📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আনুগত্যের কতিপয় যুগান্তকারী ফলাফল

📄 আনুগত্যের কতিপয় যুগান্তকারী ফলাফল


আল্লাহর অসীম দয়া ও অপার অনুগ্রহের ফলে তাঁর নেক বান্দাদের অনুসরণের কারণে সুদূরপ্রসারী কতক প্রশংসনীয় প্রভাব, শুভ পরিণাম ও সুমিষ্ট ফলাফল বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا - وَإِذًا لَآتَيْنَاهُمْ مِنْ لَدُنَّا أَجْرًا عَظِيمًا - وَلَهَدَيْنَاهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا ﴾

'তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়, তারা যদি তাই পালন করত, তবে তা তাদের জন্য উত্তম হতো এবং তা তাদের অন্তরে অবিচলতা সৃষ্টিতে অত্যন্ত সহায়ক হতো। আর তখন আমি অবশ্যই নিজের পক্ষ থেকে তাদের মহাপ্রতিদান দেবো। আর তাদের সরল পথে পরিচালিত করব।' [42]

এই আয়াতে কারিমার মধ্যে আনুগত্যের চারটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল বিবৃত হয়েছে (অর্থাৎ অপার কল্যাণ, দৃঢ়তা, মহাপ্রতিদান, হিদায়াত প্রভৃতি)।

প্রসিদ্ধ মুফাসসির শাইখ সাদি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'আল্লাহর উপদেশাবলির ওপর আনুগত্যের ফলে চারটি নগদ ফলাফল অর্জিত হয়।

১. সীমাহীন কল্যাণ
আল্লাহ তাআলা বলেন : لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ 'আনুগত্য তাদের জন্য কল্যাণকর।' অর্থাৎ তারা এমন উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা তাদের ওপর অর্পিত সব ধরনের কল্যাণমূলক কাজ আঞ্জাম দিয়ে জান্নাতি লোকদের গুণে গুণান্বিত হয়েছে। যার ফলে তাদের পবিত্র সত্তা থেকে সব রকমের মন্দ, অনিষ্টের মূল উৎস সমূলে উৎখাত হয়ে যায়। কেননা, কোনো বস্তু যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন তার বিপরীত দিকটা আপনাআপনিই রহিত হয়ে যায়。

২. দৃঢ়তা ও স্থিরতা অর্জন
আল্লাহ তাআলা বলেন : } وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا { আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাঁর আদেশের অকুণ্ঠ আনুগত্যের ফলে বালা-মুসিবতের কঠিনতম মুহূর্তে ধৈর্যের মতো নিয়ামত দিয়ে সাহায্য করেন এবং ফিতনা-ফাসাদের অন্ধকার যুগে দ্বীনের ওপর অবিচলতা দান করেন। সর্বোপরি মৃত্যুর সময় ও পরবর্তী কবর জগতে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখবেন।

৩. মহাপুরস্কার
আল্লাহ তাআলা বলেন : }إِذًا لَآتَيْنَاهُمْ مِنْ لَدُنَّا أَجْرًا عَظِيمًا{ 'আর তখন আমি অবশ্যই নিজের পক্ষ থেকে তাদের মহাপ্রতিদান দেবো।' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য এমন কতক পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা দুচোখ কখনো দেখেনি, দু'কান কখনো শুনেনি এবং অন্তরে সেই নিয়ামতরাজির স্বরূপ কখনো উদয় হয়নি।

৪. সরল পথের সঠিক দিশা পাওয়া

এই পয়েন্টে এসে সেই সর্বসম্মত বিধি (তথা কোনো বিষয়কে নির্দিষ্টকরণের পর ব্যাপক করা)-এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কারণ, হিদায়াত বিষয়টি তাঁর সত্তাগত মহান বৈশিষ্ট্যের দরুন সব কল্যাণের একমাত্র আধার ও সারনির্যাস হিসেবে পরিগণিত। কেননা, হিদায়াতই হচ্ছে পরস্পর ভালোবাসা বৃদ্ধি, অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া ও ঐশী জ্ঞানের অন্যতম ধারক-বাহক। তাই হিদায়াতের মতো মহামূল্যবান নিয়ামত লাভে যদি কেউ ধন্য হয়, তখন সে অপর সব কল্যাণের ভাগিদার হয়ে যায়, সর্বোপরি সব সফলতার দ্বার তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ, হিদায়াতই মূলত পার্থিব-অপার্থিব সফলতার চাবিকাঠি। তাই হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তিমাত্রই সব কল্যাণকর কাজের তাওফিকপ্রাপ্ত হয় এবং সকল ধরনের অনিষ্টকর বস্তু তার থেকে আপনাআপনিই দূরীভূত হয়ে যায়。

আনুগত্যের আরও কতিপয় শুভ পরিণাম

এক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর হুকুমের অকুণ্ঠ আনুগত্যের ফলে চারটি ফলাফল অর্জিত হয়।

১. আল্লাহর ভালোবাসা লাভে ধন্য হওয়া।
২. সব ধরনের হারাম কাজ থেকে নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতিরক্ষা।
৩. তার সব প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া।
৪. সব ধরনের অসাধু ও অনিষ্টকর বস্তু থেকে নিরাপদ থাকা।

• আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ
'আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে আমার অলি তথা নিকটতম বন্ধুর সাথে শত্রুতা দেখায়, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিই। আমার কোনো বান্দা ফরজ ইবাদতের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় কোনো আমল দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করেনি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে; এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি স্বয়ং তার ওই কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শ্রবণ করে; তেমনিভাবে তার ওই চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; একইভাবে তার ওই হাত ও পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে স্পর্শ করে ও পথ চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে, আমি অবশ্যই তাকে তা দিয়ে দিই এবং সে আমার নিকট আশ্রয় চাইলে তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিই।" [43]
• আনুগত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল হলো, ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের অধিবাসীরা তাদের ভালোবাসতে মুখিয়ে থাকে।

• আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের ভালোবাসা দেবেন।' [44]

- শাইখ সাদি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এটি আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের অন্যতম, যা তিনি ইমান ও পুণ্যকর্মের মাঝে সমন্বয় সাধনকারী নৈকট্যশীল বান্দাদের দান করে থাকেন। অর্থাৎ তিনি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের অধিবাসী বিশেষভাবে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত মকবুল বান্দাদের হৃদয়ে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, প্রেম ও ভালোবাসার জোয়ার সৃষ্টি করেন।
- বস্তুত, এই কারনেই হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন :

إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَقَالَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ، قَالَ: فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي فِي السَّمَاءِ فَيَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، قَالَ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল -কে ডেকে বলেন, “আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো।” তিনি বলেন, তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন, অতঃপর তিনি আসমানে ঘোষণা করেন, “আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো।” তখন আসমানবাসীরা তাকে ভালোবাসে। তিনি বলেন, এরপর পৃথিবীতে তাকে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত করা হয়।' [45]
- অপরদিকে তাদের জন্য সৃষ্টিকুলের ভালোবাসার কারণ, তারাও আল্লাহকে ভালোবেসেছে, তাই তিনি তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাদের কাছে তাকে প্রিয় করে তোলেন।

• আনুগত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফায়দা হচ্ছে, হায়াতে তাইয়িবা তথা পূণ্যময় জীবন। আল্লাহ তাআলা বলেন :

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾
'যে সৎকর্ম করে এবং সে ইমানদার, পুরুষ হোক বা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরস্কার দেবো, যা তারা করত।' [46]
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'হায়াতে তাইয়িবার ব্যাখ্যা কেউ কেউ অল্পেতুষ্টি, সর্বদা আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা ও উত্তম জীবিকার ব্যবস্থা প্রভৃতি করে থাকেন। কিন্তু এর সঠিক মর্ম হলো, রুহানি তথা আধ্যাত্মিক জীবন, এই জীবনে আল্লাহর অপার অনুগ্রহসমূহ এবং সর্বোপরি তাঁর ওপর ইমান, সত্যিকারার্থে তাঁর পরিচয় লাভ, তাঁর প্রতি পূর্ণ মুখাপেক্ষিতা ও ভরসার মাধ্যমে সর্বদা অন্তরে অনাবিল শান্তি, প্রফুল্লতা ও তাঁর ওপর সন্তুষ্টি বিরাজমান থাকা। কেননা, উক্ত পুণ্যময় জীবনের অধিকারী ব্যক্তির জীবন থেকে কারও জীবন অধিক পবিত্র ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হতে পারে না। এমনকি জান্নাতের নিয়ামত ব্যতীত অন্য কোনো পার্থিব নিয়ামত এই রুহানি বর্ণিল জীবনের সমকক্ষ হতে পারে না। এবং এই পবিত্রময়—পুণ্যময় জীবন তিন জগৎ তথা পৃথিবী, কবর বা বারজাখি জগৎ ও চিরস্থায়ী জান্নাতে সমানভাবেই প্রযোজ্য।

• আনুগত্যের আরও একটি যুগান্তকারী ফল হচ্ছে শয়তানি প্রভাব বলয় থেকে মুক্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانُ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ * إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ ﴾
'তার আধিপত্য চলে না তাদের ওপর, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালনকর্তার ওপর ভরসা রাখে। তার আধিপত্য তো তাদের ওপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।' [47]

মুফাসসিরিনে কিরাম আয়াতাংশ إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانُ এর ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ ইমানদারদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার কোনো শক্তি, ক্ষমতা শয়তানের আদৌ নেই, যতক্ষণ না তাদের আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ভরসায় কোনো চিড় ধরে।
- সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'মুমিনদের তাওবাবিহীন কোনো পাপাচারে লিপ্ত করানোর মতো ক্ষমতা বা শক্তিমত্তা দুরাচারি ইবলিসের নেই।'
- মুজাহিদ রহ. { إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ } এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'তার প্রভাব বলয় শুধু তার ওই সব বন্ধুদের মাঝেই সীমাবদ্ধ, যারা তার মতো অভিশপ্তের আনুগত্য করে।'
• অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রাখাও আনুগত্যের চমৎকার ফলাফলের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَذِكْرُ اللهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ ﴾
'আর নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বাপেক্ষা বড় জিনিস। আল্লাহ জানেন তোমরা যা করো।' [48]

• শাইখ সাদি রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
'নামাজ নামক এই ইবাদত অশ্লীল ও অন্যায় কর্মকাণ্ড থেকে বারণকারী হওয়ার কারণ হলো, বান্দা যখন নামাজের সব অত্যাবশ্যকীয় বিষয় তথা শর্ত, রুকন ও একাগ্রতা প্রভৃতির সহিত নামাজ আদায় করে, তার অন্তর নূরের ঝলকানিতে ঝিকমিক করে, তার আত্মা পূত-পবিত্র হয়ে তার ঈমান বৃদ্ধি পায়, কল্যাণের কাজে আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে যায়, নিন্দনীয় কাজে উৎসাহ বহুলাংশে হ্রাস পায়, এমনকি তা একসময় একেবারে হারিয়ে ফেলে। সুতরাং যদি কেউ উক্ত নিয়মে নামাজের পরিপূর্ণ ইহতিমাম করে এবং এর ওপর অটল থাকে; তবে সেই নামাজ অবশ্যই তাকে অশ্লীল ও অন্যায় থেকে বিরত রাখবেই রাখবে। এবং এটিই মূলত আনুগত্য ও নামাজের সবচেয়ে বড় প্রতিফল ও ফলাফল। আর নামাজের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য তো শারীরিক ও আত্মিকভাবে আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে বহুলাংশে বেড়ে যায়। কেননা, মূলত তাঁর উপাসনার জন্যই তো তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। সর্বোপরি বান্দার সম্পাদিত সর্বোত্তম ইবাদত হচ্ছে নামাজ। কেননা, তাতে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপাসনা বিদ্যমান রয়েছে। যা অন্যান্য ইবাদতে সচরাচর দেখা যায় না。
الْفَحْشَاء শব্দটির মর্ম হচ্ছে প্রবৃত্তির তাড়নায় সম্পাদিত ওই সমস্ত অবাধ্যতা, যাতে রয়েছে সুস্পষ্ট বেহায়াপনা ও বড় ধরনের অশ্লীলতা। الْمُنْكَر শব্দটি মূলত ওই সব পাপাচারকে বোঝায়, যা সৎ স্বভাব ও বিবেকবিরোধী।

• আনুগত্যের ফলাফলের অন্যতম হচ্ছে, পাপরাশি মোচন ও সার্বিক অবস্থাদির উন্নয়ন। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ ﴾ 'আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদের প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করে দেন। ' [49]

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শাইখ সাদি বলেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا অর্থাৎ যারা মুহাম্মাদ -এর ওপর বিশেষভাবে, অন্যান্য নবি-রাসুলের ওপর সাধারণভাবে ইমান এনেছে }وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ এবং তাঁদের ওপর অর্পিত আল্লাহ ও মানুষের হক-চাই তা ওয়াজিব তথা আবশ্যকীয় হক হোক কিংবা মুস্তাহাব তথা অনাবশ্যক পছন্দনীয় হক হোক-পালনের মাধ্যমে সৎকর্ম সম্পাদনে ব্রতী হয় }كَفَرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ তাদের ছোট-বড় সব পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। ফলে তাদের সব পাপ মোচনের দরুন, তারা দুনিয়া ও পরকালের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি পায়। }وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ এবং তাদের পার্থিব ও ধর্মীয় অবস্থার সংশোধন তথা উন্নতি সাধন করেন। এবং তাঁর বিশেষ তত্ত্বাবধান ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তার আত্মা ও কর্ম তথা তার যাবতীয় অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে তার প্রতিদানকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে দেন। এসব সুন্দর ফলাফলের একমাত্র কারণ হলো, }اتَّبَعُوا الْحَقَّ তারা ধ্রুব সত্য ও দৃঢ় বিশ্বাসকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরেছেন।

টিকাঃ
৪২. সুরা আন-নিসা: ৬৬-৬৮
৪৩. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২
৪৪. সুরা মারইয়াম: ৯৬
৪৫. সহিহ মুসলিম: ২৬৩৭
৪৬. সুরা আন-নাহল : ৯৭
৪৮. সুরা আল-আনকাবুত: ৪৫
৪৯. সুরা মুহাম্মাদ: ২

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 গুরুত্বের সাথে নামাজ আদায়

📄 গুরুত্বের সাথে নামাজ আদায়


পারলৌকিক উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তি কখনো যেনতেনভাবে নামাজ পড়া পছন্দ করে না। সে উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতিতে—পূর্ণ অজু, রুকু, সিজদা প্রভৃতি যথাযথভাবে আদায় করে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়ে। লঘু থেকে লঘুতর একটি সুন্নাতও সে ছাড়তে রাজি হয় না, কোনো ফরজ কিংবা নামাজের আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ ছাড়া তো দূরের কথা। এবং তাকে আপনি রাসুল ﷺ-এর নামাজের সাথে নিজ নামাজের প্রত্যেক বিষয়কে সাদৃশ্য করতে অতি উৎসাহী পাবেন। সে নামাজের কোনো বিষয়কে ঘুণাক্ষরেও বোঝা মনে করে না。

নামাজে বিনয় ও একাগ্রতার গুরুত্ব
শাইখ সাদি বলেন, ‘নামাজে বিনম্রতার মর্ম হচ্ছে:
- আল্লাহর সামনে হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়া, যার ফলে তার অন্তর স্থির ও সুসংহত হয়。
- নড়াচড়া স্থির হয়ে যাওয়া। রবের সম্মানার্থে এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত না করা।
- নামাজের শুরু থেকে শেষ অবধি নামাজে সম্পাদনরত সকল কথা ও কর্মের ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ থাকা। যেন নানা ধরনের কুমন্ত্রণা ও নোংরা চিন্তাধারা থেকে নিজেকে এবং নামাজকে পবিত্র রাখা যায়。
- মূলত একাগ্রতাই হচ্ছে নামাজের প্রাণ, মগজ ও তার মূল উদ্দেশ্য। আর এর ভিত্তিতেই প্রতিদান লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। অতএব, যে নামাজ একাগ্রতা ও অন্তরের স্থিরতা বিবর্জিত হয়, তার তেমন উল্লেখযোগ্য প্রতিদান আশা করা নিতান্তই অবান্তর। কেননা, প্রতিদান তো মূলত অন্তরের অনুভূতি ও একাগ্রতা অনুপাতেই হয়ে থাকে।'

• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا مِنَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ تَحْضُرُهُ صَلَاةٌ مَكْتُوبَةٌ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهَا وَخُشُوعَهَا وَرُكُوعَهَا، إِلَّا كَانَتْ كَفَّارَةً لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ مَا لَمْ يُؤْتِ كَبِيرَةً وَذَلِكَ الدَّهْرَ كُلَّهُ

'যখন কোনো মুসলিমের ফরজ নামাজের সময় হয়, অতঃপর সে উত্তমরূপে অজু করে একাগ্রতার সহিত নামাজ পড়ে, তা তার পূর্বের সকল গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়; যতক্ষণ না সে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। এভাবেই সর্বদা চলতে থাকবে।' [61]
• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا كَانَ فِي الصَّلَاةِ فَإِنَّهُ مُنَاجٍ رَبَّهُ، وَرَبُّهُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْقِبْلَةِ

'হে লোকসকল, যখন তোমাদের কেউ নামাজরত থাকে, তখন সে মূলত তার রবের সাথে একান্ত আলাপে মশগুল থাকে। আর এ অবস্থায় তার প্রতিপালক কিবলা ও তার মাঝে থাকেন।' [62]
• হাসান বসরি বলেন:
'যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও, তখন আল্লাহর আদেশ অনুসারে পূর্ণ আনুগত্যশীল হয়ে দাঁড়াও। ভুল-ভ্রান্তি ও এদিক-ওদিক তাকানো থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখো। যেন এমন না হয় যে, তোমার রব তোমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছেন, অথচ তুমি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য কোথাও তাকিয়ে আছো; জান্নাতলাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনায় রত। তুমি, অথচ তোমার অন্তর তোমার মুখ দিয়ে কী বের হচ্ছে—সে ব্যাপারে একদম উদাসীন।'

নামাজের অভ্যন্তরীণ আলোচ্য বিষয়

ইবনে কুদামা মাকদিসি বলেন, 'ভালোভাবে লক্ষ রাখো, নামাজ কতিপয় রুকন, ওয়াজিব ও সুন্নাতের সমষ্টি এবং তার প্রাণ হচ্ছে একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা ও অন্তরের স্থিরতা। কেননা, নামাজ নানা ধরনের জিকির-আজকার, মহান রবের সাথে গোপনালাপ ও কতক কর্ম সম্পাদনের নাম। অন্তরের একাগ্রতা ছাড়া একান্ত আলাপ ও তাঁর আজকারের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা একেবারেই অসম্ভব।
কেননা, মুখের কথা যদি অন্তরের মুখপাত্র হতে না পারে, তখন এ ধরনের বাক্যালাপের কোনো মূল্য নেই।'

নামাজে একাগ্রতা আনয়নের উপায়

১. একাগ্রতা হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাঁর সম্মান, মর্যাদা, সর্বোপরি তাঁর নৈকট্যের অনুভূতি জাগরণ। কেননা, এসব বিষয়ের ওপর যদি অন্তর লালিত হয়, তখন একাগ্রতা অবশ্যই তার পিছু নেবে। তাই একাগ্রতা সৃষ্টিতে এই একটি উপায়ই যথেষ্ট।
২. একাগ্রতা সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়—এমন সব বিষয় থেকে মুক্ত থাকা, যেমন: ক্ষুধা, প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেওয়া ইত্যাদি। তাই সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত অবস্থায় নামাজে দাঁড়ানো উচিত।
৩. নিজ কানে শোনা যায়—এমন আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করা। কেননা, তা অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করে। আর আজকার ও কুরআন পাঠকালে দুঠোঁট না নড়লে নামাজ শুদ্ধ হবে না।
সতর্কতা : নিজ কানে শোনার বিষয়টি যদি নফল নামাজে হয়, তবে ঠিক আছে। কিন্তু যদি সে সিররি নামাজ (জোহর ও আসর) জামাআতে আদায় করে, তাহলে নিজ কানে শোনা যায়-মতো পড়বে না। কেননা, এতে অনেক সময় পাশের মুসল্লির নামাজে সমস্যা হয়। কিন্তু সে অবশ্যই কিরাত পড়ার সময় ঠোঁট নাড়াবে—এমনভাবে যে জিহ্বা স্পষ্টভাবে হরফগুলো উচ্চারণ করবে।

৪. মুখ দিয়ে উচ্চারিত আজকার ও কুরআন তিলাওয়াতকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। এবং তাসবিহসমূহ ও কিরাতের মর্ম ভালোভাবে বোঝা, যাতে নামাজ প্রাণহীন দেহের ন্যায় জড় পদার্থে পরিণত না হয়।
৫. এই অনুভূতি গভীরভাবে অন্তরে জাগরূক রাখা যে, আমি যে এত কষ্ট করে নামাজ আদায় করছি, তার প্রতিদান একাগ্রতা ছাড়া অর্জন করা অসম্ভব।
৬. একাগ্রতা আনয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম করা। কেননা, প্রাথমিকভাবে প্রচেষ্টা ছাড়া এই একাগ্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়। পরে আল্লাহর ইচ্ছায় এটি ধীরে ধীরে মুসল্লিদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
৭. দাসত্বের পূর্ণ আদব রক্ষা করা। তেমনিভাবে এই সব আদবের পূর্ণ খেয়াল রাখা, যা রাসুল নিজ নামাজে বাস্তবায়ন করে গেছেন। যেমন, নামাজের রুকনগুলোর ব্যাপারে পূর্ণ যত্নবান হওয়া, নামাজকে দীর্ঘায়িত করা, সিজদার মধ্যে স্থিরতা। কেননা, স্বল্পদৈর্ঘ্যের নামাজ খুব কমই একাগ্রতা সৃষ্টি করে。

টিকাঃ
৬১. সহিহু মুসলিম: ২২৮
৬২. তাজিমু কাদরিস সালাত: ১১৯

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আপনি সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন

📄 আপনি সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন


খুব ভালোভাবে মনে রাখবেন, পরকালে উঁচু মর্তবা অর্জনের অন্যতম উপাদান হলো অধিক হারে সিজদাবনত হওয়া。

• রাসুলুল্লাহ বলেন:
عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلَّهِ، فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلَّهِ سَجْدَةً، إِلَّا رَفَعَكَ اللهُ بِهَا دَرَجَةً، وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً
'অধিক হারে আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হওয়া নিজের ওপর আবশ্যক করে নাও। কেননা, তুমি আল্লাহর সমীপে কোনো সিজদা করলে তার বিনিময়ে আল্লাহ একটি করে মর্তবা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে পাপ মোচন করেন।' [184]

• রাসুলুল্লাহ -এর খাদিম রাবিআ আসলামি বলেন: كُنْتُ أَبِيتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَتَيْتُهُ بِوَضُوئِهِ وَحَاجَتِهِ فَقَالَ لِي: سَلْ، فَقُلْتُ: أَسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ فِي الْجَنَّةِ. قَالَ: أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ، قُلْتُ: هُوَ ذَاكَ. قَالَ: فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ 'আমি একদা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে রাতযাপন করেছিলাম। ভোররাতে অজুর পানি নিয়ে আসলে তিনি আমাকে বলেন, “কিছু চাও!” আমি বললাম, “জান্নাতে আপনার সহচর হতে চাই।” তিনি বলেন, “আরও কিছু চাও?” আমি উত্তর দিলাম, “না, শুধু এটি হলে যথেষ্ট।” তখন তিনি আমাকে বললেন, "তাহলে অধিক হারে সিজদার মাধ্যমে তুমি আমাকে সাহায্য করো।” [185]
• হাফিজ ইবনে হাজার বলেন, 'সুতরাং যে অধিক হারে সিজদাবনত হবে, তার অবশ্যই উক্ত মর্তবা (তথা রাসুল-এর সাহচর্য) অর্জিত হবে।'

হে অধিক হারে সিজদাকারী বান্দা, খুব ভালোভাবে খেয়াল রাখুন যে, সিজদাই আল্লাহর নৈকট্যলাভের একমাত্র সহজ পথ। [3] তাই আল্লাহর রাসুল বলেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدُ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ :
'সিজদা অবস্থায় বান্দা আপন রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। [3] তাই তোমরা ওই অবস্থায় অধিক হারে প্রার্থনা করো।' [186]

• একদা একব্যক্তি হাসান বসরি -কে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন আমলটি বান্দাকে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী করে দেয়?' প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, 'রাতের গভীর অন্ধকারে নামাজে দাঁড়ানোর চেয়ে অধিক সহজ মাধ্যম আছে বলে আমার জানা নেই, যা তাকে খুব দ্রুতই স্বীয় মহান রবের নৈকট্যশীলে পরিণত করে দেয়।'

রাসুলুল্লাহ বলেন: أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرَّبُّ مِنَ العَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ الآخِرِ، فَإِنْ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمَّنْ يَذْكُرُ اللَّهَ فِي تِلَّكَ السَّاعَةِ فَكُنْ 'বান্দা শেষরাতে তার রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। তাই কেউ যদি ওই সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে সক্ষম হয়, সে যেন তা করে।' [187]

রাসুলুল্লাহ আরও বলেন: إِنَّ فِي اللَّيْلِ لَسَاعَةً لَا يُوَافِقُهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ، يَسْأَلُ اللَّهَ خَيْرًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ، وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ

‘রাতে এমন একটা সময় আছে, ওই সময় কোনো মুমিন বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতের যেকোনো কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ তা তাকে দান করেন। আর ওই সময়টা প্রত্যেক রাতে রয়েছে। ' [188]

- আলহামদুলিল্লাহ, আমি নিজেও অনুভব করেছি যে, ওই সময়টা প্রত্যেক রাতেই রয়েছে।
- ইমাম নববি বলেন, 'এই হাদিসে প্রত্যেক রাতের কোনো একটা সময়ে যেকোনো দুআ নিশ্চিতরূপে কবুল হওয়ার প্রমাণ রয়েছে এবং পুরো রাতজুড়ে প্রার্থনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, যাতে ওই সময়ের সাক্ষাৎ মিলে।'

আমরা আমাদের সার্বিক দুরবস্থার অভিযোগ একমাত্র রবের কাছেই করব

হে দুর্বল বান্দা, কোনো মাখলুকের কাছে অভিযোগ করার পূর্বে দয়ালু রবের কাছেই তোমার অভিযোগ পেশ করো। যাঁর হাতে রয়েছে সব কল্যাণের চাবি, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। তিনিই সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

• যদি আপনি কখনো মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোনো মুসিবতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন রাজাধিরাজ মহান রবের নিকট হাতপাতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যাকে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের কোনো কিছুই রুখতে পারে না। তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশ্রোতা। সুতরাং আবারও বলছি, যদি ওই সময়ের সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হতে চান, তবে কিয়ামুল লাইলের প্রতি অধিক হারে মনোনিবেশ করুন।

• রাসুলুল্লাহ বলেন: يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي، فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রাতে নিচের আসমানে অবতীর্ণ হন, যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন তিনি বান্দাদের ডাক দিয়ে বলেন, “ওহে, কে আছো আমার কাছে প্রার্থনা করবে? আমি তার প্রার্থনা কবুল করব, কে আছো ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।” এভাবে ফজর হওয়া পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। ' [189]

• আমরা কেন আল্লাহর সামনে লজ্জিত হবো না, অথচ স্বয়ং মহান রব আমাদের মতো দুর্বল, অভাবী, পাপী বান্দাদের অনবরত ডেকেই চলছেন। তবুও আমি, আপনি গভীর ঘুমাচ্ছন্ন। অথচ আমরা স্বাভাবিকভাবে তাঁর কাছেই অধিক মুখাপেক্ষী। যেকোনো ক্ষেত্রে তিনি ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই। ফুজাইল বিন ইয়াজ এক ব্যক্তিকে বললেন, 'এখন আমি আপনাকে একটি মূল্যবান কথা বলব, যা দুনিয়া ও এর মধ্যে অবস্থিত সবকিছুর থেকেই শ্রেষ্ঠ। তা হলো, আপনি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুকেই অন্তরের গহীন থেকে বের করে দেন, তাহলে আপনি কোনো বস্তু চাওয়ামাত্রই তিনি দান করবেন।' হে আল্লাহ, আমরা আমাদের বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির বিষয়ে বিনম্র-চিত্তে আপনার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ, হে মহান রব, আমাদের অন্তরকে আপনার ভয়, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দিন (আমিন)।

• জাহহাক বিন মুজাহিম বলেন, 'আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা নিদ্রার আধিক্যের কারণে আল্লাহর কাছে রাতের অন্ধকারে (কান্নাকাটি করে) লজ্জাবোধ করতেন। [190]

• সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'একটি পাপের দরুন আমি আজ দীর্ঘ পাঁচ মাস পর্যন্ত তাহাজ্জুদ থেকে বঞ্চিত হয়েছি।'

প্রতিকার-অযোগ্য ব্যাধি থেকে সাবধান থাকুন

• মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'পুরো রাত জুড়ে ঘুমিয়ে লজ্জিত অবস্থায় সকাল করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়, পুরো রাত জুড়ে ইবাদতে কাটিয়ে আত্মঅহমিকায় লিপ্ত অবস্থায় সকাল করার চেয়ে।'

- কেননা, ইবাদতের ক্ষেত্রে আত্মগর্বে নিমজ্জিত হওয়া মানে মূলত নিজ সম্পাদিত ইবাদতকে অনেক বড় চোখে দেখা, যেমন নাকি সে রবের প্রতি দয়া করেছে, অথচ মহান রবের পক্ষ থেকে তাওফিকের মতো মহানিয়ামতকে সে ভুলে গেছে।

• ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'দিবারাত্রির ফরজ ও নফল সব মিলিয়ে রাসুল -এর নামাজের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ রাকআতের মতো। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সতেরো রাকআত ফরজ, বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদা, বিতরসহ এগারো রাকআত তাহাজ্জুদ, কখনো দোহার নামাজ বা অন্যান্য নফলের মাধ্যমে একে তিনি বৃদ্ধি করতেন।'

প্রজ্ঞাবাণী: ব্যক্তির আত্মা স্বীয় চর্চিত বিষয়ের ওপর অভ্যস্ত হয়ে ওঠে。

• প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনি প্রতি রাতে এগারো কিংবা তেরো রাকআতের ওপর নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলুন, যেমনটি রাসুল রমজান ও অন্যান্য সময় করতেন। দেখুন, কাজটি কিন্তু একেবারেই সহজ, যেমন ধারণা করছেন, তা থেকে অনেক বেশি সহজ, আপনি যদি হাফিজ না হন, তবে ছোট ছোট সুরাই আপনার জন্য যথেষ্ট হবে, যা আদায় করতে ন্যূনতম ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে একটু কষ্ট লাগলেও ইনশাআল্লাহ ২০-২১ দিনের মধ্যে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে, এমনকি তা আপনার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নেবে। কখনো যদি তা আপনি আদায় করতে না পারেন, এর জন্য অন্তরে দুশ্চিন্তা অনুভূত হবে। আপনি যদি শেষ রাতে উঠতে সক্ষম নাও হন, তাহলে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই, আপনি চাইলে ঘুমানোর পূর্বে অথবা ইশার সুন্নাতে মুয়াক্কাদার পর বিলম্ব ছাড়া তা আদায় করে নিতে পারেন, যাতে তা আদায়ে অলসতা ও উদাসীনতা আপনাকে গ্রাস করে না ফেলে। আজ থেকে পড়া শুরু করুন, অচিরেই নামাজে অন্য রকম স্বস্তি ও স্বাদ অনুভব করবেন ইনশাআল্লাহ।

সতর্কতা : এখানে ২১ দিনের পরিমাণটি অভিজ্ঞতালব্ধ, যা মানসিক বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে নেওয়া, এর ওপর আদৌ কুরআন, সুন্নাহর কোনো শরয়ি প্রমাণ নেই।

টিকাঃ
১৮৪. সহিহ মুসলিম: ৪৮৮
১৮৫. সহিহ মুসলিম: ৪৮৯
১৮৬. সহিহু মুসলিম: ৪৮২
১৮৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৭৯
১৮৮. সহিহু মুসলিম: ৭৫৭
১৮৯. সহিহুল বুখারি: ১১৪৫
১৯০. এখানে উদ্দেশ্য হলো, সালাফে সালিহিন স্বল্প সময় ঘুমালেও সেটাকে দুনিয়ার জিন্দেগির দিকে তাকিয়ে অধিক সময় নষ্ট মনে করতেন। এ কারণে তারা রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদে এর জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জাবোধ করতেন এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। -অনুবাদক

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 দৈনন্দিনের সুন্নাতসমূহ পালনে যত্নশীল হোন

📄 দৈনন্দিনের সুন্নাতসমূহ পালনে যত্নশীল হোন


আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত সফলতার সোপানে আরোহণ করতে পারবেন না, যতক্ষণ না সকাল-সন্ধ্যার দৈনিক সুন্নাতের ব্যাপারে পরিপূর্ণ যত্নশীল হবেন। এমনকি যতক্ষণ না আপনার জীবনের হালচাল নববি সুন্নাতের সম্পূর্ণ অনুসারী হয়ে যায়。

• যতই আপনি নবিজি -এর কোনো সুন্নাতের ওপর আমল করবেন এবং তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরতে সচেষ্ট হবেন, ততই আপনি আল্লাহর নৈকট্যশীলে পরিণত হবেন। কেননা, মুমিন ব্যক্তির মান-মর্যাদা স্বীয় রবের নিকট উঁচু হতে থাকে নবিজি -এর সুন্নাত ও আদর্শকে তার জীবনে বাস্তবায়ন অনুপাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
'(হে নবি,) আপনি তাদের বলে দিন, "তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুগত্য করো।" তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন।' [103]

• নবিজি -এর দৈনন্দিনের সুন্নাত অগণিত ও অপরিসীম। নমুনাস্বরূপ এখানে দৈনন্দিনের কতিপয় সুন্নাত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। যেমন : ঘুমানোর পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ, খাওয়ার পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ, তেমনিভাবে আরও বিভিন্ন বিশেষ মুহূর্ত ও অবস্থার সুন্নাতসমূহ। এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমার ছোট্ট পুস্তিকা 'দৈনন্দিনের সহস্রাধিক সুন্নাত' দেখা যেতে পারে। তাতে আমি দেখিয়েছি, কীভাবে আপনি কোনো কষ্ট ও সময় অপচয় ছাড়া সহজেই একদিনে রাসুলুল্লাহ -এর এক হাজারেরও অধিক সুন্নাতের ওপর আমল করতে পারবেন। (সমস্ত প্রশংসা কেবল আপনারই হে আল্লাহ!)

• সুতরাং একটু চিন্তা করে দেখুন, এই নববি সুন্নাতসমূহের প্রতি একটু যত্নশীল হওয়ার দ্বারা আপনি প্রতি বছর কত বেশি সাওয়াব ও প্রতিদানের অধিকারী হবেন। তাই নববি সুন্নাতসমূহকে আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ জ্ঞান করুন। কেননা, যে ব্যক্তি যে বিষয় বা অবস্থার ওপর নিজ জীবনকে পরিচালিত করে, তার মৃত্যু অবশ্যই সেই বিষয় বা অবস্থার ওপরই হয় (চাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ)। আল্লাহ আমাদের সকলকে নববি সুন্নাত অনুযায়ী জীবন সাজানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
১০৩. সুরা আলি ইমরান : ৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00