📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 অনুপম চরিত্র গঠনের উপায়

📄 অনুপম চরিত্র গঠনের উপায়


আল্লাহর রাহে সফলতা-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য উত্তম-অনুপম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার বিকল্প নেই। তাই শুধু অত্যধিক ইবাদত, আল্লাহর জিকির ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য সত্ত্বেও মানুষের সাথে কারও খারাপ সম্পর্ক থাকলে ওই ইবাদত-বন্দেগির প্রকৃত সুফল ভোগ করা থেকে সে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। তাকে অবশ্যই রাসুল -এর আদর্শে পূর্ণ আদর্শবান হতে হবে। (রাসুলুল্লাহ -এর চরিত্রের প্রশংসায়) আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ )
'আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।'

অর্থাৎ হে সম্মানিত রাসুল, আপনি নিশ্চয় সুমহান চরিত্রের অধিকারী। আর তা হচ্ছে, কুরআনে বর্ণিত সৎ চরিত্রের যেসব সুন্দর দিক রয়েছে, সেগুলোর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কেননা, কুরআনের পরিপূর্ণ অনুকরণই ছিল মূলত রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ। কুরআনের আদেশ বাস্তবায়ন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকাই ছিল তাঁর পবিত্র জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ও ব্রত।
• আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا وَلَا مُتَفَحِّشًا، وَإِنَّهُ كَانَ يَقُولُ: إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا
'রাসুলুল্লাহ জন্মগতভাবে বা ইচ্ছাপূর্বক অশ্লীলভাষী ছিলেন না। তিনি এরূপ বলতেন যে, "তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।”'

• আবু দারদা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ صَاحِبِ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ
'কিয়ামত দিবসে মুমিন ব্যক্তির আমলনামায় সুমহান চরিত্র থেকে অধিকতর কোনো ভারী বস্তু থাকবে না। কেননা, অশ্লীল ও রূঢ় স্বভাবের অধিকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ একদমই পছন্দ করেন না।'

- আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত:
سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الجَنَّةَ، فَقَالَ: تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الخُلُقِ، وَسُئِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ، فَقَالَ: الفَمُ وَالفَرْجُ.
“রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে?” তিনি তদুত্তরে বললেন, "তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র।" এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে?" তিনি তদুত্তরে বললেন, "জবান ও লজ্জাস্থান।”

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'রাসুল ﷺ তাকওয়াকে উত্তম চরিত্রের সাথে একীভূত করেছেন। কেননা, তাকওয়া হচ্ছে এমন এক ফলপ্রসূ মাধ্যম, যা বান্দা ও রবের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের সূতিকাগার হিসেবে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সৃষ্টিকুলের সাথেও সুন্দর সম্পর্ক তৈরিতে উত্তম চরিত্র যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। সুতরাং একদিকে আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি করে তো অন্যদিকে তা সাধারণ লোকদের সুচরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে ভালোবাসতে আহ্বান করে।'

উত্তম চরিত্র অর্জনের জন্য কতিপয় আবশ্যকীয় বিষয়

১. উত্তম বস্তু খরচ করা। অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে, কথা ও কাজ ইত্যাদি যেকোনো মাধ্যমে মানুষদের সাহায্য করা এবং তাদের সমূহ কল্যাণ সাধনে সর্বদা তৎপর থাকা।
২. মুসলিমদের থেকে মন্দবিষয়ক বস্তুর অপসারণ, অর্থাৎ হাত ও পা অথবা অন্য কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দ্বারা মানুষকে কষ্ট না দেওয়া; বরং তাদের কষ্ট দূরীকরণে সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৩. প্রত্যেক মুমিন ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।
৪. নিজের মধ্যে ইমানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যাবলি জাগরূক রাখা। যেমন: ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সহনশীলতা, অন্যের প্রতি দয়া ও উপকার, নিষ্ঠার সাথে উপাসনা, বিনয়-নম্রতা এবং যত্রতত্র ক্রোধান্বিত না হওয়া। তেমনিভাবে অহেতুক অভিসম্পাত, গালমন্দ ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ না করা; বরং সর্বদা সত্যবাদী, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পবিত্র ও অত্যধিক পরিশুদ্ধ হওয়া।

৫. নিজের সকল কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পাদন করা। লোকদেখানো ও তাদের প্রশংসা অর্জনের জন্য না হওয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ আপন প্রতিপালকের নিকট ফরিয়াদ করতেন :

اللَّهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَعْمَالِ وَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَقِنِي سَيِّئَ الْأَعْمَالِ وَسَيِّئَ الْأَخْلَاقِ لَا يَقِي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
‘হে আল্লাহ আমাকে উত্তম আমল ও উত্তম চরিত্রের দিশা দিন, যা আপনি ছাড়া কেউ দান করতে পারে না। এবং মন্দ কর্ম ও মন্দ চরিত্র থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন; কেননা, সব ধরনের মন্দ থেকে আপনি ব্যতীত কেউ বাঁচাতে পারে না।’

সবচেয়ে মারাত্মক রোগ - আহনাফ বিন কায়িস বলেন, “আমি কি তোমাদের সর্বনিকৃষ্ট ও জঘন্য রোগের ব্যাপারে অবহিত করব না?” তদুত্তরে উপস্থিত লোকেরা বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তখন তিনি বললেন, “তা হলো, মন্দ চরিত্র ও অশ্লীল জবান।”

- রাসুলুল্লাহ ﷺ তাই সর্বদা নিম্নোক্ত দুআ পাঠ করতেন :

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلَاقِ، وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ
'হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট মন্দ চরিত্র, মন্দ কর্ম ও কুপ্রবৃত্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'

চরিত্রের মন্দ দিকসমূহ

চরিত্রের সার্বিক নিন্দনীয় দিকসমূহ, যেমন: অহংকার, হিংসা, আত্মতুষ্টি, অন্যের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ইত্যাদি।

মন্দকর্ম : যেমন সব ধরনের অবৈধ কথাবার্তা—পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, গাল-মন্দ প্রভৃতি।

তেমনিভাবে অবৈধ সব কর্মকাণ্ড, যেমন: মদ্যপান, ব্যভিচার, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, সুদ ও চৌর্যবৃত্তি ইত্যাদি।

প্রবৃত্তির মন্দনীয় দিকসমূহ

- বাতিল আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করা, অর্থাৎ ওই সব আকিদা-বিশ্বাস, যা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালিহিনের বিশ্বাসের স্পষ্ট বিপরীত, যা বিভিন্ন ভয়ংকর মতবাদের ধ্বজাধারী ব্যক্তিরা পোষণ করে থাকে। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফ তথা সাহাবা, তাবিয়িন, তাবে তাবিয়িনের লালিত বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাসের শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

- মন্দ উদ্দেশ্যাবলি: কথা কিংবা কর্ম সম্পাদনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও সন্তুষ্টি অর্জন মুখ্য উদ্দেশ্য থাকা এবং পুণ্যকর্মের মাধ্যমে পার্থিব কোনো তুচ্ছ স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্য থাকা। যেমন: নেতৃত্বের লোভ, প্রসিদ্ধি ও অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকা প্রভৃতি।

অপছন্দনীয় ও মন্দনীয় রোগব্যাধি যথা: অন্ধত্ব, কুষ্ঠরোগ, পাগলামি অন্যান্য নিকৃষ্ট রোগব্যাধি। এর দ্বারা সব ধরনের রোগব্যাধি উদ্দেশ্য নয়। কেননা, ছোট-খাটো কোনো রোগব্যাধি তো মানুষের সাথে বিভিন্ন সময় লেগেই থাকে।

উত্তম চরিত্রের সংজ্ঞা
উত্তম চরিত্রের মর্ম হলো, নিজে কষ্ট সহ্য করে হলেও অন্যের কষ্ট দূরীকরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

উত্তম চরিত্র হলো নিজের সব সৌন্দর্যটুকু ঢেলে দেওয়া ও মন্দা বিষয়াবলি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে রাখা।

অথবা উত্তম চরিত্র হচ্ছে, মন্দ ও সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে মুক্ত হওয়া এবং যাবতীয় কল্যাণকর ও পুণ্য কর্ম দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করা।

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'চরিত্র হচ্ছে ধর্মের আয়নাস্বরূপ। সৎ চরিত্র বৃদ্ধি পাওয়া মানে ধর্মীয় স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাওয়া।'

• সমস্ত উত্তম চরিত্রের উৎস সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'উত্তম চরিত্র মূলত চারটি স্তম্ভে প্রতিষ্ঠিত।
১. ধৈর্য : অর্থাৎ যেকোনো অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, গোস্বা হজম করা, সহনশীলতা ও নম্রতা প্রদর্শন এবং যেকোনো ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও তাড়াহুড়া না করা।
২. পূত-পবিত্রতা : অর্থাৎ সব ধরনের অবৈধ, অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখা। লজ্জাশীলতাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা। কেননা, তা সব কল্যাণের আধার এবং অশ্লীলতা, কৃপণতা, মিথ্যা, পরনিন্দা, চোগলখুরি থেকে বিরত রাখে।
৩. সাহসিকতা ও বীরত্ব: এই বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিকে আত্মসম্মানবোধ, উঁচু মাপের চরিত্র ও সৎ স্বভাবের ওপর উদ্বুদ্ধ করে। এবং তা মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান ও বীরত্বের উচ্চমার্গে উপনীত করে।
৪. ন্যায়-নীতি ও নৈতিকতা: এই বৈশিষ্ট্য মানুষের চরিত্রে ভারসাম্যতা নিয়ে আসে। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে মুক্ত করে মধ্যমপন্থায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ফলশ্রুতিতে তা এমন বীরত্বের উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে, যা কাপুরুষতা ও মন্দনীয় বীরত্বের মাঝামাঝি অবস্থান করে। এবং চরিত্রকে সজ্জিত করে এমন সহনশীলতায়, যা অতি রাগ ও হীনতার মাঝামাঝি অবস্থান করে।'

হীন চরিত্রের মূল উৎস

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সব নীচু চরিত্রের উৎস ও মূলভিত্তি মূলত চারটি মূলস্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১. অজ্ঞতা : যা সুন্দরকে কুৎসিত ও কুৎসিতকে সুন্দর করে চিত্রায়িত করে।
২. অন্যায়-অবিচার: কোনো বিষয় বা বস্তুকে তার আপন স্থানে না রেখে ভিন্ন স্থানে রাখা। তাই সে সন্তুষ্টির জায়গায় ক্রোধান্বিত হয় এবং আক্রোশের জায়গায় সন্তুষ্ট হয়, তেমনিভাবে খরচের জায়গায় কৃপণতা করে এবং কঠোরতার সময় নম্রতা প্রদর্শন করে। আবার বিনয়ের ক্ষেত্রে অহংকারী হয়ে ওঠে।
৩. কামপ্রবৃত্তি : তা মানুষকে লোভ-লালসা ও সব ধরনের নীচু মানের কাজের প্রতি উৎসাহিত করে।
৪. ক্রোধ ও আক্রোশ: তা অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও বোকামির জন্ম দেয়।

• অতএব সব ধরনের নীচু স্বভাব—একটা অপরটার উদ্রেক ঘটায়, যেভাবে উত্তম চরিত্র—একটির ফলে অপরটি বিকাশিত হয়।

টিকাঃ
১২৬. সুরা আল-কলম : ৪
১২৭. সহিহুল বুখারি: ৬০৩৫
১২৮. সুনানুত তিরমিজি: ২০০৩
১২৯. সুনানুত তিরমিজি: ২০০৪
১৩০. সুনানুন নাসায়ি: ৮৯৬
১৩১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৯১

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 মুমিনের অতি প্রয়োজনীয় গুণাবলি

📄 মুমিনের অতি প্রয়োজনীয় গুণাবলি


আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ ﴾
'তারা তাওবাকারী, ইবাদতকারী, শোকরগুজার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎ কাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্তকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হিফাজতকারী। আর সুসংবাদ দাও ইমানদারদের।

উক্ত গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি কতই না সৌভাগ্যবান। এই পবিত্রময় গুণে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তির জীবন কতই না সুন্দর, নির্মল ও স্নিগ্ধময় জান্নাতের সুবাসে সুবাসিত।

প্রিয় পাঠক, বাস্তবে উল্লিখিত প্রত্যেকটি গুণই একেকটি পূর্ণ প্রশিক্ষণ কোর্স ও লেকচারের দাবি রাখে। কিন্তু বুদ্ধিমানের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।

• এখানে আল্লাহ তাআলা মুমিনের যে নয়টি গুণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তা সকলের গভীরভাবে উপলব্ধি করে উত্তম গুণাবলি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করাই হবে বাঞ্ছনীয়। কেননা, এসব গুণে গুণান্বিত হওয়ার ভিত্তিতেই তো সফলতার সোপানে আরোহণ করা যায়।

• প্রথম বৈশিষ্ট্য: তাওবাকারী, অর্থাৎ সকল পাপাচার থেকে তাওবা করা ও সর্বদা তাওবার সাথে লেগে থাকা।

আপনি কি অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়েছেন?
হে প্রিয় ভাই, তাওবাকে আপনার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিন, যেমনিভাবে রাসুল তাওবাকে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ، فَإِنِّي أَتُوبُ، فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো। কেননা, আমি দৈনিক ১০০ বার তাওবা করি।'

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আল্লাহ তাআলার প্রকৃত উপাসক ও তাঁর খাঁটি প্রেমিকমাত্রই প্রতিটি মুহূর্তে ইসতিগফারের মুখাপেক্ষী।'

• দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: আল্লাহর নির্ভেজাল দাসত্ব ও তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের গুণে গুণান্বিত, চাই তা আবশ্যকীয় আদশে হোক কিংবা অনাবশ্যকীয় মুস্তাহাব ইত্যাদিতে হোক। এভাবেই বান্দা স্বীয় রবের খাঁটি উপাসক ও তাঁর একনিষ্ঠ গোলামদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

• তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: প্রশংসাকারী, অর্থাৎ যে সুখে-দুঃখে সর্বদা স্বীয় রবের স্তুতি ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, সাথে সাথে তার ওপর আল্লাহর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ামতরাজি এবং তাঁর করুণার কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করে। এবং দিবা-রাত্রি জিকিরের মাধ্যমে স্বীয় রবকে স্তুতি ও প্রশংসার মাধ্যমে সন্তুষ্ট করে।

• চতুর্থ বৈশিষ্ট্য: রোজাদার কিংবা মুসাফির; সিয়াহাতুন শব্দের মর্ম হচ্ছে রোজা অথবা জ্ঞানান্বেষণের জন্য ভ্রমণে বের হওয়া। অথবা এর মর্ম হচ্ছে, যাদের অন্তর সর্বদা আল্লাহর পরিচয় লাভ, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি সার্বিক আনুগত্য প্রদর্শনের পবিত্র উদ্যানে চষে বেড়োয়।

– তবে বিশুদ্ধতম ব্যাখ্যা হচ্ছে, নৈকট্য লাভের সব স্পটে ভ্রমণ করা, যেমন: হজ, উমরা, জিহাদ, জ্ঞানান্বেষণ ও নিকট আত্মীয়দের কল্যাণকামিতায় তাদের নিকট গমন ইত্যাদি।

• পঞ্চম ও ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য : যারা রুকু করে ও সিজদাবনত হয়। অর্থাৎ যারা রুকু-সিজদা সম্বিলত নামাজ আদায়ের ব্যাপারে অত্যধিক যত্নশীল।

• সপ্তম ও অষ্টম বৈশিষ্ট্য: সৎ কাজের আদেশকারী। যেখানে আবশ্যকীয় ও অনাবশ্যকীয় মুস্তাহাবজাতীয় সব ধরনের ইবাদত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অসৎ কাজ থেকে বারণকারী অর্থাৎ যেসব কাজ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল নিষেধ করেছেন, তা থেকে সৃষ্টিকুলকে বারণ করা।

• নবম বৈশিষ্ট্য: আল্লাহর সীমারেখার যথাযথ সংরক্ষণকারী। অর্থাৎ রাসুল -এর ওপর অবতীর্ণ সব ধরনের বিধিবিধান শিক্ষা করার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে যারা ব্রতী হয় এবং উক্ত কাজে সার্বক্ষণিকভাবে নিজেকে জড়িয়ে রাখে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

( وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ )

'মুমিনদের সুসংবাদ প্রদান করুন।'

এখানে সুসংবাদটির কথা আল্লাহ তাআলা উহ্য রেখেছেন। যেন পার্থিব-অপার্থিব সব প্রতিদানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অতএব সুসংবাদ তো প্রত্যেক মুমিনের জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু এর স্বরূপ ও পরিমাণ তাদের ইমানের বলিষ্ঠতা অনুপাতে হবে।

- ইবনে আব্বাস বলেন, 'যে ব্যক্তি উক্ত নয়টি গুণে গুণান্বিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় বলে গণ্য হবে।' (সূত্র: তাফসিরে সাদি সংক্ষেপিত)

টিকাঃ
১৩৫. সূরা আত-তাওবা : ১১২
১৩৬. সহিহু মুসলিম: ২৭০২
১৩৭. সুরা আল-আহজাব : ৪৭

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 বিনয়ী ও অনুগত বান্দা হওয়ার উপায়

📄 বিনয়ী ও অনুগত বান্দা হওয়ার উপায়


আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সিজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালের ভয় রাখে এবং আপন পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না। বলুন, "যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে?" চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।'

মুফাসসিরিনে কিরাম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, }أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتُ{ অর্থাৎ যিনি আল্লাহ ও রাসুল -এর বিধিবিধানের ক্ষেত্রে তাঁদের একান্ত অনুগত। }آنَاءَ اللَّيْلِ{ অর্থাৎ রাত্রিবেলায় আপনি যাকে তার রবের সান্নিধ্যে নামাজরত ও সিজদারত এবং নামাজান্তে দাঁড়িয়ে মধুর সুরে তাঁর আয়াতসমূহকে তিলাওয়াতরত অবস্থায় দেখবেন। ঠিক ওই সময়ে আবার তাকে আখিরাতের আজাবের ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত এবং তার মহান রবের নিকট এর থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনারত অবস্থায় দেখবেন। অপরদিকে আবার সে স্বীয় রবের অপার করুণা ও অনুগ্রহের আশাবাদী হয়ে কায়মনোবাক্যে জান্নাত কামনা করে।

• আল্লাহু আকবার! এই দ্বীনের মহত্ত্ব কত বড়! এর যাবতীয় বিধিবিধান কতই না সহজ! আমাদের রব কতই না মহান ও করুণাময়! যিনি আমাদের মতো দুর্বল চিত্তের মুসলিমদের সামান্যতম সৎকর্মের জন্যও কত উত্তম বদলা দিতে পারেন, যেই কাজগুলো করতে কোনো রকমের কষ্ট-ক্লেশ ও খেসারতের ভোগান্তি পোহাতে হয় না। বরং তিনি (আমলের কারণে আমাদের তাঁর) বিশেষ অনুগত বান্দাদের আওতাভুক্ত করে নেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ قَامَ بِعَشْرِ آيَاتٍ لَمْ يُكْتَبْ مِنَ الغَافِلِينَ، وَمَنْ قَامَ بِمِائَةِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ القَانِتِينَ، وَمَنْ قَامَ بِأَلْفِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْمُقَنْطِرِينَ
'যে ব্যক্তি (রাতের) নামাজে দশটি আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার নাম গাফিলদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে না। আর যে ব্যক্তি (রাতের) নামাজে একশ আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার নাম অনুগত বান্দাদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে। আর যে ব্যক্তি (রাতের) নামাজে দাঁড়িয়ে এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার নাম অফুরন্ত পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে।

• বিনয়ী হলো ওই ব্যক্তি, যিনি সার্বিক অকুণ্ঠ আনুগত্যের মূর্তপ্রতীক। قَائِتُ এর ব্যুৎপত্তিগত মর্ম হচ্ছে, যিনি স্বীয় রবের আদেশ পালনে ও তাহাজ্জুদ নামাজে সর্বদা সচেষ্ট।
• مُقَنْطِر এর মর্মার্থ হচ্ছে, অঢেল সম্পদ তথা অধিক প্রতিদানের যোগ্য।
• সুতরাং হে প্রিয় ভাই, আপনি কি সত্যিই উক্ত গুণে নিজেকে সজ্জিত করতে চান? তাহলে ঝটপট এ পদ্ধতিটি গ্রহণে সচেষ্ট হোন। আপনি দশ মিনিটের চেয়ে কম সময়ে আদায় করে ফেলতে পারেন। যেমন, তাহাজ্জুদের দুই বা চার রাকআত নামাজে ১০০ কিংবা একটু বেশি, ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সুরা পাঠ করলেন, ব্যাস! আপনি তো আল্লাহর বিশেষ বিনয়ী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন।
• তাই স্বীয় রবের দাসত্বের গুণে যত বেশি গুণান্বিত হতে পারবেন, আপনার পারলৌকিক প্রভূত উন্নতিও সে অনুপাতে বাড়তে থাকবে।

টিকাঃ
১৭৫. সুরা আজ-জুমার: ৯
১৭৬. সুনানু আবি দাউদ: ১৩৯৮

📘 কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হবো > 📄 ভেতরকে সংশোধন করুন

📄 ভেতরকে সংশোধন করুন


আল্লাহর নিকট বান্দার নৈকট্য ও সুউচ্চ মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো, আত্মাকে সংশোধন করা।
• তাই বাহ্যিক অবয়বকে ভেতরের আবরণের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসেবে গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিকল্প নেই। আমাদের সালাফের এ ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ ও সীমাহীন গুরুত্ব ছিল।
• তাই আত্মিক পরিশুদ্ধির সাথে অল্প আমল আত্মিক ত্রুটিযুক্ত অসংখ্য আমলের চেয়ে হাজার গুণে উত্তম।
• লুকমান নিজ পুত্রকে উপদেশ দিতেন, 'হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করো। এমন যেন না হয়, মানুষের সম্মানের আশায় তুমি নিজেকে বড় মুত্তাকি ও পরহেজগাররূপে জাহির করছ, অথচ তোমার অন্তর লৌকিকতার দোষে দুষ্ট।'
• ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'অন্তরের একটি মাত্র আমল বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসংখ্য আমলের চেয়ে উত্তম।'
• সালাফের জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'যার বাহ্যিক আমল অভ্যন্তরের সত্যিকারের মুখপাত্র হয়ে যায় এবং উভয়ের মাঝে কোনো বৈপরীত্য না থাকে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে একনিষ্ঠ বান্দা।'
• আবু দারদা বলেন, 'নিফাকের অধীনতা থেকে রবের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো।' তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'নিফাকের অধীনতা বলতে কী বোঝায়?' তিনি বলেন, 'শরীর বাহ্যিকভাবে বিনয়ী ও একনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও অন্তর লৌকিকতা থেকে মুক্ত না হওয়া।'
• অদ্ভুত এক সমস্যা: মানুষ যখন একাকী কোথাও থাকে, রবের অবাধ্যতা আরম্ভ করে, অথচ তিনি অন্তর্যামী। লোকচক্ষুর অন্তরালে সম্পাদিত পাপকে গোপন রাখতে তাকে বেশ সচেষ্ট দেখা যায়, বাস্তবে সে আল্লাহর হুকুমের কোনো পরোয়াই করে না। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ।
• মানুষকে জবাব দেওয়ার জন্য সে হাজারও হিসাব কষে; কিন্তু তার মহান রবকে জবাব দেওয়ার জন্য সামান্য আত্মপর্যালোচনা পর্যন্ত করে না।
• কারণ, তার নিকট রবের সম্মানের চেয়ে মানুষের সম্মান অনেক বেশি!
• আল্লাহর সাথে আদব রক্ষার চেয়ে মানুষের সাথে আদব রক্ষার দিকটাই তার নিকট প্রাধান্য পায়।
• আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়ার চেয়ে মানুষের সামনে লজ্জিত হওয়াকে সে বেশি ভয় করে।
• কোনো অপরাধের দরুন মানুষের কাছে তো কত কাকুতি-মিনতি করে, অথচ দ্বীনি ব্যাপারে কোনো ঘাটতি দেখা দিলে, খাঁটি তাওবার মাধ্যমে কোনো অপারগতা পর্যন্ত প্রকাশ করে না। বিপদে তার প্রতিপালকের নিকট ধরনা না দিয়ে কদাকার মানুষের কাছেই ধরনা দেয়। (আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন।)
আল্লাহ বলেন: ﴿مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا ﴾

'তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব আশা করছ না।'

কে সবচেয়ে বুদ্ধিমান?

সত্যিকারের বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে মাখলুকের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও রবের সন্তুষ্টিকেই প্রাধান্য দেয়। পক্ষান্তরে যে এর বিপরীতে চলে, আল্লাহ তার অন্তরকে পরিবর্তন করে দেন। ফলে সে পাপাচারকে তার রবের সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদন করতে থাকে।
• সালাফের জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'তুমি আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে নীচু না হওয়ার চেষ্টা করো। এবং পাপের লঘুতার দিকে লক্ষ না করে কার অবাধ্য হচ্ছ, তার প্রতি একটু দৃষ্টি নিবদ্ধ করো।
• বিলাল বিন সাদ বলেন, 'গুনাহর ক্ষুদ্রতার দিকে লক্ষ করো না, বরং দেখো, তুমি কার অবাধ্যতা করছ?'
• তাই আল্লাহর রাসুল ﷺ তাশাহুদের পর সালামের পূর্বে এই দুআটি পাঠ করতেন: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَرْتُ، وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، وَمَا أَسْرَفْتُ، وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ 'হে আল্লাহ, আপনি আমার পূর্বের ও পরের, গোপন ও প্রকাশ্যের, আমার বাড়াবাড়িমূলক এবং আমার যেসব অপরাধের ব্যাপারে আপনি ভালো জানেন, সব ক্ষমা করে দিন। আপনিই অগ্রে প্রেরণকারী, আপনিই পশ্চাতে প্রেরণকারী। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।'
• আল্লাহর কত বান্দা শুধু তার অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার দরুন আখিরাতের কতই না উঁচু মাকাম ও মর্যাদা অর্জন করছেন, অথচ তাদের দুনিয়াবি কোনো সার্টিফিকেট ও উন্নত পদ-পদবি ছিল না। তারা তেমন বেশি ইবাদত-বন্দেগিও করতেন না। মানুষের কাছেও তেমন সম্মানি ছিলেন না।
• আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরের অবস্থার প্রতিই লক্ষ করেন।
• আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন : إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالَكُمْ 'আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও ধন-সম্পদ দেখেন না। বরং তোমাদের অন্তর ও কর্মসমূহ দেখেন।'
• সুতরাং মহান রব দুনিয়াবি সার্টিফিকেট, জমি-জমা, সম্পদের আধিক্য, উন্নত জীবনযাপন প্রভৃতির দিকে বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ করেন না। স্রেফ এ ধরনের দুনিয়াবি চাকচিক্য আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করতে পারে না।
• রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'কিয়ামতের দিন শারীরিক দিক দিয়ে মোটা তাজা—এমন কতক লোককে আল্লাহর সমীপে উপস্থিত করা হবে, অথচ আল্লাহর নিকট মশার ডানার পরিমাণও তাদের মূল্য থাকবে না। তোমরা এই আয়াতটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ করো: فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا 'সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোনো গুরুত্ব স্থির করব না।”
• বাস্তবিক অর্থে আপনার ইমান, নিষ্ঠতা, সততা, তাওয়াক্কুল, দৃঢ় বিশ্বাস, আন্তরিক পবিত্রতা ও স্বচ্ছতাকেই আল্লাহর কাছে মাপার জন্য উত্তোলন করা হবে। বাকি সব খড়কুটার মতো ফেনা আকারে তলিয়ে যাবে।
• বিলাল বিন সাদ বলেন, 'তুমি বাহ্যিকভাবে রবের একান্ত বন্ধু আর অভ্যন্তরীণভাবে চরম শত্রু হোয়ো না। তুমি কি জানো, সেটি যে নিফাকের আলামত!'
• হাসান বসরি বলেন, 'নিফাকের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, অন্তর ও মুখের মাঝে বিপরীত হওয়া এবং বাইরের সাথে ভেতরের মিল না থাকা।'
– আলিমগণ বলেন, 'ওই ব্যক্তি হচ্ছে নিফাকের সবচেয়ে নিকটবর্তী, যে নিজেকে নিফাক থেকে পূত-পবিত্র মনে করে।'
এক ব্যক্তি হুজাইফা -কে বললেন, 'আমি নিফাক নিয়ে খুব বেশি ভীত-সন্ত্রস্ত।' তখন তিনি বললেন, 'যদি তুমি সত্যিকারের মুনাফিক হতে, তাহলে তুমি কখনো নিফাকের ব্যাপারে ভয় করতে না।'
ইবনে আবি মুলাইকা বলেন, 'আমি ৩০ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি। তারা সকলেই নিজের ব্যাপারে নিফাক নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন।' বস্তুত, এ কারণেই তাদের অবস্থা সামান্য পরিবর্তন হলে নিজের ব্যাপারে তারা নিফাকের ভয়ে মুহ্যমান হয়ে যেতেন। কেননা, নিফাক হচ্ছে আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরের উদাসীন হওয়া, মহান রবের রহমত থেকে বিমুখ ও তাঁর শাস্তি থেকে বেপরোয়া হওয়া প্রভৃতি—নাউজুবিল্লাহি মিন জালিকা—এমন নয় যে, আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও পরকালের ব্যাপারে তারা সন্দেহ পোষণ করতেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 'গান-বাদ্য অন্তরে নিফাকের বীজ বপন করে। যেমনিভাবে পানি ফসল ফলায়।'

আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরের উদাসীনতা, অন্য কারও বিষয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত হওয়া এবং তাঁর অবাধ্যতার মধ্যে মজে থাকার কারণে অন্তরে নিফাক সৃষ্টি হয়।

গোপনীয় বিষয়ের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন
ইবনুল জাওজি বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি এমন কতক লোককে দেখেছি, যারা নামাজ, রোজা ও চুপ থাকার আধিক্যের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; অথচ, মহান রবের বিন্দুমাত্র বড়ত্ব ও মর্যাদা তাদের অন্তরে নেই।

আবার এমন কতককে দেখেছি, যারা সর্বদা নিজেকে উন্নতমানের পোশাকে সজ্জিত রাখে এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা করে না, তারাই হলো সেসব লোক, যারা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনাবলি ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়।'

• অতএব, আপনার ভেতরকে সংশোধনে সচেষ্ট হোন। আনাস বলেন, 'কেউ আছে, বাহ্যিকভাবে সে অধিক (নফল) নামাজ-রোজা ও অন্যান্য ইবাদত করে না, কিন্তু তার অন্তরের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা তাকে অনেক উঁচু মর্তবায় পৌঁছিয়ে দেয়।'

• সুতরাং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আল্লাহকে খুব বেশি ভয় করুন। কারণ, অন্তরের কলুষতা সবকিছুকেই ছাড়িয়ে যায়। যদিও বাহ্যত যত অধিক ইবাদতগুজার হোন না কেন।
• আত্মার ব্যাধির প্রতিকার: রাবি বিন খুসাইম বলেন, 'অন্তরের ব্যাধির প্রতিকারের বিষয়ে মনোযোগী হও। আর তার একমাত্র চিকিৎসা খাঁটি মনে তাওবা করা, যাতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।'

টিকাঃ
১৮০. সুরা নুহ: ১৩
১৮১. সহিহু মুসলিম: ৭৭১
১৮২. সহিহু মুসলিম: ২৫৬৪
১৮৩. সুরা আল-কাহফ: ১০৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00