📄 দুনিয়া আখিরাতের শস্যখেত
আখিরাতের সফলতা-প্রত্যাশী ব্যক্তিমাত্রই এই দুনিয়াকে কেবল তার পরকালের শস্যখেত হিসেবেই দেখে। প্রতিটি সেকেন্ডে একটি নয়, অসংখ্য-অগণিত হাজারো চারা গাছ রোপণে সর্বদা তৎপর থাকে সে। যেমন, যে কেউ চাইলেই প্রতি সেকেন্ডে অনায়াসে শতাধিক চারা উক্ত উর্বর শস্যখেতে রোপণ করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ
'যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দিয়ে দিই এবং পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না।' [104]
• ইবনে কাসির উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ{ অর্থাৎ যে তার পরকালের জন্য আমল করে }نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ { অর্থাৎ আমি তাকে উক্ত কাজে শক্তি জোগাই এবং সহযোগিতা করি। সর্বোপরি এর উন্মেষ ঘটাই এবং প্রতি সৎকর্মের বিনিময়ে দশ থেকে সাত শতাধিক পর্যন্ত প্রতিদান বাড়িয়ে দিই।
{ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ} অর্থাৎ যার প্রচেষ্টা শুধু পার্থিব কোনো তুচ্ছ বিষয় অর্জনে আবদ্ধ এবং আখিরাতের ব্যাপারে সে ঘুণাক্ষরেও ক্ষণিক চিন্তা করার অবকাশ পায় না, সে পরকালের সব নিয়ামতরাজি থেকে বঞ্চিত হবে। এবং দুনিয়াতেও সে আশানুরূপ ফলাফল পায় না। আর আল্লাহ যদি তাকে দিতে না চান, তবে তো সে একুল-ওকুল দুটোই হারায়।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنْ قَالَ: سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ، غُرِسَتْ لَهُ نَخْلَةٌ فِي الْجَنَّةِ 'যে ব্যক্তি একবার }سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ { এ দুআটি পাঠ করল, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুরের চারা রোপণ করা হয়।' [105]
• ইবনুল জাওজি বলেন, 'প্রিয় পাঠক একটু চিন্তা করুন, আপনি মূল্যবান সময় অহেতুক নষ্ট করে জান্নাতের কতটি খেজুরের চারা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।'
• ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَقِيتُ إِبْرَاهِيمَ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ، أَقْرِئُ أُمَّتَكَ مِنِّي السَّلَامَ وَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ الجَنَّةَ طَيِّبَةُ التَّرْبَةِ عَذْبَةُ الْمَاءِ، وَأَنَّهَا قِيعَانُ، وَأَنَّ غِرَاسَهَا سُبْحَانَ اللهِ وَالحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
'মিরাজের রাতে আমি যখন ইবরাহিম -এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম, তখন তিনি বলেন, "হে মুহাম্মাদ, আমার পক্ষ থেকে আপনার উম্মতকে সালাম বলবেন এবং তাদের বলে দেবেন যে, জান্নাত হচ্ছে পবিত্র উর্বর ভূমি, যা এখনো ধুধু প্রান্তর। এর চারা গাছ হচ্ছে : سُbحَانَ اللهِ وَالحَمْدُ لِلهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ (ইত্যাদি তাসবিহসমূহ)।”' [106]
• ইবনে আল্লান বলেন, 'যতবার এ পবিত্র বাক্যগুলো পাঠ করা হবে, বিনিময়ে আবৃত্তির সংখ্যানুপাতে তার জন্য জান্নাতে গাছের চারা গজে উঠবে। আর তা কিন্তু জান্নাতে গাছ-গাছালিতে ভরপুর হওয়ার সাথে একেবারে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, জান্নাত গাছপালা ও ধুধু প্রান্তর উভয়েরই সমষ্টি, সুতরাং যে দিকটা ধুধু প্রান্তর, মুক্তোসদৃশ পবিত্র বাক্যগুলো তার চারা হবে।'
পৃথিবী ও জান্নাতের চারার মধ্যকার পার্থক্য
জান্নাতের চারা গজাতে শ্রম, সময়, সম্পদ ও দেখাশোনার প্রয়োজন হয় না; তবুও ফল অবশ্যম্ভাবী, এর স্বাদ সুমিষ্ট। তার প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম, ঘ্রাণ খুবই স্নিগ্ধময় এবং তা কখনো শেষ হয় না। কেননা, ফল ছেঁড়ার পর মুহূর্তেই তা পূর্বের ন্যায় ফুলেফলে টইটম্বুর হয়ে যায়। পক্ষান্তরে পৃথিবীর চারা গজাতে শ্রম, সম্পদ, সার্বিক তত্ত্বাবধান, প্রচুর সময়—সবই প্রয়োজন হয়; তবুও তার ফল অবশ্যম্ভাবী নয়। কিছুদিন ওই গাছের ফল ভক্ষণ করা যেতেও পারে, তবে যেকোনো সময় প্রলয়ংকরী কোনো ঝড়-ঝাপটা এসে গাছকে সমূলে উপড়ে দিতে পারে, সাথে সব সম্পদ ও কষ্ট-ক্লেশের গচ্চা যাওয়া তো আছেই।
জান্নাতে ত্রিশ হাজারেরও অধিক চারার অধিকারী হওয়ার উপায়
হে প্রিয় ভাই, আপনি কি জান্নাতে প্রতি মাস অন্তর অন্তর ত্রিশ হাজার চারা রোপণ করতে ইচ্ছুক? যা আপনি কোনো ধরনের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়া পেতে পারেন, তাহলে আর দেরি নয়, এক্ষুনি নিচের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে ব্রতী হোন।
১. ফরজ নামাজের পর তাসবিহসমূহ আদায়ে যত্নশীল হোন অর্থাৎ سُبْحَانَ اللَّهِ ৩৩ বার الحَمْدُ لِلَّهِ ৩৩ বার اللهُ أَكْبَرُ ৩৩ বার এবং একবার لَا إِلهَ إِلَّا الله وحدهُ لَا شَرِيكَ لهُ، لَهُ المُلْكُ ولهُ الحَمْدُ، وَهُو عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، একশ বার পূরণ করুন। সুতরাং প্রতিদিন পাঁচশ করে চারা রোপণ হবে। কেননা, প্রতি নামাজের পর একশটি করে চারা রোপণ হচ্ছে।
২. সকাল-সন্ধ্যার তাসবিহসমূহের ব্যাপারে যত্নবান হোন। যেমন سُبْحَانَ الله এই তাসবিহটি সকাল-সন্ধ্যায় একশ বার করে পাঠ করলে প্রতিদিন দুইশটি করে চারা রোপণ হবে।
৩. প্রতিদিন একশ বার করে পাঠ করুন: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সকল প্রশংসা তাঁর। তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দান করেন। আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।'
৪. ঘুমানোর পূর্বের তাসবিহসমূহের ব্যাপারে যত্নবান হোন। যেমন سُبْحَانَ اللهِ ৩৩ বার, الحَمْدُ لِلَّهِ ৩৩ বার, اللهُ أَكْبَرُ ৩৪ বার। আর অধিকাংশ লোক দৈনিক অন্তত দুবার ঘুমায়, সুতরাং প্রতিদিন আরও দুইশ করে জান্নাতি চারা যোগ হচ্ছে。
• অতএব, দিনরাতের এই তাসবিহসমূহের সমষ্টি দৈনিক এক হাজার করে হচ্ছে। তাই মাসে অনিবার্যভাবে তার জন্য রোপণ করা হচ্ছে ত্রিশ হাজার চারা গাছ। অতএব, একবছর কিংবা দশ বছরে এই চারাসমূহের সংখ্যা কত বেশি হবে, তা একটু ভাবুন। এবং উক্ত তাসবিসমূহ পাঠ করে করে পুলকিত হোন。
• এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, আখিরাতের সোপানে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তি কখনো এ সংখ্যায় সন্তুষ্ট ও ক্ষান্ত হতে পারে না; বরং সে তো তার সুউচ্চ সংকল্প ও দৃঢ় প্রত্যয়ের মাধ্যমে উক্ত সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। এমনও হতে পারে, মাসে তার একলক্ষ পর্যন্ত জান্নাতে চারা গজিয়েছে।
এ কথা সর্বদা মনে রাখবেন-প্রত্যেক তাসবিহ, তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদই আল্লাহর রাহে সদাকাস্বরূপ। যেমন আবু জার থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
يُصْبِحُ عَلَى كُلِّ سُلَامَى مِنْ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ، فَكُلُّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةٌ، وَأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ، وَنَهْيٌ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَيُجْزِئُ مِنْ ذَلِكَ رَكْعَتَانِ يَرْكَعُهُمَا مِنَ الضُّحَى
'তোমাদের প্রত্যেকে এমন অবস্থায় সকালে উপনীত হয়, যখন তার শরীরের প্রত্যেকটি জোড়ার ওপর সদাকা ওয়াজিব হয়। আর প্রত্যেক তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা) সদাকা, তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ বলা) সদাকা, তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা) সদাকা, তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা) সদাকা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া সদাকা, মন্দকাজ থেকে নিষেধ করা সদাকা। চাশতের সময় দুই রাকআত নামাজ পড়া এগুলোর সমপর্যায়ের। ' [107]
সুতরাং দৈনিক সদাকার সমষ্টি হচ্ছে এক হাজার। এভাবে মাসিক ত্রিশ হাজার করে তার নামে সদাকার প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতেই থাকবে。
• এখানে উক্ত পবিত্র চার বাক্যের ব্যাপারে তৃতীয় আরও একটি ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى مِنَ الْكَلَامِ أَرْبَعًا: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ ، فَمَنْ قَالَ: سُبْحَانَ اللهِ، كَتَبَ اللَّهُ لَهُ عِشْرِينَ حَسَنَةً، أَوْ حَطَّ عَنْهُ عِشْرِينَ سَيِّئَةً، وَمَنْ قَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ، فَمِثْلُ ذَلِكَ، وَمَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، فَمِثْلُ ذَلِكَ، وَمَنْ قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، مِنْ قِبَلِ نَفْسِهِ، كُتِبَتْ لَهُ ثَلَاثُونَ حَسَنَةً، أَوْ حُطَّ عَنْهُ ثَلَاثُونَ سَيِّئَةً
'আল্লাহ তা'আলা চারটি বাক্যকে নির্বাচন করেছেন, সেগুলো হলো : سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ যে سُبْحَانَ اللَّهِ বলল, আল্লাহ তার জন্য বিশটি সাওয়াব লিখে দেন অথবা তার বিশটি পাপ মোচন করে দেন। আর যে اللَّهُ أَكْبَرُ বলল, তার জন্যও অনুরূপ প্রতিদান। আর যে لَا إِلَهَ إِلَّا الله। বলল, তার জন্যও অনুরূপ প্রতিদান। যে ব্যক্তি নিজ থেকে বাড়িয়ে لْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ। পাঠ করে তার জন্য ত্রিশটি নেকি লেখা হয় অথবা ত্রিশটি পাপ মোচন করা হয়। [108]
পুণ্যকর্মে প্রতিযোগিতা
হাসান বসরি রহ. বলতেন, 'যখন তুমি লোকদের দুনিয়ার তুচ্ছ বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে দেখবে, তখন তুমি তাদের সাথে তোমার পারলৌকিক বিষয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। কেননা, তাদের দুনিয়া তো এক সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে কিন্তু তোমার আখিরাত তো বাকি থাকবে।'
টিকাঃ
১০৪. সুরা আশ-শুরা: ২০
১০৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩৪৬৪
১০৬. সুনানুত তিরমিজি: ৩৪৬২
১০৭. সহিহু মুসলিম: ৭২০
১০৮. মুসনাদু আহমাদ : ৮০১২
📄 জান্নাত লাভের সহজ উপায়
আল্লাহর নৈকট্য-প্রতাশী ব্যক্তিকে যে উপাদানটি সফলতার পথে একধাপ এগিয়ে দেয়, তা হচ্ছে জান্নাত লাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। রাসুল ﷺ কতিপয় এমন কথা ও কর্ম সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন, যা পালনে নিশ্চিত জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।
• আল্লাহ তাআলা বলেন: وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ 'এই যে, জান্নাতের উত্তরাধিকারী তোমরা হয়েছ, এটি তোমাদের কর্মের ফল।' [242]
আবু বকর আল-জাজায়িরি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ এটি হচ্ছে ওই জান্নাত, যা তোমরা সৎকর্ম সম্পাদনের বদৌলতে উত্তরাধিকারী হয়েছ।'
উত্তরাধিকারের কারণ: আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষের জন্য জান্নাত ও জাহান্নام দুটি স্থান সেই অনন্তকাল থেকে বরাদ্দ করে রেখেছেন। সুতরাং যে জান্নাত লাভে ধন্য হয়েছে, সে তার জান্নাতে বরাদ্দকৃত গৃহের উত্তরাধিকারী হয়েছে。
এখানে بِمَا كُنْتُمْ এর ب অক্ষরটি মানুষের নেক আমলকে মাধ্যম ও কারণ হিসেবে বোঝানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে, যে সৎকর্মগুলোর মাধ্যমে তারা নিজ নিজ আত্মাকে পবিত্র করে জান্নাতের উত্তরাধিকারী হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ:
১. তাওহিদকে ভেজালমুক্ত করা
- জাবির থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ-এর কাছে একদা জনৈক বেদুইন ব্যক্তি এসে বলল:
يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا الْمُوجِبَتَانِ؟
“হে আল্লাহর রাসুল, অনিবার্যকারী দুটি বিষয় কি?”
فَقَالَ: مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ
“রাসুলুল্লাহ বললেন, ১. যে আল্লাহর সাথে শিরক না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ২. আর যে শিরক করা অবস্থায় (মুশরিক হয়ে) মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [243]
• সুতরাং হে প্রিয় মুসলিম ভাই, তাওহিদ শিক্ষা করে কথা ও কার্যগত সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকা আপনার ওপর একান্ত অপরিহার্য。
মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
'যার অন্তিম বাক্য পবিত্র কালিমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। [244]
রাসুলুল্লাহ আরও বলেন: مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ صَادِقًا بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
'যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, "আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।” সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [245]
ইখলাসের মর্মার্থ হলো, নিজ অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর সমীপে নিষ্ঠার সাথে নিবেদিত করা, যেখানে কোনো রকমের শিরকি কদর্যতার মিশ্রণ থাকবে না। বস্তুত, তখনই মহান আল্লাহ তার হৃদয়ের একমাত্র প্রেমাস্পদ ও স্পন্দনে পরিণত হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে তার অন্তরের একমাত্র উদ্দেশ্য।
২. আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে মেনে সন্তুষ্ট থাকা
আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنْ قَالَ: رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
رضِيتُ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا (খাঁটি মনে) পাঠ করবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। [246]
এই পবিত্র বাক্য পাঠের অপর একটি লাভ হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ الْمُؤَذِّنَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ
'যে ব্যক্তি মুআজ্জিনের আজানের শুনার পর أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا এ দুআটি পাঠ করবে, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।' [247]
৩. লজ্জাস্থান ও জবানের নিয়ন্ত্রণ
সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
'যে ব্যক্তি আমার জন্য স্বীয় লজ্জাস্থান ও জবানের দায়িত্ব নেয়, আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নিলাম।' [248]
৪. আজানের উত্তর দেওয়া রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِذَا قَالَ الْمُؤَذِّنُ : اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، فَقَالَ أَحَدُكُمْ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، ثُمَّ قَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، قَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، ثُمَّ قَالَ: أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ قَالَ: أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، ثُمَّ قَالَ: حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ، قَالَ: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، قَالَ: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، قَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، ثُمَّ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ
'যখন মুআজ্জিন اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলে, তারপর তোমাদের কেউ অন্তর থেকে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলে; এরপর মুআজ্জিন أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলে, সেও لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলে; এরপর মুআজ্জিন أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ বলে, সেও أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ বলে; এরপর মুআজ্জিন حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ বলে, সে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বলে; এরপর মুআজ্জিন حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ বলে, সে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বলে; এরপর মুআজ্জিন اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলে, সেও اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলে; এরপর মুআজ্জিন لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলে, সেও لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলে; তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে'। [249]
• সুবহানাল্লাহ! মহান রবের কত বড় দয়া ও করুণা যে, উদাসীনতা ছাড়া সামান্য কতিপয় বাক্য উচ্চারণের প্রতিদানস্বরূপ তাকে জান্নাতের মতো কত বিশাল নিয়ামতে ভূষিত করবেন! অথচ, এর জন্য তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিশ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হয় না।
এমন দয়ার উদাহরণ আর কোথাও কি হতে পারে?
৫. অজু করার পর দুআ পড়া
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلِغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الْوَضُوءَ ثُمَّ يَقُولُ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيُّهَا شَاءَ
'তোমাদের মধ্যে যে কেউ উত্তমরূপে অজু করার পর أَشْهَدُ أَنْ لَا , إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজার সবকটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়; যেন সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে, প্রবেশ করতে পারে। ' [250]
৬. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: وَأُخْرَى يُرْفَعُ بِهَا الْعَبْدُ مِائَةَ دَرَجَةٍ فِي الْجَنَّةِ، مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ، قَالَ: وَمَا هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الْجِهَادُ في سَبِيلِ اللَّهِ، الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ “অপর একটি মাধ্যম, যার দ্বারা বান্দা এমন একশটি উঁচু স্তর লাভে ধন্য হবে, যে স্তরগুলোর মাঝে পরস্পর দূরত্ব আসমান ও জমিনের সমপরিমাণ হবে।” কেউ জিজ্ঞেস করল, “ওই মাধ্যমটি কী?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।” [251]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : قَالَ رَجُلٌ: أَيْنَ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ قُتِلْتُ؟ قَالَ: فِي الْجَنَّةِ، فَأَلْقَى تَمَرَاتٍ كُنَّ فِي يَدِهِ، ثُمَّ قَاتَلَ حَتَّى قُتِلَ، وَفِي حَدِيثِ سُوَيْدٍ: قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল যে, “আমি যদি যুদ্ধে নিহত হই, আমার স্থান কোথায় হবে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “জান্নাতে”। তখনই সে স্বীয় হাতের খেজুরগুলো ফেলে দিয়ে জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেল। সুওয়াইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু -এর বর্ণনায় আছে, উহুদ যুদ্ধের দিন এক ব্যক্তি নবিজি ﷺ-কে বলল।' [252]
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ قَاتَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَوَاقَ نَاقَةٍ فَقَدْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
'যে ব্যক্তি উটনীর দুধ দুবার দোহনের মধ্যবর্তী সময়টুকু (অর্থাৎ সামান্য সময়ও) আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। [253]
এই হাদিসে একটি আরবি বাগরীতি ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ দুবার দুধ দোহনের মাঝে বিরতি। কেননা, সাধারণত একবার দুধ দোহনের পর উটনীকে কিছুক্ষণ অবসর দেওয়া হয়, যেন উটনী নিজ বাচ্চাকে দুধ পান করাতে পারে।
৭. ফজর ও আসরের নামাজের ধারাবাহিকতা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ صَلَّى البَرْدَيْنِ دَخَلَ الْجَنَّةَ
'যে ব্যক্তি দুই ঠান্ডার মুহূর্তে (ফজর ও আসরের) নামাজ আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [254]
৮. নামাজে একাগ্রতা
উকবা বিন আমির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ، مُقْبِلُ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ، إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
'যে মুমিন ব্যক্তি খুব ভালো করে অজু সেরে একাগ্রতার সাথে দুই রাকআত নামাজ আদায় করবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। [255]
৯. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যত্নশীলতা
হানজালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
مَنْ حَافَظَ عَلَى الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ: رُكُوعِهِنَّ، وَسُجُودِهِنَّ، وَوُضُوئِهِنَّ، وَمَوَاقِيتِهِنَّ، وَعَلِمَ أَنَّهُنَّ حَقٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ، دَخَلَ الْجَنَّةَ أَوْ قَالَ: وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
“যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে রুকু, সিজদা, অজু ও নামাজের নির্ধরিত সময়ের ব্যাপারে পূর্ণ যত্নবান হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথবা বলেছেন তার জন্য জান্নাত অবধারিত।” [256]
১০. মৃত ব্যক্তির প্রশংসা
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
مَرُّوا بِجَنَازَةٍ، فَأَثْنَوْا عَلَيْهَا خَيْرًا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَجَبَتْ، ثُمَّ مَرُّوا بِأُخْرَى فَأَثْنَوْا عَلَيْهَا شَرًّا، فَقَالَ: وَجَبَتْ، فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: مَا وَجَبَتْ؟ قَالَ: هَذَا أَثْنَيْتُمْ عَلَيْهِ خَيْرًا، فَوَجَبَتْ لَهُ الجَنَّةُ، وَهَذَا أَثْنَيْتُمْ عَلَيْهِ شَرًّا، فَوَجَبَتْ لَهُ النَّارُ، أَنْتُمْ شُهَدَاءُ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ
'(একদা) কয়েকজন সাহাবি একটি জানাজার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন তাঁরা তার প্রশংসা করলে নবিজি বললেন, "তার জন্য অবধারিত।" অতঃপর তারা অপর একটি জানাজার পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তার নিন্দা করলে তিনি বললেন, “তার জন্য অবধারিত।” তখন উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, “(হে আল্লাহর রাসুল,) কী অবধারিত?” নবিজি বললেন, “এ (প্রথম) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা উত্তম মন্তব্য করেছ, তাই তার জন্য জান্নাত অবধারিত; আর এ (দ্বিতীয়) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাসূচক মন্তব্য করেছ, তাই তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত। তোমরা তো পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী। "" [257]
১১. প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
আবু উমামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُولِ الْجَنَّةِ إِلَّا أَنْ يَمُوتَ
'যে ব্যক্তি প্রত্যেক (ফরজ) নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার ও জান্নাতের মাঝে শুধু মৃত্যু ব্যতীত কোনো ধরনের বাধা থাকবে না।' [258]
১২. সাইয়িদুল ইসতিগফার পড়া যা নিম্নরূপ:
اللهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
'হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতিপালক, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি আপনার বান্দা এবং আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর আছি। আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমার প্রতি আপনার নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আপনার দরবারে আমার গুনাহের স্বীকারোক্তিও দিচ্ছি। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। কেননা, আপনি ছাড়া পাপ মোচন করার কেউ নেই।' [259]
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
وَمَنْ قَالَهَا مِنَ النَّهَارِ مُوقِنًا بِهَا، فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ قَبْلَ أَنْ يُمْسِيَ، فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ، وَمَنْ قَالَهَا مِنَ اللَّيْلِ وَهُوَ مُوقِنُ بِهَا، فَمَاتَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ، فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ
'যে ব্যক্তি দিনে (সকালে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে মারা গেলে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর সকাল হওয়ার আগেই সে মারা গেলে, সে জান্নাতি হবে।' [260]
১৩. নামাজের পর ও ঘুমানোর পূর্বে মাসনুন দুআ ও আজকারের ওপর যত্নবান হওয়া
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
خَصْلَتَانِ، أَوْ خَلَتَانِ لَا يُحَافِظُ عَلَيْهِمَا عَبْدُ مُسْلِمُ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ، هُمَا يَسِيرُ ، وَمَنْ يَعْمَلُ بِهِمَا قَلِيلٌ ، يُسَبِّحُ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ عَشْرًا، وَيَحْمَدُ عَشْرًا، وَيُكَبِّرُ عَشْرًا، فَذَلِكَ خَمْسُونَ وَمِائَةٌ بِاللَّسَانِ، وَأَلْفُ وَخَمْسُ مِائَةٍ فِي الْمِيزَانِ، وَيُكَبِّرُ أَرْبَعًا وَثَلَاثِينَ إِذَا أَخَذَ مَضْجَعَهُ، وَيَحْمَدُ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَيُسَبِّحُ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، فَذَلِكَ مِائَةً بِالنِّسَانِ، وَأَلْفُ فِي الْمِيزَانِ، فَلَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْقِدُهَا بِيَدِهِ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ هُمَا يَسِيرُ وَمَنْ يَعْمَلُ بِهِمَا قَلِيلُ؟ قَالَ: يَأْتِي أَحَدَكُمْ - يَعْنِي الشَّيْطَانَ - فِي مَنَامِهِ فَيُنَوِّمُهُ قَبْلَ أَنْ يَقُولَهُ، وَيَأْتِيهِ فِي صَلَاتِهِ فَيُذَكِّرُهُ حَاجَةً قَبْلَ أَنْ يَقُولَهَا
'দুটি বিষয় বা দুটি অভ্যাসের প্রতি যে মুসলিম খেয়াল রাখবে, সে নিশ্চয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবে। অভ্যাসদুটি সহজ কিন্তু তা আমলকারীর সংখ্যা কম। তা হলো, প্রত্যেক নামাজের পর ১০ বার সুবহানাল্লাহ, ১০ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ১০ বার আল্লাহু আকবার বলবে। মুখে (পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হিসেবে) এর সংখ্যা একশ পঞ্চাশ কিন্তু মিজানে তা এক হাজার পাঁচশ। যখন শয্যায় যাবে, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ বলবে। তা মুখে একশ কিন্তু মিজানে এক হাজার।” আব্দুল্লাহ বলেন, "আমি রাসুলুল্লাহ -কে তা হাতের আঙুলে গণনা করতে দেখেছি।” সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, অভ্যাসদুটি সহজ হওয়া সত্ত্বেও এর আমলকারীর সংখ্যা কম কেন?” তিনি বললেন, “তোমরা বিছানায় ঘুমাতে গেলে শয়তান তোমাদের কোনো লোককে তা বলার আগেই ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আর নামাজের মধ্যে শয়তান এসে তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সে ওইগুলো বলার আগেই প্রয়োজনের দিকে চলে যায়।”” [261]
হাদিসে বিভিন্ন শব্দে নামাজ-পরবর্তী সময়ে পাঠ করার নানান দুআ ও জিকির বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসে বর্ণিত দুআটি এগুলোর একটি। তবে অধিকাংশ হাদিসে পাওয়া যায়, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার ও শেষে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ একশ পূর্ণ করা হবে。
– এ বাক্যগুলো আরও পাঁচ-ছয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর সবই সুন্নাত。
১৪. মহান রবের নিকট কমপক্ষে তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করা
আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَنْ سَأَلَ اللهَ الجَنَّةَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَتِ الْجَنَّةُ: اللَّهُمَّ أَدْخِلْهُ الجَنَّةَ، وَمَنْ اسْتَجَارَ مِنَ النَّارِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَتِ النَّارُ: اللَّهُمَّ أَجِرْهُ مِنَ النَّارِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট একে একে তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার জন্য জান্নাত আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে বলে যে, “হে আল্লাহ, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।” আর যে ব্যক্তি একইভাবে তিনবার জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে, জাহান্নামও তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে বলে, “হে আল্লাহ, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন।” [262]
১৫. আল্লাহর রাসুলের অকুণ্ঠ আনুগত্য
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ: مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى “অস্বীকারকারী ব্যতীত আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “অস্বীকারকারী কে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে আমার আনুগত্য করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আমার অবাধ্য হয়, সে মূলত আমাকেই অস্বীকার করে।”” [263]
১৬. নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলি যার মাঝে একত্রিত হবে
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ صَائِمًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ تَبِعَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ جَنَازَةٌ؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ أَطْعَمَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مِسْكِينًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ عَادَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مَرِيضًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا،
ফَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ، إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ
'রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমাদের মধ্যে কে রোজাবস্থায় সকাল করেছ?” তখন শুধু আবু বকর বললেন, “আমি।” অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমাদের মধ্য হতে কে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছ?” আবু বকর আবারও বললেন, “আমি।” আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “আজ কে অভাবীকে খাবার দিয়েছ?” আবু বকর বললেন, "আমি।” পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের মধ্যে কে আজ অসুস্থ ব্যক্তির সেবা-শুশ্রূষা করেছ?” এবারও আবু বকর বললেন, "আমি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “যে ব্যক্তির মাঝে এতগুলো বিষয় একত্রিত হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [264]
১৭. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللهَ قَالَ: إِذَا ابْتَلَيْتُ عَبْدِي بِحَبِيبَتَيْهِ فَصَبَرَ، عَوَّضْتُهُ مِنْهُمَا الجَنَّةَ . يُرِيدُ: عَيْنَيْهِ
'আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি যদি আমার কোনো বান্দাকে তার অতি প্রিয় দুটি বস্তু সম্পর্কে পরীক্ষায় ফেলি, আর সে তাতে ধৈর্যধারণ করে, তাহলে আমি তাকে সে দুটির বিনিময়ে জান্নাত দান করব।” প্রিয় দুটি বস্তু দ্বারা বুঝিয়েছেন, বান্দার দুচোখ।' [265]
১৮. প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা করা
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত :
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ لِنِسْوَةٍ مِنَ الْأَنْصَارِ: لَا يَمُوتُ لِإِحْدَاكُنَّ ثَلَاثَةُ مِنَ الْوَلَدِ فَتَحْتَسِبَهُ، إِلَّا دَخَلَتِ الْجَنَّةَ فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنْهُنَّ : أَوِ اثْنَيْنِ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: أَوِ اثْنَيْنِ
'একদা রাসুলুল্লাহ কতক আনসারি মহিলাকে লক্ষ্য করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কারও তিনটি সন্তান মৃত্যুবরণ করার পরও সে প্রতিদানের আশা করলে, অবশ্যই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তখন এক মহিলা জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসুল, যদি কারও দুটি সন্তান মৃত্যুবরণ করে?” তিনি বললেন, দুজনেও তাই। [266]
রাসুলুল্লাহ বলেন:
يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءُ، إِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهُ، إِلَّا الجَنَّةُ
'আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি যখন আমার মুমিন বান্দার কোনো প্রিয়জনকে দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিই, আর সে এতে প্রতিদানের আশা রাখে, তবে আমার নিকট তার প্রতিদান হচ্ছে একমাত্র জান্নাত।”” [267]
১৯. আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ আত্মস্থ করা
আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجنة
'আল্লাহর নিরান্নব্বই অর্থাৎ এক কম একশটি নাম রয়েছে, যে সেগুলো যথাযথভাবে আত্মস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ' [268]
– সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে। রাসুলুল্লাহ বলেন :
لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ اسْمًا، مَنْ حَفِظَهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
'আল্লাহ তাআলার নিরান্নব্বইটি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি এ নামসমূহ মুখস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ' [269]
- أَحْصَاهَا এর অর্থ হলো মুখস্থ করা। আর এটাই অধিক বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা। কেননা, অপর বর্ণনায় সরাসরি এ অর্থেই বর্ণিত হয়েছে। আর কারও মতে أَحْصَاهَا এর অর্থ হলো, আল্লাহকে এ নামসমূহের মাধ্যমে ডাকা। আর কারও মতে এর অর্থ হলো, এ নামসমূহের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, এর অর্থের দাবিগুলো পূরণ ও এর অর্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তবে প্রথমটিই বিশুদ্ধ মত।
সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনি দৈনিক ১০ মিনিট করে সময় বের করুন, উক্ত সময়ে আপনি যেকোনো কাজেই ব্যস্ত থাকুন না কেন, যদি ব্যাখ্যাসহ আল্লাহর নাম অন্তত তিনটি করে মুখস্ত করেন, তাহলে বেশি হলে একমাস সময় লাগবে।
জান্নাতে প্রবেশের অগ্রিম টিকেট অর্জনে আপনি ধন্য হয়ে যাবেন।
২০. তিনটি বিষয়কে নিজ থেকে দূরে রাখা
সাওবান থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ فَارَقَ الرُّوحُ الْجَسَدَ وَهُوَ بَرِيءٌ مِنْ ثَلَاثٍ دَخَلَ الْجَنَّةَ: الْكَنْزُ، فِي حَدِيثِ مُحَمَّدٍ الْكِبْرُ وَالْغُلُولُ وَالدَّيْنُ
'যে ব্যক্তি বিচার দিবসে তিনটি মন্দ বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্তাবস্থায় রবের সমীপে উপস্থিত হবে, অর্থাৎ আত্মগর্ব, আত্মসাৎ ও ঋণ থেকে নিরাপদ থাকবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ' [270]
২১. সর্বক্ষেত্রে সততা অবলম্বন করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا
'নিশ্চয় সত্য পুণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ (অবিরত) সত্য বলতে থাকে, এমনকি তাকে (আল্লাহর কাছে) মহা সত্যবাদী হিসেবে লেখা হয়। পক্ষান্তরে মিথ্যা পাপের পথ দেখায়। আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ (অবিরত) মিথ্যা বলতে থাকে, এমনকি তাকে (আল্লাহর কাছে) মহা মিথ্যাবাদী হিসেবে লেখা হয়। ' [271]
البر (আল-বিররু) শব্দটি সব ধরনের কল্যাণের সমষ্টিকে বোঝায়। الفجور (আল-ফুজুরু) শব্দটি সব ধরনের অবাধ্যতাকে বোঝায়।
২২. শরয়ি জ্ঞান অন্বেষণ
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ
'যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের পথে চলে, তার জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন।' [272]
২৩. জান্নাতিদের গুণাবলি অর্জন
ইয়াজ বিন হিমার থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: وَأَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلَاثَةٌ ذُو سُلْطَانٍ مُقْسِطُ مُتَصَدِّقُ مُوَفَّقٌ، وَرَجُلٌ رَحِيمٌ رَقِيقُ الْقَلْبِ لِكُلِّ ذِي قُرْبَى وَمُسْلِمٍ، وَعَفِيفٌ مُتَعَفِّفُ ذُو عِيَالٍ
'তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতের অধিকারী হবে। যথা: ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক। ২. নম্র অন্তরের অধিকারী। ৩. অভাবী হয়েও যে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে।' [273]
আব্দুল্লাহ বিন সালাম থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الْأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ، وَالنَّاسُ نِيَامُ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
'হে লোকসকল, তোমরা সালামের প্রচার-প্রসার করো, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো, নিশি রাতে যখন মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে—তখন নামাজ আদায় করো, (ফলে) নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করো।' [274]
• হে প্রিয় ভাই, উল্লিখিত কুরআন-হাদিসের আলোকে নিজ জীবনকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে মূল্যবান করে তুলুন। সাথে সাথে উল্লিখিত উপদেশাবলির ওপর বেশি বেশি অনুশীলনে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলুন।
টিকাঃ
২৪২. সুরা আজ-জুখরুফ: ৭২
২৪৩. সহিহু মুসলিম: ৯৩
২৪৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩১১৬
২৪৫. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৫৯৭
২৪৬. সুনানু আবি দাউদ: ১৫২৯
২৪৭. সহিহ মুসলিম: ৩৮৬
২৪৮. সহিহুল বুখারি: ৬৪৭৪
২৪৯. সহিহ মুসলিম: ৩৮৫
২৫০. সহিহ মুসলিম: ২৩৪
২৫১. সহিহ মুসলিম: ১৮৮৪
২৫২. সহিহ মুসলিম: ১৮৯৯
২৫৩. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৪১
২৫৪. সহিহুল বুখারি: ৫৭৪
২৫৫. সহিহু মুসলিম: ২৩৪
২৫৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৩৪৫
২৫৭. সহিহুল বুখারি: ১৩৬৭
২৫৮. আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৯৮৪৮
২৫৯. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৬
২৬০. সহিহুল বুখারি: ৬৩২৩
২৬১. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৬৫
২৬২. সুনানুত তিরমিজি: ২৫৭২
২৬৩. সহিহুল বুখারি: ৭২৮০
২৬৪. সহিহু মুসলিম: ১০২৮
২৬৫. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫৩
২৬৬. সহিহু মুসলিম: ২৬৩২
২৬৭. সহিহুল বুখারি: ৬৪২৪
২৬৮. সহিহুল বুখারি: ২৭৩৬
২৬৯. সহিহু মুসলিম: ২৬৭৭
২৭০. আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৮৭১১
২৭১. সহিহ মুসলিম: ২৬০৭
২৭২. সহিহু মুসলিম: ২৬৯৯
২৭৩. সহিহু মুসলিম: ২৮৬৫
২৭৪. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৫
📄 ওই দৃষ্টিন্দন সুউচ্চ প্রাসাদগুলো কার জন্য?
আখিরাতে উন্নতি-প্রত্যাশীদের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, সে যেকোনো পুণ্যকর্ম ও উত্তম গুণের কথা—যা তাকে স্বীয় রবের নৈকট্যশীল বান্দায় পরিণত করবে, তার মান-মর্যাদা বাড়িয়ে দেবে—শোনামাত্রই তা সম্পাদন ও আমলের ব্যাপারে যত্নশীল হতে দ্রুত বেগে ছুটে চলে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِّن فَوْقِهَا غُرَفٌ مَّبْنِيَّةٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَ
'কিন্তু যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, তাদের জন্য নির্মিত রয়েছে উপর-নিচ তলাবিশিষ্ট উঁচু উঁচু প্রাসাদসমূহ। এগুলোর তলদেশে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহ প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ প্রতিশ্রুতির খেলাফ করেন না।' [109]
• শাইখ সাদি বলেন, 'গুরাফ অর্থাৎ চাকচিক্যময় দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ প্রাসাদ—যার সৌন্দর্য, স্বচ্ছতা ও জাঁকজমক অবস্থা সব সৌন্দর্যকে হার মানায়। যার বাইরের আবরণ থেকে ভেতরের, ভেতর থেকে বাইরের—সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যায়। যার উচ্চতা পূর্ব বা পশ্চিম দিগন্তে উদিত নক্ষত্রের উচ্চতাকেও হার মানায়।'
- আর এ কারণেই বলা হয়েছে, مِّن فَوْقِهَا غُرَفُ অর্থাৎ একটার ওপর একটা প্রাসাদ উপচে পড়েছে। مَّبْنِيَّةٌ অর্থাৎ যা সোনা-রুপা দ্বারা নির্মিত। تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ অর্থাৎ যার তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত হয়, যা সবুজ-শ্যামল জান্নাতি বাগানসমূহকে সিঞ্চিত করে।
রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ فِي الجَنَّةِ غُرَفًا تُرَى ظُهُورُهَا مِنْ بُطُونِهَا وَبُطُونُهَا مِنْ ظُهُورِهَا، فَقَامَ أَعْرَابِيُّ فَقَالَ: لِمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: لِمَنْ أَطَابَ الكَلَامَ، وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَأَدَامَ الصِّيَامَ، وَصَلَّى بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامُ
“জান্নাতে এমন এমন প্রাসাদ রয়েছে, যার ভেতর থেকে বাইরে এবং বাইরে থেকে ভেতর—সব সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।” তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, উক্ত প্রাসাদগুলো কার জন্য?” তদুত্তরে তিনি বললেন, “প্রাসাদগুলো ওই সব সৌভাগ্যবান ব্যক্তির জন্য, যারা কোমল ভাষায় কথা বলে, মানুষকে খানা খাওয়ায়, (ফরজ রোজা ছাড়াও নফল) রোজা রাখে, রাতের শেষাংশে মানুষ যখন গভীর ঘুমে নিমজ্জিত থাকে, তখন নামাজ আদায় করে।” [110]
• সুতরাং উক্ত প্রাসাদ লাভ করার প্রধান মাধ্যম চারটি। যে ওইগুলোর ওপর আমল করবে এবং এ ব্যাপারে যত্নবান হবে, সে জান্নাতে উক্ত বিলাসবহুল প্রাসাদ লাভ করবে。
- প্রথম বৈশিষ্ট্য: কথার সৌন্দর্য। অর্থাৎ যার কথা সুমিষ্ট ও কোমল হবে, যে কখনো মুখ দিয়ে অশালীন ও অহেতুক কথা বলবে না। যেমন : গাল-মন্দ, মিথ্যা, পরনিন্দা ও চোগলখুরি ইত্যাদি থেকে সে বেঁচে থাকবে। অধিকন্তু সৌন্দর্যের আওতায় কুরআন তিলাওয়াত, সালামের প্রচার-প্রসার, আল্লাহর জিকির, রাসুল -এর ওপর দরুদ পাঠ ও মুসলিমদের নসিহত করা—সবই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাই হাদিসে এসেছে : الكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةُ ‘প্রত্যেক ভালো কথাই একেকটি সদাকা।'
- দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: লোকদের আহার করানো, চাই সে নিকটাত্মীয় বা পর যেই হোক না কেন; মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু, মেহমান—সব শ্রেণির সৃষ্টিকুলকে আহার করানো। সুতরাং আপনি যদি প্রতিদিন কাউকে শুধু একটি খেজুর দিয়ে হলেও আহার করান, তাহলে আপনি অবশ্যই এই পবিত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দলের আওতাভুক্ত হয়ে যাবেন।
- তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: নফল রোজার প্রতি সর্বদা যত্নবান হওয়া, অর্থাৎ নফল রোজার ক্ষেত্রে খুব বেশি উৎসাহী হওয়া। যেমন: সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা, প্রত্যেক মাসের তিন দিন অথবা একদিন অন্তর-অন্তর (যা সাওমে দাউদ নামে পরিচিত), আশুরা, আরাফা, মুহাররম, শাবান মাস এবং শাওয়ালের ছয় দিন প্রভৃতি রোজা পালনে সর্বদা যত্নশীল হওয়া।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : রাতের অন্ধকারে নামাজ আদায়, অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজের প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া, তা যত স্বল্পই হোক না কেন, যেমন দুরাকআত কিংবা চার রাকআত নামাজ রাতে দাঁড়িয়ে আদায় করা।
বি. দ্র. তাহাজ্জুদের নামাজের সময় ইশার নামাজের পর থেকে নিয়ে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
প্রফুল্লতা ও আনন্দ দানকারী সুসংবাদ
রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِذَا أَيْقَظَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّيَا، أَوْ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا، كُتِبَا فِي الذَّاكِرِينَ وَالذَّاكِرَاتِ
'যদি কোনো পুরুষ স্বীয় স্ত্রীকে রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়, অতঃপর প্রত্যেকে কিংবা দুজনে একসাথে দুরাকআত নামাজ আদায় করে, তাদের নাম আল্লাহকে সর্বদা স্মরণকারী নারী-পুরুষদের দলে লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়।' [111]
ইমানের অন্যতম নিদর্শন
ইবনে কুদামা মাকদিসি বলেন, 'তোমার ঘুমের পূর্বের শেষ বাক্যটি আল্লাহর জিকির হওয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকো এবং জাগ্রত হওয়ার পরও প্রথমে আল্লাহর জিকির দিয়েই দিনের কাজ শুরু করো। কেননা, মূলত এ দুই বৈশিষ্ট্যই ইমানের অপূর্ব নিদর্শন।'
টিকাঃ
১০৯. সুরা আজ-জুমার: ২০
১১০. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৮৪
১১১. সুনানু আবি দাউদ: ১৩০৯
📄 সূরা কাফ-এর আলোকে জান্নাতবাসীদের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ - هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ حَفِيظٌ - مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُنِيبٍ - ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُلُودِ - لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ )
'জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে আল্লাহভীরুদের অদূরে। তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারীকে এরই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যে না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হতো। তোমরা এতে শান্তিতে প্রবেশ করো। এটাই অনন্তকাল বসবাসের জন্য প্রবেশ করার দিন। তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক।' [112]
জান্নাতিদের চারটি বৈশিষ্ট্য
ইবনুল কাইয়িম বলেন, আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে মুত্তাকিদের জন্য মেহমানদারির কিঞ্চিৎ স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, যারা নিম্নের চারটি গুণে গুণান্বিত。
• প্রথম বৈশিষ্ট্য
তাওবাকারী হওয়া; অর্থাৎ পাপ থেকে স্বীয় রবের আনুগত্যের দিকে খুবই দ্রুত প্রত্যাবর্তনকারী এবং মহান রবের ব্যাপারে উদাসীনতা ও অমনোযোগিতা ছেড়ে তার স্মরণে অগ্রগামী হওয়া。
- উবাইদ বিন উমাইর বলেন, ')أَوَّابِ( অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের গুনাহসমূহের কথা স্মরণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করে।'
- মুজাহিদ বলেন, ')أَوَّابِ( হলো ওই ব্যক্তি, যখনই তার নিজের গুনাহর কথা স্মরণ হয়, তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে।'
- সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, '(أَوَّاب) ওই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে গুনাহ করে আবার তাওবা করে; পুনরায় গুনাহ করলে আবার তাওবা করে।'
• দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য
সার্বিক আমানত সংরক্ষণের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া。
- ইবনে আব্বাস বলেন, 'অর্থাৎ আল্লাহ যা কিছু স্বীয় বান্দাকে আমানতস্বরূপ দিয়েছেন ও বান্দার ওপর অত্যাবশ্যক করেছেন, সেগুলো যথাযথভাবে আদায়ে যত্নবান হওয়া।'
- কাতাদা বলেন, 'আয়াতে حفیظ শব্দের মর্মার্থ হলো, রব কর্তৃক প্রদানকৃত আমানত ও নিয়ামতরাজির যথাযথ অধিকার সংরক্ষণে অত্যধিক যত্নশীল হওয়া।'
আত্মার শক্তিমত্তার দুটি দিক
১. পালন করার শক্তি, ২. বিরত থাকার শক্তি। সুতরাং أَوَّاب শব্দটির মর্ম হচ্ছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের দিকে ধাবিত হয়ে কোনো কিছু পালন ও আদায় করার শক্তি সঞ্চয়কারী। পক্ষান্তরে حفیظ শব্দটি আত্মার শক্তির দ্বিতীয় দিক (বিরত থাকা) অর্থাৎ স্বীয় রবের অবাধ্যতা ও নিষেধাবলি থেকে বিরত থাকার মর্মে ব্যবহৃত হয়。
- মোদ্দা কথা حفیظ এর মর্ম হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত রাখে। আর أَوَّاب হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর দিকে ধাবিত হয়。
• তৃতীয় বৈশিষ্ট্য
যে না দেখেও আল্লাহকে ভয় করে, এই ভয় মূলত (১.) আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ববাদ ও সর্বময় ক্ষমতা এবং তিনি কর্তৃক বান্দার সার্বিক অবস্থার ওপর পূর্ণরূপে অবগত হওয়া প্রভৃতি সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। (২.) তাঁর আসমানি কিতাবসমূহ, তাঁর সমস্ত রাসুল ও তাঁর আদেশ-নিষেধ প্রভৃতির স্বীকারকেও আওতাভুক্ত করে নেয়। (৩.) তাঁর প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির ধমকি ও আখিরাতে তাঁর দিদার প্রভৃতি ইমানের আবশ্যকীয় বিষয়াবলিকে অকপটে স্বীকার করে নেওয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। সুতরাং উক্ত সব বিষয়ের স্বীকারোক্তি ছাড়া অদৃশ্যে আল্লাহর ভয় কখনো বিশুদ্ধ হবে না。
• চতুর্থ বৈশিষ্ট্য
অনুগতো ও সমর্পিত অন্তরের অধিকারী হওয়া।
ইবনে আব্বাস বলেন, 'যে ব্যক্তি স্বীয় রবের অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে বিমুখ এবং আনুগত্যের ক্ষেত্রে অধিক অগ্রগামী।'
সর্মপণ ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের বাস্তব স্বরূপ
আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর ভালোবাসায় দৃঢ়তা ও অবিচলতাই মূলত ইনাবত তথা সর্বস্ব তাঁকে সঁপে দেওয়ার বাস্তব স্বরূপ।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা উক্ত চার বৈশিষ্ট্যধারী সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের প্রতিদানের ব্যাপারে বলেন:
ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُلُودِ - لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدُ
'তোমরা এতে শান্তিতে প্রবেশ করো। এটাই অনন্তকাল বসবাসের জন্য প্রবেশ করার দিন। তারা তথায় যা চাইবে, তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক।' [113]
আল্লাহভীতির প্রকৃত স্বরূপ
শাইখ সাদি বলেন, 'আল্লাহকে ভয় করার মর্ম হচ্ছে, তাঁকে লোকচক্ষুর আড়ালে ভয় করা, আর সেটাই হলো প্রকৃত আল্লাহভীতি। পক্ষান্তরে যে ভয় লোকজনের সামনে, তাদের উপস্থিতিতে করা হয়, তা মূলত অধিকাংশই লোকদেখানো ও প্রসিদ্ধির রোগে আক্রান্ত। সুতরাং তা কোনোভাবেই প্রকৃত ভয়ের ইঙ্গিত বহন করে না। কেননা ফলদায়ক ভয় হচ্ছে, লোকচক্ষুর অন্তরালে যা হয়, তাদের অনুপস্থিতিতে তা পরিবর্তন হয় না; বরং সব সময় সমান থাকে。
• মূলত এসব নৈকট্যশীল পুণ্যবানের ব্যাপারে বলা হয়েছে :
}ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ{ অর্থাৎ তোমরা বালা-মুসিবত ও মন্দ থেকে মুক্ত হয়ে এতে প্রবেশ করো, সব ধরনের অপছন্দনীয় বিষয় থেকে নিরাপদ অবস্থায়। সুতরাং তাদের নিয়ামতের কোনো অন্ত নেই। আর সেখানে কোনো কষ্ট-ক্লেশ ও শত্রুতা থাকবে না।
} ذَلِكَ يَوْمُ الْخُلُودِ { অর্থাৎ সেটা এমন দিন, যার কোনো অস্ত ও মৃত্যু নেই। এবং সেখানে কোনো ধরনের স্বভাববিরোধী বিষয়েরও লেশমাত্র নেই।
{ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ فِيهَا } .
অর্থাৎ তাদের জন্য সেখানে ওই সব নিয়ামত রয়েছে, যেগুলোর সাথে শুধু তাদের আকাঙ্ক্ষাটাই সম্পর্কযুক্ত হয়। অথবা তার অধিক নিয়ামত চোখের পলকের ব্যবধান হতে না হতেই অর্জিত হয়ে যায়।
}مَزِيدٌ{ অর্থাৎ যে প্রতিদানের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদের সাওয়াব বাড়িয়ে দেন, যা কখনো কোনো চোখ অবলোকন করেনি, কোনো কান শ্রবণ করেনি, এমনকি অন্তরেও এর ভাবনা কোনো দিন উদয় হয়নি। এবং আল্লাহর দিদার অন্য সকল নিয়ামতকে হার মানিয়ে দেবে।
জান্নাতের অধিবাসী কারা?
রাসুলুল্লাহ বলেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ قَالُوا: بَلَى، قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعَّفٍ، لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ، ثُمَّ قَالَ: أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ قَالُوا : بَلَى، قَالَ: كُلُّ عُتُلٌ جَوَّاطٍ مُسْتَكْبِرٍ
“আমি কি তোমাদের জান্নাতের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংবাদ দেবো না?” সাহাবায়ে কিরাম বললেন, "হ্যাঁ, অবশ্যই।” তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “জান্নাতের অধিবাসী হচ্ছে, দুর্বল ও অসহায় লোক, যারা কোনো কিছুর ব্যাপারে শপথ করলে, আল্লাহ তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করেন। আর আমি কি তোমাদের জাহান্নামের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংবাদ দেবো না?” সাহাবায়ে কিরাম বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তখন তিনি বললেন, “তারা হচ্ছে, রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা ও অহংকারী স্বভাবের যারা।” [114]
• নববি বলেন:
مُتَضَعَّفٍ শব্দটি জের ও জবর উভয়ভাবে পড়া যায়, যদিও জবরের বর্ণনাটি অধিক প্রসিদ্ধ।
আইনের (ع) ওপর জবর সহকারে পড়লে এ শব্দের মর্ম দাঁড়ায়, মানুষ যাকে দুর্বল ও তুচ্ছজ্ঞান করে এবং তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়।
আইনের (ع) ওপর জের সহকারে পড়লে তার মর্ম হবে, যিনি বিনয় ও নম্রতার মূর্তপ্রতীক, নিজেকে লুকানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
কাজি ইয়াজ বলেন, 'এখানে দুর্বলতা দ্বারা অন্তরের বিগলন ও নম্র হওয়া, সর্বোপরি ইমানের দাবির সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ মিটিয়ে দেওয়া প্রভৃতি মর্ম নেওয়াও কোনো কোনো সময় বাঞ্ছনীয়।
বি. দ্র. এই হাদিস থেকে মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে, অধিকাংশ জান্নাতবাসী উক্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং অধিকাংশ জাহান্নামি দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে বোঝায়। মানুষকে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যাবলির ভিত্তিতে উভয় শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করা কোনোভাবে উদ্দেশ্য নয়।
• রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী : )لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ {
এর মর্ম হচ্ছে, যদি এমন ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আশাবাদী হয়ে দৃঢ়চিত্তে কোনো বিষয়ের ওপর শপথ করে, আল্লাহ তাআলা তার শপথের লাজ রক্ষা করেন এবং ভবিষ্যতে তা বাস্তবায়ন করেন। অথবা এ হাদিসের মর্ম হবে, সে দুআ করামাত্র আল্লাহ তা কবুল করেন। যাকে مستجاب الدعوات (মুসতাজাবুদ দাওয়াত) বলা হয়। কিন্তু প্রথম মর্মটি প্রসিদ্ধ।
• জাহান্নামিদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী : }كُلُّ عُتُلَّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ{ এর ব্যাখ্যা : عُتُلُّ এর অর্থ হলো, ঝগড়াটে ও রূঢ় স্বভাবের লোক। جَوَّاظٍ এর অর্থ, যে অধিক থেকে অধিকতর সঞ্চয়কারী, অথচ কৃপণ অথবা এমন ব্যক্তি, যে বিশাল দেহের অধিকারী হওয়ার কারণে চাল-চলনে অহংকারী ও আমিত্বভাব দেখায়। مُسْتَكْبِرٍ এর অর্থ বড়াইকারী, অর্থাৎ যে হককে প্রত্যাখ্যান করে এবং মানুষকে অবজ্ঞা করে।
দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জান্নাতবাসীদের দুটি (জাগতিক) বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। ১. চিন্তা বা পেরেশানি ২. ভয় বা শঙ্কা।
প্রথম বৈশিষ্ট্য: চিন্তা বা পেরেশানি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرُ - وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورُ )
“তারা প্রবেশ করবে বসবাসের জান্নাতে। তথায় তারা স্বর্ণনির্মিত, মোতিখচিত কঙ্কণ দ্বারা অলংকৃত হবে। সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমের। আর তারা বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের চিন্তা-পেরেশানি দূর করেছেন। নিশ্চয় আমাদের পালনকর্তা ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। [115]
আয়াতের মর্ম হচ্ছে, তারা কৃতজ্ঞতাসূচক পবিত্র বাক্য আবৃত্তি করতে করতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা বলবে: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورُ
• ইমাম শাওকানি (الحزن) শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন: ১. পাপাচারের দুশ্চিন্তা এবং আনুগত্য বর্জনের আশঙ্কা প্রভৃতি।
২. الحزن। এমন অবস্থাকে বলা হয়, যা কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার ব্যাপারে পৃথিবীতে তাদের পেরেশান করে তোলে।
৩. অথবা এর মর্ম হলো, আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের ইহকালীন ও পরকালীন সব ধরনের চিন্তা-পেরেশানি থেকে মুক্ত করেন। কেননা, পৃথিবীতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের যতই উচ্চমার্গে অবস্থান করুক না কেন, কেউ কিন্তু হঠাৎ বিপদাপদ ও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার পেরেশানি থেকে মুক্ত নয়।
৪. অথবা এর মর্ম হলো, আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে ভয় ও পরিণামের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকবে এবং তাদের আমলগুলো কবুল হওয়া না হওয়া নিয়ে সর্বদা অন্তরের দোদুল্যতা ও অস্থিরতায় ভুগতে থাকবে।
৫. অথবা এর মর্ম হলো, তারা মন্দ ও অশুভ পরিণতির ব্যাপারে শঙ্কিত ও ভয়ে তটস্থ থাকবে। এভাবে জান্নাতে প্রবেশের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা দুশ্চিন্তা ও শঙ্কামুক্ত হবে না।
৬. অথবা এর আরেক মর্ম হলো, নিয়ামতরাজি থেকে বঞ্চিত হওয়া। অন্তরের পরিবর্তন ও পরিণতির ব্যাপারে দুশ্চিন্তা ইত্যাদি。
• সুতরাং অন্তরচক্ষু দিয়ে একটু লক্ষ করুন যে, জান্নাতি সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা দুনিয়াবি বড় বড় পদ, সার্টিফিকেট, চাওয়া-পাওয়া, জায়গা-জমি, টাকা-পয়সা প্রভৃতির সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে কোনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন না। বরং তারা তাদের পরকালীন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সর্বদা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। যেমন, জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের পরিণাম ও অবস্থান নিশ্চিতভাবে না জানার দরুন সর্বদা শঙ্কা ও ভীতি তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: ভয় বা শঙ্কা।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: ۞ وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤُ مَّكْنُونُ - وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ - قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ - فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ - إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
'সুরক্ষিত মোতিসদৃশ কিশোররা তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে। তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, আমরা ইতিপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আগুনের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করেছেন। আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু।' [116]
• ইবনে কাসির { إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ } এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ আমরা ইহজগতে পরিবারে অবস্থানরত অবস্থায় আমাদের স্বীয় রবের ভয়ে মুহ্যমান ও তাঁর কঠোর শাস্তির শঙ্কায় সদা কম্পমান থাকতাম।{ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ }অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করে পীড়াদায়ক শাস্তি থেকে আমাদের মুক্তি। দিলেন। এবং ভয়ংকর বিষয়াবলি থেকে আমাদের সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত করলেন। }إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوهُ{ অর্থাৎ ইতিপূর্বেও আমরা বিগলিত কণ্ঠে প্রার্থনা করতাম। আল্লাহ আমাদের প্রার্থনা কবুল করে প্রার্থনাকৃত সেই মহানিয়ামতে আমাদের ভূষিত করলেন। }إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ{ কেননা, তিনিই তো অসীম দয়ালু。
• ইবরাহিম আত-তাইমি বলেন, 'চিন্তামুক্ত ব্যক্তির অবশ্যই এ ব্যাপারে সর্বদা আশঙ্কা ও ভয় করা উচিত যে, সে জান্নাতের অধিবাসী হচ্ছে কি না? কেননা, জান্নাতি ব্যক্তি তো সেদিন বলবে, “সব প্রশংসা ওই সত্তার, যিনি আমাদের থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন।” আর ভয়হীন ব্যক্তির এ ব্যাপারে আশঙ্কা করা উচিত যে, সে জান্নাতিদের দলভুক্ত হচ্ছে কি না?” কেননা, জান্নাতিরা সেদিন বলবে, "আমরা পরিবারে অবস্থানরত অবস্থায় তাঁর ভয়ে সদা কম্পমান থাকতাম।""
টিকাঃ
১১২. সুরা কাফ: ৩১-৩৫
১১৩. সুরা কাফ: ৩৪-৩৫
১১৪. সহিহু মুসলিম: ২৮৫৩
১১৫. সুরা ফাতির: ৩৩-৩৪
১১৬. সুরা আত-তুর: ২৫-২৮