📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩২. আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা

📄 ৩২. আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
“তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর।” (সূরা আল মায়েদা: ২৩)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
“একমাত্র তারাই মু’মিন যাদের সামনে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হয় আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা স্বীয় প্রভুর উপর ভরসা করে। (সূরা আল আনফাল: ২)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
“হে নাবী! তোমার জন্য এবং যেসব মু’মিন তোমার সাথে রয়েছে তাদের সবার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক: ৩)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»، قَالَهَا إِبْرَاهِيمُ - عليه السلام - حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَقَالَهَا مُحَمَّدٌ - صلى الله عليه وسلم - حِينَ قَالُوا لَهُ: {إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا} الْآيَةَ
“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম কর্মসম্পাদনকারী”। এ কথা ইবরাহীম আ. তখন বলেছিলেন, যখন তাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আর উহুদ যুদ্ধের পর মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে লোকেরা যখন বলেছিল, “লোকেরা আপনাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী সমাবেশ করেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করুন”। (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩) তখন তিনি উক্ত কথা বলেছিলেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম নাসাঈ এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) আল্লাহর উপর ভরসা করা ফরয।
২) আল্লাহর উপর ভরসা করা ঈমানের অন্যতম শর্ত।
৩) সূরা আল আনফালের ২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।
৪) উক্ত আয়াতটির তাফসীর, অধ্যায়ের শেষাংশেই রয়েছে।
৫) সূরা তালাকের ৩ নং আয়াতের তাফসীর।
৬) حسبنا هلل ونعم الوكيل কথাটির বিরাট গুরুত্বের কথা জানা গেল। ইবরাহীম আ. ও মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপদের সময় এ বাক্যটি বলেছিলেন।

টিকাঃ
১৪৪. তাওয়াক্কুল দু’প্রকার:
(১) এমন বস্তুর ব্যাপারে তাওয়াক্কুল করা, যার ক্ষমতা শুধু আল্লাহর কাছেই। যে সমস্ত বিষয়ের ক্ষমতা শুধু আল্লাহর কাছেই, সেসব বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অলী-আওলিয়া এবং অনুরূপ অন্যান্যদের উপর ভরসা করা বড় শিরকের অন্তর্ভূক্ত, তাওবা ব্যতীত আল্লাহ তা‘আলা যা ক্ষমা করবেন না।
আর উপস্থিত এবং জীবিত লোক, রাজা-বাদশাহ এবং অনুরূপ যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমতা দিয়েছেন, যেমন রিযিক দেয়ার ক্ষমতা, কষ্ট দূর করার ক্ষমতা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ের ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে দিয়েছেন, তাদের উপর সে বিষয়ে ভরসা করা شرك أصغر তথা ছোট শিরকের অন্যতম প্রকার।
(২) বৈধ তাওয়াক্কুল হচ্ছে, মানুষ তার দুনিয়াবী কাজ-কর্ম সম্পাদন করার জন্য কাউকে উকীল বানাবে। সে তার মত করেই তার কাজ-কর্ম পরিচালনা করবে। যেমন কেনা-বেচা, ভাড়া দেয়া, বিবাহ-তালাক, গোলাম আযাদ ইত্যাদি কাজ-কর্ম কেউ স্বীয় উকীলের মাধ্যমে সম্পাদন করল। এটি সকলের ঐক্যমতে জায়েয। তবে এ ক্ষেত্রে এটি বলা জায়েয নেই যে توكلت عليه আমি তার উপর ভরসা করলাম। বরং বলতে হবে যে, وكلته আমি তাকে উকীল বানালাম। কেননা সে যখন উকীল বানায়, তখন কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার উপরই ভরসা করে।
১৪৫. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এবং অন্যান্য আলেমগণ বলেন: আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। অতএব, আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং তিনি যার হেফাজতকারী হবেন, শত্রুরা তার কোন ক্ষতি করার চিন্তাও করতে পারবেনা। তারা শুধু ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে। যেমন গরম-ঠান্ডা, ক্ষুধা-পিপাসা ইত্যাদি। কিন্তু শত্রুরা তাদের মনোবাসনা অনুযায়ী যত ইচ্ছা ক্ষতি করবে এটি কখনই হবে না। কোন কোন সালাফ বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রত্যেক কাজের বদলা কাজের অনুরূপই নির্ধারণ করেছেন। তিনি তাঁর উপর ভরসা করার বদলা এইভাবে নির্ধারণ করেছেন যে, কেও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন। আল্লাহ তা‘আলা এখানে বলেন নি যে, তার জন্য এত এত পুরস্কার রয়েছে। যেমন বলেছেন অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর উপর ভরসাকারী বান্দার জন্য নিজেকেই যথেষ্ট বানিয়েছেন। অতএব আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং সকল শত্রু ও অনিষ্ট হতে তাকে হেফাজত করবেন।
যেই বান্দা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা করবে, সমস্ত আসমান-যমীন এবং তার মধ্যকার সকল বস্তু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলেও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সেই বান্দাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং তাকে মদদ করবেন। ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এর কথা এখানেই শেষ।
১৪৬. ছহীহ বুখারী হা/৪৫৬৩, অধ্যায়: তোমাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী জড়ো হয়েছে।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৩. আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়

📄 ৩৩. আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ ۚ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
“তারা কি আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়েছে? ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে অন্য কেউ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে না”। (সূরা আল আ‘রাফ: ৯৯)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন,
وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
“একমাত্র পথভ্রষ্ট লোকেরা ব্যতীত স্বীয় রবের রহমত থেকে আর কে নিরাশ হতে পারে”? (সূরা আল হিজর: ৫৬)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, কবীরা গুনাহ হচ্ছে:
«الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ»
“আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা।”

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন:
«أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ، وَالْقُنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ»
“সবচেয় বড় কবীরাহ গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে শরীক করা, আল্লাহর পাকড়াও (শাস্তি) হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর করুণা থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা।” ইমাম আব্দুর রাযযাক স্বীয় মুসান্নাফে এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল আ‘রাফের ৯৯ নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আল হিজরের ৫৬ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) আল্লাহর পাকড়াও থেকে ভয়হীন ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।
৪) আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ ব্যক্তিদের জন্যও রয়েছে কঠোর আযাবের হুমকি।

টিকাঃ
১৪৭. হাসান: আলবানী, ছহীহ আল জামি‘ হা/৪৪৮৯, মুসনাদে বাযযার।
১৪৮. হাসান: মাওকূফ সূত্রে ছহীহ। দেখুন, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক (১০/৪৫৯), তাফসীরে তাবারী, হা/৬১৯১ এবং তাবারানী আল-কাবীর, হা/৮৭৮৩ এবং অন্যান্য।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৪. তাক্বদীরের (ফায়ছালার) উপর ধৈর্যধারণ করা ঈমানের অঙ্গ

📄 ৩৪. তাক্বদীরের (ফায়ছালার) উপর ধৈর্যধারণ করা ঈমানের অঙ্গ


আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান রাখে, তিনি তার অন্তরকে হিদায়াত দান করেন”। (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)
আলকামা (রহঃ) বলেছেন, আয়াতে যার আলোচনা হয়েছে, সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে বিপদ আসলে মনে করে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এর ফলে সে বিপদগ্রস্ত হয়েও সন্তুষ্ট থাকে এবং বিপদকে খুব সহজেই মেনে নেয়।

ছহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন,
«اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ: الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ»
“মানুষের মধ্যে এমন দু’টি (মন্দ) স্বভাব রয়েছে যার দ্বারা তাদের কুফরী প্রকাশ পায়। একটি হচ্ছে, মানুষের বংশের মধ্যে দোষ লাগানো, অপরটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা”

বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত আছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ»
“যে ব্যক্তি (মুছীবতে) স্বীয় গালে আঘাত করে, বুকের জামা ছিঁড়ে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় চিৎকার করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الْخَيْرَ عَجَّلَ لَهُ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا، وَإِذَا أَرَادَ بِعَبْدِهِ الشَّرَّ أَمْسَكَ عَنْهُ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَافِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোন বান্দার মঙ্গল করতে চান, তখন দুনিয়াতেই তার (অপরাধের) শাস্তি দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে তিনি যখন তার কোন বান্দার অমঙ্গল করতে চান, তখন দুনিয়াতে তার পাপের শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকেন, যেন ক্বিয়ামতের দিন তাকে পূর্ণরূপে শাস্তি দেন”
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السُّخْطُ»
“পরীক্ষা যত কঠিন হয়, পুরস্কার তত বড় হয়। আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন সে জাতিকে তিনি পরীক্ষা করেন। এতে যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে সন্তুষ্টি। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার প্রতিও রয়েছে অসন্তুষ্টি”। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং হাসান বলেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আত তাগাবুনের ১১ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। আল্লাহ তা‘আলা সেখানে বলেন: “আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে (বিপদাপদ ও মুছীবতে পড়ে ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর উপর আস্থা রাখে), তিনি তার অন্তরকে সৎ পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত”।
২) বিপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অঙ্গ।
৩) কারো বংশের প্রতি অপবাদ দেয়া বা দুর্নাম করা কুফরীর শামিল।
৪) যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে, গাল চাপড়ায়, জামার আস্তিন ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলী যুগের কোন রীতি নীতির প্রতি আহবান জানায়, তার প্রতি কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।
৫) আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ চান এবং তাকে ভালবাসেন, তার আলামত কী, তাও জানা গেল। অর্থাৎ তিনি তখন তার সেই বান্দাকে মুছীবতে ফেলেন এবং পরীক্ষা করেন।
৬) আর আল্লাহ যখন তার কোন বান্দার অকল্যাণ চান, তার নিদর্শন কী, তাও জানা গেল। অর্থাৎ পাপ কাজ করার পরও তাকে শাস্তি দেন না; বরং তাকে নিয়ামতের মধ্যেই রাখেন।
৭) বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসার নিদর্শন সম্পর্কে জানা গেল।
৮) আল্লাহর (ফায়ছালার) প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া হারাম।
৯) বিপদে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার ছাওয়াব।

টিকাঃ
১৪৯. ছহীহ মুসলিম হা/৬৭, অধ্যায়: বিলাপ করার ভয়াবহতা।
১৫০. ছহীহ বুখারী হা/১২৯৪, অধ্যায়: যে ব্যক্তি মুছীবতে গাল চাপড়ায় সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়। ছহীহ মুসলিম হা/১০৩।
১৫১. হাসান ছহীহ: তিরমিযী হা/২৩৯৬, অধ্যায়: মুছীবতের সময় ধৈর্য ধারণ করা। ইমাম আলবানী (রহঃ) এ হাদীছকে হাসান বলেছেন। দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা হা/১২২০।
১৫২. হাসান: তিরমিযী হা/২৫৫৯, ইবনে মাজাহ হা/৪০৩১, ইমাম আলবানী (রহঃ) এ হাদীছকে হাসান বলেছেন। ছহীহ আল জামি‘ হা/২১১০।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৫. রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা প্রসঙ্গে শরী‘আতের বিধান

📄 ৩৫. রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা প্রসঙ্গে শরী‘আতের বিধান


আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
“হে নাবী! বল: আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহী পাঠানো হয় এ মর্মে যে, তোমাদের ইলাহ মাত্র এক। অতএব যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎ আমল করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে”। (সূরা কাহাফ: ১১০)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন
«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ مَعِي فِيهِ غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ»
“যে সমস্ত (বানোয়াট) মা‘বূদদেরকে আমার সাথে শরীক বলে ধারণা করা হয়, আমি তাদের সকলের শিরক থেকে অধিক মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন আমল করে এবং ঐ আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি ঐ ব্যক্তিকে এবং তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি”।

আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে অন্য এক ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে,
«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنَ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ؟ قَالُوا: بَلَىٰ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: الشِّرْكُ الْخَفِيُّ، يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ»
“আমি কি তোমাদের এমন বিষয়ে সংবাদ দেব না, যে বিষয়টি আমার কাছে ‘মসীহ দাজ্জালের’ চেয়েও ভয়ংকর?” বর্ণনাকারী বলেন: ছাহাবায়ে কেরাম বললেন: হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে শিরকে খফী’ বা গোপন শিরক। এর উদাহরণ হচ্ছে একজন মানুষ ছালাতে দাঁড়ায়। অতঃপর সে শুধু এ মনে করেই তার ছালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার ছালাত দেখছে”। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল কাহাফের ১১০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। সেখান থেকে বুঝা যাচ্ছে আমলে পূর্ণ ইখলাস না থাকলে এবং আমল সুন্নাত মোতাবেক না হলে তা কবুল হবে না।
২) নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে উক্ত নেক কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়াও অন্যকে খুশী করার নিয়্যাত করা।
৩) এহেন শিরক মিশ্রিত নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনিবার্য কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কারো প্রতি মুখাপেক্ষী না হওয়া। এ জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যাতের সাথে অন্য নিয়্যাত মিশ্রিত কোন আমলে তার প্রয়োজন নেই।
৪) আরো একটি কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার সাথে যাদেরকে শরীক করা হয়, তাদের সকলের চেয়ে আল্লাহ বহুগুণ উত্তম।
৫) রিয়ার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরামের উপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অন্তরে ভয় ও আশঙ্কা।
৬) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিয়ার ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, একজন মানুষ মূলত ছালাত আদায় করবে আল্লাহরই জন্য। তবে ছালাতকে সুন্দরভাবে আদায় করবে শুধু এজন্য যে, সে মনে করে কোন মানুষ তার ছালাত দেখছে।

টিকাঃ
১৫৩. ছহীহ মুসলিম হা/২৯৮৫, অধ্যায়: যে ব্যক্তি আমলে শিরক করল।
১৫৪. হাসান: ইবনে মাজাহ হা/৪২০৪, হাদীছের সনদ দুর্বল। তবে হাদীছের অর্থের অনেক শাহেদ (সমর্থক) রয়েছে। এ কারণেই ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছকে হাসান বলেছেন। দেখুন: ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩০, ছহীহ আল জামি‘ হা/২৬০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00