📄 অনুগ্রহের পথ কেন রুদ্ধ হয়?
• আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ 'আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়মতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদের পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের কারণে।' [31]
যদি গ্রামবাসীরা রাসুলগণের কথা বিশ্বাস করত, তাদের কথা মান্য করত আর আল্লাহর যাবতীয় নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকত; আল্লাহ তাদের জন্য চতুর্দিক থেকে কল্যাণের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিতেন। কিন্তু তারা রাসুলগণকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে; তাই আল্লাহ তাদের ঘৃণ্য পাপাচার ও অবাধ্যতার কারণে কঠোর শাস্তি দিলেন।
• আনাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ 'যে ব্যক্তি দুনিয়াতে তার জীবিকার প্রশস্ততা চায় এবং দীর্ঘায়ু কামনা করে, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে।' [32]
• হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেন: إِنَّ الْعَبْدَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ 'নিশ্চয় বান্দা তার পাপের কারণেই রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।' [33]
• বর্ণিত আছে, পাপে নিমজ্জিত হওয়ার কারণে ব্যক্তিকে হালাল জীবিকা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। হালাল উপার্জনের তাওফিক তার হয়ে ওঠে না。
• পাপের কারণে উলামায়ে কিরামের সাহচর্য থেকে সে বঞ্চিত হয় এবং পুণ্যবানদের কাছে যেতে তার মন সায় দেয় না।
• আল্লাহর নেক বান্দা ও আলিমগণ তার ওপর অসন্তুষ্ট হন, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
• অজ্ঞতায় নিমজ্জিত থাকার কারণে সে আমলের জন্য অপরিহার্য ইলম থেকে বঞ্চিত হয়। প্রবৃত্তির খাহেশ পূরণে ব্যাপৃত থাকায় সংশয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। সন্দেহের জট সে আর খুলতে পারে না। তার বোধ-বিশ্বাস হয়ে পড়ে এলোমেলো। ফলে সে যাযাবরের মতো আল্লাহর আশ্রয়হীন অবস্থায় এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে। সত্য ও বাস্তবতার দরজায় কখনো সে করাঘাত করতে পারে না।
• ফুজাইল বিন ইয়াজ বলতেন, 'কালের দুর্বিপাক ও বন্ধুদের রূঢ়তা দেখে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? এ তো তোমার পাপের পরিণতি!'
• অবৈধ উপার্জন নেক কাজের স্বল্পতার কারণেই হয়ে থাকে।
• ইবনে মাসউদ বলতেন, 'আমি বিশ্বাস করি, গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে বান্দা ইলম ভুলে যায়।'
• কুরআন মুখস্থ করে ভুলে যাওয়া কঠিন আজাবের ইঙ্গিত বহন করে। তিলাওয়াতের তাওফিক না হওয়া, তিলাওয়াত করতে অস্বস্তি বোধ করা এবং কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া মূলত গুনাহে অভ্যস্ততার শাস্তি।
• যার মধ্যে দুটা বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে, তার জন্য দ্বীনি ইলমের দরজা কখনো খোলা হবে না। তা হলো: ক. বিদআত ও খ. অহংকার।
• জনৈক আলিম বলেন, 'আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, তার জন্য সৎকর্মের দ্বার উন্মুক্ত এবং অহেতুক বিতর্কের দ্বার রুদ্ধ করে দেন। পক্ষান্তরে যার অকল্যাণ চান, তার জন্য সৎকর্মের দ্বার রুদ্ধ এবং অহেতুক বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।'
• শাফিক বিন ইবরাহিম বলেন, 'ছয়টি কারণে মানুষ সৎকর্মের তাওফিক থেকে বঞ্চিত হয়।' যথা: ১. কৃতজ্ঞতা বাদ দিয়ে শুধু স্বীয় রবের নিয়ামত নিয়ে মত্ত থাকা। ২. আমল বাদ দিয়ে শুধু ইলম অন্বেষণেই পড়ে থাকা। ৩. পাপ সম্পাদনে খুব অগ্রগামী হলেও তাওবার ক্ষেত্রে উদাসীন হওয়া। ৪. পুণ্যবান বান্দাদের সাহচর্য গ্রহণ ও তাঁদের কর্মপন্থা অনুসরণে শিথিলতা প্রদর্শন করা। ৫. দুনিয়াবি তুচ্ছ স্বার্থ হাসিলের জন্য দুনিয়ার পেছনে পাগলের মতো দৌড়াতে থাকা। ৬. পরকালীন কল্যাণের দ্বার তার দিকে ধাবিত হলেও এর প্রতি মোটেও ভ্রূক্ষেপ না করা।
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, উল্লিখিত অবক্ষয়সমূহের মূল কারণ হচ্ছে, জান্নাতের নিয়ামতরাজির প্রতি আগ্রহ ও জাহান্নামের শাস্তির ভয়— এতদুভয়ের স্বল্পতা। আবার উভয়ের মূল উৎস হচ্ছে, স্বীয় রবের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের দৈন্যতা। উক্ত দৈন্যতা সৃষ্টির মূল উপাদান হচ্ছে, বিচক্ষণতার স্বল্পতা। আবার সবকিছুর মূল উৎস হচ্ছে, স্বভাবজাত হীনতা ও চারিত্রিক দীনতা এবং উত্তমের বিনিময়ে অনুত্তম নিয়ে সন্তুষ্টি প্রভৃতি। কারণ, উন্নত আত্মা কখনো নীচু বিষয় নিয়ে সন্তুষ্ট হয় না।
• সুতরাং হে সম্মানিত প্রিয় ভাই, যদি আপনি স্বীয় রবের ইবাদত ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যে উদাসীনতা ও শিথিলতা অনুভব করেন, তখন নিশ্চিত ধরে নিন যে, আপনি উল্লিখিত ব্যাধিগুলোর মধ্য থেকে কোনো না কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত।
টিকাঃ
৩১. সুরা আল-আরাফ: ৯৬
৩২. সহিহুল বুখারি: ৫৯৮৬, সহিহু মুসলিম: ২৫৫৭
৩৩. মুসনাদু আহমাদ: ২২৪৩৮
📄 উন্নতির পথে কতিপয় প্রতিবন্ধকতা
রবের পথের পথিক-মুমিন বান্দার জীবন জন্ম থেকে মৃত্যু ও স্বীয় রবের সাক্ষাৎ অবধি নানান ধরনের পরিশ্রম ও সাধনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়。
• কেননা, রবের সন্তুষ্টির পথটি বড়ই বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ, যাতে রয়েছে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা। মুমিন বান্দা এসব প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই তার গন্তব্য তথা রবের দিদার লাভ করে। এ পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো যেমন: নানা রকমের সন্দেহ, সংশয়, কুপ্রবৃত্তি, আত্মার ব্যাধি, অতঃপর ইমান ও ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে তো কাঁটার ছড়াছড়ি ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। নিম্নে এসব প্রতিবন্ধকতার সামান্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:
১. সন্দেহ-সংশয়: এটা মূলত প্রাথমিকভাবে একজন পথিককে মোকাবিলা করতে হয়, যা বিশ্বাসের দুর্বলতা, নানা কুমন্ত্রণা, ইসলাম, কুরআন ও সুন্নাহর ওপর নানা অভিযোগের আকৃতিতে রূপ ধারণ করে, যার দরুন অন্তরে নানান কলুষতা ও কদর্যতার দানা বাধে, যা ক্রমান্বয়ে রবের পথ থেকে পথিককে পদচ্যুত করে ফেলে। তাই উন্নতি-প্রত্যাশী মুমিনের জন্য স্বীয় অন্তরকে কোনো ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ের আধার না বানানো একান্ত অপরিহার্য। বরং এ ধরনের কুমন্ত্রণা আসামাত্রই সেটাকে রবের কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে প্রতিহত করা তার ওপর আবশ্যক।
সতর্কতা: মূলত এ ধরনের সংশয় দ্বীনি বুঝের স্বল্পতার দরুনই অস্তিত্বে রূপ লাভ করে।
২. কুপ্রবৃত্তি: যেমন অবৈধ বস্তু ভক্ষণ, পদ ও নেতৃত্বের লোভ, লজ্জাস্থানের অপব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ধরনের অবৈধ কামনা যদিও বা পথিককে পরিপূর্ণ পদচ্যুত করে না, তথাপি আখিরাতের সফলতার পানে তার পথচলাকে অনিরাপদ করে তোলে।
বস্তুত, এ জন্যই রাসুল এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সর্বক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টিকেই জীবনের পরম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তেমনই সাহাবায়ে কিরামও ঠিক একইভাবে জীবন অতিবাহিত করেছেন।
৩. আত্মার ব্যাধি: তা বিভিন্ন নিন্দনীয় গুণ ও মন্দ চরিত্রের বার্তাবাহক, যেমন: আত্মনির্ভরতা, আত্মতুষ্টি, হিংসা, বিদ্বেষ, অতি লোভ-লালসা, কাপুরুষতা, উদাসীনতা, অলসতা এবং আখিরাত ভুলে দুনিয়ার প্রেমে মত্ত হওয়া ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যকে অন্তর্ভুক্ত করে।
তাই মুমিন বান্দাকে উক্ত মন্দ বৈশিষ্ট্যাবলি থেকে বিরত থাকতে যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
৪. ইবাদতের বিপদ: অর্থাৎ প্রসিদ্ধি ও লৌকিকতা, নেতৃত্বের লোভ, মানুষের কাছে প্রশংসা কুড়ানো, সৎকর্মের মাধ্যমে দুনিয়া কামানো প্রভৃতির প্রবণতা। তাই বুদ্ধিমান মুমিনমাত্রই স্বীয় আমল ও ইবাদতকে উক্ত ভয়ংকর ব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র করতে কখনো পিছপা হয় না।
নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়া: তা প্রতিনিয়ত নিষ্ঠা, বিনয়, প্রার্থনা, করুণা, ভরসা, ভয়, ধৈর্যধারণ, জিকির, তিলাওয়াত, খাঁটি তাওবা, আত্মজিজ্ঞাসা, সময় সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তরোত্তর উন্নতি সাধন সম্ভব হয়। তার জীবন-সময় সার্বক্ষণিক অক্লান্ত পরিশ্রম, কষ্ট-ক্লেশ, কঠোর সাধনা ও ধৈর্যধারণের মধ্য দিয়ে যায়।
বস্তুত, এ কারণেই জিহাদকে ইমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা প্রতিটি উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য সার্বিক অবস্থায় আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য। আর উদাসীন ব্যক্তি এসব গুণের প্রভাব বলয় থেকে তো অনেক দূরে।
• এসব গুণ অর্জনের জন্য দুটি জিনিস আবশ্যক।
১. দৃঢ়প্রত্যয়। আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ ﴾ 'তার জন্য, যে তোমাদের মধ্যে সোজা চলতে চায়।'
২. আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ ও ইচ্ছা: কেননা, তিনি যা চান, বস্তুত তা-ই অস্তিত্ব লাভ করে। যা তিনি চান না, তা কখনো হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ﴾ 'তোমরা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অভিপ্রায়ের বাইরে অন্য কিছুই ইচ্ছা করতে পারো না।'
একটি উপদেশ: হে পাঠক, যদি আল্লাহর রহমত, তাওফিক ও সাহায্যের মাধ্যমে সফলতা পেতে চান, তাহলে আপনার ওপর রবের নিকট করজোড়ে বিগলিত কণ্ঠে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা আবশ্যক, যা কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত।
টিকাঃ
২০০. সুরা আত-তাকভির: ২৮
২০১. সুরা আত-তাকভির: ২৯
📄 প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ রবের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন
• ইবনুল কাইয়িম রহ বলেন, 'প্রতিবন্ধকতা মূলত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রবের বিধিবিধানের বিরোধিতায় নানা ধরনের নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। বস্তুত, এগুলোই আল্লাহর পথ থেকে পদচ্যুত করার জন্য পথিকের অন্তরে প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর তৈরি করে, যা মাড়িয়ে সামনে পথ চলা যে কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়。
প্রতিবন্ধকতা প্রধানত তিন প্রকার: ১. তাওহিদের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে শিরকের প্রতিবন্ধকতা। ২. সুন্নাত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদআতের প্রতিবন্ধকতা। ৩. খাঁটি তাওবার ক্ষেত্রে অবাধ্যতা পুনর্বার হানা দেওয়ার প্রতিবন্ধকতা।
উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলার সহজ উপায়
আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন ব্যতীত এসব প্রতিবন্ধকতা জয় করা পথিকের জন্য একেবারেই অসম্ভব। কেননা, আত্মা কখনো স্বীয় প্রেমাস্পদের সঙ্গ ছাড়তে রাজি নয়। হ্যাঁ, ওই প্রেমাস্পদ ছাড়া যিনি তার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তাই আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক যতই মজবুত হবে, অন্যদের সাথে সম্পর্ক ততই দুর্বল হবে。
• আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মূলত তাঁর প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও ভালোবাসাকে বোঝায়, যা তাঁর মারিফত অনুপাতে হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে。
প্রতিবন্ধকতা ও বিচ্যুতি: অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ব্যতীত দুনিয়ার যাবতীয় ভোগবিলাস, নেতৃত্বের লোভ, অবৈধ কামনা-বাসনা প্রভৃতি নিয়ে অন্তর ব্যস্ত হয়ে পড়া, তেমনিভাবে মানুষের সার্বক্ষণিক সাহচর্য ও গভীর সম্পর্কের দরুনও আল্লাহর পথের পথিক পদচ্যুত হয়।
📄 আমাদের জীবনে অহেতুক কাজের ছাড়াছড়ি
আল্লাহর পথ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বস্তুর চেয়ে অহেতুক কাজের ছড়াছড়ি আমাদের জীবনে অনেক বেশি, যা ব্যক্তির দৃঢ় প্রত্যয়কে নড়বড়ে করে দেয়, দৃঢ়সংকল্পকে করে ফেলে ক্ষীণ ও অন্তঃসারশূন্য। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمُ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا ﴾
'যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ-এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। '
• শাইখ সাদি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অজানা বিষয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করো না, বরং নিজ কথা ও কাজে দৃঢ়ভাবে মজবুত থাকো। কেননা সম্পাদিত কর্মকাণ্ড এমনি এমনি হাওয়া হয়ে যাচ্ছে মনে করার তো কোনো জো নেই; বরং প্রকৃত অনুগত বান্দার উচিত হচ্ছে, তার কথা-কাজ ও মনোবাঞ্ছার ক্ষেত্রে নিজ জবান, অন্তর ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করা, সর্বোপরি মহান রবের ইবাদত, একনিষ্ঠতা এবং রবের অপছন্দনীয় কাজসমূহ থেকে বিরত থাকা প্রভৃতির মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখা। কেননা চোখ, কান ও অন্তরসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যথাযথ জবাবদিহি করতে হবে।
• রাসুলুল্লাহ বলেন:
احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ
'তোমার উপকারী বস্তুর প্রতি উদ্বুদ্ধ হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, কিন্তু অক্ষম হয়ো না।'
• ইমাম নববি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর নিয়ামত লাভের আগ্রহের দিকে ভালোভাবে মনোনিবেশ করো এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করো, নিরুপায় হয়ো না। এবং আনুগত্য ও সাহায্য প্রার্থনা থেকে কখনো উদাসীনতা ও শিথিলতা প্রদর্শন করো না।'
• আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, 'আমার কাছে বেকার ব্যক্তির চেয়ে অপছন্দ আর কেউ নেই, যে না কোনো দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত আর না পারলৌকিক কাজে।'
• অহেতুক কাজ বলতে ওই সব কথা ও কাজই উদ্দেশ্য, যা দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যক্তির কোনো উপকারে আসে না। তাই সময়কে ঠাট্টা-মশকারা, হেলাখেলায় নষ্ট করবেন না। এমনকি অবৈধ বিষয় তো দূরের কথা বৈধ বিষয়েও ব্যাপকভাবে গা ভাসিয়ে দেবেন না। (সফলকাম মুমিনদের ব্যাপারে) আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ﴾ 'এবং যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে।' কেননা, মুসলিমদের দায়িত্ব তাদের সময় থেকে অনেক বেশি।
• আমরা যদি জীবনের বিভিন্ন বাঁকে সামান্য দৃষ্টিপাত করি, তাহলে এই অহেতুক কর্মকাণ্ডকে নানা আকার-আকৃতি ও বৈচিত্রময় ভঙ্গিতে আবির্ভূত হতে দেখি। অথচ, আমরা এরপরও বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করি না।
আমাদের জীবনের কতিপয় অহেতুক কাজের দৃষ্টান্ত
- আল্লাহর স্মরণমুক্ত বৈঠকে বসে আড্ডাবাজি করা।
- বিভিন্ন চ্যানেলের সিনেমা-নাটকের সিরিয়াল দেখাতেই সময় নষ্ট করা।
- এমন সব অশ্লীল ম্যাগাজিনে বুঁদ হয়ে থাকা, যা সমাজে ব্যাপকভাবে নির্লজ্জতার বিষবাষ্প ছড়াতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রাখে।
- মোবাইল-ফোনে অহেতুক দীর্ঘক্ষণ কথোপকথন।
- কৌতুক ও সময় অপচয়ের জন্য উদ্ভট খবর ছড়ানো।
- বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে অহেতুক সম্পদ খরচ, যেমন: জন্মদিন, মৃত্যুদিবস পালন।
- মোবাইলে বেহুদা ম্যাসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সময় অপচয়।
- বস্তুর দিকে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অবৈধ দৃষ্টিপাত।
- বাজে চিন্তা-চেতনা, শয়তানি নানা কুমন্ত্রণা ও প্রবৃত্তির মাঝে মজে থাকা।
- অশ্লীল ছোট মানের গল্প পড়ার মাধ্যমে সময় অপচয়।
- কোনো প্রয়োজন ছাড়াই সভা-সমিতিতে গমন করা।
– কষ্ট প্রদানের লক্ষ্যে মানুষের অবস্থার পর্যবেক্ষণ ও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা।
- অহেতুক হাসি-ঠাট্টা, মশকারা করা।
জীবনে বাজে কাজের ক্ষতিকারক দিকসমূহ
- সময় অপচয়, কর্মক্ষমতা ধ্বংস।
- অবৈধ কাজে জড়ানো এবং নিজ সম্পদ বিনষ্ট।
- চেতনার ভারসাম্যহীনতা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি থেকে উদাসীনতা ও আমানতের খিয়ানত।
- সর্বশেষ লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও অপমান অর্জন।
বাজে বিষয়গুলো আমাদের জীবনে অনুপ্রবেশ করার কারণ
১. মনকে তার খেয়াল-খুশিমতো ছেড়ে দেওয়া এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে যা চাই তা-ই বাস্তবায়ন করা।
২. আল্লাহর ভালোবাসা, আনুগত্য, ও নৈকট্য থেকে অন্তর ও নফসের শূন্যতা ও অমনোযোগিতা।
৩. দুনিয়াবি কিংবা পারলৌকিক যেকোনো উপকারী কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
৪. বাজে ও বেকার ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা, কেননা মানুষের জীবনে সঙ্গীর প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়।
বাজে স্বভাব ও বেকারত্বের চিকিৎসা
১. নিজের নফসকে দুনিয়া ও আখিরাতের অপকারী বিষয়াবলি ছাড়তে ব্যাপক পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে অভ্যস্ত করে তোলা।
২. আল্লাহর সাথে সর্বদা সম্পর্ক অটুট রাখা, অপরদিকে মানুষের সাথে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া।
৩. সালাফের জীবনী অধ্যয়ন করা, এ উপলব্ধি অন্তরে ধারণ করে যে, তারা সময় সংরক্ষণ, মহান রবের আনুগত্য ও জিকিরের মাধ্যমে তাঁর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের প্রতি কেমন উৎসাহী ছিলেন।
৪. বাজে ও বেকার লোকদের সাহচর্য থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বাঁচিয়ে রাখা, কেননা, তাদের সাহচর্য জীবনে অনেক বালা-মুসিবত ও দুর্ভোগ বয়ে আনে। পক্ষান্তরে সৎকর্মশীল, ব্যস্ত লোকদের সংস্পর্শ মানুষকে কর্মঠ ও উদ্যমী করে তোলে, যা তাদের জন্য অশেষ কল্যাণ ও সম্মান বয়ে আনে।
টিকাঃ
২০২. সুরা বনি ইসরাইল: ৩৬
২০৩. সহিহু মুসলিম: ২৬৬৪
২০৪. সুরা আল-মুমিনুন: ৩