📄 ২৪. যাদুর প্রকারভেদ
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলেন: আমাদের কাছে মুহাম্মাদ বিন জাফর হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তিনি বর্ণনা করেন আওন হতে, আর আওন বর্ণনা করেন হাইয়্যান বিন আলা হতে, হাইয়্যান বলেন: কাতান বিন কাবীসা আমাদের কাছে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছেন,
«إِنَّ الْعِيَافَةَ، وَالطَّرْقَ وَالطِّيَرَةَ مِنَ الْجِبْتِ». قَالَ عَوْفٌ: (الْعِيَافَةُ: زَجْرُ الطَّيْرِ، وَالطَّرْقُ: الْخَطُّ يُخَطُّ بِالْأَرْضِ)، وَالْجِبْتُ: قَالَ الْحَسَنُ: (رَنَّةُ الشَّيْطَانِ)
“নিশ্চয়ই ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ হচ্ছে ‘জিবত’এর অন্তর্ভূক্ত। আওফ বলেছেন, ‘ইয়াফা’ হচ্ছে পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা। ‘তারক’ হচ্ছে মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য গণনা করা। হাসান বসরী বলেছেন, ‘জিবত’ হচ্ছে শয়তানের চিৎকার”। এ বর্ণনার সনদ ভাল। আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে হিব্বান তার কিতাব ‘ছহীহ’তে এ হাদীছের শুধু মারফূ‘ অংশটুকু বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তারা আওফের উক্তি বাদ দিয়ে বর্ণনা করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«مَنِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ النُّجُومِ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السِّحْرِ، زَادَ مَا زَادَ»
“যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কিছু অংশ শিখল, সে যাদু বিদ্যারই একটি শাখা শিখল। জ্যোতির্বিদ্যা যে যত বেশী শিখবে, সে যাদুও তত বেশী শিখবে।
ইমাম আবু দাউদ এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হাদীছের সনদ ছহীহ।
ইমাম নাসাঈ আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন,
«مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً، ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا، فَقَدْ سَحَرَ، وَمَنْ سَحَرَ فَقَدْ أَشْرَكَ، وَمَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ»
“যে ব্যক্তি গিরা লাগাল অতঃপর তাতে ফুঁ দিল সে মূলত যাদু করল। আর যে ব্যক্তি যাদু করল সে মূলত শিরক করল। আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«أَلَا أُنَبِّئُكُمْ مَا الْعَضْهُ؟ هِيَ النَّمِيمَةُ، الْقَالَةُ بَيْنَ النَّاسِ»
আমি কি তোমাদেরকে বলব না, عضه) আয্হ) কাকে বলে? তা হচ্ছে চোগলখোরী বা কুৎসা রটনা করা। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কথা-লাগানো বা বদনাম ছড়ানো।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا»
“নিশ্চয়ই কোন কোন কথার মধ্যেও যাদু রয়েছে”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ জিবতের অন্তর্ভূক্ত।
২) ‘ইয়াফা’, ‘তারক’, এবং ‘তিয়ারাহ’এর তাফসীর জানা গেল।
৩) জ্যোতির্বিদ্যা যাদুর অন্যতম প্রকার।
৪) ‘ফুঁ’সহ গিরা লাগানোও যাদুর অন্তর্ভূক্ত।
৫) চোগলখোরী করাও যাদুর মধ্যে শামিল।
৬) কিছু কিছু বক্তৃতাও যাদুর অন্তর্ভূক্ত ।
টিকাঃ
১০৮. যঈফ: আবু দাউদ হা/৩৯০৭, ইবনে হিব্বান হা/৬১৩১।
১০৯. ছহীহ: আবু দাউদ, অধ্যায়: জ্যোতির্বিদ্যা। দেখুন: ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩০৫১।
১১০. যঈফ: নাসাঈ হা/৪০৭৯।
১১১. ছহীহ মুসলিম হা/২৬০৬, অধ্যায়: চোগলখোরী হারাম।
১১২. ছহীহ বুখারী হা/৫১৪৬, আবু দাউদ হা/৫০০৭।
📄 ২৫. গণক এবং তাদের অনুরূপ লোকদের বর্ণনা
ছহীহ মুসলিমে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কতিপয় স্ত্রী থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ فَصَدَّقَهُ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَوْمًا»
“যে ব্যক্তি কোন আররাফের (গণকের) কাছে আসল, তারপর তাকে (ভাগ্য সম্পর্কে) কিছু জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার ছালাত কবুল হবে না”।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ - صلى الله عليه وسلم»
“যে ব্যক্তি গণকের কাছে আসল, অতঃপর গণক যা বলল তা সত্য বলে বিশ্বাস করল সে মূলত মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করল। আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ এবং হাকিম এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীছ বর্ণনা করার পর ইমাম হাকেম বলেন: ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মুতাবেক হাদীছটি ছহীহ। আবু ইয়া’লা ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে অনুরূপ মাওকূফ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ইমরান বিন হুসাইন থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে:
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ أَوْ تُطُيِّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكُهِّنَ لَهُ، أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ، وَمَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم»
“যে ব্যক্তি পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করল অথবা যার ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করার জন্য পাখি উড়ানো হল, অথবা যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করল, অথবা যার ভাগ্য গণনা করা হল, অথবা যে ব্যক্তি যাদু করল অথবা যার জন্য যাদু করা হল, সে আমাদের দলের নয়। আর যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসল অতঃপর সে (গণক) যা বলল তা বিশ্বাস করল সে ব্যক্তি মূলত মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা (কুরআন) অস্বীকার করল। ইমাম বায্যার (রহঃ) এই হাদীছটি ভাল সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তাবারানীও স্বীয় কিতাব ‘আওসাত’এ হাসান সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাবারানীর বর্ণনায় ومن أتى...থেকে শেষ পর্যন্ত উল্লেখ নেই।
ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন عـراف) গণক) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে চুরাই জিনিস, হারিয়ে যাওয়া জিনিস ইত্যাদির স্থান অবগত আছে বলে দাবি করে। অন্য বর্ণনায় আছে, এ ধরনের লোককেই গণক বলা হয়। মূলত গণক বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যে ভবিষ্যতের গায়েবী বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয় অর্থাৎ যে ভবিষ্যদ্বাণী করে। আবার কারো মতে যে ব্যক্তি ভবিষ্যতের গোপন খবর বলে দেয়ার দাবি করে তাকেই গণক বলা হয়। কারো মতে যে ব্যক্তি অন্তরের (গোপন) খবর দেয়ার দাবি করে, সেই গণক।
আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন كـاهن) গণক), منجم (জ্যোতির্বিদ) এবং رمـال) বালির উপর রেখা টেনে ভাগ্য গণনাকারী) এবং এ জাতীয় পদ্ধতিতে যারাই গায়েব সম্পর্কে কিছু জানার দাবি করে তাদেরকে আররাফ(عراف) বলা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, এক কওমের কিছু লোক أباجاد লিখে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং তা দ্বারা ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে। পরকালে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোন ভাল ফল আছে বলে আমি মনে করি না।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ভাগ্য গণনাকারীকে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং কুরআনের প্রতি ঈমান রাখা, এ দু’টি বিষয় একই ব্যক্তির অন্তরে এক সাথে অবস্থান করতে পারে না।
২) ভাগ্য গণনা করা কুফরী হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা।
৩) যার জন্য গণনা করা হয়, তার হুকুমও উল্লেখ করা হয়েছে।
৪) পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষাকারীর হুকুম কি, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
৫) যার জন্য যাদু করা হয়, তার হুকুম উল্লেখ করা হয়েছে।
৬) ঐ ব্যক্তির হুকুমও জানা গেল, যে أباجد) আবাজাদ) লিখে গায়েবের খবর বলার দাবি করে।
৭) ‘কাহেন’ كـاهن এবং ‘আররাফ’ عـراف এর মধ্যে পার্থক্য কি, তাও উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
১১৩. ভাগ্য গণনা ও ভবিষ্যদ্বাণী করা:
এটা ইলমে গায়েব ও অদৃশ্যের বিষয়াবলী জানার দাবি করা। যেমন, পৃথিবীতে ভবিষ্যতে কি আপতিত ও সংঘটিত হবে এবং হারানো বস্তুর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সংবাদ দেয়া। আকাশের সংবাদ চুরিকারী শয়তানদেরকে ব্যবহার করে তারা এসব সংবাদ দিয়ে থাকে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَىٰ مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَىٰ كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ}
[الشعراء: ٢٢١ - ٢٢٣]
আমি আপনাকে বলব কি কার উপর শয়তানেরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহগারের উপর। তারা শ্রুত কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। সূরা আশ শু‘আরা ২৬:২২১-২২৩।
শয়তানরা ফেরেশতাদের কিছু কথা চুরি করে তা জ্যোতিষীদের কানে দেয়। জ্যোতিষী তখন ঐ একটি সত্য কথার সাথে আরো শত মিথ্যা কথা মিশিয়ে জনগণকে সংবাদ দেয়। আর আকাশ থেকে শ্রুত ঐ একটি সত্য কথা থাকার কারণে মানুষেরা উক্ত জ্যোতিষীকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। একমাত্র আল্লাহই কেবল ইলমে গায়েব জানেন।
অতএব, কেউ যদি জ্যোতিষী বা অন্য কোন উপায়ে ইলমে গায়েবে আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব দাবি করে অথবা যারা ইলমে গায়েব দাবি করে তাদেরকে বিশ্বাস করে তবে সে আল্লাহর বিশেষত্বে অন্যকে শরীক করলো। জ্যোতির্বিদ্যা শিরক মুক্ত নয়। কারণ এতে শয়তানের চাহিদামত বিষয় দ্বারা তার নৈকট্য অর্জন করা হয়।
আল্লাহর ইলমে শরীকানার দাবি থাকায় ইলমে গায়েবের দাবিকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শিরক করা হয়। অপর দিকে ইবাদতের কিছু অংশ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের জন্য সাব্যস্ত করায় এতে ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সাথে শরীক করা হয়।
১১৪. ছহীহ মুসলিম হা/২২৩০, অধ্যায়: গণকের কাজ নিষিদ্ধ এবং গণকের কাছে যাওয়াও নিষিদ্ধ।
১১৫. ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩৯০৪, তিরমিযী হা/১৩৫, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ হা/৬৩৯ এবং হাকিম, দারেমী হা/১১৩৬। ইমাম আলবানীও হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/৩৩৮৭।
১১৬. ছহীহ: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/৩০৪১, ছহীহুল জামি‘ হা/৫৪৩৫||
১১৭. শারহুস সুন্নাহ ১২/১৮২।
১১৮. ফাতাওয়া কুবরা ১/১৬৩।
১১৯. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা হা/২৬১৬১।
📄 ২৬. নুশরাহ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنِ النُّشْرَةِ فَقَالَ هُوَ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ»
“রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নুশরাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন: নুশরাহ হচ্ছে শয়তানের কাজ। ইমাম আহমাদ (রহঃ) ভাল সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) ও হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) বলেন: ইমাম আহমাদ (রহঃ) কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বলেছেন, ইবনে মাসউদ (রাঃ) এ সবকিছুই (নুশরাহ) অপছন্দ করতেন।
ছহীহ বুখারীতে কাতাদাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি ইবনুল মুসাইয়্যিবকে বললাম, “একজন মানুষের শরীরে অসুখ রয়েছে অথবা যাদুর মাধ্যমে তাকে তার স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, এমতাবস্থায় কি তার উপর থেকে যাদুর প্রভাব দূর করা যাবে? কিংবা নুশরাহ এর মাধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোন দোষ নেই। কারণ তারা এর দ্বারা সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করতে চায়। যা দ্বারা মানুষের কল্যাণ ও উপকার সাধিত হয় তা নিষিদ্ধ নয়”।
হাসান বসরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
«لا يحل السحر إلا الساحر»
“একমাত্র যাদুকর ছাড়া অন্য কেউ যাদু অপসারণ করতে পারে না।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, النشرة حل السحر عن المسـحور ‘নুশারাহ’ হচ্ছে যাদুকৃত ব্যক্তির উপর থেকে যাদুর প্রভাব দূর করা। নুশারাহ দু’ধরনের:
প্রথমটি হচ্ছে, যাদুকৃত ব্যক্তির উপর হতে যাদুর ক্রিয়া নষ্ট করার জন্য অনুরূপ যাদু দ্বারা চিকিৎসা করা। আর এটাই হচ্ছে শয়তানের কাজ। হাসান বসরী (রহঃ) এর বক্তব্য দ্বারা এ কথাই বুঝানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নাশের (যাদুর চিকিৎসক) ও মুনতাশার (যাদুকৃত রোগী) উভয়ই শয়তানের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে শয়তানের নৈকট্য হাসিল করে (শয়তানের ইবাদত করে)। যার ফলে শয়তান যাদুকৃত রোগীর উপর থেকে তার প্রভাব মিটিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ঝাড়-ফুঁক, আল্লাহ তা‘আলার কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা সম্বলিত দু‘আগুলো পাঠ করা এবং বৈধ ঔষধ-পত্র প্রয়োগ করা। এ ধরনের চিকিৎসা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা শরী‘আতে জায়েয আছে।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) নুশরাহ্ তথা যাদু দ্বারা যাদুকৃত রোগীর চিকিৎসা করতে নিষেধ করা হয়েছে।
২) নিষিদ্ধ বস্তু ও অনুমতি প্রাপ্ত বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারলেই সমস্যা ও সন্দেহ মুক্ত হওয়া যায়।
টিকাঃ
১২০. নুশরাহ হচ্ছে এক প্রকার ঝাড়-ফুঁক ও চিকিৎসার নাম। যাদুগৃস্ত ব্যক্তি থেকে যাদুর প্রভাব দূর করাকে ‘নুশরাহ’ বলা হয়।
১২১. ছহীহ: সুনানে আবু দাউদ হা/৩৮৬৮, বায়হাকী সুনানুল কুবরা।
১২২. ইলামুল মুওয়াক্কীঈন আনিল রাব্বুল আলামীন।
📄 ২৭. কুলক্ষণ গ্রহণ করা সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَإِذَا جَاءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ قَالُوا لَنَا هَٰذِهِ ۖ وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَطَّيَّرُوا بِمُوسَىٰ وَمَن مَّعَهُ ۗ أَلَا إِنَّمَا طَائِرُهُمْ عِندَ اللَّهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
“অতঃপর যখন তাদের শুভদিন ফিরে আসতো, তখন তারা বলতো এটা তো আমাদের প্রাপ্য। আর যদি তাদের নিকট অকল্যাণ এসে উপস্থিত হয়, তখন তাতে মূসা এবং তার সঙ্গীদের কুলক্ষণে বলে গণ্য করতো। শুনে রাখো! তাদের কুলক্ষণ তো আল্লাহর কাছেই। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ”। (সূরা আল আ‘রাফ: ১৩১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন:
قَالُوا طَائِرُكُم مَّعَكُمْ ۖ أَئِن ذُكِّرْتُم ۚ بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُونَ
“রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই। তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে বলেই কি তোমরা এ কথা বলছো? বস্তুত: তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়”। (সূরা ইয়াসিন: ১৯)
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَلَا هَامَةَ، وَلَا صَفَرَ»
“রোগের কোন সংক্রমণ শক্তি নেই, পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করারও কোন ভিত্তি নেই। ‘هاماه’ তথা হুতুম পেঁচার ডাক শুনে অশুভ নির্ধারণ করারও ইসলামী শরী‘আতে জায়েয নেই। সফর মাসেরও বিশেষ কোন প্রভাব বা বৈশিষ্ট্য নেই। অর্থাৎ এ মাসকে বরকতহীন মনে করা ঠিক নয়। মুসলিমের হাদীছে ‘নক্ষত্রের কোন প্রভাব নেই (নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয় না), ভূত-প্রেত বলতে কিছুই নেই’- এ কথাটুকু অতিরিক্ত রয়েছে”।
বুখারী ও মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْفَأْلُ» قَالُوا: وَمَا الْفَأْلُ؟ قَالَ: «الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ»
“ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি আর কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে ‘ফাল’ আমার কাছে খুব ভাল লাগে। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাল’ কি? জবাবে তিনি বললেন, ‘উত্তম কথা’।
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) উকবা বিন আমের (রাঃ) হতে ছহীহ সনদে বর্ণনা করেন যে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে ‘তিয়ারাহ’ (কুলক্ষণ) সম্পর্কে আলোচনা করা হল। তখন তিনি বললেন:
«أَحْسَنُهَا الْفَأْلُ، وَلَا تَرُدُّ مُسْلِمًا، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ، فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ»
এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ‘ফাল’। কুলক্ষণ কোন মুসলিমকে কাজে অগ্রসর হওয়া থেকে প্রতিহত করতে পারে না। তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করে তখন সে যেন বলে,
«اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া অন্য কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ অকল্যাণ প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। তোমার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে না এবং তোমার তাওফীক ও শক্তি ব্যতীত সৎ আমল করাও সম্ভব নয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«الطِّيَرَةُ شِرْكٌ، الطِّيَرَةُ شِرْكٌ، وَمَا مِنَّا إِلَّا؛ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ»
‘তিয়ারাহ’ তথা পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা শিরক, পাখি উড়িয়ে লক্ষণ নির্ধারণ করা শিরক। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন।
হাদীছটি ইমাম আবু দাউদ এবং তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদীছের শেষাংশকে অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন ” -এই অংশকে ইবনে মাসউদের উক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে,
«مَنْ رَدَّتْهُ الطِّيَرَةُ عَنْ حَاجَتِهِ فَقَدْ أَشْرَكَ»، قَالُوا: فَمَا كَفَّارَةُ ذَلِكَ؟ قَالَ: «أَنْ يَقُولَ: اللَّهُمَّ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ»
তিয়ারা (কুলক্ষণ) বা দুর্ভাগ্যের ধারণা যে ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য বের হতে বাধা দিল সে মূলত শিরক করল। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: এর কাফফারা কী? উত্তরে তিনি বললেন: তোমরা এ দু‘আ পড়বে, “হে আল্লাহ! তোমার মঙ্গল ব্যতীত অন্য কোন মঙ্গল নেই। তোমার অমঙ্গল ছাড়া অন্য কোন অমঙ্গল নেই। আর তুমি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই”।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
«إِنَّمَا الطِّيَرَةُ مَا أَمْضَاكَ أَوْ رَدَّكَ»
طيرة) তিয়ারাহ) অর্থাৎ কুলক্ষণ হচ্ছে এমন জিনিস (বিশ্বাস ও ধারণা) যা তোমাকে কোন কাজের দিকে ধাবিত করে অথবা কোন কাজ থেকে তোমাকে বিরত রাখে।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ألا إنما طائرهم عند الله “জেনে রেখো তাদের দুর্ভাগ্য আল্লাহর কাছে নিহিত” এবং طائركم معكم তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে” এ আয়াত দু’টির ব্যাপারে সতর্কীকরণ।
২) এক জনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে রোগ স্থানান্তর হয়-এ ধারণাকে অস্বীকার করা হয়েছে।
৩) তিয়ারা তথা কোন বস্তুতে কুলক্ষণ থাকার ধারণাকেও অস্বীকার করা হয়েছে।
৪) হুতুম পেঁচা বা অন্যান্য পাখির ডাকেও কুলক্ষণ নেই।
৫) সফর মাসেও কোনো অশুভ নেই। অর্থাৎ কুলক্ষণের ‘সফর মাস’ বলতে কিছুই নেই। জাহেলী যুগে সফর মাসকে কুলক্ষণ মনে করা হতো, ইসলাম এ ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছে।
৬) ‘ফাল’ উপরোক্ত নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় জিনিসের অন্তর্ভূক্ত নয়। বরং এটা মুস্তাহাব।
৭) ‘ফাল’ এর ব্যাখ্যা জানা গেল। অর্থাৎ ভাল ও সুন্দর নাম শুনে খুশী হওয়া।
৮) অন্তরে কুলক্ষণের ধারণা জাগ্রত হলেই তা ক্ষতিকর নয়। বিশেষ করে যখন বান্দা তাকে অপছন্দ করবে। শুধু তাই নয়, আল্লাহর উপর ভরসা করলে তিনি অন্তর থেকে তা দূর করে দেন।
৯) যার অন্তরে কুলক্ষণের ধারণা সৃষ্টি হবে, সে কী বলবে- এই অধ্যায় থেকে তাও জানা গেল।
১০) সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিয়ারা শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
১১) নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয় তিয়ারার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ কুলক্ষণ মনে করে কাজে অগ্রসর না হওয়া অথবা কোন বস্তুকে শুভলক্ষণ মনে করে কাজে অগ্রসর হওয়া নিষিদ্ধ তিয়ারার অন্তর্ভূক্ত।
টিকাঃ
১২৩. ছহীহ বুখারী হা/৫৭১৭, ৫৭৫৭, মুসলিম হা/২২২০, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৯।
১২৪. ছহীহ বুখারী হা/৫৭৭৬, মুসলিম হা/২২২৪, তিরমিযী হা/১৬১৫, আবু দাউদ হা/৩৯১৬, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৭, মুসনাদে আহমাদ।
১২৫. যঈফ: আবু দাউদ হা/৩৯১৯, অধ্যায়: তিয়ারাহ। দেখুন: সিলসিলায়ে যঈফা হা/১৬১৯।
১২৬. ছহীহ, তবে ‘আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই প্রকার ধারণার উদ্রেক হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করার মাধ্যমে তিনি তা মুসলিমের অন্তর থেকে দূর করে দেন’ ব্যতীত। আবু দাউদ হা/৩৯১০, তিরমিযী হা/১৬১৪, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩৮, মুসনাদে আহমাদ।
১২৭. হাসান: মুসনাদে আহমাদ ২/২২০। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, আছ-ছহীহাহ হা/১০৬৫।
১২৮. যঈফ: মুসনাদে আহমাদ ১/২১৩।