📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়াবলি

📄 আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়াবলি


এই পার্থিব জীবনে সবচেয়ে প্রশান্তিদায়ক ও সুন্দরতম বিষয় হচ্ছে, মুমিন বান্দা ওই সব আমলের প্রতি উৎসাহী ও সচেষ্ট হওয়া, যা স্বয়ং আল্লাহ পছন্দ করেন। সুতরাং আল্লাহর পছন্দসই পুণ্যকর্মের বাস্তবায়ন অনুপাতে আল্লাহর ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ আমাদের কল্যাণার্থে পবিত্র কুরআনে এমন কতক গুণের ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন, যা তাঁর কাছে অতি পছন্দনীয়। যেমন তিনি মুত্তাকি (আল্লাহভীরু), মুতাহহির (পবিত্র ব্যক্তি), তাওবাকারী, সাবিরিন (ধৈর্যশীল) ও মুহসিন (অনুকম্পা প্রদর্শনকারী) ব্যক্তিদের ভালোবাসেন।

- হাদিস শরিফেও অনুরূপ এমন কতক কর্ম ও কথার ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন。

আল্লাহ বিজোড় ভালোবাসেন
নবিজি বলেন:
وَإِنَّ اللَّهَ وِتْرُ، يُحِبُّ الْوِتْرَ
'আল্লাহ নিজে বিজোড় এবং তিনি বিজোড়কে ভালোবাসেন। '

- وتر তথা বিজোড়, আল্লাহর ক্ষেত্রে এর মর্ম হচ্ছে, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, যার অংশীদার ও সাদৃশ্য কিছু নেই。
- আর বিজোড়কে ভালোবাসার অর্থ হচ্ছে, পুণ্যকর্ম ও প্রায় সব আনুগত্যের ক্ষেত্রে বিজোড়ের প্রাধান্য দান।
- যেমন আল্লাহ নামাজকে বণ্টন করেছেন পাঁচ ওয়াক্তে。
- তেমনই পবিত্রতাকে তিন তিন বার।
- তাওয়াফ, সায়ি ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ সাতবার করে নির্ধারণ করেছেন।
- আইয়ামে তাশরিক তিন দিন,
- জাকাতে পাঁচ অসাক,
- রুপার মধ্যে পাঁচ ওকিয়া ও উটের নিসাবও অনুরূপ পাঁচ ওকিয়া নির্ধারণ করেছেন।
- এভাবে তাঁর প্রায় বড় বড় সৃষ্টিকুল, ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, সমুদ্র ও সপ্তাহের দিনকে বিজোড়ের তাথ্যিক ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ করেছেন।

আনসার (দ্বীনের সাহায্যকারী)-কে ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: مَنْ أَحَبَّ الْأَنْصَارَ أَحَبَّهُ اللهُ، وَمَنْ أَبْغَضَ الْأَنْصَارَ أَبْغَضَهُ اللَّهُ ‘যে আনসারকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসেন। আর যে আনসারকে অপছন্দ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে অপছন্দ করেন।’

আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ ﴾ “যে আমার অলি বা প্রিয় বান্দার সাথে শত্রুতা করল, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আর বান্দা তার ফরজ ইবাদত দ্বারাই আমার সবচেয়ে বেশি নৈকট্যপ্রাপ্ত হয়। আর বান্দা নফল ইবাদতের দ্বারা আমার এমন নৈকট্যশীলে পরিণত হয়ে যায় যে, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। সুতরাং যাকে আমি ভালোবাসি, আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; তদ্রূপ তার ওই চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে স্পর্শ করে; তার ওই পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে পথ চলে। যদি সে আমার নিকট কোনো বিষয়ে প্রার্থনা করে, আমি তা অবশ্যই দান করি এবং যদি সে আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে আশ্রয় দিই।""

নামাজ শুরু করার দুআ

রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ أَحَبَّ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ : سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرَكَ، وَإِنَّ أَبْغَضَ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الرَّجُلُ لِلرَّجُلِ : اتَّقِ اللَّهَ فَيَقُولُ: عَلَيْكَ نَفْسَكَ
'আল্লাহর কাছে বান্দার বলা সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য হচ্ছে سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ: غَيْرَكَ পক্ষান্তরে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক অপছন্দনীয় বাক্যের অন্যতম হচ্ছে, যখন কেউ অপরকে উপদেশের সুরে বলে যে, “আল্লাহকে ভয় করো।" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "তোমার নিজের চিন্তা করো।"'

• ইবনুল কাইয়িম এই দুআর শাব্দিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে- سُبْحَانَكَ অর্থাৎ আল্লাহ সকল পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র, সব অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত। وَبِحَمْدِكَ অর্থাৎ সব প্রকারের প্রশংসায় প্রশংসিত। অতএব بِحَمْدِكَ প্রশংসা নামক সবক্ষেত্রের পূর্ণতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর তা সব ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে তাঁর পূত-পবিত্র হওয়াকে অবধারিত করে। تَبَارَكَ اسْمُكَ সুতরাং তাঁর নাম স্বল্পতাকে বাড়িয়ে কল্যাণকে অধিক ও বরকতপূর্ণ করে দেয় এবং বিপদের মুহূর্তে উচ্চারিত হলে বিপদ দূরীভূত করে দেয়। যেকোনো শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনায় ব্যবহৃত হলে দুরাচার শয়তানকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেই ছাড়ে।
- যেকোনো নামের পূর্ণতা ও স্বতন্ত্রতা উক্ত নামে বিশেষিত বস্তুর পূর্ণতা ও স্বতন্ত্রতাকেই নির্দেশ করে। সুতরাং যে মহান সত্তার নামের শান ও মান হচ্ছে, তাঁর নামের সাথে উচ্চারিত বস্তুকে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি সাধন করতে পারে না, তাহলে উক্ত নামে বিশেষিত সত্তার শান ও মান কেমন বড় ও উঁচু হবে, তা সহজেই অনুমেয়। وَتَعَالَى جَدُّكَ অর্থাৎ তাঁর বড়ত্ব ও সম্মান অনেক ঊর্ধ্বে। وَلَا إِلَهَ غَيْرَكَ অর্থাৎ আপনি স্বীয় রাজত্ব প্রতিপালন, সব কর্মকাণ্ড ও গুণাবলিতে কারও অংশীদার হওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র। যেমন মুমিন জিন একদা বলল, 'আমাদের রবের শান অনেক ঊর্ধ্বে, তাই তাঁর কোনো স্ত্রীও নেই, সন্তানসন্ততিও নেই।'

তিনটি গুণাবলি

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন:
سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا، قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ، قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: ثُمَّ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“একদা আমি নবিজি -কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি?” তিনি তদুত্তরে বললেন, “সময়মতো নামাজ আদায়।” আমি বললাম, "তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, “পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।” আমি তৃতীয় বার আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, "আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।””

আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জায়গা

আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ مَسَاجِدُهَا، وَأَبْغَضُ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ أَسْوَاقُهَا
'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় জায়গা হচ্ছে মসজিদসমূহ এবং সবচেয়ে অপছন্দনীয় জায়গা হচ্ছে বাজারসমূহ। '

সর্বোত্তম নামাজ ও রোজা

আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الصَّلَاةِ إِلَى اللَّهِ صَلَاةُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، وَأَحَبُّ الصِّيَامِ إِلَى اللهِ صِيَامُ دَاوُدَ، وَكَانَ يَنَامُ نِصْفَ اللَّيْلِ وَيَقُومُ ثُلُثَهُ، وَيَنَامُ سُدُسَهُ، وَيَصُومُ يَوْمًا، وَيُفْطِرُ يَوْمًا
'আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম নামাজ ও রোজা হচ্ছে, দাউদ-এর নামাজ ও রোজা। কেননা, তিনি প্রথম অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন, অতঃপর রাতের এক-তৃতীয়াংশ নামাজে অতিবাহিত করতেন; ষষ্ঠাংশে আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। এবং একদিন রোজা রাখতেন তো আরেকদিন রোজা ছেড়ে দিতেন। '

পুণ্যকর্মের ওপর অটলতা ও অবিচলতা

আয়িশা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا، وَإِنْ قَلَّ
'আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে, যে আমল সর্বদা করা হয়; যদিও তা অল্প হোক। '

সর্বোত্তম দিন

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
مَا مِنْ أَيَّامٍ العَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ العَشْرِ،
'আল্লাহর নিকট জিলহজ মাসের শুরুর এই দশ দিনে সম্পাদিত আমল থেকে অধিক পছন্দনীয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।'

فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟
সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও?'

فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ
রাসুলুল্লাহ বলেন, 'হ্যাঁ। কিন্তু ওই ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজ জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়ে কোনো কিছুই ফেরত আনতে পারেনি। (অর্থাৎ যে ব্যক্তি জিহাদে শহিদ হওয়ার মহাসৌভাগ্য অর্জন করেছে।) '

বিপদে সন্তুষ্টি ও ধৈর্যধারণ

আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ عِظَمَ الجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ البَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرَّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
'নিশ্চয় মহাপ্রতিদান কঠিন বিপদের সাথেই রয়েছে। আর আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদের বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টিও অবধারিত। আর যে ক্রোধান্বিত হয়, তার জন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ অবধারিত। '

আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ

উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ
قَالَتْ عَائِشَةُ أَوْ بَعْضُ أَزْوَاجِهِ: إِنَّا لَنَكْرَهُ المَوْتَ، قَالَ: لَيْسَ ذَاكِ، وَلَكِنَّ المُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ المَوْتُ بُشِّرَ بِرِضْوَانِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ، فَلَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ، فَأَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ، وَإِنَّ الكَافِرَ إِذَا حُضِرَ بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَعُقُوبَتِهِ، فَلَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَهُ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ، كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করেন। আর যে তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করে, আল্লাহও অনুরূপ তার সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।” তখন আয়িশা কিংবা রাসুলুল্লাহ -এর অন্য কোনো স্ত্রী বলে উঠলেন, “আরে আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি।” রাসুলুল্লাহ বলেন, “বিষয়টি এমন নয়। বরং বিষয়টি হচ্ছে, যখন কোনো মুমিনের নিকট মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও স্বীয় রবের কাছে তার মহান মর্যাদার ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদান করা হয়। তখন মুমিন ব্যক্তির সামনে মৃত্যুর সময় আল্লাহর সাক্ষাৎ থেকে পছন্দনীয় অন্য কোনো বিষয় থাকে না। সুতরাং সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। পক্ষান্তরে যখন কোনো কাফিরের নিকট মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন তাকে আল্লাহর আজাব ও তার ভয়াবহ পরিণামের দুঃসংবাদ প্রদান করা হয়। তখন তার কাছে মৃত্যুর চেয়ে অপছন্দনীয় অন্য কোনো বিষয় থাকে না। সুতরাং সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে অপছন্দ ও অনীহা প্রকাশ করে, ফলশ্রুতিতে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাতে অনীহা প্রকাশ করেন।""

সুরা ইখলাসের ফজিলত

আনাস থেকে বর্ণিত :

أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُحِبُّ هَذِهِ السُّورَةَ: قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ. فَقَالَ: إِنَّ حُبَّكَ إِيَّاهَا يُدْخِلُكَ الجَنَّةَ
'একদা একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই সুরাকে (সুরা ইখলাস) ভালোবাসি।” তখন রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন, "এই সুরার ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।””

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় বাক্য

সামুরা বিন জুনদুব থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:

أَفْضَلُ الْكَلَامِ أَرْبَعُ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لَا يَضُرُّكَ بِأَيِّهِنَّ بَدَأْتَ
'সর্বোকৃষ্ট বাক্য হলো চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। যে বাক্য দিয়েই শুরু করো না কেন, কোনো অসুবিধা নেই। '

অপর এক বর্ণনায় এসেছে:

أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَرْبَعُ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا الله، وَاللَّهُ أَكْبَرُ. لَا يَضُرُّكَ بِأَيِّهِنَّ بَدَأْتَ

'আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। যে বাক্য দিয়েই শুরু করো না কেন, কোনো ক্ষতি নেই। '

আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় পদচিহ্ন

বারা বিন আজিব বলেন, রাসুলুল্লাহ বলতেন:

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الَّذِينَ يَلُونَ الصُّفُوفَ الْأَوَلَ، وَمَا مِنْ خُطْوَةٍ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ خُطْوَةٍ يَمْشِيهَا يَصِلُ بِهَا صَفًّا
'আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ দুআ করতে থাকেন ওই সব লোকের জন্য, যারা প্রথম কাতারের দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহর নিকট ওই পদক্ষেপের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় পদক্ষেপ আর কোনোটি নেই, যা মানুষেরা কাতারবদ্ধ হওয়ার জন্য করে থাকে। '

দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্ন

রাসুলুল্লাহ বলেন:

لَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ قَطْرَتَيْنِ وَأَثَرَيْنِ، قَطْرَةٌ مِنْ دُمُوعِ فِي خَشْيَةِ اللَّهِ، وَقَطْرَةٌ دَم تُهَرَاقُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَأَمَّا الْأَثَرَانِ: فَأَثَرُ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَأَثَرُ فِي فَرِيضَةٍ مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ
'আল্লাহর নিকট দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্ন থেকে অধিক পছন্দনীয় আর কিছু নেই। ফোঁটাদুটি হলো, আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুর ফোঁটা ও আল্লাহর রাস্তায় প্রবাহিত রক্তের ফোঁটা। আর চিহ্নদুটি হলো, আল্লাহর রাস্তায় প্রাপ্ত আঘাতের চিহ্ন ও ফরজ ইবাদত আদায়ে প্রাপ্ত চিহ্ন। '

আল্লাহর গুণকীর্তন করা

রাসূলুল্লাহ বলেন:

لَيْسَ أَحَدٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ مَدَحَ نَفْسَهُ، وَلَيْسَ أَحَدٌ أَغْيَرَ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ
‘আল্লাহর চেয়ে অধিক প্রশংসা পছন্দকারী সত্তা আর কেউ নেই। এ জন্যই তো স্বয়ং আল্লাহ নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন। এবং আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদাশীল আর কোনো সত্তা নেই। তাই তো তিনি সব অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন।’

- আপনি দিনে রাতে কতবার আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা করেন?
- আপনি কি এখনও অবগত হননি যে, আল্লাহর প্রশংসার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ এই বাক্যগুলো পাঠ করা।

ক্রয়-বিক্রয়ে উদারতা

রাসূলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ سَمْحَ البَيْعِ، سَمْحَ الشَّرَاءِ، سَمْحَ القَضَاءِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় ও বিচারের ক্ষেত্রে উদারতা ও সহনশীলতা পছন্দ করেন।’

উঁচু মাপের কাজ

রাসূলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ كَرِيمُ يُحِبُّ الْكَرَمَ وَيُحِبُّ مَعَالِي الْأَخْلَاقِ وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا

'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দানশীল, তিনি উদারতা ও উঁচু মাপের কর্মকাণ্ড পছন্দ করেন। এবং নীচু ও তুচ্ছ কর্মকাণ্ডকে অপছন্দ করেন।'

আমলের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও অবিচলতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ إِذَا عَمِلَ أَحَدُكُمْ عَمَلًا أَنْ يُثْقِنَهُ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের দৃঢ়তা ও অবিচলতাপূর্ণ আমল অধিক ভালোবাসেন।'

আল্লাহর নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর নিয়ামতের নিদর্শন দেখতে পছন্দ করেন।'

হাঁচি দেওয়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ العُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّتَاؤُبَ، فَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وَحَمِدَ اللهَ، كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ، وَأَمَّا التَّشَاؤُبُ: فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ، فَإِنَّ أَحَدُكُمْ إِذَا تَثَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ
'আল্লাহ তাআলা হাঁচি দেওয়াকে পছন্দ করেন এবং হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের কেউ হাঁচি দেওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ বললে, প্রত্যেক মুসলিম শ্রোতাদের ওপর উক্ত প্রশংসার জবাবে (يَرْحَمُكَ اللهُ) ইয়ারহামুকাল্লাহ) বলা আবশ্যক। আর হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে এসে থাকে। সুতরাং তোমাদের কারও যদি হাই তোলা এসেও যায়, সে যেন সামর্থ্যানুযায়ী তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কেননা, যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে, তখন শয়তান হেসে দেয়।'

অপর বর্ণনায় এসেছে :
فَإِذَا قَالَ: هَا، ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ

'তোমাদের কেউ যখন হাই বলে শব্দ করে, তখন শয়তান হেসে দেয়।'

গোপনে নিভৃতচারী আল্লাহভীরু বান্দা

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও নিভৃতে থাকা বান্দাকে ভালোবাসেন।'

সব বিষয়ে নম্রতা প্রদর্শন

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে নম্রতা পছন্দ করেন।'

সব বিষয়ে সৌন্দর্যতা
রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ، قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
“যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, “হে আল্লাহর রাসুল, মানুষ তো নিজের জামাকাপড় ও জুতোর সৌন্দর্যকে পছন্দ করে।” তখন তিনি বললেন, “(এতে সমস্যা নেই। কেননা,) আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। আর অহংকার হচ্ছে হককে প্রত্যাখ্যান ও মানুষকে অবজ্ঞা করা।”

– সুতরাং আল্লাহ স্বীয় সত্তাগত ও গুণগতভাবে সকল কাজে সুন্দর।
– তিনি বান্দার অন্তর, জবান, কাজকর্ম, বাহ্যিক-অভ্যন্তরীণ, আখলাক— এসব কিছুতে সৌন্দর্য পছন্দ করেন。

টিকাঃ
৭৭. সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭
৭৮. আস-সুনানুল কুবরা, সুনানুন নাসায়ি : ৮২৭৪
৭৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২
৮০. আস-সুনানুল কুবরা, সুনানুন নাসায়ি: ১০৬১৯
৮১. সহিহুল বুখারি: ৫২৭
৮২. সহিহু মুসলিম: ৬৭১
৮৩. সহিহুল বুখারি: ১১৩১
৮৪. সহিহুল বুখারি: ৬৪৬৫
৮৫. সহিহুল বুখারি: ৯৬৯
৮৬. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৬
৮৭. সহিহুল বুখারি: ৬৫০৭
৮৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৯০১
৮৯. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৯৮৬৯
৯০. সহিহু মুসলিম: ২৩৩৭
৯১. সুনানু আবি দাউদ: ৫৪৩
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ১৬৬৯
৯৩. সহিহ মুসলিম: ২৭৬০
৯৪. সুনানুত তিরমিজি: ১৩১৯
৯৫. মুস্তাদরাকুল হাকিম: ১৫১
৯৬. মুসনাদু আবি ইয়ালা: ৪৩৮৬
৯৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৮১৯
৯৮. সহিহুল বুখারি : ৬২২৬
৯৯. সহিহুল বুখারি : ৬২২৩
১০০. সহিহু মুসলিম : ২৯৬৫
১০১. সহিহু মুসলিম : ২১৬৫
১০২. সহিহু মুসলিম: ৯১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 বান্দার ওপর আল্লাহর হক

📄 বান্দার ওপর আল্লাহর হক


আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿ وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ ﴾

‘আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে আপন পালনকর্তার নিকট তা তার জন্য উত্তম।’

• শাইখ সাদি আয়াতাংশ حُرُمَاتِ اللهِ এর ব্যাখ্যায় বলেন, حُرُمَاتِ الله তথা আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন বলতে প্রত্যেক ওই বস্তুকে বোঝায়, যার মাঝে কোনো না কোনোভাবে মহত্ত্ব, সম্মান ও বিশেষত্ব নিহিত রয়েছে। এবং উহার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। চাই তা উপাসনা বা অন্য যেকোনো উপায়েই হোক না কেন। যেমন হজ ও কুরবানি-সম্পর্কিত সকল বিষয়। উদাহরণস্বরূপ হারাম শরিফে ইহরাম বাঁধা ও কুরবানি করার নিমিত্তে আল্লাহর রাহে উৎসর্গিত জন্তু।
তেমনিভাবে অন্যান্য ওই সব ইবাদত, যা তিনি ওই সময় সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান বলতে এটির মহত্ত্ব, প্রেম অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ এবং হৃদয় দিয়ে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করা; সর্বোপরি কোনো রকমের অলসতা, অবজ্ঞা ও অবহেলা ছাড়া ওই সব স্পটে উপাসনাকে পূর্ণরূপ দেওয়া।

• রাসুলুল্লাহ মুআজ-কে বললেন:
يَا مُعَادُ، هَلْ تَدْرِي حَقَّ اللهِ عَلَى عِبَادِهِ، وَمَا حَقُّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ؟ قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَحَقَّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا أُبَشِّرُ بِهِ النَّاسَ؟ قَالَ: لَا تُبَشِّرْهُمْ، فَيَتَّكِلُوا
“হে মুআজ, তুমি কি জানো, বান্দার ওপর আল্লাহর কী হক? এবং আল্লাহর ওপর বান্দার কী হক?” মুআজ বলেন, “আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন?” তিনি বললেন, “বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে, তাঁর উপাসনা করা ও কারও সাথে তাঁকে অংশীদার সাব্যস্ত না করা। এবং আল্লাহর ওপর বান্দার হক হচ্ছে, (এখানে তাঁর পক্ষ থেকে উক্ত মহাপ্রতিদানের অকাট্যতা বোঝাতে 'হক' তার রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে) যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে না, তাকে শাস্তি না দেওয়া।”

• সফলতা-প্রত্যাশী মুমিন ব্যক্তির ওপর সবচেয়ে বড় হক হলো আল্লাহর হক। এই বিষয়টি মুমিন ব্যক্তিমাত্রই সার্বক্ষণিক তার মনস্পটে লালন করে থাকে এবং সে কখনো তাঁর হক ও অধিকারের ওপর অন্য কোনো পার্থিব-অপার্থিব অধিকারকে প্রাধান্য দেয় না। মুমিন বান্দাকে যদিও সচরাচর ক্ষণিকের এই পৃথিবীতে অন্য দশ জনের ন্যায় নড়াছড়া করতে দেখা যায়, কিন্তু সে সার্বক্ষণিক আপন প্রতিপালকের হকের ব্যাপারে চিন্তামগ্ন থাকে। কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক আল্লাহর দরবারে বিগলিত বদনে, অশ্রুসজল নয়নে কান্নাকাটি করে তাওবার মাধ্যমে ত্রুটির ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করে না। মোটকথা আমাদের ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে, তাঁর আনুগত্য পালন ও সর্বদা শয়নে-স্বপনে তাঁকে স্মরণ করা; তাঁর নাফরমানি ও অবাধ্যতা পরিহার করা। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, কখনো অকৃতজ্ঞ না হওয়া—তাঁর হকের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতনতার কার্যকর ফলাফল।

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আত্মিক উন্নতির মাধ্যম হলো আল্লাহর হকের ব্যাপারে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি থাকা। উক্ত হকের ব্যাপারে সচেতনতার দরুন নিম্নোক্ত সুদূরপ্রসারী কতক শুভ পরিণাম বয়ে আনে।

১. নিজের দীনতা, হীনতা ও অসহায়ত্বের উপলব্ধির বীজ বপন করে।
২. যার ফলে লোকদেখানো ও আত্মপ্রশংসা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়।
৩. আপন প্রতিপালকের সহিত বিনয়, নম্রতা ও সত্যিকারের দাসত্বের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
৪. আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা লাভে ধন্য হয়। যা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব।
৫. সর্বোপরি তার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়ে নেন। কেননা, যার কাজের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ না নেবে, সে অবশ্যই ধ্বংস হবে।'

• আল্লাহ ও নিজ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতার চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে, আল্লাহর অধিকারের ওপর নিজ অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তার ওপর আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে মোটেও ভ্রুক্ষেপ না করা।

• ইমাম আহমাদের সাড়া জাগানো প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'কিতাবুজ জুহদ'-এ বর্ণিত আছে বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি তার একটি প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে একাধারে ষাট বছর আল্লাহর উপাসনা ও প্রার্থনায় রত ছিলেন। অথচ, এতকাল পরও তার প্রয়োজনটা মিটেনি এবং তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
অতঃপর সে মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বলল, আল্লাহর কসম, তোমার মধ্যে যদি কোনো কল্যাণ থাকত; তাহলে অবশ্যই তুমি উদ্দেশ্যে সফল হতে, অর্থাৎ তোমার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যেত। অতঃপর স্বপ্নে এসে তাকে কেউ বলতে লাগল, তোমার অন্তরের এই ক্ষণিকের দীনতা, হীনতার মূল্য কতটুকু, তা কি তুমি কখনো ভেবে দেখেছ। নিশ্চয় ক্ষণিকের এই বিনয়টুকু বিগত ষাট বছর উপাসনার চেয়েও অধিক মূল্যবান। (সুবহানাল্লাহ)

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'ছয়টি বিষয়ে আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর হক রয়েছে।
১. আমলের মধ্যে নিষ্ঠা, নিষ্কলুষতা ও একনিষ্ঠতা。
২. আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুখ্য উদ্দেশ্য থাকা।
৩. আমলের ক্ষেত্রে রাসুল-এর পূর্ণ আনুগত্য করা।
৪. আমলকে ইহসানের স্তরদ্বয়ের যেকোনো এক স্তরে উন্নীত করা। (স্তরদ্বয় ১. এমনভাবে উপাসনা করা, যেন আল্লাহ স্বয়ং আপনার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। ২. এমনভাবে আমল করা যে, আপনি আল্লাহকে না দেখলেও আল্লাহ তাআলা কিন্তু আপনাকে দেখছেন।)
৫. আল্লাহর দয়া ও করুণার অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখা।
৬. সর্বোপরি নিজ ত্রুটির ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকা।'

আনুগত্যের বাস্তব স্বরূপ

ইবনুল জাওজি বলেন, 'আনুগত্য শুধু নামাজ, রোজার বাহ্যিক ডেকোরেশনের নাম নয়, যেমনটি সাধারণত নির্বোধ ব্যক্তিরা মনে করে থাকে; কেননা, আনুগত্যের মর্মই হচ্ছে, আল্লাহর আদেশাবলি বাস্তবায়ন এবং তাঁর নিষেধাবলি থেকে নিবৃত্তির সাথে বাস্তবিকভাবে একাত্ম হয়ে যাওয়া।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'

• আবু বকর জাজায়িরি এই আয়াতে কারিমার ব্যাখ্যায় বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের নির্দেশসুলভ ভঙ্গিতে ইসলামে এমন সামষ্টিকভাবে প্রবেশের আহ্বান করছেন যে, তারা যেন ধর্মের বিধিবিধানে নিজেরা অনধিকার চর্চার প্রয়াস না নেয়। অর্থাৎ এমন যেন না হয়, যা নিজের খেয়াল-খুশিমতো হবে, তা গ্রহণ ও পালন করবে; আর যা তাদের প্রবৃত্তির সাথে খাপ খাবে না, তা অবহেলা ও অমান্যতার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। কেননা, তাদের ওপর ইসলামের সব বিধিবিধান পালন ও গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। যাতে কারও জন্য একবিন্দু পরিমাণও ছাড় নেই।'

• প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনি কি জানেন? ইসলাম অর্থ সব বিষয়ে আল্লাহর অকুণ্ঠ আনুগত্য করা, তো এরপরও কীভাবে ইসলামকে শুধু নামাজ ও রোজার বাহ্যিক আবরণে আচ্ছাদিত মনে করেন এবং নাজাতের জন্য শুধু উক্ত ইবাদতদ্বয়কেই যথেষ্ট জ্ঞান করেন? বরং ইসলাম মানে সব নির্দেশনা জীবনে বাস্তবায়ন (যেমন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, বাবা-মায়ের প্রতি সর্বদা সদয় থাকা, সত্য কথা বলা, আমানতের খিয়ানত না করা প্রভৃতি) এবং সব নিষেধ থেকে বিরত থাকা (যেমন: সুদ, জিনা-ব্যভিচার, মিথ্যা, ধোঁকা-প্রতারণা, পরনিন্দা, গালিগালাজ প্রভৃতি)।

টিকাঃ
৫৮. সুরা আল-হজ: ৩০
৫৯. সহিহুল বুখারি: ২৮৫৬
৬০. সুরা আল-বাকারা: ২০৮

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 হে চিরঞ্জীব, হে অবিনশ্বর সত্তা!

📄 হে চিরঞ্জীব, হে অবিনশ্বর সত্তা!


يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ ﴾
'হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের অসিলায় আমি আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দিন এবং আমাকে আমার নফসের সমীপে চোখের পলকের জন্যও সোপর্দ করবেন না।

রাসুল সকাল-সন্ধ্যা এই দুআ পড়তে বলতেন। কেননা, আল্লাহ ও তাঁর সাহায্য, সংরক্ষণ থেকে কোনো মুসলিম এক মুহূর্তও অমুখাপেক্ষী বা বেপরোয়া হতে পারে না।

أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ এই বাক্যে ক্ষণিক ভাবুন! (كل) শব্দটি ওই শব্দসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা ব্যাপকতা অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাই এই মূল্যবান দুআটি আবৃত্তির সময় আপনি নিম্নোক্ত মর্মগুলোর প্রতি লক্ষ রাখুন।

১. তাঁর আদেশ পালন এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকার ওপর দৃঢ়তা অর্জনের মাধ্যমে যেন তিনি তাঁর সাথে আপনার সম্পর্কের উন্নতি সাধন করেন।
২. আত্মশুদ্ধি, সংশোধনের মাধ্যমে কুমন্ত্রণাদায়ক নফসের সাথে আপনার যেন সমঝোতা হয়ে যায়।
৩. সব ধরনের মানুষ তথা আপনার বাবা-মা, স্ত্রী-পুত্র, আপনার দাস-দাসী, আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধু সবার সাথে আপনার সম্পর্ক যেন সংশোধিত হয়ে যায়, সব অধিকার আদায়ের মাধ্যমে ও অন্যায় অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে।

• এভাবে আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রকাশ্যে, গোপনে সুখে-দুঃখে, অবস্থার পট পরিবর্তনে—সবক্ষেত্রে সংশোধনের প্রার্থনা করা উচিত।
• সুতরাং একজন মুসলিম হিসেবে প্রত্যেকেরই প্রতিটি অবস্থায় এই দুআকে বারবার আবৃত্তি করা উচিত। কেননা, এতে রয়েছে সকল সমস্যার সমাধান, যা মুসলিম ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে সম্মুখীন হয়—চাই সমস্যাটা সামাজিক, আর্থিক, ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো সমস্যা হোক না কেন।

- কিন্তু একটি বিষয় খুব খেয়াল রাখা চাই যে, মুমিনের প্রত্যেক প্রার্থনায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা, দৃঢ় বিশ্বাস ও ভরসা থাকতে হবে। কেননা, তার প্রতিপালক স্বীয় দাসকে কখনো নিরাশ ও বঞ্চিত করেন না, যদি দুআকামী সত্যিকারার্থে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস তাঁর ওপর রাখতে সক্ষম হয়। তিনি এমন এক পবিত্র সত্তা, যাঁকে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের কোনো বস্তুই অক্ষম করতে পারে না। এবং তিনি মহাজ্ঞানী ও সর্বশ্রোতা। তিনি তাঁর কাছে সত্যিকারার্থে আশ্রিত ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও বঞ্চিত করা থেকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র。

টিকাঃ
৫৭. মুস্তাদরাকুল হাকিম : ২০০০

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে

📄 আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে


অত্যন্ত পরিতাপের একটি বিষয় হচ্ছে :

• কতক লোককে দেখা যায় যে, তারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি উৎসাহী ও ধাবিত হওয়ার চেয়ে নগণ্য সৃষ্টিকুলের প্রতি অধিক আগ্রহী ও ধাবমান।
• তারা সৃষ্টিকর্তার দিকে নিবিষ্ট হওয়ার চেয়ে মানুষের প্রতিই অধিক নিবিষ্ট ও অনুরাগী।
• আর কতক লোক আছে, তারা আল্লাহর আওতাধীন বিষয়ের চেয়ে মানুষের আওতাধীন মেকি বিষয়ের প্রতি সর্বাধিক লোলুপ-লোভাতুর হয়ে থাকে। মানুষের কাছেই তারা হাত পাতে।
• তারা মানুষের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আড্ডা দিতে থাকে। কিন্তু আপন সৃষ্টিকর্তার সাথে একটুখানি সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনটুকুও অনুভব করে না, এমনকি তাঁর আনুগত্য কিংবা তাঁর কালামে মাজিদ পাঠকালে পর্যন্ত বিরক্তিবোধ করে। অথচ, তিনিই তাদের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা।
• আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তির চেয়েও মানুষের ক্ষমতা ও শক্তির ওপর তারা অধিক নির্ভরশীল ও আস্থা রেখে থাকে!
• মানুষের জন্য তারা সব ধরনের কষ্ট-ক্লেশ ও ভোগান্তি পোহাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ, আপন প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য সামান্য কষ্ট স্বীকার করতে হাজারো টালবাহানা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আদৌ কোনো কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকার করতেই তারা প্রস্তুত নয়。
• কেউ আছে, মানুষের অন্তরে নিজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সর্বদা তৎপর ও অতি উৎসাহী থাকে। অথচ, আপন সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কোনো চেষ্টা তো করেই না; বরং এ ব্যাপারে সে কোনো তোয়াক্কাই করে না。
• আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক দৃঢ়করণের চেয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে অধিক ব্যস্ত তারা, যেমন নামাজের প্রতি তাদের কোনো ভ্রক্ষেপ নেই; অথচ, নামাজ হচ্ছে বান্দা ও রবের মাঝে সেতুবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম।
• আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগ্রহী ও উৎসাহী হওয়ার চেয়ে সৃষ্টিকুলের সন্তুষ্টি অর্জনে সে অধিক আগ্রহী ও অতি উৎসাহী।
হে আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনার অন্তর থেকে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জিজ্ঞেস করুন, যেন আপনি আপনার বাস্তব মর্যাদা ও সম্মান এবং আপনার কাছে ইমানের গুরুত্ব কতটুকু আর আপনি কোথায় মজে আছেন—এসব ব্যাপারে সম্যক অবগত হতে পারেন।

আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব, সুমহান মর্যাদা, তাঁর ভালোবাসা ও ভীতি কি আপনার হৃদয়কে জয় করতে এবং আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে? আপনার চিন্তা-চেতনা, সর্বোপরি আপনার সর্বাধিক প্রিয় বস্তু, প্রাণ ইত্যাদি কি নিরবচ্ছিন্নভাবে মহান রবের দিকেই ধাবমান ও মনোযোগী?

আপনার অন্তর কি তিনি ব্যতীত অন্যত্র ঝুঁকে? চাই ভালোবাসা, সম্মান কিংবা বিনয়, নম্রতা—যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন।

• সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'তোমার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ সবকিছুই আল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলো।'

সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট আগ্রহ ও উদ্দীপনা

মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'সবচেয়ে জঘন্য লিপ্সা হচ্ছে, পরকালের আমল দ্বারা দুনিয়া কামাই করা।'
• সুতরাং সাবধান! সতর্ক হোন! আপনি নিজেকে কত সম্মানি মনে করেন, অথচ আল্লাহর কাছে কত তুচ্ছ ও নিন্দনীয় আপনি। নিজেকে আপনি কত কল্যাণের আধার মনে করেন, অথচ বাস্তবতা এর বিপরীত। আপনি নিজেকে অনেক বড় জ্ঞানী ভেবে থাকেন, অথচ আপনার ভেতরে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার শূন্যতা ছাড়া অন্য কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না।

• আপনি নিজ আত্মাকে কোনো ধরনের ফাঁকফোকর ছাড়া সরাসরি প্রশ্ন করুন, আপনার অন্তর কি মহান আল্লাহকে প্রাধান্য দেয়? আপনার অন্তর কি তাঁকে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী মনে করে? না আপনার কাছে দুনিয়াই সবকিছু এবং এর স্বার্থ সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে?

সুতরাং আপনি যদি তুচ্ছ পার্থিব বিষয়কে আল্লাহর আদেশের ওপর প্রাধান্য দেন, আল্লাহর আনুগত্য বাদ দিয়ে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এর স্বার্থেই যদি অবাধ্যতা করেন- যেমন : মুআজ্জিন আজান দিচ্ছে, অথচ আপনি আপনার কাজেই ব্যস্ত, এর প্রতি আপনার বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই; সর্বোপরি হারামকে হালালের ওপর প্রাধান্য দেন-তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন, আপনার অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর চেয়ে দুনিয়া ও তার তুচ্ছ স্বার্থ অনেক বড়। (নাউজুবিল্লাহ)।

সোনার ফ্রেমে বেঁধে রাখার মতো একটি মূল্যবান উপদেশ

ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি আগ্রহ, তাঁর সন্তুষ্টি ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য গভীর উদ্দীপনা প্রভৃতি মূলত কোনো বান্দার মূল সম্পদ ও সকল সাফল্যের চাবিকাঠি। পবিত্র জীবনের মূল উপকরণ এবং তার সৌভাগ্য, সফলতা, নিয়ামত ও চক্ষুশীতলতার মূল উৎস। কেননা, এ জন্য তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এ জন্য নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং নাজিল করেছেন আসমানি কিতাব।’

অতএব আল্লাহর প্রতি অধিক আগ্রহী ও উৎসাহী হওয়া ব্যতীত আত্মিক পরিশুদ্ধি ও প্রশান্তি অর্জন কিছুতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ - وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ )

‘অতএব, যখন অবসর পান পরিশ্রম করুন। এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।’

আল্লাহর যথাযথ পরিচয় লাভের সুদূরপ্রসারী যুগান্তকারী ফলাফল

ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘যে আল্লাহর যথাযথ পরিচয় লাভে ধন্য হয়েছে—

- তার জীবন হবে নির্মলতা ও আত্মিক প্রশান্তিতে আচ্ছাদিত এবং পবিত্রতার চাদরে আবৃত।

- তার একটি ব্যক্তিত্ব অর্জিত হবে এবং তার অন্তর থেকে সৃষ্টিকুলের ভয় দূর হয়ে যাবে।

- রবের সাথে তার সম্পর্কে উন্নতি হবে, অপরদিকে মানুষের সাথে সম্পর্ক ক্রমশ হ্রাস পাবে।

- আপন প্রতিপালকের সামনেই সে শুধু লজ্জিত হবে এবং তাঁকেই বড় জ্ঞান করবে এবং সর্বদা অন্তরে জাগরূক রাখবে তাঁরই ধ্যান-খেয়াল।

- বস্তুত, সে আল্লাহকেই সত্যিকারার্থে ভালোবাসবে, তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে এবং তাঁকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। সব বিষয় তাঁর সন্তুষ্টির ওপর ন্যস্ত করবে।’

আগ্রহ দুপ্রকার

১. আল্লাহর দিদার, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও একান্ত আলাপ এবং তাঁর দিকেই সর্বদা দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকার আগ্রহ ও উৎসাহ।

২. জান্নাত ও তার অভ্যন্তরের অনন্তকালের নিয়ামতরাজি এবং উভয় জগতের কামিয়াবি লাভের আগ্রহ।

টিকাঃ
১২৩. সুরা আল-ইনশিরাহ: ৭-৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00