📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ২২. মুসলিম উম্মাহর কিছু সংখ্যক লোক মূর্তি পূজা করবে

📄 ২২. মুসলিম উম্মাহর কিছু সংখ্যক লোক মূর্তি পূজা করবে


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে? তারা ‘জিবত’ এবং ‘ত্বাগূত’কে বিশ্বাস করে। (সূরা আন নিসা: ৫১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَٰلِكَ مَثُوبَةً عِندَ اللَّهِ ۚ مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ ۚ أُولَٰئِكَ شَرٌّ مَّكَانًا وَأَضَلُّ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ
“বলো: আমি কি সে সব লোকদের কথা জানিয়ে দেব? যাদের পরিণতি আল্লাহর কাছে এর চেয়ে খারাপ। তারা এমন লোক যাদেরকে আল্লাহ লা’নত করেছেন এবং যাদের উপর আল্লাহর গযব নিপতিত হয়েছে। যাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে তিনি বানর ও শূকর বানিয়ে দিয়েছেন। তারা ত্বাগূতের পূজা করেছে। তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে। (সূরা আল মায়িদা: ৬০)

আল্লাহ তা‘আলা আসহাবে কাহাফের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَىٰ أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِم مَّسْجِدًا
“যারা তাদের ব্যাপারে বিজয়ী হলো তারা বলল, আমরা অবশ্যই তাদের কবরের উপর মাসজিদ তৈরী করবো” (সূরা কাহাফ: ২১)

ছাহাবী আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ، حَتَّىٰ لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدَخَلْتُمُوهُ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ؟ قَالَ: «فَمَنْ؟»
“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের অভ্যাস ও রীতি-নীতির ঠিক ঐ রকম অনুসরণ করবে, যেমন এক তীরের ফলা অন্য এক তীরের ফলার সমান হয়। অর্থাৎ তোমরা পদে পদে তাদের অনুসরণ করে চলবে। এমনকি তারা যদি দব্ব (মরুভূমিতে বসবাসকারী গুইসাপের ন্যায় এক ধরনের জন্তু বিশেষ) এর গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তাহলে তোমরাও সেখানে প্রবেশ করবে। ছাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! পূর্ববর্তী উম্মাত দ্বারা আপনি কি ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে বুঝাচ্ছেন? তিনি বললেন: তবে আর কারা?

ছহীহ মুসলিমে ছাহাবী ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الْأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا، وَأُعْطِيتُ الْكَنْزَيْنِ الْأَحْمَرَ وَالْأَبْيَضَ، وَإِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لِأُمَّتِي أَنْ لَا يُهْلِكَهَا بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ، وَأَنْ لَا يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ، فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَإِنَّ رَبِّي قَالَ: يَا مُحَمَّدُ، إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءً فَإِنَّهُ لَا يُرَدُّ، وَإِنِّي أَعْطَيْتُكَ لِأُمَّتِكَ أَنْ لَا أُهْلِكَهُمْ بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ، وَأَنْ لَا أُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَلَوِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَنْ بِأَقْطَارِهَا، حَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يُهْلِكُ بَعْضًا وَيَسْبِي بَعْضُهُمْ بَعْضًا»
“আল্লাহ তা‘আলা গোটা যমীনকে একত্রিত করে আমার সামনে পেশ করলেন। তখন আমি যমীনের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত দেখতে পেলাম। পৃথিবীর যতটুকু স্থান আমাকে দেখানো হয়েছে আমার উম্মাতের শাসন বা রাজত্ব সেই স্থান পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। লাল ও সাদা দু’টি ধনভান্ডার আমাকে দেয়া হল। আমি আমার রবের কাছে আমার উম্মাতের জন্য এ আরজ করলাম, তিনি যেন আমার উম্মাতকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদেরকে ব্যতীত বাহিরের কোন শত্রুকে তাদের উপর বিজয়ী বা ক্ষমতাসীন করে না দেন। যার ফলে সেই শত্রু তাদের সব কিছুকে (রাজত্ব ও সম্পদকে) নিজেদের জন্য হালাল মনে করবে। আমার রব আমাকে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি যখন কোন বিষয়ে ফায়ছালা করি, তখন তার কোনো ব্যতিক্রম হয় না। আমি তোমাকে তোমার উম্মাতের জন্য এ অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমি তাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করব না এবং তাদের নিজেদেরকে ছাড়া যদি সারা বিশ্বও তাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় তবুও এমন কোনো শত্রুকে তাদের উপর ক্ষমতাসীন করবো না যে তাদের জান, মাল ও রাজত্ব এমনকি সবকিছুই বৈধ মনে করে লুটে নিবে। তবে তোমার উম্মাতের লোকেরাই পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একে অপরকে হত্যা করবে এবং একে অপরকে বন্দী করবে”।

ইমাম বারকানী (রহঃ) তার ছহীহ হাদীছগ্রন্থে উপরোক্ত হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে উক্ত বর্ণনায় নিম্নোক্ত কথাগুলো অতিরিক্ত এসেছে,
«وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ، وَإِذَا وَقَعَ عَلَيْهِمُ السَّيْفُ لَمْ يُرْفَعْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَلْحَقَ حَيٌّ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدَ فِئَامٌ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي، وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورَةً، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى»
“আমি আমার উম্মাতের জন্য ভ্রষ্টকারী ইমামদের ব্যাপারে বেশী আশঙ্কা বোধ করছি এবং তাদের উপর একবার তলোয়ার চালানো হলে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে তলোয়ার উঠানো হবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না আমার একদল উম্মাত মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং যতক্ষণ না আমার উম্মাতের একটি শ্রেণী মূর্তি পূজা করবে। আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদীর আগমন ঘটবে। প্রত্যেকেই নিজেকে নাবী বলে দাবি করবে। অথচ আমিই সর্বশেষ নাবী। আমার পর আর কোনো নাবী নেই। ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মাতের মধ্যে এমন একটি সাহায্য প্রাপ্ত দল থাকবে। যারা তাদেরকে পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তা‘আলার ফায়ছালা আসার পূর্ব পর্যন্ত তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আন নিসার ৫১নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আল মায়িদার ৬০ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) সূরা আল কাহাফের ২১ নং আয়াতের তাফসীর।
৪) এই অধ্যায়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখানে জিবত এবং ত্বাগূতের প্রতি ঈমানের অর্থ কি? এটা কি শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম? নাকি জিবত ও ত্বাগূতের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং বাতিল বলে জানা সত্ত্বেও এর পূজারীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করা বুঝায়? ইত্যাদি বিষয় এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
৫) ইয়াহূদীদের কথা হচ্ছে, কাফিরদের কুফরী সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও তারা মু’মিনদের চেয়ে অধিক সত্য পথের অধিকারী।
৬) এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই মূর্তি পূজারীদের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছে এ বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে।
৭) এ রকম সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুস্পষ্ট ঘোষণা অর্থাৎ এ উম্মাতের অনেক লোকের মধ্যে মূর্তিপূজা পাওয়া যাবে।
৮) সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন লোকের আবির্ভাব হবে, যারা নবুওয়াতের দাবি করবে। যেমন দাবি করেছিল “মুখতার ছাকাফী”। অথচ সে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালাতকে স্বীকার করত। সে নিজেকে উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভূক্ত বলেও ঘোষণা করত, সে আরও ঘোষণা দিত যে, রাসূল সত্য, কুরআন সত্য এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নাবী হিসাবে স্বীকৃত। এগুলোর স্বীকৃতি প্রদান সত্ত্বেও তার মধ্যে উপরোক্ত স্বীকৃতির সুস্পষ্ট বিপরীত ও পরিপন্থী কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ভন্ড মূর্খ ছাহাবায়ে কেরামের শেষ যুগে আবির্ভূত হয়েছিল এবং অনেক লোক তার অনুসারীও হয়েছিল।
৯) সু-খবর হচ্ছে, অতীতের মত হক্ব সম্পূর্ণরূপে কখনো বিলুপ্ত হবে না বরং একটি দল হকের উপর চিরদিনই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
১০) এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে, সংখ্যায় কম হলেও যারা তাদেরকে বর্জন করবে এবং তাদের বিরোধীতা করবে, তারা এই হকপন্থী জামা‘আতের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
১১) ক্বিয়ামত পর্যন্ত হকপন্থী একটি জামা‘আত বিদ্যমান থাকবে।
১২) এ অধ্যায়ে অনেকগুলো বড় নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে। যথা:
ক) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংবাদ দিয়েছেন যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাকে বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিমের যমীনকে একত্রিত করে দেখিয়েছেন। এ সংবাদ দ্বারা তিনি যে অর্থ করেছেন, তার অর্থ সম্পর্কেও সংবাদ দিয়েছেন। ঠিক তাই সংঘটিত হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণের ব্যাপারে ঘটেনি।
খ) তাকে দু’টি ধনভান্ডার প্রদান করা হয়েছে এ সংবাদও তিনি দিয়েছেন।
গ) তার উম্মাতের ব্যাপারে দু’টি দু‘আ কবুল হওয়ার সংবাদ তিনি দিয়েছেন এবং তৃতীয় দু‘আ কবুল না হওয়ার খবরও তিনি জানিয়েছেন।
ঘ) তিনি এ খবরও জানিয়েছেন যে, এই উম্মাতের উপরে একবার তলোয়ার উঠলে তা আর খাপে প্রবেশ করবে না অর্থাৎ সংঘাত শুরু হলে তা আর থামবে না।
ঙ) তিনি আরো জানিয়েছেন যে, উম্মাতের লোকেরা একে অপরকে ধ্বংস করবে ও একে অপরকে বন্দী করবে। উম্মাতের জন্য তিনি গোমরাহকারী শাসকদের ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
চ) এই উম্মাতের মধ্য থেকে মিথ্যা ও ভন্ড নাবী আবির্ভাবের কথা তিনি জানিয়েছেন।
ছ) সাহায্যপ্রাপ্ত একটি হকপন্থীদল সব সময়ই বিদ্যমান থাকার সংবাদ জানিয়েছেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংবাদ অনুযায়ী উল্লেখিত সব বিষয়ই হুবহু সংঘটিত হয়েছে। অথচ উপরোক্ত বিষয়ের কোনটিই যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
১৩) একমাত্র পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাপারেই তিনি শঙ্কিত ছিলেন।
১৪) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের জন্য মূর্তি পূজার অর্থও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ কাঠের বা পাথরের তৈরী মূর্তির পূজা করা, অলী-আওলিয়াদের মাযার ও কবর পূজা, পাথর পূজা এবং গাছ ইত্যাদির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

টিকাঃ
৯৫. ছহীহ বুখারী হা/৩৪৫৬, ছহীহ মুসলিম হা/২৬৬৯, ইবনে মাজাহ হা/৩৯৯৪।
৯৬. ভ্রষ্টকারী/বিভ্রান্তকারী ইমামগণ: আইম্মাহ (الأئمة): শব্দটি ইমাম (إمام) শব্দের বহুবচন। আর সে হচ্ছে কোন সম্প্রদায়ের এমন প্রধান (নেতা) যে তাদেরকে কোন কথা, কাজ বা বিশ্বাসের প্রতি আহবান জানায় আর তারা তাকে অনুসরণ করে, হোক সে হিদায়াতপ্রাপ্ত অথবা পথভ্রষ্ট। এখানে তাদের (বিভ্রান্তকারী ইমামগণ) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: এমন আমীরগণ, আলিমগণ এবং ধার্মিক ব্যক্তি যারা পাপাচার, অন্যায়, ভ্রষ্টতা বা বিদ‘আতের দিকে আহবানকারী। দেখুন: গায়াতুল মুরীদ।
৯৭. আর যখন তাদের উপরে তলোয়ার এসে পড়বে তখন কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আর তা উঠানো হবে না: অর্থ্যাৎ যখন যুদ্ধ, ফিতনা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব তাদের মধ্যে প্রকাশ পাবে, তখন তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আর উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে হত্যার মাধ্যমে সেই তলোয়ার আপতিত হয়েছে, এখন পর্যন্ত তা চলমান রয়েছে, তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়নি। দেখুন: গায়াতুল মুরীদ।
৯৮. হাসান-ছহীহ: আবু দাউদ হা/৪২৫২, ইবনে মাজাহ হা/৩৯৫২।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ২৩. যাদু

📄 ২৩. যাদু


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
“তারা অবশ্যই অবগত আছে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করে নিয়েছে, পরকালে তার কোন অংশ নেই।” (সূরা আল বাকারা: ১০২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে? তারা জিবত এবং তাগূতকে বিশ্বাস করে। (সূরা আন নিসা: ৫১)

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন,
«الْجِبْتُ: السِّحْرُ، وَالطَّاغُوتُ: الشَّيْطَانُ»
‘জিবত’ হচ্ছে যাদু, আর ‘ত্বাগূত’ হচ্ছে শয়তান।

জাবির (রাঃ) বলেন,
«الطَّوَاغِيتُ كُهَّانٌ كَانَ يَنْزِلُ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ، فِي كُلِّ حَيٍّ وَاحِدٌ»
‘ত্বাগূত’ হচ্ছে গণক। তাদের উপর শয়তান অবতীর্ণ হতো প্রত্যেক গোত্রের জন্যই একজন করে গণক নির্ধারিত ছিল।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ»
তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে দূরে থাক। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী কী? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী মু’মিন নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া”।

জুনদুব (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ
“যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে গর্দান উড়িয়ে দেয়া”।

ইমাম তিরমিযী এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: হাদীছটি মাওকূফ হওয়াই সঠিক।

ছহীহ বুখারীতে বাজালা বিন আবাদাহ থেকে বর্ণিত আছে, উমার (রাঃ) মুসলিম গভর্ণরদের কাছে পাঠানো নির্দেশ নামায় লিখেছেন,
«أَنِ اقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ وَسَاحِرَةٍ، قَالَ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِرَ»
“তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ এবং যাদুকর নারীকে হত্যা করো। বাজালা বলেন, এ নির্দেশের পর আমরা তিনজন যাদুকর মহিলাকে হত্যা করেছি”।

হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছে এসেছে,
«أَنَّهَا أَمَرَتْ بِقَتْلِ جَارِيَةٍ لَهَا سَحَرَتْهَا، فَقُتِلَتْ»
তার দাসী তাকে যাদু করেছিল। তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর উক্ত নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

ইমাম মালেক (রহঃ) স্বীয় মুয়াত্তায় এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। একই রকম হাদীছ জুনদুব থেকে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ (রহঃ) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তিনজন ছাহাবী থেকে এই কথা বর্ণনা করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল বাকারার ১০২ নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আন নিসার ৫১ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) ‘জিবত’ এবং ‘ত্বাগূত’এর ব্যাখ্যা এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য।
৪) ‘ত্বাগূত’ কখনো জ্বিন আবার কখনো মানুষ হতে পারে।
৫) ধ্বংসাত্মক সাতটি বিশেষ বিষয় সম্পর্কে জানা গেল। যা থেকে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন।
৬) যাদুকর কাফির।
৭) তাওবার সুযোগ দেয়া ছাড়াই যাদুকরকে হত্যা করতে হবে।
৮) উমার (রাঃ) এর যুগে যাদুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তার পরবর্তী যুগের অবস্থা কী দাঁড়াবে? কোনো সন্দেহ নেই যে তার পরবর্তী যুগে যাদু বিদ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

টিকাঃ
৯৯. যাদু দু’দিক দিয়ে শিরকের অন্তর্ভূক্ত:
প্রথম দিক: যাদুতো শয়তানদেরকে ব্যবহার করা হয়। তাদের সাথে গাড় সম্পর্ক রাখতে হয় এবং চাহিদানুযায়ী তাদের নৈকট্য অর্জন করতে হয়। বিনিময়ে তারা যাদুকরের প্রার্থিত খেদমত আঞ্জাম দেয়। অতএব, যাদু শয়তানের শিক্ষা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ
শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত। সূরা আল-বাক্বারা ২: ১০২।
দ্বিতীয় দিক: যাদুতো ইলমে গায়েবের দাবি করা হয়। যা আল্লাহর সাথে শিরকের অন্তর্ভূক্ত। আর এটা হলো কুফরী ও ভ্রষ্টতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
১০০. আল্লাহ তা‘আলার বাণী: يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ অর্থাৎ তারা ‘জিবত’ এবং ‘তাগূত’কে বিশ্বাস করে, এর ব্যাখ্যায় উমার (রাঃ) বলেন: ‘জিবত’ হচ্ছে যাদু। আর তাগূত হচ্ছে শয়তান। একাধিক বস্তুর ক্ষেত্রে ‘তাগূত’ শব্দটি প্রয়োগ হয়ে থাকে। আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যেসব বস্তুর ইবাদত করা হয়, সেগুলো তাগূতের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং এই বাতিল মা‘বূদগুলোও তাগূত। কুরআনের আয়াতগুলোতে এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। গণকদেরকেও তাগূত বলা হয়। যারা শরী‘আতে ইলাহীকে বাদ দিয়ে অন্য বিধান দিয়ে ফায়ছালা করে, ইসলামী শরীয়াতের বিপরীত করার হুকুম করে অথবা যারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য বিধানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং এজাতীয় অন্যান্য বস্তুও তাগূতের মধ্যে শামিল।
১০১. ছহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী ৮/২৫২, ইবনে কাসীর।
১০২. ছহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী ৮/২৫২, ইবনে আবী হাতিম, তাফসীরে ইবনে জারীর ৩/১৩।
১০৩. ছহীহ বুখারী হা/২৭৬৬, অধ্যায়: সতী নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, ছহীহ মুসলিম হা/৮৯, আবু দাউদ হা/২৮৭৪, নাসাঈ হা/৩৬৭১।
১০৪. যঈফ: তিরমিযী হা/১৪৬০, অধ্যায়: যাদুকরের শাস্তি। ইমাম আলবানী (রহঃ) এই হাদীছকে যঈফ বলেছেন: দেখুন: সিলসিলায়ে যঈফা হা/১৪৪৬, দারাকুতনী হা/৩২০৪, সুনানুল কুবরা বায়হাকী।
১০৫. হাসান-ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩০৪৩, তিরমিযী হা/১৫৮৭, মুসনাদে শাফিয়ী হা/২৯০, আব্দুর রাযযাক হা/৯৯৭২।
১০৬. মুসনাদে শাফিয়ী হা/২৯০, মুয়াত্তা মালিক হা/৩২৪৭, সুনানুল কুবরা বায়হাকী ৮/১৩৬।
১০৭. যাদুকর কাফের কি না এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। একদল আলেমের মত হচ্ছে, যাদুকর কাফের। ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আহমাদ (রহঃ) এ মতই পোষণ করেছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) এর অনুসারীদের মতে কোন ঔষধ, ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর কোন জিনিস পান করিয়ে যাদু করা হলে যাদুকর কাফের হবে না। এ ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে করা হলে কাফের হবে। তা কুফরী হওয়ার অন্যতম দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
“তারা উভয়ই এ কথা না বলে কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না যে, আমরা কেবল পরীক্ষার জন্য এসেছি; কাজেই তুমি কুফরীতে লিপ্ত হয়ো না। (সূরা আল-বাকারা: ১০২)

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ২৪. যাদুর প্রকারভেদ

📄 ২৪. যাদুর প্রকারভেদ


ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলেন: আমাদের কাছে মুহাম্মাদ বিন জাফর হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তিনি বর্ণনা করেন আওন হতে, আর আওন বর্ণনা করেন হাইয়্যান বিন আলা হতে, হাইয়্যান বলেন: কাতান বিন কাবীসা আমাদের কাছে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছেন,
«إِنَّ الْعِيَافَةَ، وَالطَّرْقَ وَالطِّيَرَةَ مِنَ الْجِبْتِ». قَالَ عَوْفٌ: (الْعِيَافَةُ: زَجْرُ الطَّيْرِ، وَالطَّرْقُ: الْخَطُّ يُخَطُّ بِالْأَرْضِ)، وَالْجِبْتُ: قَالَ الْحَسَنُ: (رَنَّةُ الشَّيْطَانِ)
“নিশ্চয়ই ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ হচ্ছে ‘জিবত’এর অন্তর্ভূক্ত। আওফ বলেছেন, ‘ইয়াফা’ হচ্ছে পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা। ‘তারক’ হচ্ছে মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য গণনা করা। হাসান বসরী বলেছেন, ‘জিবত’ হচ্ছে শয়তানের চিৎকার”। এ বর্ণনার সনদ ভাল। আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে হিব্বান তার কিতাব ‘ছহীহ’তে এ হাদীছের শুধু মারফূ‘ অংশটুকু বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তারা আওফের উক্তি বাদ দিয়ে বর্ণনা করেছেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«مَنِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ النُّجُومِ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السِّحْرِ، زَادَ مَا زَادَ»
“যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কিছু অংশ শিখল, সে যাদু বিদ্যারই একটি শাখা শিখল। জ্যোতির্বিদ্যা যে যত বেশী শিখবে, সে যাদুও তত বেশী শিখবে।
ইমাম আবু দাউদ এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হাদীছের সনদ ছহীহ।

ইমাম নাসাঈ আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন,
«مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً، ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا، فَقَدْ سَحَرَ، وَمَنْ سَحَرَ فَقَدْ أَشْرَكَ، وَمَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ»
“যে ব্যক্তি গিরা লাগাল অতঃপর তাতে ফুঁ দিল সে মূলত যাদু করল। আর যে ব্যক্তি যাদু করল সে মূলত শিরক করল। আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«أَلَا أُنَبِّئُكُمْ مَا الْعَضْهُ؟ هِيَ النَّمِيمَةُ، الْقَالَةُ بَيْنَ النَّاسِ»
আমি কি তোমাদেরকে বলব না, عضه) আয্হ) কাকে বলে? তা হচ্ছে চোগলখোরী বা কুৎসা রটনা করা। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কথা-লাগানো বা বদনাম ছড়ানো।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا»
“নিশ্চয়ই কোন কোন কথার মধ্যেও যাদু রয়েছে”।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ জিবতের অন্তর্ভূক্ত।
২) ‘ইয়াফা’, ‘তারক’, এবং ‘তিয়ারাহ’এর তাফসীর জানা গেল।
৩) জ্যোতির্বিদ্যা যাদুর অন্যতম প্রকার।
৪) ‘ফুঁ’সহ গিরা লাগানোও যাদুর অন্তর্ভূক্ত।
৫) চোগলখোরী করাও যাদুর মধ্যে শামিল।
৬) কিছু কিছু বক্তৃতাও যাদুর অন্তর্ভূক্ত ।

টিকাঃ
১০৮. যঈফ: আবু দাউদ হা/৩৯০৭, ইবনে হিব্বান হা/৬১৩১।
১০৯. ছহীহ: আবু দাউদ, অধ্যায়: জ্যোতির্বিদ্যা। দেখুন: ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩০৫১।
১১০. যঈফ: নাসাঈ হা/৪০৭৯।
১১১. ছহীহ মুসলিম হা/২৬০৬, অধ্যায়: চোগলখোরী হারাম।
১১২. ছহীহ বুখারী হা/৫১৪৬, আবু দাউদ হা/৫০০৭।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ২৫. গণক এবং তাদের অনুরূপ লোকদের বর্ণনা

📄 ২৫. গণক এবং তাদের অনুরূপ লোকদের বর্ণনা


ছহীহ মুসলিমে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কতিপয় স্ত্রী থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ فَصَدَّقَهُ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَوْمًا»
“যে ব্যক্তি কোন আররাফের (গণকের) কাছে আসল, তারপর তাকে (ভাগ্য সম্পর্কে) কিছু জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার ছালাত কবুল হবে না”।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ - صلى الله عليه وسلم»
“যে ব্যক্তি গণকের কাছে আসল, অতঃপর গণক যা বলল তা সত্য বলে বিশ্বাস করল সে মূলত মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করল। আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ এবং হাকিম এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীছ বর্ণনা করার পর ইমাম হাকেম বলেন: ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মুতাবেক হাদীছটি ছহীহ। আবু ইয়া’লা ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে অনুরূপ মাওকূফ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ইমরান বিন হুসাইন থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত আছে:
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ أَوْ تُطُيِّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكُهِّنَ لَهُ، أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ، وَمَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم»
“যে ব্যক্তি পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করল অথবা যার ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করার জন্য পাখি উড়ানো হল, অথবা যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করল, অথবা যার ভাগ্য গণনা করা হল, অথবা যে ব্যক্তি যাদু করল অথবা যার জন্য যাদু করা হল, সে আমাদের দলের নয়। আর যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসল অতঃপর সে (গণক) যা বলল তা বিশ্বাস করল সে ব্যক্তি মূলত মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা (কুরআন) অস্বীকার করল। ইমাম বায্যার (রহঃ) এই হাদীছটি ভাল সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তাবারানীও স্বীয় কিতাব ‘আওসাত’এ হাসান সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাবারানীর বর্ণনায় ومن أتى...থেকে শেষ পর্যন্ত উল্লেখ নেই।
ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন عـراف) গণক) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে চুরাই জিনিস, হারিয়ে যাওয়া জিনিস ইত্যাদির স্থান অবগত আছে বলে দাবি করে। অন্য বর্ণনায় আছে, এ ধরনের লোককেই গণক বলা হয়। মূলত গণক বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যে ভবিষ্যতের গায়েবী বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয় অর্থাৎ যে ভবিষ্যদ্বাণী করে। আবার কারো মতে যে ব্যক্তি ভবিষ্যতের গোপন খবর বলে দেয়ার দাবি করে তাকেই গণক বলা হয়। কারো মতে যে ব্যক্তি অন্তরের (গোপন) খবর দেয়ার দাবি করে, সেই গণক।
আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন كـاهن) গণক), منجم (জ্যোতির্বিদ) এবং رمـال) বালির উপর রেখা টেনে ভাগ্য গণনাকারী) এবং এ জাতীয় পদ্ধতিতে যারাই গায়েব সম্পর্কে কিছু জানার দাবি করে তাদেরকে আররাফ(عراف) বলা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, এক কওমের কিছু লোক أباجاد লিখে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং তা দ্বারা ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে। পরকালে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোন ভাল ফল আছে বলে আমি মনে করি না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) ভাগ্য গণনাকারীকে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং কুরআনের প্রতি ঈমান রাখা, এ দু’টি বিষয় একই ব্যক্তির অন্তরে এক সাথে অবস্থান করতে পারে না।
২) ভাগ্য গণনা করা কুফরী হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা।
৩) যার জন্য গণনা করা হয়, তার হুকুমও উল্লেখ করা হয়েছে।
৪) পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষাকারীর হুকুম কি, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
৫) যার জন্য যাদু করা হয়, তার হুকুম উল্লেখ করা হয়েছে।
৬) ঐ ব্যক্তির হুকুমও জানা গেল, যে أباجد) আবাজাদ) লিখে গায়েবের খবর বলার দাবি করে।
৭) ‘কাহেন’ كـاهن এবং ‘আররাফ’ عـراف এর মধ্যে পার্থক্য কি, তাও উল্লেখ করা হয়েছে।

টিকাঃ
১১৩. ভাগ্য গণনা ও ভবিষ্যদ্বাণী করা:
এটা ইলমে গায়েব ও অদৃশ্যের বিষয়াবলী জানার দাবি করা। যেমন, পৃথিবীতে ভবিষ্যতে কি আপতিত ও সংঘটিত হবে এবং হারানো বস্তুর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সংবাদ দেয়া। আকাশের সংবাদ চুরিকারী শয়তানদেরকে ব্যবহার করে তারা এসব সংবাদ দিয়ে থাকে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَىٰ مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَىٰ كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ}
[الشعراء: ٢٢١ - ٢٢٣]
আমি আপনাকে বলব কি কার উপর শয়তানেরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহগারের উপর। তারা শ্রুত কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। সূরা আশ শু‘আরা ২৬:২২১-২২৩।
শয়তানরা ফেরেশতাদের কিছু কথা চুরি করে তা জ্যোতিষীদের কানে দেয়। জ্যোতিষী তখন ঐ একটি সত্য কথার সাথে আরো শত মিথ্যা কথা মিশিয়ে জনগণকে সংবাদ দেয়। আর আকাশ থেকে শ্রুত ঐ একটি সত্য কথা থাকার কারণে মানুষেরা উক্ত জ্যোতিষীকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। একমাত্র আল্লাহই কেবল ইলমে গায়েব জানেন।
অতএব, কেউ যদি জ্যোতিষী বা অন্য কোন উপায়ে ইলমে গায়েবে আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব দাবি করে অথবা যারা ইলমে গায়েব দাবি করে তাদেরকে বিশ্বাস করে তবে সে আল্লাহর বিশেষত্বে অন্যকে শরীক করলো। জ্যোতির্বিদ্যা শিরক মুক্ত নয়। কারণ এতে শয়তানের চাহিদামত বিষয় দ্বারা তার নৈকট্য অর্জন করা হয়।
আল্লাহর ইলমে শরীকানার দাবি থাকায় ইলমে গায়েবের দাবিকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শিরক করা হয়। অপর দিকে ইবাদতের কিছু অংশ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের জন্য সাব্যস্ত করায় এতে ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সাথে শরীক করা হয়।
১১৪. ছহীহ মুসলিম হা/২২৩০, অধ্যায়: গণকের কাজ নিষিদ্ধ এবং গণকের কাছে যাওয়াও নিষিদ্ধ।
১১৫. ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩৯০৪, তিরমিযী হা/১৩৫, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ হা/৬৩৯ এবং হাকিম, দারেমী হা/১১৩৬। ইমাম আলবানীও হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/৩৩৮৭।
১১৬. ছহীহ: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/৩০৪১, ছহীহুল জামি‘ হা/৫৪৩৫||
১১৭. শারহুস সুন্নাহ ১২/১৮২।
১১৮. ফাতাওয়া কুবরা ১/১৬৩।
১১৯. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা হা/২৬১৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00