📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 গোপন আকাঙ্ক্ষা ও কামনা

📄 গোপন আকাঙ্ক্ষা ও কামনা


আখিরাতে সফলতার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক হচ্ছে গোপন কুপ্রবৃত্তি ও কামনা। এখানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রসিদ্ধি ও প্রশংসা-স্তুতির তীব্র লিপ্সা।

অধিকাংশ লোকের অবক্ষয়ের মূল রহস্য
ইবনে কুদামা বলেন, 'অধিকাংশ মানুষ মূলত মানুষের ভয় ও তাদের প্রশংসা কামনার দরুনই অবক্ষয়ের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছে। তাই লোকদের সার্বিক কর্মকাণ্ড এমনকি নড়াচড়া পর্যন্ত মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদের স্তুতি লাভের আকাঙ্ক্ষায় হয়ে থাকে। বস্তুত, তা-ই ধ্বংসের অন্যতম মূল নিয়মক।'

গোপন কুপ্রবৃত্তির কতিপয় দৃষ্টান্ত

১. কথা-কাজে কৃত্রিমতার আশ্রয় নেওয়া, যেন লোকদের প্রশংসা অর্জন হয় ও ভর্ৎসনা থেকে বাঁচা যায়।

২. আলিমদের পেছনে পড়ে গোয়েন্দাগিরি ও তাদের দোষ-ত্রুটি তালাশ করা, যেন তার প্রসিদ্ধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে。

• আব্দুল মালিক আল-জাওযী বলেন, 'যখন কোনো মানুষকে তুমি ঝগড়া করতে দেখবে, তখন বুঝে নেবে যে, সে অবশ্যই নেতৃত্ব ও মাতব্বরি পছন্দ করে।'

৩. আবার কতক সুফিরূপী এমন শয়তানও রয়েছে, যারা যেকোনো কথাবার্তা বলার সময় ক্রন্দনের ভান করে, যেন তাদের সর্বাধিক মুত্তাকি ও পরহেজগার বলা হয়।

৪. নিজ কর্ম ও অবস্থানকে বড় করে দেখানো ও প্রকাশ করা।

৫. ডর-ভয়হীনভাবে ফতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা, যেন মানুষ তাকে স্বল্প জ্ঞানী ও অক্ষম মনে না করে।

৬. অধিক গান-শে’য়ের ইত্যাদি গাওয়া এবং লোকের অতিরঞ্জিত প্রশংসার বানে ভেসে যাওয়া, যা তাকে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত করে দেয়।

• প্রসিদ্ধি, প্রশংসা ও নেতৃত্বের লালসার অনেক ভর্ৎসনা কুরআন-হাদিসে নানা আঙ্গিকে রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন: تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ﴾

‘এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। আল্লাহভীরুদের জন্য শুভ পরিণাম।’২০৫

ইবনে কাসির لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ মানুষের কাছে নিজের বড়ত্ব জাহির করো না।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ

'দুটি ক্ষুধার্ত বাঘকে মেষ শাবকের পালে ছেড়ে দেওয়া হলে যতটুকু ক্ষতিসাধন করে, কারও সম্পদ ও প্রতিপত্তির মোহ এর চেয়ে বেশি ক্ষতি করে তার দ্বীনের।'২০৬

রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন :

مَنْ طَلَبَ العِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ العُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ

'যে ব্যক্তি আলিমদের সাথে গর্ব করা, অজ্ঞদের সাথে তর্ক করা অথবা মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করার জন্য ইলম অর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।'২০৭

প্রসিদ্ধির নিন্দায় সালাফের কতিপয় অমীয় বাণী

• শাদ্দাদ বিন আওস বলেন, 'আমি উম্মতের মধ্যে লৌকিকতা ও গোপন বাসনার বেশি আশঙ্কা করি।'

• বিশর আল-হাফি বলেন, 'যে ব্যক্তি প্রসিদ্ধির লালসা করে, সে আল্লাহকে ভয় করে না।'

• আইয়ুব সাখতিয়ানি, রহ বলেন, 'যে ব্যক্তি ইমান আনয়নের পর নেতৃত্ব ও প্রসিদ্ধির লালসা করে, সে কখনো ইমানের দাবিতে সত্যবাদী হতে পারে না।'

সাখতিয়ানির যখন কান্না বেড়ে যেত, তখন তিনি মজলিস থেকে উঠে যেতেন।

• ইয়াহইয়া বিন মাইন বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের মতো কাউকে দেখিনি, দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ তাঁর সাথে আমি চলাফেরা করেছি। এত দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো কোনো বিষয়ে গর্ব করেননি। আল্লাহ তাআলা তাকে কল্যাণের প্রায় সব খনিই দান করেছিলেন।'

• সুফইয়ান বলেন, 'গোপন আসক্তি হলো, সৎকর্মের ওপর লোকের প্রশংসা ও স্তুতির লালসা।'

গোপন আসক্তির চিকিৎসা

১. আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে বিগলিত কণ্ঠে সাহায্য ও নিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করা, রবের সামনে বিনয়-নম্রতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করা।

২. নফসকে আল্লাহর আনুগত্য ও এর ওপর ধৈর্যধারণের জন্য সীমাহীন প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরঙ্কুশ অনুসরণের জন্য অভ্যস্ত করে তোলা।

৩. কোনো ধরনের আত্মগর্ব ও ভ্রু-কুঁচকানো ব্যতীত নিজের ভুল-ত্রুটি স্বীকার করে নেওয়া এবং যেকোনো ভালো উপদেশ ও ভর্ৎসনা কবুল করতে প্রস্তুত থাকা।

৪. প্রসিদ্ধির সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়া, যেমন সামনাসামনি প্রশংসাকারীদের বাধা প্রদান, মুনাজারা ও তর্কে অহেতুক ঝগড়াঝাঁটিতে নির্লিপ্ততা, সালাফে সালিহিনের অবস্থাদির স্মরণ এবং ফতওয়া প্রদানে তাড়াহুড়া বাদ দেওয়া, সর্বোপরি ইলম ছাড়া কোনো বিষয়ে বকবক না করার ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণাঙ্গ অনুকরণ করা।

৫. দুনিয়াবিমুখতা ও এর তুচ্ছতা-নগণ্যতার গভীর অনুধাবন।

৬. জান্নাতে আল্লাহর নৈকট্যশীল মুত্তাকি বান্দাদের জন্য পরকালে বরাদ্দ প্রতিদানের পূর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষা রাখা।

• সুতরাং হে প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনার কথাবার্তা, কাজকর্মে স্বতন্ত্রতা আনয়ন করে একমাত্র আল্লাহর জন্যই তা নিবেদিত করুন, কেননা নফস গর্ব ও আত্মতৃপ্তির একটুখানি ঢেকুর তোলার জন্য উত পেতে মুখিয়ে আছে, যখন উদাসীন হয়ে যাবেন, তখন কিন্তু সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলবে।

• কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তি অনন্তকালের জীবনে উন্নতি ও রবের নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে সর্বদা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীর উন্নতির পেছনে গা-ভাসিয়ে দেয় না, যা আল্লাহর ক্রোধ-অসন্তুষ্টিকেই অবধারিত করে।

• হে আমার প্রাণপ্রিয় দ্বীনি ভাই, অনেক সময় আপনি মানুষের প্রশংসাবশত নিজেই খুশিতে নাচতে থাকেন, স্তুতির স্বাদ আস্বাদনে মত্ত হয়ে যান, অথচ তাতে রয়েছে আপনার জন্য পূর্ণ অবক্ষয় ও ধ্বংস।

• সাইদ বিন হাদ্দাদ বলেন, 'প্রশংসা কামনা ও নেতৃত্বের লোভের চেয়ে অধিক পরিমাণে আল্লাহর দয়া বঞ্চিতকারী অন্য কোনো বিষয় আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।'

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ

'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও নিভৃতে থাকা বান্দাকে ভালোবাসেন।' ২০৮

টিকাঃ
২০৫. সূরা আল-কাসাস : ৮৩
২০৬. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৭৬
২০৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৬৫৪
২০৮. সহিহ মুসলিম: ২৯৬৫

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 লৌকিকতা উদ্দীপক উপাদানসমূহ

📄 লৌকিকতা উদ্দীপক উপাদানসমূহ


লৌকিকতা এমন এক বিষয়, যার ভয়াবহতার ব্যাপারে জীবনের বিভিন্ন বাঁকে ও প্রেক্ষিতে বারবার বলার পরও এর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয় না। বরং আমাদের সব কর্মকাণ্ডে একনিষ্ঠতা নিশ্চিত করেই এ ব্যাপারে সদা সজাগ থাকা উচিত। আমরা কিন্তু এ কারণে অন্য কর্মগুলোকে লৌকিকতার ভয়ে একেবারে বাদ দিতে বলছি না। কেননা, তাও কিন্তু দুরাচার শয়তানের কূটচালের অংশবিশেষ; বরং আমাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেন তাদের সব কর্মকাণ্ডে একনিষ্ঠতাকেই সর্বদা পুঁজি করে রাখে, লৌকিকতা পরিহার করে এবং খুব ভালোভাবেই এর থেকে সতর্ক থাকে。

• আল্লাহ তাআলা লৌকিকতাকে মুনাফিকদের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন:

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسِ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا )

'অবশ্যই মুনাফিকরা প্রতারণা করে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রতারণা করে। বস্তুত তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।'

• ইবনে কুদামা মাকদিসি বলেন, 'লৌকিকতার মূল উৎস হচ্ছে, নেতৃত্বের লোভ ও সম্মানের লালসা, যদি তা বিশ্লেষণ করা হয়, তখন তা তিনটি প্রধান প্রধান উৎসে বিভাজিত হয়।
১. প্রশংসার লোভ। ২. মানুষের ভর্ৎসনার ভয়। ৩. লোকের আওতাধীন বিষয়াদির প্রতি লোভ-লালসা।'

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসেও এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমন আবু মুসা আশআরি বলেন:

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ الرَّجُلُ: يُقَاتِلُ حَمِيَّةً، وَيُقَاتِلُ شَجَاعَةً، وَيُقَاتِلُ رِيَاءً، فَأَيُّ ذَلِكَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ العُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

'একদা জনৈক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট এসে বলল, "কেউ লড়াই করে গোত্রপ্রীতির জন্য, কেউ বীরত্বের জন্য, আবার কেউবা লোক দেখানোর জন্য; উক্ত ব্যক্তিদের মধ্য হতে কে আল্লাহর রাস্তায় বলে গণ্য হবে?” তদুত্তরে তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর কালিমাকে উঁচু করার জন্য লড়াই করে, মূলত সেই আল্লাহর রাস্তায় বলে গণ্য হবে।”'

সুতরাং يُقَاتِلُ حَمِيَّةٌ এর ব্যাখ্যা হলো, যে নিজ সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ভর্ৎসনার ভয়ে লড়াই করে।

يُقَاتِلُ شَجَاعَةً বীরত্বের জন্য লড়াইয়ের মর্ম হচ্ছে, যেন তার জানবাজির কারণে তার স্মৃতিচারণ ও শাহাদাতের প্রশংসা করা হয়।

يُقَاتِلُ رِيَاءً এর ব্যাখ্যা হলো, মানুষ যেন তার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব স্বচক্ষে দেখে নেয়। আর সেটাই মূলত অন্তরে নেতৃত্বের সুপ্ত লিপ্সা জাগিয়ে তোলে।

* আবার অনেক সময় প্রশংসা ও স্তুতির লোভ না থাকলেও মানুষের ভর্ৎসনার ভয় অন্তরে ঠিকই জাগরূক থেকে যায়। যেমন যদি কেউ তাকে বলে, লোকটা বীরদের মাঝে আস্ত একটা কাপুরুষ! তখন সে অন্তত লোকদের নিন্দা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণপণ লড়াই করে। তেমনিভাবে সঠিক জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞতার নিন্দা থেকে বাঁচার নিমিত্তে অন্ধভাবে ফতওয়া দিয়ে দেয়। উক্ত তিনটি বিষয় লৌকিকতা সৃষ্টিতে অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা রাখে।

লৌকিকতার চিকিৎসা
সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত যে, লৌকিকতা হচ্ছে এমন এক ভয়ংকর বিষয়, যা সব পুণ্যকমর্কে বিনষ্ট করে দেয়। এবং এটাই আল্লাহর শাস্তিতে নিপতিত হওয়ার মূল কারণ।
১. স্মরণ রাখবে যে, মানুষের প্রশংসা ও ভর্ৎসনা রবের দরবারে কিয়ামত দিবসে কোনো কাজেই আসবে না।
২. আর অন্তরে এ ধারণা বদ্ধমূল রাখবে যে, বান্দা নিজের কোনো লাভ বা ক্ষতি সাধন করতে পারে না। এবং নিজের রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।
৩. এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ-ই মূলত রিজিকের প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার মাধ্যমে অন্তরসমূহকে পরিচালনা করে থাকেন। তিনি ছাড়া কেউ রিজিকদাতা নেই।
৪. জেনে রেখো, যে তাঁর সৃষ্টির কাছে ধরনা দেবে, সে অবশ্যই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুতরাং একটু অবাক দৃষ্টিতে লক্ষ করুন যে, লৌকিকতা প্রদর্শনকারী কীভাবে মিথ্যা আশা ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর নগণ্য সৃষ্টিকুলের শরণাপন্ন হয়!
৫. উপকারী চিকিৎসা থেকে অন্যতম হচ্ছে, অন্তরকে উপাসনার গোপনীয়তার ওপর অভ্যস্ত করে তোলা। তা প্রাথমিকভাবে একটু কষ্টকর হলেও ক্রমান্বয়ে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে কেউ যদি অনুশীলনে ব্রতী হয়, তার কাঁধ থেকে সেই বোঝা অচিরেই হালকা হয়ে যাবে। এবং সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। সুতরাং বান্দার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও কঠিন মুজাহাদা করা একান্ত অপরিহার্য। (আল্লাহ-ই তাওফিকদাতা)
• যখন কেউ উচ্চ ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করবে, তার লৌকিকতার আগ্রহ-উদ্দীপনা বহুলাংশে হ্রাস পেতে থাকবে। এবং আন্তরিকভাবে সে আল্লাহর দিকেই মনোযোগী হবে। কেননা, বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই কখনো এমন কোনো বিষয়ে আগ্রহী হয় না, যার লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি।

ইবাদতে গোপনীয়তার কতিপয় নিদর্শন ও বিচিত্র কিছু দৃষ্টান্ত
– একসময় মদিনাবাসীরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনধারণ করত, কিন্তু তাদের জীবিকা সরবরাহের উৎস সম্পর্কে তেমন কেউ সম্যক অবগত ছিল না। কিন্তু যখন আলি বিন হুসাইন ইনতিকাল করলেন, তাদের জীবিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা তাঁর লাশের নিকট গমন করলে তাঁর পৃষ্ঠদেশে এমন কতিপয় দাগ দেখতে পেল, যা দুঃস্থ মানুষের খাবার বহনের কারণে লেগেছিল। লোকজন তা দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেল।
- ইসা বলতেন, 'যখন তোমাদের কেউ রোজা রাখে, সে যেন মানুষের সামনে বের হওয়ার সময় দাড়িতে তেল মালিশ করে এবং ঠোঁটদ্বয় আলতো স্পর্শ করে, যা দেখে মানুষ মনে করে যে, সে তো রোজাদার নয়।'
- মুআবিয়া বিন কুররা বলেন, 'আমাকে এমন ব্যক্তির সন্ধান কি কেউ দেবে? যে রাতের বেলায় অধিক ক্রন্দনশীল, অথচ দিনের বেলায় সদা হাস্যোজ্জ্বল।'

- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব 'আজ-জুহদ'-এর মধ্যে লেখেন, 'আবু ওয়াইল নামক জনৈক পুণ্যবান ব্যক্তি যখন নিজ বাসায় নামাজে দাঁড়াতেন, তখন ক্রন্দনের দরুন কন্ঠস্বর গলায় আটকে যেত।'

- ইবনে কুদামা বলেন, 'লৌকিকতার ভয়ে কোনো পুণ্যকর্ম ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কেননা, তাও মূলত বিভ্রান্তির কূটচালের অংশবিশেষ।'

- ইবরাহিম নাখয়ি বলেন, 'নামাজরত অবস্থায় শয়তান এসে কাউকে যদি এভাবে কুমন্ত্রণা দেয় যে, তুমি লৌকিকতাপূর্ণ উপাসনায় লিপ্ত আছ। সে যেন উক্ত নামাজকে অধিক দীর্ঘায়িত করে।'

শয়তানের কুমন্ত্রণার দাঁতভাঙা জবাব

মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি বলেন, 'একদা ওয়াইস আল-করনি জনৈক ব্যক্তিকে নামাজে ব্যতিক্রমভাবে বারবার ওঠাবসা করতে দেখলেন, তখন এই অদ্ভুত অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করলে লোকটি বলল, "যখন আমি দণ্ডায়মান হই, তখন শয়তান এসে আমাকে কুমন্ত্রণা দেয় যে, তুমি লোক-দেখানো নামাজ পড়ছ, তখন আমি বসে যাই, অতঃপর আমার আত্মা আমাকে আবার নামাজে টেনে নিয়ে যায়। সুতরাং যখন আমি আবার নামাজে দণ্ডায়মান হই, তখনও ওই দুরাচার পূর্বানুরূপ লৌকিকতার কুমন্ত্রণায় আমাকে দগ্ধ করে, তখন আমি আবারও বসে যাই। এবার শয়তান ভিন্ন আঙ্গিকে কুমন্ত্রণার চেষ্টা করে বলে, তুমি কি একাকী নামাজ পড়লে অনুরূপভাবে যত্নসহকারে নামাজ আদায় করো? তখন আমি বলি, হ্যাঁ অবশ্যই, তখন সে নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, আচ্ছা তুমি নামাজ পড়ো, তোমাকে তো আর বশ করা গেল না।"'

হে প্রিয় মুমিন ভাই, সর্বদা শয়তানের সাথে বিরোধিতা ও তাকে অস্বীকারের পলিসি অবলম্বন করুন। কারণ সে কখনো আপনার কল্যাণকামী ও অনুগ্রহশীল হয়ে আপনার কাছে আসে না।

এমনকি লৌকিকতা থেকে ভীতিপ্রদর্শনের সময়ও তার সৎ উদ্দেশ্য থাকে না; বরং সে এর অন্তরালে আপনাকে সব পুণ্যকর্ম থেকে লৌকিকতার ভয় দেখিয়ে বঞ্চিত রাখতে চায়—যে সৎকর্মগুলো আপনাকে স্বীয় রবের নৈকট্যশীল বান্দায় পরিণত করতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সুতরাং হে প্রিয় দ্বীনি ভাই, আল্লাহর কাছে অধিক হারে কাকুতি-মিনতি করে বিগলিতভাবে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করুন। যেন আল্লাহ অন্তর থেকে অহংকার, লৌকিকতা, প্রশংসা ও প্রসিদ্ধির লোভ-লালসা সম্পূর্ণরূপে বের করে দেন।

নিম্নোক্ত দুআটি সর্বদা পাঠ করতে থাকুন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ
‘হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট জেনেশুনে শিরক করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং অজ্ঞাতসারে কৃত শিরক থেকে আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরের শূন্যতা

ইবনুল জাওজি বলেন, ‘কোনো মুমিন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতিতে ইবাদত করতে পছন্দ করে না, যতক্ষণ না তার অন্তর স্বীয় রবের স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহর স্মরণে মশগুল অন্তর অনিবার্যভাবে মাখলুক থেকে পলায়ন করে এবং নির্জনে থাকতে অধিক ভালোবাসে; কিন্তু যখনই আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সে সৃষ্টিকুলের স্তুতি ছাড়া অন্য কিছুই দেখে না। ফলে সে তখন তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে সব কাজ সম্পাদন করে। যার ফলে অজান্তেই সে বিধ্বংসী লৌকিকতার দরুন নিপতিত হতে থাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে।

টিকাঃ
১৩২. সুরা আন-নিসা: ১৪২
১৩৩. সহিহুল বুখারি: ৭৪৫৮, সহিহু মুসলিম: ১৯০৪
১৩৪. আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭১৬

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 উন্নতির প্রধান প্রধান অন্তরায়

📄 উন্নতির প্রধান প্রধান অন্তরায়


আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا ﴾ ‘শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।’৩৬৫
• ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ শয়তান মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে ভ্রান্ত বিষয়ে জড়িয়ে লাঞ্ছিত করে এবং বিভ্রান্তির পথে আহ্বান করতে থাকে।

রাসুলুল্লাহ এ দুআ বেশি বেশি পড়তেন : يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।’৩৬৬

তিনি এ দুআও পড়তেন : اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরকে আপনার আনুগত্যের প্রতি ধাবিত করে দিন।’৩৬৭

• রাসুলুল্লাহ আমাদেরকে পরকালীন অবক্ষয়ের সব ধরনের কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি সর্বদা এই দুআ পাঠ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ، وَالبُخْلِ والجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

‘হে আল্লাহ, আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রভাব থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।’৩৬৮

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘এই হাদিসে রাসুল ﷺ সকল অনিষ্টতার মূল উৎস ও শাখা-প্রশাখার বিষয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এই দুআটি সহজাত আটটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে—যার প্রত্যেক দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর কাছাকাছি।

(الهم والحزن (দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(الهم (দুশ্চিন্তা) ভবিষ্যতের জন্য, অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোনো বিষয় অর্জিত হবে কি হবে না—এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অথবা কোনো বিষয়ের শঙ্কায় থাকা।
(الحزن (পেরেশানি) অতীতকালের জন্য, অর্থাৎ অতীতে কোনো প্রিয়জনকে হারানো কিংবা ব্যবসায় লোকসানের দরুন চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে যাওয়া।

(العجز والكسل (অক্ষমতা ও অলসতা)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(العجز (অক্ষমতা) : শক্তির দৈন্যতার দরুন বান্দা কল্যাণের যাবতীয় উপায়-উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ সম্পদের স্বল্পতা কিংবা অন্য কোনো কারণে ফরজ হজ আদায়ে সক্ষম না হওয়া।
(الكسل (অলসতা) : সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ইচ্ছা পোষণ না করা। যেমন তাহাজ্জুদের নামাজ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উদাসীনতা হেতু না পড়া।

উন্নতি ও অগ্রগতি থেকে বান্দার পিছিয়ে পড়ার অন্তর্নিহিত কারণ
ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘বান্দার অগ্রগতি থেমে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান দুটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে。
১. শক্তিমত্তার দৈন্যতা, যাকে অক্ষমতা বলা হয়।
২. সক্ষমতা সত্ত্বেও কাজের ইচ্ছা পোষণ না করা, যাকে অলসতা বলা হয়।

উক্ত দুটি বৈশিষ্ট্যর দরুনই কল্যাণের সব দ্বার রুদ্ধ ও অনিষ্টতার সব পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

(البُخْلِ وَالجُبْنِ) কৃপণতা ও কাপুরুষতা)-এর মধ্যকার পার্থক্য
(البخل) কৃপণতা) বলতে বোঝায় স্বীয় সম্পদের দ্বারা কোনো উপকার সাধন না করা। যেমন কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীয় সম্পদ খরচ করা থেকে বিরত থাকা।
(الجين) কাপুরুষতা) বলতে বোঝায় নিজ শরীর দ্বারা কোনো উপকার সাধন না করা। যেমন ইসলাম ও মুসলিমদের সেবায় নিজেকে সঁপে না দেওয়া।

(ضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَال) ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রভাব)-এর মধ্যে পার্থক্য
(ضَلَعِ الدَّيْنِ) ঋণের বোঝা : নিজ অধিকার আদায়ের জন্য অন্য কেউ ঘাড়ের ওপর চেপে বসা। যেমন জনৈক ব্যক্তি আপনার কাছে তার প্রাপ্য ঋণ ফেরত চাচ্ছে। অথচ, তা আপনি আদায় করতে পারছেন না।
(غَلَبَةِ الرِّجَال) মানুষের অবিচার : অন্যায়ভাবে কেউ কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করা। যেমন অন্যায়ভাবে কেউ কারও প্রতি অবিচার করা, চাই তা শাস্তি বা জেল কিংবা হুমকি-ধমকির মাধ্যমে হোক।

অক্ষমতা সকল অনিষ্টতার মূল
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'অবাধ্যতার মূল উৎস হচ্ছে অক্ষমতা। কারণ, এর মাধ্যমেই বান্দা আনুগত্যবিষয়ক উপাদান ও পাপ দূরীভূতকারী উপায় থেকে অক্ষম হয়ে যায়। যার ফলে সে অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।'
উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তার ক্ষতিকারক দিকসমূহ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা মানুষের কোনো উপকার সাধন করতে পারে না; বরং এতদুভয়ের ক্ষতি উপকারের চেয়ে অনেক বেশি। কেননা, উভয় উপাদানই দৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করে দেয়, হৃদয়কে করে ফেলে অন্তঃসারশূন্য এবং উপকারী বস্তু অবলম্বনের চেষ্টার প্রাক্কালে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

সম্মুখ চলার পথ রুদ্ধ করে দেয় চিরতরে এবং পেছনে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে—পেছন ধরে টানতে থাকে।'

দৈব দুর্বিপাক তথা অশুভ লক্ষণের স্বরূপ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যা কিছুই বান্দাকে রবের স্মরণ থেকে উদাসীন করে দেয়, তা নিঃসন্দেহে অশুভ। পক্ষান্তরে যা কিছুই রবের স্মরণ জাগ্রত করে, তা নিশ্চয় শুভ ও উক্ত ব্যক্তির জন্য রহমতস্বরূপ।'

সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনার দৈনন্দিন জীবনে স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসা, দামি গাড়ি প্রভৃতি যদি আপনার প্রতিপালকের আনুগত্যে শিথিলতার জন্য দায়ী হয়, তবে এসব বিষয় আপনার জন্য অশুভ হিসেবে বিবেচিত। আর কখনো যদি আপনি কোনো বিপদে (যেমন: রোগব্যাধি, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা কোনো লোকসান ইত্যাদিতে) পতিত হওয়ার দরুন আপনার প্রতিপালকের আনুগত্যের কথা স্মরণ হয়, তবে তা তো আল্লাহর দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তনের কারণ। যা আপনার অজান্তেই আপনার জন্য রহমত হিসেবে আবির্ভূত হয়।

টিকাঃ
৩৬৫. সুরা আল-ফুরকান: ২৯
৩৬৬. সুনানুত তিরমিজি: ২১৪০
৩৬৭. সহিহু মুসলিম: ২৬৫৪
৩৬৮. সহিহুল বুখারি: ২৮৯৩

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আসমানি লাঞ্ছনা থেকে সাবধান!

📄 আসমানি লাঞ্ছনা থেকে সাবধান!


পরের সমালোচনা—অমুক এমন করেছে, তমুক এমন করেছে, এ জাতীয় অগ্রহণযোগ্য, নিষ্প্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে সাবধান! বরং সময় ফুরানোর পূর্বেই নিজে সংশোধন হওয়ার চেষ্টা করুন।

নিজে নিজের দোষ-ত্রুটি ধরার উপায়

১. আত্মার ব্যাধি ও তার প্রতিকার সম্বন্ধে প্রাজ্ঞবান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাইখের সাহচর্য গ্রহণ করা।
২. সত্যবাদী দ্বীনদার সহপাঠী অন্বেষণ করা। যে আপনার ভুল ধরে দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করবে।
৩. শত্রুদের মুখ থেকে নিজ দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে অবগত হলে সংশোধনের চেষ্টা করা (যদি তা সত্য হয়)।
৪. সাধারণ লোকজনের সাথে মেশা—এ উদ্দেশ্য যে, তাদের কাছে যে অভ্যাস নিন্দিত বলে জানবে, তা সে পরিহার করে চলবে。

* উমর বিন খাত্তাব বলেন, 'আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে দয়া করুন, যে আমাদের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়।'

* আমাদের সালাফ ওই ব্যক্তিকে বেশি ভালোবাসতেন, যে তাদের ভুল ধরিয়ে দিত। অথচ, আজকাল আমাদের নিকট সেই ব্যক্তিই হয় সর্বাধিক ঘৃণার পাত্র, যে আমাদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে শুধরানোর চেষ্টা করে।

* নিজের দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে প্রাজ্ঞবান হওয়া মহান রবের পক্ষ থেকে কল্যাণ বর্ষিত হওয়ার অন্যতম নিদর্শন।

* রাসুলুল্লাহ নিম্নোক্ত দুআটি পাঠ করতেন :
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
'হে আল্লাহ, আমাদের আত্মায় তাকওয়ার (আল্লাহভীতির) বীজ বপন করে দিন এবং তা পূত-পবিত্র করে দিন। (কেননা,) আপনিই তো সর্বোত্তম পবিত্রকারী ও অভিভাবক।'

আপনি কি নিজ ব্যক্তিত্বের প্রতি সন্তুষ্ট ও আত্মতৃপ্ত?
ইবনে আব্বাস বলেন, 'যখন তুমি তোমার কোনো সঙ্গীর দোষ ধরার ইচ্ছা করবে, তখন প্রথমেই নিজের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।'
একদা জনৈক ব্যক্তি রাবি বিন খুসাইমকে বললেন, 'আমি নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নই, তাই অন্যের দোষ ধরে নিন্দা করার অবকাশ পাই না। পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষ আজকাল আল্লাহর বান্দাদের পাপাচারে কত যে উদ্বিগ্ন! অথচ, নিজ পাপের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।'

টিকাঃ
২৯২. সহিহু মুসলিম: ২৭২২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00