📄 ২০. সৎ লোকদের কবরের প্রতি মাত্রতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন তাকে মূর্তিতে পরিণত করে এবং আল্লাহ ব্যতীত তার ইবাদতও করা হয়
ইমাম মালেক (রহঃ) মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আ করেছেন,
«اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنًا يُعْبَدُ، اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ)
“হে আল্লাহ! তুমি আমার কবরকে মূর্তিতে পরিণত করো না, যার ইবাদত করা হবে। ঐ জাতির উপর আল্লাহর লা’নত, যারা তাদের নাবীদের কবরগুলোকে মাসজিদে পরিণত করেছে।
ইবনে জারীর সুফিয়ান হতে, তিনি মানসূর হতে এবং তিনি মুজাহিদ হতে والعزى اللات أف رأيتم এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, লাত এমন একজন সৎ লোক ছিলেন, যিনি হাজীদেরকে ছাতু খাওয়াতেন। অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, তখন লোকেরা তার কবরের পাশে অবস্থান করতে লাগল। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে আবুল জাওযা একই কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘লাত’ হাজীদেরকে ছাতু খাওয়াতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَائِرَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ»
“রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদেরকে এবং যারা কবরকে মাসজিদে পরিণত করে ও যারা কবরে বাতি জ্বালায় তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১| মূর্তি বা প্রতিমার ব্যাখ্যা জানা গেল। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হোক না কেন, সেটিই মূর্তি সমতুল্য।
২) ইবাদতের ব্যাখ্যা জানা গেল। অর্থাৎ কবরকে মাত্রতিরিক্ত সম্মান করা কবরবাসীর ইবাদতের নামান্তর।
৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন একমাত্র তা থেকেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন।
৪) নাবীদের কবরকে মাসজিদ বানানোর বিষয়টিকে মূর্তি পূজার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
৫) যারা কবরকে মাসজিদ বানায় তাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কঠিন গযব নাযিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৬) এই অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সর্ববৃহৎ মূর্তি “লাতের” ইবাদতের সূচনা কিভাবে হয়েছে, তা জানা গেল।
৭) লাত নামক মূর্তির স্থানটি মূলত একজন নেককার লোকের কবর।
৮) লাত প্রকৃতপক্ষে কবরস্থ ব্যক্তির নাম। মূর্তির নামেই কবরের নামকরণ করা হয়েছে।
৯) কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদের প্রতি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিসম্পাত।
১০) যারা কবরে বাতি জ্বালায় তাদের প্রতি ও রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিশাপ।
টিকাঃ
৯১. হাসান: মুআত্তা ইমাম মালেক হা/৪১৬। ইমাম আলবানী (রহঃ) এই হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। দেখুন: শাইখের তাহকীকসহ মিশকাত, হা/৭৫০।
৯২. যঈফ: আবু দাউদ হা/৩২৩৬, অধ্যায়: মহিলাদের কবর যিয়ারত। ইমাম আলবানী এ হাদীছকে যঈফ বলেছেন। দেখুন: সিলসিলায়ে যঈফা, হা/২২৫। মুসনাদে আহমাদ, শুয়া‘ইব আর নাউত্ব (রহঃ) ছহীহ বলেছেন।
📄 ২১. নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদ সংরক্ষণ ও শিরকের পথ রুদ্ধকরণ
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ বলেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
“তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের হিদায়াতের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। মু’মিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়”। (সূরা আত তাওবা: ১২৮)
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ»
“তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না, আর আমার কবরকে ঈদ-উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। আমার উপর তোমরা দরূদ পড়ো। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়। ইমাম আবু দাউদ হাসান সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। হাদীছের সকল রাবীই নির্ভরযোগ্য”।
আলী ইবনুল হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে,
أَنَّهُ رَأَى رَجُلًا يَجِيءُ إِلَى فُرْجَةٍ كَانَتْ عِنْدَ قَبْرِ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - فَيَدْخُلُ فِيهَا فَيَدْعُو، فَنَهَاهُ وَقَالَ: أَلَا أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا سَمِعْتُهُ مِنْ أَبِي عَنْ جَدِّي عَنْ رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لَا تَتَّخِذُوا قَبْرِي عِيدًا، وَلَا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ، فَإِنَّ تَسْلِيمَكُمْ يَبْلُغُنِي أَيْنَ كُنْتُمْ»
তিনি একজন লোককে দেখতে পেলেন যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের পাশে একটি ছিদ্রপথে প্রবেশ করে সেখানে দু‘আ করছে। তখন তিনি ঐ লোকটিকে এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করলেন। তাকে আরো বললেন, আমি কি তোমার কাছে সে হাদীছটি বর্ণনা করব না, যা আমি আমার পিতার কাছ থেকে শুনেছি এবং তিনি শুনেছেন আমার দাদার কাছ থেকে, আর আমার দাদা শুনেছেন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছ থেকে? রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমরা আমার কবরকে ঈদে পরিণত করো না আর তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌঁছে যায়। ইমাম যিয়াউদ্দীন আল-মাকদেসী এই হাদীছটি মুখতারায় বর্ণনা করেছেন।
টিকাঃ
৯৩. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: কোন আলেম ছালাত আদায় ও দু‘আ করার জন্য কবরের নিকট যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কেননা এ জন্য কবরের নিকট যাওয়া কবরকে এক প্রকার ঈদ বানানোর মতই। এতে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যখন কোনো ব্যক্তি নামাযের জন্য মাসজিদে নববীতে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দেয়ার নিয়্যতে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের নিকট যাওয়া নিষিদ্ধ। কেননা এটি বৈধ হওয়ার জন্য কোন দলীল পাওয়া যায়না।
ইমাম মালেক (রহঃ) মদীনাবাসীদের জন্য অপছন্দ করতেন যে, তাদের কোন ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করেই নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের পাশে যাবে। কেননা সালফে সালেহীনগণ এরূপ করতেন না। তিনি আরো বলেন: এই উম্মাতের আখিরী যামানার লোকদেরকে ঐ বিষয়ই সংশোধন করতে পারে, যা তাদের প্রথম যামানার লোকদেরকে সংশোধন করেছিল। অর্থাৎ ছহীহ সুন্নাতের অনুসরণ ব্যতীত তাদের সংশোধনের কোন সুযোগ নেই।
ছাহাবী এবং তাবেয়ীগণ নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাসজিদে আগমন করতেন এবং ছালাত আদায় করতেন। ছালাত আদায় করে তারা মাসজিদে বসতেন অথবা বের হয়ে যেতেন। কিন্তু সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে কবরের নিকট যেতেন না। কেননা তারা জানতেন যে, মাসজিদে প্রবেশের সময়ই নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দুরূদ পাঠ করা এবং সালাম দেয়া সুন্নাত।
দুরূদ পাঠ, সালাম দেয়া কিংবা ছালাত আদায় এবং দু‘আ করার নিয়্যতে কবরের নিকট যেতে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ছাহাবীদেরকে অনুমতি দেননি; বরং তিনি তা থেকে ছাহাবীদেরকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
৯৪. ছহীহ: মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা হা/৭৫৪২, বায্যার হা/৫০৯।
📄 ২২. মুসলিম উম্মাহর কিছু সংখ্যক লোক মূর্তি পূজা করবে
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে? তারা ‘জিবত’ এবং ‘ত্বাগূত’কে বিশ্বাস করে। (সূরা আন নিসা: ৫১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَٰلِكَ مَثُوبَةً عِندَ اللَّهِ ۚ مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ ۚ أُولَٰئِكَ شَرٌّ مَّكَانًا وَأَضَلُّ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ
“বলো: আমি কি সে সব লোকদের কথা জানিয়ে দেব? যাদের পরিণতি আল্লাহর কাছে এর চেয়ে খারাপ। তারা এমন লোক যাদেরকে আল্লাহ লা’নত করেছেন এবং যাদের উপর আল্লাহর গযব নিপতিত হয়েছে। যাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে তিনি বানর ও শূকর বানিয়ে দিয়েছেন। তারা ত্বাগূতের পূজা করেছে। তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে। (সূরা আল মায়িদা: ৬০)
আল্লাহ তা‘আলা আসহাবে কাহাফের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَىٰ أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِم مَّسْجِدًا
“যারা তাদের ব্যাপারে বিজয়ী হলো তারা বলল, আমরা অবশ্যই তাদের কবরের উপর মাসজিদ তৈরী করবো” (সূরা কাহাফ: ২১)
ছাহাবী আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ، حَتَّىٰ لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدَخَلْتُمُوهُ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ؟ قَالَ: «فَمَنْ؟»
“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের অভ্যাস ও রীতি-নীতির ঠিক ঐ রকম অনুসরণ করবে, যেমন এক তীরের ফলা অন্য এক তীরের ফলার সমান হয়। অর্থাৎ তোমরা পদে পদে তাদের অনুসরণ করে চলবে। এমনকি তারা যদি দব্ব (মরুভূমিতে বসবাসকারী গুইসাপের ন্যায় এক ধরনের জন্তু বিশেষ) এর গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তাহলে তোমরাও সেখানে প্রবেশ করবে। ছাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! পূর্ববর্তী উম্মাত দ্বারা আপনি কি ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে বুঝাচ্ছেন? তিনি বললেন: তবে আর কারা?
ছহীহ মুসলিমে ছাহাবী ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الْأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا، وَأُعْطِيتُ الْكَنْزَيْنِ الْأَحْمَرَ وَالْأَبْيَضَ، وَإِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لِأُمَّتِي أَنْ لَا يُهْلِكَهَا بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ، وَأَنْ لَا يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ، فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَإِنَّ رَبِّي قَالَ: يَا مُحَمَّدُ، إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءً فَإِنَّهُ لَا يُرَدُّ، وَإِنِّي أَعْطَيْتُكَ لِأُمَّتِكَ أَنْ لَا أُهْلِكَهُمْ بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ، وَأَنْ لَا أُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَلَوِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَنْ بِأَقْطَارِهَا، حَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يُهْلِكُ بَعْضًا وَيَسْبِي بَعْضُهُمْ بَعْضًا»
“আল্লাহ তা‘আলা গোটা যমীনকে একত্রিত করে আমার সামনে পেশ করলেন। তখন আমি যমীনের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত দেখতে পেলাম। পৃথিবীর যতটুকু স্থান আমাকে দেখানো হয়েছে আমার উম্মাতের শাসন বা রাজত্ব সেই স্থান পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। লাল ও সাদা দু’টি ধনভান্ডার আমাকে দেয়া হল। আমি আমার রবের কাছে আমার উম্মাতের জন্য এ আরজ করলাম, তিনি যেন আমার উম্মাতকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদেরকে ব্যতীত বাহিরের কোন শত্রুকে তাদের উপর বিজয়ী বা ক্ষমতাসীন করে না দেন। যার ফলে সেই শত্রু তাদের সব কিছুকে (রাজত্ব ও সম্পদকে) নিজেদের জন্য হালাল মনে করবে। আমার রব আমাকে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি যখন কোন বিষয়ে ফায়ছালা করি, তখন তার কোনো ব্যতিক্রম হয় না। আমি তোমাকে তোমার উম্মাতের জন্য এ অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমি তাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করব না এবং তাদের নিজেদেরকে ছাড়া যদি সারা বিশ্বও তাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় তবুও এমন কোনো শত্রুকে তাদের উপর ক্ষমতাসীন করবো না যে তাদের জান, মাল ও রাজত্ব এমনকি সবকিছুই বৈধ মনে করে লুটে নিবে। তবে তোমার উম্মাতের লোকেরাই পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একে অপরকে হত্যা করবে এবং একে অপরকে বন্দী করবে”।
ইমাম বারকানী (রহঃ) তার ছহীহ হাদীছগ্রন্থে উপরোক্ত হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তবে উক্ত বর্ণনায় নিম্নোক্ত কথাগুলো অতিরিক্ত এসেছে,
«وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ، وَإِذَا وَقَعَ عَلَيْهِمُ السَّيْفُ لَمْ يُرْفَعْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَلْحَقَ حَيٌّ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدَ فِئَامٌ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي، وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورَةً، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى»
“আমি আমার উম্মাতের জন্য ভ্রষ্টকারী ইমামদের ব্যাপারে বেশী আশঙ্কা বোধ করছি এবং তাদের উপর একবার তলোয়ার চালানো হলে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে তলোয়ার উঠানো হবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না আমার একদল উম্মাত মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং যতক্ষণ না আমার উম্মাতের একটি শ্রেণী মূর্তি পূজা করবে। আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদীর আগমন ঘটবে। প্রত্যেকেই নিজেকে নাবী বলে দাবি করবে। অথচ আমিই সর্বশেষ নাবী। আমার পর আর কোনো নাবী নেই। ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মাতের মধ্যে এমন একটি সাহায্য প্রাপ্ত দল থাকবে। যারা তাদেরকে পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তা‘আলার ফায়ছালা আসার পূর্ব পর্যন্ত তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আন নিসার ৫১নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আল মায়িদার ৬০ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) সূরা আল কাহাফের ২১ নং আয়াতের তাফসীর।
৪) এই অধ্যায়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখানে জিবত এবং ত্বাগূতের প্রতি ঈমানের অর্থ কি? এটা কি শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম? নাকি জিবত ও ত্বাগূতের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং বাতিল বলে জানা সত্ত্বেও এর পূজারীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করা বুঝায়? ইত্যাদি বিষয় এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
৫) ইয়াহূদীদের কথা হচ্ছে, কাফিরদের কুফরী সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও তারা মু’মিনদের চেয়ে অধিক সত্য পথের অধিকারী।
৬) এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই মূর্তি পূজারীদের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছে এ বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে।
৭) এ রকম সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুস্পষ্ট ঘোষণা অর্থাৎ এ উম্মাতের অনেক লোকের মধ্যে মূর্তিপূজা পাওয়া যাবে।
৮) সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন লোকের আবির্ভাব হবে, যারা নবুওয়াতের দাবি করবে। যেমন দাবি করেছিল “মুখতার ছাকাফী”। অথচ সে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালাতকে স্বীকার করত। সে নিজেকে উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভূক্ত বলেও ঘোষণা করত, সে আরও ঘোষণা দিত যে, রাসূল সত্য, কুরআন সত্য এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নাবী হিসাবে স্বীকৃত। এগুলোর স্বীকৃতি প্রদান সত্ত্বেও তার মধ্যে উপরোক্ত স্বীকৃতির সুস্পষ্ট বিপরীত ও পরিপন্থী কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ভন্ড মূর্খ ছাহাবায়ে কেরামের শেষ যুগে আবির্ভূত হয়েছিল এবং অনেক লোক তার অনুসারীও হয়েছিল।
৯) সু-খবর হচ্ছে, অতীতের মত হক্ব সম্পূর্ণরূপে কখনো বিলুপ্ত হবে না বরং একটি দল হকের উপর চিরদিনই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
১০) এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে, সংখ্যায় কম হলেও যারা তাদেরকে বর্জন করবে এবং তাদের বিরোধীতা করবে, তারা এই হকপন্থী জামা‘আতের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
১১) ক্বিয়ামত পর্যন্ত হকপন্থী একটি জামা‘আত বিদ্যমান থাকবে।
১২) এ অধ্যায়ে অনেকগুলো বড় নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে। যথা:
ক) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংবাদ দিয়েছেন যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাকে বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিমের যমীনকে একত্রিত করে দেখিয়েছেন। এ সংবাদ দ্বারা তিনি যে অর্থ করেছেন, তার অর্থ সম্পর্কেও সংবাদ দিয়েছেন। ঠিক তাই সংঘটিত হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণের ব্যাপারে ঘটেনি।
খ) তাকে দু’টি ধনভান্ডার প্রদান করা হয়েছে এ সংবাদও তিনি দিয়েছেন।
গ) তার উম্মাতের ব্যাপারে দু’টি দু‘আ কবুল হওয়ার সংবাদ তিনি দিয়েছেন এবং তৃতীয় দু‘আ কবুল না হওয়ার খবরও তিনি জানিয়েছেন।
ঘ) তিনি এ খবরও জানিয়েছেন যে, এই উম্মাতের উপরে একবার তলোয়ার উঠলে তা আর খাপে প্রবেশ করবে না অর্থাৎ সংঘাত শুরু হলে তা আর থামবে না।
ঙ) তিনি আরো জানিয়েছেন যে, উম্মাতের লোকেরা একে অপরকে ধ্বংস করবে ও একে অপরকে বন্দী করবে। উম্মাতের জন্য তিনি গোমরাহকারী শাসকদের ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
চ) এই উম্মাতের মধ্য থেকে মিথ্যা ও ভন্ড নাবী আবির্ভাবের কথা তিনি জানিয়েছেন।
ছ) সাহায্যপ্রাপ্ত একটি হকপন্থীদল সব সময়ই বিদ্যমান থাকার সংবাদ জানিয়েছেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংবাদ অনুযায়ী উল্লেখিত সব বিষয়ই হুবহু সংঘটিত হয়েছে। অথচ উপরোক্ত বিষয়ের কোনটিই যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
১৩) একমাত্র পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাপারেই তিনি শঙ্কিত ছিলেন।
১৪) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের জন্য মূর্তি পূজার অর্থও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ কাঠের বা পাথরের তৈরী মূর্তির পূজা করা, অলী-আওলিয়াদের মাযার ও কবর পূজা, পাথর পূজা এবং গাছ ইত্যাদির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
টিকাঃ
৯৫. ছহীহ বুখারী হা/৩৪৫৬, ছহীহ মুসলিম হা/২৬৬৯, ইবনে মাজাহ হা/৩৯৯৪।
৯৬. ভ্রষ্টকারী/বিভ্রান্তকারী ইমামগণ: আইম্মাহ (الأئمة): শব্দটি ইমাম (إمام) শব্দের বহুবচন। আর সে হচ্ছে কোন সম্প্রদায়ের এমন প্রধান (নেতা) যে তাদেরকে কোন কথা, কাজ বা বিশ্বাসের প্রতি আহবান জানায় আর তারা তাকে অনুসরণ করে, হোক সে হিদায়াতপ্রাপ্ত অথবা পথভ্রষ্ট। এখানে তাদের (বিভ্রান্তকারী ইমামগণ) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: এমন আমীরগণ, আলিমগণ এবং ধার্মিক ব্যক্তি যারা পাপাচার, অন্যায়, ভ্রষ্টতা বা বিদ‘আতের দিকে আহবানকারী। দেখুন: গায়াতুল মুরীদ।
৯৭. আর যখন তাদের উপরে তলোয়ার এসে পড়বে তখন কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আর তা উঠানো হবে না: অর্থ্যাৎ যখন যুদ্ধ, ফিতনা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব তাদের মধ্যে প্রকাশ পাবে, তখন তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আর উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে হত্যার মাধ্যমে সেই তলোয়ার আপতিত হয়েছে, এখন পর্যন্ত তা চলমান রয়েছে, তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়নি। দেখুন: গায়াতুল মুরীদ।
৯৮. হাসান-ছহীহ: আবু দাউদ হা/৪২৫২, ইবনে মাজাহ হা/৩৯৫২।
📄 ২৩. যাদু
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
“তারা অবশ্যই অবগত আছে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করে নিয়েছে, পরকালে তার কোন অংশ নেই।” (সূরা আল বাকারা: ১০২)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে? তারা জিবত এবং তাগূতকে বিশ্বাস করে। (সূরা আন নিসা: ৫১)
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন,
«الْجِبْتُ: السِّحْرُ، وَالطَّاغُوتُ: الشَّيْطَانُ»
‘জিবত’ হচ্ছে যাদু, আর ‘ত্বাগূত’ হচ্ছে শয়তান।
জাবির (রাঃ) বলেন,
«الطَّوَاغِيتُ كُهَّانٌ كَانَ يَنْزِلُ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ، فِي كُلِّ حَيٍّ وَاحِدٌ»
‘ত্বাগূত’ হচ্ছে গণক। তাদের উপর শয়তান অবতীর্ণ হতো প্রত্যেক গোত্রের জন্যই একজন করে গণক নির্ধারিত ছিল।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ»
তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে দূরে থাক। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী কী? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী মু’মিন নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া”।
জুনদুব (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ
“যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে গর্দান উড়িয়ে দেয়া”।
ইমাম তিরমিযী এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: হাদীছটি মাওকূফ হওয়াই সঠিক।
ছহীহ বুখারীতে বাজালা বিন আবাদাহ থেকে বর্ণিত আছে, উমার (রাঃ) মুসলিম গভর্ণরদের কাছে পাঠানো নির্দেশ নামায় লিখেছেন,
«أَنِ اقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ وَسَاحِرَةٍ، قَالَ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِرَ»
“তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ এবং যাদুকর নারীকে হত্যা করো। বাজালা বলেন, এ নির্দেশের পর আমরা তিনজন যাদুকর মহিলাকে হত্যা করেছি”।
হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছে এসেছে,
«أَنَّهَا أَمَرَتْ بِقَتْلِ جَارِيَةٍ لَهَا سَحَرَتْهَا، فَقُتِلَتْ»
তার দাসী তাকে যাদু করেছিল। তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর উক্ত নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ইমাম মালেক (রহঃ) স্বীয় মুয়াত্তায় এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। একই রকম হাদীছ জুনদুব থেকে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ (রহঃ) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তিনজন ছাহাবী থেকে এই কথা বর্ণনা করেছেন।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা আল বাকারার ১০২ নং আয়াতের তাফসীর।
২) সূরা আন নিসার ৫১ নং আয়াতের তাফসীর।
৩) ‘জিবত’ এবং ‘ত্বাগূত’এর ব্যাখ্যা এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য।
৪) ‘ত্বাগূত’ কখনো জ্বিন আবার কখনো মানুষ হতে পারে।
৫) ধ্বংসাত্মক সাতটি বিশেষ বিষয় সম্পর্কে জানা গেল। যা থেকে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন।
৬) যাদুকর কাফির।
৭) তাওবার সুযোগ দেয়া ছাড়াই যাদুকরকে হত্যা করতে হবে।
৮) উমার (রাঃ) এর যুগে যাদুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তার পরবর্তী যুগের অবস্থা কী দাঁড়াবে? কোনো সন্দেহ নেই যে তার পরবর্তী যুগে যাদু বিদ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
টিকাঃ
৯৯. যাদু দু’দিক দিয়ে শিরকের অন্তর্ভূক্ত:
প্রথম দিক: যাদুতো শয়তানদেরকে ব্যবহার করা হয়। তাদের সাথে গাড় সম্পর্ক রাখতে হয় এবং চাহিদানুযায়ী তাদের নৈকট্য অর্জন করতে হয়। বিনিময়ে তারা যাদুকরের প্রার্থিত খেদমত আঞ্জাম দেয়। অতএব, যাদু শয়তানের শিক্ষা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ
শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত। সূরা আল-বাক্বারা ২: ১০২।
দ্বিতীয় দিক: যাদুতো ইলমে গায়েবের দাবি করা হয়। যা আল্লাহর সাথে শিরকের অন্তর্ভূক্ত। আর এটা হলো কুফরী ও ভ্রষ্টতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
১০০. আল্লাহ তা‘আলার বাণী: يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ অর্থাৎ তারা ‘জিবত’ এবং ‘তাগূত’কে বিশ্বাস করে, এর ব্যাখ্যায় উমার (রাঃ) বলেন: ‘জিবত’ হচ্ছে যাদু। আর তাগূত হচ্ছে শয়তান। একাধিক বস্তুর ক্ষেত্রে ‘তাগূত’ শব্দটি প্রয়োগ হয়ে থাকে। আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যেসব বস্তুর ইবাদত করা হয়, সেগুলো তাগূতের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং এই বাতিল মা‘বূদগুলোও তাগূত। কুরআনের আয়াতগুলোতে এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। গণকদেরকেও তাগূত বলা হয়। যারা শরী‘আতে ইলাহীকে বাদ দিয়ে অন্য বিধান দিয়ে ফায়ছালা করে, ইসলামী শরীয়াতের বিপরীত করার হুকুম করে অথবা যারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য বিধানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং এজাতীয় অন্যান্য বস্তুও তাগূতের মধ্যে শামিল।
১০১. ছহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী ৮/২৫২, ইবনে কাসীর।
১০২. ছহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী ৮/২৫২, ইবনে আবী হাতিম, তাফসীরে ইবনে জারীর ৩/১৩।
১০৩. ছহীহ বুখারী হা/২৭৬৬, অধ্যায়: সতী নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, ছহীহ মুসলিম হা/৮৯, আবু দাউদ হা/২৮৭৪, নাসাঈ হা/৩৬৭১।
১০৪. যঈফ: তিরমিযী হা/১৪৬০, অধ্যায়: যাদুকরের শাস্তি। ইমাম আলবানী (রহঃ) এই হাদীছকে যঈফ বলেছেন: দেখুন: সিলসিলায়ে যঈফা হা/১৪৪৬, দারাকুতনী হা/৩২০৪, সুনানুল কুবরা বায়হাকী।
১০৫. হাসান-ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩০৪৩, তিরমিযী হা/১৫৮৭, মুসনাদে শাফিয়ী হা/২৯০, আব্দুর রাযযাক হা/৯৯৭২।
১০৬. মুসনাদে শাফিয়ী হা/২৯০, মুয়াত্তা মালিক হা/৩২৪৭, সুনানুল কুবরা বায়হাকী ৮/১৩৬।
১০৭. যাদুকর কাফের কি না এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। একদল আলেমের মত হচ্ছে, যাদুকর কাফের। ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আহমাদ (রহঃ) এ মতই পোষণ করেছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) এর অনুসারীদের মতে কোন ঔষধ, ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর কোন জিনিস পান করিয়ে যাদু করা হলে যাদুকর কাফের হবে না। এ ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে করা হলে কাফের হবে। তা কুফরী হওয়ার অন্যতম দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
“তারা উভয়ই এ কথা না বলে কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না যে, আমরা কেবল পরীক্ষার জন্য এসেছি; কাজেই তুমি কুফরীতে লিপ্ত হয়ো না। (সূরা আল-বাকারা: ১০২)