📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩০. ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ব্যতীত অন্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো

📄 ৩০. ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ব্যতীত অন্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে আল্লাহর সাদৃশ্য স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
“হে রাসূল! তুমি বলে দাও, তোমাদের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, তোমাদের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা, যার লোকসান হওয়াকে তোমরা অপছন্দ করো এবং তোমাদের পছন্দনীয় বাড়ী-ঘর তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তার রাসূল ও তাঁরই পথে জিহাদ করার চেয়ে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়ছালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আর আল্লাহ্ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।” (সূরা আত তাওবা: ২৪)

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”

বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»
“যার মধ্যে তিনটি জিনিস বিদ্যমান আছে সে ব্যক্তি এগুলোর দ্বারা ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে। (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তার রাসূল সর্বাধিক প্রিয় হবেন। (দুই) একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার (সন্তুষ্টি লাভের) জন্য কোন ব্যক্তিকে ভালবাসবে। (তিন) আল্লাহ তা‘আলা তাকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তার কাছে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতই অপছন্দনীয় হবে”।
ছহীহ বুখারীর অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
«لَا يَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَحَتَّى أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، وَحَتَّى يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
“কেও ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কোন মানুষকে ভালবাসবে, কুফরী থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুক্তি দেয়ার পর যতক্ষণ না সে পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অধিক ভালবাসবে এবং যতক্ষণ না আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল তার কাছে অন্যসব বস্তু হতে অধিক প্রিয় হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ أَحَبَّ فِي اللَّهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللَّهِ، وَوَالَى فِي اللَّهِ، وَعَادَى فِي اللَّهِ، فَإِنَّمَا تُنَالُ وَلَايَةُ اللَّهِ بِذَلِكَ، وَلَنْ يَجِدَ عَبْدٌ طَعْمَ الْإِيمَانِ، وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ، حَتَّى يَكُونَ كَذَلِكَ، وَقَدْ صَارَتْ عَامَّةُ مُؤَاخَاةِ النَّاسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، وَذَلِكَ لَا يُجْدِي عَلَى أَهْلِهِ شَيْئًا»
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করে; তার এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করা যাবে। আর এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ব্যতীত কোন বান্দাই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, তার ছালাত-সিয়ামের পরিমাণ যত বেশীই হোক না কেন।
(বর্তমানে) মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্থিব স্বার্থ। এ ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দ্বারা তার কোন উপকার হবে না।

আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,
وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ
“গুরুরা যখন তাদের ভক্তদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং জাহান্নামের আযাব প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের মধ্যকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৬)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় :
১) সূরা আল বাকারার ১৬ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালবাসাকে জীবন, পরিবার ও ধন-সম্পদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ওয়াজিব।
৪) কোন কোন বিষয় এমন আছে যা ঈমানের পরিপন্থী হলেও এর দ্বারা ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া বুঝায় না। এমতাবস্থায় তাকে অপূর্ণাঙ্গ মু’মিন বলা যেতে পারে।
৫) ঈমানের একটা স্বাদ আছে। মু’মিন বান্দা কখনো এ স্বাদ অনুভব করতে পারে আবার কখনো অনুভব নাও করতে পারে।
৬) অন্তরের এমন চারটি আমল আছে, যা ব্যতীত আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভ করা যায় না এবং ঈমানের স্বাদও অনুভব করা যায় না।
৭) একজন প্রখ্যাত ছাহাবী দুনিয়ার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সাধারণত গড়ে উঠে পার্থিব বিষয়ের ভিত্তিতে।
৮) وتقطعت بهم الأسباب এর তাফসীর জানা গেল। যা একটু আগে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
৯) মুশরিকদের মধ্যেও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে খুব ভালবাসে। কিন্তু শিরকের কারণে এ ভালবাসা অর্থহীন।
১০) যে ব্যক্তির কাছে সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতে উল্লেখিত ৮টি বস্তু স্বীয় দীন অপেক্ষা অধিক প্রিয় হবে, তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
১১) যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার মতই ঐ শরীককে ভালবাসে সে শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় ধরনের শিরকে লিপ্ত হয়।

টিকাঃ
১৩৫. ছহীহ বুখারী হা/১৫, অধ্যায়: রাসূলকে ভালবাসা ঈমানের অন্তর্ভূক্ত।
১৩৬. শাইখুল ইসলাম বলেন: নাবী ﷺ সংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তির মধ্যে এই তিনটি গুণ পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে সক্ষম হবে। কেননা কোন জিনিসে স্বাদ পাওয়া উক্ত জিনিসের প্রতি মুহাব্বতের প্রমাণ বহন করে। যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে ভালবাসে এবং তা পাওয়ার আকাঙ্খা করে, অতঃপর যখন সে তা পেয়ে যায় তখন উক্ত বিষয়টি পেয়ে স্বাদ, মজা এবং আনন্দ পায়। স্বাদ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা প্রিয় ও কাঙ্খিত বস্তু লাভ করার পরই অর্জিত হয়।
শাইখুল ইসলাম আরো বলেন: আল্লাহকে পরিপূর্ণ ভালবাসার পরই ঈমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। এটি হাসিল হয় তিনটি জিনিসের মাধ্যমে। বান্দার মধ্যে আল্লাহর ভালবাসা পূর্ণ হওয়া, এটিকে শুধু আল্লাহর জন্যই খালেস করা ও উপরোক্ত বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে অন্তর থেকে বের করে দেয়ার মাধ্যমে।
আল্লাহর পরিপূর্ণ ভালবাসার অর্থ হচ্ছে, বান্দার মধ্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা অন্যান্য সকল বস্তুর চেয়ে অধিক পরিমাণে থাকা। কেননা বান্দার অন্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি মৌলিক ভালবাসা থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা সর্বাধিক হতে হবে।
১৩৭. ছহীহ বুখারী হা/৬০৪১, অধ্যায়: আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসা।
১৩৮. ইবনে জারীর এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে এই সনদে হাদীছটি দুর্বল। মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা; লালকাঈ, শারহু উছুলিল ই‘তিক্বাদ হা/১৬৯১, যঈফ।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩১. ঈমানের অন্যতম দাবি হল কেবল আল্লাহকেই ভয় করা

📄 ৩১. ঈমানের অন্যতম দাবি হল কেবল আল্লাহকেই ভয় করা


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا ذَٰلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
“এরা হল শয়তান, যারা তোমাদেরকে তার বন্ধুদের (কাফির-বে-ঈমান) দ্বারা ভয় দেখায়। তোমরা যদি প্রকৃত মু’মিন হয়ে থাক তাহলে তাদেরকে (শয়তানের বন্ধুদেরকে) ভয় করো না; বরং আমাকেই ভয় করো।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
“আল্লাহর মাসজিদগুলোকে একমাত্র তারাই আবাদ করতে পারে, যারা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, ছালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হিদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আত তাওবা: ১৮)

আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। এরপর যখন আল্লাহর পথে তারা দুঃখ কষ্ট পায় তখন মানুষের চাপানো দুঃখ কষ্টের পরীক্ষাকে তারা আল্লাহর আযাবের সমতুল্য মনে করে।” (সূরা আল আনকাবূত: ১০)

কাতাদাহ বলেন: শয়তান মানুষের অন্তরে তার বন্ধুদেরকে বড় করে দেখায়। যখনই বান্দার ঈমান মযবুত হয়, তখনই তার অন্তর থেকে শয়তানের বন্ধুদের ভয় দূর হয়ে যায়। আর যখনই ঈমান দুর্বল হয়, তখনই বান্দার অন্তরে শয়তানের বন্ধুদের ভয় প্রকট আকার ধারণ করে। অতএব আয়াতটি প্রমাণ করে যে, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা পরিপূর্ণ ঈমানের শর্তসমূহের অন্যতম। তাফসীর ও সীরাতের কিতাবসমূহে এই আয়াতের শানে নুযূল বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: খাওফে ইলাহী তথা অন্তরের ভয় আল্লাহর ইবাদাতের অন্যতম প্রকার। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য তা করা ঠিক নয়। আল্লাহর সামনে নত হওয়া, আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহর কাছেই আশা করা এবং এ প্রকারের অন্যসব বিষয় ইবাদাতে ক্বালবিয়্যা অর্থাৎ অন্তরের ইবাদাতের অন্তর্ভূক্ত।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: যে সমস্ত মানুষের কাছে নাবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে, তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। একভাগ বলেছে আমরা ঈমান আনয়ন করেছি, আরেকভাগ তা বলেনি। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা কুফরী ও গুনাহ-এর পথেই চলেছে। যারা বলেছে: আমরা ঈমান আনয়ন করলাম, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মুসীবত ও বিপদাপদে ফেলে পরীক্ষা করেছেন। الفتنة এর অন্যতম অর্থ হচ্ছে মুসীবতে ফেলে ঈমান পরীক্ষা করা। আর যারা ঈমান আনয়ন করেনি, তারা যেন মনে না করে যে, সে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে কিংবা আল্লাহর পাকড়াও থেকে পলায়ন করতে পারবে অথবা তাঁকে পরাজিত করতে পারবে।
সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কষ্ট করতে হবে। যে ঈমান এনেছে, সেও কষ্ট করবে, আর যে ঈমান গ্রহণ করেনি, তাকেও কষ্ট করতে হবে। তবে কথা হচ্ছে মু’মিন ব্যক্তি প্রথমে কষ্ট করবে দুনিয়াতে। অতঃপর দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর পরিণাম ভাল হবে।
কিন্তু ঈমান থেকে বিমুখ ব্যক্তি প্রথমে দুনিয়াতে সুখ-শান্তি ভোগ করবে। অতঃপর সে চিরস্থায়ী কষ্টের মধ্যে নিপতিত হবে।
দ্বীনের দাঈর জন্য সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে বসবাস করা জরুরী। মানুষের রয়েছে বিভিন্ন স্বপ্ন, চিন্তা-চেতনা ও বিভিন্ন আশা-আকাঙ্খা। সমাজের মানুষেরা চায় অন্য দ্বীনের দাঈও তাদের চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতির অনুসরণ করেই চলুক। এ ক্ষেত্রে সে যদি সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির বিরোধীতা করে, তাহলে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির অনুসারী লোকেরা তাকে কষ্ট ও শাস্তি দিবে।
আর যদি দ্বীনের দাঈ সমাজের লোকদের চিরাচরিত ও প্রচলিত রীতিনীতি ও আচার অভ্যাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলে, তাহলেও সে শাস্তি পাবে। এই শাস্তি কখনো পাবে তার সমাজের লোকদের পক্ষ হতেই। আবার কখনো পাবে অন্যদের পক্ষ হতে।
সুতরাং পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার ঐ কথার উপর আমল করা আবশ্যক, যা তিনি মু‘আবীয়া (রাঃ) কে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
«مَنِ ارْتَضَى اللَّهَ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ، وَمَنِ ارْتَضَى النَّاسَ بِسَخَطِ اللَّهِ لَمْ يُغْنُوا عَنْهُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا»
“যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, তার জন্য মানুষের মুকাবেলায় আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করে মানুষেরা আল্লাহর মুকাবেলায় তার কোনই কাজে আসবেনা”।
আল্লাহ যাকে হেদায়াত করেন, সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং যাকে নফসের অনিষ্ট হতে বাঁচান, সে হারাম কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে এবং দুষ্ট লোকদের শত্রুতার উপর ধৈর্য ধারণ করে। এতে করে সে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হয়। যেমন হয়েছিলেন নাবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীগণ।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করেছেন, যে ঈমান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করেই ঈমান আনয়ন করেছে। এ রকম মানুষকে যখন আল্লাহর রাস্তায় কষ্ট দেয়া হয়, তখন মানুষের ফিতনাকে আল্লাহর সেই আযাবের মতই মনে করে, যা থেকে বাঁচার জন্যই মু’মিনগণ ঈমাণ গ্রহণ করেছেন। ফলে যেই কারণে তাকে এই কষ্ট দেয়া হয়, তা (আল্লাহর পথ) বর্জন করে। অথচ এটি এমন একটি কষ্ট, যা নাবী-রাসূলগণ এবং তাদের অনুসারীগণ বিরোধীদের পক্ষ হতে সবসময়ই ভোগ করেছেন।
প্রকৃত মু’মিনগণ তাদের পূর্ণ দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার ফলে আল্লাহর আযাবের কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য ঈমানের ছায়াতলে আশ্রয় নেন এবং ঈমানের পথে ক্ষণস্থায়ী দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে,
«إِنَّ مِنْ ضَعْفِ الْيَقِينِ أَنْ تُرْضِيَ النَّاسَ بِسَخَطِ اللَّهِ، وَأَنْ تَحْمَدَهُمْ عَلَى رِزْقِ اللَّهِ، وَأَنْ تَذُمَّهُمْ عَلَى مَا لَمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ، إِنَّ رِزْقَ اللَّهِ لَا يَجُرُّهُ حِرْصُ حَرِيصٍ، وَلَا يَرُدُّهُ كَرَاهِيَةُ كَارِهٍ»
“বিশ্বাসের দুর্বলতার পরিচয় হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, আল্লাহর দেয়া রিযিক ভোগ করে মানুষের গুণগান করা এবং তোমাকে আল্লাহ যা দান করেননি তার ব্যাপারে মানুষের বদনাম করা। জেনে রাখা দরকার যে, কোন লোভীর লোভ আল্লাহর রিযিক টেনে আনতে পারে না। আবার কোন ঘৃণাকারীর ঘৃণা আল্লাহর রিযিক বন্ধ করতে পারে না”।

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنِ الْتَمَسَ رِضَا اللَّهِ بِسَخَطِ النَّاسِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَأَرَضَى عَنْهُ النَّاسَ، وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَا النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَسْخَطَ عَلَيْهِ النَّاسَ»
যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন, আর মানুষকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহও অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল-ইমরানের ১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ১৮ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) সূরা আল আনকাবূতের ১০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
৪) ঈমান দুর্বল হয় এবং শক্তিশালী হয়।
৫) ঈমান দুর্বল হওয়ার কিছু আলামতও রয়েছে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) এর হাদীছে দুর্বল ঈমানের তিনটি আলামত বর্ণিত হয়েছে। (১) আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, (২) আল্লাহর দেয়া রিযিক ভোগ করে মানুষের গুণগান করা (৩) আল্লাহ যা দান করেননি, তার ব্যাপারে মানুষকে দোষারোপ করা।
৬) ভয়কে শুধু আল্লাহর জন্যই খালেস-একনিষ্ঠ করা ঈমানের অন্যতম দাবি।
৭) যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহকেই ভয় করে, তার ছওয়াবের বর্ণনা রয়েছে।
৮) যে আল্লাহকে ভয় করে না, তার শাস্তিও বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১৩৯. আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: শয়তানের চক্রান্তের মধ্যে এটিও একটি চক্রান্ত যে, সে মু’মিনদেরকে তার সৈন্যবাহিনী এবং বন্ধুদের মাধ্যমে ভয় দেখায়। যাতে মু’মিনগণ শয়তানদের বিরুদ্ধে জিহাদ না করেন, সৎ কাজের আদেশ না দেন এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ না করেন। আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, এটিই শয়তানের চক্রান্ত এবং তার ভয় দেখানো। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শয়তানকে ভয় করতে নিষেধ করেছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: সকল মুফাসসিরের নিকট আয়াতের অর্থ হচ্ছে, শয়তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে মু’মিনদেরকে ভয় দেখায়।
১৪০. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: খাওফে ইলাহী তথা অন্তরের ভয় আল্লাহর ইবাদাতের অন্যতম প্রকার। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য তা করা ঠিক নয়। আল্লাহর সামনে নত হওয়া, আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহর কাছেই আশা করা এবং এ প্রকারের অন্যসব বিষয় ইবাদাতে ক্বালবিয়্যা অর্থাৎ অন্তরের ইবাদাতের অন্তর্ভূক্ত।
১৪১. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: যে সমস্ত মানুষের কাছে নাবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে, তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। একভাগ বলেছে আমরা ঈমান আনয়ন করেছি, আরেকভাগ তা বলেনি। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা কুফরী ও গুনাহ-এর পথেই চলেছে। যারা বলেছে: আমরা ঈমান আনয়ন করলাম, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মুসীবত ও বিপদাপদে ফেলে পরীক্ষা করেছেন। الفتنة এর অন্যতম অর্থ হচ্ছে মুসীবতে ফেলে ঈমান পরীক্ষা করা। আর যারা ঈমান আনয়ন করেনি, তারা যেন মনে না করে যে, সে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে কিংবা আল্লাহর পাকড়াও থেকে পলায়ন করতে পারবে অথবা তাঁকে পরাজিত করতে পারবে।
১৪২. যঈফ: আলবানী যঈফ বলেছেন, যঈফুল জামে‘ হা/২০০৯।
১৪৩. ছহীহ: ইবনে হিব্বান হা/২৭৬, তিরমিযী হা/২৪১৪, আলবানী ছহীহ বলেছেন, আছ ছহীহাহ হা/২৩১১।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩২. আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা

📄 ৩২. আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
“তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর।” (সূরা আল মায়েদা: ২৩)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
“একমাত্র তারাই মু’মিন যাদের সামনে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হয় আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা স্বীয় প্রভুর উপর ভরসা করে। (সূরা আল আনফাল: ২)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
“হে নাবী! তোমার জন্য এবং যেসব মু’মিন তোমার সাথে রয়েছে তাদের সবার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক: ৩)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»، قَالَهَا إِبْرَاهِيمُ - عليه السلام - حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَقَالَهَا مُحَمَّدٌ - صلى الله عليه وسلم - حِينَ قَالُوا لَهُ: {إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا} الْآيَةَ
“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম কর্মসম্পাদনকারী”। এ কথা ইবরাহীম আ. তখন বলেছিলেন, যখন তাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আর উহুদ যুদ্ধের পর মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে লোকেরা যখন বলেছিল, “লোকেরা আপনাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী সমাবেশ করেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করুন”। (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩) তখন তিনি উক্ত কথা বলেছিলেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম নাসাঈ এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) আল্লাহর উপর ভরসা করা ফরয।
২) আল্লাহর উপর ভরসা করা ঈমানের অন্যতম শর্ত।
৩) সূরা আল আনফালের ২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।
৪) উক্ত আয়াতটির তাফসীর, অধ্যায়ের শেষাংশেই রয়েছে।
৫) সূরা তালাকের ৩ নং আয়াতের তাফসীর।
৬) حسبنا هلل ونعم الوكيل কথাটির বিরাট গুরুত্বের কথা জানা গেল। ইবরাহীম আ. ও মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপদের সময় এ বাক্যটি বলেছিলেন।

টিকাঃ
১৪৪. তাওয়াক্কুল দু’প্রকার:
(১) এমন বস্তুর ব্যাপারে তাওয়াক্কুল করা, যার ক্ষমতা শুধু আল্লাহর কাছেই। যে সমস্ত বিষয়ের ক্ষমতা শুধু আল্লাহর কাছেই, সেসব বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অলী-আওলিয়া এবং অনুরূপ অন্যান্যদের উপর ভরসা করা বড় শিরকের অন্তর্ভূক্ত, তাওবা ব্যতীত আল্লাহ তা‘আলা যা ক্ষমা করবেন না।
আর উপস্থিত এবং জীবিত লোক, রাজা-বাদশাহ এবং অনুরূপ যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমতা দিয়েছেন, যেমন রিযিক দেয়ার ক্ষমতা, কষ্ট দূর করার ক্ষমতা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ের ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে দিয়েছেন, তাদের উপর সে বিষয়ে ভরসা করা شرك أصغر তথা ছোট শিরকের অন্যতম প্রকার।
(২) বৈধ তাওয়াক্কুল হচ্ছে, মানুষ তার দুনিয়াবী কাজ-কর্ম সম্পাদন করার জন্য কাউকে উকীল বানাবে। সে তার মত করেই তার কাজ-কর্ম পরিচালনা করবে। যেমন কেনা-বেচা, ভাড়া দেয়া, বিবাহ-তালাক, গোলাম আযাদ ইত্যাদি কাজ-কর্ম কেউ স্বীয় উকীলের মাধ্যমে সম্পাদন করল। এটি সকলের ঐক্যমতে জায়েয। তবে এ ক্ষেত্রে এটি বলা জায়েয নেই যে توكلت عليه আমি তার উপর ভরসা করলাম। বরং বলতে হবে যে, وكلته আমি তাকে উকীল বানালাম। কেননা সে যখন উকীল বানায়, তখন কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার উপরই ভরসা করে।
১৪৫. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এবং অন্যান্য আলেমগণ বলেন: আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। অতএব, আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং তিনি যার হেফাজতকারী হবেন, শত্রুরা তার কোন ক্ষতি করার চিন্তাও করতে পারবেনা। তারা শুধু ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে। যেমন গরম-ঠান্ডা, ক্ষুধা-পিপাসা ইত্যাদি। কিন্তু শত্রুরা তাদের মনোবাসনা অনুযায়ী যত ইচ্ছা ক্ষতি করবে এটি কখনই হবে না। কোন কোন সালাফ বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রত্যেক কাজের বদলা কাজের অনুরূপই নির্ধারণ করেছেন। তিনি তাঁর উপর ভরসা করার বদলা এইভাবে নির্ধারণ করেছেন যে, কেও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন। আল্লাহ তা‘আলা এখানে বলেন নি যে, তার জন্য এত এত পুরস্কার রয়েছে। যেমন বলেছেন অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর উপর ভরসাকারী বান্দার জন্য নিজেকেই যথেষ্ট বানিয়েছেন। অতএব আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং সকল শত্রু ও অনিষ্ট হতে তাকে হেফাজত করবেন।
যেই বান্দা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা করবে, সমস্ত আসমান-যমীন এবং তার মধ্যকার সকল বস্তু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলেও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সেই বান্দাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং তাকে মদদ করবেন। ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এর কথা এখানেই শেষ।
১৪৬. ছহীহ বুখারী হা/৪৫৬৩, অধ্যায়: তোমাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী জড়ো হয়েছে।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩৩. আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়

📄 ৩৩. আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ ۚ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
“তারা কি আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়েছে? ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে অন্য কেউ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে না”। (সূরা আল আ‘রাফ: ৯৯)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন,
وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
“একমাত্র পথভ্রষ্ট লোকেরা ব্যতীত স্বীয় রবের রহমত থেকে আর কে নিরাশ হতে পারে”? (সূরা আল হিজর: ৫৬)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, কবীরা গুনাহ হচ্ছে:
«الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ»
“আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা।”

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন:
«أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ، وَالْقُنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ»
“সবচেয় বড় কবীরাহ গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে শরীক করা, আল্লাহর পাকড়াও (শাস্তি) হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর করুণা থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা।” ইমাম আব্দুর রাযযাক স্বীয় মুসান্নাফে এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল আ‘রাফের ৯৯ নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আল হিজরের ৫৬ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) আল্লাহর পাকড়াও থেকে ভয়হীন ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।
৪) আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ ব্যক্তিদের জন্যও রয়েছে কঠোর আযাবের হুমকি।

টিকাঃ
১৪৭. হাসান: আলবানী, ছহীহ আল জামি‘ হা/৪৪৮৯, মুসনাদে বাযযার।
১৪৮. হাসান: মাওকূফ সূত্রে ছহীহ। দেখুন, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক (১০/৪৫৯), তাফসীরে তাবারী, হা/৬১৯১ এবং তাবারানী আল-কাবীর, হা/৮৭৮৩ এবং অন্যান্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00