📄 সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কতিপয় নিদর্শন
• ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন:
সৌভাগ্যের নিদর্শনসমূহ :
১. বান্দার ইলম বৃদ্ধির সাথে সাথে বিনয়, নম্রতা ও দয়া বৃদ্ধি পাওয়া।
২. বান্দার সৎকর্ম বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বীয় রবের ভয় বৃদ্ধি পাওয়া।
৩. বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোভ-লালসা হ্রাস পাওয়া।
৪. সম্পদের প্রাচুর্যের সাথে সাথে দানশীলতার হারও বৃদ্ধি পাওয়া।
৫. সম্মান, মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের জন্য বিনম্রতা ও উদারতাও বৃদ্ধি পাওয়া।
দুর্ভাগ্যের কতিপয় চিহ্ন
১. জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে অহংকার ও আমিত্বভাব বৃদ্ধি পাওয়া।
২. সৎকর্ম বাড়ার সাথে সাথে আত্মতৃপ্তি, মানুষকে তুচ্ছ, খাটো মনে করার প্রবণতাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া।
৩. বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোভ-লালসা বৃদ্ধি পাওয়া।
৪. সম্পদের প্রাচুর্যের সাথে সাথে কৃপণতাও সমানতালে বেড়ে যাওয়া।
৫. সম্মান ও পদোন্নতির সাথে সাথে অহংকার ও আমিত্বও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা।
• উল্লিখিত বিষয়াবলি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষাস্বরূপ। যা দিয়ে তিনি স্বীয় বান্দাদের যাচাই বাছাই করেন। ফলে কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সৌভাগ্যবান হয়, আবার কেউ অকৃতকার্য হয়ে চিরতরে দুর্ভাগ্যের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়। তেমনিভাবে সম্মান, সম্পদের প্রাচুর্য ও পদোন্নতি সবই মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষাস্বরূপ। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা অঢেল সম্পদের অধিকারী হওয়া—এগুলো একেকটি পরীক্ষা। তাই তো সুলাইমান -এর নিকট সম্রাজ্ঞী বিলকিসের সিংহাসন উপস্থিত করা হলে তিনি অবলীলায় বলে উঠলেন:
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
'এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।'
• সুতরাং নিয়ামতের প্রাচুর্যতাও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের বিপদ ও পরীক্ষা। যার মাধ্যমে কৃতজ্ঞের কৃতজ্ঞতা ও অকৃতজ্ঞের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেয়ে যায়। তাই নানান ধরনের বালা-মুসিবত যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা, তেমনিভাবে নিয়ামতের মাধ্যমেও তিনি বান্দাদের পরীক্ষা করেন।
• আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ - وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ - كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ )
‘মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন।” এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।” কক্ষনো নয় (এটা অমূলক ধারণা), বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না। ’
ব্যাখ্যা: এই আয়াতের সারাংশ হলো, মানুষ প্রাচুর্যতাকে স্বীয় রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ সম্মান মনে করে। অথচ, প্রাচুর্য মানেই কিন্তু সম্মান ও মর্যাদার ইঙ্গিত নয়, তেমনই কেউ বিপদ কিংবা অভাবে আক্রান্ত হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা অসন্তুষ্টি ও লাঞ্ছনা মনে করে। অথচ, প্রত্যেক বিপদ ও অভাবমাত্রই অসম্মান ও লাঞ্ছনার নিদর্শন নয়; বরং উভয়ই স্বীয় রবের পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা হয়ে থাকে।
মর্যাদা ও লাঞ্ছনার প্রকৃত স্বরূপ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ - وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ ﴾
‘মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন।” এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।”’
• শাইখ সাদি উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
আল্লাহ এই আয়াতে মানুষের স্বভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যে, তারা অজ্ঞ ও জালিম। পরিণামের ব্যাপারে তারা মোটেও ভাবে না। তারা মনে করে যে, যেই অবস্থায় আছে, এর কোনো পরিবর্তন সাধিত হবে না; বরং চিরকাল এভাবেই চলতে থাকবে। তেমনি তারা আরও মনে করে, দুনিয়াতে কারও সম্মান ও নিয়ামতের প্রাচুর্যতা আল্লাহর নিকট তার নৈকট্যতা ও মর্যাদার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
তেমিনভাবে যখন তাদের ওপর রিজিককে সংকীর্ণ ও সংকুচিত করে দেওয়া হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে লাঞ্ছনা ও অবজ্ঞার নিদর্শন মনে করে।
আল্লাহ তাআলা উক্ত উদ্ভট ও অবান্তর ধারণাগুলোর মূলোৎপাটন করতে গিয়ে বলেন, কাল্লা (কক্ষনো নয়)। বরং এর মর্মার্থ হচ্ছে, প্রত্যেক প্রাচুর্যতাই সম্মান এবং প্রত্যেক সংকোচনই অসন্তুষ্টি ও লাঞ্ছনার পরিচায়ক নয়। কারণ, সম্পদের প্রাচুর্যতা ও অভাব মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের মধ্যে কে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল, তা যাচাই করেন। সুতরাং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে তিনি মহাপ্রতিদানে ভূষিত করেন। পক্ষান্তরে অকৃতকার্য হলে নিষ্পেষিত করেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মাধ্যমে। তাই আল্লাহর নিকট ওই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে তাঁর ওপর ইমান এনেছে এবং তাঁর আনুগত্য করে। পক্ষান্তরে লাঞ্ছিত বান্দা হচ্ছে সে, যে উল্লিখিত দুটি বিষয়ের তাওফিক থেকে বঞ্চিত।
• হাসান বসরি বলেন, ‘পাপিষ্ঠরা আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট, এ জন্য তারা অবাধে তাঁর নাফরমানি করে। যদি তারা আল্লাহর নিকট সম্মানিত হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদের সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা করতেন।’
টিকাঃ
৩৬২. সুরা আন-নামল: ৪০
৩৬৩. সুরা আল-ফাজর: ১৫-১৭
৩৬৪. সুরা আল-ফাজর: ১৫-১৬