📄 ৩৭. যে ব্যক্তি আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম এবং হারামকৃত জিনিসকে হালাল করার ব্যাপারে আলেম ও নেতাদের আনুগত্য করল সে মূলত তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করল
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,
«يُوشِكُ أَنْ تَنْزِلَ عَلَيْكُمْ حِجَارَةٌ مِنَ السَّمَاءِ، أَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ؟ ، وَتَقُولُونَ قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ»
“তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। কারণ আমি বলছি, “রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন অথচ তোমরা বলছো, “আবু বকর এবং উমার (রাঃ) বলেছেন”।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলেন, “ঐ সব লোকদের ব্যাপারটি আমার কাছে খুবই অবাক লাগে, যারা হাদীছের সনদ ও বিশুদ্ধতা অর্থাৎ ছহীহ হওয়ার বিষয়টি জানার পরও সুফইয়ান সাওরির মতামতকে গ্রহণ করে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা তার (রাসূলের) নির্দেশের বিরোধীতা করে, তাদের এ ভয় করা উচিত যে, তাদের উপর কোন কঠিন পরীক্ষা কিংবা কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়তে পারে”। (সূরা আন নূর: ৬৩)
তুমি কি জানো ফিতনা কী? ফিতনা হচ্ছে শিরক। কেও রাসূলের কোন কথা প্রত্যাখ্যান করলে সম্ভবত তার অন্তরে বক্রতার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে সে ধ্বংসও হতে পারে”।
আ’দী বিন হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিম্ন বর্ণিত আয়াতটি পাঠ করতে শুনেছি,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ» ، فَقُلْتُ لَهُ: إِنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ، قَالَ: «أَلَيْسَ يُحَرِّمُونَ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَتُحَرِّمُونَهُ، وَيُحِلُّونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَتُحِلُّونَهُ؟ » ، فَقُلْتُ: بَلَىٰ، قَالَ: «فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ»
“তারা (ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানরা) আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিতগণকে ও সংসার-বিরাগিদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল এক মা‘বূদের ইবাদত করার জন্য। তিনি ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। তারা যাকে তার শরীক সাব্যস্ত করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। (সূরা আত তাওবা: ৩১) তখন আমি নাবীজীকে বললাম, “আমরা তো তাদের ইবাদত করি না”। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আল্লাহর হালাল ঘোষিত জিনিসকে তারা হারাম বললে, তোমরা কি তা হারাম হিসাবে গ্রহণ করো না? আবার আল্লাহর হারাম ঘোষিত জিনিসকে তারা হালাল বললে, তোমরা কি তা হালাল হিসাবে গ্রহণ করো না? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি তখন বললেন: “এটাই তাদের ইবাদত করার মধ্যে গণ্য”।
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত মাসআলাগুলো জানা যায়
১) সূরা আন নূরের ৬৩ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ৩১ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) এখানে ইবাদতের তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে, যা আ’দী বিন হাতিম অস্বীকার করেছিলেন।
৪) ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক আবু বকর এবং ওমর (রাঃ) এর দৃষ্টান্ত। আর ইমাম আহমাদ (রহঃ) কর্তৃক সুফইয়ান ছাওরীর দৃষ্টান্ত পেশ করা।
৫) মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে এমন গোমরাহীর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, তাদের অধিকাংশই আলেম ও পীর-বুযুর্গের পূজা করাকে সর্বোত্তম আমল হিসাবে গণ্য করছে। আর এরই নাম দেয়া হয়েছে ‘বেলায়েত’। যারা আলেম ও পীর-বুযুর্গ ব্যক্তিদের ইবাদত করে, তাদেরকেই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অতঃপর অবস্থার আরো পরিবর্তন সাধিত হয়ে বর্তমানে এমন পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব ব্যক্তিদের ইবাদত করা হচ্ছে, যারা আদৌ ভাল লোকদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। সে সাথে এমন লোকদেরও ইবাদত করা হচ্ছে, যারা একদম জাহেল-অজ্ঞ।
টিকাঃ
১৫৭. দেখুন: তাফসীরে ইবনে কাছীর, (২/৩৪৮)
১৫৮. দেখুন: ইবনে বাত্তাহ কর্তৃক রচিত আল-ইবানাতুল কুবরাহ, পৃষ্ঠা/৯৭, মাসায়েলে আব্দুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ (৩/১৩৫৫)।
১৫৯. উক্ত হাদীছকে ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন। তবে অন্যান্য মুহাদ্দিছগণের নিকট এটির সনদ বিশুদ্ধ নয়। বস্তুত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য আয়াতের মূল বক্তব্যই যথেষ্ট। উল্লেখ্য যে, উক্ত বক্তব্যের সমর্থনে বহু আয়াত ও হাদীছ রয়েছে। আলবানী হাসান বলেছেন। তিরমিযী হা/৩০৯৫
📄 ৩৮. আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত বিধান পরিত্যাগ করে অন্যের ফায়ছালা গ্রহণ করার বিধান
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَىٰ مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা আপনার উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছে বলে দাবি করে? তারা বিচার ফায়ছালার জন্য ত্বাগূত এর কাছে যায়, অথচ তা অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর শয়তান তাদেরকে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়। আর যখন তাদেরকে বলা হয় এসো সেই জিনিসের দিকে, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এসো রাসূলের দিকে তখন তুমি মুনাফিকদেরকে দেখবে, ওরা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ এসে যায়, অতঃপর তারা তোমার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেতে খেতে ফিরে আসে এবং বলে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না”। (সূরা আন নিসা: ৬০)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ
“তাদেরকে যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, মূলত আমরাই সংশোধনকারী।” (সূরা আল বাকারা: ১১)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন,
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا ۚ إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
“পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। আল্লাহকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী। । (সূরা আল আ‘রাফ: ৫৬)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন:
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
“তারা কি জাহেলী (বর্বর) যুগের ফায়ছালা কামনা করে? বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফায়ছালাকারী আর কে আছে?” (সূরা আল মায়েদা: ৫০)
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ»
“তোমাদের কেও ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত আদর্শের অধীন হয়”। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: হাদীছটি ছহীহ। আমরা এটিকে কিতাবুল হুজ্জাতে ছহীহ সনদে বর্ণনা করেছি।
ইমাম শা‘বী (রহঃ) বলেন: একজন মুনাফিক এবং একজন ইয়াহূদীর মধ্যে ঝগড়া ছিল। ইয়াহূদী বলল: ‘আমরা এর বিচার- ফায়ছালার জন্য মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যাব। কেননা তার জানা ছিল যে, তিনি ঘুষ গ্রহণ করেন না। আর মুনাফিক বলল: ‘ফায়ছালার জন্য আমরা ইয়াহূদী বিচারকের কাছে যাব। কেননা তার জানা ছিল যে, ইয়াহূদীরা বিচার ফায়ছালায় ঘুষ খায়। পরিশেষে তারা উভয়ই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, তারা এর বিচার ও ফায়ছালার জন্য জুহাইনা গোত্রের এক গণকের কাছে যাবে। তখন সূরা আন নিসার এ আয়াত নাযিল হয়,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَىٰ مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا
“তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যারা তোমার উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছে বলে দাবি করে? তারা বিচার ফায়ছালার জন্য ত্বাগূত এর কাছে যায়, অথচ তা অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর শয়তান তাদেরকে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়। আর যখন তাদেরকে বলা হয় এসো সেই জিনিসের দিকে, যা আল্লাহ্ নাযিল করেছেন এবং এসো রাসূলের দিকে তখন তুমি মুনাফিকদেরকে দেখবে, ওরা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। তারপর যখন তাদের কৃতকর্মের দরুন কোন বিপদ এসে পড়ে, তখন তাদের অবস্থা কী হয়? তখন তারা তোমার কাছে আল্লাহ্র নামে কসম খেতে খেতে ফিরে আসে এবং বলতে থাকে যে, আল্লাহর কসম আমরা তো কেবল মঙ্গল চেয়েছিলাম এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাক এটি ছাড়া আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না”। (সূরা আন নিসা: ৬০-৬২)
আরেকটি বর্ণনা মতে জানা যায়, ঝগড়া- বিবাদে লিপ্ত দু’জন লোকের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। তাদের একজন বলেছিল, মীমাংসার জন্য আমরা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যাব। অপরজন বলেছিল: কা‘ব বিন আশরাফের কাছে যাব। পরিশেষে তারা উভয় বিষয়টি মীমাংসার জন্য উমার (রাঃ) এর কাছে সোপর্দ করল। তারপর তাদের একজন ঘটনাটি তার কাছে উল্লেখ করল (উমার (রাঃ) এর কাছে এ কথাও বলা হল যে, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যাওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু আমাদের একজন (অমুক) এতে রাযী হয়নি)। অতঃপর যে ব্যক্তি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচার ফায়ছালার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারেনি, তাকে লক্ষ্য করে উমার (রাঃ) বললেন, ঘটনাটি কি সত্যিই এ রকম? সে বলল: হ্যাঁ। তখন তিনি তলোয়ারের আঘাতে তার গর্দান উড়িয়ে দিলেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত মাসআলাগুলো জানা যায়:
১) সূরা আন নিসার ৬০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। এ থেকে ত্বাগূতের মর্মার্থ বুঝার ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া যায়।
২) সূরা আল বাকারার ১১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানা গলে, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ
“তাদেরকে যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে মূলত আমরাই সংশোধনকারী।” শিরক ও বিদ‘আতই পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ।
৩) সূরা আল আ‘রাফের ৫৬ নং আয়াতের তাফসীর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا
“পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তোমরা বিপর্যয় সৃষ্টি করো না”। অর্থাৎ তাওহীদের মাধ্যমে পৃথিবী সংশোধিত হওয়ার পর শিরক ও বিদ‘আত ছড়িয়ে তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।
৪) সূরা আল মায়িদার ৫০ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
“তারা কি জাহেলী (বর্বর) যুগের ফায়ছালা কামনা করে? বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্ অপেক্ষা উত্তম ফায়ছালাকারী আর কে আছে?”
৫) এ অধ্যায়ের প্রথম আয়াতের শানে নুযূল (অবতরণের প্রেক্ষাপট) জানা গেল। এ ক্ষেত্রে ইমাম শা‘বীর বক্তব্যও জানা গেল।
৬) সত্যিকারের ঈমান এবং মিথ্যা ঈমানের ব্যাখ্যা।
৭) মুনাফিকের সাথে উমার (রাঃ) এর ব্যবহার সংক্রান্ত ঘটনা জানা গেল।
৮) প্রবৃত্তি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত আদর্শের অনুগত না হওয়া পর্যন্ত কারো ঈমান পূর্ণাঙ্গ না হওয়ার বিষয় জানা গেল।
টিকাঃ
১৬০. ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুন শাইখের তাহকীক কৃত ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’, হা/১৬৭।
১৬১. শা‘বীর বর্ণনাটি মুরসাল হওয়ার কারণে যঈফ। কারণ তিনি ছিলেন তাবেয়ী। তিনি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানা পাননি বলে ঘটনায় উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ইমাম তাবারী স্বীয় তাফসীরে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
১৬২. ঘটনাটি খুবই দুর্বল: ইমাম ছা’লাবী ইমাম বগবী নিজ নিজ তাফসীরে উল্লেখ করেছেন। দেখুন: ছালাবী (৩/৩৩৭), বগবী (১/৪৬৬)।
📄 ৩৯. আল্লাহর ‘আসমা ও ছিফাত’ (নাম ও গুণাবলী) এর কতককে অস্বীকার করবে তার বিধান কি?
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَيَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَٰنِ ۚ قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ
“এবং তারা রহমানকে (আল্লাহর গুণবাচক নামকে) অস্বীকার করে। বল: তিনিই আমার প্রতিপালক। তিনি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। আমি তার উপরই ভরসা করেছি এবং তার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন।” (সূরা রা’দ: ৩০)
ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীছে এসেছে, আলী (রাঃ) বলেন:
«حَدِّثُوا النَّاسَ بِمَا يَعْرِفُونَ، أَتُرِيدُونَ أَنْ يُكَذَّبَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ»
“লোকদেরকে এমন কথা বলো, যা তারা বুঝতে সক্ষম হয়। তোমরা কি চাও যে, আল্লাহ এবং তার রাসূলকে (আল্লাহ ও রাসূলের কথাকে) মিথ্যা বলা হোক।”
আব্দুর রাযযাক মামার হতে, মামার ইবনে তাউস হতে, তিনি তার পিতা হতে তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীছ শুনে এক ব্যক্তি আল্লাহর ছিফাতকে অস্বীকার করার ব্যাপারে কেঁপে উঠেছিল। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন: এরা আল্লাহ তা‘আলাকে কেমন ভয় করে? কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত শুনে নরম হয় (আল্লাহকে ভয় করে)। আর যখন কোন অস্পষ্ট আয়াত শুনে তখন ধ্বংস হয় (তা অস্বীকার করে)?” কুরাইশরা যখন শুনল, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘রহমান’ উল্লেখ করছেন তখন তারা ‘রহমান’ গুণটিকে অস্বীকার করল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন, وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَٰنِ “তারা রহমানকে অস্বীকার করে”। (সূরা রা’দ: ৩০)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১&) আল্লাহর কোন নাম ও গুণ অস্বীকার করলে ঈমান চলে যায়।
২) সূরা রা‘দের ৩০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
৩) যে কথা শ্রোতার বোধগম্য নয়, তা পরিহার করা উচিত।
৪) অস্বীকারকারীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেসব কথা আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করার দিকে নিয়ে যায়, এর কারণ কি, তা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ না বুঝার কারণেই অনেকের ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে।
৫| আল্লাহর ছিফাত সংক্রান্ত হাদীছ শুনে যে ব্যক্তির শরীর নড়ে উঠেছিল (ছিফাত অস্বীকার করতে চেয়েছিল) তার জন্য ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বক্তব্য হচ্ছে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর কোন একটি অস্বীকারকারীর ধ্বংস অনিবার্য।
টিকাঃ
১৬৩. ছহীহ বুখারী হা/১২৭, অধ্যায়: যে ব্যক্তি কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে হাদীছ শুনাল।
১৬৪. ইমাম বায়হাকী কিতাবুস সিফাতে এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন, হা/৮৬৭, ইমাম দারেমী স্বীয় কিতাব على الجهمية الرد তে বর্ণনা করেছেন, হা/১০৪ এবং ইমাম তাবারীও বিভিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে সনদ মুরসাল হওয়ার কারণে তা ছহীহ নয়।
📄 ৪০. আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করার পরিণাম
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
يَعْرِفُونَ نِعْمَتَ اللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ
“তারা আল্লাহর নিয়ামত চিনে, অতঃপর তা অস্বীকার করে তাদের অধিকাংশ অকৃতজ্ঞ।” (সূরা আন নাহল: ৮৩)
মুজাহিদ বলেন, এর মর্মার্থ হচ্ছে, কোন মানুষের এ কথা বলা ‘এ সম্পদ আমার, যা আমার পূর্ব পুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি’|
আউন বলেন: এর অর্থ হচ্ছে, কোন ব্যক্তির এ কথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি না হলে এমনটি হত না। ইবনে কুতায়বা (রহঃ) বলেন: মুশরিকরা বলে,
আমরা আমাদের মা‘বূদের সুপারিশের বদৌলতে এটি অর্জন করেছি।
যায়েদ বিন খালেদ হতে বর্ণিত হাদীছটি ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। তাতে এ কথা আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
«أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ»
“আজ আমার কোন বান্দার ভোরে নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছে মু’মিন অবস্থায়, আবার কারো ভোর হয়েছে কাফির অবস্থায়।
হাদীছের এই অংশের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে শাইখুল ইসলাম আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, এ ধরনের অনেক বক্তব্য কুরআন ও সুন্নাহয় উল্লেখ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করে এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে, আল্লাহ তা‘আলা এখানে তার নিন্দা করেছেন।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় কোন কোন সালফে ছলেহীন বলেন, বিষয়টি মুশরিকদের এ কথার মতই, “অঘটন থেকে বাঁচার কারণ হচ্ছে অনুকূল বাতাস, আর মাঝি-মাল্লারা ছিল বিচক্ষণ”। এ ধরনের আরো অনেক কথা রয়েছে যা সাধারণ মানুষের মুখে অহরহই শুনা যায়।
এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) আল্লাহর নিয়ামতগুলো চেনা এবং তা অস্বীকার করার ব্যাখ্যা জানা গেল।
২) জেনে-শুনে আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকারের বিষয়টি মানুষের মুখে বহুল প্রচলিত।
৩) মানুষের মুখে বহুল প্রচলিত এ সব কথা আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করারই শামিল।
৪) এ ধরনের কথা প্রমাণ করে যে, অন্তরে দু’টি বিপরীতমুখী (ঈমান ও কুফরী) বিষয়ের সমাবেশ ঘটতে পারে।
টিকাঃ
১৬৫. ছহীহ বুখারী হা/১০৩৮, ছহীহ মুসলিম হা/৭১, নাসাঈ হা/১৫২৫, মুসনাদে আহমাদ।