📄 ২৮. জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে শরী‘আতে বিধান
ইমাম বুখারী (রহঃ) তার ছহীহ গ্রন্থে বলেন, কাতাদাহ (রহঃ) বলেছেন,
خَلَقَ اللَّهُ هَذِهِ النُّجُومَ لِثَلَاثٍ: زِينَةً لِلسَّمَاءِ، وَرُجُومًا لِلشَّيَاطِينِ، وَعَلَامَاتٍ يُهْتَدَى بِهَا، فَمَنْ تَأَوَّلَ فِيهَا غَيْرَ ذَلِكَ أَخْطَأَ، وَأَضَاعَ نَصِيبَهُ، وَتَكَلَّفَ مَا لَا عِلْمَ لَهُ بِهِ
“আল্লাহ তা‘আলা এসব নক্ষত্ররাজি তিনটি উদ্দেশে সৃষ্টি করেছেন, আকাশের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য, আঘাতের মাধ্যমে শয়তান বিতাড়িত করার জন্য এবং পথিকদের দিক নির্ণয়ের নিদর্শন হিসাবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্য ছাড়া এর ভিন্নব্যাখ্যা করবে সে ভুল করবে এবং তার ভাগ্য নষ্ট করবে। আর যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই, তা জানার জন্য অযথা চেষ্টা করবে।
কাতাদাহ (রহঃ) চাঁদের কক্ষপথ সংক্রান্ত বিদ্যাঅর্জন শিক্ষা করা অপছন্দ করতেন। আর উয়াইনা এ বিদ্যা শিক্ষা করার অনুমতি দেননি। উভয়ের কাছ থেকে হারব (রহঃ) এ কথা বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ এবং ইসহাক (রহঃ) নক্ষত্ররাজির কক্ষপথ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার অনুমতি দিয়েছেন।
আবু মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَقَاطِعُ الرَّحِمِ، وَمُصَدِّقٌ بِالسِّحْرِ»
“তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তি, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী এবং যাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও ইমাম ইবনু হিব্বান তার ছহীহ গ্রন্থে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য জানা গেল। আর তা হচ্ছে আকাশকে সুন্দর করা, রাতের অন্ধকারে পথের সন্ধান লাভ, শয়তানের শরীরে তা নিক্ষেপ করে শয়তানকে বিতাড়িত করা।
২) এ অধ্যায়ে নক্ষত্র সৃষ্টির ভিন্ন উদ্দেশ্য বর্ণনাকারীর সমুচিত জবাব প্রদান করা হয়েছে।
৩) কক্ষ সংক্রান্ত বিদ্যাঅর্জনের ব্যাপারে মতভেদের উল্লেখ করা হয়েছে।
৪) যাদু বাতিল জানা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যাদুর অন্তর্ভূক্ত সামান্য জিনিসেও বিশ্বাস করবে, তার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।
টিকাঃ
১২৯. ছহীহ বুখারী: নক্ষত্ররাজি সম্পর্কে অধ্যায়। ৩১৯৮ নং হাদীছের পরের অধ্যায় দেখুন।
১৩০. ইমাম খাত্তাবী (রহঃ) বলেন: অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যেই জ্যোতির্বিদ্যা অর্জিত হয় এবং যার মাধ্যমে সূর্যোদয়, কিবলার দিক ইত্যাদি জানা যায়, তা নিষেধের অন্তর্ভূক্ত নয়। কেননা ইলমুন নুজুম যদি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক আছে।
আর যেই ইলমুন নুজুমের (তারকা সম্পর্কিত বিদ্যার) মাধ্যমে কিবলার দিক নির্ধারণ করা হয়, সেটি হচ্ছে ঐ সমস্ত অভিজ্ঞ ইমামদের কাজ, যাদের দ্বীনী খেদমতে আমরা কোন প্রকার সন্দেহ করিনা এবং তারকার চলাচল ও গতিপথ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতাকেও অস্বীকার করিনা। সেই সাথে তারা যে সংবাদ দেয়, তাতেও কোন সন্দেহ পোষণ করিনা। তারা কিবলার দিককে কাবার কাছে থাকা অবস্থায় যেভাবে দেখেন, দূরে থাকা অবস্থায় ঠিক সেভাবেই দেখেন (জানেন)। সুতরাং দূর থেকে কিবলা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অর্জন করা কাবাকে দেখার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের মতই। আর তাদের খবরকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরাও কিবলার দিক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে থাকি। কেননা তারা দ্বীনী ব্যাপারে আমাদের কাছে বিশ্বস্ত। সেই সাথে তারা আকাশের তারকা ও নক্ষত্ররাজি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি করেন নি। ইমাম ইবনুল মুনযির মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তারকা চলাচলের (কক্ষপথ) এবং তারকাসমূহ থেকে ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা দোষণীয় নয়, যদ্দ্বারা (গভীর অন্ধকারে ও নৌপথে) পথের সন্ধান পাওয়া যায়।
ইমাম ইবনে রজব বলেন: তারকাসমূহ চলাচল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ঘটনাবলীতে তারকার প্রভাব রয়েছে, যে ইলম এ ধরনের কথা বলে, যেমন বর্তমানের জ্যোতিষীরা দাবি করে থাকে, তা নিষেধ ও বাতিল। তা কম হোক বা বেশী হোক। কিন্তু অন্ধকার রাতে পথ চলার উদ্দেশে, কিবলা নির্ধারণ করার জন্য এবং দিক নির্দেশনা লাভ করার জন্য প্রয়োজন অনুপাতে ইলমুত্ তাসয়ীর তথা তারকার গতিপথ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অধিকাংশ আলেমের নিকট জায়েয।
১৩১. যঈফ: মুসনাদে আহমাদ ৪/৩৯৯, ইবনে হিব্বান হা/৫৩৪৬, মুসতাদরাক হাকীম হা/৭২৩৪।
📄 ২৯. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করার বিধান
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ
“তোমরা নক্ষত্রের মধ্যে তোমাদের রিযিক নিহিত আছে মনে করে আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছো।” (সূরা আল ওয়াক্বেয়া: ৮২)
আবু মালেক আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ بِالْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالِاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ»، وَقَالَ: «النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ، وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ»
“জাহেলী যুগের চারটি কু-স্বভাব আমার উম্মাতের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, যা তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারবে না। (এক) আভিজাত্যের অহংকার করা। (দুই) বংশের বদনাম করা। (তিন) নক্ষত্ররাজির মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করা এবং (চার) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা। তিনি আরও বলেন: ‘মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিনী মৃত্যুর পূর্বে যদি তাওবা না করে, তবে ক্বিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় উঠানো হবে যে, তার পরনে থাকবে আলকাতরার প্রলেপযুক্ত লম্বা জামা এবং খোস-পাঁচড়াযুক্ত কোর্তা।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম যায়েদ বিন খালেদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,
صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - صَلَاةَ الصُّبْحِ بِالْحُدَيْبِيَةِ عَلَى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْلِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ؟ »، قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ، فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِي كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا، فَذَلِكَ كَافِرٌ بِي مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ»
“রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়াতে আমাদেরকে নিয়ে ফযরের ছালাত পড়লেন। সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। ছালাতান্তে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমরা কি জানো তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? লোকেরা বলল: ‘আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন’। তিনি বললেন: আল্লাহ বলেছেন, আজ সকালে আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হয়েছে আবার কেউ কাফির হয়েছে। যে ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহর ফযল ও রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে (বৃষ্টি বর্ষণে নক্ষত্রের প্রভাবকে) অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলেছে, ‘অমুক অমুক নক্ষত্রের উসীলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে”।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ অর্থেই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাতে এ কথা আছে যে, কেউ কেউ বলেছেন, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তখন আল্লাহ তা‘আলা আয়াতগুলো নাযিল করেন:
فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ (٧٥) وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ (٧٦) إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ (٧٧) فِي كِتَابٍ مَّكْنُونٍ (٧٨) لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (٧٩) تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ (٨٠) أَفَبِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَنتُم مُّدْهِنُونَ (٨١) وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ
“অতএব, আমি তারকারাজির ভ্রমণ পথের শপথ করছি, নিশ্চয়ই এটি বড় শপথ যদি তোমরা বুঝতে পার। নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন, যা সুরক্ষিত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। যারা পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করতে পারেনা। এটি বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তবুও কি তোমরা এই বাণীর প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করছো? এবং এ নিয়ামতে তোমরা নিজেদের অংশ এই রেখেছো যে, তোমরা তা অস্বীকার করছো। (সূরা ওয়াক্বিয়া: ৭৫-৮২)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা ওয়াক্বেয়ার ৭৫ থেকে ৮২ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) জাহেলী যুগের চারটি স্বভাবের উল্লেখ করা হয়েছে।
৩) উল্লেখিত স্বভাবগুলোর কোনটি কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
৪) এমন কিছু কুফরী আছে, যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে একেবারে বের করে দেয় না।
৫) বান্দাদের মধ্যে কেউ আজ সকালে আমার প্রতি বিশ্বাসী আবার কেউ অবিশ্বাসী হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামত (বৃষ্টি) নাযিল হওয়ার কারণেই এমনটি হল।
৬) এখানে আল্লাহর প্রতি ঈমানের যেই কথা বর্ণিত হয়েছে, তা ভালভাবে বুঝা উচিত। অর্থাৎ এখানে ইখলাস তথা একনিষ্ঠ ঈমান উদ্দেশ্য। যাতে শিরকের কোন অংশ থাকে না।
৭) এখানে যে কুফরীর বর্ণনা এসেছে, তাও ভালভাবে বুঝা উচিত। এটি সেই কুফরী নয়, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
৮) কতক লোক বলেছিল صدق نوء كذا وكذا অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের এ কথার মর্মার্থও ভাল করে বুঝতে হবে।
৯) তোমরা কি জান ‘তোমাদের রব কি বলেছেন?’ এ কথা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করতে পারেন।
১০) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিণীর জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১৩২. শাইখুল ইসলাম বলেন: জাহেলী যামানার কতিপয় আমল এই উম্মাতের লোকেরা ছাড়তে পারবে না। এখানে ঐ সমস্ত লোকদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা এগুলোতে লিপ্ত হবে। এ থেকে আরও জানা গেল যে, জাহেলী যামানার প্রত্যেক কাজ ও বিষয়ই ইসলামে নিন্দিত। তাই যদি না হত, তাহলে এই পাপ কাজগুলোকে জাহেলীয়াতের কাজ বলে উল্লেখ করে তার নিন্দা করা হতনা। আর এটাও জানা কথা যে, উক্ত বিষয়গুলোকে নিন্দা করার জন্যই জাহেলীয়াতের কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে। মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না”। (সূরা আহযাব: ৩৩) এখানে জাহেলী যামানার নারীদের সৌন্দর্য্য প্রদর্শন করে বের হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে এবং জাহেলী যুগের লোকদেরও নিন্দা করা হয়েছে। এই নিন্দার দাবি হচ্ছে জাহেলী যুগের লোকদের সাদৃশ্য করা নিষিদ্ধ।
১৩৩. ছহীহ মুসলিম হা/৯৩৪, অধ্যায়: বিলাপ করার ভয়াবহতা।
১৩৪. ছহীহ বুখারী হা/৮৪৬, অধ্যায়: হুদায়বিয়ার যুদ্ধ, মুসলিম হা/৭১।
📄 ৩০. ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ব্যতীত অন্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে আল্লাহর সাদৃশ্য স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
“হে রাসূল! তুমি বলে দাও, তোমাদের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, তোমাদের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা, যার লোকসান হওয়াকে তোমরা অপছন্দ করো এবং তোমাদের পছন্দনীয় বাড়ী-ঘর তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তার রাসূল ও তাঁরই পথে জিহাদ করার চেয়ে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়ছালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আর আল্লাহ্ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।” (সূরা আত তাওবা: ২৪)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”
বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»
“যার মধ্যে তিনটি জিনিস বিদ্যমান আছে সে ব্যক্তি এগুলোর দ্বারা ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে। (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তার রাসূল সর্বাধিক প্রিয় হবেন। (দুই) একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার (সন্তুষ্টি লাভের) জন্য কোন ব্যক্তিকে ভালবাসবে। (তিন) আল্লাহ তা‘আলা তাকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তার কাছে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতই অপছন্দনীয় হবে”।
ছহীহ বুখারীর অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
«لَا يَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَحَتَّى أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، وَحَتَّى يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
“কেও ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কোন মানুষকে ভালবাসবে, কুফরী থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুক্তি দেয়ার পর যতক্ষণ না সে পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অধিক ভালবাসবে এবং যতক্ষণ না আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল তার কাছে অন্যসব বস্তু হতে অধিক প্রিয় হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ أَحَبَّ فِي اللَّهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللَّهِ، وَوَالَى فِي اللَّهِ، وَعَادَى فِي اللَّهِ، فَإِنَّمَا تُنَالُ وَلَايَةُ اللَّهِ بِذَلِكَ، وَلَنْ يَجِدَ عَبْدٌ طَعْمَ الْإِيمَانِ، وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ، حَتَّى يَكُونَ كَذَلِكَ، وَقَدْ صَارَتْ عَامَّةُ مُؤَاخَاةِ النَّاسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، وَذَلِكَ لَا يُجْدِي عَلَى أَهْلِهِ شَيْئًا»
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করে; তার এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করা যাবে। আর এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ব্যতীত কোন বান্দাই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, তার ছালাত-সিয়ামের পরিমাণ যত বেশীই হোক না কেন।
(বর্তমানে) মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্থিব স্বার্থ। এ ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দ্বারা তার কোন উপকার হবে না।
আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,
وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ
“গুরুরা যখন তাদের ভক্তদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং জাহান্নামের আযাব প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের মধ্যকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৬)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় :
১) সূরা আল বাকারার ১৬ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালবাসাকে জীবন, পরিবার ও ধন-সম্পদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ওয়াজিব।
৪) কোন কোন বিষয় এমন আছে যা ঈমানের পরিপন্থী হলেও এর দ্বারা ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া বুঝায় না। এমতাবস্থায় তাকে অপূর্ণাঙ্গ মু’মিন বলা যেতে পারে।
৫) ঈমানের একটা স্বাদ আছে। মু’মিন বান্দা কখনো এ স্বাদ অনুভব করতে পারে আবার কখনো অনুভব নাও করতে পারে।
৬) অন্তরের এমন চারটি আমল আছে, যা ব্যতীত আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভ করা যায় না এবং ঈমানের স্বাদও অনুভব করা যায় না।
৭) একজন প্রখ্যাত ছাহাবী দুনিয়ার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সাধারণত গড়ে উঠে পার্থিব বিষয়ের ভিত্তিতে।
৮) وتقطعت بهم الأسباب এর তাফসীর জানা গেল। যা একটু আগে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
৯) মুশরিকদের মধ্যেও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে খুব ভালবাসে। কিন্তু শিরকের কারণে এ ভালবাসা অর্থহীন।
১০) যে ব্যক্তির কাছে সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতে উল্লেখিত ৮টি বস্তু স্বীয় দীন অপেক্ষা অধিক প্রিয় হবে, তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
১১) যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার মতই ঐ শরীককে ভালবাসে সে শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় ধরনের শিরকে লিপ্ত হয়।
টিকাঃ
১৩৫. ছহীহ বুখারী হা/১৫, অধ্যায়: রাসূলকে ভালবাসা ঈমানের অন্তর্ভূক্ত।
১৩৬. শাইখুল ইসলাম বলেন: নাবী ﷺ সংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তির মধ্যে এই তিনটি গুণ পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে সক্ষম হবে। কেননা কোন জিনিসে স্বাদ পাওয়া উক্ত জিনিসের প্রতি মুহাব্বতের প্রমাণ বহন করে। যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে ভালবাসে এবং তা পাওয়ার আকাঙ্খা করে, অতঃপর যখন সে তা পেয়ে যায় তখন উক্ত বিষয়টি পেয়ে স্বাদ, মজা এবং আনন্দ পায়। স্বাদ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা প্রিয় ও কাঙ্খিত বস্তু লাভ করার পরই অর্জিত হয়।
শাইখুল ইসলাম আরো বলেন: আল্লাহকে পরিপূর্ণ ভালবাসার পরই ঈমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। এটি হাসিল হয় তিনটি জিনিসের মাধ্যমে। বান্দার মধ্যে আল্লাহর ভালবাসা পূর্ণ হওয়া, এটিকে শুধু আল্লাহর জন্যই খালেস করা ও উপরোক্ত বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে অন্তর থেকে বের করে দেয়ার মাধ্যমে।
আল্লাহর পরিপূর্ণ ভালবাসার অর্থ হচ্ছে, বান্দার মধ্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা অন্যান্য সকল বস্তুর চেয়ে অধিক পরিমাণে থাকা। কেননা বান্দার অন্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি মৌলিক ভালবাসা থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা সর্বাধিক হতে হবে।
১৩৭. ছহীহ বুখারী হা/৬০৪১, অধ্যায়: আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসা।
১৩৮. ইবনে জারীর এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে এই সনদে হাদীছটি দুর্বল। মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা; লালকাঈ, শারহু উছুলিল ই‘তিক্বাদ হা/১৬৯১, যঈফ।
📄 ৩১. ঈমানের অন্যতম দাবি হল কেবল আল্লাহকেই ভয় করা
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا ذَٰلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
“এরা হল শয়তান, যারা তোমাদেরকে তার বন্ধুদের (কাফির-বে-ঈমান) দ্বারা ভয় দেখায়। তোমরা যদি প্রকৃত মু’মিন হয়ে থাক তাহলে তাদেরকে (শয়তানের বন্ধুদেরকে) ভয় করো না; বরং আমাকেই ভয় করো।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
“আল্লাহর মাসজিদগুলোকে একমাত্র তারাই আবাদ করতে পারে, যারা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, ছালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হিদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আত তাওবা: ১৮)
আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। এরপর যখন আল্লাহর পথে তারা দুঃখ কষ্ট পায় তখন মানুষের চাপানো দুঃখ কষ্টের পরীক্ষাকে তারা আল্লাহর আযাবের সমতুল্য মনে করে।” (সূরা আল আনকাবূত: ১০)
কাতাদাহ বলেন: শয়তান মানুষের অন্তরে তার বন্ধুদেরকে বড় করে দেখায়। যখনই বান্দার ঈমান মযবুত হয়, তখনই তার অন্তর থেকে শয়তানের বন্ধুদের ভয় দূর হয়ে যায়। আর যখনই ঈমান দুর্বল হয়, তখনই বান্দার অন্তরে শয়তানের বন্ধুদের ভয় প্রকট আকার ধারণ করে। অতএব আয়াতটি প্রমাণ করে যে, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা পরিপূর্ণ ঈমানের শর্তসমূহের অন্যতম। তাফসীর ও সীরাতের কিতাবসমূহে এই আয়াতের শানে নুযূল বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: খাওফে ইলাহী তথা অন্তরের ভয় আল্লাহর ইবাদাতের অন্যতম প্রকার। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য তা করা ঠিক নয়। আল্লাহর সামনে নত হওয়া, আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহর কাছেই আশা করা এবং এ প্রকারের অন্যসব বিষয় ইবাদাতে ক্বালবিয়্যা অর্থাৎ অন্তরের ইবাদাতের অন্তর্ভূক্ত।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: যে সমস্ত মানুষের কাছে নাবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে, তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। একভাগ বলেছে আমরা ঈমান আনয়ন করেছি, আরেকভাগ তা বলেনি। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা কুফরী ও গুনাহ-এর পথেই চলেছে। যারা বলেছে: আমরা ঈমান আনয়ন করলাম, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মুসীবত ও বিপদাপদে ফেলে পরীক্ষা করেছেন। الفتنة এর অন্যতম অর্থ হচ্ছে মুসীবতে ফেলে ঈমান পরীক্ষা করা। আর যারা ঈমান আনয়ন করেনি, তারা যেন মনে না করে যে, সে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে কিংবা আল্লাহর পাকড়াও থেকে পলায়ন করতে পারবে অথবা তাঁকে পরাজিত করতে পারবে।
সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কষ্ট করতে হবে। যে ঈমান এনেছে, সেও কষ্ট করবে, আর যে ঈমান গ্রহণ করেনি, তাকেও কষ্ট করতে হবে। তবে কথা হচ্ছে মু’মিন ব্যক্তি প্রথমে কষ্ট করবে দুনিয়াতে। অতঃপর দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর পরিণাম ভাল হবে।
কিন্তু ঈমান থেকে বিমুখ ব্যক্তি প্রথমে দুনিয়াতে সুখ-শান্তি ভোগ করবে। অতঃপর সে চিরস্থায়ী কষ্টের মধ্যে নিপতিত হবে।
দ্বীনের দাঈর জন্য সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে বসবাস করা জরুরী। মানুষের রয়েছে বিভিন্ন স্বপ্ন, চিন্তা-চেতনা ও বিভিন্ন আশা-আকাঙ্খা। সমাজের মানুষেরা চায় অন্য দ্বীনের দাঈও তাদের চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতির অনুসরণ করেই চলুক। এ ক্ষেত্রে সে যদি সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির বিরোধীতা করে, তাহলে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির অনুসারী লোকেরা তাকে কষ্ট ও শাস্তি দিবে।
আর যদি দ্বীনের দাঈ সমাজের লোকদের চিরাচরিত ও প্রচলিত রীতিনীতি ও আচার অভ্যাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলে, তাহলেও সে শাস্তি পাবে। এই শাস্তি কখনো পাবে তার সমাজের লোকদের পক্ষ হতেই। আবার কখনো পাবে অন্যদের পক্ষ হতে।
সুতরাং পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার ঐ কথার উপর আমল করা আবশ্যক, যা তিনি মু‘আবীয়া (রাঃ) কে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
«مَنِ ارْتَضَى اللَّهَ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ، وَمَنِ ارْتَضَى النَّاسَ بِسَخَطِ اللَّهِ لَمْ يُغْنُوا عَنْهُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا»
“যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, তার জন্য মানুষের মুকাবেলায় আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করে মানুষেরা আল্লাহর মুকাবেলায় তার কোনই কাজে আসবেনা”।
আল্লাহ যাকে হেদায়াত করেন, সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং যাকে নফসের অনিষ্ট হতে বাঁচান, সে হারাম কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে এবং দুষ্ট লোকদের শত্রুতার উপর ধৈর্য ধারণ করে। এতে করে সে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হয়। যেমন হয়েছিলেন নাবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীগণ।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করেছেন, যে ঈমান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করেই ঈমান আনয়ন করেছে। এ রকম মানুষকে যখন আল্লাহর রাস্তায় কষ্ট দেয়া হয়, তখন মানুষের ফিতনাকে আল্লাহর সেই আযাবের মতই মনে করে, যা থেকে বাঁচার জন্যই মু’মিনগণ ঈমাণ গ্রহণ করেছেন। ফলে যেই কারণে তাকে এই কষ্ট দেয়া হয়, তা (আল্লাহর পথ) বর্জন করে। অথচ এটি এমন একটি কষ্ট, যা নাবী-রাসূলগণ এবং তাদের অনুসারীগণ বিরোধীদের পক্ষ হতে সবসময়ই ভোগ করেছেন।
প্রকৃত মু’মিনগণ তাদের পূর্ণ দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার ফলে আল্লাহর আযাবের কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য ঈমানের ছায়াতলে আশ্রয় নেন এবং ঈমানের পথে ক্ষণস্থায়ী দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে,
«إِنَّ مِنْ ضَعْفِ الْيَقِينِ أَنْ تُرْضِيَ النَّاسَ بِسَخَطِ اللَّهِ، وَأَنْ تَحْمَدَهُمْ عَلَى رِزْقِ اللَّهِ، وَأَنْ تَذُمَّهُمْ عَلَى مَا لَمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ، إِنَّ رِزْقَ اللَّهِ لَا يَجُرُّهُ حِرْصُ حَرِيصٍ، وَلَا يَرُدُّهُ كَرَاهِيَةُ كَارِهٍ»
“বিশ্বাসের দুর্বলতার পরিচয় হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, আল্লাহর দেয়া রিযিক ভোগ করে মানুষের গুণগান করা এবং তোমাকে আল্লাহ যা দান করেননি তার ব্যাপারে মানুষের বদনাম করা। জেনে রাখা দরকার যে, কোন লোভীর লোভ আল্লাহর রিযিক টেনে আনতে পারে না। আবার কোন ঘৃণাকারীর ঘৃণা আল্লাহর রিযিক বন্ধ করতে পারে না”।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنِ الْتَمَسَ رِضَا اللَّهِ بِسَخَطِ النَّاسِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَأَرَضَى عَنْهُ النَّاسَ، وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَا النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَسْخَطَ عَلَيْهِ النَّاسَ»
যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন, আর মানুষকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহও অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল-ইমরানের ১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ১৮ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) সূরা আল আনকাবূতের ১০ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
৪) ঈমান দুর্বল হয় এবং শক্তিশালী হয়।
৫) ঈমান দুর্বল হওয়ার কিছু আলামতও রয়েছে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) এর হাদীছে দুর্বল ঈমানের তিনটি আলামত বর্ণিত হয়েছে। (১) আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, (২) আল্লাহর দেয়া রিযিক ভোগ করে মানুষের গুণগান করা (৩) আল্লাহ যা দান করেননি, তার ব্যাপারে মানুষকে দোষারোপ করা।
৬) ভয়কে শুধু আল্লাহর জন্যই খালেস-একনিষ্ঠ করা ঈমানের অন্যতম দাবি।
৭) যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহকেই ভয় করে, তার ছওয়াবের বর্ণনা রয়েছে।
৮) যে আল্লাহকে ভয় করে না, তার শাস্তিও বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১৩৯. আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: শয়তানের চক্রান্তের মধ্যে এটিও একটি চক্রান্ত যে, সে মু’মিনদেরকে তার সৈন্যবাহিনী এবং বন্ধুদের মাধ্যমে ভয় দেখায়। যাতে মু’মিনগণ শয়তানদের বিরুদ্ধে জিহাদ না করেন, সৎ কাজের আদেশ না দেন এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ না করেন। আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, এটিই শয়তানের চক্রান্ত এবং তার ভয় দেখানো। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শয়তানকে ভয় করতে নিষেধ করেছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: সকল মুফাসসিরের নিকট আয়াতের অর্থ হচ্ছে, শয়তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে মু’মিনদেরকে ভয় দেখায়।
১৪০. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: খাওফে ইলাহী তথা অন্তরের ভয় আল্লাহর ইবাদাতের অন্যতম প্রকার। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য তা করা ঠিক নয়। আল্লাহর সামনে নত হওয়া, আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহর কাছেই আশা করা এবং এ প্রকারের অন্যসব বিষয় ইবাদাতে ক্বালবিয়্যা অর্থাৎ অন্তরের ইবাদাতের অন্তর্ভূক্ত।
১৪১. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: যে সমস্ত মানুষের কাছে নাবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে, তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। একভাগ বলেছে আমরা ঈমান আনয়ন করেছি, আরেকভাগ তা বলেনি। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা কুফরী ও গুনাহ-এর পথেই চলেছে। যারা বলেছে: আমরা ঈমান আনয়ন করলাম, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মুসীবত ও বিপদাপদে ফেলে পরীক্ষা করেছেন। الفتنة এর অন্যতম অর্থ হচ্ছে মুসীবতে ফেলে ঈমান পরীক্ষা করা। আর যারা ঈমান আনয়ন করেনি, তারা যেন মনে না করে যে, সে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে কিংবা আল্লাহর পাকড়াও থেকে পলায়ন করতে পারবে অথবা তাঁকে পরাজিত করতে পারবে।
১৪২. যঈফ: আলবানী যঈফ বলেছেন, যঈফুল জামে‘ হা/২০০৯।
১৪৩. ছহীহ: ইবনে হিব্বান হা/২৭৬, তিরমিযী হা/২৪১৪, আলবানী ছহীহ বলেছেন, আছ ছহীহাহ হা/২৩১১।