📄 ৫৬. বাক্যের মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
﴿يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا﴾
“তারা বলে, ‘যদি’ এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৪) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿الَّذِينَ قَالُوا لإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا﴾
“যারা ঘরে বসে থেকে তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কথা মতো যদি তারা চলতো তাহলে তারা নিহত হতো না। (সূরা আলে-ইমরান: ১৬৮)
ছহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা ✂ হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَلا تَعْجِزَنَّ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ لَكَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ».
“যে জিনিস তোমার উপকার সাধন করবে, তা অর্জন করার জন্য আগ্রহী হও এবং সর্বোচ্চ শ্রম ব্যয় করো এবং সকল বিষয়ে কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও। আর এ রকম যেন না হয় যে, তাকদীরের উপর ভরসা করে হাত গুটিয়ে অপারগ হয়ে বসে থাকবে। কল্যাণকর ও উপকারী বস্তু অর্জনে সাধ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও যদি তোমার উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তবে কখনও এ কথা বলো না, ‘যদি আমি এ রকম করতাম, তাহলে অবশ্যই এমন হতো’। বরং তুমি এ কথা বলো, ‘আল্লাহ যা তাকদীরে রেখেছেন এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন তাই হয়েছে। কেননা ‘যদি’ কথাটি শয়তানের জন্য কুমন্ত্রণার পথ খুলে দেয়”।187
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আলে-ইমরানের ১৫৪ নং আয়াত এবং ৬৮ নং আয়াতের উল্লেখিত অংশের তাফসীর।
২) কোন বিপদাপদ হলে কিংবা মাকসূদ পূর্ণ না হলে ‘যদি’ শব্দ প্রয়োগ করে কথা বলার উপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
৩) لو (যদি) শব্দ উচ্চারণ করা নিষেধ হওয়ার কারণ হল এটি শয়তানের কুমন্ত্রণামূলক কাজের সুযোগ তৈরী করে।
৪) উত্তম কথার প্রতি দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৫) উপকারী ও কল্যাণকর বস্তু অর্জনে আগ্রহী ও সচেষ্ট হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার আদেশ দেয়া হয়েছে।
৬) এর বিপরীত অর্থাৎ ভাল কাজে অপারগতা ও অক্ষমতা প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
টিকাঃ
187. ছহীহ মুসলিম হা/২৬৬৪, অধ্যায়: শক্তিশালী হওয়া এবং অপারগতা প্রকাশ বর্জনের আদেশ।
📄 ৫৭. বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ
উবাই বিন কা’ব ✃থেকে বর্ণিত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لا تَسُبُّوا الرِّيحَ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ مَا تَكْرَهُونَ فَقُولُوا: اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيحِ، وَخَيْرِ مَا فِيهَا وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيحِ وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ»
“তোমরা বাতাসকে গালি দিও না। তোমরা যখন বাতাসের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখবে, তখন তোমরা বলবে,
«اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيحِ وَخَيْرِ مَا فِيهَا وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيحِ وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ»
“হে আল্লাহ! এ বাতাসের যা কল্যাণকর, এতে যে মঙ্গল নিহিত আছে এবং যতটুকু কল্যাণ করার জন্য সে আদিষ্ট হয়েছে ততটুকু কল্যাণ ও মঙ্গল আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করছি।
আর এ বাতাসের যা অনিষ্টকর, তাতে যে অমঙ্গল লুকায়িত আছে এবং যতটুকু অনিষ্ট সাধনের ব্যাপারে সে আদিষ্ট হয়েছে তা থেকে আমরা তোমার কাছে আশ্রয় চাই”। ইমাম তিরমিযী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন এবং ছহীহ বলেছেন।188
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ।
২) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদেরকে এই আদেশ দিয়েছেন যে, অপছন্দনীয় জিনিস দেখে তারা যেন উপকারী কথা বলে তথা উত্তম দু’আ করে।
৩) নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন যে, বাতাস আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট এবং আল্লাহর হুকুমেই তা প্রবাহিত হয়।
৪) এ কথাও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, বাতাস কখনো কল্যাণ সাধনের জন্য আবার কখনো অকল্যাণ করার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে আদিষ্ট হয়।
টিকাঃ
188. ছহীহ: তিরমিযী হা/২২৫২, অধ্যায়: বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ।
📄 ৫৮. আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মন্দ ধারণা করা কাফের ও মুনাফেকদের অভ্যাস
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَنَا مِنَ الأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ يُخْفُونَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَا لا يُبْدُونَ لَكَ يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ﴾
“তারা জাহেলী যুগের ধারণার মত আল্লাহ সম্পর্কে অসত্য ধারণা পোষণ করে। তারা বলে: ‘আমাদের জন্য কিছু করণীয় আছে কি? হে রসূল! তুমি বলে দাও: ‘সব বিষয়ই আল্লাহর হাতে। তারা তাদের মনের মধ্যে এমন কিছু লুকিয়ে রাখে, যা তোমার নিকট প্রকাশ করে না। তারা বলে আমাদের যদি কিছু করার থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। তুমি বলো: তোমরা যদি নিজেদের ঘরে থাকতে তাহলেও যাদের মৃত্যু লিখে দেয়া হয়েছিল, তারা নিজেরাই নিজেদের বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে আসতো। আর এই যে বিষয়টি সংঘটিত হলো তা এ জন্য যে, তোমাদের বুকে যা কিছু (গোপন) রয়েছে, তা পরীক্ষা করে নেবেন আর তোমাদের অন্তরে যা কিছু (যে দোষ-ত্রুটি) রয়েছে তা পরিষ্কার করা ছিল তার কাম্য। আল্লাহ মনের অবস্থা খুব ভাল করে জানেন। ”। (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৪)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম ✈ প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: তাদের এই ধারণাকে মন্দ ধারণা হিসাবে ব্যাখ্যা করার কারণ হল আল্লাহ তা‘আলার শানে তাদের এই ধারণা ছিল অশোভনীয়। তারা ধারণা করেছিল যে, আল্লাহর রসূলকে সাহায্য করা হবে না এবং ইসলামের আলো অচিরেই মিটে যাবে। তাদের মন্দ ধারণাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, তারা ধারণা করেছিল উহুদ যুদ্ধের দিন মুসলিমগণ যেই পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং তারা যে কষ্ট পেয়েছিলেন, তা আল্লাহর নির্ধারণ, আল্লাহর হিকমত ও ফায়সালা অনুযায়ী ছিল না। সুতরাং তাদের ধারণায় আল্লাহ তা‘আলার হিকমত ও তাকদীরকে অস্বীকার করা হয়েছে। সেই সাথে তাদের ধারণায় আল্লাহর রসূলের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করা এবং তার দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর বিজয় দান করার বিষয়টিরও অস্বীকৃতি ছিল।
এটিই ছিল সেই খারাপ ধারণা, যা করেছিল মদীনার মুনাফিক সম্প্রদায় এবং মক্কার মুশরিক দল। পবিত্র কুরআনের সূরা ফাতাহ এর মধ্যে তাদের এই ধারণার আলোচনা করা হয়েছে। এই ধারণা মন্দ হওয়ার কারণ হলো, তা আল্লাহ তা‘আলার শান ও সুমহান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। উক্ত ধারণা ছিল আল্লাহর হিকমত, আল্লাহর প্রশংসা এবং তার সত্য ওয়াদার পরিপন্থী, বেমানান এবং অসৌজন্যমূলক।
সুতরাং যে ধারণা করবে যে, আল্লাহ তা‘আলা সব সময় সত্যের উপর বাতিলকে বিজয়ী রাখবেন, সত্য বাতিলের সামনে দুর্বল হয়ে থাকবে এবং এরপর সত্য কখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না, সে অবশ্যই আল্লাহর ব্যাপারে মন্দ ধারণা করল। সে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়কে সম্পৃক্ত করল, যা আল্লাহর সিফাতে কামালিয়্যাতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যে ব্যক্তি ঐ প্রকারের কোন কর্মে তাকদীরে ইলাহীকে অস্বীকার করল, সে আল্লাহর ক্ষমতা ও রাজত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আর যে সমস্ত লোক আল্লাহর সেই হিকমতকে অস্বীকার করল, যার কারণে তিনি প্রশংসার হকদার এবং এই ধারণা পোষণ করল যে, উহুদের যুদ্ধে আল্লাহ মুসলিমদেরকে পরাজিত করতে চেয়েছেন বলেই তা করেছেন, এর পিছনে অন্য কোন হিকমত নিহিত নেই, তারা কাফিরদের ন্যায়ই ধারণা করল। আর কাফিরদের জন্যই রয়েছে ধ্বংস ও জাহান্নাম।
অধিকাংশ মানুষই আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে থাকে। বিশেষ করে ঐ সমস্ত বিষয়ে, যা তাদের নিজেদের (তাকদীরের) সাথে সম্পৃক্ত অথবা যা অন্যদের সাথে সম্পৃক্ত। যারা আল্লাহর জাতে পাক, তার পবিত্র নামসমূহ, তার ত্রুটিমুক্ত ছিফাতসমূহ এবং তার হিকমত সম্পর্কে ও তিনি যে যথাযথ প্রশংসার হকদার- এ সম্পর্কে অবগত, তারাই কেবল তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
সুতরাং যে ব্যক্তি জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং নিজের কল্যাণকামী তার উচিত এ বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রভুর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে, সে যেন আল্লাহ সম্পর্কে বদ ধারণার কারণে তার নিকট তাওবা করে এবং তার কাছেই ক্ষমা চায়।
হে প্রিয় পাঠক! আপনি মানুষদের মাঝে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পারেন। দেখবেন অনেক মানুষই তাকদীরের উপর অসন্তুষ্ট এবং তাকদীরকে দোষারোপকারী। তারা বলে থাকে এ রকম হওয়া উচিত ছিল না, এমন হওয়া ঠিক ছিল না। এ রকম অভিযোগ কেউ কম করে আবার কেউ বেশী করে। আপনি আপনার নিজের মধ্যেই অনুসন্ধান করুন। আপনি কি তাকদীরের উপর আপত্তি উত্থাপন করা হতে মুক্ত? কবি বলেছেন,
فإن تنج منها تنج من ذي عظيمة + وإلا فإني لا إخالك ناجيا
“হে বন্ধু! তুমি যদি এ থেকে (তাকদীরের উপর আপত্তি করা থেকে) মুক্ত হয়ে থাক তাহলে জেনে রাখো যে, তুমি একটি বিরাট মুছীবত থেকে বেঁচে গেলে। আর এ থেকে মুক্তি না পেলে তুমি নাজাত পাবে বলে আমার মনে হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ﴾
“তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে, তারা নিজেরাই খারাপ ও দোষের আবর্তে নিপতিত।” (সূরা আল-ফাতাহ: ৬)
এই অধ্যায় থেকে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আলে- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা “ফাতাহ”-এর ৬ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) আলোচিত বিষয়ের প্রকার সীমাবদ্ধ নয়। অর্থাৎ মন্দ ধারণার অনেক প্রকার রয়েছে।
৪) যে ব্যক্তি আল্লাহর আসমা ও ছিফাত (নাম ও গুণাবলী) এবং নিজের নফস সম্পর্কে অবহিত রয়েছে, কেবল সেই আল্লাহর প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা থেকে বাঁচতে পারে।
📄 ৫৯. তাকদীর অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার ✃বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسُ ابْنِ عُمَرَ بِيَدِهِ، لَوْ كَانَ لأَحَدِهِمْ مِثْلُ أُحُدٍ ذَهَبًا، ثُمَّ أَنْفَقَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا قَبِلَهُ اللَّهُ مِنْهُ حَتَّى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ، ثُمَّ اسْتَدَلَّ بِقَوْلِ النَّبِيِّ؟: «الإِيمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
“সেই সত্তার কসম, যার হাতে ইবনে উমারের জীবন, তাদের (তাকদীরের প্রতি অবিশ্বাসীদের) কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, অতঃপর তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা উক্ত দান কবুল করবেন না, যতক্ষণ না সে তাকদীরের প্রতি ঈমান আনে”। অতঃপর তিনি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী দ্বারা নিজ বক্তব্যের পক্ষে দলীল পেশ করেন:
«الإِيمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
“ঈমান হচ্ছে, তুমি আল্লাহ তা‘আলার প্রতি, তার সমুদয় ফেরেশতার প্রতি, তার যাবতীয় কিতাবের প্রতি, তার সমস্ত রসূলের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। সাথে সাথে তাকদীর এবং এর ভাল-মন্দের প্রতিও ঈমান আনয়ন করবে”।189
ইমাম মুসলিম এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
উবাদা বিন সামেত ✃ থেকে বর্ণিত, তিনি একদা তার ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন:
يَا بُنَيَّ، إِنَّكَ لَنْ تَجِدَ طَعْمَ الإِيمَانِ حَتَّى تَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَمَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ: «إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ، فَقَالَ لَهُ: اكْتُبْ، فَقَالَ: رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ؟ قَالَ: اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ».
“হে বৎস, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি এ কথা বিশ্বাস করবে যে, ‘তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল। আর যা ঘটেনি তা কোনদিন তোমার জীবনে ঘটার ছিল না’ রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি, “সর্বপ্রথম আল্লাহ তা‘আলা যা সৃষ্টি করলেন তা হচ্ছে ‘কলম’। সৃষ্টির পরেই তিনি কলমকে বললেন, “লিখো”। কলম বলল: ‘হে আমার রব, ‘আমি কী লিখবো?’ তিনি বললেন, ‘ক্বিয়ামত পর্যন্ত সব জিনিসের তাকদীর লিপিবদ্ধ করো”।190
হে বৎস! রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি এর উপর (তাকদীরের উপর) বিশ্বাস ব্যতীত মৃত্যু বরণ করলো, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়”।191
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ✈হতে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে
«إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ تَعَالَى الْقَلَمَ، فَقَالَ لَهُ: اكْتُبْ، فَجَرَى فِي تِلْكَ السَّاعَةِ بِمَا هُوَ كَائِنٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ».
“আল্লাহ তা‘আলা সর্ব প্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে ‘কলম’। এরপরই তিনি কলমকে বললেন, ‘লিখো’। কলম তখন ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে, সব লিখে শেষ করেছে।192
ইবনে ওয়াহাবের একটি বর্ণনা মতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«فَمَنْ لَمْ يُؤْمِنْ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ أَحْرَقَهُ اللَّهُ بِالنَّارِ».
“যে ব্যক্তি তাকদীর এবং তাকদীরের ভাল- মন্দে বিশ্বাস করে না, তাকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবেন”।193
মুসনাদে আহমাদ এবং সুনানে আবু দাউদে ইবনুদ্ দাইলামী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
أَتَيْتُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ - رضي الله عنه - ، فَقُلْتُ: فِي نَفْسِي شَيْءٌ مِنَ الْقَدَرِ، فَحَدِّثْنِي بِشَيْءٍ، لَعَلَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ مِنْ قَلْبِي، فَقَالَ: لَوْ أَنْفَقْتَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا قَبِلَهُ اللَّهُ مِنْكَ حَتَّى تُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ، وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَمَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ، وَلَوْ مُتَّ عَلَى غَيْرِ هَذَا لَكُنْتَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، قَالَ: فَأَتَيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ، وَحُذَيْفَةَ بْنَ الْيَمَانِ، وَزَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ، فَكُلُّهُمْ حَدَّثَنِي بِمِثْلِ ذَلِكَ عَنِ النَّبِيِّ?.
‘আমি উবাই ইবনে কা’ব এর কাছে আসলাম। অতঃপর বললাম, ‘তাকদীরের ব্যাপারে আমার মনে কিছু সন্দেহ উদয় হয়েছে। আপনি আমাকে তাকদীর সম্পর্কে কিছু কথা বলুন। এর ফলে হয়তো আল্লাহ তা‘আলা আমার অন্তর হতে তা দূর করে দিবেন। তখন তিনি বললেন,
“তুমি যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান করো, আল্লাহ তোমার এ দান ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করবেন না, যতক্ষণ না তুমি তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস করবে”। আর এ কথা জেনে রাখো, তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা না ঘটার ছিল না। আর তোমার জীবনে যা ঘটেনি, তা ঘটার ছিল না। এ বিশ্বাস পোষণ না করে তুমি যদি মৃত্যু বরণ করো, তাহলে অবশ্যই জাহান্নামী হবে’
ইবনুদ্ দাইলামী বলেন, অতঃপর আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুযায়ফা বিন ইয়ামান এবং যায়েদ বিন ছাবিত এর নিকট আসলাম। তাদের প্রত্যেকেই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ রকমই বর্ণনা করেছেন”।194
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম এই হাদীছ তার ছহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়
১) তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ফরয।
২) তাকদীরের প্রতি কিভাবে ঈমান আনতে হবে, তাও বর্ণনা করা হয়েছে।
৩) তাকদীরের প্রতি যার ঈমান নেই তার আমল বাতিল।
৪) যে ব্যক্তি তাকদীরের প্রতি ঈমান আনে না সে ঈমানের স্বাদ থেকে মাহরূম হবে।
৫) আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন- এখানে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
৬) ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা সৃষ্টি হবে, হুকুমে ইলাহী পেয়েই কলম তা লিখে শেষ করেছে।
৭) যে ব্যক্তি তাকদীর বিশ্বাস করে না তার সাথে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পূর্ণ দায়মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ তার সাথে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন সম্পর্ক নেই।
৮) সালফে ছলেহীনের রীতি ছিল, কোন বিষয়ের সংশয় নিরসনের জন্য তারা জ্ঞানী ও বিজ্ঞজনকে প্রশ্ন করতেন।
৯) উলামায়ে কেরাম এমনভাবে প্রশ্নকারীকে জবাব দিতেন যদ্বারা সন্দেহ দূর হয়ে যেতো। তাদের জবাবের নিয়ম এই ছিল যে, তারা নিজেদের কথাকে শুধুমাত্র রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে নিসবত (সম্বোধিত) করতেন।
টিকাঃ
189. ছহীহ: ছহীহ মুসলিম হা/৮, অধ্যায়: ইসলাম, ঈমান এবং তাকদীর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। তিরমিযী হা/২৬১০, নাসাঈ হা/৪৯৯০, আবু দাউদ হা/৪৬৯৫, আবনে মাজাহ হা/৬৩।
190. ছহীহ: তিরমিযী হা/২১৫৫, ৩৩১৯, আবু দাউদ হা/৪৭০০।
191. ছহীহ: আবু দাউদ হা/৪৭০০, সুনানুল কুবরা বাইহাকী হা/২০৮৭৫।
192. ছহীহ: মুসনাদে আহমাদ হা/২২৭০৫।
193. ইবনে আবী আসিম এর কিতাবুস সুন্নাহ হা/১১১।
194. ছহীহ: আবু দাউদ হা/৪৬৯৯, ইবনে মাজাহ হা/৭৭, মুসনাদে আহমাদ।