলো দ্বারা আমি আকিদা, হাদিস, তাফসির, ফিকহ প্রভৃতির ক্ষেত্রে প্রোগ্রাম সেট করতে বলছি না। কেননা, এগুলোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে। বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, চারিত্রিক শুচিতা, স্বীয় রবের নৈকট্য অর্জনের জন্য উপাসনা, ইবাদত প্রভৃতির ক্ষেত্রে আমলের ফজিলতের প্রতি লক্ষ রাখা, চরিত্র ও অভ্যাসের সৌন্দর্যকরণ, অন্তরের পবিত্রতা, সৎকর্মশীল সালাফের পূর্ণ আনুগত্য এবং পরকালের ভয় ও এর জন্য প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজ ব্যক্তিত্বের সার্বিক উন্নতি সাধন করা।

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 সফলতা-প্রত্যাশীদের হৃদয় কেমন হওয়া উচিত?

📄 সফলতা-প্রত্যাশীদের হৃদয় কেমন হওয়া উচিত?


আল্লাহর রাহে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য অন্তরের পরিশুদ্ধির ব্যাপারে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করা একান্ত অপরিহার্য। কেননা, সবকিছুই তো অন্তরের ওপরই নির্ভর করে, যদি তা পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তখন পুরো শরীর-সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংশোধন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যদি তাতে ভেজাল ও জং ধরে, তখন পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়。

• নিম্নে উন্নত ও পরিশুদ্ধ অন্তরের কতিপয় গুণ নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হলো।

১. বিভিন্ন ধরনের কুপ্রবৃত্তি, সন্দেহ-সংশয়, শিরক, হিংসা, প্রতারণা ও ধোঁকা প্রভৃতি থেকে অন্তর পূত-পবিত্র হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন : إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ ﴾ 'তবে যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।'

২. রবের দিকে প্রত্যাবর্তন অর্থাৎ কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ও বিনয়-নম্রতার মাধ্যমে অন্তর রবের দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন: مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُنِيبٍ ﴾ 'যে না দেখে দয়াময় আল্লাহ তাআলাকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হতো। '

৩. আল্লাহর স্মরণের দরুন অন্তরের স্থিরতা। আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ﴾ 'মনে রেখো, একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।' সুতরাং যার অন্তর তার রবের স্মরণে স্থির না হয়, তার অন্তর মুনাফিকের অন্তরেরই নামান্তর। কেননা, তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।

৪. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। এর অন্যতম আলামত হচ্ছে, আল্লাহর বিধান ও নিদর্শনাবলির প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখানো। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ ﴾ 'আর কেউ আল্লাহর শিআরসমূহের (নিদর্শনাবলি) প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো অন্তরস্থ আল্লাহভীতি থেকেই অর্জিত হয়।'

৫. নিজের পুণ্যকর্মগুলো অগ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে সর্বদা ভয় ও আশঙ্কা রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ ﴾ 'এবং যারা যা দান করবার তারা কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।' 'আয়িশা রাসুলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলেন, “তারা কি ওই সব লোক, যারা চুরি করে, ব্যভিচারে লিপ্ত ও মদপান করে?” তিনি তদুত্তরে বললেন: لَا يَا بِنْتَ الصِّدِّيقِ، وَلَكِنَّهُمُ الَّذِينَ يَصُومُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَتَصَدَّقُونَ، وَهُمْ يَخَافُونَ أَنْ لَا تُقْبَلَ مِنْهُمْ

“না, হে সিদ্দিকের মেয়ে, বরং তারা ওই সব পুণ্যবান ব্যক্তি, যারা রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, দানের হাত ঢালাওভাবে প্রসারিত করে, তদুপরি তারা উক্ত আমলগুলো তাদের রবের শাহি দরবারে কবুল না হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা করতে থাকে."'

• আপনি কি আপনার পুণ্যকর্মগুলোর ব্যাপারে গর্ব ও আত্মনির্ভরতায় লিপ্ত, না সেগুলোকে নগণ্য ও তুচ্ছজ্ঞান করেন?

হাসান বসরি বলেন, 'মুমিনমাত্রই পুণ্যকর্ম সম্পাদনের পরও ভয় ও আশঙ্কা করতে থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিক ব্যক্তি পাপাচার করা সত্ত্বেও নিরাপদ ও আশঙ্কামুক্ত থাকে।'

অন্তর আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার উপায়

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহর রাহের সফলদের সকলে এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, অন্তরে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীয় সার-নির্যাস ও পবিত্রতার মূল উপাদান প্রদান করা হয় না, যতক্ষণ না তা তার রবের নৈকট্যশীল হয়ে যায় আর তা পরিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ হওয়া ব্যতীত কখনো আল্লাহর নৈকট্যশীল হতে পারে না। এবং অন্তর ততক্ষণ পর্যন্ত স্বচ্ছ, নির্মল ও পরিশুদ্ধ হয় না, যতক্ষণ না কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করা হয়। কেননা, কুপ্রবৃত্তি হচ্ছে অন্তরের অন্যতম সংক্রামক ও জটিল ব্যাধি। এর চিকিৎসা হচ্ছে তার বিরোধিতা করা। তাই কঠোর অনুশাসন ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না অন্তরাত্মা আল্লাহর নিকট পৌঁছে যায়।'

আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তর পর্দাবৃত না হওয়ার কৌশল

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যে ব্যক্তি তার অন্তরের স্বচ্ছতা, নির্মলতা ও পবিত্রতা চায়, সে যেন তার রবকে অন্তরের ওই সব কামনা-বাসনার ওপর প্রাধান্য দেয়, যেসব কুপ্রবৃত্তি আনুপাতিক হারে অন্তরকে তার রবের নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।'

টিকাঃ
৬৪. সুরা আশ-শুআরা: ৮৯
৬৫. সুরা কাফ: ৩৩
৬৬. সুরা আর-রা'দ: ২৮
৬৭. সুরা আল-হজ: ৩২
৬৮. সুরা আল-মুমিনুন: ৬০
৬৯. সুনানুত তিরমিজি: ৩১৭৫

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 কল্যাণের খনিসমূহের একটখানি ঝলক

📄 কল্যাণের খনিসমূহের একটখানি ঝলক


আখিরাতে কল্যাণ-প্রত্যাশী ব্যক্তি তার সফলতার সোপানে উড্ডয়নের সময় একস্থান থেকে অন্যত্র উন্নতির প্রাক্কালে সবচেয়ে বেশি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়। এবং পুণ্যকর্মের সুউচ্চ মার্গে আরোহণের ক্ষেত্রে ধৈর্যের চেয়ে বড় উপাদান অন্য কোনো বস্তু নেই। যেমন দুর্গম পাহাড়ে আরোহণকারী ব্যক্তি, এর জন্য ধৈর্যের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হয়, যেন মধ্যখানে এসে আবার ফিরে যেতে না হয়।

কুরআনে ধৈর্যশীলতার গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা প্রায় নব্বই জায়গায় ধৈর্যের আলোচনা করেছেন। এবং সব কল্যাণ ও মর্যাদাকে তার দিকেই সম্বন্ধ করেছেন। সর্বোপরি সব কল্যাণের আধার হিসেবে ধৈর্যকে চিত্রায়ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

'যারা ধৈর্যধারণকারী, তাদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অপরিমিত।'

শাইখ সাদি বলেন, 'প্রতিদানের বিষয়টি ধৈর্যের সব প্রকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন:
- পূর্বনির্ধারিত কষ্টদায়ক ভাগ্যলিপির ওপর ধৈর্যধারণ কালে সে আর অসন্তুষ্ট হবে না।
- তেমনিভাবে গুনাহ হতে সবরকালে সে আর তাতে লিপ্ত হয় না।
- আনুগত্যের ওপর ধৈর্যকালে সে তা পালন করেই ছাড়ে, যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন।

বস্তুত, এ কারণেই তো আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের অসংখ্য-অগণিত প্রতিদানে ভূষিত করেন। কোনো ধরনের হিসাব ছাড়া, অর্থাৎ কোনো কষ্ট ও পরিমাণ ছাড়া দান করেন। আর তা শুধু ধৈর্যের গুরুত্ব ও অভাবনীয় ফলাফলের কারণেই দিয়ে থাকেন। বস্তুত, ধৈর্য সব বিষয়ে সহায়তাকারী একটি বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ )

'আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো, তাহলে তা ধৈর্যশীলদের জন্য উত্তম。

হাসান বসরি বলেন, 'ধৈর্য হচ্ছে জান্নাতের খনিগুলোর অন্যতম। আল্লাহ তাআলা তা একমাত্র তাঁর অতিশয় নৈকট্যশীল বান্দাদের দান করে থাকেন।'

ধৈর্যের প্রকারভেদ

১. আনুগত্যে ধৈর্যশীলতা : বান্দা তিনটি অবস্থায় উক্ত ধৈর্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়。
- প্রথম অবস্থা: ইবাদতের পূর্বে, আর তা হচ্ছে নিয়ত বিশুদ্ধকরণ ও সব ধরনের লৌকিকতার গন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে নিষ্ঠার সাথে উপাসনা করা。
- দ্বিতীয় অবস্থা : ইবাদতরত অবস্থায় অর্থাৎ ইবাদতের মাঝখানে যেন কোনোভাবেই উদাসীনতা ও অলসতা গ্রাস না করে, যার ফলে ইবাদতের সুন্নাত ও আদবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অপরিপূর্ণতা পরিলক্ষিত হয়।
- তৃতীয় অবস্থা : ইবাদত সম্পাদনের পর, আর তা হচ্ছে ইবাদতটি প্রসিদ্ধি ও লৌকিকতা থেকে মুক্ত থাকা। তেমনিভাবে ওই সব ভয়ংকর বস্তু থেকে ইবাদতকে পূত-পবিত্র রাখা, যা তাকে সম্পূর্ণ বা আংশিক বিনষ্ট করে দেয়।

২. পাপাচারের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ : এই ধৈর্যের প্রতি বান্দার মুখাপেক্ষিতার অন্ত নেই। কেননা, তা সব ধরনের পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যেমন: ব্যভিচার, মদপান, ধূমপান, অবৈধ জিনিসের প্রতি দৃষ্টিপাত, পরনিন্দা, গালমন্দ ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম হাতিয়ার।

৩. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ: যেমন প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু, ধন-সম্পদ বিনষ্ট হওয়া, স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়া এবং মানুষের পক্ষ থেকে কথা কিংবা কর্মের নির্যাতন ইত্যাদি কঠিনতম মুহূর্তে ধৈর্যধারণ।

• সুতরাং ধৈর্যকে দশ ভাগে বিভক্ত করা যায়。
১. অবাধ্যতার ওপর ধৈর্যধারণ, ২. ফরজ বিধান আদায়ের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ, ৩. কামভাব ও প্রবৃত্তির তাড়নার ওপর ধৈর্যধারণ, ৪. যন্ত্রণার ওপর ধৈর্যধারণ, ৫. দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণ, ৬. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ, ৭. লোকদের নির্যাতনের ওপর ধৈর্যধারণ, ৮. নিজের কামনা-বাসনার ওপর ধৈর্যধারণ, ৯. অহেতুক বকবক করা থেকে বিরত থাকতে ধৈর্যধারণ, ১০. নফলের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ।

• উল্লিখিত যেকোনো একটি কাজ সম্পাদনে কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে আদায় করার অর্থ হলো আপনি উক্ত কাজ সম্পাদনে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আর যে কাজ সম্পাদনে কোনো রকমের ক্লান্তি ও কষ্টের ভোগান্তি পোহাতে হয় না, উহা ধৈর্যের আওতাভুক্ত নয়। কেননা, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি বিশেষ সহযোগিতা ও দানস্বরূপ। কারণ, তাতে রয়েছে একদিকে কষ্টের বোঝা না থাকা, অপরদিকে আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্যের স্বাদ আস্বাদন।

বিপদাপদ পাপ ও গুনাহকে মোচনকারী

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا يَزَالُ البَلَاءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ

‘মুমিন বান্দা-বান্দি নিজে, নিজের সন্তানসন্ততি ও ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে একের পর এক বিপদে আক্রান্ত হতে থাকে, একপর্যায়ে সে আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় উপস্থিত হয় যে, তার আর কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না।’

- রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا يُصِيبُ المُسْلِمَ، مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ، وَلَا هَمَّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٌ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ

'কোনো মুসলিম যেকোনো কষ্ট-ক্লেশ, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও নির্যাতনের সম্মুখীন হোক না কেন, এমনকি পথ চলতে সামান্যতম কাঁটাবিদ্ধ হলেও প্রত্যেক বিপদের পরিবর্তে একটি করে পাপ মোচন করে দেওয়া হয়।'

টিকাঃ
১৩৮. সুরা আজ-জুমার: ১০
১৩৯. সুরা আন-নাহল: ১২৬
১৪০. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৯
১৪১. সহিহুল বুখারি: ৫৬৪১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 মনের বাসনা ও আকাঙ্ক্ষা কেমন হওয়া উচিত

📄 মনের বাসনা ও আকাঙ্ক্ষা কেমন হওয়া উচিত


আখিরাতের রাহে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তিকে তার পারলৌকিক পথ মাড়ানোর সময় মরীচিকাময় হলেও এমন কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা সাথে নিয়ে চলতে হয়, যা তার পথ চলাকে দ্রুত থেকে দ্রুততর করতে ভূমিকা রাখে। তাই এই পথে স্বীয় মহান রবের কাছে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে এগুতে হয়। তাই প্রত্যাশা কী। এর নিদর্শন ও আমাদের বাস্তব জীবনে এর বাস্তবায়ন-পদ্ধতি ইত্যাদির পরিচয় নিয়ে আমাদের এই অধ্যায়।

প্রশংসনীয় প্রত্যাশা

ইবনুল কুদামা বলেন, 'খুব ভালোভাবে জেনে রাখুন, প্রত্যাশা-এটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক। কেননা, প্রত্যাশা মানুষকে কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পক্ষান্তরে নিরাশা নিন্দনীয়। কেননা, তা কর্ম সম্পাদনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক।'

মারুফ কারখি বলেন, 'তুমি যে মহান সত্তার অবাধ্য, তাঁর দয়ার প্রত্যাশা করা তোমার সর্বোচ্চ অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللهِ ﴾

'নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমত-প্রত্যাশী। '

• রাসুলুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ

“আমি আমার বান্দার ধারণার অনুরূপ আচরণ করি। অতএব সে আমার সাথে যেমন ইচ্ছা ধারণা পোষণ করুক।”

ইমাম কুরতুবি বলেন, 'প্রার্থনা ও তাওবার সময় দরবারে ইলাহিতে কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যাশা করো। তেমনিভাবে ইসতিগফারের সময়ও ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে প্রবল ধারণা পোষণ করো।'

• রাসুলুল্লাহ বলেন:

لَا يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ

'কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা না নিয়ে মৃত্যুবরণ না করে।'

কতিপয় উলামায়ে কিরাম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের প্রত্যাশা করে, সে তা অন্বেষণ করে। পক্ষান্তরে যে কোনো বিষয়কে ভয় করে, সে তা থেকে পলায়ন করে। তাই এমন ব্যক্তি অবশ্যই প্রতারিত, যে একদিকে তো গুনাহের ওপর গোঁ ধরে বসে আছে। অন্যদিকে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।'

প্রত্যাশা সত্য হওয়ার কতিপয় নিদর্শন

ইবনে কুদামা বলেন, '(প্রত্যাশা সত্য হওয়ার নিদর্শন তিনটি)
১. পুণ্যকর্মের ক্ষেত্রে অধিক পরিশ্রমী ও যত্নবান হওয়া।
২. আনুগত্যে পাহাড়সম অটল থাকা। যতই ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেন।
৩. আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপ ও তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ইমানি স্বাদ আস্বাদন করতে পারা।'

আমলনামার অস্থিতিশীলতা

ইবনে কুদামা বলেন, 'লোকদের মধ্যে কতক এমন আছে, যে মনে মনে ধারণা করে যে, তার আনুগত্য অবাধ্যতার চেয়ে বেশি। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, সে সৎকর্মের ক্ষেত্রে হিসেবি হলেও অবাধ্যতার ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ান এবং সে তার পাপসমূহের ব্যাপারে চোখে ধুলো দিয়ে থাকে। যেমন কোনো ব্যক্তি দিনে একশ বার তাওবা ও ইসতিগফার করে, কিন্তু

বাকি পুরো দিন পরনিন্দা ও অহেতুক গালগল্প করে কাটিয়ে দেয়। সে তাসবিহ ও ইসতিগফারের ফজিলতের ব্যাপারে তো খুব সচেতন, কিন্তু পরনিন্দা ও অশ্লীল আলাপের কঠোর শাস্তির ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।

সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন

আবু উসমান জিজি বলেন, 'সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, স্বীয় রবের অকুণ্ঠ আনুগত্য করেও তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কায় থাকা। পক্ষান্তরে দুর্ভাগ্যের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, অবাধ্যতায় ডুবে থাকা সত্ত্বেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করা।'

প্রত্যাশার বিশুদ্ধতার আলামত

কিরমানি বলেন, 'প্রত্যাশার বিশুদ্ধতার অন্যতম আলামত হচ্ছে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা।

প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার মাঝে পার্থক্য

আকাঙ্ক্ষা মানুষকে অলস বানিয়ে দেয় এবং পরিশ্রম ও কষ্ট পোহাতে নিরুৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে প্রত্যাশা এর ঠিক বিপরীত।

খাঁটি মুমিন ও অপরাধীর ধারণার মাঝে পার্থক্য

হাসান বসরি বলেন, 'খাঁটি মুমিনমাত্রই তার রবের প্রতি সুধারণাপ্রসূত সৎকর্ম সম্পাদনে ব্রতী হয়। অপরদিকে পাপাচারী ও অপরাধী ব্যক্তি স্বীয় রবের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে। ফলে সে নিন্দনীয় সব কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

টিকাঃ
১৫৭. সুরা আল-বাকারা: ২১৮
১৫৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৬০১৬
১৫৯. সহিহু মুসলিম: ২৮৭৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00