📄 ২৭. কুলক্ষণ গ্রহণ করা সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَإِذَا جَاءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ قَالُوا لَنَا هَٰذِهِ ۖ وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَطَّيَّرُوا بِمُوسَىٰ وَمَن مَّعَهُ ۗ أَلَا إِنَّمَا طَائِرُهُمْ عِندَ اللَّهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
“অতঃপর যখন তাদের শুভদিন ফিরে আসতো, তখন তারা বলতো এটা তো আমাদের প্রাপ্য। আর যদি তাদের নিকট অকল্যাণ এসে উপস্থিত হয়, তখন তাতে মূসা এবং তার সঙ্গীদের কুলক্ষণে বলে গণ্য করতো। শুনে রাখো! তাদের কুলক্ষণ তো আল্লাহর কাছেই। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ”। (সূরা আল আ‘রাফ: ১৩১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন:
قَالُوا طَائِرُكُم مَّعَكُمْ ۖ أَئِن ذُكِّرْتُم ۚ بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُونَ
“রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই। তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে বলেই কি তোমরা এ কথা বলছো? বস্তুত: তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়”। (সূরা ইয়াসিন: ১৯)
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَلَا هَامَةَ، وَلَا صَفَرَ»
“রোগের কোন সংক্রমণ শক্তি নেই, পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করারও কোন ভিত্তি নেই। ‘هاماه’ তথা হুতুম পেঁচার ডাক শুনে অশুভ নির্ধারণ করারও ইসলামী শরী‘আতে জায়েয নেই। সফর মাসেরও বিশেষ কোন প্রভাব বা বৈশিষ্ট্য নেই। অর্থাৎ এ মাসকে বরকতহীন মনে করা ঠিক নয়। মুসলিমের হাদীছে ‘নক্ষত্রের কোন প্রভাব নেই (নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয় না), ভূত-প্রেত বলতে কিছুই নেই’- এ কথাটুকু অতিরিক্ত রয়েছে”।
বুখারী ও মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْفَأْلُ» قَالُوا: وَمَا الْفَأْلُ؟ قَالَ: «الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ»
“ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি আর কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে ‘ফাল’ আমার কাছে খুব ভাল লাগে। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাল’ কি? জবাবে তিনি বললেন, ‘উত্তম কথা’।
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) উকবা বিন আমের (রাঃ) হতে ছহীহ সনদে বর্ণনা করেন যে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে ‘তিয়ারাহ’ (কুলক্ষণ) সম্পর্কে আলোচনা করা হল। তখন তিনি বললেন:
«أَحْسَنُهَا الْفَأْلُ، وَلَا تَرُدُّ مُسْلِمًا، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ، فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ»
এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ‘ফাল’। কুলক্ষণ কোন মুসলিমকে কাজে অগ্রসর হওয়া থেকে প্রতিহত করতে পারে না। তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করে তখন সে যেন বলে,
«اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া অন্য কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ অকল্যাণ প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। তোমার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে না এবং তোমার তাওফীক ও শক্তি ব্যতীত সৎ আমল করাও সম্ভব নয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«الطِّيَرَةُ شِرْكٌ، الطِّيَرَةُ شِرْكٌ، وَمَا مِنَّا إِلَّا؛ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ»
‘তিয়ারাহ’ তথা পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা শিরক, পাখি উড়িয়ে লক্ষণ নির্ধারণ করা শিরক। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন।
হাদীছটি ইমাম আবু দাউদ এবং তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদীছের শেষাংশকে অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন ” -এই অংশকে ইবনে মাসউদের উক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে,
«مَنْ رَدَّتْهُ الطِّيَرَةُ عَنْ حَاجَتِهِ فَقَدْ أَشْرَكَ»، قَالُوا: فَمَا كَفَّارَةُ ذَلِكَ؟ قَالَ: «أَنْ يَقُولَ: اللَّهُمَّ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ»
তিয়ারা (কুলক্ষণ) বা দুর্ভাগ্যের ধারণা যে ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য বের হতে বাধা দিল সে মূলত শিরক করল। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: এর কাফফারা কী? উত্তরে তিনি বললেন: তোমরা এ দু‘আ পড়বে, “হে আল্লাহ! তোমার মঙ্গল ব্যতীত অন্য কোন মঙ্গল নেই। তোমার অমঙ্গল ছাড়া অন্য কোন অমঙ্গল নেই। আর তুমি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই”।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
«إِنَّمَا الطِّيَرَةُ مَا أَمْضَاكَ أَوْ رَدَّكَ»
طيرة) তিয়ারাহ) অর্থাৎ কুলক্ষণ হচ্ছে এমন জিনিস (বিশ্বাস ও ধারণা) যা তোমাকে কোন কাজের দিকে ধাবিত করে অথবা কোন কাজ থেকে তোমাকে বিরত রাখে।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ألا إنما طائرهم عند الله “জেনে রেখো তাদের দুর্ভাগ্য আল্লাহর কাছে নিহিত” এবং طائركم معكم তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে” এ আয়াত দু’টির ব্যাপারে সতর্কীকরণ।
২) এক জনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে রোগ স্থানান্তর হয়-এ ধারণাকে অস্বীকার করা হয়েছে।
৩) তিয়ারা তথা কোন বস্তুতে কুলক্ষণ থাকার ধারণাকেও অস্বীকার করা হয়েছে।
৪) হুতুম পেঁচা বা অন্যান্য পাখির ডাকেও কুলক্ষণ নেই।
৫) সফর মাসেও কোনো অশুভ নেই। অর্থাৎ কুলক্ষণের ‘সফর মাস’ বলতে কিছুই নেই। জাহেলী যুগে সফর মাসকে কুলক্ষণ মনে করা হতো, ইসলাম এ ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছে।
৬) ‘ফাল’ উপরোক্ত নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় জিনিসের অন্তর্ভূক্ত নয়। বরং এটা মুস্তাহাব।
৭) ‘ফাল’ এর ব্যাখ্যা জানা গেল। অর্থাৎ ভাল ও সুন্দর নাম শুনে খুশী হওয়া।
৮) অন্তরে কুলক্ষণের ধারণা জাগ্রত হলেই তা ক্ষতিকর নয়। বিশেষ করে যখন বান্দা তাকে অপছন্দ করবে। শুধু তাই নয়, আল্লাহর উপর ভরসা করলে তিনি অন্তর থেকে তা দূর করে দেন।
৯) যার অন্তরে কুলক্ষণের ধারণা সৃষ্টি হবে, সে কী বলবে- এই অধ্যায় থেকে তাও জানা গেল।
১০) সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিয়ারা শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
১১) নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয় তিয়ারার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ কুলক্ষণ মনে করে কাজে অগ্রসর না হওয়া অথবা কোন বস্তুকে শুভলক্ষণ মনে করে কাজে অগ্রসর হওয়া নিষিদ্ধ তিয়ারার অন্তর্ভূক্ত।
টিকাঃ
১২৩. ছহীহ বুখারী হা/৫৭১৭, ৫৭৫৭, মুসলিম হা/২২২০, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৯।
১২৪. ছহীহ বুখারী হা/৫৭৭৬, মুসলিম হা/২২২৪, তিরমিযী হা/১৬১৫, আবু দাউদ হা/৩৯১৬, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৭, মুসনাদে আহমাদ।
১২৫. যঈফ: আবু দাউদ হা/৩৯১৯, অধ্যায়: তিয়ারাহ। দেখুন: সিলসিলায়ে যঈফা হা/১৬১৯।
১২৬. ছহীহ, তবে ‘আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন’ ব্যতীত। আবু দাউদ হা/৩৯১০, তিরমিযী হা/১৬১৪, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৮, মুসনাদে আহমাদ।
১২৭. হাসান: মুসনাদে আহমাদ ২/২২০। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, আছ-ছহীহাহ হা/১০৬৫।
১২৮. যঈফ: মুসনাদে আহমাদ ১/২১৩।
📄 ২৮. জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে শরী‘আতে বিধান
ইমাম বুখারী (রহঃ) তার ছহীহ গ্রন্থে বলেন, কাতাদাহ (রহঃ) বলেছেন,
خَلَقَ اللَّهُ هَذِهِ النُّجُومَ لِثَلَاثٍ: زِينَةً لِلسَّمَاءِ، وَرُجُومًا لِلشَّيَاطِينِ، وَعَلَامَاتٍ يُهْتَدَى بِهَا، فَمَنْ تَأَوَّلَ فِيهَا غَيْرَ ذَلِكَ أَخْطَأَ، وَأَضَاعَ نَصِيبَهُ، وَتَكَلَّفَ مَا لَا عِلْمَ لَهُ بِهِ
“আল্লাহ তা‘আলা এসব নক্ষত্ররাজি তিনটি উদ্দেশে সৃষ্টি করেছেন, আকাশের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য, আঘাতের মাধ্যমে শয়তান বিতাড়িত করার জন্য এবং পথিকদের দিক নির্ণয়ের নিদর্শন হিসাবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্য ছাড়া এর ভিন্নব্যাখ্যা করবে সে ভুল করবে এবং তার ভাগ্য নষ্ট করবে। আর যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই, তা জানার জন্য অযথা চেষ্টা করবে।
কাতাদাহ (রহঃ) চাঁদের কক্ষপথ সংক্রান্ত বিদ্যাঅর্জন শিক্ষা করা অপছন্দ করতেন। আর উয়াইনা এ বিদ্যা শিক্ষা করার অনুমতি দেননি। উভয়ের কাছ থেকে হারব (রহঃ) এ কথা বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ এবং ইসহাক (রহঃ) নক্ষত্ররাজির কক্ষপথ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার অনুমতি দিয়েছেন।
আবু মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَقَاطِعُ الرَّحِمِ، وَمُصَدِّقٌ بِالسِّحْرِ»
“তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তি, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী এবং যাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও ইমাম ইবনু হিব্বান তার ছহীহ গ্রন্থে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য জানা গেল। আর তা হচ্ছে আকাশকে সুন্দর করা, রাতের অন্ধকারে পথের সন্ধান লাভ, শয়তানের শরীরে তা নিক্ষেপ করে শয়তানকে বিতাড়িত করা।
২) এ অধ্যায়ে নক্ষত্র সৃষ্টির ভিন্ন উদ্দেশ্য বর্ণনাকারীর সমুচিত জবাব প্রদান করা হয়েছে।
৩) কক্ষ সংক্রান্ত বিদ্যাঅর্জনের ব্যাপারে মতভেদের উল্লেখ করা হয়েছে।
৪) যাদু বাতিল জানা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যাদুর অন্তর্ভূক্ত সামান্য জিনিসেও বিশ্বাস করবে, তার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।
টিকাঃ
১২৯. ছহীহ বুখারী: নক্ষত্ররাজি সম্পর্কে অধ্যায়। ৩১৯৮ নং হাদীছের পরের অধ্যায় দেখুন।
১৩০. ইমাম খাত্তাবী (রহঃ) বলেন: অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যেই জ্যোতির্বিদ্যা অর্জিত হয় এবং যার মাধ্যমে সূর্যোদয়, কিবলার দিক ইত্যাদি জানা যায়, তা নিষেধের অন্তর্ভূক্ত নয়। কেননা ইলমুন নুজুম যদি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক আছে।
আর যেই ইলমুন নুজুমের (তারকা সম্পর্কিত বিদ্যার) মাধ্যমে কিবলার দিক নির্ধারণ করা হয়, সেটি হচ্ছে ঐ সমস্ত অভিজ্ঞ ইমামদের কাজ, যাদের দ্বীনী খেদমতে আমরা কোন প্রকার সন্দেহ করিনা এবং তারকার চলাচল ও গতিপথ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতাকেও অস্বীকার করিনা। সেই সাথে তারা যে সংবাদ দেয়, তাতেও কোন সন্দেহ পোষণ করিনা। তারা কিবলার দিককে কাবার কাছে থাকা অবস্থায় যেভাবে দেখেন, দূরে থাকা অবস্থায় ঠিক সেভাবেই দেখেন (জানেন)। সুতরাং দূর থেকে কিবলা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অর্জন করা কাবাকে দেখার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের মতই। আর তাদের খবরকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরাও কিবলার দিক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে থাকি। কেননা তারা দ্বীনী ব্যাপারে আমাদের কাছে বিশ্বস্ত। সেই সাথে তারা আকাশের তারকা ও নক্ষত্ররাজি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি করেন নি। ইমাম ইবনুল মুনযির মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তারকা চলাচলের (কক্ষপথ) এবং তারকাসমূহ থেকে ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা দোষণীয় নয়, যদ্দ্বারা (গভীর অন্ধকারে ও নৌপথে) পথের সন্ধান পাওয়া যায়।
ইমাম ইবনে রজব বলেন: তারকাসমূহ চলাচল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ঘটনাবলীতে তারকার প্রভাব রয়েছে, যে ইলম এ ধরনের কথা বলে, যেমন বর্তমানের জ্যোতিষীরা দাবি করে থাকে, তা নিষেধ ও বাতিল। তা কম হোক বা বেশী হোক। কিন্তু অন্ধকার রাতে পথ চলার উদ্দেশে, কিবলা নির্ধারণ করার জন্য এবং দিক নির্দেশনা লাভ করার জন্য প্রয়োজন অনুপাতে ইলমুত্ তাসয়ীর তথা তারকার গতিপথ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অধিকাংশ আলেমের নিকট জায়েয।
১৩১. যঈফ: মুসনাদে আহমাদ ৪/৩৯৯, ইবনে হিব্বান হা/৫৩৪৬, মুসতাদরাক হাকীম হা/৭২৩৪।
📄 ২৯. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করার বিধান
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ
“তোমরা নক্ষত্রের মধ্যে তোমাদের রিযিক নিহিত আছে মনে করে আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছো।” (সূরা আল ওয়াক্বেয়া: ৮২)
আবু মালেক আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ بِالْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالِاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ»، وَقَالَ: «النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ، وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ»
“জাহেলী যুগের চারটি কু-স্বভাব আমার উম্মাতের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, যা তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারবে না। (এক) আভিজাত্যের অহংকার করা। (দুই) বংশের বদনাম করা। (তিন) নক্ষত্ররাজির মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করা এবং (চার) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা। তিনি আরও বলেন: ‘মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিনী মৃত্যুর পূর্বে যদি তাওবা না করে, তবে ক্বিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় উঠানো হবে যে, তার পরনে থাকবে আলকাতরার প্রলেপযুক্ত লম্বা জামা এবং খোস-পাঁচড়াযুক্ত কোর্তা।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম যায়েদ বিন খালেদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,
صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - صَلَاةَ الصُّبْحِ بِالْحُدَيْبِيَةِ عَلَى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْلِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ؟ »، قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ، فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِي كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا، فَذَلِكَ كَافِرٌ بِي مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ»
“রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়াতে আমাদেরকে নিয়ে ফযরের ছালাত পড়লেন। সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। ছালাতান্তে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমরা কি জানো তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? লোকেরা বলল: ‘আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন’। তিনি বললেন: আল্লাহ বলেছেন, আজ সকালে আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হয়েছে আবার কেউ কাফির হয়েছে। যে ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহর ফযল ও রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে (বৃষ্টি বর্ষণে নক্ষত্রের প্রভাবকে) অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলেছে, ‘অমুক অমুক নক্ষত্রের উসীলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে”।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ অর্থেই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাতে এ কথা আছে যে, কেউ কেউ বলেছেন, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তখন আল্লাহ তা‘আলা আয়াতগুলো নাযিল করেন:
فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ (٧٥) وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ (٧٦) إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ (٧٧) فِي كِتَابٍ مَّكْنُونٍ (٧٨) لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (٧٩) تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ (٨٠) أَفَبِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَنتُم مُّدْهِنُونَ (٨١) وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ
“অতএব, আমি তারকারাজির ভ্রমণ পথের শপথ করছি, নিশ্চয়ই এটি বড় শপথ যদি তোমরা বুঝতে পার। নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন, যা সুরক্ষিত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। যারা পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করতে পারেনা। এটি বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তবুও কি তোমরা এই বাণীর প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করছো? এবং এ নিয়ামতে তোমরা নিজেদের অংশ এই রেখেছো যে, তোমরা তা অস্বীকার করছো। (সূরা ওয়াক্বিয়া: ৭৫-৮২)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা ওয়াক্বেয়ার ৭৫ থেকে ৮২ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) জাহেলী যুগের চারটি স্বভাবের উল্লেখ করা হয়েছে।
৩) উল্লেখিত স্বভাবগুলোর কোনটি কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
৪) এমন কিছু কুফরী আছে, যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে একেবারে বের করে দেয় না।
৫) বান্দাদের মধ্যে কেউ আজ সকালে আমার প্রতি বিশ্বাসী আবার কেউ অবিশ্বাসী হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামত (বৃষ্টি) নাযিল হওয়ার কারণেই এমনটি হল।
৬) এখানে আল্লাহর প্রতি ঈমানের যেই কথা বর্ণিত হয়েছে, তা ভালভাবে বুঝা উচিত। অর্থাৎ এখানে ইখলাস তথা একনিষ্ঠ ঈমান উদ্দেশ্য। যাতে শিরকের কোন অংশ থাকে না।
৭) এখানে যে কুফরীর বর্ণনা এসেছে, তাও ভালভাবে বুঝা উচিত। এটি সেই কুফরী নয়, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
৮) কতক লোক বলেছিল صدق نوء كذا وكذا অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের এ কথার মর্মার্থও ভাল করে বুঝতে হবে।
৯) তোমরা কি জান ‘তোমাদের রব কি বলেছেন?’ এ কথা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করতে পারেন।
১০) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিণীর জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১৩২. শাইখুল ইসলাম বলেন: জাহেলী যামানার কতিপয় আমল এই উম্মাতের লোকেরা ছাড়তে পারবে না। এখানে ঐ সমস্ত লোকদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা এগুলোতে লিপ্ত হবে। এ থেকে আরও জানা গেল যে, জাহেলী যামানার প্রত্যেক কাজ ও বিষয়ই ইসলামে নিন্দিত। তাই যদি না হত, তাহলে এই পাপ কাজগুলোকে জাহেলীয়াতের কাজ বলে উল্লেখ করে তার নিন্দা করা হতনা। আর এটাও জানা কথা যে, উক্ত বিষয়গুলোকে নিন্দা করার জন্যই জাহেলীয়াতের কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে। মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না”। (সূরা আহযাব: ৩৩) এখানে জাহেলী যামানার নারীদের সৌন্দর্য্য প্রদর্শন করে বের হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে এবং জাহেলী যুগের লোকদেরও নিন্দা করা হয়েছে। এই নিন্দার দাবি হচ্ছে জাহেলী যুগের লোকদের সাদৃশ্য করা নিষিদ্ধ।
১৩৩. ছহীহ মুসলিম হা/৯৩৪, অধ্যায়: বিলাপ করার ভয়াবহতা।
১৩৪. ছহীহ বুখারী হা/৮৪৬, অধ্যায়: হুদায়বিয়ার যুদ্ধ, মুসলিম হা/৭১।
📄 ৩০. ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ব্যতীত অন্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে আল্লাহর সাদৃশ্য স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
“হে রাসূল! তুমি বলে দাও, তোমাদের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, তোমাদের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা, যার লোকসান হওয়াকে তোমরা অপছন্দ করো এবং তোমাদের পছন্দনীয় বাড়ী-ঘর তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তার রাসূল ও তাঁরই পথে জিহাদ করার চেয়ে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়ছালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আর আল্লাহ্ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।” (সূরা আত তাওবা: ২৪)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”
বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»
“যার মধ্যে তিনটি জিনিস বিদ্যমান আছে সে ব্যক্তি এগুলোর দ্বারা ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে। (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তার রাসূল সর্বাধিক প্রিয় হবেন। (দুই) একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার (সন্তুষ্টি লাভের) জন্য কোন ব্যক্তিকে ভালবাসবে। (তিন) আল্লাহ তা‘আলা তাকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তার কাছে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতই অপছন্দনীয় হবে”।
ছহীহ বুখারীর অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
«لَا يَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَحَتَّى أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، وَحَتَّى يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
“কেও ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কোন মানুষকে ভালবাসবে, কুফরী থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুক্তি দেয়ার পর যতক্ষণ না সে পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অধিক ভালবাসবে এবং যতক্ষণ না আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল তার কাছে অন্যসব বস্তু হতে অধিক প্রিয় হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ أَحَبَّ فِي اللَّهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللَّهِ، وَوَالَى فِي اللَّهِ، وَعَادَى فِي اللَّهِ، فَإِنَّمَا تُنَالُ وَلَايَةُ اللَّهِ بِذَلِكَ، وَلَنْ يَجِدَ عَبْدٌ طَعْمَ الْإِيمَانِ، وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ، حَتَّى يَكُونَ كَذَلِكَ، وَقَدْ صَارَتْ عَامَّةُ مُؤَاخَاةِ النَّاسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، وَذَلِكَ لَا يُجْدِي عَلَى أَهْلِهِ شَيْئًا»
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করে; তার এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করা যাবে। আর এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ব্যতীত কোন বান্দাই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, তার ছালাত-সিয়ামের পরিমাণ যত বেশীই হোক না কেন।
(বর্তমানে) মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্থিব স্বার্থ। এ ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দ্বারা তার কোন উপকার হবে না।
আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,
وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ
“গুরুরা যখন তাদের ভক্তদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং জাহান্নামের আযাব প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের মধ্যকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে”। (সূরা আল বাকারা: ১৬৬)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় :
১) সূরা আল বাকারার ১৬ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতের তাফসীরও জানা গেল।
৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালবাসাকে জীবন, পরিবার ও ধন-সম্পদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ওয়াজিব।
৪) কোন কোন বিষয় এমন আছে যা ঈমানের পরিপন্থী হলেও এর দ্বারা ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া বুঝায় না। এমতাবস্থায় তাকে অপূর্ণাঙ্গ মু’মিন বলা যেতে পারে।
৫) ঈমানের একটা স্বাদ আছে। মু’মিন বান্দা কখনো এ স্বাদ অনুভব করতে পারে আবার কখনো অনুভব নাও করতে পারে।
৬) অন্তরের এমন চারটি আমল আছে, যা ব্যতীত আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভ করা যায় না এবং ঈমানের স্বাদও অনুভব করা যায় না।
৭) একজন প্রখ্যাত ছাহাবী দুনিয়ার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সাধারণত গড়ে উঠে পার্থিব বিষয়ের ভিত্তিতে।
৮) وتقطعت بهم الأسباب এর তাফসীর জানা গেল। যা একটু আগে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
৯) মুশরিকদের মধ্যেও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে খুব ভালবাসে। কিন্তু শিরকের কারণে এ ভালবাসা অর্থহীন।
১০) যে ব্যক্তির কাছে সূরা আত তাওবার ২৪ নং আয়াতে উল্লেখিত ৮টি বস্তু স্বীয় দীন অপেক্ষা অধিক প্রিয় হবে, তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
১১) যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার মতই ঐ শরীককে ভালবাসে সে শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় ধরনের শিরকে লিপ্ত হয়।
টিকাঃ
১৩৫. ছহীহ বুখারী হা/১৫, অধ্যায়: রাসূলকে ভালবাসা ঈমানের অন্তর্ভূক্ত।
১৩৬. শাইখুল ইসলাম বলেন: নাবী ﷺ সংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তির মধ্যে এই তিনটি গুণ পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে সক্ষম হবে। কেননা কোন জিনিসে স্বাদ পাওয়া উক্ত জিনিসের প্রতি মুহাব্বতের প্রমাণ বহন করে। যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে ভালবাসে এবং তা পাওয়ার আকাঙ্খা করে, অতঃপর যখন সে তা পেয়ে যায় তখন উক্ত বিষয়টি পেয়ে স্বাদ, মজা এবং আনন্দ পায়। স্বাদ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা প্রিয় ও কাঙ্খিত বস্তু লাভ করার পরই অর্জিত হয়।
শাইখুল ইসলাম আরো বলেন: আল্লাহকে পরিপূর্ণ ভালবাসার পরই ঈমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। এটি হাসিল হয় তিনটি জিনিসের মাধ্যমে। বান্দার মধ্যে আল্লাহর ভালবাসা পূর্ণ হওয়া, এটিকে শুধু আল্লাহর জন্যই খালেস করা ও উপরোক্ত বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে অন্তর থেকে বের করে দেয়ার মাধ্যমে।
আল্লাহর পরিপূর্ণ ভালবাসার অর্থ হচ্ছে, বান্দার মধ্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা অন্যান্য সকল বস্তুর চেয়ে অধিক পরিমাণে থাকা। কেননা বান্দার অন্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি মৌলিক ভালবাসা থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা সর্বাধিক হতে হবে।
১৩৭. ছহীহ বুখারী হা/৬০৪১, অধ্যায়: আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসা।
১৩৮. ইবনে জারীর এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে এই সনদে হাদীছটি দুর্বল। মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা; লালকাঈ, শারহু উছুলিল ই‘তিক্বাদ হা/১৬৯১, যঈফ।