📄 ৪৯. আল্লাহ ছাড়া অন্যের বান্দা বলা হারাম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلا خَفِيفًا فَمَرَّتْ بِهِ فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللَّهَ رَبَّهُمَا لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ (١٨٩) فَلَمَّا آتَاهُمَا صَالِحًا جَعَلا لَهُ شُرَكَاءَ فِيمَا آتَاهُمَا فَتَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ (١٩٠) أَيُشْرِكُونَ مَا لا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ (١٩١) وَلا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلا أَنْفُسَهُمْ يَنْصُرُونَ﴾
“তিনিই (আল্লাহ তা‘আলা) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র প্রাণ থেকে; আর তার থেকেই তৈরী করেছেন তার স্ত্রীকে, যাতে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারে। অতঃপর সে যখন তার স্ত্রীকে আবৃত করল, তখন স্ত্রী হালকা গর্ভধারণ করল। সে তাই নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। তারপর যখন গর্ভ ভারী হয়ে গেল, তখন উভয়ে মিলে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে দু‘আ করলো। তুমি যদি আমাদেরকে ভাল সন্তান দান কর তবে আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। অতঃপর যখন আল্লাহ তাদেরকে একটি সুস্থ-নিখুঁত সন্তান দান করলেন, তখন দানকৃত বিষয়ে তারা তার অংশীদার তৈরী করতে লাগল। বস্তুত আল্লাহ তাদের শরীক সাব্যস্ত করার বহু ঊর্ধ্বে। তারা কি এমন কাউকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করে যে একটি জিনিসও সৃষ্টি করতে পারে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট? আর তারা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না নিজেদের সাহায্য করতে পারে”। (সূরা আল ‘আরাফ: ১৮৯-১৯২)
ইবনে হাযম ✈বলেন: উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এমন প্রত্যেক নামই হারাম, যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের ইবাদত করা বুঝায়। যেমন আব্দু আমর, আব্দুল কা‘বা এবং এ জাতীয় অন্যান্য নাম। তবে আব্দুল মুত্তালিব এর ব্যতিক্রম।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ✃এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
لَمَّا تَغَشَّاهَا آدَمُ حَمَلَتْ، فَأَتَاهُمَا إِبْلِيسُ فَقَالَ: إِنِّي صَاحِبُكُمَا الَّذِي أَخْرَجْتُكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ لَتُطِيعَانِّي أَوْ لأَجْعَلَنَّ لَهُ قَرْنَيْ أَيِّلٍ فَيَخْرُجَ مِنْ بَطْنِكِ فَيَشُقَّهُ، وَلأَفْعَلَنَّ وَلأَفْعَلَنَّ يُخَوِّفُهُمَا، سَمِّيَاهُ عَبْدَ الْحَارِثِ، فَأَبَيَا أَنْ يُطِيعَاهُ، فَخَرَجَ مَيِّتًا، ثُمَّ حَمَلَتْ، فَأَتَاهُمَا فَذَكَرَ لَهُمَا، فَأَدْرَكَهُما حُبُّ الْوَلَدِ، فَسَمَّيَاهُ عَبْدَ الْحَارِثِ، فَذَلِكَ قَوْلُهُ: {جَعَلا لَهُ شُرَكَاءَ فِيمَا آتَاهُمَا}.
আদম আ. যখন বিবি হাওয়ার সাথে মিলিত হলেন তখন হাওয়া গর্ভবতী হলেন। এমতাবস্থায় শয়তান আদম ও হাওয়ার কাছে এসে বললো, ‘আমি তোমাদের সেই বন্ধু ও সাথী, যে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করেছে। তোমরা আমার আনুগত্য করো, নতুবা গর্ভস্থ সন্তানের মাথায় হরিণের শিং গজিয়ে দিবো। তখন সন্তান হাওয়ার পেট চিরে বের হবে। আমি অবশ্যই এ কাজ করে ছাড়বো”। শয়তান এভাবে তাদেরকে আরো অনেক ভয় দেখাচ্ছিল। শয়তান বলল: তোমরা তোমাদের সন্তানের নাম ‘আব্দুল হারিছ’ রেখো। তখন তারা শয়তানের আনুগত্য করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর তাদের একটি মৃত সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো।
আবারো বিবি হাওয়া গর্ভবতী হলেন। শয়তানও পুনরায় তাদের কাছে এসে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। এর ফলে তাদের অন্তরে সন্তানের প্রতি ভালবাসা তীব্র হয়ে দেখা দিল। তখন তারা সন্তানের নাম ‘আব্দুল হারিস’ রাখলেন (কৃষকের বান্দা)।179
এভাবেই তারা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের মধ্যে তার সাথে শরীক করে ফেললেন। এটাই হচ্ছে فِيمَا آتَاهُمَا شُرَكَاءَ لَهُ جَعَلا এ আয়াতের তাৎপর্য।180
ইবনে আবি হাতিম হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।
وله بسند صحيح عن قتادة; قال: "شركاء في طاعته، ولم يكن في عبادته".
ইবনে আবী হাতিম কাতাদাহ হতে ছহীহ সনদে অপর একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: তারা আল্লাহর সাথে শরীক করেছিলেন আনুগত্যের ক্ষেত্রে; ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়।
ছহীহ সনদে মুজাহিদ থেকে ইবনে আবী হাতিম لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا- এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আরো বর্ণনা করেন যে, আদম ও হাওয়া এ ধরনের আশঙ্কায় পড়েছিলেন যে, সন্তানটি মানুষ হয় কি না। হাসান, সাঈদ প্রমুখের কাছ থেকেও আয়াতের এই অর্থই উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) যেইসব নামের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের অর্থ নিহিত রয়েছে সে নাম রাখা হারাম।
২) সূরা আল ‘আরাফের ১৯০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
৩) আলোচিত অধ্যায়ে বর্ণিত শিরক শুধু নাম রাখার ক্ষেত্রেই হয়েছে। এর দ্বারা শিরকের হাকীকত তথা প্রকৃত পারিভাষিক শিরক উদ্দেশ্য ছিল না।
৪) আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ সন্তান লাভ করা একজন মানুষের জন্য নিয়ামতের বিষয়।
৫) আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে শিরক এবং ইবাদতের মধ্যে শিরকের ব্যাপারে সালফে ছলেহীনগণ পার্থক্য নির্ধারণ করেছেন।
টিকাঃ
179. আব্দুল হারিছ শয়তানের উপাধী। সুতরাং আব্দুল হারিছ অর্থ শয়তানের গোলাম (বান্দা)।
180. যঈফ: আলবানী, আল যঈফাহ হা/৩৪২।
📄 ৫০. আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে আসমায়ে হুসনা
আল্লাহ তা‘আলা সূরা আল ‘আরাফের ১৮০ নং আয়াতে বলেন,
﴿وَلِلَّهِ الأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
“আর আল্লাহ্র জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাকে ডাকো। আর যারা তার নামগুলো বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন করে চলো। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।
ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস ✃ থেকে বর্ণনা করেছেন, يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ অর্থাৎ তারা তার নামগুলো বিকৃত করে। এর অর্থ হচ্ছে তারা শিরক করে।
ইবনে আব্বাস ✃ থেকে আরো বর্ণিত আছে, মুশরিকরা ‘ইলাহ’ থেকে ‘লাত’ আর ‘আযীয’ থেকে ‘উয্যা’ নামকরণ করেছে।
আ‘মাশ থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে এমন কিছু শিরকী বিষয় ঢুকিয়েছে, যার অস্তিত্ব আদৌ তাতে নেই।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) আল্লাহ তা‘আলার অনেক সুন্দর নাম রয়েছে। এই নামসমূহ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব।
২) আল্লাহর নামসমূহ সুন্দরতম ও পবিত্র।
৩) আল্লাহ তা‘আলাকে ঐ সমস্ত সুন্দর ও পবিত্র নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
৪) যেসব মূর্খ ও মুশরিকরা আল্লাহর পবিত্র নামের বিরুদ্ধাচারণ করে তাদেরকে পরিহার করে চলা জরুরী।
৫) এই অধ্যায়ে আল্লাহর নাম বিকৃতি করার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
৬) আল্লাহর নাম পরিবর্তন ও বিকৃতিকারীদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির হুমকি।
📄 ৫১. “আসসালামু আলাল্লাহ” আল্লাহর উপর শান্তি বর্ষিত হোক বলা যাবে না
ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনে মাসউদ ✃ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
كُنَّا إِذَا كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - فِي الصَّلاةِ قُلْنَا: السَّلامُ عَلَى اللَّهِ مِنْ عِبَادِهِ، السَّلامُ عَلَى فُلانٍ وَفُلانٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ؟: «لا تَقُولُوا السَّلامُ عَلَى اللَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ السَّلامُ».
“আমরা যখন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছালাতে থাকতাম, তখন আমরা বলতাম, “আল্লাহর উপর তার বান্দাদের পক্ষ থেকে সালাম, অমুক অমুকের উপর সালাম, অমুক ব্যক্তির উপর সালাম”। তখন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “আল্লাহর উপর সালাম (শান্তি বর্ষিত হোক) এমন কথা তোমরা বলো না। কেননা আল্লাহ নিজেই ‘সালাম’।181
এই অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) এই অধ্যায়ে আল্লাহ তা‘আলার নাম ‘সালাম’এর ব্যাখ্যা জানা গেল।
২) ‘সালাম’ হচ্ছে সম্মানজনক সম্ভাষণ।
৩) আল্লাহকে সালাম (সম্ভাষণ)) দেয়া ছহীহ নয়।
৪) আল্লাহ তা‘আলাকে সালাম (সম্ভাষণ) দেয়া নাজায়েয হওয়ার কারণও বলা হয়েছে।
৫) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামকে সালামের ঐ তরীকা শিক্ষা দিয়েছেন, যা আল্লাহ তা‘আলার জন্য সমীচীন ও শোভনীয়।
টিকাঃ
181. ছহীহ বুখারী হা/৮৩৫, ছহীহ মুসলিম হা/৪০২।
📄 ৫২. ‘হে আল্লাহ তুমি চাইলে আমাকে মাফ করো’ এভাবে দু‘আ করা প্রসঙ্গে
ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা ✃ হতে বর্ণিত আছে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«لا يَقُلْ أَحَدُكُمْ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي إِنْ شِئْتَ، اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي إِنْ شِئْتَ، لِيَعْزِمِ الْمَسْأَلَةَ، فَإِنَّ اللَّهَ لا مُكْرِهَ لَهُ».
“তোমাদের কেউ যেন দু‘আ করার সময় এভাবে না বলে, হে আল্লাহ্! তুমি যদি চাও তবে আমাকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ্! তুমি যদি চাও তবে আমার উপর রহমত নাযিল করো; বরং সে যেন দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে দু‘আ করে। কেননা আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই”।182
ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«وَلْيُعْظِمِ الرَّغْبَةَ، فَإِنَّ اللَّهَ لا يَتَعَاظَمُهُ شَيْءٌ أَعْطَاهُ».
“আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার সময় পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে প্রয়োজন পেশ করা উচিত। কেননা আল্লাহ বান্দাকে যাই দান করেন না কেন তার কোনটাই তার কাছে বড় কিংবা কঠিন নয়”।183
এই অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) দু‘আর মধ্যে ইনশা-আল্লাহ বলা নিষেধ। অর্থাৎ এভাবে দু‘আ করা যে, হে আল্লাহ! তুমি ইচ্ছা করলে আমাকে ক্ষমা করো, তুমি ইচ্ছা করলে আমাকে এটা দান কর ইত্যাদি। এভাবে দু‘আ করা অর্থাৎ দু‘আ কবুল করা বা না করার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া নিষেধ।
২) দু‘আতে ইনশা-আল্লাহ বলা নিষেধ হওয়ার কারণ এ অধ্যায়েই বর্ণিত হয়েছে।
৩) দু‘আর মধ্যে দৃঢ়তা থাকা চাই।
টিকাঃ
182. ছহীহ বুখারী হা/৬৩৩৯, ছহীহ মুসলিম হা/২৬৭৯।
183 Q¦nxn gymwjg nv/2679|