📄 ইখলাস (নিষ্ঠা) অর্জনের সহজ উপায়
আখিরাতে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তি তার সঠিক কর্মকাণ্ডে ইখলাস ব্যতীত কখনো লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হবে না। বরং নিষ্ঠা ছাড়া তার চেষ্টা-পরিশ্রম ও সময়—সবকিছুই বৃtha যাবে। সেগুলো প্রভুর দরবারে পৌঁছবে না।
• আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ﴾ ‘জেনে রেখো, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্তে।’
অন্যত্র বলেন: ﴿ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ ﴾ ‘অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকুন।’
• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি নিজের অংশীদার থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। সুতরাং যে ব্যক্তি সৎকর্ম সম্পাদনে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে, আমি তার অংশীদার ও সৎকর্মকে ছুঁড়ে ফেলে দিই।”’
• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا، وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ
'আল্লাহ তাআলা একমাত্র সেই আমলই কবুল করে থাকেন, যা তার জন্য একনিষ্ঠভাবে করা হয় এবং তাঁর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কিছু উদ্দেশ্য না হয়।'
ইখলাসের গুরুত্ব সম্পর্কে সালাফের কতিপয় বাণী
১. ইবনে আব্বাস বলেন, 'সাবধান! রবের আনুগত্যের ওপর মানুষের প্রশংসার আশা কোরো না। কারণ, তা আমলসমূহকে ধ্বংস করে দেয়।'
২. জনৈক প্রাজ্ঞবান ব্যক্তি বলেন, 'মুখলিস তথা নিষ্ঠাবান মুমিন হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে আপন দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার পাশাপাশি নিজের ভালো গুণসমূহও আড়ালে রাখে।'
৩. সাহল আত-তুসতারি-কে একদা জিজ্ঞেস করা হলো, 'মানুষের জন্য সবচেয়ে কষ্টসাধ্য বিষয় কী?' তিনি বললেন, 'ইখলাস। কেননা, তাতে তার বাহ্যিক কোনো লাভ পরিলক্ষিত হয় না।'
৪. ইখলাস অর্থ হলো, বান্দার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আমলের মাঝে কোনো বৈপরীত্য না থাকা।
৫. আবুল আলিয়া বলেন, 'আমাকে অনেক সাহাবি উপদেশ দিয়েছেন, “হে আবুল আলিয়া, তুমি আপন রব ছাড়া অন্য কারও সন্তুষ্টির জন্য আমল কোরো না। কেননা, তা করলে তখন তোমার দায়িত্বভার আল্লাহ মানুষের কাঁধে তুলে দেবেন।”'
৬. হাসান বসরি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে সৎকর্ম সম্পাদনের সময় অন্তরের খোঁজখবর নেয়। আল্লাহর জন্য হলে আমল চালু রাখে আর কোনো স্বার্থ উহ্য থাকলে পরিত্যাগ করে।'
একটি আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্ত
জনৈক পুণ্যবান ব্যক্তি বলেন, 'ধার্মিক ব্যক্তিকে ছাগলের রাখাল থেকে শিষ্টাচারিতা শেখা উচিত। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, 'কেননা রাখাল যখন ছাগলের নিকট নামাজ আদায় করে, তখন সে ছাগল থেকে কোনো প্রশংসার আশা করে না, মানুষের প্রশংসা কামনার তো প্রশ্নই ওঠে না।'
ইখলাস অর্জনের সহজ মাধ্যম
১. পরকালের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং এ বিশ্বাস সর্বদা অন্তরে জাগরূক রাখা যে, ইখলাসবিহীন আমল পাহাড় পরিমাণ হলেও পরকালে কোনো উপকারে আসবে না।
২. সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবানদের সাহচর্য গ্রহণ করা। কেননা, তাদের সাহচর্যে আশ্চর্যজনক প্রভাব রয়েছে।
৩. মানুষের প্রশংসা ও তিরস্কারের পরোয়া না করা। কেননা, যদি তোমার উত্তম আমলসমূহ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাদের প্রশংসা তো কোনো কাজ দেবে না। তেমনিভাবে তাদের তিরস্কারও কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যদি তোমার প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট থাকেন।
৪. নিষ্ঠা অর্জনের জন্য অধিক হারে দুআ করা।
যেমন 'হে আল্লাহ, আমার কথা ও কাজে ইখলাস দান করুন।' এ জাতীয় দুআ পাঠ করা।
৫. নিজের সৎকর্মগুলো যথাসম্ভব লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা। কথা, কাজ, অবস্থা—এমনকি ইশারা-ইঙ্গিতেও নিজের আমলসমূহ মানুষের সামনে প্রকাশ না করা।
৬. প্রত্যেক উত্তম আমল করার পূর্বে নিয়তকে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বিশুদ্ধ করে নেওয়া। উক্ত আমল দ্বারা একমাত্র রবের নৈকট্য ও সন্তুষ্টিই কাম্য হওয়া। নিজ আমলের ব্যাপারে সার্বক্ষণিক সজাগ দৃষ্টি রাখা।
সৎকর্মে একনিষ্ঠতা আনয়নের উত্তম উপায়
শাকিক বিন ইবরাহিম বলেন, 'সৎকর্মে একনিষ্ঠতা ধরে রাখার তিনটি মাধ্যম রয়েছে。
- আমলটিকে একমাত্র রবের তাওফিকের ফসল মনে করা। এ বোধ আত্মতৃপ্তি ও গর্বকে দূরীভূত করে।
- আমলটি সম্পাদনে রবের সন্তুষ্টিই একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া। এ বোধ কুপ্রবৃত্তি দমনে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
- লৌকিকতা ও পার্থিব লোভ-লালসা বাদ দিয়ে আমলটির যথাযথ প্রতিদান একমাত্র রবের নিকটই কামনা করা।'
সত্যবাদিতা ও নিষ্ঠার বাস্তব স্বরূপ
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'প্রকৃত নিষ্ঠা ও সত্যবাদিতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবটুকু ঢেলে দেওয়া সত্ত্বেও নিজ পরিশ্রমকে খুব স্বল্প ও তুচ্ছ মনে করা।'
সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনি কি রবের সন্তুষ্টির নিমিত্তে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন? আপনার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনে কুরবান করতে প্রস্তুত হয়েছেন? আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾
'আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র আল্লাহর জন্য। '
আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকা
ইবনে কুদামা বলেন, 'প্রত্যেক বান্দার জন্য নিজ অন্তরকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট রাখা উচিত। এ বোধ মূলত আল্লাহর ভয় ও তাঁর প্রতি প্রবল প্রেমাসক্তি ও আগ্রহের দরুনই সৃষ্টি হয়।'
সুতরাং হে ভাই, আপনি কি আল্লাহর ফয়সালার ওপরই সন্তুষ্ট, না মানুষের ফয়সালাই আপনার কাছে শিরোধার্য? তা একটু খতিয়ে দেখুন।
একটি প্রজ্ঞাময় বাণী: আপনার অন্তরকে কেবল আল্লাহর নিকটই সঁপে দিন, অন্যথায় আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে অনেক দূরে সরে যাবেন।
নিষ্ঠাবানদের নিদর্শন
ইবনুল জাওজি বলেন, 'একনিষ্ঠতার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার মাঝে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য না থাকা।'
তাই ভেবে দেখুন, লোকচক্ষুর আড়ালে আপনার তৎপরতা ও সার্বিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের সামনে আপনার প্রত্যক্ষ বিচরণের মাঝে কোনো ধরনের বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় কি না?
একটি জটিল ও সূক্ষ্ম আত্মসমালোচনা
রাবি বিন সাবিহ বলেন, 'একদা আমরা হাসান বসরি-এর একটি মজলিসে তার উপদেশ শুনছিলাম। ইতিমধ্যে জনৈক ব্যক্তি অঝোর ধারায় ক্রন্দন শুরু করে দিলে তিনি বললেন, “ওহে, এই ক্রন্দনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে বিচার দিবসে অবশ্যই আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে."'
সুবহানাল্লাহ! আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টি কতই না সজাগ ও সূক্ষ্ম ছিল! তারা শুধু পূণ্যকর্ম সম্পাদন করেই ক্ষান্ত থাকতেন না, বরং উক্ত আমল সম্পাদনে কেবল রবের সন্তুষ্টিই কি মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল, না তাতে অন্য কোনো পার্থিব স্বার্থ নিহিত ছিল, তাও যাচাই করে দেখতেন।
সালাফ স্বীয় নয়নযুগলের অশ্রুকে গোপন রাখতেন
হাসান বসরি বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দারা দ্বীনি মজলিসে বসার পর চোখে অশ্রু আসতে চাইলে সাথে সাথে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করতেন। এতে অশ্রুর ঝর্ণাধারা না থামলে তারা মজলিস থেকে উঠেই যেতেন।'
• নিষ্ঠা ও প্রশংসার লোভ কখনো একত্রিত হতে পারে না। তাই ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'অন্তরের একনিষ্ঠতা ও মানুষের প্রশংসা-স্তুতির লোভ একত্রিত হওয়া এমন অসম্ভব, যেমনিভাবে আগুন ও পানি এবং গুইসাপ ও মাছের সহাবস্থান অসম্ভব।
আনুগত্য ও নিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানুষের প্রকারভেদ
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সত্যিকারের আবিদ হওয়ার জন্য দুটি বৈশিষ্ট্যের বিকল্প নেই।
১. আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা। ২. রাসুল -এর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য-অনুসরণ।
এই দুই মানদণ্ডের ভিত্তিতে মানুষ চার ভাগে বিভক্ত।
ক. যারা ইখলাস ও আনুগত্য উভয় গুণে গুণান্বিত। তারাই স্বীয় রবের প্রকৃত উপাসক। তাদের সব সৎকর্ম আল্লাহকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। তেমনিভাবে তাদের কথা, কাজ, ভালোবাসা, শত্রুতা সবই স্বীয় রবের সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে। মানুষের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা ও প্রতিদানের বিন্দুমাত্র আকাঙ্ক্ষাও তাদের থাকে না।
খ. যাদের ইখলাস ও আনুগত্য কোনোটিই নেই। তাদের কোনো কর্মই শরিয়তের মানদণ্ডে উন্নীত হয় না। একনিষ্ঠতার তো প্রশ্নই আসে না। যেমন লৌকিকতার আশ্রয়গ্রহণকারী ওই সব ব্যক্তি, যারা মানুষের সামনে নিজেদের কর্মকে অত্যন্ত সুসজ্জিত করে তোলে। মূলত তারা রবের নিকট সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত। কারণ, তারা শিরক ও নিজ নিজ ভ্রষ্টতা নিয়ে মহাখুশি।
গ. যাদের কর্মে নিষ্ঠা থাকে, কিন্তু শরিয়তের মানদণ্ডে তাদের আমল পরিত্যাজ্য। যেমন মূর্খ-আবিদ ব্যক্তি, যারা একদিকে তো নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো আল্লাহর ইবাদত করে। আবার অপরদিকে এসব ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য, সন্তুষ্টিও কামনা করে!
ঘ. যাদের আমল শরিয়তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেও নিষ্ঠা বিবর্জিত। যেমন লৌকিকতার ধ্বজাদারিদের সব আনুগত্য। কেননা, তারা হজ করে তাদের হাজি বলার জন্য, কুরআন পাঠ করে তাদের কারি বলার জন্য, জিহাদ করে তাদের লড়াকু মুজাহিদ বলার জন্য ইত্যাদি। এসব আমলসমূহ শরিয়তের মাপকাঠিতে কোনো রকমে উন্নীত হলেও ইখলাস না থাকার কারণে রবের নিকট সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত হয়।'
টিকাঃ
২৯৭. সুরা আজ-জুমার: ৩
২৯৮. সুরা আজ-জুমার: ২
২৯৯. সহিহ মুসলিম: ২৯৮৫
৩০০. সুনানুন নাসায়ি: ৩১৪০
৩০১. সুরা আল-আনআম: ১৬২