📄 সত্যিকারের মুমিন হওয়ার উপায়
আখিরাতে মুমিনদের ইমান ও সৎকর্মের ওপর ভিত্তি করে তাদের স্তর ও মর্যাদা লাভ হয়। আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে প্রকৃত মুমিনদের কতিপয় গুণের আলোচনা করেন।
• হাসান বসরি বলেন:
'বাহ্যিক সাজগোজ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ইমান অর্জিত হয় না। বরং ইমান হচ্ছে, যা অন্তরে বদ্ধমূল হয়, সাথে সাথে ব্যক্তি বাহ্যিক সৎকর্মও সম্পাদন করে।'
• হাসান বসরি বলেন:
'প্রকৃত মুমিন হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে অদৃশ্যে আল্লাহকে ভয় করে; আল্লাহর পছন্দসই সৎকর্মে উৎসাহবোধ করে। আল্লাহর ক্রোধ আবশ্যককারী বিষয়াবলি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে। অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ﴾
"আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে আলিমগণই ভয় করে।”
তেমনিভাবে অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ - الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ - أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
'মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর নাম নেওয়া হলে, তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে। আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা আপন প্রতিপালকের প্রতি ভরসা রাখে। যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদের যে রুজি দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো প্রকৃত মুমিন! তাদের জন্য রয়েছে আপন প্রতিপালকের নিকট মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রুজি।'
উক্ত আয়াতে মুমিনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
প্রথম বৈশিষ্ট্য { إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ } : অর্থাৎ আয়াত শ্রবণমাত্রই অন্তর বিগলিত হওয়া।
ইবনে আব্বাস বলেন, 'ফরজ ইবাদতসমূহ আদায়ের ক্ষেত্রে মুনাফিকের অন্তর স্বীয় রবের স্মরণে জাগ্রত হয় না। এমনকি তারা আল্লাহর একটি আয়াতেও বিশ্বাস স্থাপন করে না। আর না তারা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, না লোকচক্ষুর অন্তরালে নামাজ আদায় করে। স্বীয় সম্পদের জাকাত আদায়েও তারা অত্যন্ত কিপটে। তাই উক্ত বৈশিষ্ট্যের আলোকে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়ে বলেন যে, তারা প্রকৃত মুমিন নয়।
- পক্ষান্তরে যার হৃদয় আল্লাহর স্মরণে বিগলিত হয়, অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে যে তাঁর আদেশসমূহ পালন করে এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকে। অন্যত্র স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى - فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
“পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।”
- এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম সুদ্দি বলেন, 'প্রকৃত মুমিন ওই ব্যক্তি, যে কোনো অবিচার ও পাপের ইচ্ছা পোষণ করলে, কেউ তাকে তাকওয়ার উপদেশ দেওয়ামাত্রই তার অন্তর স্বীয় রবের ভয়ে বিগলিত হয়ে যায়।'
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : { وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا } অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার আয়াত শ্রবণে ইমান বৃদ্ধি পাওয়া।
এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, তারা আয়াতের তিলাওয়াত আরম্ভ হওয়ামাত্রই গভীর শ্রদ্ধা ও একাগ্রতার সহিত উহা শ্রবণে মনোযোগী হয়। ফলে, তাদের ইমান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা আয়াতের মর্মার্থ অনুধাবনে গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। কেননা, গভীর উপলব্ধি উহা অন্তরের কাজ, যা দ্বারা অজানা ও ভুলে যাওয়া মর্মোদ্ধার হয়; কিংবা এর মাধ্যমে অন্তরে কল্যাণ লাভের জন্য প্রচণ্ড স্পৃহা জাগে, রবের পুরস্কারের প্রতি আগ্রহ জন্মায়, আর শাস্তির ভয় জাগরূক হয়, ঘৃণা সৃষ্টি হয় রবের অবাধ্যতার প্রতি। সর্বোপরি উল্লিখিত সবকটিই ইমান বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : { وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ } অর্থাৎ মহান রবের ওপর ভরসা ও পূর্ণ আস্থা অর্জন করা।
তারা স্বীয় রব ব্যতীত কারও দয়ার ওপর আস্থাশীল ও আশাবাদী নন, তাঁকে পাওয়াই তাদের একমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য এবং তাঁর দরবারেই তারা নতজানু হয়, তাঁর কাছ থেকেই সব প্রয়োজন অন্বেষণ করে, তাঁর প্রতিই আগ্রহী হয়। এ ব্যাপারে বদ্ধমূল বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলা যা চান, তা-ই হয়; তিনি যা চান না, তা ঘুণাক্ষরেও অস্তিত্বশীল হয় না এবং তিনিই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, যাঁর কোনো শরিক নেই, যাঁর বিধানকে কেউ রহিত করতে পারে না। এ কারণেই সাইদ বিন জুবাইর বলেন, 'তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা হচ্ছে ইমানের উৎসস্বরূপ। কেননা, তাতে নিহিত রয়েছে ইমানের আনুষঙ্গিক বিষয়।
• শাইখ সাদি আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন: 'অর্থাৎ তারা উপকারী ও পার্থিব-অপার্থিব ক্ষতিকর বস্তু অপসারণের ক্ষেত্রে মহান রবের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখে। দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তাঁর সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে। বস্তুত, তাওয়াক্কুল সব আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী ও উৎসাহ দানকারী। তাই উক্ত বিষয়টি ছাড়া কোনো কাজ পূর্ণতা পায় না।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ{ অর্থাৎ নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলা আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে আলোচনা করার পর সৎকর্ম নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করেছেন, যে সৎকর্মটি সবার ওপর অত্যাবশ্যকীয়, তা হচ্ছে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
কাতাদা বলেন, 'নামাজ কায়িম করার অর্থ হচ্ছে, নামাজের সময় রুকু, সিজদা ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথাযথ যত্নবান হওয়া।'
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য : } وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ { অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় দান করা। আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে দান করার মধ্যে জাকাত এবং আবশ্যকীয় নফল সদাকা, পরিবার- পরিজনের জন্য ব্যয় প্রভৃতি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহর নিকট তার সৃষ্টিকুলের জন্য উপকারী ব্যয়ই সর্বাধিক পছন্দনীয়।
আল্লাহর বাণী: {أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا} 'তারাই হলো প্রকৃত মুমিন।'
শাইখ সাদি উক্ত বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লোকদের প্রকৃত মুমিন হওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ১. কেননা, তারা ইসলাম ও ইমানকে একীভূত করেছে। তেমনিভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আমলের মাঝে কোনো বৈপরীত্য আনয়ন করেননি। ২. তারা ইলম অর্জন ও তদনুযায়ী আমল করে। ৩. তেমনই বান্দার হক ও আল্লাহর হক আদায়ে সমন্বয় সাধন করে।
প্রথমে অন্তরের আমলের বর্ণনার কারণ-কেননা, উহা হচ্ছে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলগুলোর উৎসস্বরূপ। তাই অন্তরের আমল সর্বাধিক উত্তম এবং উহাতেই রয়েছে ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধির অন্যতম প্রমাণ। তাই আনুগত্যের ফলে ইমান বৃদ্ধি পায় আবার অবাধ্যতার দরুন হ্রাস পায়। ইমানের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
প্রত্যেক উন্নতি-প্রত্যাশী বান্দার ওপর স্বীয় ইমান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য। এর ফলে সর্বোত্তম যে ফলাফলটি বের হয়ে আসবে, তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব কুরআনের গভীর বুঝ ও অনুধাবনশক্তি এবং এর অন্তর্নিহিত মর্মের রহস্য উন্মোচন।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুমিনদের মহাপ্রতিদানের বিষয়ে বর্ণনা দিয়ে বলেন: { لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ} অর্থাৎ তাদের জন্য রয়েছে স্বীয় সম্পর্ক অনুযায়ী উঁচু উঁচু সম্মান ও দৃষ্টিনন্দন স্তর।
}وَمَغْفِرَةٌ{ অর্থাৎ তাদের পাপসমূহের ক্ষমা প্রদান।
}وَرِزْقٌ كَرِيمٌ{ অর্থাৎ তাদের মেহমানদারির জন্য আল্লাহ জান্নাতে এমন এমন নিয়ামতরাজি প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শুনেনি এবং মানুষের অন্তরে যার স্বরূপ কখনো উদয় হয়নি।
- রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ أَهْلَ الجَنَّةِ يَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ، كَمَا يَتَرَاءَوْنَ الكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الغَابِرَ فِي الأُفُقِ، مِنَ المَشْرِقِ أَوِ المَغْرِبِ، لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُمْ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تِلْكَ مَنَازِلُ الْأَنْبِيَاءِ لَا يَبْلُغُهَا غَيْرُهُمْ، قَالَ: بَلَى وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، رِجَالٌ آمَنُوا بِاللَّهِ وَصَدَّقُوا الْمُرْسَلِينَ
“নিশ্চয় জান্নাতবাসীগণ তাদের উঁচুস্তরের অধিবাসীদের দেখতে পাবে, যেমনিভাবে মানুষেরা দিগন্তের পূর্বে বা পশ্চিমে উদিত নক্ষত্র দেখতে পায়। এটা হবে তাদের মধ্যে মর্যাদাগত পার্থক্য বিদ্যমান থাকার কারণে।” সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, উহা তো নবিদের স্থান, সেখানে তো অন্যরা পৌঁছতে পারবে না।” তদুত্তরে রাসুলুল্লাহ বলেন, “হ্যাঁ, কিন্তু ওই সব ব্যক্তিও এর অধিকারী, যারা আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছে ও তাঁর রাসুলগণকে সত্যায়ন করেছে।”
- আবু বকর বলেন, 'তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। কেননা, মিথ্যা ইমানের বিপরীত বিষয়।'
• মুমিনের হৃদয়ের স্বচ্ছতা
আলি বলেন, 'অন্তরে প্রাথমিকভাবে ইমান একটি ছোট্ট শুভ্র ফোঁটা হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে ইমান বৃদ্ধির সাথে সাথে ওই শুভ্রতার আয়তনও বাড়তে থাকে। যখন ইমান পূর্ণতা লাভ করে, তখন পুরো অন্তর শুভ্রতায় ভরে যায়। পক্ষান্তরে নিফাক প্রাথমিক অবস্থায় একটি কালো বর্ণের ফোঁটার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। ক্রমান্বয়ে নিফাকের পরিধি প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে কালো বর্ণের আকার-আয়তনও বাড়তে থাকে। এভাবে একসময় যখন নিফাক পূর্ণতা লাভ করে, তখন পুরো অন্তর কৃষ্ণ বর্ণের হয়ে যায়। আল্লাহর শপথ! যদি কখনো কোনো মুমিনের হৃদয় বিদারণ করতে সক্ষম হও, অবশ্যই ইমানের শুভ্রতা সেখানে দেখতে পাবে, পক্ষান্তরে যদি কোনো মুনাফিকের হৃদয় চিরতে সক্ষম হও, তাকে অবশ্যই কালো বর্ণ পাবে।'
• বান্দার প্রতি মহান রবের অনুগ্রহ এবং বান্দা থেকে রবের রহমতের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার আলামতসমূহ
জুননুন মিসরিকে একদা জিজ্ঞেস করা হলো, 'বান্দার প্রতি রবের অনুগ্রহের নিদর্শন কী?' তিনি বললেন, 'যখন তুমি কোনো বান্দাকে সর্বদা ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ও জিকিরকারীরূপে পাবে, তা হচ্ছে তার প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহের আলামত।' অতঃপর তাকে রবের অসন্তুষ্টির আলামতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে, তদুত্তরে তিনি বললেন, 'যখন আপনি কোনো বান্দাকে স্বীয় রবের স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন ও অবজ্ঞাকারী রূপে দেখবেন, তা হবে তার প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টির নিদর্শন।'
টিকাঃ
৩৫০. সুরা ফাতির: ২৮
৩৫১. সুরা আল-আনফাল: ২-৪
৩৫২. সুরা আন-নাজিআত: ৪০-৪১
৩৫৩. সহিহুল বুখারি: ৩২৫৬
📄 সফলকামদের কতিপয় বৈশিষ্ট্য
মুমিন ব্যক্তি কেবল পরকালীন সফলতা ও মুক্তির জন্যই দুনিয়ার জীবনে যাবতীয় কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে। ওপারের কামিয়াবির আশায় সে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। আল্লাহ তাআলা পরকালের সফলতা-লাভকারীদের কতিপয় গুণ সম্পর্কে কুরআনে আমাদের অবহিত করেছেন। তিনি বলেন:
﴿ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ - الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ - إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ - فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ - أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ - الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴾
'নিশ্চয় সফলতা লাভ করেছে মুমিনগণ। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। যারা জাকাত আদায় করে। এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে; তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে তা সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে। এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে। এবং যারা তাদের নামাজসমূহের খবর রাখে। তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।'
ইবনে উম্মে মাখতুম -এর সাথিরা তাকে বলেন, 'হে আবু ইয়াজিদ, আপনাকে তো নিজ ঘরে বসে নামাজ আদায় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।' তখন তিনি বলেন, 'এটা এমনি মানুষ বলে আর কি! কিন্তু আমি তো حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ অর্থাৎ “কল্যাণের পথে এসো” এর আহ্বান শুনি। আর যে ব্যক্তি حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ এর আহ্বান শুনবে, সে যেন উক্ত আহ্বানে সাড়া দেয়, যদিও হামাগুড়ি দিয়ে হোক না কেন।'
প্রথম বৈশিষ্ট্য: নামাজে একাগ্রতা।
e t e { الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ} অর্থাৎ যারা নামাজে একাগ্রচিত্তে দণ্ডায়মান হয়। নামাজে একাগ্রতার মর্ম হচ্ছে, আল্লাহর সমীপে অন্তরকে উপস্থিত করে তাঁর নৈকট্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা, যার ফলে হৃদয়ে সম্পূর্ণ স্থিরতা চলে আসে, নড়াচড়া থেমে যায়। স্বীয় রবের সম্মানার্থে এদিক সেদিক তাকানো হ্রাস পাওয়া। নামাজের আনুষঙ্গিক কর্মগুলো আদায়ের সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুব মনোযোগের সাথে অনুধাবন করে করে আদায় করা, এর ফলে শয়তানি কুমন্ত্রণা ও অশালীন চিন্তা-ফিকির থেকে নিস্তার পাওয়া যায়।
একাগ্রতাই মূলত নামাজের মূল উদ্দেশ্য, যার প্রতিদান অবশ্যই বান্দার জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়। তাই যে নামাজ নম্রতা ও একাগ্রতা-বিবর্জিত, যদিও তার প্রতিদান আশা করা যায়, তথাপি তা হবে নিতান্তই লঘু। কেননা, প্রতিদান তো অন্তরের অবস্থা হিসেবে হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: অহেতুক বিষয় বর্জন।
e a r a c { وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ} অর্থাৎ যারা অনর্থক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখে। উহা শিরক, অবাধ্যতা ও অপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম, কথাবার্তা সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا )
'এবং যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।'
বান্দা যখন নিজ জবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তখন সে অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়েও পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। রাসুলুল্লাহ মুআজ বিন জাবাল -কে উপদেশ দানকালে বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكَ بِمَلَاكِ ذَلِكَ كُلِّهِ؟ قُلْتُ: بَلَى يَا نَبِيَّ اللَّهِ، فَأَخَذَ بِلِسَانِهِ قَالَ: كُفَّ عَلَيْكَ
'আমি কি তোমাকে সবকিছুর মূল বস্তুর ব্যাপারে অবহিত করব না?' তদুত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ নিজ জিহ্বা টেনে বের করে বললেন, 'এটাকে নিয়ন্ত্রণ করো।'
সুতরাং মুমিনদের অন্যতম প্রশংসনীয় গুণ হচ্ছে, নিজ জবানকে অহেতুক ও অবৈধ বিষয়াবলি থেকে পূর্ণরূপে বিরত রাখা।
• ইবনে মাসউদ বলেন, 'বিচার দিবসে অত্যধিক পাপের বোঝা বহনকারীর ঝুলিতে উঁকি দিলে দেখা যাবে, সে নিজের অধিকাংশ সময় অহেতুক কাজেই কাটিয়ে দিত।'
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : জাকাত আদায়ে যত্নশীল হওয়া। { وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ} অর্থাৎ যারা নিজ সম্পদের জাকাত আদায় করে। কেননা, এর মাধ্যমে চরিত্রের কলুষতা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সুতরাং নামাজে একাগ্রতার মাধ্যমে যেমনিভাবে সে রবের ইবাদতে ইহসানের স্তরে উপনীত হয়, তেমনিভাবে জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সৃষ্টিকুলের প্রতি ইহসান করা হয়।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য: লজ্জা স্থানের হিফাজত। { وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ} অর্থাৎ যারা অবৈধ বিষয়াদি থেকে স্বীয় লজ্জাস্থানকে হিফাজত করে, তারা ব্যভিচার ও সমকামিতা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে বাঁচিয়ে রাখে এবং তাদের বৈধ স্ত্রী ও দাসী ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে লজ্জাস্থানের ব্যবহার করে না। বস্তুত, বৈধভাবে ব্যবহারে স্বীয় রবের পক্ষ থেকে কোনো বাধা ও ভর্ৎসনা নেই। এ কারণেই তিনি বলেন : { فَمَن ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ } অর্থাৎ যারা স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত অন্য কারও সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়, মূলত তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।
ইমাম শাফিয়ি উক্ত আয়াত থেকে হস্তমৈথুন অবৈধতার ওপর প্রমাণ পেশ করেছেন।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য: আমানতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া। { وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ } অর্থাৎ যখন তাদের কাছে আমানত রাখা হয়, তারা তখন খিয়ানত ও প্রতারণা করে না; বরং উক্ত আমানতকে তার প্রাপ্য হকদারের নিকট যথাযথভাবে ফেরত দেয়। কোনো চুক্তি কিংবা প্রতিশ্রুতি দিলে তারা তা পালনে সর্বদা বদ্ধপরিকর থাকে। ওই মুনাফিকদের মতো নয়, যাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেন:
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
'মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য তিনটি : কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে তা ভঙ্গ করে আর আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।'
এই আয়াতটি আমানতের ব্যাপারে ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। তা রবের হক আদায়ের ব্যাপারে হোক কিংবা বান্দার অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে হোক। সুতরাং আল্লাহ কর্তৃক বান্দার ওপর অত্যাবশকীয় সব বিষয়ই আমানত হিসেবে গণ্য। তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা বান্দার ওপর একান্ত অপরিহার্য। তেমনিভাবে উক্ত আয়াতে মানুষের আমানতের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত, চাই তা সম্পদ কিংবা অন্য কোনো গোপনীয় সংবাদ হোক না কেন। সুতরাং বান্দার ওপর দুধরনের আমানতের যথাযথ হিফাজত করা অত্যাবশ্যকীয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا ﴾
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।'
তেমনিভাবে চুক্তির ক্ষেত্রেও উভয়টি প্রযোজ্য তথা স্বীয় রবের সঙ্গে চুক্তি ও সাধারণ মানুষের সাথে কৃত চুক্তি যথাযথ পালন করা ওয়াজিব। উভয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি কিংবা উদাসীনতা করা যাবে না।
কে সত্যিকারের মনুষ্যত্বের অধিকারী?
উমর বলেন, 'কোনো মানুষের প্রসিদ্ধি ও পরিচিতি দেখে তোমরা আশ্চর্যবোধ কোরো না। কেননা, সত্যিকারের মানুষ তো সেই, যে যথাযথ ভাবে নিজের ওপর আরোপিত আমানতকে সংরক্ষণ করে এবং অন্যের দোষ- ত্রুটি অন্বেষণ থেকে বিরত থাকে।'
আমানতের বাস্তব স্বরূপ
শাইখ সাদি আমানতের সংজ্ঞায় বলেন, 'আমানত হচ্ছে বাহ্যিক দিক দিয়ে যেভাবে আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা হয়, তেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ ও পরোক্ষভাবেও তা যথাযথ আদায় করা।'
ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য: নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া।
{ وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ} অর্থাৎ যারা নামাজের সময় ভেতর ও বাইরের ফরজসমূহ-সহ অন্যান্য নামাজের আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বদা যত্নশীল। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দুধরনের গুণের প্রশংসা করেছেন। যার কোনো একটি ব্যতীত নামাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যেমন কেউ যদি একাগ্রতা ব্যতীত নামাজের ব্যাপারে সর্বদা যত্নবান হয়, অথবা একাগ্রতা তো আছে, তবে যত্নশীলতা শূন্যের কোঠায়, তাহলে উক্ত নামাজ নিতান্তই দুর্বল, ক্ষীণকায় ও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। আদায়কারী ব্যক্তি তিরস্কৃত ও ভর্ৎসনার যোগ্য।
ইবনে কাসির বলেন, 'আল্লাহ তাআলা উক্ত প্রশংসনীয় গুণাবলির আলোচনা নামাজের মাধ্যমে আরম্ভ করেছেন। আবার নামাজ দিয়েই উক্ত বৈশিষ্ট্যাবলির আলোচনার ইতি টেনেছেন। এর থেকে নামাজের সর্বोत्কৃষ্টতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।
أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ - الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
যখন আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত প্রশংসনীয় গুণাবলির গুরুত্ব নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করলেন। এবার এসবের প্রতিদানের আলোচনা উক্ত আয়াতের মাধ্যমে আরম্ভ করলেন। রাসুলুল্লাহ বলেন:
فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ، فَاسْأَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ - أَرَاهُ - فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الجَنَّةِ
'অতএব, যখন তোমরা আল্লাহর নিকট (জান্নাত) চাও, তখন তোমরা জান্নাতুল ফিরদাওসই প্রার্থনা করো। কেননা, এটিই সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত-বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, রাসুলুল্লাহ এ কথাও বলেন—এর ওপর রয়েছে দয়াময়ের আরশ এবং জান্নাতে প্রবাহমান নদী ওই স্থান থেকে উৎসরিত। '
- রাসুলুল্লাহ বলেন: مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا لَهُ مَنْزِلَانِ: مَنْزِلُ فِي الْجَنَّةِ، وَمَنْزِلُ فِي النَّارِ، فَإِذَا مَاتَ، فَدَخَلَ النَّارَ، وَرِثَ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنْزِلَهُ، فَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى: {أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ} [المؤمنون: ١٠]
'তোমাদের প্রত্যেকের জন্য পরকালে দুটি করে গৃহ বরাদ্দ রয়েছে। একটি জান্নাতে, অন্যটি জাহান্নামে। সুতরাং যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে জাহান্নামে প্রবেশ করে, জান্নাতবাসীরা সেই জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য জান্নাতে বরাদ্দকৃত গৃহের উত্তরাধিকারী হয়ে যায়, এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন: “তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে।” (আল-মুমিনুন: ১০)।
সুতরাং মুমিনরা জান্নাতে কাফিরদের জন্য বরাদ্দকৃত সেই প্রাসাদগুলোর উত্তরাধিকারী হয়ে যায়। কেননা, সবাইকে তো আল্লাহর উপাসনার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মুমিনরা যখন স্বীয় রবের ইবাদতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে, কাফিররা তখন তাদের ওপর আবশ্যকীয় বিষয়াদি পালনে ব্যর্থতা ও উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। তাই মুমিনরা জান্নাতে পুরো বিস্তৃত অঞ্চলের মালিক হয়ে গেছে।
- বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاسٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ بِذُنُوبِ أَمْثَالِ الْجِبَالِ، فَيَغْفِرُهَا اللهُ لَهُمْ وَيَضَعُهَا عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى
'কিয়ামত দিবসে মুসলিমদের মধ্যে কতক পাহাড়সম পাপের বোঝা নিয়ে স্বীয় রবের দরবারে উপস্থিত হলে তাদেরকে আল্লাহ নিজ কৃপায় ক্ষমা করে দিয়ে পাপের বোঝাগুলো ইহুদি-নাসারাদের কাঁধে চাপিয়ে দেবেন।'
টিকাঃ
৩৫৪. সুরা আল-মুমিনুন: ১-১১
৩৫৫. সূরা আল-ফুরকান: ৭২
৩৫৬. সুনানুত তিরমিজি: ২৬১৬
৩৫৭. সহিহুল বুখারি: ৩৩, সহিহু মুসলিম: ৫৯
৩৫৮. সুরা আন-নিসা: ৫৮
৩৫৯. সহিহুল বুখারি: ২৭৯০
৩৬০. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪৩৪১
৩৬১. সহিহ মুসলিম: ২৭৬৭
📄 সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কতিপয় নিদর্শন
• ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন:
সৌভাগ্যের নিদর্শনসমূহ :
১. বান্দার ইলম বৃদ্ধির সাথে সাথে বিনয়, নম্রতা ও দয়া বৃদ্ধি পাওয়া।
২. বান্দার সৎকর্ম বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বীয় রবের ভয় বৃদ্ধি পাওয়া।
৩. বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোভ-লালসা হ্রাস পাওয়া।
৪. সম্পদের প্রাচুর্যের সাথে সাথে দানশীলতার হারও বৃদ্ধি পাওয়া।
৫. সম্মান, মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের জন্য বিনম্রতা ও উদারতাও বৃদ্ধি পাওয়া।
দুর্ভাগ্যের কতিপয় চিহ্ন
১. জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে অহংকার ও আমিত্বভাব বৃদ্ধি পাওয়া।
২. সৎকর্ম বাড়ার সাথে সাথে আত্মতৃপ্তি, মানুষকে তুচ্ছ, খাটো মনে করার প্রবণতাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া।
৩. বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোভ-লালসা বৃদ্ধি পাওয়া।
৪. সম্পদের প্রাচুর্যের সাথে সাথে কৃপণতাও সমানতালে বেড়ে যাওয়া।
৫. সম্মান ও পদোন্নতির সাথে সাথে অহংকার ও আমিত্বও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা।
• উল্লিখিত বিষয়াবলি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষাস্বরূপ। যা দিয়ে তিনি স্বীয় বান্দাদের যাচাই বাছাই করেন। ফলে কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সৌভাগ্যবান হয়, আবার কেউ অকৃতকার্য হয়ে চিরতরে দুর্ভাগ্যের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়। তেমনিভাবে সম্মান, সম্পদের প্রাচুর্য ও পদোন্নতি সবই মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষাস্বরূপ। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা অঢেল সম্পদের অধিকারী হওয়া—এগুলো একেকটি পরীক্ষা। তাই তো সুলাইমান -এর নিকট সম্রাজ্ঞী বিলকিসের সিংহাসন উপস্থিত করা হলে তিনি অবলীলায় বলে উঠলেন:
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
'এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।'
• সুতরাং নিয়ামতের প্রাচুর্যতাও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের বিপদ ও পরীক্ষা। যার মাধ্যমে কৃতজ্ঞের কৃতজ্ঞতা ও অকৃতজ্ঞের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেয়ে যায়। তাই নানান ধরনের বালা-মুসিবত যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা, তেমনিভাবে নিয়ামতের মাধ্যমেও তিনি বান্দাদের পরীক্ষা করেন।
• আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ - وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ - كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ )
‘মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন।” এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।” কক্ষনো নয় (এটা অমূলক ধারণা), বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না। ’
ব্যাখ্যা: এই আয়াতের সারাংশ হলো, মানুষ প্রাচুর্যতাকে স্বীয় রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ সম্মান মনে করে। অথচ, প্রাচুর্য মানেই কিন্তু সম্মান ও মর্যাদার ইঙ্গিত নয়, তেমনই কেউ বিপদ কিংবা অভাবে আক্রান্ত হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা অসন্তুষ্টি ও লাঞ্ছনা মনে করে। অথচ, প্রত্যেক বিপদ ও অভাবমাত্রই অসম্মান ও লাঞ্ছনার নিদর্শন নয়; বরং উভয়ই স্বীয় রবের পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা হয়ে থাকে।
মর্যাদা ও লাঞ্ছনার প্রকৃত স্বরূপ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ - وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ ﴾
‘মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন।” এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, “আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।”’
• শাইখ সাদি উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
আল্লাহ এই আয়াতে মানুষের স্বভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যে, তারা অজ্ঞ ও জালিম। পরিণামের ব্যাপারে তারা মোটেও ভাবে না। তারা মনে করে যে, যেই অবস্থায় আছে, এর কোনো পরিবর্তন সাধিত হবে না; বরং চিরকাল এভাবেই চলতে থাকবে। তেমনি তারা আরও মনে করে, দুনিয়াতে কারও সম্মান ও নিয়ামতের প্রাচুর্যতা আল্লাহর নিকট তার নৈকট্যতা ও মর্যাদার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
তেমিনভাবে যখন তাদের ওপর রিজিককে সংকীর্ণ ও সংকুচিত করে দেওয়া হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে লাঞ্ছনা ও অবজ্ঞার নিদর্শন মনে করে।
আল্লাহ তাআলা উক্ত উদ্ভট ও অবান্তর ধারণাগুলোর মূলোৎপাটন করতে গিয়ে বলেন, কাল্লা (কক্ষনো নয়)। বরং এর মর্মার্থ হচ্ছে, প্রত্যেক প্রাচুর্যতাই সম্মান এবং প্রত্যেক সংকোচনই অসন্তুষ্টি ও লাঞ্ছনার পরিচায়ক নয়। কারণ, সম্পদের প্রাচুর্যতা ও অভাব মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের মধ্যে কে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল, তা যাচাই করেন। সুতরাং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে তিনি মহাপ্রতিদানে ভূষিত করেন। পক্ষান্তরে অকৃতকার্য হলে নিষ্পেষিত করেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মাধ্যমে। তাই আল্লাহর নিকট ওই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে তাঁর ওপর ইমান এনেছে এবং তাঁর আনুগত্য করে। পক্ষান্তরে লাঞ্ছিত বান্দা হচ্ছে সে, যে উল্লিখিত দুটি বিষয়ের তাওফিক থেকে বঞ্চিত।
• হাসান বসরি বলেন, ‘পাপিষ্ঠরা আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট, এ জন্য তারা অবাধে তাঁর নাফরমানি করে। যদি তারা আল্লাহর নিকট সম্মানিত হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদের সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা করতেন।’
টিকাঃ
৩৬২. সুরা আন-নামল: ৪০
৩৬৩. সুরা আল-ফাজর: ১৫-১৭
৩৬৪. সুরা আল-ফাজর: ১৫-১৬