📄 ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করার উপায়
• ইবনে কাসির এর ব্যাখ্যায় বলেন: 'পরিশ্রম, উৎসাহ ও কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আঁকড়ে ধরো।'
রাসুলুল্লাহ বলেন: الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ، خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيف، وَفِي كُلِّ خَيْرٌ
'শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিন অপেক্ষা উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে।'
ইমাম নববি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এখানে মূলত শক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অন্তরের দৃঢ়তা ও পরকালের বিষয়াবলিতে বিচক্ষণতা ইত্যাদি। সুতরাং এ গুণের অধিকারীমাত্রই অবধারিতভাবে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হবে।
১. এরূপ ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে শত্রুর বিরুদ্ধে অধিক অগ্রগামী হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে বের হওয়া ও তাদের অন্বেষণে ধাবমান হওয়ার ক্ষেত্রে অধিক দ্রুতগামী হবে।
২. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সে হবে খুবই দৃঢ়সংকল্প।
৩. তার মধ্যে থাকবে সব ধরনের দুঃখ, কষ্ট ও নির্যাতনের ওপর সংযম ও ধৈর্যধারণের ক্ষমতা এবং আল্লাহর জন্য অধিক কষ্টক্লেশ কাঁধে তুলে নেওয়ার সক্ষমতা।
৪. সর্বোপরি নামাজ, রোজা, আজকার ও অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে সে হবে অধিক আগ্রহী ও সবার অগ্রগামী। এগুলোর খোঁজে সে থাকবে অধিক তৎপর এবং যেকোনো ইবাদাত-সম্পাদনে অধিক যত্নবান।
৫. রাসুল-এর বাণী, )وَفِي كُلِّ خَيْرٌ( এর মর্মার্থ হচ্ছে 'দুর্বল ও সবল প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ইমানের ক্ষেত্রে দুজনেই মুমিন হওয়ার কারণে। অধিকন্তু দুর্বল ব্যক্তি কিছু ইবাদত কম হলেও তো করেছে, সে হিসেবে শুধু সবলের মধ্যেই কল্যাণ সীমাবদ্ধ নয় বরং দুর্বলের মধ্যেও কল্যাণ নিহিত রয়েছে।'
ইবাদতই শক্তির মূল উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿ وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ ﴾
'আর হে আমার কওম, তোমাদের পালনকর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির ওপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মতো বিমুখ হয়ো না।'
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর দাসত্ব করে, তার শক্তি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং যে অলসতা করে, তার দুর্বলতা ও অবসন্নতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।' সারি আস-সাকাতি বলেন, 'শক্তির মধ্যে অধিক সুদৃঢ় ও প্রভাব বিস্তারকারী হচ্ছে, যা তোমার অন্তরকে পরাস্ত করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আপন নফসকে দীক্ষাদানে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, সে অন্যের আত্মা পরিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অধিক অক্ষম হবে।'
ইরাদা বা সংকল্প সঠিক হওয়ার চিহ্নসমূহ
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়ার কয়েকটি লক্ষণ হলো: ১. সংকল্পকারীর অভিপ্রায় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া। ২. তাঁর সাক্ষাতের জন্য সদা উদগ্রীব থাকা ও মুলাকাতের প্রস্তুতিতে ব্যাপৃত থাকা। ৩. এমন সময়ের ওপর ব্যথিত হওয়া ও আক্ষেপ করা, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে অতিবাহিত হয়েছে। ৪. ওই নোংরা কর্মের সাথে নিবিষ্টতার জন্য আফসোস করা। ৫. উল্লিখিত সবকিছুর সমষ্টিগত চিহ্ন হলো, সকাল হোক বা সন্ধ্যা তার স্বপ্ন, উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষা সবকিছু যেন মহান প্রতিপালককে ঘিরেই হয়।
ইচ্ছাশক্তির দৃঢ়তা ও মনোবল বাড়ানোর উপায়
১. আল্লাহ, তাঁর গুণাবলি, তাকদির ইত্যাদির ওপর ইমান বাড়ানোর উপাদানগুলো শক্তিশালী করা এবং তাঁর ওপর সঠিক ভরসা ও ভালো ধারণা পোষণের উপকরণকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করা।
২. নফসের কুপ্রবৃত্তি ও তার নোংরা কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ।
৩. বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। যেমন, সঠিক নিয়মানুবর্তিতা ও যত্নের সাথে নামাজ পড়া। কেননা, আল্লাহর ভয়, বিনয় ও একাগ্রতার সহিত নামাজ সম্পাদন মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে অনেক শক্তিশালী করে তোলে। তেমনিভাবে রোজাকে অধিক গুরুত্ব ও যত্নসহকারে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুণ্য ও প্রতিদান লাভের আশায় পালন করা। একইভাবে অন্য সকল ইবাদত স্বীয় ইচ্ছাশক্তি দৃঢ়করণের অন্যতম মাধ্যম।
৪. আবশ্যিকভাবে আল্লাহর সমস্ত আদেশের আনুগত্য করা এবং তাঁর নিষেধাবলি থেকে বিরত থাকা। বাধা-বিপত্তি আসার পূর্বে কল্যাণের কাজগুলোর দিকে দ্রুত অগ্রগামী হওয়া। এসব কাজে নিয়তকে পরিশুদ্ধ ও দৃঢ় করা।
৫. মুমিন বিভিন্ন উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও নিয়তের পরিশুদ্ধতাকে শক্তিশালী করতে পারে। যেমন, অধিক হারে আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, বেশি বেশি ইসতিগফার, দুআ ইত্যাদি।
৬. সবর্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভকেই কাজের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানানো। কল্যাণের কাজে ইচ্ছাশক্তি ও সংকল্পকে দৃঢ় করা। তেমনিভাবে আল্লাহর মহাপুরস্কার জান্নাত লাভ এবং মুত্তাকিদের জন্য তিনি যেসব নিয়ামত বরাদ্দ করে রেখেছেন, সেগুলোর যথাযথ উপলদ্ধিও সংকল্পকে বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীও সদা অন্তরে স্মরণ ও জাগরূক রাখার মাধ্যমে সংকল্পের ভিত মজবুত করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى. 'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।'
৭. কর্মক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় অবলম্বন, নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করা, কাজের সুষম বণ্টন ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; সর্বোপরি নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও অরাজকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিরত রাখা।
৮. ইচ্ছাশক্তি তথা সংকল্পের দৃঢ়তা বৃদ্ধিকারী বিষয়াদির মধ্য থেকে সৌভাগ্যসূচক 'ফাল' নেওয়াও অন্যতম এবং অশুভ লক্ষণ গ্রহণ থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখা। তবে শর্ত হলো, সব সময় আল্লাহর ব্যাপারে পূর্ণ সুধারণা পোষণ করা।
৯. ক্রোধের সময় নিজেকে ধরে রাখা, ভারসাম্য রক্ষা করা, অন্য কারও সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে নফসের রুদ্রমূর্তি ধারণের সময় নিজের একঘেয়েমি ও জিদকে দমন করা এবং তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
১০. কোনো অঘটন ও বালা-মুসিবতকে সংযমের সাথে হাসিমুখে বরণ করা। হারানো কোনো বিষয়ের জন্য খুব বেশি হতাশাগ্রস্ত না হওয়া এবং এ থেকে সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত থাকা। দুঃসাধ্য ও নাগালের বাইরের বিষয়াবলি অর্জন করার পেছনে না পড়া। তেমনই যা কিছু বাস্তবায়ন অসম্ভব, এরূপ কাজের জন্য অযথা সময় নষ্ট করে তার পেছনে বারবার না দৌড়ানো। (সূত্র: আল-আখলাকুল ইসলামিয়্যাহ)
টিকাঃ
৪. সুরা মারইয়াম: ১২
৫. সহিহু মুসলিম: ২৬৬৪
৬. সুরা হুদ: ৫২
৭. সুরা আন-নাজিআত: ৪০-৪১
📄 উন্নতি-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য আত্মার খোরাক
আল্লাহর পথের পথিক সেই সব সোনালি মনীষীদের মর্যাদায় আরোহণের জন্য কতিপয় শক্তিবর্ধক রুহানি আহার্য ও স্বতঃস্ফূর্ত পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত আবশ্যক। যা তার জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি ও আখিরাতে আল্লাহর নিকট মহান মর্যাদা লাভের ক্ষেত্রে সহায়করূপে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
১. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা, বিনয়, নম্রতা, সার্বক্ষণিক তাঁর মুখাপেক্ষিতা। সাথে সাথে তাঁর স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদতের জন্য সর্বদা তাঁর কাছে সহায়তার নিবেদন প্রভৃতি মূলত সফলতার চালিকাশক্তি। তাই তো রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রত্যেক নামাজের পর নিম্নোক্ত দুআপাঠে আমাদের উৎসাহিত করেছেন :
اَللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
'হে আল্লাহ, আপনার জিকির, কৃতজ্ঞতা ও উত্তম ইবাদতে আমাকে সাহায্য করুন।'
• শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ জন্যই সর্বদা এই দুআর মাধ্যমে সিজদায় প্রার্থনা করতেন এবং বারবার তা আবৃত্তি করতেন।
২. এই দুআগুলো পাঠে অধিক মনোযোগী হওয়া অর্থাৎ নামাজের ভেতরে কিংবা বাইরে, আপনার ওঠাবসা, গমনাগমন এমনকি আপনি যখন ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে দাঁড়িয়ে যান, সর্বত্রই এই দুআগুলোকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। তেমনিভাবে প্রতীক্ষার বিরক্তিকর মুহূর্তে, আরামদায়ক বিছানায়, কর্মব্যস্ততার ফাঁকে। তাহলে অচিরেই সফলতা আপনার পদচুম্বন করবে। নিম্নে এরূপ কিছু দুআর নমুনা দেওয়া হলো :
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ)
'হে আমাদের প্রতিপালক, দুনিয়াতে আমাদের কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতে কল্যাণ দান করুন। আর জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করুন।'
রাসুলুল্লাহ সবচেয়ে বেশি এই দুআ করতেন। এতে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য।
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ ، بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
'হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের অসিলায় আমি আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দিন এবং আমাকে আমার নফসের সমীপে চোখের পলকের জন্যও সোপর্দ করবেন না।'
রাসুলুল্লাহ স্বীয় কন্যা ফাতিমা -কে সকাল-সন্ধ্যা এ দুআটি পড়ার জন্য নসিহত করেছিলেন।
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
'আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও ইবাদত করার কোনো শক্তি নেই।'
এই দুআটি জান্নাতের ধনভান্ডারের অন্যতম। কেননা, এতে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিষয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনার উত্তম হাতিয়ার।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ. *
'আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিশ্চয় আমি জালিমদের অন্তর্গত।'
এই দুআর বরকতে আল্লাহ ইউনুস কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই পবিত্র বাক্যে এমন নিগূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে, যা এটি পাঠে অভ্যস্ত ও এর স্বাদ আস্বাদনকারী ব্যতীত কেউ উপলব্ধি করতে পারে না।
৩. অধিক হারে ইসতিগফার করা। কেননা, ইসতিগফারকারীকে আল্লাহ দুশ্চিন্তা ও সংকট থেকে মুক্তি দেন। এমনভাবে তার রিজিকের ব্যবস্থা করেন, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। তার হায়াতে বরকত দেন। সর্বোপরি এটিই সাফল্য, প্রবৃদ্ধি ও উন্নতির অন্যতম মাধ্যম; যেমনটি কুরআনে এসেছে। সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ইসতিগফারকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা অনুচিত। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ইসতিগফার যেন আপনার সাথি হয়। সালাফের বাণীতে আছে, আপনার সকাল যেন হয় তাওবারত অবস্থায় আর বিকেলও যেন হয় তাওবারত অবস্থায়।
৪. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। তাকওয়া মানে আল্লাহর হুকুম পালন করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা। সুতরাং যে চায় ইলমের বদ্ধদুয়ার তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাক, সে যেন তাকওয়া অবলম্বন করে। কেননা, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন :
﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا ﴾
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।'
• তাই তাকওয়া অবলম্বন না করার অনিবার্য খেসারত হচ্ছে ইলমের পথ কণ্টকাকীর্ণ হয়ে যাওয়া ও আল্লাহর পথ থেকে ছিটকে যাওয়া।
৫. জান্নাতের নিয়ামতের বর্ণনা সম্বলিত আয়াত পাঠ করতে থাকা এবং আল্লাহ তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত মুমিন বান্দাদের জন্য যে উপহার প্রস্তুত করে রেখেছেন, তা জানা।
৬. সালাফে সালিহিনের জীবনীগ্রন্থ অধ্যয়ন। তাঁদের সুমহান চরিত্র, আল্লাহভীতি, রবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক, দুনিয়াবিমুখতা ইত্যাদি গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা।
৭. সফল ও সাহসী লোকদের সংশ্রব গ্রহণ। যাদের সাক্ষাৎ আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা, তাদের সাহচর্য মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং অনুপম নৈতিক চরিত্র গঠনে আশ্চর্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
• ইবনুল জাওজি এ বলে দুআ করতেন, 'বাতিলদের সংশ্রব থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'
৮. আমলের ফজিলতসংক্রান্ত বইপুস্তক অধ্যয়নে মনোনিবেশ করা। যাতে আল্লাহ তাআলা পুণ্যকর্মের কী প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন, জানা যায়। যা নেক কাজে আগ্রহ বাড়াতে জাদুর ন্যায় কাজ করে।
• একটি প্রজ্ঞাময় বাণী: প্রতিদানের গভীর উপলব্ধি কাজের কষ্ট অনেক কমিয়ে দেয়।
৯. অধিক হারে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও তাঁর প্রশংসা করা। আপনার যেকোনো দ্বীনি নিয়ামত অর্জনে এটি স্বীকার করতেই হবে যে, তা একমাত্র আল্লাহর তাওফিকের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ﴾
'তোমরা শুকরিয়া আদায় করলে আমি নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেবো।'
• সুতরাং যখন আপনি সফলতার রাজপথে একটু একটু অগ্রসর হতে শুরু করবেন, তখনই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করবেন; যেন তিনি আপনাকে চূড়ান্ত গন্তব্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করান।
১০. কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলা।
• ইবনে কুদামা বলেন, 'সবার উচিত নিজেকে কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত করে তোলা। কেননা, যে ব্যক্তি নিজেকে কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতায় অভ্যস্ত করে তুলবে, সে একদিন অবশ্যই এর ওপর বিজয়ী হবে।'
• হে আমার ভাই, আপনি যদি আপনার জীবনে এই নিবেদনটুকু বাস্তবায়ন করেন, তবে ইনশাআল্লাহ, জীবনের অনেক তিক্ত ও জটিল সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবেন। আর এই মানহাজ বা কর্মপন্থা অনুসরণের মাধ্যমে আপনার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদায় আরোহণ করবেন।
টিকাঃ
৮. সুনানু আবি দাউদ: ১৫২২
৯. সুরা আল-বাকারা: ২০১
১০. মুস্তাদরাকুল হাকিম: ২০০০
১১. সহিহুল বুখারি: ৬৩৮৪
১২. সুরা আল-আম্বিয়া: ৮৭
১৩. সুরা আত-তালাক: ৪
১৪. সুরা ইবরাহিম: ৭
📄 আত্মার পরিচর্যার কতিপয় পদক্ষেপ
চরিত্র ও আত্মশুদ্ধির বোদ্ধারা বলেন, আত্মার পরিচর্যা, তার পরিশুদ্ধি ও পবিত্রকরণে চারটি পদক্ষেপ রয়েছে। যে ওইগুলো দৃঢ়ভাবে কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে অর্জন করবে, সে অবশ্যই তার আত্মশুদ্ধিতে সফল হবে। যা নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে আলোকপাত করা হলো।
১. সকল পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে তাওবা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾
'হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যেন তোমরা সফলতা লাভ করো। '
আল্লাহ তাআলা তাওবাকে সফলতা ও কামিয়াবির অন্যতম উপায় হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত ও অসংখ্য হাদিসে তাওবার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
তাওবার কতিপয় শর্ত
- কৃত পাপের ওপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
- তার পুনরাবৃত্তি না ঘটানোর ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
- পাপাচার থেকে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে পৃথক করে নেওয়া।
- মানুষের যাবতীয় পাওনা পরিশোধ করে দেওয়া।
২. মুরাকাবা তথা স্বীয় রবের ধ্যানে মগ্ন থাকা
অর্থাৎ মুসলিম ব্যক্তি তার সব কথা ও কাজে স্বীয় রবের দৃষ্টির আওতাধীন হওয়ার ব্যাপারে অনুভব করা, এমনকি তার অন্তরের গোপন চিন্তাধারার ব্যাপারেও। যার ফলশ্রুতিতে রবের বড়ত্ব, তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ভয় গভীরভাবে উপলব্ধি হবে। এবং এই ধারণাও বদ্ধমূল হবে যে, আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই গোপন নয়। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজের ব্যাপারে বলেন:
﴿ يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴾
'চোখের খিয়ানত ও অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।'
৩. মনে মনে নিজের হিসেব নিজে করা
অর্থাৎ মুমিন ব্যক্তি তার প্রত্যেক কাজকর্মে সর্বদা নিজের ব্যাপারে এমনভাবে হিসেব নেওয়া, যেমন কোনো পার্টনার (অংশীদার) অপর পার্টনার থেকে চুলচেরা হিসেব নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴾
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।'
• উমর বিন খাত্তাব বলেন:
'তোমরা জিজ্ঞাসিত হওয়ার পূর্বে নিজ নফস থেকে হিসাব নাও এবং তাকে পাকড়াও করো। আর তোমাদের আমলসমূহকে পাল্লায় পরিমাপ করার পূর্বে নিজেই পরিমাপ করে দেখো।'
নির্জন অবস্থায় নিজের থেকে হিসাব নাও
ইবনুল জাওজি বলেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, নির্জনতায় তোমার অন্তর থেকে হিসাব নাও। এবং তোমার আয়ু ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ার ওপর ক্ষণিক ভাবো। দুর্যোগ ও ব্যস্ততায় নিজেকে গ্রাস করে নেওয়ার পূর্বে অবসরে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নাও।'
তাই আপনার আমলনামায় লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে একটু চিন্তা করে দেখুন। এবং খুব ভালোভাবে লক্ষ করুন, আপনার কঠোর পরিশ্রম ও আত্মশুদ্ধির সময় নফস তথা অন্তরাত্মা আপনার সঙ্গ দেয় নাকি বিরুদ্ধে চলে যায়।
আল্লাহর শপথ, যে নিজ নফসের সাথে হিসাব কষে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, তার বৈধ অধিকারগুলো আদায়ে সচেষ্ট হয় এবং যখনই নফস ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে পড়ে, তাকে ভর্ৎসনা করে, একমত পোষণ করলে তাকে উৎসাহ দিয়ে বুকে টেনে নেয় এবং যখনই কোনো কুপ্রবৃত্তি, অবৈধ কামনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে প্রচেষ্টা চালায়, কঠোর প্রতিরোধের মাধ্যমে তা বাধা দেয়, উক্ত ব্যক্তি অবশ্যই সফলকাম ও বিজয়ী।
সুতরাং যে কেউ নিজ আত্মার পরিশুদ্ধিতে ইচ্ছুক, তাকে অবশ্যই নফসের সাথে এমনভাবে লড়াই করতে হবে, যার দরুন সে এমন কতক উপাসনা, আনুগত্য ও অবাধ্যতা পরিহারের ওপর অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যার সাথে পূর্বে তার কখনো যোগসূত্র ঘটেনি।
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا )
'আর যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি তাদের অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব।'
প্রাথমিক অবস্থায় যদিও নানা ধরনের ক্লান্তি, অবর্ণনীয় কষ্ট ও কাঠিন্যতা অনুভব হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে কঠোর অনুশীলন ও নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে সব বিষয় তার জন্য সহজ হয়ে যায়। বস্তুত, ইহাই বাস্তব অভিজ্ঞতা। কষ্টকে জোর করে অনুভব করা কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইবনুল জাওজি বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি কখনো নফসের সাথে সংগ্রামের ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করে না। কেননা, নফসের সাথে সংগ্রামই তাকে সফলতার পথে এগিয়ে নেয়।' সুতরাং তার ওপর কঠোর নজরদারি করুন। এবং তার পক্ষ থেকে কল্যাণকর যাই পান না কেন, সে ব্যাপারে সুযোগের সদ্ব্যবহার করুন। কেননা, আপনি যদি প্রাপ্ত কষ্টটাকে আলাদাভাবে অনুভব করেন, তাহলে আপনি প্রকৃত কষ্টের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবেন। নফস যদি আপনার পক্ষ থেকে সামান্য অমনোযোগিতাও পায়, তা সে লুফে নিয়ে আপনাকে পদচ্যুত করতে কালক্ষেপণ করবে না।
• আত্মশুদ্ধির উলামায়ে কিরাম বলেন:
যে ব্যক্তি নিজেকে কোনো বিষয়ের ওপর অভ্যস্ত করে তুলতে ইচ্ছুক, সে যেন উক্ত কাজে ২১ দিন পর্যন্ত নিজেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়োজিত রাখে। অতঃপর তার জন্য ওই কাজটি অকল্পনীয় আকারে সহজ হয়ে যাবে। চাই তা আনুগত্যের বিষয়ে হোক কিংবা অবাধ্যতা থেকে পরিত্রাণের ব্যাপারে হোক।
টিকাঃ
৭০. সুরা আন-নুর: ৩১
৭১. সুরা গাফির: ১৯
৭২. সুরা আল-হাশর: ১৮
৭৩. সুরা আল-আনকাবুত : ৬৯
📄 অনুপম চরিত্র গঠনের উপায়
আল্লাহর রাহে সফলতা-প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য উত্তম-অনুপম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার বিকল্প নেই। তাই শুধু অত্যধিক ইবাদত, আল্লাহর জিকির ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য সত্ত্বেও মানুষের সাথে কারও খারাপ সম্পর্ক থাকলে ওই ইবাদত-বন্দেগির প্রকৃত সুফল ভোগ করা থেকে সে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। তাকে অবশ্যই রাসুল -এর আদর্শে পূর্ণ আদর্শবান হতে হবে। (রাসুলুল্লাহ -এর চরিত্রের প্রশংসায়) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ )
'আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।'
অর্থাৎ হে সম্মানিত রাসুল, আপনি নিশ্চয় সুমহান চরিত্রের অধিকারী। আর তা হচ্ছে, কুরআনে বর্ণিত সৎ চরিত্রের যেসব সুন্দর দিক রয়েছে, সেগুলোর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কেননা, কুরআনের পরিপূর্ণ অনুকরণই ছিল মূলত রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ। কুরআনের আদেশ বাস্তবায়ন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকাই ছিল তাঁর পবিত্র জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ও ব্রত।
• আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا وَلَا مُتَفَحِّشًا، وَإِنَّهُ كَانَ يَقُولُ: إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا
'রাসুলুল্লাহ জন্মগতভাবে বা ইচ্ছাপূর্বক অশ্লীলভাষী ছিলেন না। তিনি এরূপ বলতেন যে, "তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।”'
• আবু দারদা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ صَاحِبِ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ
'কিয়ামত দিবসে মুমিন ব্যক্তির আমলনামায় সুমহান চরিত্র থেকে অধিকতর কোনো ভারী বস্তু থাকবে না। কেননা, অশ্লীল ও রূঢ় স্বভাবের অধিকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ একদমই পছন্দ করেন না।'
- আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত:
سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الجَنَّةَ، فَقَالَ: تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الخُلُقِ، وَسُئِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ، فَقَالَ: الفَمُ وَالفَرْجُ.
“রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে?” তিনি তদুত্তরে বললেন, "তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র।" এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে?" তিনি তদুত্তরে বললেন, "জবান ও লজ্জাস্থান।”
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'রাসুল ﷺ তাকওয়াকে উত্তম চরিত্রের সাথে একীভূত করেছেন। কেননা, তাকওয়া হচ্ছে এমন এক ফলপ্রসূ মাধ্যম, যা বান্দা ও রবের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের সূতিকাগার হিসেবে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সৃষ্টিকুলের সাথেও সুন্দর সম্পর্ক তৈরিতে উত্তম চরিত্র যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। সুতরাং একদিকে আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি করে তো অন্যদিকে তা সাধারণ লোকদের সুচরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে ভালোবাসতে আহ্বান করে।'
উত্তম চরিত্র অর্জনের জন্য কতিপয় আবশ্যকীয় বিষয়
১. উত্তম বস্তু খরচ করা। অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে, কথা ও কাজ ইত্যাদি যেকোনো মাধ্যমে মানুষদের সাহায্য করা এবং তাদের সমূহ কল্যাণ সাধনে সর্বদা তৎপর থাকা।
২. মুসলিমদের থেকে মন্দবিষয়ক বস্তুর অপসারণ, অর্থাৎ হাত ও পা অথবা অন্য কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দ্বারা মানুষকে কষ্ট না দেওয়া; বরং তাদের কষ্ট দূরীকরণে সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৩. প্রত্যেক মুমিন ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।
৪. নিজের মধ্যে ইমানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যাবলি জাগরূক রাখা। যেমন: ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সহনশীলতা, অন্যের প্রতি দয়া ও উপকার, নিষ্ঠার সাথে উপাসনা, বিনয়-নম্রতা এবং যত্রতত্র ক্রোধান্বিত না হওয়া। তেমনিভাবে অহেতুক অভিসম্পাত, গালমন্দ ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ না করা; বরং সর্বদা সত্যবাদী, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পবিত্র ও অত্যধিক পরিশুদ্ধ হওয়া।
৫. নিজের সকল কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পাদন করা। লোকদেখানো ও তাদের প্রশংসা অর্জনের জন্য না হওয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ আপন প্রতিপালকের নিকট ফরিয়াদ করতেন :
اللَّهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَعْمَالِ وَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَقِنِي سَيِّئَ الْأَعْمَالِ وَسَيِّئَ الْأَخْلَاقِ لَا يَقِي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
‘হে আল্লাহ আমাকে উত্তম আমল ও উত্তম চরিত্রের দিশা দিন, যা আপনি ছাড়া কেউ দান করতে পারে না। এবং মন্দ কর্ম ও মন্দ চরিত্র থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন; কেননা, সব ধরনের মন্দ থেকে আপনি ব্যতীত কেউ বাঁচাতে পারে না।’
সবচেয়ে মারাত্মক রোগ - আহনাফ বিন কায়িস বলেন, “আমি কি তোমাদের সর্বনিকৃষ্ট ও জঘন্য রোগের ব্যাপারে অবহিত করব না?” তদুত্তরে উপস্থিত লোকেরা বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তখন তিনি বললেন, “তা হলো, মন্দ চরিত্র ও অশ্লীল জবান।”
- রাসুলুল্লাহ ﷺ তাই সর্বদা নিম্নোক্ত দুআ পাঠ করতেন :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلَاقِ، وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ
'হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট মন্দ চরিত্র, মন্দ কর্ম ও কুপ্রবৃত্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'
চরিত্রের মন্দ দিকসমূহ
চরিত্রের সার্বিক নিন্দনীয় দিকসমূহ, যেমন: অহংকার, হিংসা, আত্মতুষ্টি, অন্যের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ইত্যাদি।
মন্দকর্ম : যেমন সব ধরনের অবৈধ কথাবার্তা—পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, গাল-মন্দ প্রভৃতি।
তেমনিভাবে অবৈধ সব কর্মকাণ্ড, যেমন: মদ্যপান, ব্যভিচার, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, সুদ ও চৌর্যবৃত্তি ইত্যাদি।
প্রবৃত্তির মন্দনীয় দিকসমূহ
- বাতিল আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করা, অর্থাৎ ওই সব আকিদা-বিশ্বাস, যা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালিহিনের বিশ্বাসের স্পষ্ট বিপরীত, যা বিভিন্ন ভয়ংকর মতবাদের ধ্বজাধারী ব্যক্তিরা পোষণ করে থাকে। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফ তথা সাহাবা, তাবিয়িন, তাবে তাবিয়িনের লালিত বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাসের শিক্ষা অর্জন করতে হবে।
- মন্দ উদ্দেশ্যাবলি: কথা কিংবা কর্ম সম্পাদনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও সন্তুষ্টি অর্জন মুখ্য উদ্দেশ্য থাকা এবং পুণ্যকর্মের মাধ্যমে পার্থিব কোনো তুচ্ছ স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্য থাকা। যেমন: নেতৃত্বের লোভ, প্রসিদ্ধি ও অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকা প্রভৃতি।
অপছন্দনীয় ও মন্দনীয় রোগব্যাধি যথা: অন্ধত্ব, কুষ্ঠরোগ, পাগলামি অন্যান্য নিকৃষ্ট রোগব্যাধি। এর দ্বারা সব ধরনের রোগব্যাধি উদ্দেশ্য নয়। কেননা, ছোট-খাটো কোনো রোগব্যাধি তো মানুষের সাথে বিভিন্ন সময় লেগেই থাকে।
উত্তম চরিত্রের সংজ্ঞা
উত্তম চরিত্রের মর্ম হলো, নিজে কষ্ট সহ্য করে হলেও অন্যের কষ্ট দূরীকরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
উত্তম চরিত্র হলো নিজের সব সৌন্দর্যটুকু ঢেলে দেওয়া ও মন্দা বিষয়াবলি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে রাখা।
অথবা উত্তম চরিত্র হচ্ছে, মন্দ ও সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে মুক্ত হওয়া এবং যাবতীয় কল্যাণকর ও পুণ্য কর্ম দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করা।
• ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'চরিত্র হচ্ছে ধর্মের আয়নাস্বরূপ। সৎ চরিত্র বৃদ্ধি পাওয়া মানে ধর্মীয় স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাওয়া।'
• সমস্ত উত্তম চরিত্রের উৎস সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'উত্তম চরিত্র মূলত চারটি স্তম্ভে প্রতিষ্ঠিত।
১. ধৈর্য : অর্থাৎ যেকোনো অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, গোস্বা হজম করা, সহনশীলতা ও নম্রতা প্রদর্শন এবং যেকোনো ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও তাড়াহুড়া না করা।
২. পূত-পবিত্রতা : অর্থাৎ সব ধরনের অবৈধ, অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখা। লজ্জাশীলতাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা। কেননা, তা সব কল্যাণের আধার এবং অশ্লীলতা, কৃপণতা, মিথ্যা, পরনিন্দা, চোগলখুরি থেকে বিরত রাখে।
৩. সাহসিকতা ও বীরত্ব: এই বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিকে আত্মসম্মানবোধ, উঁচু মাপের চরিত্র ও সৎ স্বভাবের ওপর উদ্বুদ্ধ করে। এবং তা মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান ও বীরত্বের উচ্চমার্গে উপনীত করে।
৪. ন্যায়-নীতি ও নৈতিকতা: এই বৈশিষ্ট্য মানুষের চরিত্রে ভারসাম্যতা নিয়ে আসে। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে মুক্ত করে মধ্যমপন্থায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ফলশ্রুতিতে তা এমন বীরত্বের উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে, যা কাপুরুষতা ও মন্দনীয় বীরত্বের মাঝামাঝি অবস্থান করে। এবং চরিত্রকে সজ্জিত করে এমন সহনশীলতায়, যা অতি রাগ ও হীনতার মাঝামাঝি অবস্থান করে।'
হীন চরিত্রের মূল উৎস
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সব নীচু চরিত্রের উৎস ও মূলভিত্তি মূলত চারটি মূলস্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১. অজ্ঞতা : যা সুন্দরকে কুৎসিত ও কুৎসিতকে সুন্দর করে চিত্রায়িত করে।
২. অন্যায়-অবিচার: কোনো বিষয় বা বস্তুকে তার আপন স্থানে না রেখে ভিন্ন স্থানে রাখা। তাই সে সন্তুষ্টির জায়গায় ক্রোধান্বিত হয় এবং আক্রোশের জায়গায় সন্তুষ্ট হয়, তেমনিভাবে খরচের জায়গায় কৃপণতা করে এবং কঠোরতার সময় নম্রতা প্রদর্শন করে। আবার বিনয়ের ক্ষেত্রে অহংকারী হয়ে ওঠে।
৩. কামপ্রবৃত্তি : তা মানুষকে লোভ-লালসা ও সব ধরনের নীচু মানের কাজের প্রতি উৎসাহিত করে।
৪. ক্রোধ ও আক্রোশ: তা অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও বোকামির জন্ম দেয়।
• অতএব সব ধরনের নীচু স্বভাব—একটা অপরটার উদ্রেক ঘটায়, যেভাবে উত্তম চরিত্র—একটির ফলে অপরটি বিকাশিত হয়।
টিকাঃ
১২৬. সুরা আল-কলম : ৪
১২৭. সহিহুল বুখারি: ৬০৩৫
১২৮. সুনানুত তিরমিজি: ২০০৩
১২৯. সুনানুত তিরমিজি: ২০০৪
১৩০. সুনানুন নাসায়ি: ৮৯৬
১৩১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৯১