📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের উপায়

📄 আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের উপায়


একটি অভিনব ও প্রচণ্ড রকমের তাজ্জবের বিষয় হচ্ছে, কতক লোককে দেখা যায়, তারা সর্বোচ্চ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নিজেকে বড় লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে এবং নিজের সর্বস্ব ঢেলে দিয়ে হলেও এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর নগণ্য কোনো প্রেসিডেন্টের একটুখানি ভালোবাসা ও করুণা লাভে ধন্য হতে চায়। এমনকি সে এমন কিছু বিষয় পর্যন্ত অবলম্বন করে, যা করা তো দূরের কথা, মুখে আনা পর্যন্ত সভ্য লোকের কাজ নয়। সর্বোপরি প্রেসিডেন্ট বা বাদশার ধ্বংস ও তার রাজত্ব ক্ষণস্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও উক্ত ব্যক্তি চূড়ান্ত কষ্ট ও বিনয়-নম্রতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জনে সর্বোচ্চ কসরত করে যায়। পক্ষান্তরে এই দুনিয়ালোভী ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করা তো দূরের কথা, সামান্যতম উৎসাহ ও আগ্রহের প্রয়োজনও বোধ করে না। অথচ তিনি এমন সত্তা, যাঁর অনুগ্রহেই সবাই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে সফল হয়। বরং কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নতির কোনো সিঁড়িও অতিক্রম করতে সক্ষম হয় না, যতক্ষণ না তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর ভালোবাসা হয় এবং উক্ত মহানিয়ামতে ধন্য হওয়ার জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু প্রাণটাকে আল্লাহর রাস্তায় বিলীন করে দিতে কুণ্ঠাবোধ না করে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ ﴾
'তিনি (আল্লাহ) তাদের ভালোবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালোবাসে। '

দাসত্বের বাস্তব স্বরূপ

পূর্ণ বিনয়সহ খুঁতবিহীন ভালোবাসা এবং প্রেমাস্পদের জন্য নম্রতা অবলম্বন করা।

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টিকারী কতিপয় উপায়-উপকরণ

ইবনুল কাইয়িম কতিপয় উপায় উল্লেখ করেছেন, যা অন্তরে মহান প্রতিপালকের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। যথা:
১. পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও এর মর্ম অনুধাবন।
২. অত্যাবশ্যকীয় ফরজ বিধানাবলি আদায়ের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা।
৩. সর্বদা অন্তর ও জবান দ্বারা, কর্ম ও অবস্থার মাধ্যমে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা। কেননা, বান্দা তাঁর জিকির অনুযায়ী অনুপাতিক হারে তাঁর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়。

• জনৈক সালাফ বলেছেন:
'আল্লাহর ভালোবাসার আলামত হলো অধিক হারে তাঁর জিকির করা। কেননা, যার ভালোবাসা যত বেশি হয়, তার আলোচনার আধিক্যও তত বেশি হয়ে থাকে।'

• উবাই বিন কাব বলেন, 'যে আল্লাহকে অধিক হারে স্মরণ করে, সে নিফাকের পঙ্কিলতা থেকে পূত-পবিত্র। কেননা, ধূর্ত মুনাফিকরা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।'

৪. প্রবৃত্তি প্রকট ধারণের মুহূর্তে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টিকে নিজের ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা ও পছন্দের ওপর প্রাধান্য দেওয়া।

৫. আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে অন্তরে গভীর অনুধাবন।

৬. আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পা এবং তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ামতরাজির প্রত্যক্ষ দর্শন।

৭. আল্লাহর সমীপে হৃদয়কে পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়া।

৮. প্রকৃত আল্লাহ-প্রেমিকদের সাহচর্য গ্রহণ এবং তাদের মুক্তোদানার মতো পবিত্র বাণীগুলো কুড়িয়ে নেওয়া।

৯. আল্লাহ ও হৃদয়ের মাঝে প্রাচীর সৃষ্টিকারী উপকরণ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা।

১০. আল্লাহর স্মরণে কিছুক্ষণ নির্জনে সময় কাটানো, বিশেষভাবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও তাঁর সাথে একান্ত আলাপের সময় এবং তাঁর সামনে দাসত্বের বিনয়ী ভাব অবলম্বনের সময়। সুতরাং উল্লিখিত উপকরণগুলো অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ-প্রেমিকরা তাঁর ভালোবাসার সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন হবে, ধন্য হবে প্রেমাস্পদের সাক্ষাতে।

প্রজ্ঞাবাণী

ইবনে কুদামা বলেন, 'যদি মানুষ সবকিছুর পরিচয় লাভ সত্ত্বেও আল্লাহর পরিচয় লাভে ব্যর্থ হয়, তার যেন কোনো কিছুর সাথেই পরিচয় হয়নি। আর পরিচয়ের অন্যতম চিহ্ন হলো ভালোবাসা। সুতরাং যে তার রবকে সত্যিকারার্থে চেনে, সে তাঁকে ভালোবাসে। আর ভালোবাসার অন্যতম চিহ্ন হলো, কোনো প্রিয় বস্তুকে প্রেমাস্পদের ওপর প্রাধান্য না দেওয়া। যদি কেউ এমন প্রাধান্য দেয়, তার অন্তর অবশ্যই রোগাক্রান্ত।'

• আবু বকর সিদ্দিক বলেন, 'হে আল্লাহ, আপনার সাথে সাক্ষাতের শুভ দিনটিকে আমার খুশির দিন বানিয়ে দিন (আপনার সন্তুষ্টির ফলে)।'

টিকাঃ
৭৪. সুরা আল-মায়িদা: ৫৪

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 প্রকৃত প্রেম

📄 প্রকৃত প্রেম


আল্লাহর রাহে উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তির উত্তম গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল্লাহর জন্যই সত্যিকারের ভালোবাসা, যা প্রেমিকদের হৃদয়ে তার প্রেমাস্পদের সাথে সাক্ষাতের জন্য আকুলতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত করে। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসার কতেক স্পষ্ট নিদর্শন কিংবা নমুনা রয়েছে, যার আলোচনা নিম্নরূপ:
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'ভালোবাসার নিদর্শন হচ্ছে, মনটা সর্বদা আল্লাহকে পাওয়ার আশায় অধীর হয়ে থাকা। যদিও প্রেমিক ব্যক্তি বাহ্যিক দৃষ্টিতে যত ব্যতিব্যস্তই হোক না কেন। আর এই মহানিদর্শনটি চার জায়গায় প্রকাশ পায়。
• প্রথম স্পট
ঘুমানোর সময়। কেননা, পঞ্চইন্দ্রীয় ও অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যেকটি বাহ্যিক ব্যস্ততা থেকে তখন সম্পূর্ণ অবসর থাকে, তখন প্রেমাস্পদের ছবি অজান্তেই মনস্পটে ভেসে ওঠে। তাই সে তার প্রেমাস্পদের আলোচনা ছাড়া কোনোভাবেই ঘুমাতে পারে না।

সতর্কতা: সাবধান! যুবকেরা সাবধান! কেউ যেন ঘুমানোর সময় তার মহান রবের স্মরণ বাদ দিয়ে অহেতুক গল্পগুজব ও অশ্লীল বাজনাতে বুঁদ হয়ে না থাকে。

• দ্বিতীয় স্পট
ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সময়। তখন অন্তরে প্রথমে স্বীয় প্রেমাস্পদের চেহারা ভেসে ওঠে। কেননা, ঘুমের মাধ্যমে প্রেমাস্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আবার যখন প্রাণটা ফিরে আসে, তখন তার স্মরণে আবার মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। পুনরায় হৃদয়টা মত্ত হয়ে ওঠে তাঁর ভালোবাসায়। কেননা, প্রেমাস্পদের ভালোবাসাটা লালিত হয় অন্তঃপুরে。

• তৃতীয় স্পট
নামাজরত অবস্থায়। যেহেতু নামাজ সব পুণ্যের পাল্লা ও সব অবস্থার নিয়ন্ত্রক। কেননা, প্রেমাস্পদের সাথে নির্জনে মিলিত হওয়ার চেয়ে মজাদার ও কাঙ্খিত বিষয় প্রেমিকের নিকট আর দ্বিতীয়টি নেই। তেমনিভাবে তাঁর সাথে একান্ত আলাপ ও তাঁর সমীপে নিজেকে সঁপে দেওয়ার মজাই তো আলাদা; যখন কিনা প্রেমাস্পদ তার সামনে উন্মোচিত হয়। সুতরাং নামাজ আল্লাহ-প্রেমিকদের চক্ষু শীতল করে। নামাজ আত্মিক প্রফুল্লতা ও অন্তরের স্বাদ আনয়নের অন্যতম মাধ্যম। তাই কেউ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে যেন সবকিছুর কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করে এবং তাঁর স্মরণের মাধ্যমেই স্থির হয়। অতএব বান্দার ইমান ও ভালোবাসা পরিমাপের জন্য নামাজ থেকে অধিক উপযোগী অন্য কোনো পরিমাপক যন্ত্র নেই。

• চতুর্থ স্পট
দুর্যোগ ও দুঃখ-দুর্দশার সময়। কেননা, তখন অন্তর তার সবচেয়ে প্রিয়তম সত্তাকেই স্মরণ করে। ফিরে আসে তার প্রিয় প্রেমাস্পদের দিকে。

সতর্কতা

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সবচেয়ে বড় স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে, মৃত্যুর সময় মানুষ তার প্রিয় বস্তুটিকে অধিক হারে স্মরণ করে, এমনকি তার প্রাণপাখি উড়াল দেওয়ার মুহূর্তেও ওই ক্ষণস্থায়ী প্রিয় বস্তুকে স্মরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। (নাউজুবিল্লাহ)
• সুতরাং যে নিজ জীবনকে আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত রাখবে, সে মৃত্যুর সময় অবশ্যই তাঁর স্মরণে নিজেকে ধন্য করতে সক্ষম হবে。
• পক্ষান্তরে যে তার রবের স্মরণ থেকে দুনিয়াতে গাফিল ছিল, মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণের মতো মহাদৌলত তার কীভাবে অর্জিত হবে? অতএব আপনি যদি সত্যিই উক্ত চার জায়গায় আল্লাহ-কে স্মরণ ও তাঁকে ভালোবেসে থাকেন, তা-ই হবে আপনার প্রেম-ভালোবাসা সত্য। হওয়ার একমাত্র নিদর্শন। অন্যথায় তা অর্জনের চেষ্টা করুন। কেননা, আপনি শুধু ভালোবাসার দাবিদার, যার অন্তরে প্রেমের লেশমাত্র নেই। (ঈষৎ পরিবর্তনের সাথে)

স্রষ্টাকে সৃষ্টিকুলের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার কতিপয় নিদর্শন ও বাস্তব চিত্র
১. রবের সন্তুষ্টিকে অন্যের সন্তুষ্টির ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
২. ভয়, আশা ও ভালোবাসা শুধু তাঁর জন্যই বরাদ্দ করা।
৩. শুধু তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা।
৪. আত্মার অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও আল্লাহর পছন্দনীয় কাজ সম্পাদন করা।
৫. নিজ নফসের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা।

এই প্রাধান্যগুলো বান্দাকে খুব দ্রুত আল্লাহর নৈকট্যশীল বানিয়ে দেয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার এমন শুভপরিণাম ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনে, যার সাথে কোনো বস্তুর ফলাফলের তুলনা চলে না।

• }إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ{ 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো।' এর ব্যাখ্যায় ইমাম মালিক বলেন, 'যে আল্লাহর আনুগত্যকে ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। সাথে সাথে সৃষ্টিকুলের কাছেও সে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।'

আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়ার নিদর্শন

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্য অনুপাতে বান্দার স্বীয় রবের সাথে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং সতর্ক হোন! খুব সাবধান! আপনার জীবন, সময়, অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতি একটু লক্ষ করুন। আপনি কি আল্লাহর আনুগত্য ও স্মরণে, তাঁর উপাসনা ও নৈকট্য অর্জনে ব্যস্ত? না তা ব্যতীত অন্য কোনো অহেতুক কাজে সময় অপচয়ে মত্ত?
• জনৈক সালাফ বলেন,
এক জাতি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে বসল, আল্লাহ তাদের ভালোবাসা পরীক্ষার জন্য আয়াত নাজিল করলেন:
﴿ قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ ﴾
'আপনি তাদের বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার আনুগত্য করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন।'

• জনৈক আল্লাহ-প্রেমিক বলেন:
'পৃথিবীর নিঃস্ব ব্যক্তিরা তা থেকে এ অবস্থায় বিদায় নিয়েছে যে, তারা এর সবচেয়ে সুস্বাদু ও পবিত্র বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করেছে।' কেউ কেউ জিজ্ঞেস করলেন, 'পৃথিবীর সর্বাধিক সুস্বাদু ও পবিত্র বিষয়টি কী?' তদুত্তরে বলা হলো, 'আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর সাথে বিশেষ অন্তরঙ্গতা, তাঁর দিদার, তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন এবং তিনি ছাড়া সবকিছুর থেকে বিমুখতা প্রভৃতির অভিপ্রায় ও অধীর আগ্রহের স্বাদ আস্বাদন করেছে।'

আল্লাহ-প্রেমিকদের অন্তরের অবস্থা

- ইবনুল জাওজি বলেন, 'প্রেমিকদের অন্তর সর্বদা স্বীয় প্রেমাস্পদ রবের স্মরণে মশগুল থাকে। যখন কথা বলে শুধু তাঁর আলোচনাই ঘুরেফিরে চলে আসে। নড়াচড়া করলে তাঁর ইশারাতেই নড়ে। যখন আপ্লুত হয়, তখন শুধু তাঁর নৈকট্যলাভের আনন্দের ফলেই আপ্লুত হয়।'

- তিনি বলেন, 'আল্লাহ-প্রেমিকদের বদনখানি যদিও পৃথিবীতে বিচরণ করে, তবু তাদের অন্তর সর্বদা স্বীয় প্রেমাস্পদ রবের কাছে পড়ে থাকে।'

টিকাঃ
৭৬. সুরা আলি ইমরান: ৩১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়াবলি

📄 আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়াবলি


এই পার্থিব জীবনে সবচেয়ে প্রশান্তিদায়ক ও সুন্দরতম বিষয় হচ্ছে, মুমিন বান্দা ওই সব আমলের প্রতি উৎসাহী ও সচেষ্ট হওয়া, যা স্বয়ং আল্লাহ পছন্দ করেন। সুতরাং আল্লাহর পছন্দসই পুণ্যকর্মের বাস্তবায়ন অনুপাতে আল্লাহর ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ আমাদের কল্যাণার্থে পবিত্র কুরআনে এমন কতক গুণের ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন, যা তাঁর কাছে অতি পছন্দনীয়। যেমন তিনি মুত্তাকি (আল্লাহভীরু), মুতাহহির (পবিত্র ব্যক্তি), তাওবাকারী, সাবিরিন (ধৈর্যশীল) ও মুহসিন (অনুকম্পা প্রদর্শনকারী) ব্যক্তিদের ভালোবাসেন।

- হাদিস শরিফেও অনুরূপ এমন কতক কর্ম ও কথার ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন。

আল্লাহ বিজোড় ভালোবাসেন
নবিজি বলেন:
وَإِنَّ اللَّهَ وِتْرُ، يُحِبُّ الْوِتْرَ
'আল্লাহ নিজে বিজোড় এবং তিনি বিজোড়কে ভালোবাসেন। '

- وتر তথা বিজোড়, আল্লাহর ক্ষেত্রে এর মর্ম হচ্ছে, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, যার অংশীদার ও সাদৃশ্য কিছু নেই。
- আর বিজোড়কে ভালোবাসার অর্থ হচ্ছে, পুণ্যকর্ম ও প্রায় সব আনুগত্যের ক্ষেত্রে বিজোড়ের প্রাধান্য দান।
- যেমন আল্লাহ নামাজকে বণ্টন করেছেন পাঁচ ওয়াক্তে。
- তেমনই পবিত্রতাকে তিন তিন বার।
- তাওয়াফ, সায়ি ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ সাতবার করে নির্ধারণ করেছেন।
- আইয়ামে তাশরিক তিন দিন,
- জাকাতে পাঁচ অসাক,
- রুপার মধ্যে পাঁচ ওকিয়া ও উটের নিসাবও অনুরূপ পাঁচ ওকিয়া নির্ধারণ করেছেন।
- এভাবে তাঁর প্রায় বড় বড় সৃষ্টিকুল, ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, সমুদ্র ও সপ্তাহের দিনকে বিজোড়ের তাথ্যিক ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ করেছেন।

আনসার (দ্বীনের সাহায্যকারী)-কে ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: مَنْ أَحَبَّ الْأَنْصَارَ أَحَبَّهُ اللهُ، وَمَنْ أَبْغَضَ الْأَنْصَارَ أَبْغَضَهُ اللَّهُ ‘যে আনসারকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসেন। আর যে আনসারকে অপছন্দ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে অপছন্দ করেন।’

আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ ﴾ “যে আমার অলি বা প্রিয় বান্দার সাথে শত্রুতা করল, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আর বান্দা তার ফরজ ইবাদত দ্বারাই আমার সবচেয়ে বেশি নৈকট্যপ্রাপ্ত হয়। আর বান্দা নফল ইবাদতের দ্বারা আমার এমন নৈকট্যশীলে পরিণত হয়ে যায় যে, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। সুতরাং যাকে আমি ভালোবাসি, আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; তদ্রূপ তার ওই চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে স্পর্শ করে; তার ওই পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে পথ চলে। যদি সে আমার নিকট কোনো বিষয়ে প্রার্থনা করে, আমি তা অবশ্যই দান করি এবং যদি সে আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে আশ্রয় দিই।""

নামাজ শুরু করার দুআ

রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ أَحَبَّ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ : سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرَكَ، وَإِنَّ أَبْغَضَ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الرَّجُلُ لِلرَّجُلِ : اتَّقِ اللَّهَ فَيَقُولُ: عَلَيْكَ نَفْسَكَ
'আল্লাহর কাছে বান্দার বলা সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য হচ্ছে سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ: غَيْرَكَ পক্ষান্তরে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক অপছন্দনীয় বাক্যের অন্যতম হচ্ছে, যখন কেউ অপরকে উপদেশের সুরে বলে যে, “আল্লাহকে ভয় করো।" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "তোমার নিজের চিন্তা করো।"'

• ইবনুল কাইয়িম এই দুআর শাব্দিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে- سُبْحَانَكَ অর্থাৎ আল্লাহ সকল পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র, সব অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত। وَبِحَمْدِكَ অর্থাৎ সব প্রকারের প্রশংসায় প্রশংসিত। অতএব بِحَمْدِكَ প্রশংসা নামক সবক্ষেত্রের পূর্ণতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর তা সব ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে তাঁর পূত-পবিত্র হওয়াকে অবধারিত করে। تَبَارَكَ اسْمُكَ সুতরাং তাঁর নাম স্বল্পতাকে বাড়িয়ে কল্যাণকে অধিক ও বরকতপূর্ণ করে দেয় এবং বিপদের মুহূর্তে উচ্চারিত হলে বিপদ দূরীভূত করে দেয়। যেকোনো শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনায় ব্যবহৃত হলে দুরাচার শয়তানকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেই ছাড়ে।
- যেকোনো নামের পূর্ণতা ও স্বতন্ত্রতা উক্ত নামে বিশেষিত বস্তুর পূর্ণতা ও স্বতন্ত্রতাকেই নির্দেশ করে। সুতরাং যে মহান সত্তার নামের শান ও মান হচ্ছে, তাঁর নামের সাথে উচ্চারিত বস্তুকে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি সাধন করতে পারে না, তাহলে উক্ত নামে বিশেষিত সত্তার শান ও মান কেমন বড় ও উঁচু হবে, তা সহজেই অনুমেয়। وَتَعَالَى جَدُّكَ অর্থাৎ তাঁর বড়ত্ব ও সম্মান অনেক ঊর্ধ্বে। وَلَا إِلَهَ غَيْرَكَ অর্থাৎ আপনি স্বীয় রাজত্ব প্রতিপালন, সব কর্মকাণ্ড ও গুণাবলিতে কারও অংশীদার হওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র। যেমন মুমিন জিন একদা বলল, 'আমাদের রবের শান অনেক ঊর্ধ্বে, তাই তাঁর কোনো স্ত্রীও নেই, সন্তানসন্ততিও নেই।'

তিনটি গুণাবলি

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন:
سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا، قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ، قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: ثُمَّ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“একদা আমি নবিজি -কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি?” তিনি তদুত্তরে বললেন, “সময়মতো নামাজ আদায়।” আমি বললাম, "তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, “পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।” আমি তৃতীয় বার আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, "আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।””

আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জায়গা

আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ مَسَاجِدُهَا، وَأَبْغَضُ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ أَسْوَاقُهَا
'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় জায়গা হচ্ছে মসজিদসমূহ এবং সবচেয়ে অপছন্দনীয় জায়গা হচ্ছে বাজারসমূহ। '

সর্বোত্তম নামাজ ও রোজা

আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الصَّلَاةِ إِلَى اللَّهِ صَلَاةُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، وَأَحَبُّ الصِّيَامِ إِلَى اللهِ صِيَامُ دَاوُدَ، وَكَانَ يَنَامُ نِصْفَ اللَّيْلِ وَيَقُومُ ثُلُثَهُ، وَيَنَامُ سُدُسَهُ، وَيَصُومُ يَوْمًا، وَيُفْطِرُ يَوْمًا
'আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম নামাজ ও রোজা হচ্ছে, দাউদ-এর নামাজ ও রোজা। কেননা, তিনি প্রথম অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন, অতঃপর রাতের এক-তৃতীয়াংশ নামাজে অতিবাহিত করতেন; ষষ্ঠাংশে আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। এবং একদিন রোজা রাখতেন তো আরেকদিন রোজা ছেড়ে দিতেন। '

পুণ্যকর্মের ওপর অটলতা ও অবিচলতা

আয়িশা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا، وَإِنْ قَلَّ
'আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে, যে আমল সর্বদা করা হয়; যদিও তা অল্প হোক। '

সর্বোত্তম দিন

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
مَا مِنْ أَيَّامٍ العَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ العَشْرِ،
'আল্লাহর নিকট জিলহজ মাসের শুরুর এই দশ দিনে সম্পাদিত আমল থেকে অধিক পছন্দনীয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।'

فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟
সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও?'

فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ
রাসুলুল্লাহ বলেন, 'হ্যাঁ। কিন্তু ওই ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজ জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়ে কোনো কিছুই ফেরত আনতে পারেনি। (অর্থাৎ যে ব্যক্তি জিহাদে শহিদ হওয়ার মহাসৌভাগ্য অর্জন করেছে।) '

বিপদে সন্তুষ্টি ও ধৈর্যধারণ

আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ عِظَمَ الجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ البَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرَّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
'নিশ্চয় মহাপ্রতিদান কঠিন বিপদের সাথেই রয়েছে। আর আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদের বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টিও অবধারিত। আর যে ক্রোধান্বিত হয়, তার জন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ অবধারিত। '

আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ

উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ
قَالَتْ عَائِشَةُ أَوْ بَعْضُ أَزْوَاجِهِ: إِنَّا لَنَكْرَهُ المَوْتَ، قَالَ: لَيْسَ ذَاكِ، وَلَكِنَّ المُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ المَوْتُ بُشِّرَ بِرِضْوَانِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ، فَلَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ، فَأَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ، وَإِنَّ الكَافِرَ إِذَا حُضِرَ بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَعُقُوبَتِهِ، فَلَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَهُ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ، كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করেন। আর যে তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করে, আল্লাহও অনুরূপ তার সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।” তখন আয়িশা কিংবা রাসুলুল্লাহ -এর অন্য কোনো স্ত্রী বলে উঠলেন, “আরে আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি।” রাসুলুল্লাহ বলেন, “বিষয়টি এমন নয়। বরং বিষয়টি হচ্ছে, যখন কোনো মুমিনের নিকট মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও স্বীয় রবের কাছে তার মহান মর্যাদার ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদান করা হয়। তখন মুমিন ব্যক্তির সামনে মৃত্যুর সময় আল্লাহর সাক্ষাৎ থেকে পছন্দনীয় অন্য কোনো বিষয় থাকে না। সুতরাং সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। পক্ষান্তরে যখন কোনো কাফিরের নিকট মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন তাকে আল্লাহর আজাব ও তার ভয়াবহ পরিণামের দুঃসংবাদ প্রদান করা হয়। তখন তার কাছে মৃত্যুর চেয়ে অপছন্দনীয় অন্য কোনো বিষয় থাকে না। সুতরাং সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে অপছন্দ ও অনীহা প্রকাশ করে, ফলশ্রুতিতে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাতে অনীহা প্রকাশ করেন।""

সুরা ইখলাসের ফজিলত

আনাস থেকে বর্ণিত :

أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُحِبُّ هَذِهِ السُّورَةَ: قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ. فَقَالَ: إِنَّ حُبَّكَ إِيَّاهَا يُدْخِلُكَ الجَنَّةَ
'একদা একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই সুরাকে (সুরা ইখলাস) ভালোবাসি।” তখন রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন, "এই সুরার ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।””

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় বাক্য

সামুরা বিন জুনদুব থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:

أَفْضَلُ الْكَلَامِ أَرْبَعُ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لَا يَضُرُّكَ بِأَيِّهِنَّ بَدَأْتَ
'সর্বোকৃষ্ট বাক্য হলো চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। যে বাক্য দিয়েই শুরু করো না কেন, কোনো অসুবিধা নেই। '

অপর এক বর্ণনায় এসেছে:

أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَرْبَعُ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا الله، وَاللَّهُ أَكْبَرُ. لَا يَضُرُّكَ بِأَيِّهِنَّ بَدَأْتَ

'আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। যে বাক্য দিয়েই শুরু করো না কেন, কোনো ক্ষতি নেই। '

আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় পদচিহ্ন

বারা বিন আজিব বলেন, রাসুলুল্লাহ বলতেন:

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الَّذِينَ يَلُونَ الصُّفُوفَ الْأَوَلَ، وَمَا مِنْ خُطْوَةٍ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ خُطْوَةٍ يَمْشِيهَا يَصِلُ بِهَا صَفًّا
'আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ দুআ করতে থাকেন ওই সব লোকের জন্য, যারা প্রথম কাতারের দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহর নিকট ওই পদক্ষেপের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় পদক্ষেপ আর কোনোটি নেই, যা মানুষেরা কাতারবদ্ধ হওয়ার জন্য করে থাকে। '

দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্ন

রাসুলুল্লাহ বলেন:

لَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ قَطْرَتَيْنِ وَأَثَرَيْنِ، قَطْرَةٌ مِنْ دُمُوعِ فِي خَشْيَةِ اللَّهِ، وَقَطْرَةٌ دَم تُهَرَاقُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَأَمَّا الْأَثَرَانِ: فَأَثَرُ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَأَثَرُ فِي فَرِيضَةٍ مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ
'আল্লাহর নিকট দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্ন থেকে অধিক পছন্দনীয় আর কিছু নেই। ফোঁটাদুটি হলো, আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুর ফোঁটা ও আল্লাহর রাস্তায় প্রবাহিত রক্তের ফোঁটা। আর চিহ্নদুটি হলো, আল্লাহর রাস্তায় প্রাপ্ত আঘাতের চিহ্ন ও ফরজ ইবাদত আদায়ে প্রাপ্ত চিহ্ন। '

আল্লাহর গুণকীর্তন করা

রাসূলুল্লাহ বলেন:

لَيْسَ أَحَدٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ مَدَحَ نَفْسَهُ، وَلَيْسَ أَحَدٌ أَغْيَرَ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ
‘আল্লাহর চেয়ে অধিক প্রশংসা পছন্দকারী সত্তা আর কেউ নেই। এ জন্যই তো স্বয়ং আল্লাহ নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন। এবং আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদাশীল আর কোনো সত্তা নেই। তাই তো তিনি সব অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন।’

- আপনি দিনে রাতে কতবার আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা করেন?
- আপনি কি এখনও অবগত হননি যে, আল্লাহর প্রশংসার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ এই বাক্যগুলো পাঠ করা।

ক্রয়-বিক্রয়ে উদারতা

রাসূলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ سَمْحَ البَيْعِ، سَمْحَ الشَّرَاءِ، سَمْحَ القَضَاءِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় ও বিচারের ক্ষেত্রে উদারতা ও সহনশীলতা পছন্দ করেন।’

উঁচু মাপের কাজ

রাসূলুল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ كَرِيمُ يُحِبُّ الْكَرَمَ وَيُحِبُّ مَعَالِي الْأَخْلَاقِ وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا

'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দানশীল, তিনি উদারতা ও উঁচু মাপের কর্মকাণ্ড পছন্দ করেন। এবং নীচু ও তুচ্ছ কর্মকাণ্ডকে অপছন্দ করেন।'

আমলের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও অবিচলতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ إِذَا عَمِلَ أَحَدُكُمْ عَمَلًا أَنْ يُثْقِنَهُ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের দৃঢ়তা ও অবিচলতাপূর্ণ আমল অধিক ভালোবাসেন।'

আল্লাহর নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর নিয়ামতের নিদর্শন দেখতে পছন্দ করেন।'

হাঁচি দেওয়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ العُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّتَاؤُبَ، فَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وَحَمِدَ اللهَ، كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ، وَأَمَّا التَّشَاؤُبُ: فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ، فَإِنَّ أَحَدُكُمْ إِذَا تَثَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ
'আল্লাহ তাআলা হাঁচি দেওয়াকে পছন্দ করেন এবং হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের কেউ হাঁচি দেওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ বললে, প্রত্যেক মুসলিম শ্রোতাদের ওপর উক্ত প্রশংসার জবাবে (يَرْحَمُكَ اللهُ) ইয়ারহামুকাল্লাহ) বলা আবশ্যক। আর হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে এসে থাকে। সুতরাং তোমাদের কারও যদি হাই তোলা এসেও যায়, সে যেন সামর্থ্যানুযায়ী তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কেননা, যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে, তখন শয়তান হেসে দেয়।'

অপর বর্ণনায় এসেছে :
فَإِذَا قَالَ: هَا، ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ

'তোমাদের কেউ যখন হাই বলে শব্দ করে, তখন শয়তান হেসে দেয়।'

গোপনে নিভৃতচারী আল্লাহভীরু বান্দা

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও নিভৃতে থাকা বান্দাকে ভালোবাসেন।'

সব বিষয়ে নম্রতা প্রদর্শন

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে নম্রতা পছন্দ করেন।'

সব বিষয়ে সৌন্দর্যতা
রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ، قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
“যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, “হে আল্লাহর রাসুল, মানুষ তো নিজের জামাকাপড় ও জুতোর সৌন্দর্যকে পছন্দ করে।” তখন তিনি বললেন, “(এতে সমস্যা নেই। কেননা,) আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। আর অহংকার হচ্ছে হককে প্রত্যাখ্যান ও মানুষকে অবজ্ঞা করা।”

– সুতরাং আল্লাহ স্বীয় সত্তাগত ও গুণগতভাবে সকল কাজে সুন্দর।
– তিনি বান্দার অন্তর, জবান, কাজকর্ম, বাহ্যিক-অভ্যন্তরীণ, আখলাক— এসব কিছুতে সৌন্দর্য পছন্দ করেন。

টিকাঃ
৭৭. সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭
৭৮. আস-সুনানুল কুবরা, সুনানুন নাসায়ি : ৮২৭৪
৭৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২
৮০. আস-সুনানুল কুবরা, সুনানুন নাসায়ি: ১০৬১৯
৮১. সহিহুল বুখারি: ৫২৭
৮২. সহিহু মুসলিম: ৬৭১
৮৩. সহিহুল বুখারি: ১১৩১
৮৪. সহিহুল বুখারি: ৬৪৬৫
৮৫. সহিহুল বুখারি: ৯৬৯
৮৬. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৬
৮৭. সহিহুল বুখারি: ৬৫০৭
৮৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৯০১
৮৯. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৯৮৬৯
৯০. সহিহু মুসলিম: ২৩৩৭
৯১. সুনানু আবি দাউদ: ৫৪৩
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ১৬৬৯
৯৩. সহিহ মুসলিম: ২৭৬০
৯৪. সুনানুত তিরমিজি: ১৩১৯
৯৫. মুস্তাদরাকুল হাকিম: ১৫১
৯৬. মুসনাদু আবি ইয়ালা: ৪৩৮৬
৯৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৮১৯
৯৮. সহিহুল বুখারি : ৬২২৬
৯৯. সহিহুল বুখারি : ৬২২৩
১০০. সহিহু মুসলিম : ২৯৬৫
১০১. সহিহু মুসলিম : ২১৬৫
১০২. সহিহু মুসলিম: ৯১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 বান্দার ওপর আল্লাহর হক

📄 বান্দার ওপর আল্লাহর হক


আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿ وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ ﴾

‘আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে আপন পালনকর্তার নিকট তা তার জন্য উত্তম।’

• শাইখ সাদি আয়াতাংশ حُرُمَاتِ اللهِ এর ব্যাখ্যায় বলেন, حُرُمَاتِ الله তথা আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন বলতে প্রত্যেক ওই বস্তুকে বোঝায়, যার মাঝে কোনো না কোনোভাবে মহত্ত্ব, সম্মান ও বিশেষত্ব নিহিত রয়েছে। এবং উহার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। চাই তা উপাসনা বা অন্য যেকোনো উপায়েই হোক না কেন। যেমন হজ ও কুরবানি-সম্পর্কিত সকল বিষয়। উদাহরণস্বরূপ হারাম শরিফে ইহরাম বাঁধা ও কুরবানি করার নিমিত্তে আল্লাহর রাহে উৎসর্গিত জন্তু।
তেমনিভাবে অন্যান্য ওই সব ইবাদত, যা তিনি ওই সময় সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান বলতে এটির মহত্ত্ব, প্রেম অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ এবং হৃদয় দিয়ে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করা; সর্বোপরি কোনো রকমের অলসতা, অবজ্ঞা ও অবহেলা ছাড়া ওই সব স্পটে উপাসনাকে পূর্ণরূপ দেওয়া।

• রাসুলুল্লাহ মুআজ-কে বললেন:
يَا مُعَادُ، هَلْ تَدْرِي حَقَّ اللهِ عَلَى عِبَادِهِ، وَمَا حَقُّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ؟ قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَحَقَّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا أُبَشِّرُ بِهِ النَّاسَ؟ قَالَ: لَا تُبَشِّرْهُمْ، فَيَتَّكِلُوا
“হে মুআজ, তুমি কি জানো, বান্দার ওপর আল্লাহর কী হক? এবং আল্লাহর ওপর বান্দার কী হক?” মুআজ বলেন, “আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন?” তিনি বললেন, “বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে, তাঁর উপাসনা করা ও কারও সাথে তাঁকে অংশীদার সাব্যস্ত না করা। এবং আল্লাহর ওপর বান্দার হক হচ্ছে, (এখানে তাঁর পক্ষ থেকে উক্ত মহাপ্রতিদানের অকাট্যতা বোঝাতে 'হক' তার রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে) যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে না, তাকে শাস্তি না দেওয়া।”

• সফলতা-প্রত্যাশী মুমিন ব্যক্তির ওপর সবচেয়ে বড় হক হলো আল্লাহর হক। এই বিষয়টি মুমিন ব্যক্তিমাত্রই সার্বক্ষণিক তার মনস্পটে লালন করে থাকে এবং সে কখনো তাঁর হক ও অধিকারের ওপর অন্য কোনো পার্থিব-অপার্থিব অধিকারকে প্রাধান্য দেয় না। মুমিন বান্দাকে যদিও সচরাচর ক্ষণিকের এই পৃথিবীতে অন্য দশ জনের ন্যায় নড়াছড়া করতে দেখা যায়, কিন্তু সে সার্বক্ষণিক আপন প্রতিপালকের হকের ব্যাপারে চিন্তামগ্ন থাকে। কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক আল্লাহর দরবারে বিগলিত বদনে, অশ্রুসজল নয়নে কান্নাকাটি করে তাওবার মাধ্যমে ত্রুটির ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করে না। মোটকথা আমাদের ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে, তাঁর আনুগত্য পালন ও সর্বদা শয়নে-স্বপনে তাঁকে স্মরণ করা; তাঁর নাফরমানি ও অবাধ্যতা পরিহার করা। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, কখনো অকৃতজ্ঞ না হওয়া—তাঁর হকের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতনতার কার্যকর ফলাফল।

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আত্মিক উন্নতির মাধ্যম হলো আল্লাহর হকের ব্যাপারে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি থাকা। উক্ত হকের ব্যাপারে সচেতনতার দরুন নিম্নোক্ত সুদূরপ্রসারী কতক শুভ পরিণাম বয়ে আনে।

১. নিজের দীনতা, হীনতা ও অসহায়ত্বের উপলব্ধির বীজ বপন করে।
২. যার ফলে লোকদেখানো ও আত্মপ্রশংসা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়।
৩. আপন প্রতিপালকের সহিত বিনয়, নম্রতা ও সত্যিকারের দাসত্বের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
৪. আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা লাভে ধন্য হয়। যা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব।
৫. সর্বোপরি তার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়ে নেন। কেননা, যার কাজের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ না নেবে, সে অবশ্যই ধ্বংস হবে।'

• আল্লাহ ও নিজ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতার চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে, আল্লাহর অধিকারের ওপর নিজ অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তার ওপর আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে মোটেও ভ্রুক্ষেপ না করা।

• ইমাম আহমাদের সাড়া জাগানো প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'কিতাবুজ জুহদ'-এ বর্ণিত আছে বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি তার একটি প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে একাধারে ষাট বছর আল্লাহর উপাসনা ও প্রার্থনায় রত ছিলেন। অথচ, এতকাল পরও তার প্রয়োজনটা মিটেনি এবং তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
অতঃপর সে মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বলল, আল্লাহর কসম, তোমার মধ্যে যদি কোনো কল্যাণ থাকত; তাহলে অবশ্যই তুমি উদ্দেশ্যে সফল হতে, অর্থাৎ তোমার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যেত। অতঃপর স্বপ্নে এসে তাকে কেউ বলতে লাগল, তোমার অন্তরের এই ক্ষণিকের দীনতা, হীনতার মূল্য কতটুকু, তা কি তুমি কখনো ভেবে দেখেছ। নিশ্চয় ক্ষণিকের এই বিনয়টুকু বিগত ষাট বছর উপাসনার চেয়েও অধিক মূল্যবান। (সুবহানাল্লাহ)

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'ছয়টি বিষয়ে আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর হক রয়েছে।
১. আমলের মধ্যে নিষ্ঠা, নিষ্কলুষতা ও একনিষ্ঠতা。
২. আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুখ্য উদ্দেশ্য থাকা।
৩. আমলের ক্ষেত্রে রাসুল-এর পূর্ণ আনুগত্য করা।
৪. আমলকে ইহসানের স্তরদ্বয়ের যেকোনো এক স্তরে উন্নীত করা। (স্তরদ্বয় ১. এমনভাবে উপাসনা করা, যেন আল্লাহ স্বয়ং আপনার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। ২. এমনভাবে আমল করা যে, আপনি আল্লাহকে না দেখলেও আল্লাহ তাআলা কিন্তু আপনাকে দেখছেন।)
৫. আল্লাহর দয়া ও করুণার অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখা।
৬. সর্বোপরি নিজ ত্রুটির ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকা।'

আনুগত্যের বাস্তব স্বরূপ

ইবনুল জাওজি বলেন, 'আনুগত্য শুধু নামাজ, রোজার বাহ্যিক ডেকোরেশনের নাম নয়, যেমনটি সাধারণত নির্বোধ ব্যক্তিরা মনে করে থাকে; কেননা, আনুগত্যের মর্মই হচ্ছে, আল্লাহর আদেশাবলি বাস্তবায়ন এবং তাঁর নিষেধাবলি থেকে নিবৃত্তির সাথে বাস্তবিকভাবে একাত্ম হয়ে যাওয়া।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'

• আবু বকর জাজায়িরি এই আয়াতে কারিমার ব্যাখ্যায় বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের নির্দেশসুলভ ভঙ্গিতে ইসলামে এমন সামষ্টিকভাবে প্রবেশের আহ্বান করছেন যে, তারা যেন ধর্মের বিধিবিধানে নিজেরা অনধিকার চর্চার প্রয়াস না নেয়। অর্থাৎ এমন যেন না হয়, যা নিজের খেয়াল-খুশিমতো হবে, তা গ্রহণ ও পালন করবে; আর যা তাদের প্রবৃত্তির সাথে খাপ খাবে না, তা অবহেলা ও অমান্যতার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। কেননা, তাদের ওপর ইসলামের সব বিধিবিধান পালন ও গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। যাতে কারও জন্য একবিন্দু পরিমাণও ছাড় নেই।'

• প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনি কি জানেন? ইসলাম অর্থ সব বিষয়ে আল্লাহর অকুণ্ঠ আনুগত্য করা, তো এরপরও কীভাবে ইসলামকে শুধু নামাজ ও রোজার বাহ্যিক আবরণে আচ্ছাদিত মনে করেন এবং নাজাতের জন্য শুধু উক্ত ইবাদতদ্বয়কেই যথেষ্ট জ্ঞান করেন? বরং ইসলাম মানে সব নির্দেশনা জীবনে বাস্তবায়ন (যেমন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, বাবা-মায়ের প্রতি সর্বদা সদয় থাকা, সত্য কথা বলা, আমানতের খিয়ানত না করা প্রভৃতি) এবং সব নিষেধ থেকে বিরত থাকা (যেমন: সুদ, জিনা-ব্যভিচার, মিথ্যা, ধোঁকা-প্রতারণা, পরনিন্দা, গালিগালাজ প্রভৃতি)।

টিকাঃ
৫৮. সুরা আল-হজ: ৩০
৫৯. সহিহুল বুখারি: ২৮৫৬
৬০. সুরা আল-বাকারা: ২০৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00