📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 উন্নতির প্রধান প্রধান অন্তরায়

📄 উন্নতির প্রধান প্রধান অন্তরায়


আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا ﴾ ‘শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।’৩৬৫
• ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ শয়তান মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে ভ্রান্ত বিষয়ে জড়িয়ে লাঞ্ছিত করে এবং বিভ্রান্তির পথে আহ্বান করতে থাকে।

রাসুলুল্লাহ এ দুআ বেশি বেশি পড়তেন : يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।’৩৬৬

তিনি এ দুআও পড়তেন : اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরকে আপনার আনুগত্যের প্রতি ধাবিত করে দিন।’৩৬৭

• রাসুলুল্লাহ আমাদেরকে পরকালীন অবক্ষয়ের সব ধরনের কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি সর্বদা এই দুআ পাঠ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ، وَالبُخْلِ والجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

‘হে আল্লাহ, আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রভাব থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।’৩৬৮

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘এই হাদিসে রাসুল ﷺ সকল অনিষ্টতার মূল উৎস ও শাখা-প্রশাখার বিষয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এই দুআটি সহজাত আটটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে—যার প্রত্যেক দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর কাছাকাছি।

(الهم والحزن (দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(الهم (দুশ্চিন্তা) ভবিষ্যতের জন্য, অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোনো বিষয় অর্জিত হবে কি হবে না—এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অথবা কোনো বিষয়ের শঙ্কায় থাকা।
(الحزن (পেরেশানি) অতীতকালের জন্য, অর্থাৎ অতীতে কোনো প্রিয়জনকে হারানো কিংবা ব্যবসায় লোকসানের দরুন চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে যাওয়া।

(العجز والكسل (অক্ষমতা ও অলসতা)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(العجز (অক্ষমতা) : শক্তির দৈন্যতার দরুন বান্দা কল্যাণের যাবতীয় উপায়-উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ সম্পদের স্বল্পতা কিংবা অন্য কোনো কারণে ফরজ হজ আদায়ে সক্ষম না হওয়া।
(الكسل (অলসতা) : সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ইচ্ছা পোষণ না করা। যেমন তাহাজ্জুদের নামাজ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উদাসীনতা হেতু না পড়া।

উন্নতি ও অগ্রগতি থেকে বান্দার পিছিয়ে পড়ার অন্তর্নিহিত কারণ
ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘বান্দার অগ্রগতি থেমে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান দুটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে。
১. শক্তিমত্তার দৈন্যতা, যাকে অক্ষমতা বলা হয়।
২. সক্ষমতা সত্ত্বেও কাজের ইচ্ছা পোষণ না করা, যাকে অলসতা বলা হয়।

উক্ত দুটি বৈশিষ্ট্যর দরুনই কল্যাণের সব দ্বার রুদ্ধ ও অনিষ্টতার সব পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

(البُخْلِ وَالجُبْنِ) কৃপণতা ও কাপুরুষতা)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(البخل) কৃপণতা) বলতে বোঝায় স্বীয় সম্পদের দ্বারা কোনো উপকার সাধন না করা। যেমন কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীয় সম্পদ খরচ করা থেকে বিরত থাকা।
(الجين) কাপুরুষতা) বলতে বোঝায় নিজ শরীর দ্বারা কোনো উপকার সাধন না করা। যেমন ইসলাম ও মুসলিমদের সেবায় নিজেকে সঁপে না দেওয়া।

(ضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَال) ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রভাব)-এর মধ্যে পার্থক্য
(ضَلَعِ الدَّيْنِ) ঋণের বোঝা : নিজ অধিকার আদায়ের জন্য অন্য কেউ ঘাড়ের ওপর চেপে বসা। যেমন জনৈক ব্যক্তি আপনার কাছে তার প্রাপ্য ঋণ ফেরত চাচ্ছে। অথচ, তা আপনি আদায় করতে পারছেন না।
(غَلَبَةِ الرِّجَال) মানুষের অবিচার : অন্যায়ভাবে কেউ কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করা। যেমন অন্যায়ভাবে কেউ কারও প্রতি অবিচার করা, চাই তা শাস্তি বা জেল কিংবা হুমকি-ধমকির মাধ্যমে হোক।

অক্ষমতা সকল অনিষ্টতার মূল
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'অবাধ্যতার মূল উৎস হচ্ছে অক্ষমতা। কারণ, এর মাধ্যমেই বান্দা আনুগত্যবিষয়ক উপাদান ও পাপ দূরীভূতকারী উপায় থেকে অক্ষম হয়ে যায়। যার ফলে সে অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।'
উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তার ক্ষতিকারক দিকসমূহ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা মানুষের কোনো উপকার সাধন করতে পারে না; বরং এতদুভয়ের ক্ষতি উপকারের চেয়ে অনেক বেশি। কেননা, উভয় উপাদানই দৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করে দেয়, হৃদয়কে করে ফেলে অন্তঃসারশূন্য এবং উপকারী বস্তু অবলম্বনের চেষ্টার প্রাক্কালে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

সম্মুখ চলার পথ রুদ্ধ করে দেয় চিরতরে এবং পেছনে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে—পেছন ধরে টানতে থাকে।'

দৈব দুর্বিপাক তথা অশুভ লক্ষণের স্বরূপ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যা কিছুই বান্দাকে রবের স্মরণ থেকে উদাসীন করে দেয়, তা নিঃসন্দেহে অশুভ। পক্ষান্তরে যা কিছুই রবের স্মরণ জাগ্রত করে, তা নিশ্চয় শুভ ও উক্ত ব্যক্তির জন্য রহমতস্বরূপ।'

সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনার দৈনন্দিন জীবনে স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসা, দামি গাড়ি প্রভৃতি যদি আপনার প্রতিপালকের আনুগত্যে শিথিলতার জন্য দায়ী হয়, তবে এসব বিষয় আপনার জন্য অশুভ হিসেবে বিবেচিত। আর কখনো যদি আপনি কোনো বিপদে (যেমন: রোগব্যাধি, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা কোনো লোকসান ইত্যাদিতে) পতিত হওয়ার দরুন আপনার প্রতিপালকের আনুগত্যের কথা স্মরণ হয়, তবে তা তো আল্লাহর দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তনের কারণ। যা আপনার অজান্তেই আপনার জন্য রহমত হিসেবে আবির্ভূত হয়।

টিকাঃ
৩৬৫. সুরা আল-ফুরকান: ২৯
৩৬৬. সুনানুত তিরমিজি: ২১৪০
৩৬৭. সহিহু মুসলিম: ২৬৫৪
৩৬৮. সহিহুল বুখারি: ২৮৯৩

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আসমানি লাঞ্ছনা থেকে সাবধান!

📄 আসমানি লাঞ্ছনা থেকে সাবধান!


পরের সমালোচনা—অমুক এমন করেছে, তমুক এমন করেছে, এ জাতীয় অগ্রহণযোগ্য, নিষ্প্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে সাবধান! বরং সময় ফুরানোর পূর্বেই নিজে সংশোধন হওয়ার চেষ্টা করুন।

নিজে নিজের দোষ-ত্রুটি ধরার উপায়

১. আত্মার ব্যাধি ও তার প্রতিকার সম্বন্ধে প্রাজ্ঞবান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাইখের সাহচর্য গ্রহণ করা।
২. সত্যবাদী দ্বীনদার সহপাঠী অন্বেষণ করা। যে আপনার ভুল ধরে দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করবে।
৩. শত্রুদের মুখ থেকে নিজ দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে অবগত হলে সংশোধনের চেষ্টা করা (যদি তা সত্য হয়)।
৪. সাধারণ লোকজনের সাথে মেশা—এ উদ্দেশ্য যে, তাদের কাছে যে অভ্যাস নিন্দিত বলে জানবে, তা সে পরিহার করে চলবে。

* উমর বিন খাত্তাব বলেন, 'আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে দয়া করুন, যে আমাদের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়।'

* আমাদের সালাফ ওই ব্যক্তিকে বেশি ভালোবাসতেন, যে তাদের ভুল ধরিয়ে দিত। অথচ, আজকাল আমাদের নিকট সেই ব্যক্তিই হয় সর্বাধিক ঘৃণার পাত্র, যে আমাদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে শুধরানোর চেষ্টা করে।

* নিজের দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে প্রাজ্ঞবান হওয়া মহান রবের পক্ষ থেকে কল্যাণ বর্ষিত হওয়ার অন্যতম নিদর্শন।

* রাসুলুল্লাহ নিম্নোক্ত দুআটি পাঠ করতেন :
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
'হে আল্লাহ, আমাদের আত্মায় তাকওয়ার (আল্লাহভীতির) বীজ বপন করে দিন এবং তা পূত-পবিত্র করে দিন। (কেননা,) আপনিই তো সর্বোত্তম পবিত্রকারী ও অভিভাবক।'

আপনি কি নিজ ব্যক্তিত্বের প্রতি সন্তুষ্ট ও আত্মতৃপ্ত?
ইবনে আব্বাস বলেন, 'যখন তুমি তোমার কোনো সঙ্গীর দোষ ধরার ইচ্ছা করবে, তখন প্রথমেই নিজের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।'
একদা জনৈক ব্যক্তি রাবি বিন খুসাইমকে বললেন, 'আমি নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নই, তাই অন্যের দোষ ধরে নিন্দা করার অবকাশ পাই না। পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষ আজকাল আল্লাহর বান্দাদের পাপাচারে কত যে উদ্বিগ্ন! অথচ, নিজ পাপের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।'

টিকাঃ
২৯২. সহিহু মুসলিম: ২৭২২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00