📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে

📄 আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে


অত্যন্ত পরিতাপের একটি বিষয় হচ্ছে :

• কতক লোককে দেখা যায় যে, তারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি উৎসাহী ও ধাবিত হওয়ার চেয়ে নগণ্য সৃষ্টিকুলের প্রতি অধিক আগ্রহী ও ধাবমান।
• তারা সৃষ্টিকর্তার দিকে নিবিষ্ট হওয়ার চেয়ে মানুষের প্রতিই অধিক নিবিষ্ট ও অনুরাগী।
• আর কতক লোক আছে, তারা আল্লাহর আওতাধীন বিষয়ের চেয়ে মানুষের আওতাধীন মেকি বিষয়ের প্রতি সর্বাধিক লোলুপ-লোভাতুর হয়ে থাকে। মানুষের কাছেই তারা হাত পাতে।
• তারা মানুষের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আড্ডা দিতে থাকে। কিন্তু আপন সৃষ্টিকর্তার সাথে একটুখানি সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনটুকুও অনুভব করে না, এমনকি তাঁর আনুগত্য কিংবা তাঁর কালামে মাজিদ পাঠকালে পর্যন্ত বিরক্তিবোধ করে। অথচ, তিনিই তাদের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা।
• আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তির চেয়েও মানুষের ক্ষমতা ও শক্তির ওপর তারা অধিক নির্ভরশীল ও আস্থা রেখে থাকে!
• মানুষের জন্য তারা সব ধরনের কষ্ট-ক্লেশ ও ভোগান্তি পোহাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ, আপন প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য সামান্য কষ্ট স্বীকার করতে হাজারো টালবাহানা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আদৌ কোনো কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকার করতেই তারা প্রস্তুত নয়。
• কেউ আছে, মানুষের অন্তরে নিজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সর্বদা তৎপর ও অতি উৎসাহী থাকে। অথচ, আপন সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কোনো চেষ্টা তো করেই না; বরং এ ব্যাপারে সে কোনো তোয়াক্কাই করে না。
• আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক দৃঢ়করণের চেয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে অধিক ব্যস্ত তারা, যেমন নামাজের প্রতি তাদের কোনো ভ্রক্ষেপ নেই; অথচ, নামাজ হচ্ছে বান্দা ও রবের মাঝে সেতুবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম।
• আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগ্রহী ও উৎসাহী হওয়ার চেয়ে সৃষ্টিকুলের সন্তুষ্টি অর্জনে সে অধিক আগ্রহী ও অতি উৎসাহী।
হে আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনার অন্তর থেকে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জিজ্ঞেস করুন, যেন আপনি আপনার বাস্তব মর্যাদা ও সম্মান এবং আপনার কাছে ইমানের গুরুত্ব কতটুকু আর আপনি কোথায় মজে আছেন—এসব ব্যাপারে সম্যক অবগত হতে পারেন।

আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব, সুমহান মর্যাদা, তাঁর ভালোবাসা ও ভীতি কি আপনার হৃদয়কে জয় করতে এবং আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে? আপনার চিন্তা-চেতনা, সর্বোপরি আপনার সর্বাধিক প্রিয় বস্তু, প্রাণ ইত্যাদি কি নিরবচ্ছিন্নভাবে মহান রবের দিকেই ধাবমান ও মনোযোগী?

আপনার অন্তর কি তিনি ব্যতীত অন্যত্র ঝুঁকে? চাই ভালোবাসা, সম্মান কিংবা বিনয়, নম্রতা—যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন।

• সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'তোমার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ সবকিছুই আল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলো।'

সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট আগ্রহ ও উদ্দীপনা

মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'সবচেয়ে জঘন্য লিপ্সা হচ্ছে, পরকালের আমল দ্বারা দুনিয়া কামাই করা।'
• সুতরাং সাবধান! সতর্ক হোন! আপনি নিজেকে কত সম্মানি মনে করেন, অথচ আল্লাহর কাছে কত তুচ্ছ ও নিন্দনীয় আপনি। নিজেকে আপনি কত কল্যাণের আধার মনে করেন, অথচ বাস্তবতা এর বিপরীত। আপনি নিজেকে অনেক বড় জ্ঞানী ভেবে থাকেন, অথচ আপনার ভেতরে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার শূন্যতা ছাড়া অন্য কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না।

• আপনি নিজ আত্মাকে কোনো ধরনের ফাঁকফোকর ছাড়া সরাসরি প্রশ্ন করুন, আপনার অন্তর কি মহান আল্লাহকে প্রাধান্য দেয়? আপনার অন্তর কি তাঁকে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী মনে করে? না আপনার কাছে দুনিয়াই সবকিছু এবং এর স্বার্থ সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে?

সুতরাং আপনি যদি তুচ্ছ পার্থিব বিষয়কে আল্লাহর আদেশের ওপর প্রাধান্য দেন, আল্লাহর আনুগত্য বাদ দিয়ে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এর স্বার্থেই যদি অবাধ্যতা করেন- যেমন : মুআজ্জিন আজান দিচ্ছে, অথচ আপনি আপনার কাজেই ব্যস্ত, এর প্রতি আপনার বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই; সর্বোপরি হারামকে হালালের ওপর প্রাধান্য দেন-তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন, আপনার অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর চেয়ে দুনিয়া ও তার তুচ্ছ স্বার্থ অনেক বড়। (নাউজুবিল্লাহ)।

সোনার ফ্রেমে বেঁধে রাখার মতো একটি মূল্যবান উপদেশ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি আগ্রহ, তাঁর সন্তুষ্টি ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য গভীর উদ্দীপনা প্রভৃতি মূলত কোনো বান্দার মূল সম্পদ ও সকল সাফল্যের চাবিকাঠি। পবিত্র জীবনের মূল উপকরণ এবং তার সৌভাগ্য, সফলতা, নিয়ামত ও চক্ষুশীতলতার মূল উৎস। কেননা, এ জন্য তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এ জন্য নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং নাজিল করেছেন আসমানি কিতাব।’

অতএব আল্লাহর প্রতি অধিক আগ্রহী ও উৎসাহী হওয়া ব্যতীত আত্মিক পরিশুদ্ধি ও প্রশান্তি অর্জন কিছুতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ - وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ )

‘অতএব, যখন অবসর পান পরিশ্রম করুন। এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।’

আল্লাহর যথাযথ পরিচয় লাভের সুদূরপ্রসারী যুগান্তকারী ফলাফল

ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘যে আল্লাহর যথাযথ পরিচয় লাভে ধন্য হয়েছে—

- তার জীবন হবে নির্মলতা ও আত্মিক প্রশান্তিতে আচ্ছাদিত এবং পবিত্রতার চাদরে আবৃত।

- তার একটি ব্যক্তিত্ব অর্জিত হবে এবং তার অন্তর থেকে সৃষ্টিকুলের ভয় দূর হয়ে যাবে।

- রবের সাথে তার সম্পর্কে উন্নতি হবে, অপরদিকে মানুষের সাথে সম্পর্ক ক্রমশ হ্রাস পাবে।

- আপন প্রতিপালকের সামনেই সে শুধু লজ্জিত হবে এবং তাঁকেই বড় জ্ঞান করবে এবং সর্বদা অন্তরে জাগরূক রাখবে তাঁরই ধ্যান-খেয়াল।

- বস্তুত, সে আল্লাহকেই সত্যিকারার্থে ভালোবাসবে, তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে এবং তাঁকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। সব বিষয় তাঁর সন্তুষ্টির ওপর ন্যস্ত করবে।’

আগ্রহ দুপ্রকার

১. আল্লাহর দিদার, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও একান্ত আলাপ এবং তাঁর দিকেই সর্বদা দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকার আগ্রহ ও উৎসাহ।

২. জান্নাত ও তার অভ্যন্তরের অনন্তকালের নিয়ামতরাজি এবং উভয় জগতের কামিয়াবি লাভের আগ্রহ।

টিকাঃ
১২৩. সুরা আল-ইনশিরাহ: ৭-৮

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও...

📄 অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও...


আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ مُبِينٌ ﴾

'অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী।'

• প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম তবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'হে লোক সকল, তোমরা আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে ইমানের মাধ্যমে তাঁর দয়া ও অনুকম্পার দিকে ধাবিত হও। এবং তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্যের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদনে ব্রতী হও।'

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, (الفرار) শব্দের বাস্তবধর্মী মর্ম হচ্ছে, এক বস্তু থেকে অপর বস্তুর দিকে পলায়ন করা। এটি মূলত দুপ্রকার। (১.) সৌভাগ্যবানদের পলায়ন। তা হচ্ছে সবকিছুকে ফেলে রেখে আল্লাহর দিকেই ধাবিত ও অগ্রগামী হওয়া। (২.) দুর্ভাগাদের পলায়ন। তা হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে পালিয়ে আসা। অর্থাৎ মহান রবের শাস্তি থেকে বাঁচতে অন্য কারও সাহায্য প্রার্থনা করা।'

• সাহল আত-তুসতারি প্রায়শ উপদেশের সুরে স্বীয় শিষ্যদের বলতেন, 'আল্লাহ ছাড়া সবকিছুকে বাদ দিয়ে তোমরা একমাত্র তাঁরই দিকে পালিয়ে এসো।'

আল্লাহর নিকট পলায়নের কতিপয় প্রকারভেদ

শাইখ সাদি আল্লাহর নিকট পলায়নের বিভিন্ন প্রকারভেদ চিহ্নিত করেছেন, যা নিম্নরূপ:

১. বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ—আল্লাহর সব অপছন্দনীয় বিষয় থেকে তাঁর প্রিয় বস্তুর দিকে ফিরে আসা, চাই তা প্রত্যক্ষ হোক কিংবা পরোক্ষ হোক।

২. অজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞার দিকে পলায়ন。

৩. কুফর থেকে ইমানের দিকে প্রত্যাবর্তন।

৪. অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে পলায়ন।

৫. অলসতা ও উদাসীনতা থেকে রবের স্মরণের দিকে পলায়ন।

৬. আল্লাহর এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরের দিকে পলায়ন。

• আল্লাহর নিকট পলায়নের মূল উপপাদ্য বিষয় হলো, বান্দা আল্লাহর কোনো অংশী সাব্যস্তকরণ (যেমন, মূর্তি-ভাস্কর্য কিংবা কবর পূজা ইত্যাদি, যা তিনি ব্যতীত অন্য কারও উপাসনাকেই অনিবার্য করে তোলে।) থেকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের দিকেই ফিরে আসা এবং স্বীয় রবের জন্য উপাসনা, ভয়, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রার্থনা ও প্রত্যাবর্তন-সব বিষয় বরাদ্দ করা। যে উক্ত বিষয়াবলিকে পরিপূর্ণরূপে অর্জন করল, সে যেন পুরো দ্বীনকেই পরিপূর্ণভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল。

• ওহে, আপনি কে? যার স্বীয় রবের দিকে পলায়নের প্রয়োজনই নেই! ওহে আল্লাহর দুর্বল বান্দা, আপনি কি ভুলে গেছেন যে, নিজের লাভ-ক্ষতি কোনো কিছুরই মালিক আপনি নন? যেমন আপনি হঠাৎ সুস্থ আবার হঠাৎ অসুস্থ। জীবনযাপনের প্রাক্কালে হঠাৎ-ই বার্ধক্যে উপনীত। এখন জন্ম তো ক্ষণিক পরে আবার মৃত্যু। সর্বোপরি আপনি এমন এক দুর্বল সত্তার অধিকারী, যে কিনা কোনো ধরনের বালা-মুসিবতই সহ্য করতে পারে না। কোনো আসমানি ফয়সালা অকেজো করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম আপনি, এ হলো আপনার বাস্তব প্রকৃত অবস্থা। তো আপনি কোথায় মজে আছেন! হে বন্ধু, একটুখানি ভাবুন!

• আপনি দয়ার সাগর আল্লাহর দিকে কেনই-বা প্রত্যাবর্তন করেন না? অথচ তিনিই তো সবচেয়ে সম্মানিত ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তিনিই তো আমাদের রিজিকদাতা, আমাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক। মূলত তাঁর হাতেই তো পার্থিব-অপার্থিব সব ধরনের সফলতার মূল চাবিকাঠি।

• আল্লাহর শপথ! আপনি যদি সত্যিই স্বীয় রবের দিকে পালিয়ে আশ্রয় নেন, তাহলে অবশ্যই আপনি আর্থিক স্থিরতা, সার্বিক সফলতা, প্রফুল্লতা ও প্রশান্তির স্নিগ্ধময় আভা অনুভব করবেন。

• পক্ষান্তরে যদি তাঁর থেকে পলায়ন করে অন্য কোথাও আশ্রয় নেন, তাহলে আপনি অবশ্যই দুনিয়া-আখিরাত—উভয় জগতেই সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশ, কোণঠাসাবোধ, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাগ্য ইত্যাদি পেরেশানিতে জর্জরিত হতে থাকবেন।

• সুতরাং এমন দিন আসার আগেই পলায়ন করুন মহান প্রতিপালকের দিকে, যেদিন তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাবর্তনের সক্ষমতা থাকবে না। তা এমন দিন, যেদিন আপনার প্রাণপাখি কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। শরীরের বাহ্যিক আবরণ থেকে প্রাণ বের হয়ে ঊর্ধ্বজগতে উড়াল দেবে। যেদিন আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হতে হবে, সেদিন আসার আগেই তাঁর দিকে পলায়নে ব্রতী হোন। কেননা, সেদিন আপনি আপনার চোখের সামনে জাহান্নামের আগুনকে টগবগ করতে দেখতে পাবেন, কিন্তু আপনার ইজ্জত, সম্মান, ধন-সম্পদ কিছুই তখন কোনো কাজে আসবে না। ফলে আপনাকে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, যার কোনো রকমের ক্ষতিপূরণ আদতে নেই। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ।

• আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَتَرَكْتُمْ مَا خَوَّلْنَاكُمْ وَرَاءَ ظُهُورِكُمْ وَمَا نَرَى مَعَكُمْ شُفَعَاءَكُمُ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّهُمْ فِيكُمْ شُرَكَاءُ لَقَدْ تَقَطَّعَ بَيْنَكُمْ وَضَلَّ عَنْكُمْ مَا كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ ﴾

'তোমরা আমার কাছে নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছ, যেমন আমি প্রথমে তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তোমাদের যা দিয়েছিলাম, তা পশ্চাতেই রেখে এসেছ। আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সুপারিশকারীদের দেখছি না। যাদের সম্পর্কে তোমাদের দাবি ছিল যে, তারা তোমাদের ব্যাপারে অংশীদার। বাস্তবিকই তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমাদের দাবি উধাও হয়ে গেছে। '

• আপনি কি শয়তানের আনুগত্য থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে পলায়ন করছেন, না পলায়ন করছেন আল্লাহর আনুগত্য থেকে শয়তানের আনুগত্যের দিকে?

• খুব ভালো করে জেনে রাখুন, আপনার মধ্যে আল্লাহভীতির পরিমাণ অনুপাতেই তাঁর প্রতি পলায়নের হার হবে। স্বীয় রবের ভয় যার যত বেশি হবে, তার পলায়নও তার দিকে সে পরিমাণ হবে।

• মণিমুক্তোখচিত একটি অমিয়বাণী: প্রত্যেক ভয়ংকর বস্তু থেকে মানুষ পলায়ন করে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত, কেননা মানুষ তাঁকে ভয় করা সত্ত্বেও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করে।

টিকাঃ
১২৪. সুরা আজ-জারিয়াত: ৫০
১২৫. সুরা আল-আনআম : ৯৪

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুমিনের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য

📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুমিনের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য


আখিরাতের সফলতা-প্রত্যাশীর জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো, রবের সন্তুষ্টি, যা অর্জনের জন্য সে নিজের সবকিছু বিলীন করে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। [2, 3] সে সবকিছু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করে থাকে, যা মুমিনের অন্তর ও রুহের খোরাক হিসেবে কাজ করে। মানুষের সার্বিক অবস্থায়—কথাবার্তা, চলাফেরা, নড়াচড়া, সবকিছুতে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টিই মূলত প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে।

• ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আমি সার্বিক উপকারী দুআর ব্যাপারে চিন্তা করলাম, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সাহায্য প্রার্থনাই আমার নিকট সবচেয়ে উপকারী দুআ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
• তাই সার্বক্ষণিক আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা করা উচিত- اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ابْتِغَاءِ مَرْضَاتِكَ 'হে আল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করুন।'
• জাওহারি বিরচিত সিহাহ নামক কিতাবে (رضوان) রিজওয়ান শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি মূলত সন্তুষ্টির আধিক্যতাকেই নির্দেশ করে, যখন আল্লাহর সন্তুষ্টিই সন্তুষ্টির সর্বোচ্চ স্তর, তাই কুরআনে (رضوان) রিজওয়ান শব্দটিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি বোঝানোর জন্য চয়ন করা হয়েছে।
যেমন আল্লাহ বলেন: تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ﴾ 'আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদারত দেখবেন।' [209]
• রাগিব ইসপাহানি বলেন, 'আল্লাহর প্রতি বান্দার সন্তুষ্টির অর্থ হলো, রবের ফয়সালার ওপর কোনো রকম অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করা এবং ভ্রু না কুঁচকানো। বান্দার ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির নিদর্শন হলো, বান্দা তাঁর আদেশ ও নিষেধের পূর্ণ আনুগত্য করা।'
• রবের সন্তুষ্টির নিদর্শন: ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'রবের সন্তুষ্টির নিদর্শন হলো তাঁর ব্যাপারে খুশি ও প্রফুল্ল থাকা।'
• ইবনে তাইমিয়া আল্লাহ তাআলার (মুসা সম্পৃক্ত) বাণী : وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى ('এবং হে আমার পালনকর্তা, আমি তাড়াতাড়ি তোমার কাছে এলাম, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও।' সুরা তহা: ৮৪)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, তাঁর আদেশ পালনে বিলম্ব ও অবহেলা না করা।'
• লুকমান তাঁর পুত্রকে বলেন, 'আমি তোমাকে এমন কতেক বৈশিষ্ট্যের উপদেশ দিচ্ছি, যা তোমাকে খুব দ্রুতই আল্লাহর নৈকট্যশীল ব্যক্তি বানিয়ে দেবে, সাথে সাথে তাঁর ক্রোধ থেকেও বাঁচিয়ে রাখবে। তা হলো, তুমি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, তোমার পছন্দ হোক বা না হোক—সর্বাবস্থায় রবের সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট থাকবে।

রবের সন্তুষ্টি অর্জনের কতিপয় মাধ্যম

১. আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য সর্বদা মুখিয়ে থাকা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা। রাসুলুল্লাহ বলেন: إِنَّ الْعَبْدَ لَيَلْتَمِسُ مَرْضَاةَ اللَّهِ فَلَا يَزَالُ بِذَلِكَ، فَيَقُولُ اللَّهُ لِجِبْرِيلَ: إِنَّ فُلَانًا عَبْدِي يَلْتَمِسُ أَنْ يُرْضِيَنِي أَلَا وَإِنَّ رَحْمَتِي عَلَيْهِ،
'বান্দা তার রবের সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা করতে করতে একসময় আল্লাহ তাআলা জিবরাইলকে বলে দেন যে, "অমুক বান্দা আমার সন্তুষ্টিপানে মুখিয়ে আছে, তাই তাকে আমি আমার দয়ার চাদর নিয়ে ডেকে নিলাম।”' [210]
২. মিসওয়াক করা।
রাসুলুল্লাহ বলেন: السَّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ، مَرْضَاهُ لِلرَّبِّ
'মিসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম। '

৩. পানাহারের পর আলহামদুলিল্লাহ বলা।
রাসুলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الْأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বান্দার ওপর সন্তুষ্ট, যে খাবার খাওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ বলে এবং পানীয় পান করার পর আলহামদুলিল্লাহ বলে।' [212]
৪. পিতার সন্তুষ্টি অর্জন।
রাসুলুল্লাহ বলেন:

رِضَى الرَّبِّ فِي رِضَى الوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
'আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে। তেমনিভাবে তাঁর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত। '

৫. মানুষের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্রতী হওয়া।
রাসুলুল্লাহ বলেন:

مَنِ التَمَسَ رِضَاءَ اللهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ، وَمَنِ التَمَسَ رِضَاءَ النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ
'যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্রতী হয়, আল্লাহ তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। [214]

৬. কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা এই দুআ পাঠ করতেন:
اَللَّهُمَّ اَعُوْذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوْبَتِكَ، وَاَعُوْذُ بِكَ مِنْكَ لَا أُحْصِيْ ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
'হে আল্লাহ, আমি তোমার অসন্তুষ্টি থেকে সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই। তোমার শাস্তি থেকে শান্তি ও স্বস্তির আশ্রয় চাই। আমি তোমার (ক্রোধ) থেকে তোমারই নিকট আশ্রয় কামনা করি। তোমার যথাযথ প্রশংসা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি নিজে তোমার যেরূপ প্রশংসা করেছ, তুমি তেমনই।' [215]
৭. বিপদাপদে আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ عِظَمَ الجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ البَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
'নিশ্চয় বড় প্রতিদান কঠিন বিপদের সাথেই রয়েছে। আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন বিভিন্ন বালা-মুসিবত দিয়ে তাদের পরীক্ষা করেন। সুতরাং যারা এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর যারা এর ওপর অসন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য রয়েছে মহান রবের অসন্তুষ্টি।' [216]
৮. সকাল-সন্ধ্যা প্রতিনিয়ত নিম্নোক্ত দুআ পাঠ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يَقُولُ حِينَ يُصْبِحُ وَحِينَ يُمْسِي ثَلَاثَ مَرَّاتٍ: رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا، إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُرْضِيَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا
'যে মুমিন বান্দা সকাল-সন্ধ্যা তিনবার করে এ দুআটি পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে বিচার দিবসে অবশ্যই সন্তুষ্ট করে দেবেন।' [217] সুবহানাল্লাহ!

৯. পবিত্র বাক্য উচ্চারণ। রাসুলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَتَكَلَّمُ بِالكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ فَيَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ
'তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহর তাআলার সন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে, তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, অথচ আল্লাহ তাআলা তার এ কথার জন্য তাঁর সাথে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত সন্তুষ্টি লিখে দেন।' [218]

১০. আল্লাহর জিকির। রাসুলুল্লাহ বলেন:

أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ أَعْمَالِكُمْ، وَأَزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ، وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ، وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ؟ قَالُوا: بَلَى. قَالَ: ذِكْرُ اللَّهِ تَعَالَى
"আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের অধিক উত্তম কাজ সম্পর্কে জানাব না, যা তোমাদের মালিকের নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের সম্মানের দিক হতে সবচেয়ে উঁচু, সোনা-রুপা দান-সদাকা করার চেয়েও বেশি ভালো এবং তোমাদের শত্রুর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে তোমাদের নিধন করা ও তোমাদেরকে তাদের নিধন করার চেয়েও ভালো?” তারা বললেন, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তা হলো, আল্লাহর তাআলার জিকির।”

১১. তিনিটি বৈশিষ্ট্য: রাসুলুল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا، وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلَاثًا، فَيَرْضَى لَكُمْ: أَنْ تَعْبُدُوهُ، وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ، وَيَكْرَهُ لَكُمْ: قِيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةِ الْمَالِ ‘আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজে সন্তুষ্ট আর তিনটি কাজে অসন্তুষ্ট হন। সন্তোষজনক তিনটি কাজ হচ্ছে, একমাত্র তাঁর ইবাদত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা, তাঁর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হওয়া। পক্ষান্তরে অপছন্দনীয় তিনটি কাজ হচ্ছে, অযথা বকবক করা, অনর্থক প্রশ্ন করা ও সম্পদ বিনষ্ট করা।’
* আল্লাহর সন্তুষ্টির কতিপয় আলামত: কোনো বান্দাকে যখন আল্লাহ তাআলা নিজ আনুগত্যে ব্যবহার করেন, তা রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট সন্তুষ্টিরই নিদর্শন, পক্ষান্তরে যখন কোনো বান্দা অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তা হচ্ছে রবের অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের প্রকৃষ্ট আলামত。
* উবাই বিন কাব বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও চিন্তা-চেতনা নিয়ে সকাল করে, আল্লাহ উক্ত বান্দা থেকে নিজ দায়িত্ব উঠিয়ে নেন।’
* সুতরাং হে প্রিয় ভাই, দয়া করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উক্ত মাধ্যমগুলো গ্রহণ করুন।

টিকাঃ
২০৯. সুরা আল-ফাতহ: ২৯
২১০. মুসনাদু আহমাদ: ২২৪০১
২১১. মুসনাদু আহমাদ: ৭
২১২. সহিহু মুসলিম: ২৭৩৪
২১৩. সুনানুত তিরমিজি: ১৮৯৯
২১৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৪১৪
২১৫. সহিহ মুসলিম: ৪৮৬
২১৬. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৬
২১৭. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৯৬৭
২১৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩১৯
২১৯. সুনানুত তিরমিজি: ৩৩৭৭
২২০. সহিহু মুসলিম: ১৭১৫

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 দৃঢ় বিশ্বাসের বাস্তব স্বরূপ

📄 দৃঢ় বিশ্বাসের বাস্তব স্বরূপ


আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে স্থান পাওয়ার পূর্বে কখনো সে আখিরাতের সর্বোচ্চ সোপানে আরোহণ করতে সফল হবে না। তাই আল্লাহ তাআলা (তাঁর মুত্তাকি বান্দাদের সম্পর্কে) বলেন:

وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ ﴾

'এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের ওপর, যা কিছু আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের ওপর, যা আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।”
• মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :

مَنْ مَاتَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، مُوقِنًا مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ

'যে ব্যক্তি পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ইয়াকিনের সংজ্ঞা

• শাইখ সাদি বলেন, 'ইয়াকিন হচ্ছে ওই পূর্ণ বিশ্বাসের নাম, যেখানে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকবে না। অধিকন্তু তা সৎকর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।'

• ইবনে মাসউদ বলেন, 'ইয়াকিন হলো মানুষ আল্লাহর ক্রোধে সন্তুষ্ট না হওয়া এবং আল্লাহর রিজিকের ওপর কারও মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দান করেননি-সে ব্যাপারে কাউকে তিরস্কার না করা। কেননা, মহান রবের রিজিককে কোনো লোভীর লোভ জোর খাটিয়ে কুক্ষিগত করতে পারে না, কারও অপছন্দও তা রুখতে পারে না। কারণ, মহান রব প্রফুল্লতাকে দৃঢ় বিশ্বাস ও সন্তুষ্টির মাঝেই নিহিত রেখেছেন। আবার দুশ্চিন্তাকে নিহিত রেখেছেন সন্দেহ ও তার ক্রোধের মধ্যে।'

• লুকমান হাকিম স্বীয় পুত্রকে বলেন, 'হে প্রিয় বৎস, পূর্ণ বিশ্বাস ছাড়া কোনো কর্মই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ, মানুষ নিজ বিশ্বাস অনুপাতে সৎকর্ম সম্পাদন করে থাকে। পক্ষান্তরে মানুষের সৎকর্মের পরিমাণ নিজ ইয়াকিন অনুপাতেই সংকুচিত হয়ে থাকে।'

• ইবনে মাসউদ সদা এই দুআটি পাঠ করতেন:

اللهُمَّ زِدْنَا إِيمَانًا، وَيَقِينَا، وَفِقْهَا
'হে আল্লাহ, আমাকে ইমান, ইয়াকিন ও প্রজ্ঞা দান করুন।'

• সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'যদি সত্যিকারার্থে কারও দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে স্থান করে নেয়, তখন তাকে জান্নাতের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী ও জাহান্নাম থেকে পলায়নপর দেখা যায়।'

হাসান বসরি বলেন, 'বিশ্বাসের দুর্বলতা ক্রমান্বয়ে মহান রবের ওপর থেকে আস্থা ও ভরসা হ্রাস করে নিজ ব্যক্তিত্বের ওপর অধিক আস্থাভাজন করে তোলে। অথচ, আল্লাহ তাআলাই সব বান্দার রিজিকের দায়িত্ব নিজ জিম্মায় রেখেছেন। তাই তিনি বলেন:

﴿وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا ﴾

'ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিজ দায়িত্বে রাখেননি। '

প্রকৃত দৃঢ় বিশ্বাসের কতিপয় উপকারী ফলাফল

ইবনে রজব বলেন:

- যে ব্যক্তি বিশ্বাসকে পূর্ণভাবে সত্যায়ন করবে, সে সকল ক্ষেত্রে মহান রবের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারবে।

- তাঁর পরিচালনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে।

- ভয় ও আশার ক্ষেত্রে মাখলুকের সাথে কোনোরূপ সম্পর্ক রাখবে না।

- অসদুপায়ে দুনিয়া কামানো থেকে বিরত থাকবে。

দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন হওয়ার কতিপয় আলামত

জুননুন মিসরি বলেন:

সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন করা এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করা।

মহান রবের আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাঁর পূর্ণ দাসত্ব করা।

তাঁর দেওয়া সব অদৃশ্য সংবাদ তথা জান্নাত-জাহান্নাম, পুলসিরাত ইত্যাদির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা এবং এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করা যে, তিনি বান্দাদের সার্বিক অবস্থার ওপর পূর্ণ অবগত।

ইয়াকিন ও বিশ্বাসের সাক্ষাৎ ফলাফল

বান্দা নির্জনে সর্বদা সম্পূর্ণ বিনয়-নম্র হয়ে থাকে, যেভাবে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে সাধারণ লোক পূর্ণ আদবের সহিত বসে থাকে। স্বীয় রবের প্রতি লজ্জাবোধ, ভয়, বিনয়, নম্রতা, অন্যের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহের মতো বড় বড় বিষয়াবলির ওপর দৃঢ়বিশ্বাসী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

• দৃঢ় বিশ্বাসই সব সৎকর্মের মূলভিত্তি। এটি একটি বৃক্ষের মতো, অনুপম চরিত্র হচ্ছে তার শাখা ও ডালপালা। উত্তম চরিত্র থেকে উৎসারিত আনুগত্য হচ্ছে সেই পুণ্যময় বৃক্ষের ফল।

টিকাঃ
২৯২. সহিহু মুসলিম: ২৭২২
২৯৩. সুরা আল-বাকারা: ৪
২৯৪. আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ১০৯০৭
২৯৫. আস-সুন্নাহ, আবু বকর আল-খাল্লাল: ১১২০
২৯৬. সুরা হুদ: ৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00