📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৪. তাক্বদীরের (ফায়ছালার) উপর ধৈর্যধারণ করা ঈমানের অঙ্গ

📄 ৩৪. তাক্বদীরের (ফায়ছালার) উপর ধৈর্যধারণ করা ঈমানের অঙ্গ


আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান রাখে, তিনি তার অন্তরকে হিদায়াত দান করেন”। (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)
আলকামা (রহঃ) বলেছেন, আয়াতে যার আলোচনা হয়েছে, সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে বিপদ আসলে মনে করে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এর ফলে সে বিপদগ্রস্ত হয়েও সন্তুষ্ট থাকে এবং বিপদকে খুব সহজেই মেনে নেয়।

ছহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন,
«اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ: الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ»
“মানুষের মধ্যে এমন দু’টি (মন্দ) স্বভাব রয়েছে যার দ্বারা তাদের কুফরী প্রকাশ পায়। একটি হচ্ছে, মানুষের বংশের মধ্যে দোষ লাগানো, অপরটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা”

বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত আছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ»
“যে ব্যক্তি (মুছীবতে) স্বীয় গালে আঘাত করে, বুকের জামা ছিঁড়ে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় চিৎকার করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الْخَيْرَ عَجَّلَ لَهُ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا، وَإِذَا أَرَادَ بِعَبْدِهِ الشَّرَّ أَمْسَكَ عَنْهُ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَافِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোন বান্দার মঙ্গল করতে চান, তখন দুনিয়াতেই তার (অপরাধের) শাস্তি দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে তিনি যখন তার কোন বান্দার অমঙ্গল করতে চান, তখন দুনিয়াতে তার পাপের শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকেন, যেন ক্বিয়ামতের দিন তাকে পূর্ণরূপে শাস্তি দেন”
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السُّخْطُ»
“পরীক্ষা যত কঠিন হয়, পুরস্কার তত বড় হয়। আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন সে জাতিকে তিনি পরীক্ষা করেন। এতে যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে সন্তুষ্টি। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার প্রতিও রয়েছে অসন্তুষ্টি”। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং হাসান বলেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আত তাগাবুনের ১১ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। আল্লাহ তা‘আলা সেখানে বলেন: “আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে (বিপদাপদ ও মুছীবতে পড়ে ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর উপর আস্থা রাখে), তিনি তার অন্তরকে সৎ পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত”।
২) বিপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অঙ্গ।
৩) কারো বংশের প্রতি অপবাদ দেয়া বা দুর্নাম করা কুফরীর শামিল।
৪) যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে, গাল চাপড়ায়, জামার আস্তিন ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলী যুগের কোন রীতি নীতির প্রতি আহবান জানায়, তার প্রতি কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।
৫) আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ চান এবং তাকে ভালবাসেন, তার আলামত কী, তাও জানা গেল। অর্থাৎ তিনি তখন তার সেই বান্দাকে মুছীবতে ফেলেন এবং পরীক্ষা করেন।
৬) আর আল্লাহ যখন তার কোন বান্দার অকল্যাণ চান, তার নিদর্শন কী, তাও জানা গেল। অর্থাৎ পাপ কাজ করার পরও তাকে শাস্তি দেন না; বরং তাকে নিয়ামতের মধ্যেই রাখেন।
৭) বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসার নিদর্শন সম্পর্কে জানা গেল।
৮) আল্লাহর (ফায়ছালার) প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া হারাম।
৯) বিপদে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার ছাওয়াব।

টিকাঃ
১৪৯. ছহীহ মুসলিম হা/৬৭, অধ্যায়: বিলাপ করার ভয়াবহতা।
১৫০. ছহীহ বুখারী হা/১২৯৪, অধ্যায়: যে ব্যক্তি মুছীবতে গাল চাপড়ায় সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়। ছহীহ মুসলিম হা/১০৩।
১৫১. হাসান ছহীহ: তিরমিযী হা/২৩৯৬, অধ্যায়: মুছীবতের সময় ধৈর্য ধারণ করা। ইমাম আলবানী (রহঃ) এ হাদীছকে হাসান বলেছেন। দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা হা/১২২০।
১৫২. হাসান: তিরমিযী হা/২৫৫৯, ইবনে মাজাহ হা/৪০৩১, ইমাম আলবানী (রহঃ) এ হাদীছকে হাসান বলেছেন। ছহীহ আল জামি‘ হা/২১১০।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৫. রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা প্রসঙ্গে শরী‘আতের বিধান

📄 ৩৫. রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা প্রসঙ্গে শরী‘আতের বিধান


আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
“হে নাবী! বল: আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহী পাঠানো হয় এ মর্মে যে, তোমাদের ইলাহ মাত্র এক। অতএব যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎ আমল করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে”। (সূরা কাহাফ: ১১০)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন
«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ مَعِي فِيهِ غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ»
“যে সমস্ত (বানোয়াট) মা‘বূদদেরকে আমার সাথে শরীক বলে ধারণা করা হয়, আমি তাদের সকলের শিরক থেকে অধিক মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন আমল করে এবং ঐ আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি ঐ ব্যক্তিকে এবং তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি”।

আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে অন্য এক ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে,
«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنَ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ؟ قَالُوا: بَلَىٰ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: الشِّرْكُ الْخَفِيُّ، يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ»
“আমি কি তোমাদের এমন বিষয়ে সংবাদ দেব না, যে বিষয়টি আমার কাছে ‘মসীহ দাজ্জালের’ চেয়েও ভয়ংকর?” বর্ণনাকারী বলেন: ছাহাবায়ে কেরাম বললেন: হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে শিরকে খফী’ বা গোপন শিরক। এর উদাহরণ হচ্ছে একজন মানুষ ছালাতে দাঁড়ায়। অতঃপর সে শুধু এ মনে করেই তার ছালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার ছালাত দেখছে”। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল কাহাফের ১১০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। সেখান থেকে বুঝা যাচ্ছে আমলে পূর্ণ ইখলাস না থাকলে এবং আমল সুন্নাত মোতাবেক না হলে তা কবুল হবে না।
২) নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে উক্ত নেক কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়াও অন্যকে খুশী করার নিয়্যাত করা।
৩) এহেন শিরক মিশ্রিত নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনিবার্য কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কারো প্রতি মুখাপেক্ষী না হওয়া। এ জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যাতের সাথে অন্য নিয়্যাত মিশ্রিত কোন আমলে তার প্রয়োজন নেই।
৪) আরো একটি কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার সাথে যাদেরকে শরীক করা হয়, তাদের সকলের চেয়ে আল্লাহ বহুগুণ উত্তম।
৫) রিয়ার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরামের উপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অন্তরে ভয় ও আশঙ্কা।
৬) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিয়ার ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, একজন মানুষ মূলত ছালাত আদায় করবে আল্লাহরই জন্য। তবে ছালাতকে সুন্দরভাবে আদায় করবে শুধু এজন্য যে, সে মনে করে কোন মানুষ তার ছালাত দেখছে।

টিকাঃ
১৫৩. ছহীহ মুসলিম হা/২৯৮৫, অধ্যায়: যে ব্যক্তি আমলে শিরক করল।
১৫৪. হাসান: ইবনে মাজাহ হা/৪২০৪, হাদীছের সনদ দুর্বল। তবে হাদীছের অর্থের অনেক শাহেদ (সমর্থক) রয়েছে। এ কারণেই ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছকে হাসান বলেছেন। দেখুন: ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩০, ছহীহ আল জামি‘ হা/২৬০৭।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৬. মানুষের নেক আমল দ্বারা নিছক পার্থিব স্বার্থ হাসিলের নিয়্যাত করা শিক©

📄 ৩৬. মানুষের নেক আমল দ্বারা নিছক পার্থিব স্বার্থ হাসিলের নিয়্যাত করা শিক©


আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যারা শুধু দুনিয়ার জীবন এবং এর চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদের সব কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে থাকি এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না। এরাই হল সেসব লোক আখিরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া অন্য কিছু নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ হয়েছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল। ।” (সূরা হূদ: ১৫-১৬)

ছহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، تَعِسَ عَبْدُ الدِّرْهَمِ، تَعِسَ عَبْدُ الْخَمِيصَةِ، تَعِسَ عَبْدُ الْخَمِيلَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ، طُوبَىٰ لِعَبْدٍ آخِذٍ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَّةً قَدَمَاهُ، إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ، وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ، إِنِ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَّعْ»
“ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, ধ্বংস হোক দিরহামের গোলাম, ধ্বংস হোক উত্তম চাদরের (পোশাকের) দাস, ধ্বংস হোক নরম পোশাকের গোলাম! তাকে কিছু দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। সে ধ্বংস হোক, উল্টে পড়ুক এবং সে যখন কাঁটা বিদ্ধ হবে তখন তা খুলতে না পারুক। সুসংবাদ ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য তার ঘোড়ার লাগাম ধরে আছে। তার মাথা ধূলিমলিন এবং পা দু’টি ধূলি ধুসরিত। তাকে সেনাবাহিনীi পাহারায় নিয়োজিত করা হলে সেখানেই নিয়োজিত থাকে। আর তাকে সেনাবাহিনীর পশ্চাতে রাখা হলে সে তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। সে অনুমতি প্রার্থনা করলে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। কোন বিষয়ে কারো জন্য সুপারিশ করলে তার সুপারিশও গ্রহণ করা হয় না”।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) মানুষ আখিরাতের আমল দ্বারা দুনিয়া হাসিলের নিয়্যাতও করে।
২) সূরা হূদের ১৫ ও ১৬ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
৩) একজন মুসলিম ব্যক্তিকে দীনার- দিরহাম ও পোশাকের গোলাম হিসাবে আখ্যায়িত করা।
৪) উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা হচ্ছে, সে মুসলিমকে দেয়া হলেই খুশী হয়, দেয়া না হলেই অসন্তুষ্ট হয়।
৫) দুনিয়াদারকে আল্লাহর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বলে বদ দু‘আ করেছেন, “সে ধ্বংস হোক, সে হতভাগ্য হোক, সে উল্টে পড়ুক এবং অপমানিত হোক অপদস্ত হোক।”
৬) দুনিয়াদারকে এ বলেও বদদোয়া করেছেন, “তার গায়ে কাঁটা ফুটুক এবং সে তা খুলতে না পারুক।”
৭) হাদীছে বর্ণিত গুণাবলীতে গুণান্বিত মুজাহিদের প্রশংসা করা হয়েছে। সে সৌভাগ্যের অধিকারী বলে জানানো হয়েছে।

টিকাঃ
১৫৫. শিরকে আছগার বা ছোট শিরক।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৭. যে ব্যক্তি আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম এবং হারামকৃত জিনিসকে হালাল করার ব্যাপারে আলেম ও নেতাদের আনুগত্য করল সে মূলত তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করল

📄 ৩৭. যে ব্যক্তি আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম এবং হারামকৃত জিনিসকে হালাল করার ব্যাপারে আলেম ও নেতাদের আনুগত্য করল সে মূলত তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করল


আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,
«يُوشِكُ أَنْ تَنْزِلَ عَلَيْكُمْ حِجَارَةٌ مِنَ السَّمَاءِ، أَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ؟ ، وَتَقُولُونَ قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ»
“তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। কারণ আমি বলছি, “রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন অথচ তোমরা বলছো, “আবু বকর এবং উমার (রাঃ) বলেছেন”।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলেন, “ঐ সব লোকদের ব্যাপারটি আমার কাছে খুবই অবাক লাগে, যারা হাদীছের সনদ ও বিশুদ্ধতা অর্থাৎ ছহীহ হওয়ার বিষয়টি জানার পরও সুফইয়ান সাওরির মতামতকে গ্রহণ করে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা তার (রাসূলের) নির্দেশের বিরোধীতা করে, তাদের এ ভয় করা উচিত যে, তাদের উপর কোন কঠিন পরীক্ষা কিংবা কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়তে পারে”। (সূরা আন নূর: ৬৩)
তুমি কি জানো ফিতনা কী? ফিতনা হচ্ছে শিরক। কেও রাসূলের কোন কথা প্রত্যাখ্যান করলে সম্ভবত তার অন্তরে বক্রতার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে সে ধ্বংসও হতে পারে”।

আ’দী বিন হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিম্ন বর্ণিত আয়াতটি পাঠ করতে শুনেছি,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ» ، فَقُلْتُ لَهُ: إِنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ، قَالَ: «أَلَيْسَ يُحَرِّمُونَ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَتُحَرِّمُونَهُ، وَيُحِلُّونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَتُحِلُّونَهُ؟ » ، فَقُلْتُ: بَلَىٰ، قَالَ: «فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ»
“তারা (ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানরা) আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিতগণকে ও সংসার-বিরাগিদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল এক মা‘বূদের ইবাদত করার জন্য। তিনি ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। তারা যাকে তার শরীক সাব্যস্ত করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। (সূরা আত তাওবা: ৩১) তখন আমি নাবীজীকে বললাম, “আমরা তো তাদের ইবাদত করি না”। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আল্লাহর হালাল ঘোষিত জিনিসকে তারা হারাম বললে, তোমরা কি তা হারাম হিসাবে গ্রহণ করো না? আবার আল্লাহর হারাম ঘোষিত জিনিসকে তারা হালাল বললে, তোমরা কি তা হালাল হিসাবে গ্রহণ করো না? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি তখন বললেন: “এটাই তাদের ইবাদত করার মধ্যে গণ্য”।
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত মাসআলাগুলো জানা যায়
১) সূরা আন নূরের ৬৩ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ৩১ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) এখানে ইবাদতের তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে, যা আ’দী বিন হাতিম অস্বীকার করেছিলেন।
৪) ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক আবু বকর এবং ওমর (রাঃ) এর দৃষ্টান্ত। আর ইমাম আহমাদ (রহঃ) কর্তৃক সুফইয়ান ছাওরীর দৃষ্টান্ত পেশ করা।
৫) মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে এমন গোমরাহীর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, তাদের অধিকাংশই আলেম ও পীর-বুযুর্গের পূজা করাকে সর্বোত্তম আমল হিসাবে গণ্য করছে। আর এরই নাম দেয়া হয়েছে ‘বেলায়েত’। যারা আলেম ও পীর-বুযুর্গ ব্যক্তিদের ইবাদত করে, তাদেরকেই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অতঃপর অবস্থার আরো পরিবর্তন সাধিত হয়ে বর্তমানে এমন পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব ব্যক্তিদের ইবাদত করা হচ্ছে, যারা আদৌ ভাল লোকদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। সে সাথে এমন লোকদেরও ইবাদত করা হচ্ছে, যারা একদম জাহেল-অজ্ঞ।

টিকাঃ
১৫৭. দেখুন: তাফসীরে ইবনে কাছীর, (২/৩৪৮)
১৫৮. দেখুন: ইবনে বাত্তাহ কর্তৃক রচিত আল-ইবানাতুল কুবরাহ, পৃষ্ঠা/৯৭, মাসায়েলে আব্দুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ (৩/১৩৫৫)।
১৫৯. উক্ত হাদীছকে ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন। তবে অন্যান্য মুহাদ্দিছগণের নিকট এটির সনদ বিশুদ্ধ নয়। বস্তুত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য আয়াতের মূল বক্তব্যই যথেষ্ট। উল্লেখ্য যে, উক্ত বক্তব্যের সমর্থনে বহু আয়াত ও হাদীছ রয়েছে। আলবানী হাসান বলেছেন। তিরমিযী হা/৩০৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00