📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আখিরাতের ফসল ফলানোর সুবর্ণ সুযোগ

📄 আখিরাতের ফসল ফলানোর সুবর্ণ সুযোগ


• প্রকৃত উপকারী ফসল আখিরাতে একমাত্র আল্লাহর নিকটেই রয়েছে, যা অনন্তকালীন জীবনের স্থায়ী সফলতার অন্যতম নিয়ামক, যেখানে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ও কলুষতার লেশমাত্র নেই, আর না তথায় মৃত্যু কিংবা কোনো রোগব্যাধির আশঙ্কা রয়েছে; যা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

مَنْ كَانَ يُرِيدُ ثَوَابَ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ ثَوَابُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَكَانَ اللهُ سَمِيعًا بَصِيرًا

‘যে কেউ দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করবে, তার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আল্লাহরই নিকট রয়েছে। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও দেখেন’।

• ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ হে দুনিয়ালোভী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, খুব ভালোভাবে স্মরণ রেখো, তোমার রবের নিকট মূলত উভয় জাহানের প্রতিদান রয়েছে, তাই তুমি যা-ই প্রার্থনা করো, মহান রব তা-ই দান করবেন। সুতরাং তুমি ক্ষণস্থায়ী জীবনের ক্ষীণ সংকল্প ও লালসার মাধ্যমে নিজ পরকালকে ধ্বংস করো না, বরং তুমি দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে উভয় জাহানের সফলতা অর্জন করো, কেননা লাভ- লোকসান সবকিছুর নিয়ন্তা তো কেবল আল্লাহ তাআলাই, যিনি দুনিয়া- আখিরাতে মানুষের মাঝে দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যকে বণ্টন করেছেন, সাথে সাথে পূর্ণ ন্যায়ের সহিত তাদের মাঝে নিজ ফয়সালা কার্যকর করেছেন, কেননা তিনিই অধিক শ্রবণকারী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সত্তা।

- নিম্নে আখিরাতের পাথেয় অর্জনের জন্য সুবর্ণ সুযোগের ব্যাপারে আলোকপাত করা হলো, যার সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক মুমিনের ওপর আবশ্যক। কেননা, তাতে রয়েছে বড় বড় প্রতিদানের অভূতপূর্ব সমাহার, সাথে অল্প আমলেই অধিক প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি।’

১. কল্যাণের চাবিসমূহ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرٍ فَاعِلِهِ

‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, সে উক্ত কাজ সম্পাদনকারীর মতো প্রতিদান পায়’।

• যেমন আপনার কোনো সন্তান বা বন্ধুকে মাসনুন কোনো দুআ শিক্ষা দিলেন, তখন সে যতবার উক্ত দুআটি পাঠ করবে, ততবার আপনার জন্য প্রতিদান লিপিবদ্ধ করা হবে। এবার যদি আপনি দুআজাতীয় একটি বই হাদিয়া দেন, তখন কিন্তু আপনার জন্য এই বইয়ে বর্ণিত প্রত্যেকটি দুআর বিনিময়েই উল্লেখযোগ্য প্রতিদান লিপিবদ্ধ হবে, তা বলাই বাহুল্য।

২. একসাথে চারটি ফসল লাভের সুবর্ণ সুযোগ
সালাম, মুসাফাহা (সাক্ষাতে পরস্পর হাত মিলানো), সাথে মুচকি হাসি ও পবিত্র বাক্য উচ্চারণ।

হে প্রিয় ভাই, কখনো ভেবেছেন কি? আপনি একসাথেই চারটি ইবাদত সম্পাদনে চারটি ফসল লাভে ধন্য হচ্ছেন?

ক. সালাম : রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জনৈক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন: أَيُّ الْإِسْلَامِ خَيْرٌ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ

“ইসলামের কোন আমলটি উত্তম?” তিনি উত্তরে বললেন, “লোকদের খাবার খাওয়ানো ও পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।”

- অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে সালাম দেয়, তার জন্য ত্রিশটি সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।

আর প্রত্যেক সৎকর্মের প্রতিদান মহান রব দশ গুণ করে যে বৃদ্ধি করেন, তা তো রিজার্ভ আছেই!

আর এই পরিমাণ তো নিতান্তই অল্প। কেননা, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। তাই সালামকে পূর্ণরূপে করতে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলি, যেন প্রতিদানও পূর্ণরূপে পাওয়া যায়।

খ. মুসাফাহা (সাক্ষাতে পরস্পর হাত মিলানো): রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يَلْتَقِيَانِ، فَيَتَصَافَحَانِ إِلَّا غُفِرَ لَهُمَا قَبْلَ أَنْ يَفْتَرِقَا

'দুজন মুসলিম পরস্পর সাক্ষাৎ লাভে মুসাফাহা করলে আল্লাহ তাআলা উভয়কে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বেই ক্ষমা করে দেন।'
- হাসান বসরি বলেন, 'মুসাফাহা পরস্পর ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।'
- ইমাম নববি বলেন, 'মুসাফাহা সাক্ষাতের এমন এক সুন্নাত, যাতে কারও কোনো দ্বিমত নেই।'

গ. মুচকি হাসি : রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ

'কোনো ভালো কাজকে তোমরা তুচ্ছ মনে করো না, যদিও তা হোক তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।'

ঘ. কোনো দ্বীনি ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতে পবিত্র বাক্য উচ্চারণ। যেমন جَزَاكَ اللَّهُ، بَارَكَ اللَّهُ، حَفِظَكَ اللَّهُ ইত্যাদি বাক্যগুলো মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা। সুতরাং আপনি কোনো ভাইকে সালাম দিলে উক্ত চার সুন্নাতের ওপর অভ্যস্ত হয়ে উঠুন, সাথে মহান প্রতিপালকের মহাপ্রতিদানে ভূষিত হোন।
পারলৌকিক ফসল ফলানোর নানা সুবর্ণ সুযোগ

১. রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

يُصْبِحُ عَلَى كُلِّ سُلَامَى مِنْ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ، فَكُلُّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةٌ، وَأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ، وَنَهْيٌ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَيُجْزِئُ مِنْ ذَلِكَ رَكْعَتَانِ يَرْكَعُهُمَا مِنَ الضُّحَى

'তোমাদের প্রত্যেকে এমন অবস্থায় সকালে উপনীত হয়, যখন তার শরীরের প্রত্যেকটি জোড়ার ওপর সদাকা ওয়াজিব হয়। আর প্রত্যেক তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা) সদাকা, তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ বলা) সদাকা, তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা) সদাকা, তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা) সদাকা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া সদাকা, মন্দকাজ থেকে নিষেধ করা সদাকা। চাশতের সময় দুই রাকআত নামাজ পড়া এগুলোর সমপর্যায়ের। '

২. উম্মুল মুমিনিন জুয়াইরিয়া থেকে বর্ণিত: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا بُكْرَةٌ حِينَ صَلَّى الصُّبْحَ، وَهِيَ فِي مَسْجِدِهَا، ثُمَّ رَجَعَ بَعْدَ أَنْ أَضْحَى، وَهِيَ جَالِسَةٌ، فَقَالَ: مَا زِلْتِ عَلَى الْحَالِ الَّتِي فَارَقْتُكِ عَلَيْهَا؟ قَالَتْ: نَعَمْ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَقَدْ قُلْتُ بَعْدَكِ أَرْبَعَ كَلِمَاتٍ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، لَوْ وُزِنَتْ بِمَا قُلْتِ مُنْذُ الْيَوْمِ لَوَزَنَتْهُنَّ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ

'নবিজি ﷺ একদা সাজ-সকালে তার কাছ থেকে বের হলেন, যখন তিনি নামাজরত ছিলেন, অতঃপর নবিজি ﷺ নামাজ শেষ করে ফিরে এসেও তাকে নামাজের স্থানে পূর্বের ন্যায় বসা দেখে বললেন, "তুমি কি পূর্বের অবস্থায় এখনো দিব্যি বসে রয়েছ?" তিনি বললেন, “হ্যাঁ।" তখন নবিজি ﷺ বললেন, "আমি ফজরের নামাজ আদায়ের পর এমন চারটি বাক্য তিনবার পাঠ করেছি, ওইগুলো যদি এখন পর্যন্ত তোমার কৃত আমলের বিপরীতে পাল্লায় তুলে মাপা হয়, তাহলে উক্ত চারটি বাক্যের পাল্লাই ভারী হবে। তা হলো: سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ

• আল্লাহর মাখলুখের সংখ্যা কেউ গণনা করে শেষ করতে পারবে না, যা ফেরেশতাকুল, মানব-দানব, পাহাড়-পর্বত, জীবজন্তু, পশু-পাখি ও গাছপালা ইত্যাদি সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তাঁর অশেষ করুণা ও দয়ায় আপনাকে সৃষ্টিকুলের সমপরিমাণ প্রতিদান দানে ধন্য করছেন, তেমনই তাঁর আরশের ওজন পরিমাণ নেকি দানে ভূষিত করছেন।

৩. আবু হুরাইরা বলেন: أَوْصَانِي خَلِيلِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ: صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَيِ الضُّحَى، وَأَنْ أُوتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ 'আমাকে আমার প্রিয় বন্ধু রাসুলুল্লাহ প্রতি মাসে তিনটি রোজা, চাশতের দুই রাকআত নামাজ এবং ঘুমের পূর্বে মাসনুন দুআ পড়ে নিতে উপদেশ দিয়েছেন। '

৪. আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ 'দুটি বাক্য আছে, যা উচ্চারণে সহজ আমলনামায় অনেক ভারী এবং আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়, তা হলো: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللهِ العَظِيمِ

৫. রাসুলুল্লাহ বলেন: أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللَّهُ بِهِ الْخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ

"আমি কি তোমাদের এমন আমলের সন্ধান দেবো না, যা করলে আল্লাহ পাপরাশি মোচন করে দেন এবং উহার বিনিময়ে মর্যাদা বৃদ্ধি করেন?” সাহাবিগণ জবাব দিলেন, “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন, "কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণরূপে অজু করা, মসজিদে আসার জন্য বেশি পদচারণা করা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় থাকা। আর এ কাজগুলোই হলো সীমান্ত প্রহরা (অর্থাৎ সাওয়াবের ক্ষেত্রে এর সদৃশ)।”

এখানে পূর্ণরূপে অজু বলতে অজুর অঙ্গগুলোকে সুন্নাত মোতাবেক যথাযথ ধৌত করা আর কষ্টকর অবস্থা বলতে গা কাঁপানো ঠান্ডা অথবা শারীরিক অসুস্থতা প্রভৃতি।

৬. উম্মে হাবিবা বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি : مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُصَلِّي لِلَّهِ كُلَّ يَوْمٍ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً تَطَوُّعًا، غَيْرَ فَرِيضَةٍ، إِلَّا بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ، أَوْ إِلَّا بُنِيَ لَهُ بَيْتُ فِي الْجَنَّةِ ‘যে মুমিন বান্দা ফরজ ছাড়াও বারো রাকআত নফল তথা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আদায়ে সচেষ্ট হবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’

সুনানে তিরমিজির অন্য বর্ণনায় এসেছে: مَنْ صَلَّى فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بُنِيَ لَهُ بَيْتُ فِي الْجَنَّةِ: أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَهَا، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ العِشَاءِ، وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ صَلَاةِ الْفَجْرِ صَلَاةِ الْغَدَاةِ ‘যে ব্যক্তি সারা দিনে বারো রাকআত নামাজ পড়বে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। উক্ত বারো রাকআত হচ্ছে, জোহরের পূর্বে চার ও পরে দুই রাকআত,

মাগরিব ও ইশার পরপর দুই রাকআত এবং ফজরের নামাজের পূর্বে দুই রাকআত। '

• একটু চিন্তা করুন, শুধু বারো রাকআত নামাজ আদায় করলেই আপনার জন্য একটি ঘর নির্মিত হচ্ছে! সুতরাং এখন পুরো বছরে হিসাব করুন আপনার জন্য জান্নাতে কতটি ঘর নির্মাণ হতে পারে?
৭. আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছেন: مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا 'যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। '

আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلَّمُوا تَسْلِيمًا ) 'নিশ্চয় আল্লাহ নবির প্রশংসা করেন এবং ফেরেশতাগণ নবির জন্য দুআ ও ইসতিগফার করেন। হে মুমিনগণ, তোমরা নবির জন্য রহমতের দুআ করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো। '

• শাইখ সাদি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এই আয়াতে রাসুল-এর শ্রেষ্ঠত্ব, তাঁর সুমহান মর্যাদা এবং স্বীয় রবের নিকট ও সৃষ্টিকুলের কাছে সুউচ্চ সম্মানের ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী: )إِنَّ الله (وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ তাঁর গুণকীর্তন করেন, যা তাঁর প্রতি আল্লাহর অশেষ ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে, তেমনিভাবে ফেরেশতাগণও তাঁর জন্য কায়মনোবাক্যে বিগলিতভাবে প্রার্থনা করেন।

)يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا{ অর্থাৎ (হে মুমিনগণ) সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাদের অনুকরণে এবং তোমাদের ওপর রাসুল -এর অধিকার, সম্মান, ভালোবাসা ও মর্যাদা অনুযায়ী তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করো, যা তোমাদের নেকি বৃদ্ধি ও পাপরাশি মোচন করবে।'

- দরুদের সর্বোত্তম পদ্ধতি, যা সাহাবিগণ অনুসরণ করতেন : নামাজে পঠিত দরুদে ইবরাহিম: (যেমন সহিহ বুখারিতে এসেছে) : اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

- দরুদ ও সালামের এই হুকুমটি সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবার কতিপয় আলিম নামাজে দরুদ পাঠকে ওয়াজিব পর্যন্ত সাব্যস্ত করেছেন।
- একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: যখনই আপনি রাসুল -এর ওপর দরুদ পাঠ করবেন, তখন দরুদ ও সালাম উভয়টিকেই একসাথে পাঠ করুন। কখনো একটির ওপর ক্ষান্ত হবেন না, তাই শুধু ﷺ عَلَيْهِ اللَّهِ صَلَّى বলবেন না। কেননা, আল্লাহ তাআলা দুটিকেই একসাথে করার নির্দেশ দিয়েছেন।

৮. রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنِ اسْتَغْفَرَ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِكُلِّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ حَسَنَةً

'যে ব্যক্তি সমস্ত মুমিন-মুমিনার জন্য মাগফিরাত কামনা করে, আল্লাহ তাকে প্রত্যেক মুমিন-মুমিনার সংখ্যা অনুপাতে একটি করে নেকি দান করেন।'

• প্রত্যেক ভালো কাজই সদাকা - রাসুলুল্লাহ বলেন: كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজই সদাকা।'

ইমাম নববি বলেন, 'প্রতিদানের ক্ষেত্রে সব কল্যাণই সদাকার অনুরূপ প্রতিদান বয়ে আনে।'

• কল্যাণের দ্বার রুদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তা অর্জনে সচেষ্ট হই

- খালিদ বিন মা'দান বলেন, 'যখন তোমাদের কারও জন্য কল্যাণের কোনো দ্বার উন্মুক্ত হয়, তখন তার দিকে দ্রুত বেগে আগুয়ান হও। কেননা, ওই উন্মুক্ত দ্বারটি কখন যে রুদ্ধ হয়ে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।'

- সুতরাং হে প্রিয় দ্বীনি ভাই, মৃত্যু কিংবা রোগব্যাধি, দুনিয়াবি ব্যস্ততা ও বার্ধক্যের দরুন কল্যাণের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়, তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই উন্মুক্ত কোনো কল্যাণের দ্বারের দিকে এগিয়ে যান। কেননা, সময় ফুরিয়ে গেলে কিন্তু শত আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না।

- আহ! কত মৃত ব্যক্তি একটি মাত্র তাসবিহ আদায় কিংবা এক পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত বা শুধু এক রাকআত নামাজ আদায় বা খেজুরের দানা পরিমাণ হলেও সদাকা করার জন্য কত বুকভরা আশা নিয়ে চেয়ে আছে! অথচ তাদের পক্ষে এখন আর কোনো কিছুই সম্ভব হচ্ছে না। কেননা, তাদের সেই সুবর্ণ সুযোগ তো ফুরিয়ে গেছে, এখন হাজার বছর ক্রন্দন করেও কোনো লাভ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ - لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ﴾

'যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।” কখনোই নয়; এটা একটা কথার কথা, যা সে মুখে বলছে মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।

– কাতাদা বলেন, 'উক্ত ব্যক্তি কিন্তু তার পরিবার ও জাতির কাছে ফিরে আসতে আশা করবে না, বরং সে শুধু আল্লাহর আনুগত্য করার জন্যই ফিরে আসতে চাইবে। 'সুতরাং অবাধ্য কাফিরের পরকালীন আকাঙ্ক্ষা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।

- ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আপনি নিজ পার্থিব জীবনে আল্লাহকে নিয়েই ব্যস্ত থাকুন, তাহলে মৃত্যু পরবর্তীকালে তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন এবং নিশ্চিত আপনার কাজে আসবেন।'

সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনার সম্পূর্ণ ব্যস্ততা এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে একমাত্র স্বীয় রবের আনুগত্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখুন, সাথে সাধ্যমতো তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। আপনি যদি তা করতে সক্ষম হন, তাহলে নিশ্চিতভাবে মৃত্যুপরবর্তী কবরের সংকটময় ও বিচার দিবসের ভয়ংকর মুহূর্তে তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন এবং আপনার উপকারে আসবেন।

টিকাঃ
২২২. সুরা আন-নিসা : ১৩৪
২২৩. সহিহ মুসলিম : ১৮৯৩
২২৪. সহিহুল বুখারি: ১২
২২৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৬৮৯
২২৬. সুনানু আবি দাউদ : ৫২১২
২২৭. সহিহু মুসলিম : ২৬২৬
২২৮. সহিহ মুসলিম: ৭২০
২২৯. সহিহ মুসলিম: ২৭২৬
২৩০. সহিহুল বুখারি: ১৯৮১
২৩১. সহিহুল বুখারি: ৬৪০৬, সহিহু মুসলিম: ২৬৯৪
২৩২. সহিহু মুসলিম: ২৫১
২৩৩. সহিহু মুসলিম: ৭২৮
২৩৪. সুনানুত তিরমিজি: ৪১৫
২৩৫. সহিহু মুসলিম: ৪০৮
২৩৬. সুরা আল-আহজাব: ৫৬
২৩৭. সহিহুল বুখারি: ৩৩৭০
২৩৮. মুসনাদুশ শামিয়্যিন, তাবারানি: ২১৫৫
২৩৯. সহিহুল বুখারি: ৬০২১
২৪০. সুরা আল-মুমিনুন: ৯৯-১০০

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 হে পরকালমুখী অভিযাত্রী থাকো! একটু ভাবো!

📄 হে পরকালমুখী অভিযাত্রী থাকো! একটু ভাবো!


নিম্নে সালাফের মুখনিঃসৃত মনি-মুক্তোসদৃশ কিছু অমিয় বাণী নিয়ে আলোকপাত করা হলো, যা আখিরাতের পথিকদের জন্য উত্তম, কার্যকর পাথেয় হিসেবে কাজ দেবে।

প্রথম স্পট: সারি আস-সাকাতি বলেন, 'নিজের মাঝে অনুপস্থিত গুণকে কৃত্রিমভাবে সজ্জিত করার দরুন আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে হয়।'

সুতরাং হে প্রিয় ভাই, নিজের মাঝে অনুপস্থিত বিষয়ে অহেতুক কৃত্রিমতা ও তা সজ্জিত করা থেকে সাবধান! চাই তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি বা অন্য যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রেই হোক না কেন। সুতরাং নিজ অন্তরে লালনকৃত বিষয়ের বিপরীত অবস্থা প্রকাশ করা আল্লাহর রহমতের সুদৃষ্টি থেকে পড়ে যাওয়ার অন্যতম নিয়ামক।

দ্বিতীয় স্পট: জনৈক প্রাজ্ঞবান ব্যক্তি বলেন, 'বুদ্ধিমান মুমিনের জন্য পাঁচটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করা অপরিহার্য। ক. অতীত পাপের ব্যাপারে সর্বদা অনুতপ্ত থাকা। খ. ক্ষমা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত থাকা। গ. সৎকর্মের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কায় থাকা। ঘ. জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাপারে আশঙ্কায় থাকা যে, কোথায় হবে আমার ঠিকানা? অনন্তকালের শান্তির নীড় জান্নাত না চিরস্থায়ী শাস্তির ঠিকানা জাহান্নাম? ঙ. স্বীয় রবের সন্তুষ্টির ব্যাপারে সর্বদা শঙ্কায় থাকা।

তৃতীয় স্পট : মালিক বিন দিনার বলেন, 'যখন তুমি অন্তরে কাঠিন্য ও শরীরে ক্লান্তি অনুভব করবে, তখন নিশ্চিত থাকো যে, তুমি অবশ্যই অহেতুক কথাবার্তায় জড়িয়েছ।'

চতুর্থ স্পট: আবুল আলিয়া বলেন, 'আমি আশা রাখি যে, বান্দা দুটি বিষয়কে আঁকড়ে ধরলে কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না। ক. আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায়। খ. নিজ গুনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করা।'

পঞ্চম স্পট : ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'বান্দার ওপর আল্লাহর দুটি অত্যাবশকীয় অধিকার রয়েছে, যে অধিকারদ্বয়ের ক্ষেত্রে সে কখনো শিথিলতা প্রদর্শন করতে পারে না। ক. মহান প্রভুর আদেশ-নিষেধ পালনে যথাযথ যত্নবান হওয়া। খ. আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের ওপর কৃতজ্ঞ হওয়া।'

ষষ্ঠ স্পট : ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, 'দাউদ-এর হিকমার কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য চারটি সময়ে শিথিলতা প্রদর্শন কখনো বাঞ্ছনীয় নয়।

ক. রবের সাথে একান্ত আলাপের সময়。
খ. আত্মসমালোচনার সময়।
গ. বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সময়, যদি তাদের কোনো একটি বিচ্যুতি শুধরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয়।
ঘ. বৈধ ও প্রশংসনীয় বিষয়ের স্বাদ আস্বাদন করার সময়।”

বুদ্ধিমানের ওপর আরও আবশ্যক হলো, নিজ সময়ের ব্যাপারে সদা সজাগ থাকা।'

• হায়, উক্ত আলোচিত উপদেশাবলি বাস্তবায়নে আমরা যদি সত্যি সত্যি যত্নবান হতাম, তবে আমরা সফলতার কতই না উচ্চ শিখরে উন্নীত হতাম!

সপ্তম স্পট : ইমাম ইবনে কাইয়িম বলেন, 'বান্দার চিরস্থায়ী সফলতার পূর্বশর্ত হলো, দৃঢ় প্রত্যয়, বিপদে ধৈর্যধারণ, মানসিকভাবে সাহসী, আন্তরিক দৃঢ়তা, যা মূলত সবই আল্লাহর অনুগ্রহের অংশ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করেন।'

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 ভয়ংকর মুহূর্ত

📄 ভয়ংকর মুহূর্ত


নীরবতা চারদিকে আছড়ে পড়ছে, ভয়ংকর নিস্তব্ধতা ও আশ্চর্যজনক মৌনতা গ্রাস করে ফেলেছে সবকিছুকেই। যে দিকেই চোখ যায় কবর ও লাশের স্তুপ ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। থেমে গেছে কালের আবর্তন। অচল হয়ে গেছে সময়ের চাকা। প্রচণ্ড ভীতি সঞ্চারকারী বিকট বিস্ফোরণ বিদীর্ণ করে দিচ্ছে নিস্তব্ধতাকে। যার ক্ষীণ আওয়াজ মুক্ত আকাশে কর্ণগোচর হবে। যে বিকট শব্দ মৃতদের জীবিত করে তুলবে। পৃথিবীর মাটি বিদীর্ণ করে দেবে। কবরকে ওলটপালট করে ছাড়বে। মানুষেরা সেখান থেকে ধুলোমিশ্রিত হয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় পঙ্গপালের ন্যায় বের হতে থাকবে। প্রত্যেকেই দ্রুত বেগে শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিতে দৌড়াতে থাকবে। সেদিনটি হবে কিয়ামতের দিন।

কোনো বাক্যালাপ ছাড়া মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্যাবস্থায় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকবে। সেদিন পাহাড় সম্পূর্ণ সমতল হয়ে যাবে। নদীনালা শুকিয়ে যাবে, সমুদ্র উত্তাল হয়ে গর্জন ছাড়বে। সেদিন ভূমণ্ডল আর ভূমণ্ডল থাকবে না। চিরাচরিত নভোমণ্ডল পূর্বের ন্যায় বহাল থাকবে না। বরং উভয়ের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। সেদিন মহাপরাক্রমশালী রবের আহ্বান থেকে পলায়নের কোনো উপায় থাকবে না। সেদিন সংঘটিত হবে সৃষ্টির সবচেয়ে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি। তখন সবাই চুপচাপ থাকবে। কারও মুখ দিয়ে কোনো একটি বাক্যও বের হবে না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজেকে নিয়ে। নিজের ওপর আপতিত মহাবিপদের ভয়াবহতা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। মানব, দানব, দুরাচার শয়তান, জীবজন্তুসহ সব সৃষ্টিকুল এক স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে।

সকলের চক্ষুযুগল আসমান পানে অপলক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকবে, কীভাবে উক্ত বিশাল আসমান ভয়ংকর বিকট শব্দে নিমিষেই বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে! তখন আতঙ্কের ওপর আতঙ্ক আর ভয়ে সকলেই মুহ্যমান হয়ে যাবে। ফেরেশতারা আসমান থেকে অবতরণ করে দাঁড়িয়ে থাকবে সারিবদ্ধভাবে একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে। তাঁদের চক্ষুযুগল নুয়ে পড়বে। এমন ভয়াবহ মুহূর্তে সূর্য মানুষের মাথার অতি সন্নিকটে চলে আসবে-এমনকি সূর্য ও তাঁদের মাঝে ব্যবধান এক মাইলের চেয়েও কম হবে। সেদিন সূর্যের খরতাপ ভয় ও শঙ্কার দরুন আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সকলেই অপেক্ষায় থাকবে। তাদের অপেক্ষার প্রহর ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। এ ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত গন্তব্যের অনিশ্চয়তায় মানুষ নিজ স্থানে ঠায় দাড়িয়ে থাকবে। কোথায় যাবে—জান্নাতে না জাহান্নামে? সেদিন সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। যে পানি থাকবে—তা পান করলে মুখ ঝলসে যাবে। নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবে। অপেক্ষার দীর্ঘতা ও অবস্থার ভয়াবহতার দরুন সবাই চূড়ান্ত ফয়সালা ও বিচার কাজের অধীর অপেক্ষায় থাকবে। কী হবে আমার শেষ পরিণতি! বিভীষিকাময় ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ওই দিন কোনো আশ্রয়স্থল কি থাকবে?

হ্যাঁ, ওই ভয়াবহ অবস্থায়ও কিন্তু সাত শ্রেণির লোককে মহান দয়ালু রব স্বীয় আরশের নিচে ছায়া দেবেন।

তাদের মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ: ১. ওই যুবক, যে আল্লাহর আনুগত্যে বেড়ে উঠেছে। ২. ওই ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে ঝুলে থাকত। ৩. যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করত, অশ্রুসিক্ত হতো তার চক্ষুযুগল।

আপনি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত? আর বাকি লোকদেরই বা কি অবস্থা হবে? সেদিন মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় অপরাধীর মতো হাঁটু গেড়ে নিথর হয়ে বসে থাকবে। তখনই হঠাৎ রাসুল তাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হবেন। সবাই দ্রুত বেগে তাঁর দিকে দৌড়ে যাবে। তিনি আপন প্রতিপালকের দরবারে সিজদাবনত হয়ে সুপারিশের অনুমতি প্রার্থনা করবেন। তখন তাকে এই বলে অনুমতি দেওয়া হবে—'হে মুহাম্মাদ, তুমি চাও, তোমাকে প্রদান করা হবে। তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' এদিকে সব মানুষ অপেক্ষায় থাকবে, তখন সহসা সুস্পষ্ট এক আলো প্রস্ফুটিত হবে, যা মূলত দয়ালু রবের আরশের আলো হবে। রবের উক্ত নুরের আলোকচ্ছটায় পুরো অঞ্চল আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাবে। অতঃপর বিচারকার্য আরম্ভ হবে।

তখন অদৃশ্য থেকে একটি আওয়াজ ধ্বনিত হবে—হে অমুকের বেটা অমুক! এ তোমার নাম, তোমার অবস্থান নিয়ে তুমি দুনিয়াতে সন্তুষ্ট ছিলে। কিন্তু আজ তুমি শঙ্কিত। জাহান্নামের গর্জনে তোমার কর্ণকুহর এক্ষুনিই ফেটে পড়বে। তুমি স্বীয় রবের সম্মুখে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দণ্ডায়মান হবে।

তখন এক নতুন দৃশ্যের অবতারণা হবে, অভিনব ওই দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা আপাতত আপনাদের জন্য ছেড়ে দিচ্ছি। তবে হে প্রিয় ভাই ও বোন, দয়া করে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন!

* আপনি কি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ করেছেন?
* আপনি কি কুরআন পড়ে তার যাবতীয় বিধিনিষেধ অনুযায়ী আমল করেছেন?
* আপনি কি আমাদের প্রিয় রাসুল -এর শাশ্বত সুন্নাতের প্রকৃত অনুসারী?
* আপনি কি যথাসময়ে নামাজ আদায় করেছেন?
* আপনি কি কপটতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রেখেছেন?
* আপনি কি আপনার ওপর আবশ্যকীয় ফরজ হজ আদায় করেছেন?
* আপনি কি স্বীয় সম্পদের জাকাত আদায়ে যত্নশীল হয়েছেন?
* আপনি কি পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করেছেন?
* আপনি কি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সর্বাবস্থায় সত্যবাদী, না কপটতার মুখোশ পরে বাহ্যিকভাবে সত্যবাদী সেজেছেন?
* আপনি কি অনুপম নববি চরিত্রে চরিত্রবান?
* স্বীয় কর্মফলের ব্যাপারে বিচারকার্য ও চুলচেরা বিশ্লেষণ তো ওই দিনই হবে, তবে এখন থেকেই ওই দিনের সফলতার জন্য সৎকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ওই দিনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। এখন থেকেই এমন সৎকর্ম সম্পাদন করুন, যা আপনাকে সোজা জান্নাতে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যে সৎকর্ম জিজ্ঞাসাবাদের সময় আপনার প্রতিপালকের সম্মুখে আপনার চেহারাকে করবে শুভ্র ও আলোক উদ্ভাসিত। অন্যথায় জাহান্নামই হবে আপনার শেষ আশ্রয়স্থল।

* খুব ভালোভাবে স্মরণ রাখুন—আল্লাহ যেমন অতিশয় দয়ালু ও ক্ষমাশীল, তেমনই তিনি মহাপরাক্রমশালী, কঠোর শাস্তিদাতা।

হে মহান দয়ালু পালনকর্তা, আমাদের ওই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত করে নিন, যারা সদুপদেশসমূহ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে এর সর্বোত্তমটিরই অনুসরণ করে। আমাদের এই মিনতিটুকু কবুল করুন, হে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা!

হে মহান রাজাধিরাজ, সর্ববিষয়ে আমাদের উত্তম পরিণতি দান করুন। দুনিয়াবি লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও পারলৌকিক কঠোর শাস্তি থেকে মুক্তি দান করুন, আমিন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00