📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 হে পরকালমুখী অভিযাত্রী থাকো! একটু ভাবো!

📄 হে পরকালমুখী অভিযাত্রী থাকো! একটু ভাবো!


নিম্নে সালাফের মুখনিঃসৃত মনি-মুক্তোসদৃশ কিছু অমিয় বাণী নিয়ে আলোকপাত করা হলো, যা আখিরাতের পথিকদের জন্য উত্তম, কার্যকর পাথেয় হিসেবে কাজ দেবে।

প্রথম স্পট: সারি আস-সাকাতি বলেন, 'নিজের মাঝে অনুপস্থিত গুণকে কৃত্রিমভাবে সজ্জিত করার দরুন আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে হয়।'

সুতরাং হে প্রিয় ভাই, নিজের মাঝে অনুপস্থিত বিষয়ে অহেতুক কৃত্রিমতা ও তা সজ্জিত করা থেকে সাবধান! চাই তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি বা অন্য যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রেই হোক না কেন। সুতরাং নিজ অন্তরে লালনকৃত বিষয়ের বিপরীত অবস্থা প্রকাশ করা আল্লাহর রহমতের সুদৃষ্টি থেকে পড়ে যাওয়ার অন্যতম নিয়ামক।

দ্বিতীয় স্পট: জনৈক প্রাজ্ঞবান ব্যক্তি বলেন, 'বুদ্ধিমান মুমিনের জন্য পাঁচটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করা অপরিহার্য। ক. অতীত পাপের ব্যাপারে সর্বদা অনুতপ্ত থাকা। খ. ক্ষমা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত থাকা। গ. সৎকর্মের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কায় থাকা। ঘ. জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাপারে আশঙ্কায় থাকা যে, কোথায় হবে আমার ঠিকানা? অনন্তকালের শান্তির নীড় জান্নাত না চিরস্থায়ী শাস্তির ঠিকানা জাহান্নাম? ঙ. স্বীয় রবের সন্তুষ্টির ব্যাপারে সর্বদা শঙ্কায় থাকা।

তৃতীয় স্পট : মালিক বিন দিনার বলেন, 'যখন তুমি অন্তরে কাঠিন্য ও শরীরে ক্লান্তি অনুভব করবে, তখন নিশ্চিত থাকো যে, তুমি অবশ্যই অহেতুক কথাবার্তায় জড়িয়েছ।'

চতুর্থ স্পট: আবুল আলিয়া বলেন, 'আমি আশা রাখি যে, বান্দা দুটি বিষয়কে আঁকড়ে ধরলে কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না। ক. আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায়। খ. নিজ গুনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করা।'

পঞ্চম স্পট : ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'বান্দার ওপর আল্লাহর দুটি অত্যাবশকীয় অধিকার রয়েছে, যে অধিকারদ্বয়ের ক্ষেত্রে সে কখনো শিথিলতা প্রদর্শন করতে পারে না। ক. মহান প্রভুর আদেশ-নিষেধ পালনে যথাযথ যত্নবান হওয়া। খ. আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের ওপর কৃতজ্ঞ হওয়া।'

ষষ্ঠ স্পট : ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, 'দাউদ-এর হিকমার কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য চারটি সময়ে শিথিলতা প্রদর্শন কখনো বাঞ্ছনীয় নয়।

ক. রবের সাথে একান্ত আলাপের সময়。
খ. আত্মসমালোচনার সময়।
গ. বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সময়, যদি তাদের কোনো একটি বিচ্যুতি শুধরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয়।
ঘ. বৈধ ও প্রশংসনীয় বিষয়ের স্বাদ আস্বাদন করার সময়।”

বুদ্ধিমানের ওপর আরও আবশ্যক হলো, নিজ সময়ের ব্যাপারে সদা সজাগ থাকা।'

• হায়, উক্ত আলোচিত উপদেশাবলি বাস্তবায়নে আমরা যদি সত্যি সত্যি যত্নবান হতাম, তবে আমরা সফলতার কতই না উচ্চ শিখরে উন্নীত হতাম!

সপ্তম স্পট : ইমাম ইবনে কাইয়িম বলেন, 'বান্দার চিরস্থায়ী সফলতার পূর্বশর্ত হলো, দৃঢ় প্রত্যয়, বিপদে ধৈর্যধারণ, মানসিকভাবে সাহসী, আন্তরিক দৃঢ়তা, যা মূলত সবই আল্লাহর অনুগ্রহের অংশ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করেন।'

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 ভয়ংকর মুহূর্ত

📄 ভয়ংকর মুহূর্ত


নীরবতা চারদিকে আছড়ে পড়ছে, ভয়ংকর নিস্তব্ধতা ও আশ্চর্যজনক মৌনতা গ্রাস করে ফেলেছে সবকিছুকেই। যে দিকেই চোখ যায় কবর ও লাশের স্তুপ ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। থেমে গেছে কালের আবর্তন। অচল হয়ে গেছে সময়ের চাকা। প্রচণ্ড ভীতি সঞ্চারকারী বিকট বিস্ফোরণ বিদীর্ণ করে দিচ্ছে নিস্তব্ধতাকে। যার ক্ষীণ আওয়াজ মুক্ত আকাশে কর্ণগোচর হবে। যে বিকট শব্দ মৃতদের জীবিত করে তুলবে। পৃথিবীর মাটি বিদীর্ণ করে দেবে। কবরকে ওলটপালট করে ছাড়বে। মানুষেরা সেখান থেকে ধুলোমিশ্রিত হয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় পঙ্গপালের ন্যায় বের হতে থাকবে। প্রত্যেকেই দ্রুত বেগে শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিতে দৌড়াতে থাকবে। সেদিনটি হবে কিয়ামতের দিন।

কোনো বাক্যালাপ ছাড়া মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্যাবস্থায় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকবে। সেদিন পাহাড় সম্পূর্ণ সমতল হয়ে যাবে। নদীনালা শুকিয়ে যাবে, সমুদ্র উত্তাল হয়ে গর্জন ছাড়বে। সেদিন ভূমণ্ডল আর ভূমণ্ডল থাকবে না। চিরাচরিত নভোমণ্ডল পূর্বের ন্যায় বহাল থাকবে না। বরং উভয়ের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। সেদিন মহাপরাক্রমশালী রবের আহ্বান থেকে পলায়নের কোনো উপায় থাকবে না। সেদিন সংঘটিত হবে সৃষ্টির সবচেয়ে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি। তখন সবাই চুপচাপ থাকবে। কারও মুখ দিয়ে কোনো একটি বাক্যও বের হবে না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজেকে নিয়ে। নিজের ওপর আপতিত মহাবিপদের ভয়াবহতা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। মানব, দানব, দুরাচার শয়তান, জীবজন্তুসহ সব সৃষ্টিকুল এক স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে।

সকলের চক্ষুযুগল আসমান পানে অপলক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকবে, কীভাবে উক্ত বিশাল আসমান ভয়ংকর বিকট শব্দে নিমিষেই বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে! তখন আতঙ্কের ওপর আতঙ্ক আর ভয়ে সকলেই মুহ্যমান হয়ে যাবে। ফেরেশতারা আসমান থেকে অবতরণ করে দাঁড়িয়ে থাকবে সারিবদ্ধভাবে একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে। তাঁদের চক্ষুযুগল নুয়ে পড়বে। এমন ভয়াবহ মুহূর্তে সূর্য মানুষের মাথার অতি সন্নিকটে চলে আসবে-এমনকি সূর্য ও তাঁদের মাঝে ব্যবধান এক মাইলের চেয়েও কম হবে। সেদিন সূর্যের খরতাপ ভয় ও শঙ্কার দরুন আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সকলেই অপেক্ষায় থাকবে। তাদের অপেক্ষার প্রহর ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। এ ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত গন্তব্যের অনিশ্চয়তায় মানুষ নিজ স্থানে ঠায় দাড়িয়ে থাকবে। কোথায় যাবে—জান্নাতে না জাহান্নামে? সেদিন সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। যে পানি থাকবে—তা পান করলে মুখ ঝলসে যাবে। নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবে। অপেক্ষার দীর্ঘতা ও অবস্থার ভয়াবহতার দরুন সবাই চূড়ান্ত ফয়সালা ও বিচার কাজের অধীর অপেক্ষায় থাকবে। কী হবে আমার শেষ পরিণতি! বিভীষিকাময় ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ওই দিন কোনো আশ্রয়স্থল কি থাকবে?

হ্যাঁ, ওই ভয়াবহ অবস্থায়ও কিন্তু সাত শ্রেণির লোককে মহান দয়ালু রব স্বীয় আরশের নিচে ছায়া দেবেন।

তাদের মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ: ১. ওই যুবক, যে আল্লাহর আনুগত্যে বেড়ে উঠেছে। ২. ওই ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে ঝুলে থাকত। ৩. যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করত, অশ্রুসিক্ত হতো তার চক্ষুযুগল।

আপনি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত? আর বাকি লোকদেরই বা কি অবস্থা হবে? সেদিন মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় অপরাধীর মতো হাঁটু গেড়ে নিথর হয়ে বসে থাকবে। তখনই হঠাৎ রাসুল তাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হবেন। সবাই দ্রুত বেগে তাঁর দিকে দৌড়ে যাবে। তিনি আপন প্রতিপালকের দরবারে সিজদাবনত হয়ে সুপারিশের অনুমতি প্রার্থনা করবেন। তখন তাকে এই বলে অনুমতি দেওয়া হবে—'হে মুহাম্মাদ, তুমি চাও, তোমাকে প্রদান করা হবে। তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' এদিকে সব মানুষ অপেক্ষায় থাকবে, তখন সহসা সুস্পষ্ট এক আলো প্রস্ফুটিত হবে, যা মূলত দয়ালু রবের আরশের আলো হবে। রবের উক্ত নুরের আলোকচ্ছটায় পুরো অঞ্চল আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাবে। অতঃপর বিচারকার্য আরম্ভ হবে।

তখন অদৃশ্য থেকে একটি আওয়াজ ধ্বনিত হবে—হে অমুকের বেটা অমুক! এ তোমার নাম, তোমার অবস্থান নিয়ে তুমি দুনিয়াতে সন্তুষ্ট ছিলে। কিন্তু আজ তুমি শঙ্কিত। জাহান্নামের গর্জনে তোমার কর্ণকুহর এক্ষুনিই ফেটে পড়বে। তুমি স্বীয় রবের সম্মুখে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দণ্ডায়মান হবে।

তখন এক নতুন দৃশ্যের অবতারণা হবে, অভিনব ওই দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা আপাতত আপনাদের জন্য ছেড়ে দিচ্ছি। তবে হে প্রিয় ভাই ও বোন, দয়া করে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন!

* আপনি কি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ করেছেন?
* আপনি কি কুরআন পড়ে তার যাবতীয় বিধিনিষেধ অনুযায়ী আমল করেছেন?
* আপনি কি আমাদের প্রিয় রাসুল -এর শাশ্বত সুন্নাতের প্রকৃত অনুসারী?
* আপনি কি যথাসময়ে নামাজ আদায় করেছেন?
* আপনি কি কপটতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রেখেছেন?
* আপনি কি আপনার ওপর আবশ্যকীয় ফরজ হজ আদায় করেছেন?
* আপনি কি স্বীয় সম্পদের জাকাত আদায়ে যত্নশীল হয়েছেন?
* আপনি কি পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করেছেন?
* আপনি কি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সর্বাবস্থায় সত্যবাদী, না কপটতার মুখোশ পরে বাহ্যিকভাবে সত্যবাদী সেজেছেন?
* আপনি কি অনুপম নববি চরিত্রে চরিত্রবান?
* স্বীয় কর্মফলের ব্যাপারে বিচারকার্য ও চুলচেরা বিশ্লেষণ তো ওই দিনই হবে, তবে এখন থেকেই ওই দিনের সফলতার জন্য সৎকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ওই দিনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। এখন থেকেই এমন সৎকর্ম সম্পাদন করুন, যা আপনাকে সোজা জান্নাতে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যে সৎকর্ম জিজ্ঞাসাবাদের সময় আপনার প্রতিপালকের সম্মুখে আপনার চেহারাকে করবে শুভ্র ও আলোক উদ্ভাসিত। অন্যথায় জাহান্নামই হবে আপনার শেষ আশ্রয়স্থল।

* খুব ভালোভাবে স্মরণ রাখুন—আল্লাহ যেমন অতিশয় দয়ালু ও ক্ষমাশীল, তেমনই তিনি মহাপরাক্রমশালী, কঠোর শাস্তিদাতা।

হে মহান দয়ালু পালনকর্তা, আমাদের ওই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত করে নিন, যারা সদুপদেশসমূহ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে এর সর্বোত্তমটিরই অনুসরণ করে। আমাদের এই মিনতিটুকু কবুল করুন, হে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা!

হে মহান রাজাধিরাজ, সর্ববিষয়ে আমাদের উত্তম পরিণতি দান করুন। দুনিয়াবি লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও পারলৌকিক কঠোর শাস্তি থেকে মুক্তি দান করুন, আমিন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00