📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 গুরুত্বের সাথে নামাজ আদায়

📄 গুরুত্বের সাথে নামাজ আদায়


পারলৌকিক উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তি কখনো যেনতেনভাবে নামাজ পড়া পছন্দ করে না। সে উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতিতে—পূর্ণ অজু, রুকু, সিজদা প্রভৃতি যথাযথভাবে আদায় করে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়ে। লঘু থেকে লঘুতর একটি সুন্নাতও সে ছাড়তে রাজি হয় না, কোনো ফরজ কিংবা নামাজের আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ ছাড়া তো দূরের কথা। এবং তাকে আপনি রাসুল ﷺ-এর নামাজের সাথে নিজ নামাজের প্রত্যেক বিষয়কে সাদৃশ্য করতে অতি উৎসাহী পাবেন। সে নামাজের কোনো বিষয়কে ঘুণাক্ষরেও বোঝা মনে করে না。

নামাজে বিনয় ও একাগ্রতার গুরুত্ব
শাইখ সাদি বলেন, ‘নামাজে বিনম্রতার মর্ম হচ্ছে:
- আল্লাহর সামনে হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়া, যার ফলে তার অন্তর স্থির ও সুসংহত হয়。
- নড়াচড়া স্থির হয়ে যাওয়া। রবের সম্মানার্থে এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত না করা।
- নামাজের শুরু থেকে শেষ অবধি নামাজে সম্পাদনরত সকল কথা ও কর্মের ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ থাকা। যেন নানা ধরনের কুমন্ত্রণা ও নোংরা চিন্তাধারা থেকে নিজেকে এবং নামাজকে পবিত্র রাখা যায়。
- মূলত একাগ্রতাই হচ্ছে নামাজের প্রাণ, মগজ ও তার মূল উদ্দেশ্য। আর এর ভিত্তিতেই প্রতিদান লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। অতএব, যে নামাজ একাগ্রতা ও অন্তরের স্থিরতা বিবর্জিত হয়, তার তেমন উল্লেখযোগ্য প্রতিদান আশা করা নিতান্তই অবান্তর। কেননা, প্রতিদান তো মূলত অন্তরের অনুভূতি ও একাগ্রতা অনুপাতেই হয়ে থাকে।'

• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا مِنَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ تَحْضُرُهُ صَلَاةٌ مَكْتُوبَةٌ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهَا وَخُشُوعَهَا وَرُكُوعَهَا، إِلَّا كَانَتْ كَفَّارَةً لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ مَا لَمْ يُؤْتِ كَبِيرَةً وَذَلِكَ الدَّهْرَ كُلَّهُ

'যখন কোনো মুসলিমের ফরজ নামাজের সময় হয়, অতঃপর সে উত্তমরূপে অজু করে একাগ্রতার সহিত নামাজ পড়ে, তা তার পূর্বের সকল গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়; যতক্ষণ না সে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। এভাবেই সর্বদা চলতে থাকবে।' [61]
• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا كَانَ فِي الصَّلَاةِ فَإِنَّهُ مُنَاجٍ رَبَّهُ، وَرَبُّهُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْقِبْلَةِ

'হে লোকসকল, যখন তোমাদের কেউ নামাজরত থাকে, তখন সে মূলত তার রবের সাথে একান্ত আলাপে মশগুল থাকে। আর এ অবস্থায় তার প্রতিপালক কিবলা ও তার মাঝে থাকেন।' [62]
• হাসান বসরি বলেন:
'যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও, তখন আল্লাহর আদেশ অনুসারে পূর্ণ আনুগত্যশীল হয়ে দাঁড়াও। ভুল-ভ্রান্তি ও এদিক-ওদিক তাকানো থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখো। যেন এমন না হয় যে, তোমার রব তোমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছেন, অথচ তুমি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য কোথাও তাকিয়ে আছো; জান্নাতলাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনায় রত। তুমি, অথচ তোমার অন্তর তোমার মুখ দিয়ে কী বের হচ্ছে—সে ব্যাপারে একদম উদাসীন।'

নামাজের অভ্যন্তরীণ আলোচ্য বিষয়

ইবনে কুদামা মাকদিসি বলেন, 'ভালোভাবে লক্ষ রাখো, নামাজ কতিপয় রুকন, ওয়াজিব ও সুন্নাতের সমষ্টি এবং তার প্রাণ হচ্ছে একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা ও অন্তরের স্থিরতা। কেননা, নামাজ নানা ধরনের জিকির-আজকার, মহান রবের সাথে গোপনালাপ ও কতক কর্ম সম্পাদনের নাম। অন্তরের একাগ্রতা ছাড়া একান্ত আলাপ ও তাঁর আজকারের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা একেবারেই অসম্ভব।
কেননা, মুখের কথা যদি অন্তরের মুখপাত্র হতে না পারে, তখন এ ধরনের বাক্যালাপের কোনো মূল্য নেই।'

নামাজে একাগ্রতা আনয়নের উপায়

১. একাগ্রতা হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাঁর সম্মান, মর্যাদা, সর্বোপরি তাঁর নৈকট্যের অনুভূতি জাগরণ। কেননা, এসব বিষয়ের ওপর যদি অন্তর লালিত হয়, তখন একাগ্রতা অবশ্যই তার পিছু নেবে। তাই একাগ্রতা সৃষ্টিতে এই একটি উপায়ই যথেষ্ট।
২. একাগ্রতা সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়—এমন সব বিষয় থেকে মুক্ত থাকা, যেমন: ক্ষুধা, প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেওয়া ইত্যাদি। তাই সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত অবস্থায় নামাজে দাঁড়ানো উচিত।
৩. নিজ কানে শোনা যায়—এমন আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করা। কেননা, তা অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করে। আর আজকার ও কুরআন পাঠকালে দুঠোঁট না নড়লে নামাজ শুদ্ধ হবে না।
সতর্কতা : নিজ কানে শোনার বিষয়টি যদি নফল নামাজে হয়, তবে ঠিক আছে। কিন্তু যদি সে সিররি নামাজ (জোহর ও আসর) জামাআতে আদায় করে, তাহলে নিজ কানে শোনা যায়-মতো পড়বে না। কেননা, এতে অনেক সময় পাশের মুসল্লির নামাজে সমস্যা হয়। কিন্তু সে অবশ্যই কিরাত পড়ার সময় ঠোঁট নাড়াবে—এমনভাবে যে জিহ্বা স্পষ্টভাবে হরফগুলো উচ্চারণ করবে।

৪. মুখ দিয়ে উচ্চারিত আজকার ও কুরআন তিলাওয়াতকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। এবং তাসবিহসমূহ ও কিরাতের মর্ম ভালোভাবে বোঝা, যাতে নামাজ প্রাণহীন দেহের ন্যায় জড় পদার্থে পরিণত না হয়।
৫. এই অনুভূতি গভীরভাবে অন্তরে জাগরূক রাখা যে, আমি যে এত কষ্ট করে নামাজ আদায় করছি, তার প্রতিদান একাগ্রতা ছাড়া অর্জন করা অসম্ভব।
৬. একাগ্রতা আনয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম করা। কেননা, প্রাথমিকভাবে প্রচেষ্টা ছাড়া এই একাগ্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়। পরে আল্লাহর ইচ্ছায় এটি ধীরে ধীরে মুসল্লিদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
৭. দাসত্বের পূর্ণ আদব রক্ষা করা। তেমনিভাবে এই সব আদবের পূর্ণ খেয়াল রাখা, যা রাসুল নিজ নামাজে বাস্তবায়ন করে গেছেন। যেমন, নামাজের রুকনগুলোর ব্যাপারে পূর্ণ যত্নবান হওয়া, নামাজকে দীর্ঘায়িত করা, সিজদার মধ্যে স্থিরতা। কেননা, স্বল্পদৈর্ঘ্যের নামাজ খুব কমই একাগ্রতা সৃষ্টি করে。

টিকাঃ
৬১. সহিহু মুসলিম: ২২৮
৬২. তাজিমু কাদরিস সালাত: ১১৯

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আপনি সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন

📄 আপনি সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন


খুব ভালোভাবে মনে রাখবেন, পরকালে উঁচু মর্তবা অর্জনের অন্যতম উপাদান হলো অধিক হারে সিজদাবনত হওয়া。

• রাসুলুল্লাহ বলেন:
عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلَّهِ، فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلَّهِ سَجْدَةً، إِلَّا رَفَعَكَ اللهُ بِهَا دَرَجَةً، وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً
'অধিক হারে আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হওয়া নিজের ওপর আবশ্যক করে নাও। কেননা, তুমি আল্লাহর সমীপে কোনো সিজদা করলে তার বিনিময়ে আল্লাহ একটি করে মর্তবা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে পাপ মোচন করেন।' [184]

• রাসুলুল্লাহ -এর খাদিম রাবিআ আসলামি বলেন: كُنْتُ أَبِيتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَتَيْتُهُ بِوَضُوئِهِ وَحَاجَتِهِ فَقَالَ لِي: سَلْ، فَقُلْتُ: أَسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ فِي الْجَنَّةِ. قَالَ: أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ، قُلْتُ: هُوَ ذَاكَ. قَالَ: فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ 'আমি একদা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে রাতযাপন করেছিলাম। ভোররাতে অজুর পানি নিয়ে আসলে তিনি আমাকে বলেন, “কিছু চাও!” আমি বললাম, “জান্নাতে আপনার সহচর হতে চাই।” তিনি বলেন, “আরও কিছু চাও?” আমি উত্তর দিলাম, “না, শুধু এটি হলে যথেষ্ট।” তখন তিনি আমাকে বললেন, "তাহলে অধিক হারে সিজদার মাধ্যমে তুমি আমাকে সাহায্য করো।” [185]
• হাফিজ ইবনে হাজার বলেন, 'সুতরাং যে অধিক হারে সিজদাবনত হবে, তার অবশ্যই উক্ত মর্তবা (তথা রাসুল-এর সাহচর্য) অর্জিত হবে।'

হে অধিক হারে সিজদাকারী বান্দা, খুব ভালোভাবে খেয়াল রাখুন যে, সিজদাই আল্লাহর নৈকট্যলাভের একমাত্র সহজ পথ। [3] তাই আল্লাহর রাসুল বলেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدُ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ :
'সিজদা অবস্থায় বান্দা আপন রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। [3] তাই তোমরা ওই অবস্থায় অধিক হারে প্রার্থনা করো।' [186]

• একদা একব্যক্তি হাসান বসরি -কে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন আমলটি বান্দাকে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী করে দেয়?' প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, 'রাতের গভীর অন্ধকারে নামাজে দাঁড়ানোর চেয়ে অধিক সহজ মাধ্যম আছে বলে আমার জানা নেই, যা তাকে খুব দ্রুতই স্বীয় মহান রবের নৈকট্যশীলে পরিণত করে দেয়।'

রাসুলুল্লাহ বলেন: أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرَّبُّ مِنَ العَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ الآخِرِ، فَإِنْ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمَّنْ يَذْكُرُ اللَّهَ فِي تِلَّكَ السَّاعَةِ فَكُنْ 'বান্দা শেষরাতে তার রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। তাই কেউ যদি ওই সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে সক্ষম হয়, সে যেন তা করে।' [187]

রাসুলুল্লাহ আরও বলেন: إِنَّ فِي اللَّيْلِ لَسَاعَةً لَا يُوَافِقُهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ، يَسْأَلُ اللَّهَ خَيْرًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ، وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ

‘রাতে এমন একটা সময় আছে, ওই সময় কোনো মুমিন বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতের যেকোনো কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ তা তাকে দান করেন। আর ওই সময়টা প্রত্যেক রাতে রয়েছে। ' [188]

- আলহামদুলিল্লাহ, আমি নিজেও অনুভব করেছি যে, ওই সময়টা প্রত্যেক রাতেই রয়েছে।
- ইমাম নববি বলেন, 'এই হাদিসে প্রত্যেক রাতের কোনো একটা সময়ে যেকোনো দুআ নিশ্চিতরূপে কবুল হওয়ার প্রমাণ রয়েছে এবং পুরো রাতজুড়ে প্রার্থনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, যাতে ওই সময়ের সাক্ষাৎ মিলে।'

আমরা আমাদের সার্বিক দুরবস্থার অভিযোগ একমাত্র রবের কাছেই করব

হে দুর্বল বান্দা, কোনো মাখলুকের কাছে অভিযোগ করার পূর্বে দয়ালু রবের কাছেই তোমার অভিযোগ পেশ করো। যাঁর হাতে রয়েছে সব কল্যাণের চাবি, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। তিনিই সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

• যদি আপনি কখনো মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোনো মুসিবতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন রাজাধিরাজ মহান রবের নিকট হাতপাতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যাকে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের কোনো কিছুই রুখতে পারে না। তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশ্রোতা। সুতরাং আবারও বলছি, যদি ওই সময়ের সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হতে চান, তবে কিয়ামুল লাইলের প্রতি অধিক হারে মনোনিবেশ করুন।

• রাসুলুল্লাহ বলেন: يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي، فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রাতে নিচের আসমানে অবতীর্ণ হন, যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন তিনি বান্দাদের ডাক দিয়ে বলেন, “ওহে, কে আছো আমার কাছে প্রার্থনা করবে? আমি তার প্রার্থনা কবুল করব, কে আছো ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।” এভাবে ফজর হওয়া পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। ' [189]

• আমরা কেন আল্লাহর সামনে লজ্জিত হবো না, অথচ স্বয়ং মহান রব আমাদের মতো দুর্বল, অভাবী, পাপী বান্দাদের অনবরত ডেকেই চলছেন। তবুও আমি, আপনি গভীর ঘুমাচ্ছন্ন। অথচ আমরা স্বাভাবিকভাবে তাঁর কাছেই অধিক মুখাপেক্ষী। যেকোনো ক্ষেত্রে তিনি ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই। ফুজাইল বিন ইয়াজ এক ব্যক্তিকে বললেন, 'এখন আমি আপনাকে একটি মূল্যবান কথা বলব, যা দুনিয়া ও এর মধ্যে অবস্থিত সবকিছুর থেকেই শ্রেষ্ঠ। তা হলো, আপনি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুকেই অন্তরের গহীন থেকে বের করে দেন, তাহলে আপনি কোনো বস্তু চাওয়ামাত্রই তিনি দান করবেন।' হে আল্লাহ, আমরা আমাদের বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির বিষয়ে বিনম্র-চিত্তে আপনার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ, হে মহান রব, আমাদের অন্তরকে আপনার ভয়, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দিন (আমিন)।

• জাহহাক বিন মুজাহিম বলেন, 'আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা নিদ্রার আধিক্যের কারণে আল্লাহর কাছে রাতের অন্ধকারে (কান্নাকাটি করে) লজ্জাবোধ করতেন। [190]

• সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'একটি পাপের দরুন আমি আজ দীর্ঘ পাঁচ মাস পর্যন্ত তাহাজ্জুদ থেকে বঞ্চিত হয়েছি।'

প্রতিকার-অযোগ্য ব্যাধি থেকে সাবধান থাকুন

• মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'পুরো রাত জুড়ে ঘুমিয়ে লজ্জিত অবস্থায় সকাল করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়, পুরো রাত জুড়ে ইবাদতে কাটিয়ে আত্মঅহমিকায় লিপ্ত অবস্থায় সকাল করার চেয়ে।'

- কেননা, ইবাদতের ক্ষেত্রে আত্মগর্বে নিমজ্জিত হওয়া মানে মূলত নিজ সম্পাদিত ইবাদতকে অনেক বড় চোখে দেখা, যেমন নাকি সে রবের প্রতি দয়া করেছে, অথচ মহান রবের পক্ষ থেকে তাওফিকের মতো মহানিয়ামতকে সে ভুলে গেছে।

• ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'দিবারাত্রির ফরজ ও নফল সব মিলিয়ে রাসুল -এর নামাজের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ রাকআতের মতো। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সতেরো রাকআত ফরজ, বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদা, বিতরসহ এগারো রাকআত তাহাজ্জুদ, কখনো দোহার নামাজ বা অন্যান্য নফলের মাধ্যমে একে তিনি বৃদ্ধি করতেন।'

প্রজ্ঞাবাণী: ব্যক্তির আত্মা স্বীয় চর্চিত বিষয়ের ওপর অভ্যস্ত হয়ে ওঠে。

• প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনি প্রতি রাতে এগারো কিংবা তেরো রাকআতের ওপর নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলুন, যেমনটি রাসুল রমজান ও অন্যান্য সময় করতেন। দেখুন, কাজটি কিন্তু একেবারেই সহজ, যেমন ধারণা করছেন, তা থেকে অনেক বেশি সহজ, আপনি যদি হাফিজ না হন, তবে ছোট ছোট সুরাই আপনার জন্য যথেষ্ট হবে, যা আদায় করতে ন্যূনতম ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে একটু কষ্ট লাগলেও ইনশাআল্লাহ ২০-২১ দিনের মধ্যে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে, এমনকি তা আপনার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নেবে। কখনো যদি তা আপনি আদায় করতে না পারেন, এর জন্য অন্তরে দুশ্চিন্তা অনুভূত হবে। আপনি যদি শেষ রাতে উঠতে সক্ষম নাও হন, তাহলে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই, আপনি চাইলে ঘুমানোর পূর্বে অথবা ইশার সুন্নাতে মুয়াক্কাদার পর বিলম্ব ছাড়া তা আদায় করে নিতে পারেন, যাতে তা আদায়ে অলসতা ও উদাসীনতা আপনাকে গ্রাস করে না ফেলে। আজ থেকে পড়া শুরু করুন, অচিরেই নামাজে অন্য রকম স্বস্তি ও স্বাদ অনুভব করবেন ইনশাআল্লাহ।

সতর্কতা : এখানে ২১ দিনের পরিমাণটি অভিজ্ঞতালব্ধ, যা মানসিক বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে নেওয়া, এর ওপর আদৌ কুরআন, সুন্নাহর কোনো শরয়ি প্রমাণ নেই।

টিকাঃ
১৮৪. সহিহ মুসলিম: ৪৮৮
১৮৫. সহিহ মুসলিম: ৪৮৯
১৮৬. সহিহু মুসলিম: ৪৮২
১৮৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৭৯
১৮৮. সহিহু মুসলিম: ৭৫৭
১৮৯. সহিহুল বুখারি: ১১৪৫
১৯০. এখানে উদ্দেশ্য হলো, সালাফে সালিহিন স্বল্প সময় ঘুমালেও সেটাকে দুনিয়ার জিন্দেগির দিকে তাকিয়ে অধিক সময় নষ্ট মনে করতেন। এ কারণে তারা রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদে এর জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জাবোধ করতেন এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। -অনুবাদক

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 দৈনন্দিনের সুন্নাতসমূহ পালনে যত্নশীল হোন

📄 দৈনন্দিনের সুন্নাতসমূহ পালনে যত্নশীল হোন


আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত সফলতার সোপানে আরোহণ করতে পারবেন না, যতক্ষণ না সকাল-সন্ধ্যার দৈনিক সুন্নাতের ব্যাপারে পরিপূর্ণ যত্নশীল হবেন। এমনকি যতক্ষণ না আপনার জীবনের হালচাল নববি সুন্নাতের সম্পূর্ণ অনুসারী হয়ে যায়。

• যতই আপনি নবিজি -এর কোনো সুন্নাতের ওপর আমল করবেন এবং তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরতে সচেষ্ট হবেন, ততই আপনি আল্লাহর নৈকট্যশীলে পরিণত হবেন। কেননা, মুমিন ব্যক্তির মান-মর্যাদা স্বীয় রবের নিকট উঁচু হতে থাকে নবিজি -এর সুন্নাত ও আদর্শকে তার জীবনে বাস্তবায়ন অনুপাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
'(হে নবি,) আপনি তাদের বলে দিন, "তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুগত্য করো।" তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন।' [103]

• নবিজি -এর দৈনন্দিনের সুন্নাত অগণিত ও অপরিসীম। নমুনাস্বরূপ এখানে দৈনন্দিনের কতিপয় সুন্নাত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। যেমন : ঘুমানোর পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ, খাওয়ার পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ, তেমনিভাবে আরও বিভিন্ন বিশেষ মুহূর্ত ও অবস্থার সুন্নাতসমূহ। এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমার ছোট্ট পুস্তিকা 'দৈনন্দিনের সহস্রাধিক সুন্নাত' দেখা যেতে পারে। তাতে আমি দেখিয়েছি, কীভাবে আপনি কোনো কষ্ট ও সময় অপচয় ছাড়া সহজেই একদিনে রাসুলুল্লাহ -এর এক হাজারেরও অধিক সুন্নাতের ওপর আমল করতে পারবেন। (সমস্ত প্রশংসা কেবল আপনারই হে আল্লাহ!)

• সুতরাং একটু চিন্তা করে দেখুন, এই নববি সুন্নাতসমূহের প্রতি একটু যত্নশীল হওয়ার দ্বারা আপনি প্রতি বছর কত বেশি সাওয়াব ও প্রতিদানের অধিকারী হবেন। তাই নববি সুন্নাতসমূহকে আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ জ্ঞান করুন। কেননা, যে ব্যক্তি যে বিষয় বা অবস্থার ওপর নিজ জীবনকে পরিচালিত করে, তার মৃত্যু অবশ্যই সেই বিষয় বা অবস্থার ওপরই হয় (চাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ)। আল্লাহ আমাদের সকলকে নববি সুন্নাত অনুযায়ী জীবন সাজানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
১০৩. সুরা আলি ইমরান : ৩১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 দৈনন্দিনের দুআসমূহ পঠনে সচেষ্ট হোন

📄 দৈনন্দিনের দুআসমূহ পঠনে সচেষ্ট হোন


আপনি যদি সফলতার সুউচ্চ স্তরে আরোহী হতে চান, তাহলে ওই সব দুআ পাঠের প্রতি সচেষ্ট হোন, যা নবিজি দিবারাত্রি পাঠ করতেন。

* আমরা যদি তাঁর মহা বর্ণাঢ্যময় জীবনের প্রতি একটু লক্ষ করি, তাহলে দেখব, কীভাবে তিনি তাঁর দিবারাত্রির কথাবার্তা ও কাজকর্মের মুহূর্তগুলো স্বীয় রবের স্মরণে কাটিয়েছেন। তিনি আহার-নিদ্রার অগ্র- পশ্চাতে, সকাল-সন্ধ্যায়-বিভিন্ন অবস্থার পরিবর্তনে ও বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে অসংখ্য-অগণিত দুআ পাঠে রত থাকতেন। কেননা, তাঁর অন্তর সর্বদা আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যে মগ্ন থাকত。
* তাই দুআর মাধ্যমে মুমিন বান্দা স্বীয় রবের সাথে সম্পর্ককে যত বেশি দৃঢ় ও মজবুত করবে, মহান প্রতিপালকের কাছে সে তত বেশি সম্মানিত, মর্যাদাবিশিষ্ট নৈকট্যশীলে পরিণত হবে।
* সুতরাং সামর্থ্যানুযায়ী উক্ত দুআসমূহের ব্যাপারে যত্নশীল হোন। চাই তা নামাজের মধ্যে কিংবা নামাজ শেষে হোক অথবা জীবনের অন্য কোনো ক্ষেত্রে হোক। যেন আপনি সর্বদা আপন রবের সাথে অন্তরঙ্গ হতে পারেন। তাঁর পক্ষ থেকে আপনার জন্য যেন বিশেষ সাহায্য, তাওফিক ইত্যাদি অনবরত আসতেই থাকে。

নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন

আপনি প্রতিদিন দুআর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেন, যেমন প্রতিদিন একটি করে নতুন দুআ পাঠে ব্রতী হবেন। তাহলে মাসিক আপনার আমলে ত্রিশটি দুআ যোগ হবে, এভাবে দুমাসে যুক্ত হবে ষাটটি দুআ।

• আপনার এই নতুন পরিকল্পনার আশু ফলাফল আপনি দেখতে পাবেন, যখন কতক মানুষকে জিজ্ঞেস করবেন, রাসুল -এর কয়টি দুআ আপনি মুখস্ত করেছেন? তখন আশ্চর্যজনকভাবে আপনি লক্ষ করবেন, তাদের কেউ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দুআ মুখস্তকরণে ব্রতী হয়নি। তখনই আপনি ওই দৈনিক ছোট্ট পরিকল্পনার ফলাফলের স্বতন্ত্রতা গভীরভাবে অনুভব করতে পারবেন।

• আমার একটি ছোট্ট পুস্তিকা রয়েছে (দৈনন্দিনের সহস্রাধিক সুন্নাত), এই পুস্তিকাতে আমি দিনরাতের সহস্রাধিক দুআ পাঠের কৌশল নিয়ে আলোকপাত করেছি। সেটি দেখা যেতে পারে, উপরন্তু তা সুখপাঠ্যও বটে। তেমনিভাবে শাইখ কাহতানি রচিত 'হিসনুল মুসলিম' নামক পুস্তিকাটিও দেখা যেতে পারে, কেননা তাতে নবিজি -এর সামগ্রিক জীবনের প্রায় ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুআর সংগ্রহ রয়েছে।
- সুতরাং দুআই একমাত্র ইবাদত।
- দুআই মুমিনের জীবনের একমাত্র হাতিয়ার।
– দুআই দয়ালু রবের নিকট অভিযোগের একমাত্র মাধ্যম।
-দুআ নম্রতা, বিনয় এবং প্রতাপশালী সৃষ্টিকর্তার প্রতি মুখাপেক্ষিতার একমাত্র নিদর্শন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00